শুক্রবার, ডিসেম্বর ৯

আব্দুল্লাহ আল মুক্তাদিরের গল্প : জহরত

0

চল্লিশের দশক তাই বছরগুলো ছিল উত্তালতম। কিন্ত যমুনার এই প্রত্যন্ত চরে সেই তাপগুলো পৌঁছায় না। শহরের যেকোনো গরম খবর চরবাসী শুনতে পায় অনেক পরে। খুন ততক্ষণে জমে কালচে মাটি, সর্বগ্রাসী আগুন ততদিনে ভেজা ছাই।

চৌদ্দ বছরের এক কিশোর রবিবারের হাট শেষে একলা বাড়ি ফিরছিল উনিশশ’ ছেচল্লিশ সনের কার্তিক মাসে। সন্ধ্যা পার হয়েছে এক ঘণ্টাও হয় নাই অথচ দুর্গম অন্ধকার চারপাশে। শরীরে ঠান্ডা বাতাস এসে বিঁধছে। চোখ খোলা বা বন্ধ রাখার মধ্যে এখন আদতে কোনো পার্থক্য নাই। জহরত আলী পা ফেলছে কিছুই না দেখে। অবশ্য সমস্যা হচ্ছে না কোনো। গত কয়েক বছরে প্রতি সপ্তাহে অন্তত দুইবার তার এই পথে আসা যাওয়া। প্রতিটা বাঁক, ঢাল, খানাখন্দ মুখস্থ। ইদানীং সে কথাও কম বলে। এই এলাকায় যদিও চুপচাপ থাকা মুশকিল। হাজারটা প্রশ্ন, মানুষের ক্লান্তিহীন কৌতুহল! তার নিজের কেন যেন আজকাল অল্পতেই ক্লান্ত লাগে। ভর দুপুরে, সন্ধ্যার আগে, ভোররাতে বুকের ভেতর থেকে দীর্ঘ নিশ্বাস উঠে আসে। শরীর নিংড়ে আসা এই বাতাসের উপর তার আর কোনো নিয়ন্ত্রন নাই! নিজেকে ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলার উদ্বেগ রাত-দিন, সপ্তাহ-মাস তাকে দুনিয়াদারি ভুলিয়ে রাখে!

হাজারটা প্রশ্ন, মানুষের ক্লান্তিহীন কৌতুহল! তার নিজের কেন যেন আজকাল অল্পতেই ক্লান্ত লাগে। ভর দুপুরে, সন্ধ্যার আগে, ভোররাতে বুকের ভেতর থেকে দীর্ঘ নিশ্বাস উঠে আসে। শরীর নিংড়ে আসা এই বাতাসের উপর তার আর কোনো নিয়ন্ত্রন নাই!

আজকের দিনটা ছিল আরও ভয়ানক, জীবনের অন্যসব দিন থেকে একদম আলাদা। শেষ রাতে সে একটা নজিরবিহীন কাজ করে ফেলেছে, গোপনে। ফজরের আজান পড়তে তখনও ঘন্টাখানিক বাকি, পুরো বাড়ি ঘুমে। এরপর সারাদিন কেটে গেছে অস্থিরতায়। হাটে দুই জোড়া হাঁস নিয়ে বসে থেকেছে ঘন্টা তিনেক, বিক্রিও করেছে সব। অথচ এক মিনিটের জন্যেও বেচা-কেনায় মন বসাতে পারে নাই। কাজটা বড়ো কোনো পাপ হয়ে গেল কি না— এই ভয় প্রাণপন প্রতিরোধের পরেও বারবার তার মনে ফিরে এসেছে। হাট ভেঙে জায়গাটুকু জনহীন হয়ে গেলেও সে তাই অপরাধীর মতো একলা বসে ছিল। মাগরিবের নামাজ শেষে মুসল্লিরা চলে যাওয়ার পর অবশেষে পথ যখন পুরো খালি, জহরত আলী উঠে দাঁড়াল। পুবদিকে একটা ঢাল নেমে গেছে বাড়ির দিকে। দুইপাশের কাঁঠালগাছকে মনে হচ্ছে দানবীয় ছায়ামূর্তি! যেন বাকি রাতের জন্যে এরা দুইজন হাটের খোলা জমিন-আসমানের নির্ঘুম পাহারাদার।

