রবিবার, নভেম্বর ২৮

ঋতুপর্ণের সিনেমা : মন ও সম্পর্কের জটিল সমীকরণ

0

মেঘ পিওনের ব্যাগের ভেতর মন খারাপের দিস্তা/মন খারাপ হলে কুয়াশা হয়/ ব্যাকুল হলে তিস্তা।

মেঘ পিওনের মন খারাপের এই গানটি ঋতুপর্ণ তার সপ্তম চলচ্চিত্র ‘তিতলিতে’ অনেকবার ব্যবহার করলেও, ঋতুপর্ণের এই মেঘপিওন তার প্রায় প্রতিটি ছবিতেই মন খারাপের ব্যগ নিয়ে হাজির হয়েছে। ঋতুপর্ণ মনের ঘরের হিসাব কষেছেন সম্পর্কের জটিল সমীকরণের মাধ্যমে। সম্পর্কের জটিলতাগুলোকে বিশ্লেষণ করে তা ভেঙে দিয়ে ধীরে ধীরে তাকে সমীকৃত করেছেন। অবিশ্বাস, সন্দেহভরা মন শেষপর্যন্ত নিখাঁদ ভালোবাসার কাছেই হার মেনেছে। গভীর পর্যবেক্ষণ ও সংবেদনশীল মনে তিনি যেন মনের আকাশের বিচিত্র সব রং ধরার চেষ্টা করেছেন।

ঋতুপর্ণের সিনেমায় যেকোনো সম্পর্কের তৃতীয়জন, সন্দেহ, অবিশ্বাস এই কুয়াশা হয়েই আসে। সম্পর্কের ঘাত-প্রতিঘাতে আবার যখন পরস্পর পরস্পরকে চিনতে পারে তখন কুয়াশা কেটে যায়, মনের আকাশে ছড়ায় রক্তিম আভা। নীল কুয়াশা কেটে গিয়ে স্পষ্ট হয় গোধুলীর লাল রং, যা প্রাকৃতিক নিয়মেই স্বাভাবিক। তাই সিনেমার সম্পর্কগুলো নানা জটিলতার শেষে, ভাঙন শেষে, স্থায়ী সম্পর্কে ফেরার ঈঙ্গিত দিয়ে শেষ হয়।

আমরা স্মরণ করতে পারি ঋতুপর্ণের ষোড়শ চলচ্চিত্র ‘আবহমানের’ শেষ দিকের কিছু দৃশ্যের, যেখানে চলচ্চিত্র পরিচালক অনিকেতের কাছে শেষ বিকেলের আকাশ নীল হয়ে ধরা দেয়, তারপর একসময় নীলচে ধুসর রংও ম্রিয়মাণ হয়ে সন্ধ্যা নামে। শেষ বিকেলের আলোয় আকাশ রক্তিম আভা ছড়িয়ে দেওয়ার কথা থাকলেও কুয়াশায় ঘিরে ধরার কারণে তা নীল হয়ে যায়। অনিকেতের আকাশের এই নীলচে ধুসর রঙের ভাবনা মিশে যায় মনিটরের পর্দায় প্রদর্শিত তার চলচ্চিত্রের নায়িকা শিখার জামার নীলের সাথে, যা ধুসর হয়ে মিলিয়ে যায় নিমিষেই। ঋতুপর্ণের সিনেমায় যেকোনো সম্পর্কের তৃতীয়জন, সন্দেহ, অবিশ্বাস এই কুয়াশা হয়েই আসে। সম্পর্কের ঘাত-প্রতিঘাতে আবার যখন পরস্পর পরস্পরকে চিনতে পারে তখন কুয়াশা কেটে যায়, মনের আকাশে ছড়ায় রক্তিম আভা। নীল কুয়াশা কেটে গিয়ে স্পষ্ট হয় গোধুলীর লাল রং, যা প্রাকৃতিক নিয়মেই স্বাভাবিক। তাই সিনেমার সম্পর্কগুলো নানা জটিলতার শেষে, ভাঙন শেষে, স্থায়ী সম্পর্কে ফেরার ঈঙ্গিত দিয়ে শেষ হয়।



