শুক্রবার, জুলাই ১৯

আব্বা যেদিন নয়নতারা হলো : নাদিয়া জান্নাত

0

আব্বার পায়ের দিকটাতে লাগানো নয়নতারা গাছটাতে পানি দিচ্ছে মেহেদী উল্লাহ। চৈত্রের দুপুরে গাছে পানি দিলে গাছ মরে যায় এটা সে জানে। তবুও, নয়নতারা গাছটার দিকে তাকিয়ে তার মায়া লাগে। মনে পড়ে, প্রথম যখন গাছটা লাগায় তখন একবারে নেতিয়ে ছিল। সে ভাবত, কবরে পুঁতে দিলেই গাছের সাথে আব্বার যোগাযোগ তৈরি হবে। যখন গাছটাতে পানি দেওয়া হবে তখন পানি গাছের মাটি চুয়ে চুয়ে ঠিক আব্বার পায়ে গিয়ে পড়বে। আব্বা যখন বেঁচে ছিলেন, সরাসরি কল চেপে কখনোই ওজু করতেন না। প্রথমে কলটাকে চাপতেন। পিতলের জগে পানি ভরাতেন। তারপর ধীরে ধীরে সময় নিয়ে ওজু করতেন। যখন তিনি দুহাত দিয়ে কান মুছতেন, তখন চোখ বন্ধ করে রাখতেন। পায়ে পানি ঢালার সময় হাতের আঙুল দিয়ে পায়ের পাতাটা ঘষে ঘষে ধুতেন। পানি ছর ছর করে গড়িয়ে যেত কলতলায়।

আজ হঠাৎ করে, নয়নতারা গাছে পানি দেওয়ার সময় আব্বার ওজু করার দৃশ্য মনে পড়তেছে মেহেদী উল্লাহর। রমজান মাসে মানুষটার মতিভ্রম হলো। সকালে ওজু করে জায়নামাজে বসল। নামাজ পড়ল না। পুঁটি মাছ দিয়ে ভাত খেতে ধরে বলল, ‘বিষ দিয়া এই মাছ কেউ রান্ধছেনি হ্যাঁ!’ তারপর গজগজ করে চুপ করে থাকল। বাড়ির কেউ ঠাওর করতে পারে নাই একটা জলজ্যান্ত মানুষ আসরের ওয়াক্তে মারা যাবে। সদর ঘরের চৌকিতে বসে মানুষটা একলা একলা বুক মালিশ করল কতক্ষণ। তার বুকে হাত দিতেই চিল্লায় উঠল, কিহ্ প্রাণটারে বের করবি নাকি! জোরে ফুঁ দে, আয়াতুল কুরসি পড়, কিরে বুকে দম নাই! তারপর ধীরে ধীরে নিস্তেজ হইল মানুষটা। প্রথমে তেলাপিয়া মাছের মতন চোখ দুটা ঘোলা হলো, এরপর নিথর হলো পা। তারপর হাত, মুখ, পুরা শরীর…।

আব্বা উঁচা গলায় কথা বলতে পারে, বাড়ি বা মহল্লার কেউ কোনো দিন জানত না। মরার আগে আগে মেজাজ চড়া হইছিল লোকটার। এমন নরম মানুষ হুট করে চড়া হয়ে গেল অথচ আমরা টেরও পাইলাম না মানুষটা চলে যাবে।

আব্বা উঁচা গলায় কথা বলতে পারে, বাড়ি বা মহল্লার কেউ কোনো দিন জানত না। মরার আগে আগে মেজাজ চড়া হইছিল লোকটার। এমন নরম মানুষ হুট করে চড়া হয়ে গেল অথচ আমরা টেরও পাইলাম না মানুষটা চলে যাবে। মরণ আসলে নানান রকম মাজেজা নিয়ে আসে। এই কথা আম্মা বলছিলেন, আব্বা চলে যাবার পরে। দাদি যেবার মরল সেও অদ্ভুত আচরণ করছিল। আম্মা নতুন বউ, ঘর বাড়ি ঠিক মতন সামলাইতে শেখে নাই তখনই চলে যান ভদ্রমহিলা। পানি খাইতে ধরেও গলায় আটকাইত তার। বলত, দুনিয়ার পানিতে স্বাদ নাই। জান্নাতি পানির স্বাদের কাছে দুনিয়ার পানি হইল ডাইল ভাত।

