শুক্রবার, অক্টোবর ২২

নিত্য যে নদী বহে

2

প্রথম পর্ব

• দণ্ডভোগ করার গোড়ার দিকে


বেশ কেমন একটা ধন্ধ নিয়ে আছি আমি!

কিন্তু এটা কি ধন্ধ? একে কী ধন্ধ বলা যায়? এটা তো দণ্ড ভোগ করা! মনে হচ্ছে, আমি দণ্ড ভোগ করে যাচ্ছি!

আমি দেখতে পাচ্ছি, আমার সামনেও যেন আর কিছু নেই! কোনো পথ, বা কোনো একরকমের ভবিষ্যৎ, বা আগামীকাল— এমন কিচ্ছু যেন নেই আমার সামনে! না না! এটা আমার কোনো ফ্রাস্টেশনজনিত নেগেটিভ ভাবনা নয়! আমি মধুর রকমের কাব্যি করে করে নিজেকে স্যাড বানাচ্ছি না! সত্যি সত্যি আমার সিচুয়েশনটা আমি নিজের কাছেই ক্লিয়ার করে নিচ্ছি!

আমার যেন পেছনেও কিছু নেই! কিচ্ছু না! আমার যেন কোনো ফ্যামিলি নেই! যেন সেটা ছিলো না কোনোদিন! বাবা অথবা মা! বা ভাইবোন! বা, অন্য কেউ! প্রেমিক, বা স্পাউস! যেন কোনোজন নেই! কিচ্ছু নেই! থাকলে কী আর—সেসব কিছুকে আমি—মনে করতে পারতাম না! নিশ্চয়ই পারতাম! নেই বলেই—কিচ্ছু মনে পড়ার নেই আমার! এমন মনে হচ্ছে!

আবার আমার যেন পেছনেও কিছু নেই! কিচ্ছু না! আমার যেন কোনো ফ্যামিলি নেই! যেন সেটা ছিলো না কোনোদিন! বাবা অথবা মা! বা ভাইবোন! বা, অন্য কেউ! প্রেমিক, বা স্পাউস! যেন কোনোজন নেই! কিচ্ছু নেই! থাকলে কী আর—সেসব কিছুকে আমি—মনে করতে পারতাম না! নিশ্চয়ই পারতাম! নেই বলেই—কিচ্ছু মনে পড়ার নেই আমার! এমন মনে হচ্ছে! ভেরি স্ট্রেন্জ! আমি আমার পেছনে—কোনো গতকালকে— দেখতে পাচ্ছি না! আমার—আমার— কোনো যেন পাস্ট নেই! এই আজকের আমিই যেন শেষ কথা!

আমি এখন যেখানে আছি, এখানে দিনের মতো করে দিন শেষ হচ্ছে! রাতও তেমন করেই যাচ্ছে! দেন এগেইন দিন! আবার রাত! তবে, এইখানে কতোদিন হয় আমি আছি? আছি কতোদিন ধরে? কতোদিন হয় এখানে থাকছি আমি?

হতে পারে— আমি এখানে সাতদিন ধরে আছি! বা, এটা তিন দিনও হতে পারে! বা, দিন পাঁচেক! বা, হতে পারে তারও চেয়ে বেশি দিন! তবে সেই বিষয়টাও আমি একজাক্টলি মনে রাখতে পারছি না! দিন গোণা-গুনতির হিসেবটাও কেবলই এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে! একেকবার একেক রকম মনে হচ্ছে!

কেন আমি এখানে থাকার টাইম-পিরিয়ডের হিসেবটা মাথায় রাখতে পারছি না? একেবারেই পারছি না কেন? এটা যেমন পারছি না, তেমন আরো অনেক কিছুও পারছি না! একটুও পারছি না!

এই যেমন; আমি মনে করতে পারছি না, আমি কে!

আমি জানি না সেটা! আমি— আমি কে!

আমি কে আসলে?

আমি জানি না!

আমি কে!

কে ছিলাম আমি, কোত্থেকে আমি এইখানে এসে উঠেছি, কী আমার নাম, আমি কাদের বাড়ির কে? অনেস্টলি বলছি, আই কান্ট রিকল! কিচ্ছু আমি বলতে পারছি না! যারা আমাকে আপাতত হেল্প করছে, মানে আমাকে তাদের এখানে থাকতে দিয়েছে; সো জেনারাস দে আর! রিয়েলি তারা ওয়ার্ম-হার্টেড! এক্সট্রিমলি কাইন্ড! গড! তারা আমাকে শুধু রক্ষাই করেনি! আমাকে তাদের এখানে থাকতে দিয়েছে! আমি থেকেই যাচ্ছি তাদের সাথে! থেকেই যাচ্ছি!

আমি কোত্থেকে এসেছি, সেটা যদি মনে করতে পারতাম; তাহলে আমি কিন্তু সেইখানে ফিরে যাওয়ার একটা এটেম্পট নিতেই পারতাম! বাট! আমি তো কিছুই রিকল করতে পারছি না! কী যে অকওয়ার্ড লাগছে! রিয়েলি ফিলিং ব্যাড!

আমি কোত্থেকে এসেছি, সেটা যদি মনে করতে পারতাম; তাহলে আমি কিন্তু সেইখানে ফিরে যাওয়ার একটা এটেম্পট নিতেই পারতাম! বাট! আমি তো কিছুই রিকল করতে পারছি না! কী যে অকওয়ার্ড লাগছে! রিয়েলি ফিলিং ব্যাড! আর তারপরেও এদের সাথে আমি থেকেই যাচ্ছি! থেকেই যাচ্ছি!

নয়তো আমি আর কী করবো! কী করবো! নো ওয়ে আউট অফ ইট! আমি যে কে, সেটা যদি মনে করতে পারতাম আমি! কী আমার নাম! কী নাম?

কারো যে একটা কোনো নাম থাকতে পারে, একটা কোনো নাম থাকতে হয়— এটাই তো এখন আমার কাছে একটা নতুন জেনে ওঠা ব্যাপার! কমপ্লিটলি নিউ ফেনোমেনন! কারো আবার নাম থাকতে হয় নাকি? যিনি আমাকে জলে ভেসে যাওয়া অবস্থা থেকে তুলে এনেছেন, তিনি এই নাম থাকাথাকির বিষয়টা আমাকে বলেছেন!