বলছিলাম ‘আবহমানের’ কথা। চলচ্চিত্র পরিচালক অনিকেতের সাথে তার নায়িকা শিখার সম্পর্কের স্ক্যান্ডাল যখন তুঙ্গে, অনিকেতের স্ত্রী পূত্র যখন তার থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, তখন ঋতুপর্ণ ফিরে যান অনিকেতের পরিচালনায় বিনোদিনী সিনেমার শ্যুটিং দৃশ্যে, যেখানে গিরিশ ঘোষ বিনোদিনীর কাছে জানতে চান, তিনি বিনোদিনীর কে হন? বিনোদিনী জানায়, আপনি আমার মাস্টার মশাই, পিতা। তবু গিরিশ ঘোষ সন্তুষ্ট হন না, তাই যখন আবার জানতে চান, তখন বিনোদিনী জানায়, আপনি আমার প্রাণেশ্বর। আমরা এবার ফিরে আসি মূল সিনেমায়, যেখানে বিনোদিনী-গিরিশ ঘোষ যেন ফিরে এলেন শিখা-অনিকেত হয়ে। তাই অনিকেত ও শিখার সম্পর্ককে এত সহজে সরলীকরণ করা যাচ্ছে না। সব সম্পর্ককে খুব সহজেই আইডেন্টিটিফাই করা যায় না। অনিকেতের স্ত্রী ও পুত্রের কাছে শিখা কুয়াশাই থেকে যায়। শিখাকে নিয়ে অনিকেত ও তার স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্কের সফিস্টিকেশন এবং আনসফিস্টিকেশন বিষয়ক কথোপকথনে ঋতুপর্ণের সম্পর্কের ভাবনা দারুণভাবে উঠে এসেছে। শিখাকে নিয়ে দীপ্তি যখন তার বাক্যবানে অনিকেতকে বিদ্ধ করছিলেন, তখন অনিকেতের মনে সম্পর্কের জটিলতা ও জটিলতাহীনতা এক সাথে বজায় রাখার দ্বিধাও নতুন করে ভাবায়। অনিকেতের সেই আকুতি কানে বাজে অবিরাম— ‘যাই চিন্তা কর, যেও না, থেকো’। এই আকুতিতে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার প্রতিই ঋতু তার শ্রদ্ধা দেখান, যা তার আরও কয়েকটি সিনেমায়ও দেখা যায়। পাহাড়ের পাদদেশে অপ্রতিম তার পিতা অনিকেতের পাশে থেকে মনের কাছাকাছি আসে, মনের দ্বন্দ্ব ঘুচে যায়। আবার সিনেমার শেষ দৃশ্যে স্ত্রীর কাছে নিজের ছেলেকে নিয়ে অনিকেতের একটি প্রশ্ন শুনে সম্পর্কের জটিল সমীকরণ মেলানোটা সত্যই খুব কঠিন হয়ে যায়। স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে মৃত্যু পথযাত্রী অনিকেতকে বলতে শোনা যায়, ‘আচ্ছা, অপু কি আমার চেয়ে লম্বা? ’



শুরু করেছিলাম ‘তিতলি’ সিনেমার কথা বলে। ঋতুপর্ণের দ্বিতীয় সিনেমা ‘উনিশে এপ্রিলের’ মা ও মেয়ের সম্পর্কের কিছুটা দ্বন্দ্ব যেন ফিরে আসে ‘তিতলি’ সিনেমায় ভিন্ন প্রেক্ষাপটে। ‘উনিশে এপ্রিলে’ নৃত্যশিল্পী মায়ের (সরোজিনী) সাথে ডাক্তার মেয়ে অদিতির দুরত্ব ঘুচে যায় একটি সুইসাইড নোটের মাধ্যমে— যে দূরত্ব শুরু হয়েছিল অদিতির ছোটোবেলা থেকেই। মায়ের প্রতি জমাট বাঁধা অভিমান, ক্ষোভ ঘুচে যায় উনিশে এপ্রিল ঝড়ের রাতে; যেদিন অদিতির বাবার মৃত্যু দিবস, আবার সেদিন তার মায়ের পুরস্কার অর্জনের খবরও আসে। অদিতি বুঝতে পারে তার ডাক্তার বাবার মনের সাথে তার মা সরোজিনীর শিল্পিত মন, রুচির মিল ছিল না কোনোভাবেই। সেলিব্রেটি সরোজিনীর ক্যারিয়ার নিয়ে একটা হীনমন্যতা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল সরোজিনীর স্বামীর মধ্যে। এই সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল সরোজিনীর কাঁচা বয়সের আবেগ নিয়ে, কিন্তু সরোজিনীর নৃত্যের ক্যারিয়ারের প্রতি তার স্বামীর শ্রদ্ধাবোধ না থাকার কারণে তাদের দাম্পত্য সম্পর্ক রূপ নেয় কেবল এক অভ্যস্ততায়। নারীর সৃষ্টিশীলতা ও সংসার একসময় সাংঘর্ষিক হয়ে উঠে। পরিবারের প্রতিকুল পরিবেশের কারণে যেকোনো একটিকেই বেছে নিতে হয় এবং দুর্ভাগ্যবশত তা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সংসার। সরোজিনীর ক্ষেত্রেও তাই হলো। নাচের পেছনে সময় দেওয়ার কারণে অদিতি তার মাকে সেভাবে কাছে পায়নি, বড়ো হয়ে উঠেছে বুয়ার তত্বাবধানে, স্নেহে। মা-মেয়ের দূরত্ব আরও গভীর হয় যখন সরোজিনীর অনুপস্থিতিতে ছোটো অদিতি তার বাবাকে হারায়। মা ও মেয়ের এই কাছাকাছি না থাকার ব্যাপারে সরোজিনীর ব্যাখ্যাটা ছিল, ভালোবাসা মানেই কি সারাদিন লেপ্টে থাকাকে বোঝায়? উনিশে এপ্রিলের ঝড়ের রাতে মা ও মেয়ের মনের অর্গল ভেঙে দেন ঋতুপর্ণ, দুজনের কথোপকথনে উঠে আসে মন ও সম্পর্কের সমীকরণ এবং তা অবশ্যই পারিবারিক ও সামাজিক সমস্যার আলোকে।


