শনিবার, অক্টোবর ৮

আমিনুল ইসলামের কবিতায় ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং উত্তর-উপনিবেশবাদ : মঈন শেখ

0

দ্বিতীয় পর্ব


ইতিহাস-ঐতিহ্য-কিংবদন্তী থেকে উপকরণ নিয়ে অনেক শিল্পসফল কবিতা রচেছেন আমিনুল ইসলাম। তাঁর তেমনি একটি প্রেমের কবিতার নাম ‘তুমি হলে সন্ধ্যাবতী সকলি কবুল’। পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারের কিংবদন্তী, পুন্ড্রনগরের বেহুল-লখিন্দরের লোককাহিনী সহযোগে বর্তমান বিশ্বায়নশাসিত সমাজের নারীর উদ্দেশ্যে রচিত কবিতাটি ছন্দ, উপমা, উৎপ্রেক্ষা, চিত্রকল্প ও কল্পচিত্রের অলংকারে একটি কালজয়ী প্রেমের কবিতায় উন্নীত হয়েছে। তার সাথে এসেছে আমন ধান, শিমুল ও পলাশ ও জবাফুল, গাঙের ভাসান প্রভৃতি অনুষঙ্গ। কথা ঘুরিয়ে বলা যায়, একটি কালজয়ী কবিতা রচনায় তিনি অত্যন্ত সফলভাবে কালজয়ী মিথ-লোককাহিনি-ইতিহাসের উপকরণ ব্যবহার করেছেন। বাংলার প্রাচীন ভূগোল, বর্তমান শস্যক্ষেত্র, বিশ্বায়নপ্রভাবিত বর্তমান সময়, বিশ্বাসনির্ভর অতীত একসাথে কথা বলে উঠেছে একটি ক্ষুদ্রায়তন কবিতার মুখে। কবিতায় বর্তমান বাঙালি নারীকে অতীতের বাঙালি নারীর সমৃদ্ধ পরম্পরায় ও মানবিক বৈশিষ্ট্যে দেখার ও গ্রহণের বাসনা পরিস্ফুটিত হয়েছে। এই বাঙালি অতীতের বাঙালি। এই বাঙালি বর্তমানের বাঙালি। এই বাঙালি আগামী দিনের বাঙালি। একথায় এই বাঙালি আবহমান বাঙালি। বিশ্বায়নের সর্বগ্রাসী স্রোতে বাঙালির আবহমানকালের ইতিহাস-ঐতিহ্য-মিথ বাঙালিকে সংস্কৃতিকে রক্ষার রক্ষাকবচ , এমন ভাবব্যঞ্জনা কবিতাটির পরতে পরতে ঝংকৃত হয়ে উঠেছে। শৈল্পিক সুচারুতায় নান্দনিক সৌন্দর্যে বাঙালি জাতির ইতিহাস-ঐতিহ্য পুনর্নিমিত হয়ে ঐশ্বর্যমন্ডিত বর্তমানে উন্নীত হয়েছে। কবিতাটি আমিনুল ইসলামের যুগপৎ ঐতিহ্যপ্রীতি এবং কাব্যকুশলতার সোনালি সাক্ষর।

ছুটে আসে বিশ্ব ঢল, শিকড় বিপাকে;
নগ্ন নিতম্ব হাসে হাজারে হাজারে;
আমি তো তাদের নয়, চেয়েছি তোমাকে,
গড্ডলিকায় ব্যতিক্রম মুক্ত বাজারে!

তোমার চেতনা রাঙা শিমুল পলাশ
তোমার মনন জুড়ে আমনের রঙ
আমিও শিখেছি দ্যাখো শব্দঘন চাষ
আমাকে কিনিবে কোন্ ছিনালির ঢঙ!

তোমার আঁচলে মাখা প্রত্নঘন ঘ্রাণ
চিরায়ত ক্ষুধা নিয়ে মাতাল আমিও
এ দেহে ধরেছি দ্যাখো লখিন্দর প্রাণ
ভাসি যদি সে ভাসানে তুমিও নামিও।

আমি তো স্বয়ং আছি— লাগিবে না ফুল
তুমি হলে সন্ধ্যাবতী সকলি কবুল।

[ তুমি হলে সন্ধ্যাবতী সকলি কবুল/ কুয়াশার বর্ণমালা ]

বাংলা সাহিত্যে বেশ কিছু কাব্যগ্রন্থ বা কবিতা ধ্রুব নক্ষত্র হয়ে আছে যুগ যুগ ধরে। যার বিষয়, প্রকরণ, উপস্থাপন, ভাষাসহ বিভিন্ন কিছু, যা গ্রন্থ বা কবিতাগুলোকে উল্লেখযোগ্য করে রেখেছে। বর্তমানে এর সাথে আর একটি কবিতা যোগ হয়েছে ‘পথ বেঁধে দিল বন্ধনহীন গ্রন্থি’ । কবি আমিনুল ইসলামের ‘পথ বেঁধে দিল বন্ধনহীন গ্রন্থি’ এই ধারার কবিতা। বলতে গেলে এই ধারার কাব্যমাল্যে এক নতুন ও তাজা পুষ্পের সংযুক্তি ঘটলো। সূচীত হল কবিতার ভূবনে নতুন দিগন্তের। এতদিন বাংলাদেশের কাব্যভূবন হয়তো অপেক্ষা করছিলো এমন একটি কবিতার জন্য। যে কবিতার থাকবে নিজেকে নিয়ে অহংকার করার আস্পর্ধা। ‘পথ বেঁধে দিল বন্ধনহীন গ্রন্থি’ এমন একটি কবিতা যেখানে জ্বলজ্বল করছে বাংলাদেশের সমস্ত অহংকারের দ্বীপ। বৃহত্তর বরেন্দ্র অঞ্চলের সমস্ত ঐতিহাসিক দলিল তথা অহংকার গ্রথিত হয়েছে এখানে। আমি বিশ্বাস করি, এখন কিংবা তখন, যখনই হোক না কেন, একদিন আলোচনার সামনে আসবে এ কবিতা। আমিনুল ইসলামের কবিতায় প্রকৃতি ও জীবন্ত উপমার ব্যবহার আলাদা ও স্বতন্ত্র বিশ্লেষণের দাবি রাখে। জীবনানন্দ দাশকে আমরা পাই প্রধান ইন্দ্রিয়বোধের কবি হিসাবে। বুদ্ধদেব বসুর ভাষায় পাঠকের কাছে তাঁর একতটি মাত্র দাবি: সেটি এই যে তিনি চোখ খোলা রাখবেন। কেননা জীবনানন্দের জগৎ প্রায় সম্পুর্ণরূপে চোখে দেখার জগৎ। তাঁর কাব্য বর্ণনাবহুল, তাঁর বর্ণনা চিত্রবহুল, এবং তাঁর চিত্র বর্ণবহুল- এটুকু বললেই জীবনানন্দের কবিতার জাত চিনিয়ে দেওয়া সম্ভব হতে পারে।৭ এদিক দিয়ে দেখলে আমিনুল ইসলামের জগৎও চোখে দেখবার জগৎ। তাবে তা অবশ্যই ইতিহাস ও ঐতিহ্যের নিরিখে। আর তা উপমায় ব্যবহারের মাধ্যমে তিনি আরো বেশি করে ইন্দ্রিয়বোধের কবি হয়ে উঠেছেন। জীবনানন্দ দাশের বনলতা সেন-এ যেভাবে ইতিহাস, ঐতিহ্যের ব্যবহার হয়েছে ‘পথ বেঁধে দিলো বন্ধনহীন গ্রন্থি’ও ঐ পথেই সৃষ্টি। তবে ‘পথ বেঁধে দিলো বন্ধনহীন গ্রন্থি’ সৃষ্টি হয়েছে একটি লক্ষ্যকে সামনে রেখে; বনলতা সেন সেভাবে হয় নি। আমিনুল ইসলাম শুরুতেই পণ করেছিলেন, প্রেমের তুলিতে বাংলাদেশের গৌরবগাথা আঁকবেন। আর আমিনুল ইসলাম যেহেতু বরেন্দ্রভূমির সন্তান, তাই তার তুলিতে বরেন্দ্রভূমির ছবিই বারবার আসা স্বাভাবিক। তাছাড়া প্রাচীন সভ্যতার যাকিছু নিয়ে আজ আমরা গর্ব করি তার বেশিরভাগই বাংলাদেশের এই অংশে অবস্থিত। যার ফলেই হয়তো সম্ভব হয়েছে এমন সার্থক ফসল ফলানো। তিনি এই কবিতায় পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার নিয়ে যখন কথা বলেছেন, তখন তা শেকড়সন্ধানী গভীরতায় এবং সাফল্যের সোনালি ব্যঞ্জনায় আকাশচুম্বী মহিমা ধারণ করেছে। পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার ছিল একটি বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়। অতীশ দীপঙ্করের মতো বিশ্বখ্যাত পন্ডিত এখানে শিক্ষকতা করেছেন। অতঃপর জ্ঞানের মশাল নিয়ে তিনি পাড়ি দিয়েছেন সুদূরের চীনদেশ। আজ বাংলাদেশ থেকে আমরা জ্ঞান আহরণে ইউরোপ আমেরিকা যাই। আর দেড়হাজার বছর আগে যখন ইউরোপ ছিল অজ্ঞানতার অন্ধকারে, আমেরিকা আবিস্কৃতই হয়নি, তখন এদেশেই গড়ে উঠেছিল বিশ্ববিদ্যালয় এবং জন্মগ্রহণ করেছিলেন বিশ্ববিখ্যাত একাধিক পন্ডিত। ঐতিহ্য-সন্ধানী কবি আমিনুল ইসলাম সেই সোনালি দিনের কথা শুধু স্মরণ করিয়েই দেননি, সেই গৌরবের ইতিহাসকে বাঙালি জাতির জাতিসত্তার সাথে একাকার করে তুলেছেন ইতিহাস, ঐতিহ্য, কিংবদন্তী, প্রেম এবং বর্তমানের সাথে অতীতকে একাকার রঙে রঞ্জিত করে। তিনি জাতির স্মৃতির দরোজায় নক করে তাদের পায়ের নিচের সোনালি মাটির দিকে দৃষ্টি দিতে বলেছেন। এটা অতীতচারিতা নয়, আত্মপরিচয় সম্পর্কে আগাগোড়া সচেতন হওয়া।

