বুধবার, ফেব্রুয়ারি ১

অংক

0

রশিদ মাস্টারের বয়স ৭২ বছর।

লম্বা পাতলা শরীর। বছর তিনেক আগে বাঁ চোখের ছানি অপারেশন করিয়েছেন। কালো ফ্রেমের সরকারি চশমা একটা পরেন তিনি। ফলে তাকে একটু অদ্ভুতই দেখায়। তবে এগুলো তার চেহারার বিশেষত্ব না; আসল বিশেষত্ব তার মাথা, এবং মাথাভর্তি সাদা চুল। রজনীপুর মফস্বলে এই দুটি বস্তুই তাকে আলাদা করে ফেলেছে।

মাথার আগে মাথার চুলের কথায় আসা যাক।

রশিদ মাস্টার যখন উদভ্রান্তের মতো মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে হাঁটেন, তখন তার চুলগুলোকে মনে হয় একরাশ কাশফুল। যেন ফুলগুলো বাতাসে ভাসতে ভাসতে এগিয়ে আসছে। দূর থেকেও মানুষ ঠাহর করে নেয়৷ মাস্টারের আগমনে সচেতন হয়ে যায়।

তা রশিদ মাস্টার ছিলেন গণিতের শিক্ষক।

গণিতের ভালো শিক্ষকদের নিয়ে নানা রকম গুজব থাকে। রশিদ মাস্টারকে নিয়েও ছিল। অবশ্য ছিল না বলে এখনো যে আছে তাই বলা উচিত।

তা কী ধরনের সে গুজব?

রজনীপুরে এখনো সবাই বলাবলি করে যে রশিদ মাস্টার একটা অংক নাকি অন্তত এক শ রকমের নিয়মে করতে পারেন। আপনি একটা নিয়ম না বুঝলে আপনাকে শতেক নিয়মে বুঝিয়ে ছাড়বে— এমনই তার মাস্টারি।

এ গুজব অবশ্য সত্যের কাছাকাছি।

রশিদ মাস্টার নানান নিয়মে অংক করতে পারেন এবং তিনি যদি ঠিক করে নেন যে শিক্ষার্থীর মাথায় অংক ঢুকিয়ে ছাড়বেন, তা তিনি করবেনই করবেন।

প্রতিভাবানরা যে একটু জেদি হয়, তা কে না জানে!

অবশ্য রশিদ মাস্টারকে নিয়ে সবচেয়ে জনপ্রিয় গুজব হলো, তিনি নাকি একবার এক ম্যাজিস্ট্রেটকে একটা অংক ধরেছিলেন। ম্যাজিস্ট্রেট স্বভাবতই উত্তর দিতে পারেননি। রশিদ মাস্টার তখন তাঁকে বেত নিয়ে তাড়া করতে করতে বলেছিলেন, ‘এই বিদ্যা নিয়ে আমার স্কুল পরিদর্শন করার যোগ্যতা আপনার নাই। বাহির হওন, এক্ষুনি বাহির হওন!’

তবে কি, এই গুজবের সত্য-মিথ্যা নির্ণয় করা মুশকিল। রশিদ মাস্টারকে যতোবার এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়েছে ততোবারই তিনি এড়িয়ে গেছেন। কখনো কখনো মুচকি হেসে অন্য প্রসঙ্গে গেছেন। তিনি যে একটু খেয়ালি তা কে না জানে!

স্কুল থেকে রিটায়ার্ড হওয়ার পর কিছুদিন রশিদ মাস্টার বাড়ি বাড়ি গিয়ে ছাত্র পড়াতেন। তবে অল্প দিনের মধ্যেই বিরক্ত হয়ে যান। ‘প্রাইভেট’ পড়ানো আর যাই হোক তার কর্ম না। অংক কষে মানুষ ব্যাবসা কেমনে করে রে?