আমার কী নাম?

আমি জানি না!

আমি কে?

আমার মনে নেই! আমি জানি না!

আমি কিছুই মনে করতে পারি না!

আমি পানিতে ভাসছিলাম কেন? কেন? আমি জানি না!

ভেসে ভেসে—একেবারে মর মর—হয়ে যেতে হয়েছিলো কেন আমাকে?

আমি জানি না! কিছুই আমার মনে আসে না!

অই যে নাম আর পরিচয়টা— অই দুটোই নাকি মানুষের সংসারে মানুষের জন্য খুব দরকারি বিষয়! এ না-থাকলে লোকে, কেউ-না হয়ে যায়! সেই হিসেবে এখন আমি কিন্তু একজন কেউ-না! সেটা হিসেব করে, তখন আমি আমার উদ্ধারকর্তাকে বলি কী, এখন থেকে তিনি তো আমাকে অই ‘কেউ না’ নামেই ডাকতে পারেন! তাই না? আমার নাম হোক— ‘কেউ-না’!

কিন্তু তাকে রাজিই করানো গেলো না! তিনি নাকি মনুষ্যের মধ্যে, এমন নাম রাখার রেওয়াজটা কোনোখানে দেখেননি! তার যে স্পাউস, তিনিও নাকি অমন নাম-ওয়ালা কাউকে—সংসারের কোনো বাড়িতে— দেখতে পাননি!

তাহলে আমার কী অবস্থা দাঁড়াচ্ছে?

আমার নাম আমার মনে পড়ছে না! আমি যে কে— তার কিছুই আমার মনে আসছে না! আমি কোত্থেকে এইভাবে এসে পড়েছি, সেটা তো মনে করতে পারছি না-ই!

তাহলে?

যাদের এখানে আমি আছি, তাদের সাথে আমি আর কতোই বা থেকে যেতে পারবো? বেশিদিন থাকা কী উচিত হবে! গড! একদম না! না!

এইখানে, আরো বেশ কিছুদিন থেকে যাওয়ার কথাটা মনে করেই তো— আমার কেমন সাফকেটিং লাগছে! ডোন্ট ফিল গুড! নিজেকে খুব যাচ্ছেতাই লাগছে! কেমন— কেমন একটা গিল্টি ফিলিং হচ্ছে আমার! ওয়েল! এরা দুজন যদি আমার মতন নরমাল হতো, তাহলে হয়তো কোনো প্রবলেম ছিলো না! কিন্তু তারা তো সেটা নয়! তারা প্রায় যেন একরকমের অচল মানুষ! বোথ অফ দেম! ওহ!

যিনি এই বাড়ির ভদ্রলোকটির স্ত্রী; সেই মহিলাটির একটা পা যেন— একেবারে বাতিল কিছু একটা! সেই পা-টা কোনো কাজ করে না! হাঁটুর নিচ থেকে একেবারে বাঁকানো সেটা! কেমন একটা হেভী রকমের রোপের মতো! ব্রাউন রোপ! হাঁটুর নিচে যেন স্ট্যাপল করে দিয়েছে কেউ! নেতানো। ঝুলন্ত! স্যাড স্যাড!

তাকে মুভ করতে হয় অনেক কষ্ট করে! লাঠিতে ভর দিয়ে দিয়ে! লাঠি না থাকলে মাটিতে হেচড়ে হেচড়ে! পিটি পিটি! ইস! নিজের শরীরের ওই টেরেবল কনডিশান নিয়েই—তাকে এখন—আমার জন্য রান্নার অ্যারেন্জমেন্ট করে যেতে হচ্ছে! দেন, খাবার বেড়েও দিতে হচ্ছে! প্লেটও তো রেডি করতে হচ্ছে তাকেই! যদিও এই প্লেটের ব্যাপারটা— এদের এখানে ভারী অদ্ভুত রকমের!

আমাকে তারা কলাপাতায় করে খাবার খেতে দেয়! এই যে মাটির ওপরে—পা ভাজ করে বসে—তারপর অই পাতার প্লেট থেকে খাবার মুখে তোলা! ইফ! এটা নট অ্যা ম্যাটার অফ জোক! কেমন করে এইভাবে বসে, খাবার খাওয়া যায়! কীভাবেই বা আমি পা-ভাজ করবো! কীভাবেই খাবার মুখে ওঠাবো! হাউ কাম!

কলাপাতা! আমাকে তারা কলাপাতায় করে খাবার খেতে দেয়! এই যে মাটির ওপরে—পা ভাজ করে বসে—তারপর অই পাতার প্লেট থেকে খাবার মুখে তোলা! ইফ! এটা নট অ্যা ম্যাটার অফ জোক! কেমন করে এইভাবে বসে, খাবার খাওয়া যায়! কীভাবেই বা আমি পা-ভাজ করবো! কীভাবেই খাবার মুখে ওঠাবো! হাউ কাম!

আর, ভাত-টাথ মাখতে গিয়েও তো ঝামেলার কোনো কুলকিনারা দেখি না আমি! পাতাটা হচ্ছে একেবারে ফ্ল্যাট! আমি ভাত মাখতে গেলেই—ভাতেরা কীভাবে যেন—পাতার একেবারে বর্ডারের দিকে চলেই যাচ্ছে! একেবারে পাতা-প্লেটের কিনারে কিনারে চলে যাচ্ছে! তারপর মাটির দিকে জাম্প করার জন্য একদম রেডি তারা!

খুব অদ্ভুত না? খুবই অদ্ভুত! তখন আবার ভাতকে পাতার মাঝখানের দিকে আনো! মাখো! সেটাকে মুখে পোরার এটেম্পট নাও! ভালো জটিলতা! এইভাবে, অই খাবার খাওয়ার বিষয়টাকে, ম্যানেজ করার চেষ্টা করতে করতে আমার কী হয়! দুই পা’কে সটান ছড়ায়ে দিতে ইচ্ছা করতে থাকে! দিই আমি তখন পা ছড়ায়ে! কিন্তু তাতে প্রবলেম কিছু কমে না আমার জন্য! এভাবে পা ছড়ায়ে নিলে খাবার মুখে তোলার বিস্তর অসুবিধা ঘটে!