কথায় কথায় আমরা এসে গেছি পাহাড়পুর। পাহাড় নেই,
পর্বত নেই; আছে শুধু পাহাড়সমান অতীতের সোনালি গৌরব।
এখানে এলে ঘাড় হতে নেমে যায় বোঝা; যখন দিনের আসনে
অন্ধকারের পা, তখন এখানেই জ্বলে উঠেছিল নাক্ষত্রিক দীপের
মশাল; বাতিওয়ালার দল সেই মশাল হাতে পাড়ি দিয়েছিল
অসীমিত জল—বক্ষে নিয়ে উর্বরতার উপাদান যেভাবে মেঘমালা
ছুটে যায় দেশ-দেশান্তর। সে আলোয় উদ্ভাসিত তারা; অথচ
আমাদের চোখে আজ আঁধারের গুঁড়ো ছিটোয় উত্তরের হাওয়া
এবং আপনাবিস্মৃতি!

[ পথ বেঁধে দিল বন্ধনহীনগন্থি/ পথ বেঁধে দিল বন্ধনহীন গ্রন্থি ]

শব্দ নয়, যেন একের পর এক গৌরবগাথা সাজিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে কাব্যপিরামিড। উপমা মজবুত, কংক্রিট অথচ সবার খুব কাছের; ওজনে হার মানায় অথচ জগদ্দল নয়। উপমার তোরণ দিয়ে, উপমার গালিচা টপকে আবার উপমা সজ্জিত বাহনেই কবি পথিকরূপ পাঠককে তার কাঙ্খিত লক্ষে যেতে প্রলুব্ধ করেন। আর তখনই টুপ করে বলে ফেলেন কবির আসল কথা। মোটকথা, কবির বলাটা পোক্ত তথা যোগ্য আসনদান বা বিশ্বাসযোগ্য করবার লক্ষ্যেই এই আয়োজন। পাঠককে থামিয়ে দেন কবি, এতক্ষণ কী দেখলেন বা কী শুনলেন এবং কেন, এর তালাশে। বাংলা সাহিত্যের কিংবদন্তীতুল্য কবিতাগুলোর সমগোত্রীয় ‘পথ বেঁধে দিলো বন্ধনহীন গ্রন্থি’ বলার আর একটি কারণ হল, আমিত্ববোধ। তবে এই আমিত্ব নজরুলের ‘বিদ্রোহী’র আমিত্ব নয়। এ আমিত্ববোধ বাংলা, বাংলাদেশ, আর বাঙালির আমিত্ববোধ। আমাদের এই জনপদ কেন গৌরবের, কেন আমার এত অহংকার এ পদে জন্মগ্রহণ করে, তারই বিজয়গাথা এই কবিতা। পুরো বাংলাদেশের পুঞ্জিভূত গৌরব এর আগে একই কবিতার ফ্রেমে কেউ আনেননি। হয়তো সাহস করেননি। আমিনুল ইসলাম সেই অর্থে শুধু সাহসী নন, দুঃসাহসীও বটে। সার্থকও। যেখানে বিভিন্ন কাব্যিক অনুষঙ্গে এসেছে ইতিহাস, ঐতিহ্য, প্রত্নতত্ত্ব। যা নিয়ে আমাদের অহংকার, এ ভূখন্ডের বাসিন্দা বলে। আসলে তিনি প্রাচীন সভ্যতার কেন্দ্র মহাস্থানগড়, ময়নামতি, পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার, উয়ারি-বটেশ্বরও নিয়ে যে কাব্যিক সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন, তা বাঙালি জাতিকে তার শেকড়ের কাছে নিয়ে যেতে উদ্বুদ্ধ করে , প্রাণিত করে। ইউরোপ যখন অন্ধকারে তখন আমাদের বর্তমান নওগাঁ জেলার বদলগাছিতে গড়ে উঠেছিল সোমপুর বিহার নামক বিশ্ববিদ্যালয়। তখন আমাদের কুমিল্লার ময়নামতিতে গড়ে উঠেছিল বিভিন্ন নামের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়। ময়নামতিতে পাওয়া গেছে নানাবিধ ধাতব মুদ্রা এবং স্বর্ণরৌপ্যের অলংকার। সম্প্রতি নরসিংদীর উয়ারি-বটেশ্বর নামক স্থানে নামহারা প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন আবিস্কৃত হয়েছে তা দেখে নিশ্চিত হওয়া যায় যে বাঙালির ইতিহাস শুধুমাত্র এক হাজার বছরের ইতিহাস নয়। তার ইতিহাস অনেক অনেক বেশি পুরোনো। শুধু চাঁদ সওদাগরের কিংবদন্তী নয়, পুন্ড্রবর্ধন, উয়ারি বটেশ্বর , ময়নামতি এসব স্থান একসময় ছিল আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকেন্দ্র। পার্শ্ববর্তী থাইলান্ডসহ সুদূর রোম পর্যন্ত যাতায়াত করতো বাণিজ্যজাহাজ।

