শুক্রবার, ডিসেম্বর ৯

ঈশ্বরী পাটুনী

0

মরার উপর খাড়ার ঘায়ের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছিল ঘটনাটা। স্বামী পরিত্যক্ত বলা ভুল হবে, মূলত শ্বশুরবাড়ি পরিত্যক্ত মেয়েটা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার শিকার হয়ে যেদিন তার কাছে এসে কেঁদেকেটে পড়েছিল। তিনি অপ্রস্তুত ধাক্কায় হতবিহবল হয়ে পড়েছিলেন। সেই পড়ন্ত বিকেলে, ছাদে মেলে দেয়া কাপড় সংসারে ছড়িয়ে থাকা সমস্যাগুলোর মতোই গুটিয়ে নিচ্ছিলেন বদরুন্নেছা। একটা নির্ঝঞ্ঝাট দিনশেষ করার স্বস্তি তাকে ঘিরে ঘুরছিল তপ্ত আঁচ হারানো বিকালের বাতাসের মতো।

তখনই দূর থেকে দেখলেন ছোটো মেয়ে লিলি গেটের সামনে অটো থেকে নামছে একা। হাতে ব্যাগ। কিছু দৃশ্যের নিজস্ব ইশারা থাকে, খোলাসা করে বলার দরকার পড়ে না। এই সন্ধ্যা সমাগত বিকেল বিকেল মেয়েকে একা নামতে দেখেই অকল্যাণকর ধাক্কায় বুকটা কেঁপে উঠেছিল বদরুন্নেছার।

লিলি এসে কেঁদে পড়েছিল মায়ের কাছে। বড়ো আপার বাড়ি আর যাবে না সে। কক্ষনো নয়। কারণটা বলতে বলতে হেঁচকি উঠা কান্নার ঢেউয়ের কাছে হেরে যাচ্ছিল সে। এই মেয়েটিকে মুরগির ডিমে ওম দেয়ার মতো উষ্ণতায় আগলে বড়ো করেছেন বদরুন্নেছা। নারী জীবনের অযাচিত ধাক্কাগুলোর সাথে একেবারেই পরিচয় নেই তার।

তিনমেয়ের মধ্যে এই ছোটো মেয়ে লিলিই পায়ের নিচে মাটি শক্ত করার আগেই প্রেম করে পুরাদস্তুর গৃহবধূর জীবন বেছে নিয়েছিল। বাকি দুটোকেই অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করেছেন তিনি, দুটোই স্কুল মাস্টার। মেয়েদের পড়াশোনা, চাকরি এ নিয়ে শশুরবাড়ির কম বাধা অতিক্রম করতে হয়নি বদরুন্নেছার। পড়াশোনা অব্যাহত রাখার চেয়ে বিয়ে দিয়ে দায়িত্ব ঘাড় থেকে ঝেড়েঝুড়ে ফেলার ব্যাপারেই ছিল সংসারের সংখ্যাগরিষ্ঠের আগ্রহ। তৎপরও ছিল সবাই সেই চেষ্টায়। পান-সুপারি-চাতেই সীমাবদ্ধ থাকত না ঘটকের আপ্যায়ন, প্রতিবেলায় ভাতে-মাছে পাতও পড়ত বাড়িতে। বাপ বেঁচে নেই বলে সবাই দায়িত্বে অবহেলার অপবাদ এড়াতে চেয়েছে অধিকতর সচেতনতায়। কতো কিসিমের পাত্র, কাপড়ের মহাজন, ব্রয়লার মুরগির ফার্মের মালিক, দুবাই প্রবাসী। কিন্তু তিনি হাল ছাড়েননি। পড়াশোনা শেষ করিয়ে চাকরি পাওয়ার পরই পাত্রস্থ করেছেন দু’মেয়েকে। এই যুদ্ধ সুলতান সুলেমানের রাজ্য বিস্তারের যুদ্ধের চেয়ে কম কষ্টের নয়। দেবর, ভাসুর, ননদ, শাশুড়ির সাথে অব্যক্ত লড়াই অটোমান সাম্রাজ্যের মহলের চেয়ে কিছু কম নয়। ইদানিং টেলিভিশনের সিরিয়ালটায় নিজেকে মিশিয়ে ফেলে সে অবুঝ কিশোরীর প্রেমের মতো।