অবসরের পর একটা মোটামুটি অংকের টাকা রশিদ মাস্টার পেয়েছিলেন। টাকাগুলো তিনি তার ছেলেদের দিয়েছিলেন। ব্যবসা করতে। ছেলেরা ব্যবসায় নেমেছিল ঠিকই, কিন্তু উঠে দাঁড়াতে পারেনি। ছেলেদের চিন্তা তাই তিনি অনেক আগেই ছেড়ে দিয়েছেন।

বেশ কিছুদিন থেকে রশিদ মাস্টারের মাথায় অন্য চিন্তা। চিন্তায় বলা যায়— কারণ তিনি নাওয়া-খাওয়া বলতে গেলে ছেড়েই দিয়েছেন। পড়ে আছেন রজনীপুরের পাবলিক লাইব্রেরি নিয়ে।

পুরনো ভাঙা এক জমিদার বাড়ির কোনোমতে টিকে থাকা একটা ঘর নিয়ে পাবলিক লাইব্রেরিটা তৈরি যখন হয়, অনেকের সাথে তখন রশিদ মাস্টারেরও ছিল সীমাহীন আগ্রহ। কিন্তু অযত্ন আর অবহেলায়, যোগ্য লোকবলের অভাবে, অন্য সবার অনাগ্রহে, লাইব্রেরিটা তার চেহারা হারাতে দেরি করেনি। পাঠক নেই— নিয়ে আসার কারো ইচ্ছাও নেই; ফলে তাতে তালা পড়তে খুব বেশি সময়ও লাগেনি।

চেয়ারম্যানের ওপর রশিদ মাস্টারের রয়েছে আলাদা দাবি— কারণ মিজান ছিল তারই ছাত্র। বইয়ের অংকে একেবারে গাধা প্রকৃতির হলেও জাগতিক অংকে মিজান বেশ পাকা। আওয়ামী লীগ বিএনপিকে পাশ কাটিয়ে চেয়ারম্যান হওয়া চাট্টিখানি কথা না।

রশিদ মাস্টার দীর্ঘদিন ধরে ওই লাইব্রেরি আবার খোলার অনুরোধ করে আসছেন মিজানের কাছে।

রজনীপুরকে কিছুদিন আগেই পৌরসভা ঘোষণা করা হয়েছে। মিজান সেই পৌরসভার চেয়ারম্যান। চেয়ারম্যানের ওপর রশিদ মাস্টারের রয়েছে আলাদা দাবি— কারণ মিজান ছিল তারই ছাত্র। বইয়ের অংকে একেবারে গাধা প্রকৃতির হলেও জাগতিক অংকে মিজান বেশ পাকা। আওয়ামী লীগ বিএনপিকে পাশ কাটিয়ে চেয়ারম্যান হওয়া চাট্টিখানি কথা না।

তবে রশিদ মাস্টার এসব অংকের ধার ধারেন না। কাঠের ডাঁটের ছাতা মাথায় দিয়ে পৌরসভায় ঢুকে তিনি জলদকণ্ঠে হাঁক দেন— মিজান! মিজান!!

মুখে স্বীকার করে না, কিন্তু এ ডাকে মিজানের পেটের ভেতর আজো কিছু একটা নড়ে যায়। হঠাৎই বাথরুম যেতে ইচ্ছা করে। তীব্র গলায় বলতে ইচ্ছা করে— প্রেজেন্ট স্যার!

মিজান কোনোমতে সামলে নেয়। অত্র এলাকায় মিজানকে এখন কেউ নাম ধরে ডাকে না। সবারই এক রা–চেয়ারম্যান! চেয়ারম্যান!!

তাই মাস্টারের এমন ডাকে মিজানের খুব লজ্জা হয়, রাগও চড়ে যায়। কিন্তু মিজান মেজাজ হারায় না। মেজাজ হারানোর মানুষ হলে আর যাই হোক এ-বিকে পাশ কাটিয়ে চেয়ারম্যান হওয়া যায় না।

উলটো মিজানের কণ্ঠে মধু ঝরে পড়ে— সার আসছেন তো! ও বজলু, সারকে ভিত্রে নিয়া আয় রে!