দ্যাখো-আমরা পার হয়ে এসেছি যমুনা; পা ঠেকেছে প্রাচীন
এক নগরীর ধ্বংসাবশেষে। মাটি খুঁড়ে তোলা কোনো নামহারা
সভ্যতার ধূসর কঙ্কাল; এই লোহা, এই ব্রোঞ্জ-এই যে পাথর—
এসবই সে-যুগের জ্ঞানের ফসল: বিস্তারিত নদী ছিল—সমুদ্রও
সুদূরে ছিল না। অনেক বছর আগে এ শহর ছিল প্রেম ও প্রাণের
ঠিকানা; কিছুটা পিছিয়ে হয়তবা তারা ছিল প্রস্তরযুগের মেধা;
সত্য তবু— শুধুই শিকারি নয়- সওদাগর ছিল তারা আর ছিল
মৃত্তিকার ব্যবহারে দক্ষ কারিগর। চোখ বুঁজে দ্যাখো— শহরের
কোলঘেঁষা বিস্তীর্ণ বন্দরে শরতের সোনালি প্রভাতে নোঙর
করেছে কত বিদেশি জাহাজ; মাল নিয়ে আবার দিয়েছে পাড়ি
সুদূরের রোমান সাম্রাজ্য কিংবা স্বল্পদূরে শ্যামদেশ; রাতের
তারারা দিনের সিগন্যাল হয়ে হেসেছে আকাশে। এ যুগের
বিশ্ববাণিজ্য তবে অভিনব নয়—যেমন নতুন নই আমি-তুমি
অথবা সুমনা।

[ পথ বেঁধে দিল বন্ধনহীন গ্রন্থি / পথ বেঁধে দিল বন্ধনহীন গ্রন্থি ]

‘এযুগের বিশ্ববাণিজ্য তবে অভিনব নয়যেমন নতুন নই আমি-তুমি অথবা সুমনা।’এই কথাগুলো বর্তমানের উপযোগী করে ইতিহাসের পুনর্নির্মাণে আমিনুল ইসলামের দক্ষতাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে। তিনি বাঙালি জাতিকে এবং সেই সাথে বিশ্বাবাসীর চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে চেয়েছেন যে, আজকের বিশ্ববাণিজ্যে বাঙালি জাতি ইউরোপ-আমেরকিার তুলনায় পিছিয়ে থাকলেও সুদূর অতীতে সে-ই বিশ্ববাণিজ্যে নেতৃত্ব দিয়েছিল। এভাবেই তিনি বর্তমান বাঙালি জাতির পায়ের নিচে সহস্র বছরের সমৃদ্ধ ভূমি রচে দিতে চেয়েছেন। এটি কেবল ইতিহাসচর্চা নয়, এ হচ্ছে ইতিহাসের আড়ত থেকে গৌরবের ইট-সিমেন্ট-চুন-সুরকি দিয়ে বর্তমানের সুদৃশ্য ও মজবুত অট্টালিকা নির্মাণ এবং তার দেয়ালগুলো কিংবদন্তী-লোককাহিনী-সত্য ঘটনার হীরা-জহরত-চুনি-পান্না অলংকৃতকরণ। এর ভিত্তি যেমন মজবুত, এর চেহারাও তেমনি নয়নাভিরাম। এভাবে তিনি একদিকে বাঙালিকে তার গৌরবের বিষয়গুলো সনাক্তকরণে অনুপ্রাণিত করেছেন, অন্যদিকে নিজের কাব্যসাধনাকে সোনালি সাফল্যে উন্নীত করেছেন। তিনি বাঙালি জাতির উপনিবেশিক ভুল শিক্ষা থেকে অর্জিত মানসিক হীনমন্যতাকে দূর করে তোলার প্রয়াস পেয়েছেন।। এভাবেই তিনি বাঙালি জাতিকে উপনিবেশিত মনের কারাগার থেকে মুক্ত করে নিজের সুবর্ণভূমিতে দাঁড় করানোর প্রয়াস পেয়েছেন। কোনো কূপমণ্ডূকতা নয়, কোনো সংকীর্ণ জাতীয়তাবোধ নয়, কোনো বিশেষ ধর্মীয় প্রচারণা নয়, তিনি ইতিহাসের বিশাল আয়নায় জাতিকে তার স্বরূপ দেখে নিতে অনুপ্রাণিত করেছেন যাতে করে সে যথার্থ আত্মাভিজ্ঞানে ঋদ্ধ হয়ে ওঠে, তার সামনের পথচলা দিশা না হারায়। সে যেন নতুন করে নয়া-উপনিবশেবাদের দ্বারা বিভ্রান্ত না হয়। এই আত্মাভিজ্ঞান জাতি হিসেবে তাকে আত্মবিশ্বাসী, আত্মমর্যাদাশীল, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন এবং আত্মশক্তিতে বলীয়ান করে তুলবে।


আরও পড়ুন : আমিনুল ইসলামের কবিতায় ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং উত্তর-উপনিবেশবাদ : প্রথম পর্ব


তবে আমিনুল ইসলামের মৌলিকত্ব এবং শ্রেষ্ঠত্ব এখানে যে তিনি লক্ষ বছরের বাংলার প্রাণের সুরটি তার কবিতায় ধারণ করেছেন সফলভাবে এবং শিল্পিত মাত্রায়। ভারত উপমহাদেশ বা বাংলা কিংবা বৃহত্তর বরেন্দ্র ভূখন্ড অতীতে নানারকম দুর্যোগ এবং হুমকির সম্মুখীন হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ তথা সাইক্লোন, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, মহামারী, দুর্ভিক্ষ, বহিঃশত্রুর আক্রমণ তার ইতিহাস জুড়ে রচে আছে নানা কালো অধ্যায়। কিন্তু বাঙালি শেষ পর্যন্ত টিকিয়ে রেখেছে তার নৃতাত্ত্বিক এবং ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব। সাময়িক পরাজয় কাটিয়ে সে স্বস্থানে থিতু হয়ে উঠেছে। কালের পরিবর্তনে সদানীরা নদীর নাম হয়েছে করতোয়া, পুন্ড্রবর্ধন হয়েছে মহাস্থানগড় বা বগুড়া, গৌড় হয়েছে মালদহ বা অন্যকিছু, সোমপুর হয়েছে বদলগাছি বা পাহাড়পুর কিন্তু বাঙালি রয়ে গেছে বাঙালি। বাঙালি আজীবন অতিথিপরায়ণ। শত্রুকেও সে বঞ্চিত করেনি তার আতিথেয়তা থেকে। আমিনুল ইসলাম যেন পেছনের শিক্ষা নিয়েই সামনের সোনালির ভবিষ্যত-গাথা রচতে চান। তিনি বারবার ফিরে গেছেন আপন গৌরবের দিকে। পাল আমলে পালদের পরাজিত করে অনার্য বাঙালি কৈবর্তগণ কর্তৃক বরেন্দ্র অঞ্চলে একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিা করা হয়। ধরা যেতে পারে সেটাই বাঙালির প্রথম রাষ্ট্রক্ষমতায় আরোহণ। রাষ্ট্রটির দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। তবু তা বাঙালির জন্য গৌরবের। নওগাঁ জেলার পত্নীতলায় সেই গৌরবের স্মারক এখনো বিদ্যমান আছে। দিবর দিঘিতে স্থাপিত বিজয়-স্মারকটির নাম দিব্বক স্তম্ভ। আমিনুল ইসলাম সেই ঘটনাকে ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করে ‘বনভোজন’ শিরোনামে যে প্রেমের কবিতা রচেছেন, তাতে করে প্রেমাতিরিক্ত ব্যঞ্জনায় বাঙালির গৌরবের দিন ফ্লাশব্যাক হয়ে ফিরে এসেছে। প্রেমের মহিমা কীর্তন করতে গিয়ে কবি এই ইতিহাসকে উপমা অর্থাৎ কাব্যালংকার হিসেবে সার্থকভাবে ব্যবহার করেছেন। ‘পুঁজির বেদীতে হাসে স্টুয়ার্ট মিল’ এই চিত্রকল্পটি দ্বারা তিনি পাশ্চাত্যের অর্থলিপ্সার বিষয়টিকে তুলে ধরেছেন এবং তার পাশে বসিয়েছেন প্রণয়নিবিড় প্রাচ্যহৃদয়। এভাবে তিনি উত্তর-ঔপনিবেশিক মন নিয়ে প্রাচ্যের শ্রেষ্ঠত্বকে উদ্ভাসিত করে তুলেছেন। এখানে মার খেয়েছে পাশ্চাত্যের সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ এবং অরিয়েন্টালিজম। সুপ্রতিষ্ঠা পেয়েছে উত্তর-উপনিবেশবাদ। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, এই সবকিছুর নান্দনিক সংযোজন কবিতাটিকে গভীর-নিবিড় ব্যঞ্জনায় অনিঃশেষভাবে ঐশ্বর্যমন্ডিত করে তুলেছে। কবিতাটি