ছোটো মেয়েটা প্রেম করে বিয়ে করতে চাইলে বদরুন্নেছা চরম আপত্তি সত্ত্বেও বাধ সাধতে পারেননি। এই মেয়েটার প্রতি জন্ম থেকেই বেহিসাবি পক্ষপাতিত্ব তার, কোনোকিছুতেই বাঁধা দিতে পারেন না। পারেননি। অবশ্যম্ভাবী নিয়তির কাছে পর্যদুস্ত মেয়েটাকে তিনি বড়ো আশা করে বড়ো মেয়ের কাছে পাঠিয়েছিলেন। বয়স তখন ত্রিশের কোঠায়, চাকরি-বাকরি করার সুযোগ নেই, আইন পড়িয়ে আইনপেশায় মেয়েটাকে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন। এ ছাড়া আর কোনো উপায়ও সামনে খোলা ছিল না বদরুন্নেছার। তিনি চোখ বুজলে এই মেয়েকে দেখবে কে? নিজের জীবন দিয়ে বুঝেছেন, অর্থনৈতিক স্বাবলম্বীতা থাকলে মেয়েদের অন্যের মুখাপেক্ষী হওয়ার অসহায়ত্বটা অন্তত থাকে না। তার ক্ষেত্রে যা ঘটেছিল। সব অধিকার থাকা সত্ত্বেও অনাহুতের মতো জীবন। নিজের সংসারে পরবাসী।

নিজের জীবন দিয়ে বুঝেছেন, অর্থনৈতিক স্বাবলম্বীতা থাকলে মেয়েদের অন্যের মুখাপেক্ষী হওয়ার অসহায়ত্বটা অন্তত থাকে না।

জন্ম থেকেই এই মেয়েটা মা ঘেঁষা আর একগুঁয়ে জেদি। একান্নবর্তী পরিবারে দাদি চাচীদের তাচ্ছিল্যের আঁচটা প্রকাশ্য না হলেও অনাকাঙ্ক্ষিত জন্মের ক্ষত মেয়েটা ঠিকই টের পেত। আর তা অস্বীকার করতে চাইত বদমেজাজ এবং একগুঁয়েমির নানা অন্যায় আবদারে। নিজেকে অগুরুত্বপূর্ণ ভাবার হতাশাগুলো অতিক্রম করার জন্য এই পথটাই যেন খুঁজে পেয়েছিল সে।

তৃতীয় মেয়ের জন্মে এই সমাজে কোথায় কোনকালে পরিদের হার টুটে নাচের উৎসবে! সবার আশায় ছাই দিয়ে জন্ম বলেই বোধহয় জন্ম থেকেই মা তাকে আঁকড়ে ধরেছে অন্য সন্তানদের চেয়ে অধিক স্নেহে, সেও বোধকরি বুঝে গেছে মায়ের চেয়ে আপন আর কেউ সংসারে তার নেই। শেষবার যেদিন মুরাদ বাপের বাড়ি নাইওর এর নাম করে নিয়ে এলো, সেদিনও সে নাক ফুলিয়ে মাকে বলেছিল, আম্মা এরা কিন্তু আর আমাকে নেবে না। তুমিও কিন্তু আমারে যাইতে কইবা না। মেয়ের নির্বিকার একগুঁয়ে কথাগুলো সে মুহূর্তে বদরুন্নেছাকে উদ্বিগ্ন করলেও তিনি মেয়েকে তাৎক্ষণিক তা বুঝতে দেননি। মেয়ের বিবেচনাও এর সুদূরপ্রসারী ভোগান্তি পর্যন্ত যায়নি, বরং তার কাছে তখনো নিজের একগুঁয়ে জেদটাই বড়ো।

