বুধবার, ফেব্রুয়ারি ২৮

অ্যাটলাস, গ্লোবটা ফেলে দিয়ে ফ্রি হয়ে যাও : রৌশান সৃজন

0

দ্বীপান্বিতা কঙ্কালে দেখি দেহ


এই দ্যাখো…
ক্যামন করুণভাবে পুড়ে যাচ্ছে সময়! অথচ, ‘অবজ্ঞার হোমাগুনে পুড়ে পুড়ে খাক হোক শাপিত অতীত’— এমন প্রার্থনানাদ পাপাচারী প্রেতের প্রতীতি নিয়ে ফিরে আফিমের ঘোর ঘেরাটোপে বুঁদ করে ফেলছে আমায়। আর আমি, অহম-যাতনাগুলোকে পবিত্র আগুন হতে বহুদূর বিদিশায় নাচানাচি করতে দেখছি, আপাতস্থবির, দৃশ্যের বাহিরে দাঁড়িয়ে একাকী। ক্যামন আত্মঘাতি আমি আজ দ্যাখো…

বেগুনি আকাশের পটে থিত্থির উড়ে চলা অগ্নিলাল মেঘপুঞ্জের প্রখর ছায়ায় পুড়ে পুড়ে কোন সে ধ্যানী বলাকার সামান্য হরিদ্রায় মিশে যেতে চেয়ে শত শত প্রবীর-প্রচেতার সবুজ ধমনী কেটে নীল-শোনিত সহ লুট করে চলছি হৃদয়! পরিণামে, দৃষ্টির আবডালে উড়ে চলা অতিনীল ডোলঘুঁড়িটার লাগাম নাটাই আমি ফাগুনের শেষাবধি পেয়ে যাব বলে?

….আমার কামনাগুলো তোমাদের আরক্ত ঠোঁটের হীম ঝাপটায় নাগরিক শালিখের চিলেকোঠাঘরে বীপ্রক্ষয়ি চামড়ায় অনুদিত হতে হতে এতটা পেশল আর পরিবাহি হয়ে গ্যাছে আজ; যেনবা, ‘বিজুরি-ঝটকার বিবশ যাতনা সঞ্চার করে শেষে…’
এই ভেবে– তোমাদের হৃদকমল গুলো সযতনে সরিয়ে রেখেছো কনক্রিট সরোবরে! তবুও, তোমাদের দিকেই তাকিয়ে থেকেছি আমি। তোমাদের আনন্দ-হুল্লোড়, যাপনের রঙ-রেখ দেখতে দেখতে আর জানতে জানতেই রাঙিয়ে চলেছি আমি নিজস্ব আকাশ….

সেখানে, ততোধিক অসীমতা নিরূপিত হবে কিনা, এরূপ ভাবনারা ভীড় করে। আমি সেই ভীড়-ভাট্টায় ভিন্ন কোনো সুখদ নির্জনে নির্বাক ঘুরে ঘুরে উদ্ধার করি— মোক্ষোম মিথ্যার অসীম অভাবে তার না কি প্রাণ যায় যায়, আমিও তার প্রতি সসীম মায়ায় সক্ষম মিথ্যার সন্ধানে হায়! মরিমরি! দৈবাৎ যদি আমি পেয়ে যাই সত্য ‘মিথ্যা’ বা মিথ্যে ‘সত্যে’র অমিয় যৌগজল; সেদিন বাঁচাব তাকে অমূল্য মিথ্যের সুগম-সচ্ছল অমূলক নিত্যতা থেকে।

… তাই বুঝি এত এত অযাচিত দূর্ভাবনাতরু শিকর-বাকড়ে যুথ বিস্তারিছে তোমাদের কুটিল মগজে? পারত্রিক প্রতিপৃথিবীর ওমনীলনিলয়লিপ্সা থেকে ফেরাতে আমায়? ভুল। ফিরে যাও। তোমাদের যাবতীয় যাপনোল্লাস আর অতিমূল্য জাগতিক হিরণ্যপ্রসাদ নিয়ে তোমাদের পথে। আমি শুধু সেইসব যাতনার নিরেট আঁধারে একা পরাপ্রত্ন খননের সবক শিখেছি সারাবেলা একান্ত আপন এক বুদ্ধের বেদনার ব্যাতিচার মেপে।