আর, অই ভদ্রমহিলাও তখন অনেক অনেক হানা-তানা কথা বলতে থাকেন! শুধু বলতে থাকে, ‘এমনে করে না! এমুন করে না! আল্লার দেওয়া দানার সামনে এমনে বইলে— বেদ্দবী অয়! ঝি গো! কিসমত তেনে দানা উইট্টা যাইবো গা কইলাম! পাও থুবাইয়া বহেন রে ঝি!’ ভদ্রমহিলা এমন! কী দরকার তার, আমার খাওয়ার সময়ে অমন করে আমার সামনে বসে থাকার? যতো আমি বলি, এভাবে বসে থাকা লাগবে না! সেকথা তিনি যেন শুনতেই পান না!

বোবা মুখ করে, আমার সামনে বসে থাকাটা, তার লাগেই লাগে! আর, আমার প্লেটে—ভাতের ওপরে ভাত দিয়ে যেতেই হয় তাকে! আমার কেমন একটু সন্দেহ হয়! সন্দেহ হয়, এই মহিলা যেন আমার কথাগুলো ঠিক বুঝতে পারে না! একদমই সে হয়তো আমার কথা বোঝে না!

নয়তো, আমার কোনো কথার উত্তরে— সে কিছুই বলে না কেন? তখন কেন শুধু সাইলেন্টলি আমাকে ওয়াচ করে যেতে থাকে? শুধু তাকায়ে থাকে আমার দিকে! ঠান্ডা চোখে কেবল চেয়ে থাকে—আমার দিকে! কিচ্ছু রেসপন্ড করে না! তারবাদে নিজের যা-বলার, সেটা সে আবার বলা শুরু করে!

আর, এই মহিলা এমন! কিছু একটা বলা শুরু করলে, সে কিছুতেই থামতে চায় না! একটুও থামতে চায় না! টপর টপর টপর টপর টপর টপর—একই কথা বলে যেতেই থাকে! বলেই যেতে থাকে! আমি তো এখানে নতুন একজন! অচেনা! আমার সাথে তাই একটু কম কম করে! কিন্তু তার যে হাসবেন্ড! তার সাথে কেবল করেই যেতে থাকে, করেই যেতে থাকে!

ইফ! এটা আমি কোথায় যে এসে পড়েছি! কীভাবে এসেছি, এইখানেই!

তবে এই জায়গায় একটা অদ্ভুত ব্যাপার আছে কিন্তু! এই বাড়িতে একটাও কোনো প্লেট নেই! তারা অই কলার পাতা করে করেই সকল সময় খাবার খায়! তাদের দুজনের কলাপাতা দুটোকে ধুয়েটুয়ে, শুকায়ে আবার ইউজ করতে দেখেছি আমি! তবে আমাকে প্রত্যেকবার নতুন পাতা পেতে দেয়! এমনটা কেন করে? কী জানি! আননেসেসারী লোড নেয়া না এটা? কেন নিচ্ছে?

এই ডিসঅ্যাবেল মহিলাটিকে— আমার জন্য এমন লোড নিতে হচ্ছে! শেম অন মী!

আমি কেন তাকে এইসব বারডেন দিচ্ছি! আমি কেন কাজগুলো করছি না?

করতে তো চাই আমি! চেয়েছি! বাট, অই তার এক কথা! ‘অসুইক্ষা একজোনেরে কাম করতে দিমু? কী গজইব্বা কতা! আল্লায় কী আমার হাত রথরে নিছে গা?’ কথাগুলো এই কয়দিনে এতো বার শুনেছি! শুনে শুনে কী আর সেটা আমার মেমোরাইজ হওয়ার বাকি আছে! একেবারে মেমোরাইজ হয়ে গেছে!

এদের যে বাড়িটা, সেটার এক সাইডে, অনেক অনেক কলার গাছ আছে! ওরা বলে, ওটা নাকি এই বাড়ির উত্তর দিক! এই দিক বিষয়টাকে আমি কিছুতেই বুঝতে পারি না! দিক কী? এটা কী বিষয়? এই বাড়ির যেই হাসবেন্ড, তিনি বলেছেন; আমার জ্ঞান ফিরে আসলে নাকি এই দিক বিষয়টাও আমার মনে চলে আসবে! আমাকে তখন আর কিছইু বোঝাতে হবে না! কী যে বলে অই লোক! আমার আবার জ্ঞান ফিরে আসবে কী? আমি তো কমপ্লিটলি সেন্সে আছি! সেন্সলেস না তো আমি!

তো যাই হোক, এই বাড়ির উত্তর কিনারে আছে অনেক অনেক কলার গাছ! এতো কলার গাছ কেন থাকতে হয়, কারো বাড়িতে? সমস্তটা বাড়ি জুড়ে আরো কতো কতো যে গাছ! আন বিলিভেবল! এতো কেন? এতো গাছে গাছে বাড়িটা যে ঢেকে-ঢুকে একবারে ক্লামজি হয়ে উঠেছে! সেটা এরা একটুও খেয়াল করছে না! এতো গাছ লাগে নাকি কারো! আমি সেটা একটুও বুঝে উঠতে পারছি না!

কলার গাছে গাছে—একবারে একটা বনের মতো হয়ে থাকা জায়গাটার পরে, আছে শুধু জলা! শুধু জলা! আর কিচ্ছু নেই! কোনো ল্যান্ড না! মানুষের বাড়ি-টারি না! শুধু জলার পরে জলা! নদী না তো! নদী না! লেকের মতো! একটার পরে আরেকটা! এমন জলা এমন নীরবতা! এটা কেমন প্লেস?

আমি যখন এখান থেকে চলে যাবো, তখন, এখানকার কোন বিষয়টা আমার সবচেয়ে বেশি মনে থাকবে? অই জলাগুলোর কথা? নাকি কলাপাতা প্লেটদের কথা? নাকি অই ভদ্রমহিলার কথা? নাকি তার হাসবেন্ডের কথা? কোনটা?

