রবিবার, এপ্রিল ১৪

উইন্টার স্লিপ: শীতঘুমে বন্দি সম্পর্ক ও শ্রেণিবৈরিতা | আরিফ মাহমুদ

0

`উইন্টার স্লিপ’ ছবির ন্যারেটিভ এমনভাবে সাজানো হয়েছে যা কয়েকটি পর্বে ভাগ হয়ে প্রধান চরিত্রদের মুখোমুখি সংলাপের মাধ্যমে এগিয়ে যাবে। সেইসব সংলাপের মাধ্যমে দ্বন্দ্ব তৈরি হবে, দ্বন্দ্ব ভাঙতে আসবে তর্ক, সেই তর্কে একে অপরকে করবে আঘাত, হারাবে নিয়ন্ত্রণ, মুখোশ খুলে পড়বে। এই রকম সংলাপ-নির্ভর ছবিতে দ্বন্দ্ব তৈরি হওয়াটা জরুরি। এই ছবির দ্বন্দ্বগুলো অহংবোধের সাথে আশাহতের, আত্মবিশ্বাসের সাথে আত্ম-সন্দেহের আর ক্ষমতাবানের সাথে ক্ষমতাহীনের।

ছবির মূল চরিত্র ‘আইদিন’, যিনি একসময় থিয়েটারে অভিনয় করতেন, এখন তিনি তুরস্কের অ্যানাটলিয়ায় একটা হোটেলের মালিক। হোটেল ব্যাবসার পাশাপাশি স্থানীয় পত্রিকায় কলাম লেখেন। চারপাশের বিভিন্ন সামাজিক ও নৈতিক সমস্যা তার লেখালেখির বিষয়। তুরস্কের থিয়েটারের ইতিহাস নিয়ে লেখার কথা ভাবছেন যা বই আকারে প্রকাশ করার ইচ্ছা আছে। তিনি এলাকার একজন ধনবান ব্যক্তি এবং নিজেকে দানবীর হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। তার পৈতৃক সম্পত্তি ভাড়ায় দেওয়া আছে। সবমিলে নিজের তৈরি ছোটো রাজ্যে সেই রাজা, অন্তত নিজে তাই ভাবেন।

চারপাশের বিভিন্ন সামাজিক ও নৈতিক সমস্যা তার লেখালেখির বিষয়। তুরস্কের থিয়েটারের ইতিহাস নিয়ে লেখার কথা ভাবছেন যা বই আকারে প্রকাশ করার ইচ্ছা আছে। তিনি এলাকার একজন ধনবান ব্যক্তি এবং নিজেকে দানবীর হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।

তুলনামূলক দৈর্ঘ্যে গুরুত্ব পায় আরও দুটি চরিত্র—আইদিনের ডিভোর্সি বোন ‘নেকলা’ আর তার কমবয়সি স্ত্রী ‘নিহাল’। তিনটি চরিত্রই তাদের চিন্তাভাবনায় পৃথক। যেখানে আইদিন ও তার স্ত্রী যেন প্রত্যেক উপায়েই বিপরীত মেরুর মানুষ। বয়সে, চিন্তায়, ঘরের কোনায়, চিত্রনাট্যের কাঠামোতেও। এমন পরিস্থিতির আবর্তে তাদের সম্পর্ক নানা জটিলতায় ঘুরপাক খেতে থাকে। সম্পর্কের এই শীতল অবস্থানই সিনেমার উপজীব্য।