সেই বিকেলেও প্রথমটায় কিংকর্তব্যবিমূঢ় বোধ করলেও মাসখানেকের মধ্যেই নিজের সাথে বোঝাপড়া শেষ করে ফেললেন বদরুন্নেছা। ফোন করলেন ছোটোজামাই মুরাদকে। বাড়ির সবাইকে ফাঁকি দিয়ে মাঝে মাঝে এমনিতেই আসতো সে। এবারও দেরি করেনি। শাশুড়ির ফোন পেয়ে রাতেই এসে হাজির। বেচারা মুরাদ। মা বোনেদের চাপের সাথে ক্রমাগত লড়াই করে পেরে উঠছিল না। কমতো নয়। বারোটি বছর। প্রথমত পরিবারের অমতে প্রেম করে বিয়ে, তারউপর বারো বছর বাচ্চাকাচ্চা নেই, সব পরিস্থিতির সাথে যুদ্ধ করে ক’দিন আর ধৈর্যের উপর দাঁড়িয়ে প্রেমের জয়ধ্বজা উড়ানো যায়? মুরাদ এসেই শাশুড়ির পায়ে হাত দিয়ে কদমবুসি করে। কী কাঙ্ক্ষিত খবরটাই না দিয়েছেন তিনি! লিলি মা হবে। কতো বছর ধরে সে অপেক্ষা করেছে এমন একটা খবরের জন্য। বদরুন্নেছা মনে মনে ভাবে, সন্তানের মঙ্গলের জন্য কোনো কোনো সত্য মিথ্যার আড়াল দিয়ে ঢেকে ফেললে কোনো অপরাধ হয় না। কতো সাবধানতায় মেয়েকে আগলে রেখেছেন এই কয়টা মাস। ক্ষেপাটে মেয়েটা যেন অতর্কিতে লাগা আগুনের মতো সব ভেস্তে না দিতে পারে। দিনরাত বুঝিয়েছেন।

আজ আর চুলায় হাড়ি চড়াননি বদরুন্নেছা। কোনো কোনোদিন ভাত তরকারি রান্নাকে কোনো কাজই মনে হয় না। তার চেয়েও জরুরি কাজও সামনে হাজির হয়। এমনই জরুরি যে ভাতের জন্য বেঁচে থাকা না বেঁচে থাকার জন্য ভাত, দুইয়ের দ্বন্দ্বের সমাধান করতে পারেন না বদরুন্নেছা খাতুন।

ভাত রান্নার চেয়ে বড়ো প্রয়োজন এই মুহূর্তে তার সামনে রসগোল্লা আনা। অভ্যাগতদের মিষ্টিমুখ করানোর জন্য রসগোল্লার বিকল্প নেই। বড়ো মেয়ে জামাই ব্যারিস্টার আবু সাঈদ এখনো এসে পৌঁছায়নি। অথচ খবর পাওয়ার সাথে সাথেই রওয়ানা করেছেন ঢাকা থেকে। স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন আসার পথে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রসমালাই আর ছানামুখী তিনি নিজে কিনে নিয়ে আসবেন। এ দিয়েই মিষ্টিমুখ হবে সবার।

লিলি, তার ছোটোমেয়ের মুখ অবশ্য অন্ধকার। না হাসি না কান্না। না আনন্দ না বেদনা। বদরুন্নেছা আপাতত আজকের দিনটা সামাল দিতে চান। তারপর মেয়ের মুখোমুখি হবেন। সবচেয়ে বড়ো কথা আজ অনেকদিন পর মুরাদের হাসিমুখ দেখছেন তিনি। যেন হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে সে। ভাঙতে যাওয়া সংসারটা টিকে গেল শেষ পর্যন্ত!

পুত্রসন্তান জন্ম নিলে আজান দিতে হয়, এই কথা যেচে বলতে আসে আশেপাশের দশ ঘরের মানুষ। একটু দ্রুতই চলে আসে। বদরুন্নেছা খাতুন যখন ভর দুপুরে ঘরে ঘরে হেঁটে খবর বিলিয়ে আসেন, তখন মাত্র যোহরের আজানের পবিত্র সুর ধুয়ে নিয়েছে চরাচর। ঘরে ঘরে মুসুর ডাল ফোঁড়নের গন্ধ, ভাত ফুটে ওঠার বগবগ তীব্র গুলাগুলির আওয়াজ আর প্রাগৈতিহাসিক কালের মতো দূর থেকে ভেসে আসছে— কিছুদিন মনে মনে শ্যামের পীড়িত রাখ গোপনে…গানের সুর। কই বাজে কে জানে! হয়তো কারো বাসার টিভিতে কিংবা পথ চলতি কোনো যুবকের স্মার্টফোনে।