বাহ! কী দুরাশা আমার! এখান থেকে চলে যাবার কথা ভাবছি আমি! কোথায় যাবো? আমি যে কে—সেটাই যেখানে আমার মনে নেই! কোত্থেকে এসেছি, তাও যেখানে কিছুতেই মনে আসছে না আমার! সেই আমি এখান থেকে চলে যাবার ডিজায়ার আনছি, মনে!

এই বাড়ির যিনি হাসবেন্ড—পচা মিয়া! পুওর মী! তার পায়ের কন্ডিশনও হোরিবল! আই কান্ট ইমাজিন! দুজনেরই গুনে-বেছে, পায়েই কেন, প্রবলেম হতে হলো! নো নো! ইটস সিম্পলি আনবেয়ারেবল!

এই বাড়ির যিনি হাসবেন্ড—পচা মিয়া! পুওর মী! তার পায়ের কন্ডিশনও হোরিবল! আই কান্ট ইমাজিন! দুজনেরই গুনে-বেছে, পায়েই কেন, প্রবলেম হতে হলো! নো নো! ইটস সিম্পলি আনবেয়ারেবল! তবে ইনি তার পা দুটো দিয়ে হাঁটতে পারেন! হাঁটছেনও তো! বাট, এটাকে কী হাঁটা বলা যায়?

এক হাতের সমান ডিসট্যান্স কভার করতে গিয়ে—তার যেন একটা হোল দুপুরই লেগে যায়! ওহ! গস!

হবে না? তার দুই পায়ের হাঁটু দুটো, ভেতর দিকে বেঁকে গেছে! পায়ের পাতা বাঁকা হয়ে আছে! সেই পা মাটিতে পড়ছে, কিন্তু প্রপারলি কী ফেলা যাচ্ছে সেটা! নো!

এমন দুজনের এখানে—কতোদিন গেস্ট হয়ে থাকা যাবে? থাকা যায় নাকি? থাকতে গেলে নিজের ওপর আর রেসপেক্টটা রাখা যায়? রাখা যাবে?

কিন্তু—কিন্তু— আমি এখন তবে কী করবো? আমি কোথায় যাবো? কোথায় যাবো? আমি কে? আমার নাম কী?

আমি জানি না! আমার মনে আসে না! কিছুই মনে আসে না!

আমার নামটাকে মনে করার জন্যই কিন্তু—আমি এখন খুব ট্রাই করে চলছি! কে আমি? কী নাম আমার? কী নাম ছিলো? আমার হোস্ট যারা, তাদের কিন্তু নাম আছে! একজনের নাম বুচি বিবি! তার হাসবেন্ডের নাম পচা মিয়া!

আমার কেন জানি বারবার মনে হয়, এই বুচি বিবি বা পচা মিয়া—ঠিক আমার মতন কোনো হিউম্যান বিয়িং না! আমিও যেন ঠিক তাদের মতো কেউ না! যদিও আমাদের দেখতে একই রকম হিউম্যান হিউম্যানই লাগে; কিন্তু তাও আমরা সেম টাইপের কেউ না! তারা কেমন কেমন করে ড্রেস পরে! পচা মিয়া শুধু একটা কিছু শরীরের নিচের দিকে পেচিয়ে রেখেছে! আর কিছু নেই! কখনোই আর কিছু পরতে দেখলাম না তো আমি!

আর বুচি বিবি তার শরীরের নিচের দিকে এক টুকরা কাপড় জড়ায়ে রাখছে। ওপরের দিকে জড়ানো আছে অন্য আরেকটা টুকরা! ব্যস? এই টুকরা-টাকরাদের কীভাবে সামলে সেয় সে! কীভাবে নড়ে-চড়ে? গড নোজ!

আমার পরনে কী? আমার পরনে জিন্স আর সাদা ফতুয়া!

তারা দুইজনে আমার এই ড্রেসের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে! এখন অবশ্য আমার জিন্সটা শুকিয়েছে! সেইজন্য ওটা পরতে পারছি এখন! নাইলে কী চলছিলো? খুবই ফানি একটা সিনারিও দেখতে পাচ্ছিলাম আমি! বুচি বিবির একটা ড্রেসকেই তো আমার শরীরে—কোনো রকমে জড়িয়ে রাখতে হয়েছিলো! এই তো আজকে দুপুর পর্যন্ত তো এমনটাই ছিলাম আমি!

তবে এখন আর তেমন আনইজি অবস্থায় নেই আমি! আমার ড্রেসের ভেতরেই—এই যে আমি! পুরো কনফিডেন্ট একজন! কনফিডেন্ট? অ্যাম আই?

কী আমার নাম? বলতে পারি আমি? পারি না! আমি কে? বলতে পারছি আমি? পারছি না! এই যে বুচি বিবি, বা এই যে পচা মিয়া! আমার নামও কী অমন কিছু? এমন কিছুই কি ছিলো—আমার নাম? কাম অন কাম অন মাই মাইন্ড! লেট মী রিকল! প্লিজ! প্লিজ!

 

 

• এই এক গাঙপাড়ে

মালিক সাঁইয়ে ভালাই রাখছিলো! হের রহমতের শেষ নাই! আমাগো দিন ভালাই যাইতাছিলো! জিন্দিগীর ঘাটে-বাটে কোনো ঝুট-ঝামেলা পাইতাছিলাম না! আউজকা বহুতদিন হয়; আমাগো দিবানিশিতে কোনোপ্রকার উষ্টা-ধাক্কা পাওয়া-লওয়ি নাই!

তাইতে আমি নিজের লগে নিজে—এক মোনে কইতাছিলাম কী; মাওলায় আমার লেইগা ভেজাল-সেজাল যা-কিছু রাখছিলো, তার তামানগিলিই বুঝি শোধ হইয়া গেছে! যা যা হওনের, সবই য্যান আমার ছোটোকালের দিনেই হইয়া, অখন ক্ষান্তি নিয়া আছে! অখন, বাদবাকি জনমের লেইগা বুঝি আর কোনো গেঞ্জাম-পেরেশানী হওনের নাই! দিনে দিনে কেরমে কেরমে এমুনই বিশ্বাস হইতাছিলো আমার!