বজলু মিজানের অফিস পিয়ন। তবে অফিসের কাজ-কাম তার কমই। তার মূল কাজ চেয়ারম্যানের বাড়ির বাজার করে দেয়া। বাজারে বড়ো আইড়-বোয়াল নামলেই বজলু বিদ্যুতের বেগে ছুটে যায়।

তা রশিদ মাস্টারকে ডাকতেও বজলু তড়িৎ ছোটে। আসেন সার আসেন সার বলে মিজানের রুমে বসায়। মিজান চা সাধে। কিন্তু রশিদ মাস্টার চায়ের পাশ দিয়েও যান না। স্পষ্ট বলেন, তুই লাইব্রেরির চাবি কবে দিতাছিস সেইটা আগে বল! চা তো তোর গেটের বাহিরেও পাওয়া যায়!

এ অবশ্য আরেক লজ্জা!

এই যে পিয়ন-টিয়ন বজলুদের সামনেই মিজানকে তুই তুই বলে সম্বোধন… মিজান একেবারেই কুঁকড়ে যায়। আরে এখন তো পারলে তাকে উঠতে-বসতে মাননীয় মাননীয় বলে লোকে! ‘তুই’ কি এখন যায় কোনোভাবে?

মিজানের জিবে কথা সরতে চায় না। কোনোমতে বলে, দেখেন সার, আপনি তো অবুঝ না— এইটা তো আসলে সরকারি ব্যাপার…আমি চাইলেও তো কিছু করবার পারি না!

রশিদ মাস্টার খেঁকিয়ে ওঠেন, ‘রাখ তোর সরকারি ব্যাপার! রাখ তোর সরকার! একবার কান মইলা দিলে বুঝবি ঐকিক নিয়ম কী হারামজাদা!

বজলু ফিক করে হেসে দেয়। মিজান ধমক দিয়ে ওঠে— এইখানে কী করোস তুই? যা.. সারের জন্য ফান্টা নিয়া আয়, যা…

বজলু বেরিয়ে যায়। রশিদ মাস্টার বলেন, শোন, তুই মানুষের উন্নতি করবি বইলা ভোট নিছিস না? আর এখন সেই মানুষদের জন্য লাইব্রেরিটা খুইলা দিতে পারছোস না… চাবি কই আছে বল…?

তা চাবি মিজানের ড্রয়ারেই আছে অবশ্য। কিন্তু কী এক অদ্ভুত কারণে চাবিটা মিজানের দিতে ইচ্ছা করে না। মিজানের বউও একদিন বলেছে, বুইড়া মানুষটারে তুমি খালি খালি ঘুরাইতেছ ক্যান? হাজার হলেও মাস্টার মানুষ— চাবি দিয়া দাও, ঝামেলা ফুরাক।

মিজান বলেছে, সরকারি অর্ডার না হইলে এগুলান করা যায় না! পলিটিক্সের তুমি কী বুঝো? তুমি তুমার ফেসবুক আর ফেসওয়াশ নিয়া থাকো! আমার কুনো ক্ষমতা নাই এই ব্যাপারে!

বউ মুখ ঝামটায়— তুমি দেখি সবখানেই অক্ষম।

মিজান কিছু বলে না। এদের বলে লাভ তো নাই। মিজান শুধু ভাবে। ভাবে যে চাবি দেয়ার ক্ষমতা যে তার নাই তা তো না। ক্ষমতা তার আছে। ইচ্ছা করলেই রশিদ মাস্টারকে চাবিটা সে দিতে পারে। তবে, ইচ্ছাটা তার হচ্ছে না।

কেন হচ্ছে না?

মিজান পুরো ছাত্রজীবন রশিদ মাস্টারের কথায় ও হাতে বলা যায় নিগৃহীত হয়েছে এবং এখন তার বদলা নিতে চাচ্ছে ব্যাপারটা এমন কিনা মিজান কিন্তু তাও ভেবেছে; এবং ভেবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে ব্যাপারটা তেমন না। এত সরল-সহজ না।

বরং এমনও হতে পারে যে ছোটোবেলা থেকে যাকে বাঘের মতো ভয় পেয়ে এসেছে, যার জন্য পুরো ছাত্রজীবন তটস্থ থেকেছে, সেই পাহাড়ের মতো শক্তিশালী মানুষটা এখন তার কাছে আসছে, তাকে একটা কাজ করে দিতে বলছে, তার সম্মতি ছাড়া কাজটা হচ্ছে না… হয়তো এই ব্যাপারগুলো মিজানকে সুখী করে তুলছে। ছোটোবেলার ভয়ের দীঘি বড়োবেলায় সাঁতরে ফালা করার আনন্দ সে পাচ্ছে!