‘আকাজ’টা আজকে সে হঠাৎ করে ঘটিয়ে ফেলেছে এমন না! বরং তার তরুণ মাথার খুলির ভেতর এই ‘নিষিদ্ধ ইচ্ছা’ বিন্দু বিন্দু জল থেকে ক্রমাগত মহাসমুদ্র হয়ে উঠছিল। গত বর্ষায় যখন পাঁচদিন টানা বৃষ্টি হলো, এক মিনিটের জন্যেও সে বাড়ির বাইরে যাইতে পারে নাই। এই ‘দুর্বুদ্ধি’ সেই সময় প্রথমবারের মতো তার অলস মগজে খোঁচা দেয়। সেদিনও সে একলা ছিল, কাচারি ঘরের মাচালে পা তুলে বসে গুড় দিয়ে মুড়ি খাচ্ছিল। নিচের মাটি ভেজা। এলোমেলো বাতাসে বৃষ্টির স্রোত একেকবার একেক দিকে বেঁকে যাচ্ছিল। ওই রকম মাতাল দৃশ্য একলা উপভোগ করাটাই বোধহয় কাল হলো! জহরত আলী এরপর থেকে একটু একটু করে বদলে গেল। এবং গত মাসে, ভর দুপুরে, সে আরও একটা বড়োসড়ো ভুল করে বসল!

কড়া সূর্য মাথায় নিয়ে পারতপক্ষে কেউ চরের সবচেয়ে প্রাচীন ভিটার কাছে যায় না। সামনের চওড়া মাটির পথটা বছরের অর্ধেক সময় ঘাসে ঢাকা থাকে। বাকি সময় দুইদিকের আলপথ ধরে দুই-তিনজন মানুষকে চুপচাপ হাঁটতে দেখা যায়। দুপুরবেলা অথবা এশার পর যতই জরুরি হোক, দরকার হলে মাইল মাইল ঘুরে যাবে, তবু পথের এই ভুতুরে বাঁকটায় কোনোমতেই কেউ আসবে না। সেই টানা বৃষ্টির পর থেকে জহরত আলীর ভয়, সাহস দুইটাই বোধহয় বেড়ে গিয়েছিল। একদিন তাই দুপুরে ভাত না খেয়ে, বিনা গোসলে সে ওই ভিটার মুখে দাঁড়াল। কম করে হলেও এক যুগ আগে ফেলে যাওয়া বাড়ি, তারপরও ঘরের ঢিবিগুলোর দৈর্ঘ্য-প্রস্থ টের পাওয়া যাচ্ছে। উঠানের শেষ কোনায় বিশাল গাবগাছ, তার বিশালতর ছায়া। পাতা পর্যন্ত দেখা যায় না এমন ঘন ফুল ধরে আছে পুরুষ গাছটায়। ফল যেহেতু আটকায় না, ফুলগুলো নিচের মাটিতে স্তূপ হয়ে পড়ে আছে।

ওই দুপুরে ফলহীন, সঙ্গীহীন দাঁড়িয়ে থাকা গাবগাছের সাদা পাপড়ির মায়ায় সে আপাদমস্তক জড়িয়ে গেল। ঘরে ফিরে এলো হাত-ভর্তি ফুল নিয়ে। মনের মধ্যে শুরু হলো নদীর মতো ভাঙন, বিকট শব্দ তুলে তার একান্ত শান্ত পৃথিবী মন-যমুনায় ডুবে গেল।

 