তয়, বিধির কেরামতী বোজে—এমুন সাধ্যি আছে কার? নাইলে কিছুর মিদে কিছু না, শাঙন মাইস্যা নিশিরাইতের দুই পহরের কালে, আমাগো জিন্দিগীতেই, এমুন বেচইন্না কারবার ঘটে নিকি? আমাগো ঠান্ডা, থিতু সংসারে; কেমুন যে এক খাবাজাবা, বেগতিক দশা আইয়া পড়লো! পুরা আতকার উপরে!

থাকোনের মধ্যে, আছে খালি আমার পরিবারে! ঘরে-উঠানে-সবখানে, আছে খালি সেয়ই! কিছু মুরগি-মারগি আছে! হাঁস-বকরী, বকরীর বাচ্চা— এটিও আছে! আর আছে একখান খালি গাভীন গাই! আমার যেয় পরিবার, হের, আরো কয়টা গরুবাছুর পালোন্তীর হাউস আছিলো! তয়, হাউস থাকলে কী! অটি করোনের লেইগা শইল্লের তাকদও তো থাকোন লাগে!

বাইত, থাকোনের মধ্যে, আছে খালি আমার পরিবারে! ঘরে-উঠানে-সবখানে, আছে খালি সেয়ই! কিছু মুরগি-মারগি আছে! হাঁস-বকরী, বকরীর বাচ্চা— এটিও আছে! আর আছে একখান খালি গাভীন গাই! আমার যেয় পরিবার, হের, আরো কয়টা গরুবাছুর পালোন্তীর হাউস আছিলো! তয়, হাউস থাকলে কী! অটি করোনের লেইগা শইল্লের তাকদও তো থাকোন লাগে! আমাগো শইল্লেরে তো মালিকে বেকা-তেরা বানাইয়া থুইছে! এরে সিধা-পোক্ত হইতে দেয় নাই! আমরা দোনোজোনেই হইলাম গিয়া— টুন্ডা-লুলা দুই খুঁতা মনিষ্যি! আমাগো দোনোজোনেরই একই হাল!

আমার জিন্দিগীর এক্কেরে পিছের কথা— আমার আর অখন, কিছু-একটুও স্মরণে আহে না! তারপরেও কী জানি একটা বেপার য্যান— আমার মনে জাগনা দিয়া যাইতেই থাকে! এই অখনকার কালেও প্রায় প্রায়ই, সেইটা জাগনা দিয়া যাইতেই আছে! আতকা আতকা! প্রায় প্রায়ই আমার মনে হইতে থাকে য্যান, কবে একদিন জানি আমার জ্বর আইছিলো! দুরন্ত জ্বর! সেই না জ্বরের কালে, আমি তহন খালি; পাটিতে পইড়া দাপাই, দাপাই! আহারে দাপাই! শেষ কাটালে কবে কোনদিন সেই জ্বরের শেষ হয়, সেই বিষয়খান আর স্মরণে আসে না!

হেইরপরে কী হয়, সেইসবের একটু-কিছুও আর আমার স্মরণ আহে না! কোনখানের কোন বাইত যে— আমি অমুন জ্বউরা, রোগ-ভোগা হইয়া আছিলাম; সেইটাও আমি ধরতে পারি না! কিছুতেই পারি না! তবে সেইটা যে এই বাড়িটা না, তা আমি পরিষ্কার বুঝি!

সেইটা যে কোন জায়গা কোন দেশ— কিছুতেই তা আমার স্মরণে আহে না! উস্তাদে কয়; ‘হইলে হইতে পারে, সেইই আমার আদি নিবাস! সেইনেই আমি মায়ের পেটের তেনে নাইম্মা, দুনিয়ার মোখ আইছিলাম! সেইনেই আমার জন্ম!’ কিন্তুক সেই জায়গা কোন জায়গা? কোনখানে আছিলো সেইটা? কোনখানে? আমি তার কিছুই আর স্মরণে আনতে পারি না!

এই যে আমার অখনকার এই বসতস্থল; এইটা তো আর আমার বাপ-দাদার ভিটা না! এইটা হইলো গিয়া আমার উস্তাদের ভিটা! সেয় আমার জনম দাতা না! তয়, এক হিসাবে ধরলে সেয় আমার জনম-দাতার তেনেও বেশি! সেয় যুদি আমারে টোকাইয়া না-আনতো, তাইলে আমি অহন কই থাকতাম? থাকতাম মাছ আর কুম্ভীরের পেটে! উস্তাদে আমারে টোকাইয়া পাইছে!

কই টোকাইয়া পাইছে!

না! গাঙে টোকাইয়া পাইছে!

এই যেমুন আমি— অই কন্যাখানেরে গাঙে টোকাইয়া পাইছি! অবিকল তেমুন প্রকারে, উস্তাদেও আমারে এই গাঙেই টোকাইয়া পাইছে!

আমারে পাওয়াটা—বড়ো সোজামোজা বেপার আছিলো না! সেইটা আছিলো এক অতি তেলেসমাতির বেপার!

আমি গাঙে ভাসতাছিলাম ক্যান? কোন দেশ তেনে ভাইস্সা আইতাছিলাম? এই কথার মীমাংসা—আমি আইজ পর্যন্ত পাইলাম না! উস্তাদেও সেই মীমাংসা পাইয়া যায় নাই!

খালি উস্তাদের মোখে শোনা কথা এই, আমারে সেয় গাঙে-ভাসা অবস্থায় পাইছে! একদিন; বহুত দিন আগে, দিনের দোপোরের সময়ে উস্তাদে দেখে কী, অই ত্তো দেহি গাঙ দিয়া কী-জানি একটা কিছু ভাইস্সা যাইতাছে! উস্তাদে পইল্লা মোনে করে, হইলে হইবো অইটা কোনো মরা বকরি! নাকি বাছুর!