বদরুন্নেছা খবর বিলিয়ে ঘরে ফিরতে না ফিরতেই পাড়ার বৌ-ঝিরা জুটে যায়। মুরাদকে দ্রুত পাঠায় সে রাধাকৃষ্ণ ভাণ্ডার থেকে মিষ্টি কিনে আনতে। কী লজ্জা, নবজাতক দেখতে মানুষ জমে গেছে গণ্ডায় গণ্ডায়, আর কিনা তখনো মিষ্টিই আনানো হয়নি। বড়ো জামাইয়ের ভরসায় বসে আছে সে।

কিন্তু এ নবজাতককে দেখতে আসার বিশেষ কারণ রয়েছে। বদরুন্নেছার ছোটোমেয়ে লিলি মা হয়েছে বিয়ের বারো বছর, যাকে বলে এক যুগ পর।

এরকম নবজাতক বছর বছর পাড়ার ঘরে ঘরে জন্ম নেয়। এ নিয়ে তেমন হুল্লোড় হয় না। সম্পন্ন কেউ সাধ করে আকিকা করে, কেউ তার আরো কয়েক বছর পর সুন্নতে খৎনা। তাও হাতে গোণা কয়েকটি পরিবার। কিন্তু এ নবজাতককে দেখতে আসার বিশেষ কারণ রয়েছে। বদরুন্নেছার ছোটোমেয়ে লিলি মা হয়েছে বিয়ের বারো বছর, যাকে বলে এক যুগ পর। এই বাচ্চা না হওয়ার কারণে তার শ্বশুরকুলের অবস্থানটাও প্রায় জানাজানি হয়ে গেছে পাড়ায়। এই বাচ্চা নিয়ে পাড়ার বউ-ঝিদের আগ্রহ তাই পদ্মার আগ্রাসী ঢেঊয়ের মতো বাঁধ না মানা।

কথাটা সবার মনে গুড়গুড় বদহজমের মতো ফুটতে থাকলেও সবচেয়ে বয়স্কা নানী আলতা বানু বলেই ফেলে, আঁটকুড়া মেয়েটার এই বয়সে বাচ্চা অইব কেউ ভাবে নাই, খালি মিষ্টিতে পেট ভরবো না, পোলাও মাংস খাওয়ান লাগব। তার কথায় একমত হয় সবাই। সবচে সরল যার অন্তর, রহিমুন্নেছা চাচী মুখে তার তৃপ্তি আর আনন্দ মাখামাখি করে। আল্লা চাইলে কী না পারে!

তাইতো আল্লা চাইলে কী না পারে, হুড়মুড় করে খুলে যায় বদরুন্নেছার স্মৃতির দরজা জানালা। এই মেয়েটার জন্মের পর ভর দুপুরে মাটির হাড়ি ঝুলিয়ে ঘরে ঢুকে বউকে জড়িয়ে ধরেছিলেন মেয়ের বাপ সামাদ আলী মিয়া। বুক ধড়ফড় করছিল বদরুন্নেছার। খবরটা জানালো কে সামাদ মিয়াকে। কাঙ্ক্ষিত আর অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার মিশেলে খবরটা কীভাবে সামাল দেবে বদরুন্নেছার সেই ভারি ভাবনায় যবনিকার পর্দা টেনে দিয়েছিল সামাদ মিয়া, মাইয়া কী সন্তান না? মুখটারে অমন কালা পাতিল বানাইয়া রাখছো ক্যান? বিশাল গন্ধমাদন পর্বত নেমে গিয়েছিল বদরুন্নেছার ঘাড় থেকে।

তৃতীয়বারে মেয়ের জন্মে সামাদ মিয়া এতো খুশি হবে আন্দাজ করেনি বদরুন্নেছা। সেই দুপুরে সামাদ মিয়ার হাতে তালপাতার পাখা ধরিয়ে দিয়ে বদরুন্নেছার আম্মাজান তাকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল রান্নাঘরের দিকে, টিউবওয়েলের ঠান্ডা শীতল জলে গুড় আর লেবুপাতা চিপে শরবত বানাতে বানাতে মেয়েকে শিখিয়ে পড়িয়ে দিয়েছিলেন সাত জনমের ভাগ্যে এমন জামাই মিলে। বেশি বেশি যত্ন-আত্তি করবি জামাইরে। নিজেই তড়িঘড়ি মেয়ের চুলে চিরুনি বুলিয়ে, মুখে মেরিল পাউডার ঘষে পাঠিয়েছিলেন জামাইয়ের সামনে।