আমাদের চরে গ্রাম মোট ছয়টা, মানুষও সংখ্যায় অনেক। কৃষক, জেলে, তাঁতি, কামার, কুমার, গাড়িয়াল, কাঠমিস্ত্রী— বহু পেশার মানুষ। চারিদিকে শিশু, কিশোরও গিজগিজ করে। কিন্তু ছয় গ্রামের কোথাও কোনো স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা নাই। তিনটা ছেলেদের, একটা মেয়েদের— মোট চারটা মক্তবে ফজরের পর আরবি পড়া আর যোগ-বিয়োগ শেখানো হয়। এর চেয়ে বেশি কিছু শেখার দরকার পড়ে না কারও।

বোধহয় চরের পত্তনের সময় জন্ম, বৃদ্ধ গাবগাছটা খুব অদ্ভুত। দুনিয়ার অন্য কোথাও কোনোদিন যায় নাই, অথচ তার পাতায় পাতায় বিদেশি আকাশের রোদ। দূর-দূরান্তের শহর থেকে মেঘ ভেসে আসে, বৃষ্টি নামে, তার শরীর ধুয়ে যায়। রোদ আর বৃষ্টি এক সময় ফুরিয়ে যায়, কিন্তু গাছটা সব গন্ধ মনে রাখে। ফুলগুলোতে সময়ের সাদা রং। মাটি থেকে ফুল তুলে ঘরে ফেরার সময় মনে হচ্ছিল পাপড়িগুলোতে ঘড়ির কাঁটা ঘুরছে, অদৃশ্য সময়ের শব্দহীন চাকা।

আগে একঘুমে রাত পার হয়ে যেত। এখন স্বপ্নের কাহিনি মোড় না নিতেই জেগে উঠি। গায়ের কাঁথা সরিয়ে বিছানা থেকে নামি। বাতি জ্বালানোর সাহস হয় না। বারান্দার অন্ধকার মাচালে বসে একা একা কথা বলি, প্রায় নিঃশব্দে।

কোনোদিন কারও মুখে না শোনা এই রকম কথার তোড় আমার ভেতর বাহির ভাসিয়ে দিয়ে, মনের একূল-ওকূল ভেঙে দিগ্বিদিক ছুটতে শুরু করল। একটা ধাক্কার রেশ না যেতেই আরেকটা ধাক্কা। আমার স্বপ্নগুলোও বদলে গেল। আগে একঘুমে রাত পার হয়ে যেত। এখন স্বপ্নের কাহিনি মোড় না নিতেই জেগে উঠি। গায়ের কাঁথা সরিয়ে বিছানা থেকে নামি। বাতি জ্বালানোর সাহস হয় না। বারান্দার অন্ধকার মাচালে বসে একা একা কথা বলি, প্রায় নিঃশব্দে।

কথাগুলো অন্তত নিজেকে হলেও বলতে হয়, নাহলে খুব দমবন্ধ লাগে। শুনতে গিয়ে বারবার অবাক হই। পাগল হয়ে যাচ্ছি কি না— ভয়ও লাগে। কোনো কোনো কথা আসে আবার গীত-পুঁথির ঢঙে। কিন্তু আরও গভীর আর এলোমেলো। মনে রাখতে পারি না। মাঝে মাঝে নিজের অভিনব ভাবনায় এমন মুগ্ধ হই, ইচ্ছা হয় বহুদিন মনে রাখি, কোনোদিন হারিয়ে না যাক কথাগুলো! কিন্তু আমার মনে রাখার ক্ষমতা প্রতিবারই হতাশ করে। সময়ের চাকা একবার দিন-রাত ঘুরে আসার আগেই অনন্য শব্দগুলো স্মৃতি থেকে আগাগোড়া মুছে যায়।