তারবাদে ভালা কইরা দিষ্টি দিয়া দেখে, কিয়ের মরা বকরি! দেখো একটা মাইনষের ছাওয়াল ভাইস্সা যাইতাছে! পুরা নেংটা একটা ছোটো পোলা! এই এত্তাটুক! ভাইস্সা যায় যায় যায়!

পানি খাইয়া খাইয়া—হেইটার শইল—ফুইল্লা য্যান আস্তা একটা ঢোলের লাহান হইয়া রইছে! জ্যাতা আছে? আরে না! কেমনে জ্যাতা থাকে? এমন পানিতে ভাসতে ভাসতে যাইতে থাকা দেহ কী আর জ্যাতা থাকে নি? তাইলে এইটা অখন একটা লাশ! অই ত্তো! সোরোতে লাশটারে— অই যে— ভাসাইয়া লইয়া যাইতাছে গা! চক্ষের সামনে দিয়া এমনে—একটা লাশরে কী— ভাইস্সা যাইতে দেওন যায়? মরা হইছে তো কী হইছে? অইটা খোদার বান্দা না? হেরে এমনে বেইজ্জতি হইতে দেওন যায় নিকি?

উস্তাদে করে কী, ফাল দিয়া গাঙে নামে! ভাটির বেলা! কিনারে তো তখন হাঁটু পানি! চিলতা গাঙের মাইঝ বরাবর তহন মাথা-ডুবা পানি! সেয় একটা তুরুত সাতোর দিয়া গিয়া— লাশটার ঠ্যাংয়ে ধরে! যার পুত হউক, যেই গেরামের পোলাই হউক এইটা, আদম সন্তান তো!

উস্তাদে করে কী, ফাল দিয়া গাঙে নামে! ভাটির বেলা! কিনারে তো তখন হাঁটু পানি! চিলতা গাঙের মাইঝ বরাবর তহন মাথা-ডুবা পানি! সেয় একটা তুরুত সাতোর দিয়া গিয়া— লাশটার ঠ্যাংয়ে ধরে! যার পুত হউক, যেই গেরামের পোলাই হউক এইটা, আদম সন্তান তো! এরে তরিজুত কইরা মাটি-মঞ্জিল দেওনের কর্মে তো—এই উস্তাদে কোনো গলতি রাখবো না!

ওম্মা! বাচ্চা পোলাটারে ঠ্যাংয়ে ধইরা টাইন্না, কিনারে তুইল্লাও সারে না; মাটির লগে ঘষটানী খাইয়া দেখো— লাশটার মোখ দিয়া— গলবলাইয়া পানি বাইর হইতে থাকে! দুনিয়ার পানি! একদিগ দিয়া পানির ঢলকটা বাইর হইয়া সারে না, অমনেই য্যান লাশটার ভিতর তেনে—কেমুন এট্টু কঁকানীর আওয়াজ বাইর হইতে থাকে! অনেক ক্ষীণ অনেক অনেক হালকা-ফিকা এক কঁকানী!

গায়েবের মালিক! এইটা তোমার কোন লীলা! পোলাটায় কী বাইচ্চা আছে নি? উস্তাদে হরদিশা হইয়া পানিতে-ডোবা ছেড়াটার বুকে কান লাগাইতে যায়! দয়াল দয়াল! এইটা কী আচ্চজ্জ কথা! পোলাটার পরানটা দেহি—এই এট্টু—হাছামিছি প্রকারে য্যান— ধুকপুক করতাছে! ধুকপুক করতাছে! এ্য় তো তাইলে জ্যাতা! অখনও জ্যাতা! উস্তাদের কইলজাখান তখন ধড়াস ধড়াস করতে থাকে!

দম যেহেতু আছে, তাইলে তো এরে বাচাইয়া তোলনের একটা চেষ্টা দেওন লাগে! হায়াতের মালিক খোদায়! তয়, এই ধন শেখ উস্তাদে তো চেষ্টাটা করতে পারে! একবার চেষ্টা কইরা দেখবো সেয়!

এই পোলারে যে সেয় অখন—আগলান্তী দিয়া লইয়া— নিজ বাড়ির দিকে লৌড়টা দিবো; সেই রাস্তা তো পুরা বন্ধ! কোনো উপায় নাই!

আয় সব্বনাশের সব্বনাশ রে! এই পোলার সর্বঅঙ্গে মা— শীতলার দয়া দেখো—জাগনা দিয়া রইছে! ইস ইস! গুটি বসন্তের গুটিগুলারে লাগতাছে য্যান পেরেক! হাজারে-বিজারে পেরেক! পোলাটার শইল্লে বিন্ধা রইছে! আয় হায় রে! অখন কেমনে কোন বিহিত করোন!

উস্তাদের বাড়ি—গাঙপাড় তেনে বেশি দূরে না! শুকনার দিনে এক ডাকের সমান দূরুত্বির বাড়ি সেইটা! আর বাইরার দিনে, গাঙে তো বাড়ির ঘাটায়ই আইয়া হাজির অয়! হেইটা বোলে তহন শুকনার দিন আছিলো! তহন, উস্তাদের ডাকাডাকির ধাক্কায় হের পরিবারের জান-পরান নান্দিনাশ হইয়া যাইতে থাকে!

আরে! এমুন আতকার মিদে— ঘরের বেটাটার আবার কী হইয়া গেলো! সর্পে নি দংশাইলো! হের পরিবারে তরাতরি পাওয়ে তহন গাঙ পাড়ে আহে! আইসা দেহে, কেমুন এক আচানক ঘটনা হইয়া রইছে! বিধিয়ে দেখি আস্তা একটা পোলারে— মিলাইয়া দিছে! কিন্তুক অর কিনা অখন-তখন অবস্থা! অয়ে ফিরা আর জিন্দিগী পায়, এমুন তো লাগতাছে না! পরোয়ার দীগার, তোমার মোনে কী আছে!

সেয় বৌ-মাতারী হইয়াও তখন করে কী, লৌড়ানী শুরু করে! এক লৌড়ে সেয় বাইত যায়! গিয়া, তিন তিনটা মানকচুর পাতা কাইট্টা আনে! একে জলে-ডোবা, তার উপরে আবার শীতলা মায়ের দয়া-লাগা অই যে দেহখান! তারে তো আর অখন পাটি-খেতা-কোনো কিছুর উপরেই রাখোনের নিয়ম নাই!