আমি তুমি সে


তুমি ঘর পোড়া গরু এক
আমি সিঁদুর রঙা মেঘ
তুমি যুক্তিরুদ্ধ বোকা
তাই বাড়তেছে উদ্বেগ।
আমি সন্তাপি এক পাপী
তাই আর কোনো অনুতাপ
কাবু করে না আমারে মোটে
তুমি ভাবে আছো যদ্যপি।
সেও ছিল খুব একরোখা
য্যানো ক্লিওপেট্রার কপি
আমি এন্টনি হতে যেয়ে
তবে খেয়েছি কি কোনো ধোঁকা!
ভাব কেটে গেলে বালা
আসে অভাব অন্তরীত
ফিরে ভাঙাচোরা সংসারে
ক্লিশে অপলাপ হয় গীত।
তারও চোখ ছিল উজ্জ্বল
লোরে মাস্তানি বাঙময়
হেরি আমিও মদন কৃষ
তপে হয়েছিনু তন্ময়।
পরে মন্ময় পিছুটানে
সেখানে রাত্রি নামে
ভোরে অস্ফূট ছিল রবি
অনিবার্য সে গ্রহণে।
তুমি ঠিকঠাক মেপেজুখে
দেখো আমার মুরদখানি
জেনো, ভাবে নাকি কোনো ঠাপে
এই মরমের তড়পানি।
মায়া ছিনালি করেই থাকে
আমি ভক্তিতে সাবলীল
তুমি প্যারালালি অদ্যপি
আছো— ভালোবাসা যায় যাকে
আমি নিধিরাম নিহিলিস্ট
মগজ পচিয়ে চলি
খুবি গানিতিক যদিচ
তবু জ্যমিতিতে আছে ভয়
আছে হারানোর ম্যালা কিছু
সারা জীবনের সঞ্চয়।


বিপন্ন বিষয়


সময় এখন তোমাকে ভাবার নয়
বর্ষার আগে খুঁজে পেতে হবে কাজ
নোনাধরা ঘরে চৌকাঠ নড়বরে
এ ঘরে তোমাকে মানাবে না নিশ্চয়।
এদিকে আবার সঞ্চয় যত ক্রান্তির কোপে শেষ
গতায়ু চৈত্র, ঈশানের রাঙা চোখ
তপ্ত বাতাসে যখন-তখন ঝটিকার নির্দেশ।
স্বরাজ আমার এই বুঝি গেল চলে;
নিষ্ফলা বড়ো স্বকৃতসাধনা, সৃষ্টি-অমনিবাস
যার ফুলে-ফলে ভেবেছ আমাকে রাজা
এবং করেছ আমাকেই অভিলাস।
ভাবিনি কখনো হঠাৎ এভাবে তুমি
শাসন করবে গদ্যসত্যদিন
ভবিষ্যগামি বিচিন্তা পরিণামে
আমাকে ফেলবে সংকটে সঙ্গীন।
আমিও কেমন উদ্ভট একা রাতে
বাষ্পরুদ্ধ ফুসফুসে মর্মের
যন্ত্রণা ধরে তোমারি কান্তি এঁকে
উদ্ধার করি আনন্দ জন্মের।
এভাবে মেরো না।
এতটা গভীরে এভাবে কেটো না অয়ি,
সময় এখন তোমাকে ভাবার নয়
কাজ খুঁজে পেতে হবে বর্ষার আগে
নইলে স্বরাজ টিকবে না আর; নেই কোনো সংশয়…