আমাদের চরেই অনেকে আছে, যাদের স্মরণশক্তি ঈর্ষা করার মতো। দেখা যায় এক-ঘণ্টা-দীর্ঘ পুঁথি গেয়ে যাচ্ছে, একটা শব্দও এদিক-সেদিক হচ্ছে না। আবার যারা হাফেজ, সুদূর আরবের ভাষায় তারা কোরানের সবগুলো সুরা আজীবন মুখস্থ করে রাখে; একটা জের, জবর বা পেশও ভুল হয় না। এদের কাউকে যদি একান্ত এই চিন্তাগুলো বলে রাখা যেত! অন্তত পুঁথি আর গীতের মতো মনে আসা কথাগুলো যদি তাদের উসিলায় কিছুদিন বেঁচে থাকত! কিন্তু আমার এইসব অসংলগ্ন আলাপ মনে রাখার মতো কষ্ট কেউ কেন করবে? দুই একজনকে বলার চেষ্টা করে দেখেছি, মুখে কিছু না বললেও তাদের চোখ স্পষ্ট বলে দেয় তারা যথেষ্ট বিস্মিত এবং বিরক্ত। বহু ভেবেও কোনো উপায় খুঁজে পাই না।

একদিন অর্ধেক ঘুম, অর্ধেক জেগে থাকা অবস্থায় হঠাৎ করেই একটা সমাধান মাথায় এলো। চোখ মুছে যখন পরিষ্কার মাথায় ভেবে দেখলাম, মনে হলো আমার উদ্ভট চিন্তাগুলোর থেকেও বুদ্ধিটা বেশি উদ্ভট। আর ভয়ংকর! আমি কি শেষমেশ বোধ-বুদ্ধি সব হারিয়ে ফেললাম?

প্রচুর ভাবনা-চিন্তার পর, আজকে শেষ রাতে অবশেষে ‘দুর্বুদ্ধি’টা আমি প্রয়োগ করেছি। এরপর থেকে নিজেকে ক্রমাগত জর্জরিত করে যাচ্ছি একটার পর একটা প্রশ্নের তিরে। আমার এই কাজটা কি সত্যিই গুরুতর পাপ? পবিত্রতা নষ্ট করার মতো ধৃষ্টতা? ইমান নষ্ট হয়ে যাওয়ার মতো মন্দ আমল?

 


বা জের বি, জাল, লাম জের লি— বিজলি
বা জের বি, নুন জবর না— বিনা
বা জের বি, শিন জের ষে— বিষে
আলিফ জবর আ, মিম জবর মা, রা— আমার
আলিফ জবর আ, সিন, মিম জবর মা, নুন জের নি— আসমানি
নুন জের নী, লাম— নীল
বা পেশ বু, ছোট কাফ,— বুক

এই পর্যন্ত পড়ে আমি দম নিলাম। কবি ছেলেটা ততক্ষণে আবার বারান্দায় পা ঝুলিয়ে বসে পড়েছে। রোদে পোড়া চামড়া, লালচে চুল আর অসহায় চাহনি। বিকেল চারটায় যখন সে পোস্ট অফিসে আসে, আমি তখন ঘরে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম।

এই মহকুমা শহরে পোস্ট অফিস দুইটা। আমি যেটাতে কাজ করি, সেখানে খুব একটা ভিড় হয় না। নামেই কেবল শহর, আমাদের পোস্ট অফিসের তিন পাশে ঘন জঙ্গল। উত্তর দিকে দুইপাশে মাঠ রেখে একটা ভাঙাচোড়া পাকা রাস্তা গিয়ে উঠেছে ভিক্টোরিয়া স্কুলের বামপাশে। পোস্টমাস্টার অর্থাৎ আমি বাদে এখানে কর্মচারি মোট দুইজন। একজন সিল-ছাপ্পড়ের কাজ করে, দরকার হলে চা বানায়, টেবিল-চেয়ার মোছে। আরেকজন পিয়ন। সারাদিন ডাক বিলি করে সাড়ে তিনটা নাগাদ ফিরে আসে। এরপর আমাদের কারও কোনো কাজ থাকে না। গল্প-গুজব করে, ম্যাগাজিন-পত্রিকা পড়ে সময় কাটে।