গাঙের পানিতে মানকচুর পাতা তিনটারে তিন চুবান দিয়া গাঙপাড়ে পাতে সেয়। তারবাদে তারা দোনোজনে ধরাধরি কইরা আধা-মউতা পোলাটারে নিয়া সেই পাতার উপরে শয়ান দেয়! অখন, উস্তাদে এইবার দোয়া-কালাম পইড়া পইড়া যতো পারুক ফুঁ দিতে থাকুক, বাদবাকি টোটকার জিনিসপাতি— তাইলে অখন ঘরের মাতারিয়েই জোগাড় কইরা আনবো!

মাতারিয়ে পাতলা একখান তেনা আনে। তুষের আগুনভরা আইল্লাটারে আনতেও সেয় ভোলে না! বিষকাটালি ঝোপের তেনে পাঁচটা ঠাইল্লা ছিঁড়া লয়! আর লয় সাতখান আকন্দ পাতা! তুষের আগুনে আকন্দপাতারে গরম করতে হয়। সেই গরম-পাতা দিয়া দিয়া গুটিবসন্ত লাগা শইল্লেরে সেঁক দিয়া যাইতে হয়! তারবাদে কতখোন পরে পরে শইলটারে বিষকাটালির পাতা-ঠাইল্লার বাড়ি খাওয়ানোরও বিধি আছে!

আর, ঝিনাই দিয়া দিয়া এক ঢোক এক ঢোক আন্দাজ ফেন— সেই আধা-মউতার মুখে দিতে থাকে উস্তাদণ্ডমায়ে! নুন-মিশাইন্না অল্প গরম ফেন! হেই ফেনের দুই-চাইর ঢোকও যুদি কোনোমতে বিমারীটার ভিতরে ঢুকান যায়! তাইলেও অর ভিতরে, অল্পে-ধীরে, শইল্লের তাকতখান জাগনা দিতে পারে! তাইলে এই বিমারী জানে-বাঁচলেও বাঁচতে পারে!

তয়, গোড়ার দিগে এট্টু কোনো ফেনও অই মর মর পোলাটার ভিতরে ঢুকানো যায় নাই! সকলই— মুখ বাইয়া—বাইরে পইড়া শেষ! তারবাদে হেষে, না-পাইড়া বোলে উস্তাদে করে কী, আলগোচ্ছে সেই গুটি বসন্তে ছ্যাদাভ্যাদা থোতাটারে একটু ফাঁক করে! নেও আলা! দেহো! মোখের ভিতরে অই দাওয়াইটুক ঢুকানো যায় কিনা!

এইসেই করতে করতে বেইল একেবারে নিভু নিভু হইয়া যায়, তাও পোলাটার দেহে হুঁশ ফিরোনের কোনো লয়-লক্ষণ নাই! তয়, আস্তে আস্তে অর পরানের ধুকুর-পুকুরেরে য্যান এট্টু উঁচাইয়া উঠতে শোনা যায়! ফেনও তো সোন্দর ভিতরে টাইন্না নিতাছে ছেড়াটায়! আল্লা!

তাইলে অখন এরে—তারা দোনোজনে ধরাধরি কইরা— বাইত নিলে গা-ই তো পারে! অসুখে-ভোগা, কচি-কড়া এট্টুক একটা মর মর পোলা! তারে আর আলগাইতে কী!

আমারে হেরা দোনোজনে ঠিকই আগলান্তী দিয়া ভিটিতে নিয়া আইছিলো! আইন্না, একচালা গোয়ালঘরটার দুয়ার বরাবর উত্তর শিথানে শোয়ানীও দিছিলো তারা, বিধি মান্যি কইরাই! তয়, এট্টুও আশা করে নাই যে, আমারে বাঁচান যাইবো!

আমারে হেরা দোনোজনে ঠিকই আগলান্তী দিয়া ভিটিতে নিয়া আইছিলো! আইন্না, একচালা গোয়ালঘরটার দুয়ার বরাবর উত্তর শিথানে শোয়ানীও দিছিলো তারা, বিধি মান্যি কইরাই! তয়, এট্টুও আশা করে নাই যে, আমারে বাঁচান যাইবো! হেইর মিদে, দিনে দিনে কীপ্রকারে যে আমি বাইচ্চা ওঠলাম, তার হিসাব খালি উস্তাদে আর তার পরিবারে জানে! আর জানে, মাতার উপরের খোদায়!

তয়, আমি খাড়াইয়া ওটোনের পরে দেহা গেলো, আমার শইল্লের হাল বড়ো কিছু সুবিধার না! কী হইছে? না! আমার দোনোটা পাওয়ের হাঁটু দুইটায় কিনা— বেঁকা হইয়া— একটায় আরেকটার দিগে গিয়া রইছে! পাওয়ের পাতা মাটিতে পড়ে, তবে সেইটাও পড়ে কোনোরকমে! পড়ে কেমুন তেছরা-বেঁকা হইয়াই!

সেই কারণেই না—আমি হাঁটলেও য্যান— আমার পথ আর ফুরাইতে চায় না! দুই হাত রাস্তা যাইতেই য্যান আধাটা বেইল লাইগ্গা যায়!

আমার সেই ফিরা-জনম পাওনের আদিকালেই দেখা গেলো, আরো একটা অনিষ্টি হইয়া রইছে আমার!

কী সেইটা? না! আমার কিনা আগের কথা এট্টু কিছুও মোনে নাই! কেটায় আমি, আমাগো নিজেগো বাড়ি কই, আমি কাগো ফরজন্দ! হেগো বসত কই! কইত্তেনে কেমনে আমি এমুন গাঙে-ভাসা দশায় আইয়া পড়লাম?

উস্তাদে এই-তেই কতো কিছুই না জিগায় আমারে! আমি হেগিলির কোনোটারই কোনো জব দিতে পারি না! উস্তাদেরে যেমুন জানান্তী দিতে পারি নাই কোনোদিন; নিজেরেও তো কোনো বুঝ দিতে পারলাম না আইজ পর্যন্ত!