মিজান তাই ড্রয়ার থেকে চাবি বের করে না। আর রশিদ মাস্টারও হাল ছাড়েন না। ফলে রজনীপুর পৌরসভায় প্রায় প্রতিদিন একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে থাকে।

 

২.
এরমধ্যে মিজানকে একদিন শহরে যেতে হয় সরকারি কাজে। রশিদ মাস্টার তা জানতেন না। প্রতিদিনের মতো পৌরসভায় ঢুকেই তিনি হইহল্লা শুরু করে দেন। মিজান মিজান বলে চেঁচাতেও থাকেন। বজলু এসে সালাম দিয়ে জানায়, চিয়ারম্যান সার তো নাই সার! শহরে গেছেন। ফিরতে দেরি হইব। নাও ফিরতে পারেন আইজ।

রশিদ মাস্টার ফোঁস করে শ্বাস ফেলে ছাতা বাগিয়ে ফিরতি পথা ধরেন। কিন্তু তখনই, ঠিক সে মুহূর্তেই, বজলু একটু কেশে ওঠে। বলে, সার… একটা কথা…

কী বল…

বজলু এদিক-ওদিক দেখে। ঘরের দেয়ালগুলো যেন চোখ দিয়ে চাটে। কিছু একটা বোঝার চেষ্টা করে। তারপর গলাকে প্রায় সাইলেন্ট মোডে দিয়ে বলে ওঠে, ‘সার লাইব্রেরির চাবি তো এখানেই আছে। এই ঘরে। চিয়ারম্যানের ডয়ারে!’

রশিদ মাস্টার এবার হুংকার দিয়ে ওঠেন— কী?

কলিজা পেটে নেমে আসে বজলুর। কাঁপতে কাঁপতে বলে, জি, জি সার!

রশিদ মাস্টার রাগের তোড়ে হড়বড় করে অনেক কথা বলতে থাকেন। বেশিরভাগই খুব স্পষ্ট হয় না। যতটুকু হয় তাতেই বজলুর চোখ কপালে ওঠে। মাস্টার বারবার বলতে থাকেন যে, মিজানের সাহস দেখে তিনি যারপরনাই তীব্র অবাক হয়েছেন। নিজের কাছে চাবি রেখে তাকে বারবার কষ্ট দেয়ার কী অর্থ তিনি বুঝতে পারছেন না! তবে তিনি আগেই জানতেন যে-ছেলে সুদ-কষা পারে না সে-ছেলে কোনোদিনই ভালো হয় না। মিজান ভালো ছাত্র কোনোকালেই ছিল না, এখন তো দেখা যায় মানুষও সে খারাপ হয়ে গেছে! বেতিয়ে মিজানের পিঠের ছাল উঠিয়ে নেয়া উচিত… সে এলেই তাকে অন্তত একশবার কান ধরে ওঠবোস করাবেন!

বজলু ঢোক গেলে। চেয়ারম্যান তাদের ওপরওয়ালা। তাকে নিয়ে এমন কথায় বজলু যেন বিহবল হয়ে পড়ে। যেন মহাপুরুষের বস্ত্রহরণ হচ্ছে!

রশিদ মাস্টার যেন হঠাৎই উল্লসিত বোধ করেন। বজলুর পিঠে দ্রুত টোকা দিয়ে বলেন, যা যা! এইবার চাবি নিয়া আয় যা!

বজলু পড়ল ফাঁপড়ে। মিজানের যে-ড্রয়ারে লাইব্রেরির চাবি আছে সেটা তালামারা থাকে না সত্যি, কিন্তু চেয়ারম্যানের অনুমতি ছাড়া এ কাজ সে করেই বা কীভাবে? আবার রশিদ মাস্টারের কণ্ঠ আর শরীরিভাষা এমন যে বলামাত্র তার আজ্ঞা পালনে শরীর-মন নিজ থেকেই অসাড় হয়ে পড়তে চায়।

রশিদ মাস্টার আবার তাড়া দেন— কী হলো, যা নিয়া আয় চাবি… কত বড়ো সাহস তোদের চিয়ারম্যানের হইছে চিন্তা কর… রশিদ মাস্টাররে ডজ দেয়? বিরাট মেসি হইয়া গেছে সে? তার মেসিগিরিবামি ছুটাইতেছি, খাড়া!