সামাদ মিয়া ঘরপালা হাঁসের মাংস দিয়ে ভরাপেট ভাত খেয়ে সন্ধ্যার দিকে বাড়িভর্তি শ্যালক শ্যালিকা আর ভাবিদের নিয়ে মোহন সিনেমা হলে ‘বৌরাণী’ সিনেমা দেখতে নিয়ে গেল। রঙিন পাতলা গোলাপি কাগজে ছাপানো টিকেট হাতে নিয়ে, সবাইকে নেপথালিনের গন্ধমাখা পাটভাঙা পোশাক পরতে দেখে বদরুন্নেছারও খুব ইচ্ছে করছিল সাথে যায়। কিন্তু নবজাতককে রেখে কয়েক ঘন্টার জন্য বেরিয়ে যাওয়ার আবদার কোনো যুক্তিতেই মানানসই হবে না ভেবে চুপচাপই থাকে সে। শখের মাঝে শখতো তার একটাই সিনেমা দেখা। এমনিতেই মেয়ে মানুষের শখ কালেভদ্রে কতো অসম্ভবের ভেজা কাঠখড়ি পুড়িয়ে মেটাতে হয়, তারউপর তৃতীয় মেয়ে জন্মের পর এই শখ পূরণের আব্দার, প্রকাশ করতেও বুকের পাটা লাগে। সেই বুকের পাটা তার মোটেই নেই। মানে মানে শ্বশুরবাড়ি ফিরতে পারলেই এ যাত্রা রক্ষা হয়। শুনেছে শ্বশুরবাড়ির সবাই মহাবিরক্ত এই মেয়ের জন্মে। পরদিন বড়োভাবি রান্নাবাড়া শেষে এক ফুরসতে বৌরাণী বইয়ের কাহিনিটা বলতে শুরু করলে শেষ করার আগেই ফিরে যাবার তাড়া দেয় সামাদ মিয়া আর সন্ধ্যার আগেই তিন মেয়ে সহ বদরুন্নেছাকে নিয়ে নিজের বাড়ি ফিরে।

ফেরার পর যে বাড়ি আসত তার হাতেই রসগোল্লা ধরিয়ে দিত সামাদ মিয়া। খাও খাও, আমার মাইয়া হইছে। গায়ে পড়ে সান্ত্বনা দেয়ার সুযোগ দিত না কাউকে। অতিরিক্ত উচ্ছ্বাস ছিল তার আত্মরক্ষার ঢাল।

কেউ মুখ টিপে হাসত। কেউ বাহ বাহ বেশ বেশ বলে উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে তৃপ্তি ভরে খেয়ে যেত।কেউ মুখের উপর টিপ্পনী কাটত, তিন নম্বর মাইয়া, তায় আবার ঘটা কইরা মিষ্টি খাওয়ান। রাগ করত না সামাদ মিয়া, কেন মিয়া, মাইয়া কি সন্তান না? আল্লায় দেয় নাই? পোলা হওউন যে কথা, মাইয়া হওউন একই কথা। লেখাপড়ার যুগ। পোলা কী কাছে থাইক্যা আমার মতো হাটে দোকানদারি করব? বংশেরবাতি বলে দুয়েকজন মিনমিন করলেও তার কাছে বিশেষ পাত্তা পেত না। ঘরে মা আর ভাইবউদের হুল ফোটানো কথায় ঊল্টা বদরুন্নেছাকে সান্ত্বনা দিতো, মন খারাপ কইরো না। আমি আছি না তোমার! বদরুন্নেছার ভাগ্য! এমন স্বামী বছর না ঘুরতেই একদিন বাজার থেকে ফিরে, শরীরটা কেমন করছে বলেই নাই হয়ে গেল। থাকলে কী মেয়েদের নিয়ে এমন থৈহীন উত্তাল সমুদ্রে পড়ত বদরুন্নেছা!