চরিত্র তিনটির বৈশিষ্ট্যের পর্যায়ক্রমিক বর্ণনা ও তার মাধ্যমে চরিত্রদের ভেতরকার অবস্থান স্পষ্ট হতে থাকা ছবিটায় আগ্রহ আগাগোড়া বজায় রাখে। প্রত্যেক পর্বে একটা সাধারণ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য উঠে আসে। এরা বাস্তবতা থেকে পালাতে চায়। কোন বাস্তবতা? যে বাস্তবতায় তাদের নগ্ন অবস্থান বের হয়ে আসে। কাজেই এই পরিস্থিতি এড়াতে তারা একে অপরকে কোণঠাসা করে নিজেকে জাস্টিফাই করতে চায়, সুরক্ষিত রাখতে চায়। সম্পর্কের মধ্যে থেকেও তারা নিজের দৃষ্টিকোণ দিয়ে অপরকে দেখে যায়। নিজের বিপক্ষে যাওয়া মতামত তারা প্রায় ক্ষেত্রেই মেনে নিতে পারে না কারণ তারা বরাবর স্থির কিছু ধারণা নিয়ে থাকে অথবা নিজের ইচ্ছাকে প্রাধান্য দেয় বলে ওই ধারণাগুলোকে উলটেপালটে দেখে না। যেমন নেকলা মনে করে সে চাইলে তার অবিবেচক স্বামীর সব অন্যায় মেনে নিতে পারত, তাকে আরেকটা সুযোগ দিতে পারত। কিন্তু এই চাওয়ার বৈধতা সে আইদিন বা নিহালের কাছ থেকে আদায় করে নিতে পারে না। যখনই তাকে মুখের ওপর তিতা সত্যটা বলে দেওয়া হয় সে তর্ক থেকে বিদায় নেয়। নিহাল মনে করে আইদিনের মতো মানুষ ভালোমন্দের বিচার করে নিজের তৈরি মতাদর্শে, সেইখানে ভালোমন্দ বিচার হলো কি না মুখ্য থাকে না। তার মতে তাকেই বরং সন্দেহ করা উচিত যে আদর্শের বুলি বেশি আওড়ায়। সে তার যৌবনের সেরা সময়গুলো অপচয় করেছে আইদিনের সাথে বিবাদে জড়িয়ে।

যখনই তাকে মুখের ওপর তিতা সত্যটা বলে দেওয়া হয় সে তর্ক থেকে বিদায় নেয়। নিহাল মনে করে আইদিনের মতো মানুষ ভালোমন্দের বিচার করে নিজের তৈরি মতাদর্শে, সেইখানে ভালোমন্দ বিচার হলো কি না মুখ্য থাকে না। তার মতে তাকেই বরং সন্দেহ করা উচিত যে আদর্শের বুলি বেশি আওড়ায়। সে তার যৌবনের সেরা সময়গুলো অপচয় করেছে আইদিনের সাথে বিবাদে জড়িয়ে।

একদিকে সে আইদিনকে তার দোষ-গুণে গ্রহণ করতে পারে না, আবার তার সঙ্গও ত্যাগ করতে পারে না। কারণ সঙ্গ ত্যাগ করার মতো নিজ পরিচয় নিয়ে স্বচ্ছ ধারণা ও আর্থিক অবস্থান তার ছিল না। আর সেই কারণে তাকে হারাতে হয়েছে নিজের ব্যক্তি স্বাধীনতা। এই দোলাচলে পাওয়া হতাশার জীবনকে সে একটা উদ্দেশ্য দিতে চায় স্থানীয় স্কুলের উন্নয়নে ফান্ড সংগ্রহ করে। সেই কাজ আইদিনের দৃষ্টিতে যেমনই হোক সে চায় তার হস্তক্ষেপ ছাড়া স্বাধীনভাবে করে যেতে। অপরদিকে আইদিন সর্বদা বিবেক ও নৈতিকতা গুণাবলির কথা বলে কিন্তু তার নিজের মধ্যে এই সমস্ত গুণাবলি আছে তা সকলকে বুঝাতে ব্যর্থ হয়। সে অজ্ঞতা শব্দকে এমনভাবে ব্যবহার করে যেন অজ্ঞতার বিপক্ষে লড়ছে কিন্তু সে নিজেই তার চারপাশের সকলের কাছে অজ্ঞ। সে মনে করে নিহালের জীবনের জটিল হিসাব-নিকাশ বিচার করার পরিপক্বতা নেই। নিজের কষ্টার্জিত উপার্জনে সে নিহালকে যে সহজ ও স্বাধীন জীবন দিয়েছে, যা সে নিজে পায়নি অথচ সেটার প্রতি নিহালের কোনো কদর নেই। আদতে সে নিহালের ওপর কর্তৃত্ব চায়। নিহালের ডাকা স্কুল ফান্ডের মিটিংয়ে তার দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হওয়াটা সে সহজভাবে মেনে নেয়নি। সেই মিটিংয়ে সম্পৃক্ত হতে না পেরে তার অহমে আঘাত লাগে। নিজের সেই অহমকে সন্তুষ্ট করতে সে নিহালের অনিচ্ছাতেও তার ফান্ডের কাগজপত্রে হস্তক্ষেপ করে।