কী লাভ বলো বৃত্তের ভূগোল পুষে রেখে উটপাখিপ্রাণ?
তার চেয়ে সেই ভালো— নিয়ে আসো ফ্লাশব্যাক যাযাবর দিন।
পুঁজির বেদীতে হাসে স্টুয়ার্ট মিল; আর অভুক্ত শিশুর
মতো একপাশে পড়ে আছে প্রাচ্য হৃদয়। প্রতিদিন দেখা,
অথচ হইনি আমরা দিগন্তের ছবি। ফিতাবাঁধা সিদ্ধান্তের
মতো আর কতো ঝুলে রবে আমাদের একদফা দাবি?
আমার বক্ষভরা জবাফুল জেনেও সন্ধ্যাবতীর শরীর
নিয়ে তুমিই-বা আর কতদিন থাকবে বসে আঘাটায়?

দ্যাখো আজ সোমপুর বিহারে সবুজ সংকেত হয়ে জমে ওঠে
বনভোজনের দিন! এসো আমরা দু’জনে রচি এ শতকের
গন্ধেশ্বরীর ঘাট। সবুজ আঁচলের সুতোয় এ হাতে বেঁধে
দিলে বনভোজনের রাখি, লজ্জাভাঙা গৌরবের ছাপ
এঁকে দেবো আমিও। ক্ষতি কি বিজয় হলে কৈবর্তশাসন
যদি দিব্বক স্তম্ভ দেখে ভাবী মগজ মানে এদিনের প্রেম!

 [বনভোজন/ শেষ হেমন্তের জোছনা ]

এই কবিতার শেষাংশে প্রেমের ভাষার অবকাঠামোর ওপর ইতিহাস ও ঐতিহ্যের পুনর্নির্মাণ নান্দনিক সৌন্দর্যে উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে। ‘দ্যাখো আজ সোমপুর বিহারে সবুজসঙ্কেত হয়ে জমে ওঠে /বনভোজনের দিন! এসো আমরা দু’জনে রচি এ শতকের/গন্ধেশ্বরীর ঘাট।’ চরণগুলোতে ইতিহাসচেতনা, সময়চেতনা এবং দেশপ্রেম জীবন্ত ব্যঞ্জনায় সোচ্চার হয়ে উঠতে চেয়েছে।

ইতিহাস-ঐতিহ্য-মিথের পুনর্নির্মাণকালে আমিনুল ইসলাম আরেকটি কাজ দক্ষতার সাথে করেছেন, তা হলো বাঙালির প্রেমিক-সত্তার নবায়ন অথবা পুনর্নির্মাণ। বাঙালি তার মূল পেশায় কৃষক তবে হৃদয়গতভাবে আজন্ম প্রেমিক। আমিনুল ইসলাম তার একাধিক কবিতায় বাঙালিজাতির এই প্রণয়ীসত্তাকে উদ্ভাসিত করে তুলেছেন। বাঙালি একদিকে কালসাপে কাটা শরীর নিয়ে হয়ে উঠেছে মৃতুঞ্জয়ী লক্ষ্মীন্দর, তেমনি সাইক্লোন-ঘূর্ণিঝড় আর মহাজোয়ারে নাকানিচুবানি খেতে খেতে হয়ে উঠেছে অকূল গাঙজয়ী পদ্মানদীর মাঝি। সে আজীবন প্রেমিক। তার প্রেমিক সত্তা সর্বজয়ী। তাইতো সকল ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞা, পুরোহিতের অনুশাসন, রাষ্ট্রের জেলজুলুম, আর পরকালের শাস্তির ভয়কে তুচ্ছ করে সে আজীবন ভালোবেসে এসেছে তার সঙ্গীকে। তাই বাঙালির প্রাণের সত্তাটি তার প্রেমিকসত্তা। এই কবির ‘পথ বেঁধে দিল বন্ধনহীন গ্রন্থি’ কাব্যগ্রন্থে আরও বেশকিছু কবিতা রয়েছে যেখানে কবি প্রেমের তুলিতে ছবি আঁকতে ব্যবহার করেছেন ইতিহাসের জমিন। যেমন, তুর্র্কি মেয়ের জন্য, তোমাকে দেখার সাধ, ব্লু মাউন্টেনে দাঁড়িয়ে, পিপাসার জল, লালন সূত্র, সহ আরও কিছু কবিতায়। একটি গ্রন্থে যদি এতগুলো কবিতায় ইতিহাস আর ঐতিহ্যের ব্যবহার সাবলীল ভাবে থাকে, তবে আমিনুল ইসলামকে আর নতুন করে চিনতে হয় না, তিনি কোন জাতের কবি। সারাবিশ্বজুড়ে আজকাল বিলাসিতা আর ভোগবাদের স্রোত। এখন প্রেমানভূতি সেভাবে প্রশংসিত নয়। কিন্তু আমিনুল ইসলাম অনেকটা স্রোতের বিপরীতে অবস্থান নিয়ে বাঙালির প্রেমিকসত্তার পুনর্জাগরণ ঘটাতে প্রয়াস পেয়েছেন এবং এক্ষেত্রে ইতিহাস আর মিথ হয়েছে তাঁর প্রধান কাব্য-অস্ত্র। তিনি তাঁর ‘ভালোবাসার পদাবলি’ নামক কবিতায় ‘লখিন্দর-কায়া’ ‘বেহুলা-দুপুর’ প্রভৃতি সমাসবদ্ধ শব্দ সৃষ্টি করেছেন যা উপমার স্তর পার হয়ে উৎপ্রেক্ষায় উন্নীত হয়েছে। এসকল শব্দ ঐতিহাসিক গভীরতা ও লোকাকহিনীর ব্যঞ্জনা নিয়ে কবিতাকে প্রভূত পরিমাণে সমৃদ্ধ করে তুলেছে।

নদীর শরীরে আজ বাসা বাঁধে জলাশয়-সুখ
প্রেম কি যে অপ্রেম— এ দ্বিধায় পেয়েছে রাজত্ব
ঠোঁট দেখে ভয় হয়— ঠোঁট না কি বেমারের মুখ!
দিন ছোটে, ছোটে রাত,—এই ছোটা অন্ধগলিত্ব।
তবু প্রাণের ঘাঁটি এ আমার লখিন্দর-কায়া
বেহুলা-দুপুর তুমি অক্সিজেনে মেখে ধুপছায়া।

[ ভালোবাসার পদাবলী/ শরতের ট্রেন শ্রাবণের লাগেজ ]