দুপুরটা শেষ হয়ে পরিপূর্ণ বিকালের ছায়ায় ঢাকা পড়ার আগেই সাঈদ আহমাদ এর গাড়ির হর্ণ বাজে গেটের সামনে। সাঈদ আহমাদ আসা উপলক্ষ্যে ঘরে সাজ সাজ রব পড়ে যায়। এক উৎসবের সাথে যোগ হয় আরেক উৎসব। এই ঘরের বড়ো মেয়ে বিয়ে করেছে সে তাও প্রায় বছর বিশ। ঘর তখন ভাসুর, দেবর জায়েদের ছেলেপুলেতে ভার ভারন্ত। বড়ো জামাই হিসাবে তার খাতিরই ছিল আলাদা। সেই খাতিরে ভাটা পড়েনি। এখনো ঘরে তার আপ্যায়ন নতুন জামাইয়ের মতোই। আসার সময় কাকরাইল বাজারের সেরা বোয়াল কিংবা আইড় মাছ, ব্রকলি, ক্যাপসিকাম, মটরশুঁটি, ফুলকপি, বাঁধাকপি কিংবা গ্রীষ্মের আম কাঁঠাল লিচু নিজের পাজেরো ভরতি করে নিয়ে আসে সে। এসেই আবার বাজারে ছোটে দেশি হাঁস মুরগি আর খাসির সন্ধানে। বিশ বছর ধরেই সাঈদ আহমাদ আসা আর বাড়িতে ঈদ লাগা সমান কথা। তাকে ছাড়া এ পরিবারে ছোটোখাটো কোনো উৎসব আয়োজনের কথাও ভাবে না কেউ।

তার সাথে বড়ো মেয়ের যখন বিয়ে হয় নতুন জামাই নিয়ে সিনেমা হলে যাওয়ার উৎসব তখন রূপ নিয়েছে রাতচুক্তি ভিসি আর ভাড়া আনার উৎসবে। রাখাল বন্ধু, বৌরাণীর জায়গা অনায়াস দখল নিয়েছে ডিস্কো ড্যান্সার, এক দোজে কা লিয়ে। ফ্লাক্স ভরে চা বানিয়ে, বাজার থেকে চানাচুর প্যাকেট এনে সাজিয়ে রেখে ঘুমাতে যেতেন তিনি। এসব হল্লাচিল্লার সিনেমাগুলো কোনোকালেই তাকে আকর্ষণ করেনি। চারপাশ শাড়ি দিয়ে ঘেরা রিক্সায় মায়ের কোলে বসে সিনেমা হলে যাবার স্মৃতিতে ফিরে যেত সে তন্দ্রাচ্ছন্নতায়, যখন পাশের ঘরে উচ্চস্বরে বাজতো, আই আ্যম এ ডিস্কো ড্যান্সার…।

বদরুন্নেছা খাতুন হনুফাকে মোবাইল লাগায়। হনুফা মোবাইল কেনার পর বেশ সুবিধা হয়েছে তার, যখন তখন ফোন করে আনানো যায়। হনুফার হাতের চিতই পিঠা আর শুটকি ভর্তার খ্যাতি পুরা এলাকা জুড়ে। রাজধানীতে ফাইভ স্টার হোটেলে নানান দেশি পদ খেয়ে শ্বশুর বাড়ি এসে এই শীতে চিতই আর সিঁদল ভর্তা সাঈদ আহমাদ খুব শখ করে খায়। তার নাকি মায়ের কথা মনে পড়ে। শীতের সকালে উঠানের কোণে মাটির উনুনে বানাতো তার মা, আর তারা পাঁচ ভাই মাকে ঘিরে বসে খেয়ে যেত দুপুর অবধি, প্রতিবার একই গল্প করত আবু সাঈদ। বদরুন্নেছা ভেতরের আদি সাঈদ আহমাদকে দেখত। শহরে গাড়ি বাড়ি বিত্ত বৈভবের রাঙতা তার ভেতরের গ্রামীণ অকৃত্রিম জীবনের গিনি স্বর্নটা গিলে খেতে পারেনি। মায়ের এসব আহ্লাদী বাণীতে বড়ো মেয়ের ছাই চাপা আগুন ফুলকি ছড়াতো, হ গ্রাইম্যা আর শহরইরা কোনো জায়গার খারাপ দোষই অবশ্য শিখতে ভুল করে নাই। তিনি কারণ বুঝতেন না। এমন সোনার টুকরা ছেলে! মেয়েটা প্রশংসা শুনলেই তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠে কেন! মেয়েকে ধমক দিতেন। পরে অবশ্য রহস্যটা জেনে যাওয়ার পর, তিনি তাকে আর বড়োমেয়েকে ঘাঁটাতেন না, যা বলে চুপ করেই সহ্য করতেন। শেষে যদি মেয়েটা বিগড়ে সংসারটাই ছেড়ে আসে!