Wintersleep

সম্পর্কের মধ্যে থেকেও তারা নিজের দৃষ্টিকোণ দিয়ে অপরকে দেখে যায়


যদি সামগ্রিকভাবে দেখি, ছবিতে ব্যক্তিক দ্বন্দ্বগুলো দেখানোর পাশাপাশি সামাজিক দ্বন্দ্বও বেশ জোরালোভাবে তুলে আনা হয়েছে কিন্তু ওইসব দ্বন্দ্বে স্বস্তি দিতে পরিচালক কোনো সহজ সমাধানে যেতে অনিচ্ছুক। প্রচলিত অর্থে সমাজের শ্রেণি বিশ্লেষণ দেখানো তার আসল উদ্দেশ নয়। অন্ধভাবে কোনো নির্দিষ্ট মতামতের পক্ষে না থেকে, পরিচালক এই সমাজে বিদ্যমান সমস্যাযুক্ত পরিস্থিতিতে গভীর অন্তর্দৃষ্টি দিয়েছেন। তার বিশ্বাস একজন ফিল্মমেকারের কোনোকিছুকে বিস্তৃত দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা উচিত। উনি নিজের সিনেমা দিয়ে দর্শকদের ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করেন, সেটাকে তিনি প্রকৃত সাফল্য মনে করেন। তাদের আত্মায় খোরাক জোগাতে পারলে কিছু ব্যাপারে দর্শক লজ্জিত হতে পারে। তার মতে একজন ফিল্মমেকারের মূলত এ পথেই বেশি কাজ করে যাওয়া উচিত।

গাড়ির কাচ-ভাঙা ঘটনায় আইদিন ও ভাড়াটিয়াদের মধ্যে শ্রেণি বৈষম্যের গভীরভাবে প্রোথিত অবস্থান আমরা দেখতে পাই। শ্রেণি বিভাজন তৈরি করে যে সভ্যতার শুরু সেটা আজ অবধি বর্তমান পুঁজিবাদী সমাজ কাঠামোর মধ্যে আরও প্রকট হয়ে বিদ্যমান। এই বিভাজন সমাজ কাঠামোর সাথে অনেকটা উত্তরাধিকার ব্যবস্থার মতো জড়িত।