অ্যাটলাস, গ্লোবটা ফেলে দিয়ে ফ্রি হয়ে যাও


…সে এক নিষ্ফলা বড়ই গাছ।
ফলন্ত কুল-বাগান দেখে ঈর্ষায় জ্বলে যায় মাঘে
—এখন চোত মাস
এমন নিদাঘ দিনে তার পাতা পুড়ে ফাতাফাতা
এখন স্বর্ণলতিকায় ভারী তার মাথা
সে এক বয়োপ্রাপ্ত বড়ই গাছ
পরিত্যক্ত শ্মশানে একা রয়েছে দাঁড়ায়ে।
—যেহেতু বড়ইগাছ মাওয়ারা ছাবালের মতো নিরানন্দ রয়েছে দাঁড়ায়ে
পরন্তু ফাগুনে ফলে না;
তাই রতিজড় বৃক্ষ-সমাজে সে অস্পৃশ্য একা—
ফলত চক্ষুষ্মানের মাথার পিছন দিয়া সে স্হাণু
(যদিও, দেখনেঅলারা ভাবে
‘জিরোডিগ্রি পরিবীক্ষণে তারা তিনশতষাঠ ডিগ্রি দেখতেছে’)
—মূলত তারা কচু খাইতেছে আর মরতেছে
ফের জিন্দা হইতেছে ফের মুলা খাইতেছে
এই বদরীবৃক্ষটি আমি
সারা গায়ে মোর চোঁখা চোঁখা কাঁটা
বৃক্ষ-সমাজ থেকে দূরে
বেসরকারি শ্মশানে একা সটান খাড়ায়া আছি
আমাকে বেষ্টন করে থাকে লতা
বসন্তে শষকুঁড়ি বর্ষায় মাচআলু আগাছা তেলাকুচা
ফাগুনে ফলি না তাই পোলাপান ভেঁড়ে না আশেপাশে
আমাকে ঘিরে ফুটে থাকে ভাঁটফুল
লাল, শাদা, শাদা-লাল থোকায় থোকায়
আমি ঐগুলারেই ড্যাফোডিল ভাবি
হোক সে মাটিটা দোআঁশ
ঝড়-বাউড় নেয় না আমারে
সন্নিকটে হিমালয়
বিধায়, সুনামি-সাইক্লোন দূরপরাহত
—টর্নেডোর অপেক্ষায় থাকি
ওদিকে চক্ষুষ্মানের মগজে নাকি অনাদিকাল হতে চাঁদে এক বুড়ি চড়কা নিয়ে আছে বসে—
চাঁদের বুড়ির চড়কা হতে বেতার বার্তা নিয়ে উড়ে আসে সূতো
…পত্রপাঠ জানিতে পারলুম
কেশকর্তনে তেনাদের ব্যাপ্তি বিশাল

তাই
মওকা মিলিলে ফের বালগাছ হবো।


প্রত্যয়


কতটা গভীরে যাব আমি?
গভীরে তো হীমলোনা জল—
কখোনো মরম-তরপানি
কখোনো অমল হলাহল।
গভীরে যেতেই হবে তবে?
গভীরে যেয়েই কী বা হয়!
দৃষ্টি হেনেছি গভীরে
গভীরে গভীর সংশয়।
গভীরে যেতেই আমি আজ
খুলেছি নাসিকা থেকে লাজ
যতন করেছি কারুকাজ
তোকেই পড়াতে সেই তাজ
কবিতারে মারিস না মা
আমি তরে উদযাপনের
স্বস্তি ভেবেছি আর নয়
লালেবি লালেবি জীবনের
গভীরে গভীরতর ক্ষয়
ক্ষয়িষ্ণু দুপুরে একাকী
আমাকেই বুকে টেনে নে
রচনা করো রে আমারে
সৃজনের নীল প্রতিমা।

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

জন্ম ১২ নভেম্বর ১৯৮৩। লেখাপড়া: বিএ, এল. এল.বি, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। পোস্ট গ্রাজুয়েট ডিপ্লোমা ইন রুরাল ডেভেলপমেন্ট, বশেমুরকৃবি। পেশা: উদ্যোক্তা। অবসেশন: ক্লাসিক্যাল গিটার। বিবাহিত। লেখালেখির শুরু লেট নাইন্টিজ। প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয় ৯৯ এ। প্রথম গল্প প্রকাশিত হয় বিধান সাহা সম্পাদিত ‘মিশ্র দর্শন’ নামক সাহিত্যপত্রে।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।