হনুফা গ্যাসের আগুনে তড়তড়িয়ে চিতই পিঠার স্তুপ বানায় স্টিলের চারিতে। বদরুন্নেছা উঁকি দিয়ে দেখে লিলি ঘুমাচ্ছে অঘোরে। পাশে বাচ্চাটাও। নিঃশব্দে সরে আসে সে যেন না ঘুম ভাঙে।

সাঈদ আহমেদ একটু বিরক্ত হয়। বিকাল বিকাল সবাইরে আসতে বললেই হতো। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঐতিহ্যবাহী ছানামুখী আর রসমালাই খেয়ে যেতে পারত। ভুলই হয়ে গেছে স্বীকার করে বদরুন্নেছা। দুপুরের ভর রোদে সবাইকে আসতে না বললেও হতো। আসলে খবরটা রাষ্ট্র করে প্রতিষ্ঠিত না করলে শান্তি পাচ্ছিল না বদরুন্নেছা। এতো কেবল একটি মানবশিশুর জন্ম নয়, বরং একটা পরিবারের রক্ষাকবচ।

শেষ হয়ে যাওয়া চিতই পিঠার খালি বাটি সরিয়ে ব্যারিস্টার সাঈদ আহমাদের সামনে চিনি ছাড়া চা এগিয়ে দিতে দিতে বদরুন্নেছা ভাবেন, কেজি কেজি রসমালাই আর ছানামুখী আনলেও বেচারা এর কিছুই ছুঁয়ে দেখতে পারে না। ব্লাড সুগার। কড়া নির্দেশনা ডাক্তারের।

সংসারের সম্মান রাখা, বংশের বাত্তি জ্বালানো, ভবিষ্যত বংশধরদের বেড়ে ওঠায় যেন মানসিক চাপ না পরে, সব দায়ই কেন যে পুত্রবধুদের উপরই চাপে! বড়ো মেয়ে যে কারণে সাঈদ আহমাদের ঘর ছাড়তে পারে না, ছোটো মেয়েকেও গুপ্ত হত্যার পাপ হজম করে রাজ্য দখলের মতো শ্বশুরবাড়ি ফিরে যাবার আয়োজন করতে হয়। সে নিজেও তারই নিশ্চয়তা নিশ্চিত করার সব উপায় অবলম্বন করে। লিলি যেদিন কেঁদেকেটে শেষ পর্যন্ত সাঈদ মিয়ার কীর্তির কথা বলতে পারল সেদিনই বদরুন্নেছার কাছে স্পষ্ট হয়েছিল বড়ো মেয়ের গোমড়া মুখের অন্তর্নিহিত কারণ। লিলিকে রেখে আসার সময় বড়োমেয়ের গোমড়া মুখ দেখে তিনি কী বিরক্তটাই না হয়েছিলেন। ভেবেছিলেন দুই মাস ছোটো বোনটাকে রাখতে পারে না সে! কতো বড়ো ব্যারিস্টার তার মেয়ে জামাই। অভাবের ঘরতো নয়। জামাইয়ের প্রসংশায় বড়ো মেয়ের ফুঁসে ওঠার কারণটাও আবিষ্কার করেছিলেন সেদিনই।

ব্যারিস্টার নিজেই কথাটা পাড়ে। আম্মা ছেলের আকিকা করতে হবে, খরচ যা লাগে আমি দেব। চলেন ছেলের চেহারাটা একবার দেখি। আপনার মেয়েকে একা রেখে আসছি। রাতেই ফিরতে হবে আমাকে।

বদরুন্নেছা চুপিচুপি ঢোকেন লিলির ঘরে, অ মা বড়ো জামাই আইছে, ছেলের মুখখানা একবার দেখতে চায়। শোনামাত্র এবার তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠে লিলি। তুমি তারে খবর দিছো আসার জন্য? ক্যান মা? তোমার কী একটুও হায়া শরম নাই, গলা টিপ্যা মাইরা ফালাবো এই বাচ্চা আমি।