গাড়ির কাচ-ভাঙা ঘটনায় আইদিন ও ভাড়াটিয়াদের মধ্যে শ্রেণি বৈষম্যের গভীরভাবে প্রোথিত অবস্থান আমরা দেখতে পাই। শ্রেণি বিভাজন তৈরি করে যে সভ্যতার শুরু সেটা আজ অবধি বর্তমান পুঁজিবাদী সমাজ কাঠামোর মধ্যে আরও প্রকট হয়ে বিদ্যমান। এই বিভাজন সমাজ কাঠামোর সাথে অনেকটা উত্তরাধিকার ব্যবস্থার মতো জড়িত। বিভিন্ন মানদণ্ডে মানুষের মধ্যে যে বিভাজন সেটা মানুষ যুগের পর যুগ জেনে না-জেনে মেনে গেছে। মানুষ নিজেকে যে শ্রেণির বলে মনে করেছে তার আচরণ ও চিন্তা সেই শ্রেণিতেই আবদ্ধ থেকেছে। এই শ্রেণি-বলয়ে আটকে থেকে তাদের উপলব্ধির ধরনও তাই ভিন্ন থেকেছে। এই শ্রেণিবিভক্ত সমাজ কাঠামোর হাজার বছরের ইতিহাস যে সহসা বদলে যাবে না সেই সত্যই পরিচালক জিলানের পর্দায় উঠে আসে। ছবির শুরুতে গাড়ির কাচ ভাঙা ও শেষে টাকা পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা দুইটি মূলত শ্রেণি বিদ্বেষের বহিঃপ্রকাশ। এই বিদ্বেষ এতটাই তীব্র যে এটা ভাড়াটিয়ার ছোট্ট ছেলের মধ্যেও প্রবেশ করেছে, যখন তার চাচা ঘটনার মধ্যস্ততায় তাকে আইদিনের হাতে চুমু খেতে বলে, তখন সেটা এড়াতে সে জেদে অজ্ঞান হয়ে পড়ে। সেই বিদ্বেষের কারণেই বড়ো হয়ে পুলিশ হতে চায় ছোট্ট ‘ইলিয়াস’।


Wintersleep 2

গাড়ির কাচ-ভাঙা ঘটনায় আইদিন ও ভাড়াটিয়াদের মধ্যে শ্রেণি বৈষম্যের গভীরভাবে প্রোথিত অবস্থান দেখা যায়


ছবির এক পর্যায়ে নিহাল আইদিনের অজান্তে তার দেওয়া ওই অনুদান ভাড়াটিয়া ইসমাইলের পরিবারকে দিতে যায়। বিপদগ্রস্ত একটা পরিবারকে এককালীন টাকা দিয়ে তাদের দুর্দশা লাঘব করাই ছিল তার উদ্দেশ্য। কিন্তু তার এই নিরীহ উদ্দেশ্য ‘ইসমাইল’ দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হয়। প্রত্যাখ্যাত হবার পর নিহাল হয়তো বুঝতে পারে আইদিন কোনো পরিপক্বতার কথা বলছিল। এই প্রত্যাখ্যান বা টাকা পুড়িয়ে দেবার মাধ্যমে ইসমাইল তার পরিবারের হারানো সম্মান কেবল রক্ষা করতে চাইছে তা নয়, বরং এই ঘটনার মাধ্যমে নিহাল ও দর্শকদের মনে করিয়ে দেওয়া যে তাদের ঐতিহ্যগত পিতৃতান্ত্রিক আশ্রয়ের বাইরে কোনো ধরনের আধ্যাত্মিক আশ্রয়ের খোঁজ করা উচিত নয়।

এই সমাজ ও তার পরিমণ্ডল থেকে একজন মানুষ নিজেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারে না। মানুষের মনের সহজাত ধর্ম তার চারপাশের ইঙ্গিতে প্রভাবিত হওয়া। বাইরের সাথে ভেতরের মতবিরোধ যেমন অনিবার্য, তেমনি অনিবার্য সেই মতবিরোধে সাড়া দেওয়া। ছবির শুরুতে আইদিনকে মানসিকভাবে সুরক্ষিত করে দেখানো হয়। অন্যান্য চরিত্রগুলোর সাথে মিথস্ক্রিয়ায় আইদিনের চরিত্র আমাদের কাছে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে থাকে। যেমন, নেকলা তর্কের সময় মৃত মা-বাবার কথা মনে করিয়ে দিলে, পরেরদিন আমরা তাকে তাদের কবরে উদাস চেহারায় বসে থাকতে দেখি, তখনই প্রথম তার কঠোরতা থেকে নগ্ন হওয়া টের পাই। কিংবা ওই মোটরসাইক্লিস্ট যে জীবনকে তার পরিকল্পনা থেকে মুক্তি দিয়েছে, জীবনকে এইভাবে দেখতে পারা আইদিনের কাছে একদম অচেনা। আর তাই নিহালের সাথে তর্কের পর, আইদিনের বন্য ঘোড়াকে ছেড়ে দেওয়া তার পূর্বকল্পিত ধারণা থেকে মুক্ত হতে চাওয়াকে ইঙ্গিত করে। এমনকি নেহালের সহকর্মী ‘লেভেন্ট’ যাকে তার অভিজ্ঞতার নিরিখে নৈতিকবান মনে হয়নি। পরবর্তী সময়ে তাকে এক আলাপে পরোক্ষভাবে আইদিনের দানশীলতা ও নৈতিকতাকে কটাক্ষ করতে দেখা যায়। সেই আলাপ থেকে ৬ বছর আগে ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্য করা নিয়ে আইদিনের অবস্থান সম্বন্ধে আমরা জানতে পারি। নিজের অবস্থান ও অভিযোগ খণ্ডাতে আইদিনকে নানা যুক্তিতে আত্মপক্ষ সমর্থন করতে দেখি।