বয়স বেশি হলেও পনেরো। দ্রুত হেঁটে বারান্দায় উঠেই পা ঝুলিয়ে বসে পড়ল। আমাদের পিয়ন গিয়ে ‘কী চাই’ জিজ্ঞেস করলে সে ঘুরে তাকাল দুইবার কিন্তু কোনো উত্তর দিল না। অগত্যা আমি এগিয়ে গেলাম। ছেলেটা এবার উঠে দাঁড়াল, তার হাত কাঁপছে।

আশপাশের কোনো চর থেকে এসেছে বোধহয়। নাম বলল জহরত আলী। বয়স বেশি হলেও পনেরো। দ্রুত হেঁটে বারান্দায় উঠেই পা ঝুলিয়ে বসে পড়ল। আমাদের পিয়ন গিয়ে ‘কী চাই’ জিজ্ঞেস করলে সে ঘুরে তাকাল দুইবার কিন্তু কোনো উত্তর দিল না। অগত্যা আমি এগিয়ে গেলাম। ছেলেটা এবার উঠে দাঁড়াল, তার হাত কাঁপছে। হাতের ভেতর কয়েক ভাঁজ করা মলিন কাগজ।

চিঠি নিয়ে এসেছ? পোস্ট করতে চাও?
না। আপনে কি আরবি পইরব্যার পারেন?
পারি, তোমার কাগজটা পড়ে দিতে হবে? আমি অবশ্য খালি বানান করে পড়তে পারি, কোনো কিছুর অর্থ জানি না।

ভীত চোখ জোড়া বন্ধ করে জহরত আলী হাসল। হাসিমুখে, কম্পমান হাত খুলে কাগজের টুকরাটা বাড়িয়ে দিল আমার দিকে। বাঁশ কেটে বানানো কলম দিয়ে লেখা মনে হয়, কোথাও কোথাও কালি বেশি পড়ে গেছে। সবচেয়ে বড়ো কথা, প্রথম তিনটা শব্দ পড়েই আমার থেমে যেতে হলো।

বা জের বি, জাল, লাম জের লি— বিজলি
বা জের বি, নুন জবর না— বিনা
বা জের বি, শিন জের ষে- বিষে

আরবি অক্ষরে আসলে বাংলা কবিতা লিখে এনেছে ছেলেটা। এখন চোখভর্তি জিজ্ঞাসা আর আশঙ্কা নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।

আমি বাংলা পইরব্যার পারি না। গত বুধবার এই ‘আকাজ’ কইর্যাখ ফালাইছি। তারপর থাইক্যা এক বারও শান্তিমতোন চোখ বন্ধ কইরব্যার পারি নাই। চরের কাহুক দ্যাহাইব্যারও সাউস পাই নাই।

আমি সময় নিয়ে থেমে থেমে পুরো কবিতা পড়লাম। মুগ্ধ হওয়ার মতো একটা কাহিনির খোঁজ পাওয়া গেল। পুরুষ গাছের জবানে লেখা। তার শুকনা সাদা ফুল দিয়ে সে জয় করতে চায় যমুনার খোলা দেহ। উত্তাল যৌবনের দাপটে যে নদী প্রেম ভুলে গেছে। পুরুষ গাছটার শরীর পুড়ে যাচ্ছে তার ঘোলা জলে ডুবতে না পারার আফসোস, উত্তাপে। অনেক শব্দ পড়তে কষ্ট হচ্ছিল; কী বোঝাতে চায় আন্দাজ করে নিতে হয়েছে। আরবি অক্ষরে যেমন বাংলা ‘শরীর’ হয়ে গেছে ‘শারীর’, ‘নাভি’ হয়ে গেছে ‘নাবি’, ‘তাপ’ এর বদলে ‘তাব’, ‘পুরুষ’ এর জায়গায় ‘বুরুশ’!

আরবি হইল পবিত্র ভাষা, কোরান-হাদিসের ভাষা। তার হরফে এইসব প্রেম-পিরিতি, দেহ, কামনা-বাসনার কথা ল্যাহা মনে অয় মহাপাপ? আমি তাই কাগজটো পুড়ায়্যা ফালামু। তার আগে ভাইবল্যাম অন্তত একজন পড়ুক, শহরের একজন জ্ঞানী মানুষও যদি পড়ে, পইড়্যা যদি কিছু কয়, যদি কিছুদিন মনে রাহে!