বজলু করবেটা কী?

রশিদ মাস্টার আবার তাড়া দেন— কী হলো, যা নিয়া আয় চাবি… কত বড়ো সাহস তোদের চিয়ারম্যানের হইছে চিন্তা কর… রশিদ মাস্টাররে ডজ দেয়? বিরাট মেসি হইয়া গেছে সে? তার মেসিগিরি ছুটাইতেছি, খাড়া!

বজলু কাচুমাচু হয়ে বলে, সার, চেয়ারম্যান সারের অনুমতি ছাড়া তো…

রশিদ মাস্টার এবার ভয়ঙ্কর ভারী কণ্ঠে হুংকার দেন, অনুমতি? আমার কথা আগে না মিজানের কথা, অ্যাঁ? তরে পড়াইছি আমি, তর বাপরেও পড়াইছি… আমার কথা অমান্য তোর বাপেও করতে পারে না! মিজানকে বলিস এই চাবি আমি নিয়া গেছি, দেখি মিজান কী বলে? যা চাবি নিয়া আয়, যা…

শেষের ‘যা’ শব্দটাতে দুরন্ত গতি ছিল, বজলুর ড্রয়ারের উদ্দেশে বুলেটপ্রাপ্তি ঘটে। ওই অল্প সময়ের মধ্যেই সে চিন্তা করে, চেয়ারম্যান প্রশ্ন করলেই তো সে রশিদ মাস্টারকে দেখায়া দিতে পারবে। আর রশিদ মাস্টারকে কিছু বলার ক্ষমতা এ রজনীপুরে কারইবা আছে?

 

৩.
রশিদ মাস্টার চাবি নিয়ে সরাসরি লাইব্রেরি চলে যান। ইয়াব্বড়ো তালাটা খুলে দেখেন ভেতরের অবস্থা বেদম শোচনীয়। আলোহীন, ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে থাকথাক বইয়ের স্তূপ; আর চারপাশে ইঁদুরের তীব্র কোলাহল। লাইব্রেরির ইলেকট্রিক লাইন কাটা। রশিদ মাস্টার ঠিক করেন মিজানকে বলে কালকেই এখানে বিদ্যুতের ব্যবস্থা করবেন। বাজার থেকে মোমবাতি এনে পাবলিক লাইব্রেরিকে করেন আলোকিত। অথচ এটারই না আলোকিত করার কথা ছিল রজনীপুরকে!

দুঃখ করার মতো মানুষ রশিদ মাস্টার না।
তিনি সমস্যায় পড়লে সমাধান করেন। অংক মেলান। লাইব্রেরির অংক তিনি মেলাতে শুরু করেন।

প্রথমেই ঝেঁটিয়ে ইঁদুর আর ধুলোবালি তাড়ানোর চেষ্টা করেন রশিদ মাস্টার। সন্ধ্যা পার হয়ে গেলে মুখে একটুকরো পাউরুটি দিয়েই বই ঝাড়মোছ করতে শুরু করেন। এটা বোধহয় রাতভরই চলতো— কিন্তু রাত প্রায় দশটার দিকে প্রবল বাতাসের সাথে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যেই রশিদ মাস্টার আবিষ্কার করলেন ঘরটার এমন কোনো ছাদ নেই যেখান থেকে পানি গড়িয়ে পড়ছে না। শেল্ফে বইগুলো মোটেও নিরাপদ না; শেল্ফ গলিয়ে পানি ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে। সাপের মতো সেই পানি এই বইয়ে সেই বইয়ে ছোবল মারতে শুরুও করেছে। রশিদ মাস্টার বইগুলো টেনে টেনে টেবিলের ভেতরে নিতে শুরু করলেন। তাতে কিছু বই ভেজা থেকে বাঁচল, কিছু বই বাঁচানো অসম্ভব হয়ে দাঁড়াল। কিন্তু চেষ্টার কোনো ত্রুটি রশিদ মাস্টার করলেন না। এই চেষ্টা তার চলল রাতভর…