উনিশে এপ্রিল


‘উনিশে এপ্রিলে’ মা ও মেয়ের মানসিক দ্বন্দ্ব যেখানে মায়ের ক্যারিয়ায় ও মেয়ে অদিতির নিঃসঙ্গতার দ্বন্দ্ব থেকে শুরু হয়, সেখানে তিতলিতে মা ও মেয়ের দ্বন্দ্ব শুরু হয় ফিল্ম সুপার স্টার রোহিতকে নিয়ে, যখন তিতলি জানতে পারে তার মনের মানুষ রোহিত হচ্ছে তার মায়ের প্রাক্তন প্রেমিক। সম্পর্কের এই দ্বিঘাত ও ত্রিঘাত সমীকরণ মোটেই সরল নয়। তবু ঋতুপর্ণ স্বাভাবিকতা দিয়েই জটিল সমীকরণকে সমীকৃত করেন। মায়ের প্রেমিক হিসেবে রোহিত আসে নীল পাহাড়ের কুয়াশা হয়ে, শিশির হয়ে ঝরেও পড়ে। মেয়ের মনের ইর্ষা একসময় মিলিয়ে যায় মায়ের ভালোবাসার শক্তিতে। রোহিত পুরনো সম্পর্ককে খুঁচিয়ে আহত করে না, অপমান করে না বরং লালন করে মনের গহীনে; গোপন, অথচ কী গভীর ভালোবাসায়। ‘উনিশে এপ্রিলে’ মা ও মেয়ের মানসিক দুরত্ব ঘুচে যায় এক ঝড়ের রাতে। ‘তিতলীতে’ও মা (ঊর্মি) ও মেয়ে (তিতলি) মুখোমুখি হয় সেই এক ঝড়ের রাত্রিতে, যেখানে ঋতুপর্ণ মা মেয়ের মনের অর্গল ভেঙে দিয়ে সম্পর্কের জটিল সমীকরণ কে সমীকৃত করেন। তিতলি বুঝতে পারে, তার মা তার মনের মাঝেই খুঁজে পেয়েছিলেন রোহিতকে, যাকে হারাতে হয়েছিল সামাজিক অসাম্যের অজুহাতে। ঊর্মির মনের গহীনে রোহিত নীরবেই রয়ে যায়, যা তাদের দাম্পত্য সম্পর্কে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি একেবারেই। তিতলিদের বনপাহাড়ে রোহিতের বাংলো তৈরির ইচ্ছা পোষনের কারণে, মায়ের হারানো সম্পর্কের রিনিউ করা নিয়ে তিতলির মনের যে সন্দেহ তৈরি হয় তা দূর হয়ে যায় সেই ঝড়ের রাতেই, মায়ের সাথে মেয়ের বন্ধুত্ব আবার ফিরে আসে। তাই তিতলি মায়ের কাছে রবিঠাকুরের সঞ্চিতার কবিতাটি শুনতে চায়। ঋতুপর্ণ সিনেমার ইতি টানেন সেই কবিতা পাঠের মাধ্যমে যা খুবই প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠে—

আমরা দু’জন একটি গাঁয়ে থাকি
সে আমাদের একটিমাত্র সুখ।

সম্পর্কের অভ্যস্ততা নিয়ে ঋতুপর্ণের সুনির্দিষ্ট বক্তব্য পাওয়া যায় ‘দহন’ চলচ্চিত্রে যেখানে বৃদ্বাশ্রমে থাকা শ্রবণার আধুনিক মননের ঠাকুরমা ও শ্রবণার কথোপকথনের মাধ্যমে তা স্পষ্ট হয়। শ্রবণার ঠাকুরমা বিএ পাস করতে পারেননি কারণ তার স্বামী চাননি দুজন সমান যোগ্যতার হয়ে যান। তাই নিজের ইচ্ছে বিসর্জন দিয়ে তিনি প্র‍্যাগন্যান্ট হয়ে সবাইকে জানিয়ে দিয়েছিলেন, এই অবস্থায় তার পক্ষে বিএ পরীক্ষা দেওয়া সম্ভব নয়। নিজের স্বামীকে ছোটো হতে দিলেন না। এ প্রসঙ্গে ঠাকুরমার সংলাপটি খুব উল্লেখযোগ্য—

‘প্রথম প্রথম রাগ হয়েছিল, একদিন দেখলাম সেটা আর নেই। জোর করে ক্ষমা করতে হয়নি, ঐ লাইফে হেঁটে, আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে গেল।’