কী মন্তব্য করা উচিত ঠিক করতে আমার সময় লাগল অনেক। এতোদূর থেকে এতো অভিনব একটা লেখা নিয়ে এসে জহরত আলী নিমেষেই এমন এক জগত তৈরি করে ফেলেছে, যেখানে বাস্তব অবাস্তবের ফারাক নাই। চুপ করে থাকার মানেও এখন হাজার বাক্য বলা। কিছুই না বলে আমি যা বললাম এই অনবদ্য কবি সবটুকু বুঝে গেছে। তার হাত আর কাঁপছে না। চোখ-মুখ থেকে ভয়ের রেশও মিলিয়ে গেছে। এবং এই শব্দহীন সহজ প্রশংসা-পর্বের পর আমার নিজেরও মাথা খুলে গেল।

পাপ হওয়ার সম্ভাবনা আছে। তবে এই পাপ থেকে বাঁচার উপায় আছে, খুব সোজা উপায়। তুমি তোমার কবিতা আমাকে মুখে বল আমি বাংলা অক্ষরে লিখে দেই।

কিন্তুক আমি তো তহন পইরব্যার পারমু না।

তুমি বরং বাংলা অক্ষর শেখা শুরু করে দাও। আমি ব্যবস্থা করব। যতদিন লাগে লাগুক। এর মধ্যে যা লিখতে চাও এভাবে লিখে প্রতি সপ্তাহে এখানে নিয়ে আসো, আমাকে পড়ে শোনাও। বুঝেছো? আমি বাংলায় লিখে দেব, তারপর মন চাইলে পুড়িয়ে ফেলো কাগজগুলো। যতদিন বাংলায় লিখতে না পারো এটা, ধরে নাও, সাময়িক ব্যবস্থা। বাংলা শেখার পর লম্বা মোনাজাত ধরে, দান-সদকা-কাফফারা দিয়ে মাফ চেয়ে নিও।

আমার তরঙ্গহীন জীবনে কবি জহরত আলীর আরবি হরফে লেখা বাংলা বাক্যগুলো এরপর প্রায় দুই বছর ধরে আনন্দময় ঝড় হয়ে বইতে লাগল। আমার ড্রয়ারের অর্ধেক তার কবিতার বাংলা অনুলিপিতে ভরে গেল। মূল কাগজগুলো পুড়ে ছাই হয়ে উড়তে থাকল ভাঙা রাস্তার উপর, মাঠের ঘাসে জমতে শুরু করল তাদের ধ্বংসাবশেষ।

 


এতো বছর হয়ে গেল এই শহরে আছি অথচ এখনও মাঝেমধ্যে পথ হারিয়ে ফেলি, ভুল রুটের বাসে উঠে যাই। প্রত্যেকবার এইরকম এলোমেলো হলে আমার দুই হাজার সাতের জুলাই মাস মনে পড়ে। ওইদিন সম্ভবত বৃহস্পতিবার ছিল। জীবনে প্রথম ঢাকা শহরে এসে নেমেছি। বিশাল বাস টার্মিনাল। প্রচণ্ড রোদ আর ভিড়ে দাঁড়িয়ে কয়েক মিনিটেই আমার মাথা ধরে গেল। চারপাশের ঘামে ভেজা মানুষগুলোকে মনে হচ্ছে দিকভ্রান্ত, আশেপাশে না তাকিয়ে কেবল পাগলের মতো সামনে ছুটছে।