শেষ দমটা যখন ছাড়ে সে, তখন সারা কপাল ঘামে জবজব করছিল। বড়ো বড়ো করে শ্বাস নিতেছিল। কেবলমাত্র মরণ কাছে এলেই বোঝা যায় দমটা কত দরকারি। মানুষটাকে জড়িয়ে ধরে একটু যে বসে থাকবো সে ফুসরতটাও মিলল না। মসজিদে গিয়ে জানাতে হলো আব্বার চলে যাবার কথা।

আত্মীয়দের জানাতে হলো। খালুরা এসে বলল, বড়ো ভালো দিনে তোমার আব্বা চলে গেল। রমজানের প্রথম দিন আজ।

রমজানে কেউ মরে গেলে বিনা হিসাবে জান্নাত। মানুষটাও ভালো আছিল, কারো ক্ষতি করে নাই। শুনলাম, সে নাকি আইজ পুঁটিমাছ দিয়ে ভাত খাইছে! আজকের রোজাটা যদি রাখতে পারত আরও ভালো হইত। শেষ রিজিকটা তাইলে পুঁটিমাছ আছিল, তাই না বাজান! রিজিকের মালিক আল্লাহ।

পানি পাবার সাথে সাথেই গাছটা আরও ঝিমায় গেল যেন। বাইরের তাপমাত্রার সাথে নিজের তাপমাত্রারে খাপ খাওয়াইতে পারতেছে না গাছটা। হাসি পাচ্ছে মেহেদী উল্লাহর। তার অবশ্য আব্বার কথা ভেবেই হাসি পাচ্ছে। মানুষটা একদম চমক নিতে পারে না। ঈদে জামা কাপড় কিনে দিলে বলত, আমার তো মেলা জামা কাপড়। এসব লাগব না আমার। তোর মায়েরে দে, খুশি হবে।

আজ এই ভরা চৈত্র মাসে, হঠাৎ করে পায়ে পানি পেয়ে কী ভাবতেছে সে! মনে হয় রাগ করতেছে। ভাবতেছে, কাম কাজ ফেলে কবরস্থানে বইসা খুব তো জগৎ উদ্ধার করতেছ বাপধন।

কবরের দিকে প্রাণ ভরে তাকিয়ে থাকতে ধরে মনে হলো, বেঁচে থাকতে মানুষটারে এভাবে দেখা হয় নাই। কোঁকড়ানো বাবরি চুলের লম্বা একটা মানুষ। মরে যাবার পরপর তার শরীর আরও সটান, আরও লম্বা হইছিল। চার জন মানুষ মিলে কাঁধে উঠানোর পরেও হিমশিম খাইছিলাম আমরা। বেঁচে থাকতে মানুষটারে নজর দিয়ে দেখা হয় নাই, কবরটাকেও বেশি দিন দেখতে পারব না। তিন বছরের জন্য নেওয়া হইছে কবর।

বুকের মধ্যে মাথাটা টেনে ধরে বলত, আব্বারে, তোর জ্বালা তো কমাইতে পারতেছি না আব্বা, আমি এখন কী করতাম মানিক, এই শহরে সবচেয়ে দামি জায়গা হইল কবরস্থান। যদি দক্ষিণের যেকোনো জায়গাতে পঁচিশ বছরের জন্য কবর সংরক্ষণ করতে চাই তাহলে আমার হাতে বিশ লাখ টাকা থাকতে হবে। উত্তরের দিকে খরচ একটু কম। পনেরো লাখ টাকা।

আমি হাঁটতে শিখছিলাম দুই বছর বয়সে। বাড়ির সবাই কইত, নবাব হয়ে জন্মাইছে। আব্বা জবাব দিত এত আগাম হাঁটতে হইব ক্যান! শোন বাপ, তুই বুকে শুয়ে থাক। মাটিকে দুক্কু দিতে হবে না তোর। আমার এসব স্মৃতি মনে নাই। মনে আছে নয় বছর বয়সের কথা। অনেক জ্বর হলো সেবার। সারা গায়ে গুটিগুটি করে চিকেন পক্স উঠল। আম্মা তখন পোয়াতি। কাজ কর্ম ফেলে একটা সপ্তাহ আব্বা আমার ঘরে থাকল। বালতিতে পানি নিয়ে শরীর মুছে দিলো বারে বারে। বুকের মধ্যে মাথাটা টেনে ধরে বলত, আব্বারে, তোর জ্বালা তো কমাইতে পারতেছি না আব্বা, আমি এখন কী করতাম মানিক, এই শহরে সবচেয়ে দামি জায়গা হইল কবরস্থান। যদি দক্ষিণের যেকোনো জায়গাতে পঁচিশ বছরের জন্য কবর সংরক্ষণ করতে চাই তাহলে আমার হাতে বিশ লাখ টাকা থাকতে হবে। উত্তরের দিকে খরচ একটু কম। পনেরো লাখ টাকা। জুরাইন, আজিমপুর বা খিলগাঁও কবরস্থানে দশ লাখের মতো তো লাগেই। যদি আমি আট বছরের জন্য কবর সংরক্ষণ করতে চাই তাহলে দাম একটু কমে আসবে।