কবি-হৃদয় যেন বারবার আছড়ে মরে সময়ের কাছে, কবির প্রেমিকসত্তা বিভিন্ন ভঙ্গিমায় এঁকে চলেন একই বিষয়ের নানা বৈশিষ্ট্যের বিচিত্র ছবি। বলতে চান শিক্ষা নাও শিক্ষা নাও, আমাদেরই অতীত গৌরব থেকে। আর এই অতীত গৌরবের ঢিবিগুলো যে শুধু বনভোজনের জায়গা নয়, আমোদের নিজেকে হারাবার জায়গা নয়, এখানে নিজেকে শানিত করবারও জায়গা বটে; তাই-ই কবি যেন বারবার বোঝাতে চেয়েছেন আমাদের বেভুলা সত্তাকে। এ যেন কবির এক অমোঘ দায়িত্ব। আসলে আমিনুল ইসলামের কাব্যসমগ্র জুড়ে এই বিষয়গুলোই এসেছে নানাভাবে। যার উদাহরণ দিয়ে প্রবন্ধের সমাপ্তি টানা যাবে না। কখনো তা শুধু ইতিহাস হয়ে, কখনো ঐতিহ্য হিসাবে, আবার কখনো তা প্রেমের আবহে। কবি যেন সুযোগ পেলেই গেয়ে ফেলেন তার উদ্দিষ্ট গান। বলতে গেলে আমিনুল ইসলাম আমাদের ইতিহাসের পাখি, ঐতিহ্যের পাখি, আর এক কথায় আমাদের গৌরবগাথা গাইবার পাখি। এই গৌরবগাথা গাইতে গিয়ে কবি গেয়ে ফেললেন আর এক অমূল্য গাথা। তবে তা প্রেমের তুলিতে। ইতিহাসের পথ ধরে বিজয়সেনের রাজধানীতে প্রেমিকাকে নিয়ে আবার ইতিহাসকেই সাক্ষী রেখে রচনা করলেন অমর কবিতা। এই কবিতার উপমা এতবেশি করে প্রাণজ যে, পাঠক তা উপভোগের সময় শিহরিত না হয়ে পারে না। সার্থক কবি, সার্থক বিজয়নগর। কবি শুরু করেছেন এভাবে

শরতের রোগা সকালটা মাতোয়ারা ঘ্রাণে—কাঁচাধানের সবুজ গন্ধ; তার সঙ্গে দ্রবীভূত
তোমার উষ্ণতার নিকোটিন; দুপাশে সারিবদ্ধ গাছ, ধানখেত, ওপরে সাদা-কালো
আকাশ— ‘মোগলে আজম’-এর দর্শক সবাই, সবার চোখে সেলিমের চোখ, আনারকলি
অধর; সম্রাট আকবর পরাজিত সবখানি পথ— সারাটা সময়। গাড়ির জানালা ফুঁড়ে
তোমার আমার নিঃশ্বাস পদ্মা-যমুনার সম্মিলিত স্রোত হয়ে মিশে যায় ইলামিত্রের
এমবোস স্কেচ আঁকা ভূগোলে। অথচ আমি জড়িয়ে ধরিনি বাহু, চুমু দিইনি ইচ্ছুক
অধরে! আমাকে টানছিলো মঞ্চ; আমাকে টানছিলো সংবর্ধনা; আমাকে টানছিলো সময়!

 [বিজয় সেনের রাজধানী এবং ভালোবাসার রাজকন্যা/ প্রণয়ী নদীর কাছে ]

অতঃপর ইতিহাস-কিংবদন্তীর রাজধানীর ধ্বংসপ্রাপ্ত ভূগোলে উপস্থিতি, নতুন চোখে পুরোনো ভূগোল দর্শন এবং অতীতের সাথে বর্তমানকে মিলিয়ে নেয়া:

আর ততোক্ষণে এবং সেটা অনেক বছর পর, আমরা দুজন বিজয় সেনের রাজধানী—
বিজয়নগরের ধ্বংসাবশেষের ওপর দাঁড়িয়ে; আমাদের পায়ের নিচে গণইতিহাসের
গণকবর, বিচ্ছিন্ন করোটি ও চাপাকান্না; আমাদের মাথার ওপর সন্ধ্যার শামিয়ানা,
আমাদের চারপাশে অন্ধকারের বিশ্বস্ত পাহারা; আমাদের দিকে তাকিয়ে নীরব পদ্মার
জলে ভেজা পুরাতন প্রেম; আমি তোমার বুকের ওঠানামা টের পাচ্ছি, লোনা উত্তেজনা
ছুঁয়ে যাচ্ছে শান্তসাঁঝের পৌরুষ! প্রবল বাতাসের বেগ কিন্তু তা রূপ নিচ্ছে না ঝড়ে!
এমন অবস্থায় আগে হলে আমি তোমাকে শ্রাবণ-ঝড়ের পদ্মা করে তুলেছি; এমন
অবস্থায় আগে হলে তোমাকে ভূকম্পরোধক ভূমিকম্পের বাড়ি করে তুলেছি! অথচ
আজ শুধু সাড়াহীনতা, আজ শুধু নন-পারফরমেন্স যদিও তোমার ঠোঁটের কাছে আমার
ঠোঁট, তোমার বুকের কাছে আমার বুক; আমাদের মনের দেয়ালে অভিন্ন স্মৃতির
সাঁওতালী আল্পনা!

 [ পূর্বোক্ত ]

কবিতাটির উপসংহার আরও তাৎপর্যপূর্ণ যেখানে তিনি অনার্য বাঙালির রাজনৈতিক বিজয়, তার প্রেমিকসত্তার বিজয় এবং সেই বিজয়কে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলনা করে তার মান নির্ণয় করেছেন। কবির ইতিহাসচেতনার সাথে স্বজাত্যবোধ, ভাবনার আন্তর্জাতিকতা এবং দেশপ্রেম একাকার হয়ে অভিনব উপভোগ্যতার স্বাদে নান্দনিকতার পেয়ালায় উপচে উঠতে চেয়েছে।

কিন্তু এইবার কেন এই ব্যতিক্রম? আমি কি তোমার কাছ থেকে সরে এসেছিলাম?
আমাকে কি ডেকে নিয়েছিলো অন্য কোনো প্রেম? ভালোবাসা কি এশিয়ার নদী যে
খুলে দেয় উজানের মুখ নব প্লাবনের আগমনে ও আবেদনে? হয়তোবা এ প্রশ্নেরও
উত্তর আছে। কিন্তু তথ্য অধিকার আইন যাই বলুক, যতই যুক্তি তুলে ধরুক ট্রান্সপারেন্সি
ইন্টারন্যাশনাল, এটা জানার সুযোগ পাবে না অন্য কেউ। শুধু তুমি জেনে রেখো—
ইউরোপের নানা ক্লাবে খেলেও মেসি যেমন আর্জেন্টিনার, আইপিএলে কাউন্টিতে খেলেও
সাকিব যেমন বাংলাদেশের, বিজয় সেনের রাজধানী বিজয়নগরের ধূসর ধংসাবশেষে
দাঁড়িয়ে থাকা হে অনার্য রাজকন্যা, প্রণয়ের পতাকা হাতে আমিও তেমনি তোমার!

[ পূর্বোক্ত ]

বিজয় সেনের রাজধানীকে নিয়ে বাংলা সাহিত্যে এমন কবিতা দ্বিতীয়টি আর আছে কিনা আমার তা জানা নেই। এখানে শুধু বিজয় সেন বা তার রাজধানী মুখ্য নয়, এখানে জড়িয়ে আছে গৌড়চূড়ামণির কবির আত্মমর্যাদার প্রশ্ন। তাইতো তাঁর কবিতা হয়ে উঠেছে এত দরদ-মাখা আর প্রাণময়। এ কবিতা শুধু হয়ে থাকেনি প্রেমের কবিতা, হয়ে উঠেছে একটা অঞ্চলের প্রতিনিধিত্বশীল কবিতা। কবি নিজেও হয়ে উঠেছেন আমাদের অহংকারের প্রতীক। তিনি নিজেকে, নিজের দেশকে, জাতিকে সম্মানিত করবার কবিও বটে।

ইতিহাস ঐতিহ্যের ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমিনুল ইসলাম যতটা দুঃসাহসিক, ততটাই অভিনব। অবশ্য এই দুঃসাহসিক হবার অধিকার তার আছে। কারণ, তিনি দাঁড়িয়ে আছেন বিশ্বাসের ভূমিতে। আর যে বিশ্বাস আত্মগৌরবের রশ্মিতে উজ্জ্বল। এখানে উল্লেখ্য, আমিনুল ইসলামের ইতিহাসচেতনা, ঐতিহ্যবোধ শুধু তার নিজ জন্মভূমির আঙিনায় সীমাবদ্ধ নয়। তিনি গভীরভাবে দেশপ্রেমিক কবি, তবে তিনি আধুনিক উচ্চশিক্ষিত মানুষ হিসেবে ভাবনায় ও মননে আন্তর্জাতিকতাকে ধারণ ও লালন করেন। তার ভাবনায় বা ভালোবাসায় কোনো কূপমন্ডূকতা নেই। তিনি বিশ্বের সাথে যুক্ত হয়েই আপন স্বাতন্ত্র্য প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। তার কবিতায় অষ্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মালেশিয়া, থাইল্যান্ড, ভারত, তুরস্ক, ইউরোপের ভূগোল ও মানুষ স্থান লাভ করেছে আত্মীয়তার ব্যঞ্জনায়। তিনি বিশ্ব-ইতিহাস ও বিশ্ব-ঐতিহ্যকে আত্মীকরণ করে নিয়েছেন।