আমার সাথে কেউ আসে নাই। দুই হাতে বড়ো বড়ো বস্তা, কাঁধে ভারী ব্যাগ। আমাকে বলা হয়েছে একটা সিএনজি নিয়ে সোজা মগবাজার ওভারব্রিজ পর্যন্ত যেতে। তখনও নিজের মোবাইল ফোন নাই। যে বোনের বাসায় যাব তার ফোন নম্বর আর বাসার ঠিকানা লেখা কাগজ পকেটে। একটা বিরাট মোড়ে আসতেই জ্যামে পড়লাম। ডানে সিনেমা হল, বিরাট বিরাট বাংলা অক্ষরে নাম লেখা। ছবির রঙিন ব্যানার অর্ধেক ঢেকে দিয়ে হলের সামনে দুইটা দোতলা বাস দাঁড়িয়ে আছে। তখন পর্যন্ত আমার জানা ছিল না, দেশে আজকে হঠাৎ একটা কল্পনাতীত ঘটনা ঘটে গেছে। সেই ঘটনা এতোই গুরুত্বপূর্ণ যে বিকেলবেলা নতুন করে দুই পৃষ্ঠার খবরের কাগজ ছাপতে হয়েছে। কয়েকজন কিশোর-কিশোরী অবেলায় বের হওয়া কাগজ হাতে প্রায় উড়তে উড়তে ছুটছে মানুষের ভিড়ের দিকে।

প্রথম দিনের মতো আজকেও আমি ভুল গলিতে ঢুকে গেছি। ছয় বছর আগে কথা ছিল মগবাজার পৌঁছে আমি বামদিকে শ্রুতি স্টুডিয়োর গলিতে ঢুকব, চলে গিয়েছিলাম মৌচাকের দিকে। আজকে যাওয়ার কথা ছিল বায়তুল মোকাররমের উল্টাদিকে। ভুল করে ঢুকে গেছি প্রশস্ত, অচেনা কানাগলিতে। গলির ভেতর মানুষের জটলা। একটা পুরোনো দালানের সামনে অনেকগুলো রিকশা আর গাড়ি রাখা। নতুন রং করা বাড়িটার বয়স ঠিক কত বোঝা যাচ্ছে না, অন্তত পাকিস্তান আমলের। কাছে গিয়ে জানলাম, এই দালান এখন জাদুঘর। মাত্র তিন দিন আগে এর উদ্বোধন হয়েছে।

যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল প্রকাশনা অফিসে, প্রুফ দেখতে। টাকা পয়সা নিয়ে এরা বারবার ঝামেলা করে। তারপরও, টিউশনি বাদে যেহেতু আর কোনো উপার্জন নাই, কাজটা ছাড়তে পারছি না। নতুন একটা পত্রিকা অফিসে ঢোকার আলাপ চলছে। সামনের সপ্তাহের মধ্যেই আশাকরি ভালো-মন্দ জানতে পারব। কানাগলির এই ভবনটাও মূলত পত্রিকা অফিস ছিল। নিচতলা বাদে বাকিটা মিলিয়ে একসময় দুর্দান্ত কর্মযজ্ঞ চলত। বাংলাদেশের এক সময়ের প্রবল জনপ্রিয় প্রত্রিকা এবং সাড়া-জাগানো ম্যাগাজিন ছাপা হতো আগে এই ভবন থেকে। দৈনিকটা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর কিছুদিন ম্যাগাজিন সেকশনটা চালু ছিল। এরপর, জাদুঘর ঘোষণা হওয়ার আগ পর্যন্ত, ভূতের বাড়ির মতো বারো বছর ধরে জন-প্রাণিহীন পড়ে ছিল।