মানুষের মনের সহজাত ধর্ম তার চারপাশের ইঙ্গিতে প্রভাবিত হওয়া। বাইরের সাথে ভেতরের মতবিরোধ যেমন অনিবার্য, তেমনি অনিবার্য সেই মতবিরোধে সাড়া দেওয়া। ছবির শুরুতে আইদিনকে মানসিকভাবে সুরক্ষিত করে দেখানো হয়। অন্যান্য চরিত্রগুলোর সাথে মিথস্ক্রিয়ায় আইদিনের চরিত্র আমাদের কাছে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে থাকে।

পুরো ছবিতে আমরা দেখি আইদিন তার অহংবোধকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। নিজের মন্দ দিক নিয়ে অবগত থেকেও তাৎক্ষণিক আবেগকে খর্ব করতে পারে না। মানুষ যখন নিজেকে সুপিরিয়র বা অপেক্ষাকৃত জ্ঞানী ভাবতে শুরু করে তখন সে ক্রমে বিচারপ্রবণ হয়ে ওঠে। যে লোক কাউকে তার অবস্থান নিয়ে কটাক্ষ করে সেটা সবসময় জেনে-বুঝে করে তা নয়, তার অবচেতন মন এমনভাবে তৈরি থাকে যে শেষপর্যন্ত সে অন্যকে কটাক্ষই করবে। সজ্ঞানে সবসময় করে না বলেই নিজেদের তারা সহজে পরিবর্তন করতে পারে না। কাজেই অন্যজনকে কটাক্ষ করাও থামাতে পারে না। ছবির একপর্যায়ে আইদিন যখন নিহালের কাছে নিজের দোষগুলো নিয়ে জানতে চায়, তখন উভয়ের আলাপ শুনে বোঝা যায় পরস্পরের কাছে অভিযোগ ও জবাবদিহি শুনে তারা অভ্যস্ত। এমন কয়েক আলাপ তাদের মধ্যে বাড়তে থাকা মনের দূরত্ব কমে যাবে না। কত জটিল মানবিক সম্পর্কগুলো। একই আচ্ছাদনের নিচে বসবাস অথচ বোঝাপড়ায় কত অভাব থেকে যায়। আলাপের মধ্যে আইদিন ইস্তানবুলে যাবার কথা বলে। কার্যত সে ইস্তানবুলে যেতেই চায়নি, সেখানে যাবার বাহানায় সে নিহালের সহানুভূতি চেয়েছিল। বিবাহের একঘেয়েমি সত্ত্বেও পরস্পরের থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার অপারগতা আমরা তাদের মধ্যে দেখতে পাই। ছবির শেষপর্যায়ে আইদিন ফিরে আসে বাড়িতে, শীতঘুম ভেঙে ফিরতে চায় নিহালের কাছে। মনোলগের সূত্রপাতে আমরা আইদিনের মানসিক অবস্থা জানতে পারি। তবে কি আইদিনের কাছে একাকী জীবনযাত্রার চেয়ে দ্বন্দ্বদীর্ণ অবস্থাতেও সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা শ্রেয়? মানুষকে কি শেষপর্যন্ত সম্পর্কের কাছেই ফিরতে হয়? নিজেকে অস্বীকার করতে না পারা মানুষ কেন সম্পর্কের, মায়ার বেড়াজাল ছিঁড়তে পারে না? সেই সম্পর্কের মায়াকে ফিরে পেতে তাকে আত্মপীড়নের মধ্যে চলে আসতে হোক, তবু আশ্রয় চাই। আমরা এই অবস্থায় চিন্তিত নিহালকে দেখি, সম্পর্কের কিছু ভার বোধকরি তার কাঁধেও চলে গেল তাতে।