ইতিহাসের অলিগলি ঘুরে অবশেষে তোমার কাছে পৌঁছেছি সাবিহা,
সেজন্য বিধাতাকে ধন্যবাদ। আষাঢ়ের নদীতে বানডাকার মত যখন
আমার শরীরে যৌবনের কানাকানি শুরু, তখনই আমি তোমার কথা
শুনেছিলাম। তুমি নিশ্চয় ভুলোনি— তোমার গালের একটি কালো তিলের
জন্য সমরখন্দ আর বোখারা বিকিয়ে দিতে চেয়েছিলেন আমারই পূর্বসূরী
হাফিজ। আশ্চর্য যে সেদিন তুমি তাকে পাত্তাই দাওনি।…

[ সাবিহা— তোমার কাছে/ পথ বেঁধে দিল বন্ধনহীন গ্রন্থি ]

যদি প্রশ্ন ওঠে আমিনুল ইসলাম তার ইতিহাস-ঐতিহ্য-মিথ চেতনার ব্যবহারে কতটুকু কব্যিক সফলতা দেখাতে পেরছেন, তবে আমার উত্তর হবে তিনি তা পেরেছেন ঈর্ষণীয় মাত্রায়। তিনি অত্যন্ত সাবলীলভাবে এবং সুপ্রযুক্তভাবে মিথ ও ইতিহাসের উপদানসমূহ ব্যবহার করেছেন। সেকারণে তাঁর কবিতা কোথাও আড়ষ্ঠ হয়ে ওঠেনি কিংবা ঝুলে পড়েনি। নান্দনিক সৌকর্যের সাথে একধরনের স্মার্টনেস বজায় থেকেছে সর্বত্র। তাছাড়া তাঁর কবিতার সবচেয়ে বড়গুণ বিষয়বৈচিত্র্য ও প্রকরণবৈচিত্র্য। কত বিচিত্র বিষয় নিয়ে এবং কত বিচিত্র ভঙিমায় তিনি কবিতা লিখেছেন, তা নিয়ে লিখতে গেলে বিশাল আয়তনের আলাদা আরেকটি রচনা হয়ে যাবে। তাঁর উপস্থাপনাভঙ্গি বৈচিত্র্যপূর্ণ হওয়ায় এক একটি কবিতার স্বাদ এক এক ধরনের। কখনো প্রতীক, কখনো তুলনা, কখনো চিত্রকল্প, কখনো উৎপ্রেক্ষা, কখনো প্রতিতুলনায় ব্যবহৃত হয়েছে মিথ-ইতিহাসের নানাবিধ অনুষঙ্গ। অধিকন্তু, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কবিতায় প্রেমের রস থাকায় সেগুলো সহজেই নিবিড়ভাবে উপভোগ্য হতে পরেছে। তিনি ইতিহাস-ঐতিহ্যকে বিষয় হিসেবে কম ব্যবহার করেছেন, বেশি ব্যবহার করেছেন বিষয়ের অনুষঙ্গ অথবা কাব্যালংকার হিসেবে। এতে করে তাঁর কবিতার গভীরতা, সৌন্দর্য এবং ব্যঞ্জনা বৃদ্ধি পেয়েছে অনেক বেশি। এ পর্যন্ত যেসকল কবিতাংশ উদ্ধৃত হয়েছে, সেগুলো প্রসঙ্গেও একইকথা প্রযোজ্য। তথাপি তাঁর ব্যবহার-কৌশলের প্রমাণস্বরূপ আরও কয়েকটি উদাহরণ দেয়া যায়।

১.
বাঁশির সুরে কান দিয়ে
নাচে
চম্পা ও চামেলী
ঘুঙুরের রুনুঝুনু ছড়িয়ে পড়ে জলে
জল কই?
জল তো দেখি না!
বিলের কিনার ঘেঁষে
বনের কবর ছুঁয়ে
এ বাঁশি চলে গেছে—
যেখানে ঘুমিয়ে আছে
অশোকের ঘোড়া
আরো দূরে—
যেখানে ঘুমিয়ে আছে
প্লাইওসিন দিন।

[ বাঁশি/ শরতের ট্রেন শ্রাবণের লাগেজ ]

এই কাব্যাংশে কোটি বছর আগের প্লাইওসিন দিন যখন সাগরের গর্ভ থেকে উঠে এসেছিল রাঢ়-বরেন্দ্রভূমি, যীশু খ্রীস্টের জন্মের আগের ভারতীয় সম্রাট মহামতি অশোক, রূপকথার বাইজী বা নৃত্যশিল্পী চম্পা-চামেলী প্রভৃতি ঐতিহাসিক ও কিংবদন্তী ভিত্তিক চরিত্র উঠে এসেছে। কবি বাজতে-থাকা বাঁশিটির সাথে সাথে এসবের যোগসূত্র রচনা করেছেন। বাঁশিটি কালের বা মহাকালের বাঁশি। সময়কে চিত্রিতক রতে গিয়ে কবি ইতিহাস-কিংবদন্তীকে চমৎকার চিত্রকল্প হিসেবে ব্যবহার করেছেন।

২.
যে-ব্যথা ইস্তানবুলে রচে আছে গভীর হুজুন
অথবা যে-ব্যথা কাঁদে সোমপুর বিহারের ইঁটে
তেমন কিছু কি আজ ঘ্রাণে পায় পেঁচা বা শকুন?
প্রবল ভূতের কিল— প্রেম খোঁজে বিকৃতির ভিটে।

[ শীত এসে কড়া নাড়ে ধোঁয়া ওঠা হেমন্তের দ্বারে/ শরতের ট্রেন শ্রাবণের লাগেজ ]

এই উদ্ধৃতিটিও অসাধারণ সুন্দর চিত্রকল্প রচনা করেছে। ‘হুজুন’ একটি বিষণ্ন অবস্থার আরবি নাম। কবি ইস্তাম্বুল শহরে মানবচোখের আড়ালে বিরাজিত হুজুন এবং পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারে বিরাজিত বিষাদময়তার মধ্যে সেতু রচনা করেছেন। এই বিরল বিষণ্নতা কেন এবং কীভাবে তার উদ্ভব এই সংক্রান্ত কোনো ইঙ্গিত নেই এখানে। একধরনের রহস্যময়তা আছে। রহস্যময়তা কবিতার প্রাণ। কবি ইতিহাস-মিথ-ঐতিহ্যকে চমৎকারভাবে ব্যবহার করেছেন কবিতায় বিষয় পরিস্ফুটনে এবং কবিতার সৌন্দর্য ও প্রাণ সৃষ্টিতে।

৩.
বিস্মৃত বাঁশের কেল্লা, জলে ভাসে আলাওল নাম
কালের করাত হাসে; বটভায়া, দ্যাখো দফারফা!
সুরের অরিশ ভুলে প্রেমে-ভরা নগরের ধাম
শেরাটনে হয়ে ওঠে কৌটিল্যের গোপন মুনাফা।
পাহাড়পুরের সোনা চূর্ণরেণু কালের ধুলায়
সে-ধুলায় ধুলিচাপা মাঝিহীন গন্ধেশ্বরী-ঘাট
শ্রীজ্ঞানের পাঠশালা উড়ে যায় শিমুলতুলায়
শিক্ষার্থী বিকেল ফেরে বুকে নিয়ে বনসাইপাঠ।