এই যে আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবার সম্পর্কের অভ্যস্ততা, তা তো চলে আসছে যুগের পরে যুগ ধরে। ঠাকুরমার মতো শ্রবণাও আপোশকামী হয়; কারণ সে-ও জেনে গেছে, আস্তে আস্তে সব ঠিক হয়ে যাবে। রাস্তায় বখাটেদের দ্বারা শ্লীলতাহানির পর রমিতা যখন ঘরে স্বামীর দ্বারাও ধর্ষিত হয়, তখনও তাকে এই সম্পর্কের অভ্যস্ততায় সংসার করতে হয়।

এই যে আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবার সম্পর্কের অভ্যস্ততা, তা তো চলে আসছে যুগের পরে যুগ ধরে। ঠাকুরমার মতো শ্রবণাও আপোশকামী হয়; কারণ সে-ও জেনে গেছে, আস্তে আস্তে সব ঠিক হয়ে যাবে। রাস্তায় বখাটেদের দ্বারা শ্লীলতাহানির পর রমিতা যখন ঘরে স্বামীর দ্বারাও ধর্ষিত হয়, তখনও তাকে এই সম্পর্কের অভ্যস্ততায় সংসার করতে হয়। যদিও সিনেমার শেষে প্রতিবাদী স্কুল শিক্ষক শ্রবণার একা একা রাস্তায় নামা, রমিতার দিদিকে লেখা রমিতার একা থাকার চিঠির মাধ্যমে ঐ মেকি সম্পর্ককেই আঘাত করেছেন ঋতুপর্ণ। ঋতুপর্ণের মন ও সম্পর্কের দর্শন প্রকাশ প্রায় শ্রবণাকে উদ্দ্যেশ্যে করে বলা ঠাকুরমার আরও কিছু সংলাপে।

‘ঠিক তোর মনের মতো কাউকে দেখেছিস দিদি? তোর বাবা, মা, ছোটোন, আমি ঠিক তোর মনের মতোন? তুই নিজেই কি তোর মনের মতোন? ’

‘এক সঙ্গে থাকতে গেলে দেখবি আলাদা করে একেকটি মুহূর্ত বলে কিছু নেই। এই হাসি, এই কান্না, এই রাগ, এই দুঃখ, এই প্রবঞ্চনা, এই শটতা, এই ভালোবাসা, এই প্রেম— একটা থেকে একটা আলাদা করতে পারবি না। সব মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। তোর অমনিবাসের মতো।’

এই মানবিক অনুভুতি তুলনা করা হলো একই মলাটের ভেতর কয়েকটি উপন্যাসের সাথে। আলাদা আলাদা উপন্যাসের যেমন আলাদা আলাদা মলাট, আলাদা ঘ্রাণ থাকে, চরিত্র থাকে কিন্তু অমনিবাসে সব যেন এক হয়ে যায়, স্বকীয়তা হারায়, আলাদা কোনো চরিত্র আর থাকে না।

ঠাকুরমার সংলাপে সম্পর্কের অনুভূতির অনন্য এক বিশ্লেষণ করলেন ঋতুপর্ণ।

 

২.
অবিশ্বাস ও সন্দেহের কারণে পিতার সাথে কন্যার দূরত্বের গল্প দেখা যায় ঋতুপর্ণের ‘অসুখ’ সিনেমায়। প্রেমিক অনিরুদ্ধের সমান্তরাল সম্পর্কের কানাঘুষায় ফিল্মস্টার রোহিণীর মন ন্যুজ হয়, সন্দেহক্লিষ্ট মন বিষণ্ণতায় ছেয়ে গিয়ে হতাশায় আবৃত হয়। মায়ের অসুস্থতায় রোহিণীর বিচিত্র মনের সন্দেহের তীর বিদ্ধ হয় নিজের পিতার দিকেও। অসুস্থ মায়ের চিকিৎসায় চিকিৎসক যখন এইডস পরীক্ষার জন্য পরামর্শ দেন, তখন রোহিনীর সন্দেহ তার পিতার দিকেই যায়।

কিন্তু ঋতুপর্ণ এই অবিশ্বাসকে জিইয়ে রেখে সিনেমা শেষ করেন না। এখানেও অবিশ্বাসের কুয়াশা সরিয়ে আমাদের বিশ্বাসের কথা শোনান। তাই এইচআইভি টেস্টের নেগেটিভ রেজাল্ট আসে। ঋতুপর্ণ বাবা মেয়ের দূরত্ব ঘুচিয়ে মেয়েকে ফিরিয়ে দেন বাবার বুকে। অন্ধকারে ভয় পেয়ে, রোহিণীর ভয়ার্ত কন্ঠের ‘বাবা’ ডাকটি নির্ভরশীলতার পরম এক আশ্রয়ের কথাই মনে করিয়ে দেয়।