বড়ো মেয়ে ফোন করে কাঁদতে থাকলে, তাকে সান্ত্বনা দিয়েছে, কাক পক্ষীও জানবে না রে মা। এমনকি আবু সাঈদ নিজেও না।

ছি ছি কী কস মা! লিলির মুখে হাত চাপা দেন বদরুন্নেছা। এই মেয়েকে বিশ্বাস নেই। বদরাগ আর একগুঁয়েমিতে পুরো জীবনটাকেই দাবা খেলার গুটি বানিয়েছে সে। হুট করে বিয়ে করেছে, শ্বশুড় বাড়ি আর নেবে না জেনেও দিব্যি মেনে নিয়েছে। কী কষ্ট করেই না অবোধ বালিকার মতো মাথায় হাত বুলিয়ে পার করেছেন নয়টা মাস। পরীক্ষার খাতায় মাথা খাটিয়ে অংকের উত্তর সরল করে মিলানোর পর বুঝি পুরো খাতায় ক্রস দিয়ে দেয় মেয়ে ! বড়ো মেয়ে ফোন করে কাঁদতে থাকলে, তাকে সান্ত্বনা দিয়েছে, কাক পক্ষীও জানবে না রে মা। এমনকি আবু সাঈদ নিজেও না। আতঙ্ক গ্রাস করে তাকে, আর কেউ যেমন তেমন যদি কিছু মুরাদের কানে যায় উপায় আছে! এ ব্যাপারে ঝুঁকি নিতে চান না বদরুন্নেছা খাতুন। মুরাদের মনে যেন কোনোভাবেই কোনো সন্দেহের ফাঁক তৈরি না হয়।

সাঈদ আহমাদকে ছেলের মুখ দেখানোর পরিকল্পনা বাদ দিয়ে মুরাদকে ডাকতে যান বদরুন্নেছা, ও ব্যাটা বড়ো জামাই কইতে ছিল পোলার আকিকার কথা। সে সব খরচ দিতে চায়। মুরাদও লিলির মতোই কঠোর হয়ে দাঁড়ায়। এ ছেলে তার, এ ছেলের বাপ সে? বড়ো জামাই আকিকার খরচ দেবে ক্যান? এই ব্যাটা যদি ফের এমন বলে তো বউ ছেলেকে নিয়ে আর এমুখো হবে না সে। সাফ জানিয়ে দেয় মুরাদ।

দুজনের একইরকম প্রতিক্রিয়ায় বদরুন্নেছা নিজেই সন্দেহের মরীচিকায় হুমড়ি খেয়ে পড়েন। তবে কী তিনিই বোকার মতো লোকুচুরি লোকুচুরি খেলেছেন এতোদিন!

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

গল্পকার, নাট্যকার, মঞ্চাভিনেত্রী, শিক্ষক। বাংলাদেশ তার গল্পের আত্মা জুড়ে থাকে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে আশা, স্বপ্ন, স্বপ্নভঙ্গ, বেদনা ও বৈষম্যকে বিষয় করে তিনি গল্প লেখেন, যা একই সঙ্গে ডকুমেন্টেশন এবং শুধু ডকুমেন্টেশনই নয়, আখ্যান; কথাসাহিত্য। তার গল্পে জীবনের বাঁকবদল স্পষ্ট এবং অন্যদের থেকে আলাদা এক স্বর, যে-স্বর আমাদের আত্মা খমচে ধরে, বেদনাহত করে। সমকালীন বাংলাদেশ তার সমস্ত রকমের ঘা, রক্তপুঁজ নিয়ে উপস্থিত থাকে। ব্যবচ্ছেদের গল্পগুলি (২০১৫), প্রসঙ্গটি বিব্রতকর (২০১৬), গোল (২০১৮), সেলিব্রেটি অন্ধকারের রোশনাই (২০২০), নদীর নাম ভেড়ামোহনা (২০২০) তার উল্লেখযোগ্য প্রকাশিত বই। মঞ্চ তার অদ্বিতীয় সত্ত্বা। গড়েছেন নাট্যদল- জীবন সংকেত নাট্যগোষ্ঠী। মঞ্চায়িত হয়- কমলাবতীর পালা, বিভাজন, জ্যোতি সংহিতা ইত্যাদি নাটক।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।