শনিবার, এপ্রিল ২০

আরেক বিকেলে ও অন্যান্য কবিতা : দুর্জয় আশরাফুল ইসলাম

0

আরেক বিকেলে


এই বিকেলে আমার কোনো কবিতা নাই।
কয়েকটা অনাম্নী ফুলের গল্পে—
বৃষ্টির ছাট, পাতা উলটে যাচ্ছে
পাতা ভিজে যাচ্ছে
জানাশোনা আর কোনো ভণিতা নাই।
তোমাকে কিছু দেবার ইচ্ছের ভেতর
অপ্রস্তুতি আর অক্ষমতা ভিড় করলে
বিষণ্ণ গিটারে গান বাজছে দূরে,
আড়াল করা সান্নিধ্যের ছবি
………………….হয়ে উঠছে সন্দিহান রূপকথা
এই বিকেলে খবরের কাগজ ভরে উঠছে
জাহাজ ডুবি আর ক্রমশ শূন্যতায়
তুমি আছো ঠিক
……………..তবুও কোথাও তোমার ছায়া নাই


আম্মার চলে যাওয়া


আম্মার কবরে প্রথম ফুল কবে ফুটবে ভাবি
শরীরের সমস্ত শক্তি শুষে উর্বর হয়ে উঠছে যে মাটি
তার চারদিকে ছড়ানো লতাপাতার ভেতর ফুল
নাম আছে হয়তো-বা, অথবা নেই, আম্মার নামে
যে ফুল হাসি হয়ে ফুটবে সমস্ত যাপন বেদনা
শুয়ে থাকা স্মৃতি, পৃথিবী জন্মের প্রতি। সমস্ত বেদনা
বুকে নিয়ে অমলিন হাসি, চলে যাওয়া আম্মা আমার।


পলায়নপরতা


বস্তুত শিউলি ফুলের নাম আমি হারিয়ে ফেলি
এবং যখন যাই, নিজেকে বলি এরই সন্ধান—
আসলে অন্য মানে, অন্য ব্যতিব্যস্ততা ;

অভিজ্ঞতা আমাকে শিখিয়েছে আড়াল করা
অন্ধকারে কিরকম মেলে ধরতে হয় গান—
পাখির ঠোঁট উন্মাদ হলে, রাস্তা কেন স্তব্ধ হয়

কিভাবে ভুলে যাওয়া শপথে, তোমারই কাছে
সমর্পণ রেখে হয়ে যেতে হয় শান্ত এক নদী
যে জলের তোড় সমুদ্র-সহায়, কেবলই যায়…

আমি যার মুখ দেখি, শূন্যের উপর ভাসমান
কতক আকাঙ্ক্ষায় নিয়ে যেন নিটোল ব্রহ্মাণ্ড,
তাকে আশ্বাস দিই, এবং হই না মুখোমুখি আর

প্রণাম রাখা থাকে, তারই উল্টোপিঠে যে হাত
তারই গন্ধ নিয়ে, দেখি নিজস্ব মৃত্যু আমার—
দেখা হবে তার সাথে, দেখা হওয়া যখন দরকার?


ননী ঠাকুর


ননী ঠাকুরের গল্পও বলা যাক। ধর্মবিশ্বাসী আর ছিলেন কি না
তা তিনি স্বয়ং জানবেন। কিন্তু শাদা ধূতি পরে কুঁজো শরীরে
পাড়া গা ঘুরে যখন তারই ভিটেবাড়িতে প্রতিষ্ঠিত ইশকুলে
যেতেন তখন তাকে ঠাকুর মেনে যে প্রণামগুলো পড়ত সব
যবন সন্তানদের, যাদের বাপদাদারা জানত, ম্যাট্রিকুলেশন
অবধির ননী ঠাকুর, গ্রামের শেষ ব্রাহ্মণ, এমনকি তার ভাগনে
পৈতে শরীরে দীক্ষা নিয়ে টুকটাক এগ্রাম ওগ্রামে পুরোহিতপণা
করে বেড়ালেও, আর কোনো অর্থই বহন করে না ধর্মসূত্রের।

ননী ঠাকুর কোনোদিন রবীন্দ্রনাথ দেখেছিলেন কি না কৌতুহল
কোনোদিন আর না মিটলেও লোকে তাকে দেখে রবীন্দ্রনাথ
সাদৃশ্যে ছবি আঁকতে পারত নিশ্চিত। কিন্তু কে আঁকে, যারা
আঁকতে পারত তাদের সকলেই পাখিটি হয়ে নিরাপদ দেশে।
আর ননী ঠাকুর, ব্রিজ পেরোতে গেলে যার ভেঙে পড়া ভয়—
একা পিতৃভিটেতে, চারদিক শূন্যতার মাঝে, মাটি-হাওয়াকে
আঁকড়ে ধরে, বেঁচে ছিলেন যতদিন, শোলার আটির বিনিময়ে
অবশিষ্ঠ উঠোনটুকু বিশ্বস্ত কারো হাতে সমর্পণ করে।

তার চলে যাওয়ার পরই তাকে মনে পড়ে।
ননী ঠাকুর, প্রতিবেশী থেকে গল্পচরিত হয়ে ওঠেন।


মাকে নিয়ে আরেকটি


সপ্তাহান্ত বলে কিছু আর নেই।
এমনকি ভিটেবাড়ি,
লেবুপাতাগন্ধের উঠোন,
অতি পুকুরে ঘেরা গ্রাম
আকাশে প্রতিফলিত ষড়ঋতু—
সব কিছু দূর অতীতের মতো
যেমনটা আমার মা—
একটি মাটির ঘরে ঢুকে খিল দিয়ে
অদৃশ্য হয়ে গেলে পর
লোকে বলছে তিনি নক্ষত্রদের
পৃথিবীতে পৌঁছে গেছেন।

সপ্তাহান্তে নক্ষত্রদের দেশে
একবারই যাওয়া যায়,
সপ্তাহান্তের হিসেব সেখানে নেই

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

১৯৮৭ সালের ২১ নভেম্বর জন্ম। তিতাসবিধৌত ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সন্তান। প্রকাশিত কবিতাবই : ‘সমুদ্রের ব্যাকরণ’ (২০১৯, বোধি, ঢাকা), ‘বিস্ময়, তুমি বৃষ্টিফুল’ (২০২০, একলব্য, কলকাতা)।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।