[ মেঘের মিনারে বসে দেখা/ প্রণয়ী নদীর কাছে ]

আলোচ্য কবিতায়াংশে অনেককটি কল্পচিত্র মিলে একত্রে একটি অসাধারণ সুন্দর ও অতুলনীয়ভাবে অর্থসমৃদ্ধ একটি চিত্রকল্প রচনা করেছে। আমাদের গৌরবের ইতিহাস, মিথ, ঐতিহ্যিক বিষয়াবলী হারিয়ে যাচ্ছে অথচ সেসব রক্ষা করা সচেতন ও কার্যকর প্রয়াস নেই। কবি বিষয়চি অপরিসীম দরদ সহকারে এবং অতুলনীয় কাব্যনৈপুণ্যে উপস্থাপন করেছেন। ইতিহাস বিষয়ে অসচেতন এবং ঐতিহ্যবিমুখ হওয়ার কারণে আমাদের নতুন প্রজন্ম স্বদেশ-স্বজাতির প্রকৃত পরিচয় জানতে পারছে না। তারা জ্ঞানের উঠোনে বনসাইয়ের মতো বেড়ে উঠছে। এই বিষয়টি ‘ শ্রীজ্ঞানের পাঠশালা উড়ে যায় শিমুলতুলায় /শিক্ষার্থী বিকেল ফেরে বুকে নিয়ে বনসাইপাঠ।’ এই অসাধারণ সুন্দর চিত্রকল্পের মাধ্যমে উপস্থাপিত হয়েছে। আমিনুল ইসলাম এখানে ইতিহাস-ঐতিহ্যের ব্যবহারে দুর্দান্ত শৈল্পিক দক্ষতা প্রদর্শন করেছেন।

৪.
আমি পাগলায় কান দিয়ে
শুনে নিচ্ছি আলকাপের নাভিশ্বাসের শব্দ
আমি সোমপুর বিহারে বসে
শুনে নিচ্ছি ভিক্ষুদের সমবেত সামগান
আমি চলনবিলে বসে
শুনে নিচ্ছি সওদাগরের প্রণয়ীবধূর গলা
আমি শুনে নিচ্ছি
সবুজ ঢেউয়ে বেজে ওঠা আবদুল আলীমের সুর
আমি দেখে নিচ্ছি
আকাশের আরশিতে পড়া লালন-মনের ছায়া।

[ যাত্রা্/ স্বপ্নের হালখতা ]

এই কবিতাংশে অনেককটি চিত্রকল্প রয়েছে। প্রতিটি চিত্রকল্পই ইতিহাস-কিংবদন্তী-লোককাহিনীর উপকরণে তৈরী হয়েছে। কিন্তু এখানে নির্মাণ কৌশল । একেবারেই আলাদা। কবি নিজেই প্রতিটি চিত্রকল্পের অংশ হয়েছেন। এখানে অভিজ্ঞতা প্রত্যক্ষ হয়ে উঠতে চেয়েছে। একদিকে ইতিহাস-ঐতিহ্যের বিলুপ্তি দশার জন্য কবির বেদনা, অন্যদিকে সেসব আঁকড়ে ধরার নাছোড় বাসনা উভয়বিধ মানসিক অবস্থার ছবি নির্মিত হয়েছে। উপরের উদাহরণগুলো দেখে নিশ্চিকভাবে বলা যায় যে ইতিহাস-কিংবদন্তী-ঐতিহ্যিক উপকরণের কাব্যিক ব্যবহারে আমিনুল ইসলাম প্রশংসনীয় দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। এতে করে একদিকে তার গভীর ঐতিহ্যপ্রীতি এবং অন্যদিকে অসাধারণ কাব্যকুশলতার স্বাক্ষর স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

আসলে আমিনুল ইসলামের জাতীয় সত্তা আর তার কবিতার সত্তা অভিন্ন। জাতীয় সত্তার উপাদানগুলোর মধ্যে অনেকগুলো উপকরণ দেখা যায়। যেমন ঐতিহাসিক, ঐতিহ্যিক, ভৌগোলিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক প্রভৃতি। আমিনুল ইসসলামের কবিতায় এই উপাদানগুলো খুবই আবিষ্ট হয়ে আছে। সেইদিক থেকে বিচার করলে তিনি আমাদের জাতিসত্তার কবিও বটে। তবে জসীমউদদীনকে যে অর্থে বাংলাদেশের জাতিসত্তার কবি বলব, আমিনুল ইসলামকে সেই অর্থে নয়। জসীমউদদীন বাংলাদেশকে এঁকেছেন যেই ক্যানভাসে, আমিনুল ইসলাম তাকে সেই ক্যানভাসে আঁকেননি। তার ক্যানভাসের ব্যবহৃত তুলি আমাদের আত্মগৌরবের তুলি। তাছাড়া কবির কাছে সময় অনন্ত। কারণ কবির ধারণায় নিরঙ্কুশ বর্তমান বলে কিছু নেই। সব বর্তমানই নিরত অতীত হচ্ছে। কবিতার আবেদন যেহেতু চিরন্তন, সুতরাং সে-কারণেই কবিকে ত্রিকালের মধ্যে বাস করতে হয়।৮ আমাদের আলোচ্য কবিও বাস করেছেন সেই ত্রিকাল ধরে আপন বলয়ে। এজরা পাউন্ড লিখেছেন, ‘লন্ডনের মত আর কোনো শহর পৃথিবীতে নেই। লন্ডনে অবস্থান করলে একটি নাগরিক জীবনের অহংকার এবং গর্ব অনুভব করা যায়।’ আমিনুল ইসলামও যেন তাঁর আপন ইতিহাস ঐতিহ্য দিয়ে সরাসরি কিংবা আড়ালে আবডালে বলতে চেয়েছেন, বাংলাদেশের মতো দেশ পৃথিবীতে আর একটিও নেই। এখানে অবস্থান করলে একটি ঐতিহাসিক জীবনের অহংকার এবং গর্ব অনুভব করা যায়।

আমিনুল ইসলাম বিশেষভাবে বাঙালি জাতির এবং বৃহত্তর অর্থে এশিয়াবাসীর মুক্ত কণ্ঠস্বর হয়ে কথা বলেছেন। প্রায় সকল ধর্মের উৎপত্তি স্থল প্রাচ্য, পৃথিবীর অধিকাংশ প্রসিদ্ধ সভ্যতাগুলোই প্রাচ্যের মাটিতে জন্ম ও বিকাশ লাভ করেছিল। অথচ ইউরোপের বুদ্ধিজীবী-পন্ডিতেরা এশিয়ার ইতিহাস-ঐতিহ্য এবং মানুষ ইউরোপের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও মানুষের তুলনায় নিম্নমানসম্পন্ন, এমন অন্যায্য ও দাবি ও ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করে রেখেছেন। বিষয়টি এডওয়ার্ড সাঈদের বিখ্যাত ‘ওরিয়েন্টারিজম’ গ্রন্থে সবিস্তারে এবং বহু উদাহরণসহ আলোচিত হয়েছে।৯ আমিনুল ইসলাম সেই ‘প্রাচ্যবাদ’ খন্ডন করে তার বিপরীতে এশিয়ার ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতি ও মানুষকে উজ্জ্বল আলোয় উপস্থাপন করেছেন তাঁর অসংখ্য কবিতায়। নিবন্ধে এ যাবৎ যে সকল উদ্ধৃতি দেয়া হয়েছে, প্রায় সবগুলোয় সেই অন্যায় ‘প্রাচ্যবাদ’-কে মিথ্যা প্রতিপন্ন করতে চেয়েছে। আরও একটা বিষয় লক্ষণীয়, আমিনুল ইসলাম প্রাচ্যকে উপস্থাপন করেছেন তার সর্বজনীন মহিমায়, অখন্ডিত সত্যে। ধর্ম, ভাষা কিংবা ভূগোলের বিভাজন তাঁর প্রাচ্যপ্রেমকে খন্ডিত করেনি।