আমি আব্বাকে কবর দিয়েছিলাম মুগদাতে। খরচ হয়েছিল দশ হাজার টাকা। বন্ধু স্থানীয় এক ভদ্রলোককে ফোন করে বলেছিলাম, শাহজাহানপুরে একটা কবরের ব্যবস্থা যেন করে দেয়। সে জানাল, শাহজাহানপুরে আর নতুন করে কবর নেওয়া হচ্ছে না। আমি চাইলে, মুগদাতে একটা ব্যবস্থা করতে পারে। কমিশনার তার পরিচিত।

ফ্রিজিং গাড়িতে করে আব্বাকে শেষবারের মতো মুগদা নিয়ে গেলাম। মোতাওয়াল্লি বাবুল ভাইয়ের সাথে আলাপ করে দশ হাজার টাকায় ঠিক করলাম ওনার থাকার জায়গা। একদিকে তার থাকার জায়গা পরিপাটি করা হচ্ছিল, আরেক দিকে চলতেছিল গোসলের আয়োজন। গোসলের জন্য টাকাটা ফিক্সড, তিন হাজার টাকা। বাঁশ, চাটাই, কাফনের কাপড়, কর্পূর, গোলাপজল, আগরবাতির পেছনে সাত হাজার টাকা খরচ হলো।

এখানে এসে বুঝলাম, কবরস্থানের ব্যাবসাটা সাংঘাতিক। এক পাশে অনেকগুলান বাঁশ ফেলে রাখা হইছে। দরদাম করে বাঁশ কিনতে হইতেছে, চাটাই কিনতে হইতেছে। জন্মের সময় হাসপাতালগুলান ব্যাবসা করতেছে শিশুদের নিয়া, আর মরণের পর ব্যাবসা হইতেছে কবরস্থানে। তাহলে কি জন্ম মৃত্যু পুরাটাই ব্যাবসা! বাস্তুসংস্থান বড়োই অদ্ভুত।

জামা কাপড় কেনার সময় যেমন সুতোর কারুকাজ দেখতে হয় তেমনি কাফনের কাপড় কেনার সময়ও সবচেয়ে বেশি নজর রাখতে হয়। ইহরামের কাপড় দিয়ে যদি মুর্দাকে মুড়াতে চাই তাহলে আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা খরচ পড়ে যাবে। বেছে বেছে আমি ইহরামের কাপড়টাই নিলাম আব্বার জন্য। গোলাপজলের ঘ্রাণ ওনার পছন্দ ছিল। কাশানের গোলাপজল খুঁজছিলাম। এটা অনেক এলিট জাতের। কাশানের গোলাপজল দিয়ে কাবা শরিফের দেওয়াল ধোয়া হয়। পুরা মুগদা তন্ন তন্ন করেও পেলাম না গোলাপজল, পরে দেশিটাই কিনলাম।

‘বিসমিল্লাহি ওয়া আলা মিল্লাতি রাসুলিল্লাহ’ বলে আব্বাকে কবরে রাখলাম অবশেষে। তার গায়ে মুঠো ভরা মাটি দিলাম। ছোটো বেলার কথা মনে পড়ল খুব। আমাদের শৈশব গ্রামে কেটেছে। জমিতে রোয়া লাগানোর সময় কী যে আনন্দ হতো। আব্বার গায়ে কাদা ছিটিয়ে দিলে একটুও রাগ করত না। হাসত খুব। আজ আব্বার শরীরে মাটি দেওয়ার সময় কবরটাকে ধানি জমি মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে, আব্বা হলো ধান। আব্বারে আলতো করে মাটিতে রোপণ করছি শেষ বারের মতো।

আব্বার শরীর ছুঁয়ে বেড়ে ওঠা নয়নতারা গাছটায় ফুল এসেছে। গাছের গোড়ায় মাটি দিতে দিতে মেহেদী উল্লাহ ভাবে আব্বা নিশ্চয়ই গাছটাতে ফুল হয়ে ফুটে আছে। আব্বা ভালো আছে।

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।