ফজরের আজানের পরপরই লাইব্রেরির পশ্চিম দেয়ালের একাংশ ধ্বসে গেল। ধ্বসে যাওয়া ফাঁকা অংশ দিয়ে বাইরের জমে থাকা পানি ঢুকতে শুরু করল গলগলিয়ে। বইগুলো বাঁচানোর জন্য রশিদ মাস্টার বুক আগলে দাঁড়ালেন। এটা সেটা টানতে টানতে, বইয়ের শেল্ফগুলোকে ঢালের মতো ব্যবহার করতে করতে সকালের আলো যখন ফুটল, ভাগ্য ভালো বৃষ্টিটা ধরে এলো ততক্ষণে। রশিদ মাস্টার বুকের মধ্যে বই জড়িয়ে হালভাঙা নাবিকের মতো সেই ধ্বংসস্তূপের মধ্যে ধ্বস্ত বসে থাকলেন।

বইয়ের শেল্ফগুলোকে ঢালের মতো ব্যবহার করতে করতে সকালের আলো যখন ফুটল, ভাগ্য ভালো বৃষ্টিটা ধরে এলো ততক্ষণে। রশিদ মাস্টার বুকের মধ্যে বই জড়িয়ে হালভাঙা নাবিকের মতো সেই ধ্বংসস্তূপের মধ্যে ধ্বস্ত বসে থাকলেন।

সারারাত ভেজার ফলে রশিদ মাস্টারের শরীর মুচড়ে জ্বর এলো। আর তার পরপরই চলে এলো পুলিশ। সরকারি চাবি ডাকাতি করার অভিযোগে রশিদ মাস্টার তখনই গ্রেফতার হলেন এবং সেদিনই চালান হয়ে গেলেন কোর্টে। যেতে যেতে শুনলেন পৌরসভার চেয়ারম্যানের পিয়ন বজলু শেখ তার জবানিতে জানিয়েছে, রশিদ মাস্টার দিনে-দুপুরে চেয়ারম্যানের ড্রয়ার থেকে পাবলিক লাইব্রেরির চাবি ছিনিয়ে নিয়ে গেছে। এতে পাবলিক লাইব্রেরির সকল সরকারি জিনিসপত্র পড়েছে সীমাহীন হুমকির মুখে।

অংকের দুঁদে শিক্ষক হয়েও রশিদ মাস্টার কোনো অংকই বুঝে উঠতে পারলেন না। জ্বরে তার সবকিছুই কেমন যেন ঘোরের মধ্যে চলে গেল। কিছুক্ষণ পরপর ঠান্ডায় বা অন্য কোনো কারণে তিনি শুধু কেঁপে উঠতে থাকলেন।

পনেরো দিনের মাথায় অজ্ঞাত ম্যাজিস্ট্রেটের হস্তক্ষেপে রশিদ মাস্টারের জামিন হলো। জেল থেকে বের হয়ে তিনি শুনলেন পাবলিক লাইব্রেরির তালা নাকি খুলে দেয়া হয়েছে। বইগুলো সরিয়ে অন্যত্র রাখা হয়েছে। সরকার ঠিক করেছে ওখানে এখন থেকে মাছের পায়কারি কেনাবেচা হবে!

মাছ স্বাস্থ্যকর অংক বটে!

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

জন্ম ৮ নভেম্বর ১৯৮১। দশ বছরের লেখালেখির জীবনে লিখছেন মূলত বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়। বর্তমানে কর্মরত একটি বেসরকারী টেলিভিশন চ্যানেলে।

প্রকাশিত গ্রন্থ কবিতা :আত্মহননের পূর্বপাঠ (২০১০) রম্য সংকলন : যে কারণে আমি সাকিব আল হাসান হতে পারি নি (২০১৭) গল্প সংকলন : য পলায়তি স জীবতি (২০২০), সিলগালা মহল্লার ব্যালকনিরা (২০২১), কী একটা অবস্থা (২০২২)।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।