রোহিণীর পিতা সুধাময় যখন তার স্ত্রীর হাঁটুর উপর ইঞ্জেকশন পুশ করে চেয়ে থাকেন, পর্দার আড়ালে থাকা রোহিণী তা স্বাভাবিক ভাবে নিতে পারে না, কাজের মেয়ের সাথে পিতার কথোপকথনও তার সন্দেহের বাইরে থাকে না। চরম হতাশাগ্রস্ত রোহিণী প্রেসের কাছে প্রকাশ করে মৃত্তিকা ও প্রেমিক অনিরুদ্ধের সম্পর্কের গসিপ, যেখানে সে জানায়, পৃথিবীতে বিশ্বাস বলে কিছু নেই, অনুগত্য বলে কিছু নেই, সমস্তটাই অবিশ্বাস। কিন্তু ঋতুপর্ণ এই অবিশ্বাসকে জিইয়ে রেখে সিনেমা শেষ করেন না। এখানেও অবিশ্বাসের কুয়াশা সরিয়ে আমাদের বিশ্বাসের কথা শোনান। তাই এইচআইভি টেস্টের নেগেটিভ রেজাল্ট আসে। ঋতুপর্ণ বাবা মেয়ের দূরত্ব ঘুচিয়ে মেয়েকে ফিরিয়ে দেন বাবার বুকে। অন্ধকারে ভয় পেয়ে, রোহিণীর ভয়ার্ত কন্ঠের ‘বাবা’ ডাকটি নির্ভরশীলতার পরম এক আশ্রয়ের কথাই মনে করিয়ে দেয়। ঋতুপর্ণ তার ঝরঝরে গল্পের নির্মেদ বুননে আমাদের শোনান বাবা ও মেয়ের ভালোবাসার গল্প, যা অবিশ্বাস ও সন্দেহের বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে আসে পরম মমতায়।

সব চরিত্র কাল্পনিক

মন ও সম্পর্কের জটিল ব্যাখ্যা বিভিন্ন জাদুবাস্তবতা, পরাবাস্তবতায় উঠে আসে ঋতুপর্ণের ‘সব চরিত্র কাল্পনিক’ চলচ্চিত্রে। এখানে ঋতুপর্ণ কোনো সরল গল্প বলেন না। ঋতুপর্ণের আগের ন্যারেটিভ চলচ্চিত্র থেকে তা ভিন্ন হয়ে উঠে বিভিন্ন মাত্রায়। কবিতা ও সিনেমার একান্ত নিজস্ব ভাষা একাকার হয়ে উঠে আসে মনের বহুমাত্রিক গতিধারা ও সম্পর্কের জটিল সমীকরণ। সিনেমার ইমেজের সাথে কবিতার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য একাকার হয়ে তা প্রকাশিত হয় বিভিন্ন জাদুবাস্তবতা ও পরাবাস্তবতায়। রাধিকার স্বপ্ন ও বাস্তবতার মিশেলে তার মৃত স্বামী কবি ইন্দ্রনীল যেন নতুনভাবে উপস্থাপিত হয়। ইন্দ্রনীলের কবিতার কাজরীর মধ্যে রাধিকা নিজেকেই দেখতে পায়। রাধিকার কাছে কাজরীকে তখন আর দূরের কেউ মনে হয় না। কবিতার কাজরী জীবন্ত হয়ে উঠে। রাধিকার সাথে কাজরীর সখ্যতা তুলে ধরা হয় জাদুবাস্তবতায়, কবিতায়। জীবিত ইন্দ্রনীলের মন রাধিকার কাছে অস্পষ্ট থাকলেও মৃত ইন্দ্রনীলের মধ্যে তা সুস্পষ্ট হয়ে যায়। এমনকি তার সহকর্মী অশোকের সাথে নতুন করে ঘর বাঁধার যথেষ্ঠ সম্ভাবনাকেও রাধিকা বাতিল করে দেয়। মৃত্যু মানেই তো সম্পর্কের সমাপ্তি নয়, তাই ইন্দ্রনীলের কবিতা ও তার মনের সাথে নতুন যাত্রা শুরু করে রাধিকা। লেখার শুরুতে বলেছিলাম, ঋতুপর্ণ সম্পর্কের জটিলতাগুলো ভেঙে দিয়ে তা আবার কাছাকাছি নিয়ে আসেন স্বাভাবিকতার মধ্যে। ‘সব চরিত্র কাল্পনিক’ চলচ্চিত্রে তার এই দর্শন আরও জোরালো হয়ে উঠে যেখানে মৃত্যু এসেও রাধিকা ও ইন্দ্রনীলের সম্পর্ককে ভেঙে দিতে পারে না, বরং তা শক্তিশালী হয় নতুন সম্ভাবনায়।

জীবিত ইন্দ্রনীলের মন রাধিকার কাছে অস্পষ্ট থাকলেও মৃত ইন্দ্রনীলের মধ্যে তা সুস্পষ্ট হয়ে যায়। এমনকি তার সহকর্মী অশোকের সাথে নতুন করে ঘর বাঁধার যথেষ্ঠ সম্ভাবনাকেও রাধিকা বাতিল করে দেয়। মৃত্যু মানেই তো সম্পর্কের সমাপ্তি নয়, তাই ইন্দ্রনীলের কবিতা ও তার মনের সাথে নতুন যাত্রা শুরু করে রাধিকা।