কেটায় আমি? কী আমার বংশ-পরিচয়? আমি জানি না! এই যে কন্যাখানেরে আমি গাঙে পাইছি, হেরও অই একই বিমার কেমনে হইয়া রইছে? একেবারে আমার জাতেরই বিমারখান? মালিক! ভেদের খবর খালি তুমি জানো সাঁই!

তাও কইলাম আমার অবস্থাটা—এই কন্যাটার তেনে ভালা আছিলো! অন্যসব কথা বিস্মরণ হইলেও, আমার কিন্তু নিজের নামখান অন্তত স্মরণ আছিলো! উস্তাদরে আমি কইতে পারছি, ‘আমার নাম হইলো গিয়া পচা মিয়া!’ কিন্তুক এই কন্যায় নিজ নামেরেও স্মরণে আনতে পারতাছে না! হের কী উপায় হইবো দয়াল?

আমারে নিয়া তো উস্তাদের পেরেশানীর—কুলকিনারা আছিলো না! পুরুষ পোলার জিন্দিগী! এমুন টুন্ডা শইল লইয়া—এই পোলার দিন কেমনে যাইবো! উস্তাদের চিত্তিতে দিনে দিনে—আমার লেইগা বড়ো কেমুন বেদনা হইতে থাকে! না-হইলে না-হউক এইটা নিজের ফরজন্দ! কিন্তু এই ধন শেখে কী নিজ হাতে এই পোলারে নয়া-জনম দেয় নাই? দিছে তো!

ধন শেখে যতো জনম বাঁচবো, ততো জনম এই পচারে, খাওন-বাঁচোনের কোনো চিন্তা করতে হইবো না! এইটা সত্য! কিন্তুক হেইর বাদে? উস্তাদের মউতের পরে, এই পোলায়, কেমনে মোখের অন্ন জোগাইবো? এই টুন্ডা পাও দিয়া কেমনে নিজেরে রক্ষা দেওনের পোথ পাইবো! অর ভবিষ্যতের উপায় কী?

ধন শেখে যতো জনম বাঁচবো, ততো জনম এই পচারে, খাওন-বাঁচোনের কোনো চিন্তা করতে হইবো না! এইটা সত্য! কিন্তুক হেইর বাদে? উস্তাদের মউতের পরে, এই পোলায়, কেমনে মোখের অন্ন জোগাইবো? এই টুন্ডা পাও দিয়া কেমনে নিজেরে রক্ষা দেওনের পোথ পাইবো! অর ভবিষ্যতের উপায় কী? আর উস্তাদে যুদি আগে যায় গা, তাইলে ঘরের সগলতেরে দেইক্ষা রাখোনের ঠেকা তো—এই পোলার ঘাড়েই গিয়া পড়বো! উস্তাদের পরিবারেরে! এই যে আল্লার মাল কন্যাখান দুনিয়াতে আইছে! হেরেও তো! দেইক্ষা রাখোন লাগবো অই পচা মিয়ারেই! তহন?

এমত শতেক ভাবনায় জরাজরা হইয়া শেষে উস্তাদে—আমারে খাড়া করোনের একটা পন্থ—ঠিকই বিছরাইয়া পায়! সেয় আমারে কিষি-কর্মের ভাও শিখায়! মাছ ধরোনেরও ভাও শিক্ষা দেয়! অইগুলা সবই শিখায় সেয়-অল্প বিস্তর কইরা কইরা! কিন্তু একটা বিদ্যা আমারে শিক্ষা দেওনের কালে সেয় কোনো কমাকমতি, চিপাচিপি রাখে না!

এই যে! সেই বিদ্যার কারণেই না আমি, অই সোরোতে-ভাইস্সা যাইতে-থাকা কন্যাটারে উদ্ধার করতে পারছি! নাইলে শাঙন মাইস্যা দ্বিপহর রাইতের বাদলার-আন্ধারে, আমি এই কন্যার ভাইস্সা যাওনের সংবাদ জানতাম কেমনে? উদ্ধারই বা করতাম কেমনে? উস্তাদের শিক্ষার গুণেই না আজকা—এই এত্তাবড়ো কর্মখান করতে পারছি!

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

বাংলা ভাষার একজন ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক ও গল্পকার। আকিমুন রহমানের গ্রন্থসমূহ হলো : ‘আধুনিক বাংলা উপন্যাসে বাস্তবতার স্বরূপ (১৯২০-৫০)’, ‘সোনার খড়কুটো’, ‘বিবি থেকে বেগম’, ‘পুরুষের পৃথিবীতে এক মেয়ে’, ‘রক্তপুঁজে গেঁথে যাওয়া মাছি’, ‘এইসব নিভৃত কুহক’, ‘জীবনের রৌদ্রে উড়েছিলো কয়েকটি ধূলিকণা’, ‘পাশে শুধু ছায়া ছিলো’, ‘জীবনের পুরোনো বৃত্তান্ত’, ‘নিরন্তর পুরুষভাবনা’, ‘যখন ঘাসেরা আমার চেয়ে বড়ো’, ‘পৌরাণিক পুরুষ’, ‘বাংলা সাহিত্যে বাস্তবতার দলিল (১৩১৮-১৩৫০ বঙ্গাব্দ)’, ‘অচিন আলোকুমার ও নগণ্য মানবী’, ‘একদিন একটি বুনোপ্রেম ফুটেছিলো’, ‘জলের সংসারের এই ভুল বুদবুদ’, এবং ‘নিরুদ্দেশের লুপ্তগন্ধা নদী’।

আকিমুন রহমান ভালোবাসেন গন্ধরাজ আর বেলীফুল আর হিজলের ওড়াভাসা! আর তত্ত্বের পথ পরিক্রমণ! আর ফিকশন! ঊনবিংশ শতকের ইউরোপের সকল এলাকার গল্পগাঁথা আর এমিল জোলার কথা-বৈভব! দূর পুরান-দুনিয়ায় বসতের সাথে সাথে তিনি আছেন রোজকার ধুলি ও দংশনে; আশা ও নিরাশায়!

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।