ডাকে শোনো ওই নগদের দিন রাত
উৎসাহে তার ঘরছাড়া ইউরোপ
ল্যাটিন প্রাণেও প্রসারিত সেই হাত
যেখানেই পায় ঝোপ বুঝে মারে কোপ।

পৃথিবী ভোলে কি আঁধারের সেই বন—
আলোর আশায় উদ্গ্রীব শত চোখ?
পুবের দু’হাতে ভোরের উদ্বোধন—
সকল দুনিয়া আলোর উৎস হোক।

ভুলিনি এবং ভুলবো না কোনোদিন
যুগ-সূচনার সোনাঝরা সেই বাঁক
আলেয়ার আলো হলে হোক সুরঙিন
আমাদের দিন শপথে শাণিত থাক্।

তোমার দুচোখে সিন্ধুর অববাহিকা
আমার দুচোখে তাজমহলের ছবি
মঞ্চে নগ্ন হোক্ না নায়ক নায়িকা
আড়ালে বিবেক বেহুলাদিনের কবি।

[ শাশ্বতিকী/ প্রণয়ী নদীর কাছে ]

আমিনুল ইসলাম চিন্তভাবনায় অনেক অগ্রগামী মানুষ। তার কবিতায় তার ভাবনার মতো অগ্রগামী। পাঠক সমান্তরালভাবে প্রাগ্রসর হলে তার কবিতার এসকল বিষয় উপলব্ধি করা এবং এসবের স্বাদ আস্বাদন করা সহজ হবে। আমিনুল ইসলাম হয়তো সেই ভাবনা থেকে তার কবিতাসমগ্র এর ভূমিকায় তার ইতিহাস-ঐতিহ্যপ্রীতি বিষয়ের ব্যাখ্যা দিতে চেয়েছেন। কারণ পাঠককে পেছনে ফেলে লেখকের একাকী এগিয়ে যাবার উপায় নেই। তাকেও সঙ্গে করে নিয়ে যেতে হবে। কিন্তু তাই বলে পাঠকের ধীরগতির জন্যে লেখক তার নিজস্বতাকে জলাঞ্জলি দিতে পারেন না। অন্নদাশঙ্কর রায়-এর ভাষায় ‘পাঠক হয়তো প্রস্তত নন, হতে সময় লাগবে। লেখক তা বলে লেখা বন্ধ করে বসে থাকবেন না, পাঠকের মুখ চেয়ে লেখার মান খাটো করতে পারবেন না। সব লেখা সকলের জন্য হলেও সকলে সব লেখার জন্য প্রস্তত নন। যিনি যখন প্রস্তুত হবেন তিনি তখন উপভোগ করবেন। লেখক আপাতত তাঁর সৃষ্টির দায় থেকে মুক্ত হতে চান, যে দায় তাঁকে লেখক হতে বাধ্য করেছে।’ আমিনুল ইসলামকেও যে-দায় কবি হতে বলতে গেলে বাধ্য করেছে, তা হল তাঁর আত্মগৌরব ও তাঁর হাজার হাজার বছরের ইতিহাস। তাঁর কবিতায় যা এসেছে কখনো সরাসরি ইতিহাস বা ঐতিহ্য হিসাবে, কখনো উপমা হিসাবে, আবার কখনো অলংকার হিসাবে। একটি চিত্রশিল্পে বিভিন্ন রঙের আলাদা আলাদা করে কোনোবিশেষতা থাকে না, যার তাৎপর্য থাকে সকল রঙের সামগ্রিকতায়। কিন্তু মজার বিষয় আমিনুল ইসলামের কবিতায় ইতিহাস ঐতিহ্যের ব্যবহার এতটাই স্বচ্ছভাবে হয়েছে যে, যার তাৎপর্য আলাদা আলাদাভাবেও নির্ণীত হতে পারে। পাঠকের এক্ষেত্রেও একটা অতিরিক্ত পাওয়া বলা যেতে পারে। তাই আর বলতে দ্বিধা থাকবার কথা নয় যে, আমিনুল ইসলাম ইতিহাস সচেতন কবি, দেশপ্রেমিক কবি, নিজেকে, নিজের দেশকে, নিজের জাতিকে একটা যোগ্য সম্মানের জায়গায় বসাবার কবি। এত নিবিড়ভাবে যা আগে কেউ ভাবেনি। তবে সবচেয়ে বড় কথাটি এই যে তিনি কবিতায় ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে ব্যবহার করেছেন অত্যন্ত শিল্পিতভাবে ও নান্দনিক সৌকর্যে। ফলে ইতিহাস-ঐতিহ্যের উপকরণগুলোকে তাদের বিষয়গৌরব বাদ দিয়ে যদি শুধু কবিতার সৃজনের উপকরণ ও অলংকার হিসেবেও গ্রহণ করা হয়, সেক্ষেত্রেও সেগুলো সাহিত্যমূল্যে অমূল্য হয়ে থাকবে। আমিনুল ইসলামের ইতিহাসচেতনা ও কাব্যবোধ একই মালায় গাঁথা শৈল্পিক সুচারুতায়।


তথ্যসূত্র:

১. ফকরুল চৌধুরী সম্পাদিত: উপনিবেশবাদ ও উত্তর-ঔপনিবেশিক পাঠ, আগামী প্রকাশনী, ঢাকা: দ্বিতীয় সংস্করণ ২০১১।
২. বুদ্ধদেব বসু: জীবনানন্দ দাশ: বনলতা সেন, কালের পুতুল।
৩. হাসান হাফিজুর রহমান: কবিতার বিষয়বস্তু। আধুনিক কবি ও কবিতা, বাংলা একাডেমি, দ্বিতীয় সংস্করণ, ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৩।
৪. ফয়েজ আলম: এডওয়ার্ড সাঈদ এর অরিয়েন্টালিজম: র্যা মন পাবলিশার্স, ঢাকা। দ্বিতীয় প্রকাশ: ২০০৭।
৫. অন্নদাশঙ্কর রায়: লেখকের দায়িত্ব।
৬. আমিনুল ইসলাম: কবিতাসমগ্র: পরিবর্ধিত সংস্করণ: ২০১৬, অনন্যা, ঢাকা।
৭. আমিনুল ইসলাম: প্রণয়ী নদীর কাছে, লেখাপ্রকাশ, ঢাকা; প্রকাশকাল ২০১৬।

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

জন্ম ২২ নভেম্বর ১৯৭৯, রাজশাহীর তানোর উপজেলার পাড়িশো গ্রামে। পেশা শিক্ষকতা। গল্প ছাড়াও লিখেছেন উপন্যাস, প্রবন্ধ, কিশোর সাহিত্য, কবিতা ও গান। সম্পাদনা করেছেন কয়েকটি ছোটোকাগজ। তিনি বাংলাদেশ বেতারের একজন তালিকাভুক্ত গীতিকার। মঈন শেখের লেখা প্রথম উপন্যাস ‘কুসুমকথা’ ছাপা হয় ভারতের দেশ পত্রিকার শারদীয় সংখ্যায় ২০১৯ সনে (১৪২৬ ব.)। এর পরপর তাঁর নাম অনেকটা আলোচিত হতে থাকে সাহিত্যিক মহলের বিভিন্ন আড্ডায় ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। অল্প সময়ের মধ্যে দেশ-এর ওই শারদীয় সংখ্যা ফুরিয়ে যায় বাংলাদেশের পত্রিকার বিভিন্ন স্টল থেকে। সেই বছরই কলকাতার আন্তর্জাতিক বইমেলা উপলক্ষ্যে ‘কুসুমকথা’ বই আকারে প্রকাশ করে আনন্দ পাবলিশার্স। এই উপন্যাসের জন্য রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বাংলা-উর্দু লিটারারি ফোরামের সাহিত্য পুরস্কার-২০২০’ প্রদান করা হয় মঈন শেখকে।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।