‘বাড়িওয়ালি’ চলচ্চিত্রে এক মধ্যবয়সী নারী যিনি সমাজে প্রচলিত কুসংস্কারের কারণে বিয়ে না করেও অকালবৈধব্যকে বরণ করে নিয়েছেন, তার নিঃসঙ্গতা, প্রেম ও অবদমিত যৌন বাসনাকে সুনিবিড় পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। চলচ্চিত্র পরিচালক দীপংকরের সান্নিধ্যে বনলতার মনে প্রেমের পুলক জাগে। তার অবদমিত যৌন বাসনার প্রকাশ কয়েকটি রূপক দৃশ্যের মাঝেও ফুটে উঠে। বনলতার স্বপ্নে কিংবা কল্পনায় দীপংকর তার হাতের স্ক্রু-ড্রাইভার দিয়ে বনলতার হাতের বইয়ের জোড়া লাগানো পৃষ্ঠা খুলে দেন, তখন ঘুমন্ত বনলতার মুখে লাল রক্ত ছিটকে পড়ে, বনলতার চোখে মুখে তৃপ্তির ছাপ। এই দৃশ্যের মাধ্যমে দীপংকর যেন বনলতার বহুদিনের অবদমিত যৌন বাসনার দরজাকেই উন্মুক্ত করে দিলেন। তাই আরেক স্বপ্নদৃশ্যে ঘুমন্ত বনলতার গা থেকে নকশীকাঁথা সরিয়ে নিতে থাকেন দীপংকর। ধীরে ধীরে উন্মুক্ত হয় বনলতার সাদা অন্তর্বাস, আলতা রাঙা পা যা অতিরিক্ত ব্রীড়ায় আড়ষ্ট। বনলতা জানান, এ নকশীকাঁথা তিন পুরুষের তৈরি।


বাড়িওয়ালি

বাড়িওয়ালি সিনেমার দৃশ্যে কিরণ খের, সুদীপ্তা চক্রবর্তী এবং সূর্য চ্যাটার্জি


এ-তো বছরের পর বছর ধরে তৈরি সংস্কারের কাঁথা যা ঢেকে রাখে সমাজ সৃষ্ট বৈধব্যের পবিত্রতাকে। সংস্কার ও সামাজিক মূল্যবোধের নকশীকাঁথায় ঢাকা বনলতার সাদা রঙের অন্তর্বাস তো সেই তথাকথিত পবিত্রতার প্রতীক। দীপংকরের স্পর্শে বনলতা তার আলতারাঙা পাকে আরও বর্ণিল করতে প্রস্তুত। কাজের সুত্রে দীপংকর বনলতার কাছাকাছি এসে বনলতাকে প্রেমের জোয়ারে ভাসিয়ে দিলেন, যদিও তা পুরোপুরি বনলতার পক্ষ থেকে; তবু দীপংকর যখন তার সিনেমার ছোটো একটা দৃশ্যে থেকে বনলতাকে বাদ দিয়ে দিলেন, তখন বনলতার অপমান বাধ ভাঙল। সেই কুয়াশার মতো হঠাৎ আসা দীপংকর মিলিয়ে গেলেন বনলতার জীবন থেকে। বনলতা আবার ব্যস্ত হলেন গৃহকর্মের কাজে। সাথে রইল গৃহকর্মী মালতী, পুরনো গৃহভৃত্য প্রসন্ন। এই প্রসন্নকে ঋতুপর্ণ হাজির করেছেন এক রহস্যজনক চরিত্রে, যার সামনে বনলতা অবলীলায় বুকের কাপড় সরাতে দ্বিধাবোধ করেন না, যাকে ঋতুপর্ণ আরেক স্বপ্নদৃশ্যে শাড়ি পরে কপালে সিঁদুর পরিয়ে হাজির করেন। অর্থাৎ নিঃসঙ্গ বনলতার জীবনে প্রসন্ন যেন পুরুষ শরীরে এক নারী। দীর্ঘদিনের নিঃস্বঙ্গ জীবনে দীপংকরই ছিলেন বনলতার প্রথম পুরুষ।

‘দোসরে’ সড়ক দুর্ঘটনায় কৌশিকের প্রেমিকা মিতার মৃত্যুতে কাবেরী ও কৌশিকের দাম্পত্য জীবন নতুন মোড় নেয়। যদিও এ সম্পর্ক জেনেও কাবেরী নীরব ছিল, দুর্ঘটনায় খবর মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়লে সে বিচলিত হয় তবু বাইরে কাঠিন্যে ধরে রেখে স্বামীর সেবা শুশ্রুষার ত্রুটি রাখে না। আহত স্বামী নতুন করে আবিষ্কার করে স্ত্রীর ভালোবাসাকে। দু’জন আবার কাছাকাছি আসে। এখানেও ঋতুপর্ণ স্বাভাবিক সম্পর্ককেই কাছাকাছি এনে শেষ করে দেন।