পত্রিকার জাদুঘর আমি আগে কোনোদিন দেখি নাই। এই শহরে এইরকম আরও আছে বলে শুনিও নাই। দোতলায় ওঠার সিঁড়ি থেকেই শুরু হয়েছে গ্যালারি। বিভিন্ন সময় সম্পাদকদের ব্যবহৃত কালির দোয়াত থেকে শুরু করে টাইপরাইটার, অকেজো ছাপার মেশিন যত্ন করে সাজানো। পরের তলায় দেখলাম দশ-বারোটা শেলফ ভর্তি করে ম্যাগাজিনের সংখ্যাগুলো মাসওয়ারি বাঁধাই করে রাখা। ডান পাশের দরজায় লেখা ‘চিঠিপত্র বিভাগ’। সেই ঘরে গিয়ে আমি মূলত আটকে গেলাম একটা কাচের বক্সের সামনে। ভেতরে কোনোদিন না খোলা আটত্রিশটা চিঠি। বক্সের সামনে বাংলা, ইংরেজি দুই ভাষায় প্রেরকের ঠিকানা, সময়কাল আর প্রাপক সম্পাদকের অনিবার্য ব্যস্ততার কথা লেখা।

একদৃষ্টিতে তাকিয়ে কত সময় কেটে গেল জানি না, তবে স্পষ্ট মনে আছে সন্ধ্যার পর যখন আরও একবার কানাগলিতে এসে দাঁড়ালাম মনে হলো ঢাকার কোনো গলি না বরং সময়ের স্রোত ভুল করে আমি এক নিষ্প্রাণ ভবিষ্যতে চলে এসেছি। সজীব বর্তমান বয়ে যাচ্ছে পয়ষট্টি বছর আগের ধারায়।

কোনো কোনো চিঠি তার টেবিলের পাশে না-খোলা পড়ে থাকে মাসের পর মাস। কবিরা সাধারণত কয়েকবার পাঠানোর পর নিরাশ হয়ে পোস্ট করা বন্ধ করে দেয়। কেবল একটা ঠিকানা থেকে পুরো বছর জুড়ে ক্লান্তিহীন চিঠি আসতে থাকে।

উনিশশ আটচল্লিশ সন। নতুন চালু হওয়া খবরের কাগজের সবচেয়ে জমজমাট পাতা ‘সাহিত্য সাময়িকী’। এই পাতার সম্পাদকের কাছে প্রতি সপ্তাহে শত শত চিঠি আসে। বেশির ভাগ কবিদের পাঠানো। কোনো কোনো চিঠি তার টেবিলের পাশে না-খোলা পড়ে থাকে মাসের পর মাস। কবিরা সাধারণত কয়েকবার পাঠানোর পর নিরাশ হয়ে পোস্ট করা বন্ধ করে দেয়। কেবল একটা ঠিকানা থেকে পুরো বছর জুড়ে ক্লান্তিহীন চিঠি আসতে থাকে।

আমার চোখের সামনে এসে খাকি কাপড় পরা ডাকপিয়নের সাইকেল এসে থামল। ব্যাগ থেকে বের করে প্রতিবার একটা নির্দিষ্ট খাম সে সবার উপরে রাখে। প্রেরকের ঠিকানা মুখস্থ, তবুও ভবনে ঢোকার আগে খামটা উল্টিয়ে সে আর একবার নাম-ঠিকানা পড়ে নিল।

কবি জহরত আলী
প্রযত্নে: পোস্টমাস্টার আজমত হোসেন
দত্তবাড়ি পোস্ট অফিস
মহকুমা: সিরাজগঞ্জ
জেলা: পাবনা

গলার স্বর হালকা ভাঙা। না মৃদু না তীব্র— এমন ঢেউ তার উচ্চারণে।

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

আব্দুল্লাহ আল মুক্তাদিরের জন্ম সিরাজগঞ্জে, ১৯৯০ সালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে পড়াশোনা শেষ করে এখন শিক্ষকতা করছেন ত্রিশালের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে। দৈনিক সংবাদের সাহিত্য পাতায় ছোটগল্প ও কবিতা প্রকাশের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ ২০১০ সালে । এখন পর্যন্ত প্রকাশিত কবিতার বই দুইটা, অন্য গাঙের গান, সমুদ্রসমান  (২০১৬) ও যুদ্ধ যুদ্ধ রুদ্ধ দিন (২০২০)। প্রথম গল্প সংকলন বছরের দীর্ঘতম রাত  প্রকাশিত হয় ২০১৯ সালে।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।