Wintersleep 3

আইদিন ফিরে আসে বাড়িতে, শীতঘুম ভেঙে ফিরতে চায় নিহালের কাছে


তাদের এই দ্বন্দ্ব-সংকট কোনো অবাস্তবতা থেকে তৈরি না। বাস্তবের দৈনন্দিতার ভেতর থেকেই আইদিন ও নিহাল আমাদের জানায় তাদের অন্তর্গত কথা। কিন্তু একটি অবিচ্ছিন্ন সংসারজীবন যাপনের জন্য স্বতন্ত্রভাবে ভালো হওয়ার চেয়ে তারা পরস্পরের কাছে কতটা ভালো সেটা জরুরি হয়ে যায়।

বাস্তবের দৈনন্দিতার ভেতর থেকেই আইদিন ও নিহাল আমাদের জানায় তাদের অন্তর্গত কথা। কিন্তু একটি অবিচ্ছিন্ন সংসারজীবন যাপনের জন্য স্বতন্ত্রভাবে ভালো হওয়ার চেয়ে তারা পরস্পরের কাছে কতটা ভালো সেটা জরুরি হয়ে যায়।

প্রাসঙ্গিকভাবেই এইসব দ্বন্দ্ব লাঘব করার চেষ্টায় কি না পরিচালক আইদিনের বন্ধু ‘সুয়াবি’র মুখ দিয়ে বলিয়ে নেন—

‘কিছু জিনিসের নিয়ন্ত্রণ আমাদের আয়ত্তে থাকে না, তাই তোমাকে নমনীয় হতেই হবে। মানুষকে বেশি বিচার করতে যেও না। কিছু ব্যাপারকে তার মতো করে গ্রহণ করে নাও।’

এই প্রাত্যহিক জীবনচর্যার টানাপোড়েনে মুখোশে আড়াল করা আইদিন ও নিহালের ভেতরটা তাদের সামনে বেরিয়ে আসে। কিন্তু তাতে সম্পর্কের বরফ গলে না। অব্যক্ত যন্ত্রণার আবরণ উন্মোচিত হয়। বাইরে বরফ শীতল পরিবেশ, আর ভেতরে সম্পর্কের বৈরিতা একই থাকে। তারা নিজের যুক্তির কাছে পড়ে থাকে। সেই যুক্তির খণ্ডন তাদের মধ্যকার জটিলতা দূর করে দেয় না। কারণ তারা প্রকৃতপ্রস্তাবে একে অপরের চেয়ে ভিন্ন। সেই ভিন্নতায় থেকেও তারা পরিত্রাণের পথ বেছে নিতে চায়।


● লেখার সময়কাল: নভেম্বর ২০১৮

দোহাই:
১. Interview: Nuri Bilge Ceylan for Winter Sleep—Brogen Hayes, Irish Journal, Movie.ie, November 2014

২. Ceylan’s Winter Sleep: From Ambiguity to Nothingness—Asli Daldal, CINEJ Cinema Journal, 2017

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

জন্ম থেকে বেড়ে ওঠা— সিলেটে। পড়াশোনা শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে, অর্থনীতিতে। চলচ্চিত্রের প্রতি আগ্রহ থেকেই লেখালেখির শুরু। প্রকাশিত বই: ‘সিনে-লয়েড’ (২০১৭, চৈতন্য)।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।