মন ও সম্পর্কের এই জটিল সমীকরণ দেখা যায় ‘দোসর’ ও ‘উৎসব’ সিনেমাতেও। ‘দোসরে’ সড়ক দুর্ঘটনায় কৌশিকের প্রেমিকা মিতার মৃত্যুতে কাবেরী ও কৌশিকের দাম্পত্য জীবন নতুন মোড় নেয়। যদিও এ সম্পর্ক জেনেও কাবেরী নীরব ছিল, দুর্ঘটনায় খবর মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়লে সে বিচলিত হয় তবু বাইরে কাঠিন্যে ধরে রেখে স্বামীর সেবা শুশ্রুষার ত্রুটি রাখে না। আহত স্বামী নতুন করে আবিষ্কার করে স্ত্রীর ভালোবাসাকে। দু’জন আবার কাছাকাছি আসে। এখানেও ঋতুপর্ণ স্বাভাবিক সম্পর্ককেই কাছাকাছি এনে শেষ করে দেন। তবু একটি প্রশ্ন থেকেই যায়, মিতার মৃত্যু না হলে তারা কি আবার কাছাকাছি আসার সুযোগ পেত? কাবেরী কি কৌশিককে ক্ষমা করে দিতে পারত?

কাবেরী ও কৌশিকের সম্পর্কের সমান্তরালে কাবেরীর নাট্যদলের সদস্য ববি ও বৃন্দার সম্পর্কের জটিলতাও বারবার ফিরে আসে। নিরাপত্তা ও ভালোবাসার প্রশ্নে বৃন্দার দ্বিধান্বিত মনের সমীকরণ মেলানোটা বেশ কঠিন হয়ে যায়। স্বামীর কাছে নিরাপত্তা আর ববির কাছে ভালোবাসা পায় বৃন্দা, কিন্তু তার দুটোই এক সাথে দরকার! এই সম্পর্কের সমীকরণ মেলানো খুব সহজ নয় বৈকি। কৌশিকের সম্পর্ক নিয়ে কাবেরী যেখানে বিচলিত, সেখানে ববি ও বৃন্দার অসঙ্গায়িত সম্পর্ককে প্রশ্রয় দানে ও কাবেরীর উৎসাহি ভুমিকায় তার মনের দ্বৈততারই প্রকাশ ঘটে।

‘উৎসব’ সিনেমায় দুর্গাপূজার উৎসবে দুই প্রজন্মের মামাতো-পিসতুতো ভাই-বোনদের প্রেমের সম্পর্কের কিছু দিক উন্মোচন করেছেন ঋতুপর্ণ। নানা জটিলতায়, সম্পর্কের ভাঙনে ও বন্ধনে কাহিনি এগিয়ে যায়, আর আমরা আবিষ্কার করি মধ্যবিত্তের সম্পর্কের আরেক রকম জটিলতা, যে সম্পর্ককে মোটামুটি নিষিদ্ধই করে দেওয়া আছে। ঋতুপর্ণ সেদিকেই আলো ফেলেন। তবে এই সম্পর্ককে আবার কোনো পরিনতির দিকেও নিয়ে যান না। তাই পারুল ও শিশিরের মধ্যে সম্পর্কের কারণে শিশিরকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। পরের প্রজন্মের জয় ও শম্পার মধ্যে এ সম্পর্কের সম্ভাবনা নিয়ে শম্পার মা পারুলকে বিচলিত হতে দেখা যায়। দুর্গাপূজা উৎসব শেষে বাড়ির ছোটো মেয়ে কেয়া ও তার স্বামী অরুণের সম্পর্কের বরফ ভেঙে গিয়ে তরলীকৃত হয়, সমীকৃত হয়। এখানেও ঋতুপর্ণ স্বাভাবিক সম্পর্ককেই উঁচুতে তুলে ধরে মিলিয়ে দেন গভীর মমতায়। যে শিশিরকে বাড়ি থেকে বের করা দেওয়া হয়েছিল, স্বার্থের প্রয়োজনে সেই শিশিরকেই বাড়িতে স্বাগত জানানো হয় অর্থাৎ সম্পর্কের স্বাভাবিকতা অথবা অস্বাভাবিকতার সংজ্ঞা প্রয়োজনের স্বার্থে অনেকসময় বদলে যেতে পারে।

ঋতুপর্ণ সাহিত্যের চলচ্চিত্রায়নেও মানসিক টানাপোড়েন ও সম্পর্কের জটিলতার কাহিনিকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। তার মধ্যে রবীন্দ্রনাথের ‘চোখের বালি’ ও ‘নৌকাডুবি’ অন্যতম। যেখানে সম্পর্কগুলোকে নিজস্ব বিবেচনাতেই বিশ্লেষণ করেছেন ঋতুপর্ণ। এ দুটো উপন্যাসের চলচ্চিত্রায়নে সম্পর্ক নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও ঋতুপর্ণের ভাবনার তুলনামূলক আলোচনার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। ভবিষ্যতে এ নিয়ে আলাদা করে আলোচনার ইচ্ছা রইল। গোয়েন্দা চরিত্র ব্যোমকেশকে নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণেও শরদিন্দুর সম্পর্কের এক জটিল কাহিনিকেই নির্বাচন করেছেন ঋতুপর্ণ।


চিত্রাঙ্গদা

চিত্রাঙ্গদায় ঋতুপর্ণ ঘোষ


‘চিত্রাঙ্গদায়’ ঋতুপর্ণ ঘোষ ফেরেন জেন্ডার বিষয়ক সম্পর্কের জটিল ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ নিয়ে। মহাভারতের ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিত্রাঙ্গদার মন ও মানস বিশ্লেষণ করেছেন তার গভীর পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে, নিজস্ব দর্শনে। রুদ্র পুরুষ শরীরের কাঠামো নিয়ে জন্মগ্রহণ করলেও, মন ও আচরণগত ভাবে ভীষণভাবে নারী, মহাভারতের চিত্রাঙ্গদা যেমন নারী হয়ে জন্ম নিয়েও আচরনে পুরুষালী। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াশোনা করেও রুদ্র নামী কোরিওগ্রাফার। বাবার ইচ্ছের কারণে সে ইঞ্জিনিয়ার কিন্তু মনে সর্বদাই এক শিল্পীর বাস। তাই শেষ পর্যন্ত ইচ্ছের সাথে তার আপোশ করা হয় না। রুদ্রের জীবনে উভকামী পার্থ আসে ঝড়ের মতো, ভালোবাসায় ভাসিয়ে পার্থ একদিন চলেও যায়। কিন্তু পার্থকে (প্রসঙ্গত মহাভারতে অর্জুনের আরেক নাম পার্থ) ধরে রাখার জন্য মা বাবার ইচ্ছের বিরুদ্ধে রুদ্র নিজের সেক্স পরিবর্তন করার কষ্টকর প্রক্রিয়ায় গিয়েও শেষ পর্যন্ত ধরে রাখতে পারে না। পার্থ ঘর বাঁধে তাদেরই নাট্যদলের সুন্দরী কস্তুরীর সাথে।

বিভিন্ন জাদুবাস্তবতায় স্বপ্ন ও বাস্তবতা একাকার করে সমান্তরালভাবে বলেছেন মহাভারতের চিত্রাঙ্গদার গল্প, আরেক সম্পর্কের গল্প। চিত্রাঙ্গদার ছায়ায় রুদ্র ও অর্জুনের ছায়ায় পার্থর অতি সংবেদনশীল সম্পর্কের গল্প নির্মাণ করেছেন ঋতুপর্ণ তার নিজস্ব শৈলীতে, যেখানে সিনেমার নিজস্ব ভাষার স্বার্থক প্রয়োগ হয়েছে। কী অপূর্ব জাদুবাস্তবতায় রুদ্রর অপারেশন মঞ্চ চিত্রাঙ্গদার নাট্যমঞ্চে রূপান্তরিত হয়, রুদ্র ও চিত্রাঙ্গদার রূপান্তর মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। রুদ্রের অবচেতন মনের শুভর সাথে কথোপকথনে সম্পর্কের এক জটিল রূপের ব্যবচ্ছেদ করেছেন ঋতুপর্ণ। আর রুদ্র চরিত্রে যেহেতু ঋতুপর্ণ নিজেই রূপদান করেছেন এবং যেহেতু তা ঋতুপর্ণের নিজস্ব জীবন দর্শনের সাথে কিছুটা সাদৃশ্যপুর্ণ, তাই বিভিন্ন জাদুবাস্তবতায় ও রুদ্রর অবচেতন মনের সৃষ্ট চরিত্র শুভর বাস্তবিক উপস্থিতিতে এক ইলিউশনের জগৎ সৃষ্টি হয়, যার মাধ্যমে রুদ্রের জন্য মন অনুভুতিশীল হতে বাধ্য। সকল সম্পর্কের প্রতি, জেন্ডার বিষয়ক জীবন প্রনালীর প্রতি বিরূপ আচরণ না করে মানুষকে মানুষ হিসাবে ভাবার শক্তি যোগায়। এখানেই ঋতুপর্ণের সার্থকতা। ঋতুপর্ণের অন্যান্য সম্পর্কের গল্পের মতোই রুদ্রও শেষ পর্যন্ত মা বাবার ভালোবাসার কাছেই ফেরে। কুয়াশার মতো আসা পার্থ মিলিয়ে যায় রুদ্রের জীবন থেকে। এ পর্যায়ে রুদ্রের সেই সংলাপটি ভীষণ রকম সংবেদনশীল হয়ে যায়, ‘বাবা-মা আমার ঘরটি খুব সুন্দর করে সাজিয়েছেন, মা নতুন পর্দা এনেছেন, আমি বাড়ি যাই!’

ঋতুপর্ণ ঘোষ তাঁর প্রায় প্রতিটি চলচ্চিত্রে সব সম্পর্কের উপরই আলোকপাত করেছেন। সেই সম্পর্কের সমীকরণে যেমন স্বামী-স্ত্রী, মা-মেয়ে, বাবা-মেয়ে, বাবা-ছেলে, ভাই-বোন রয়েছে, কাজিন রয়েছে তেমনি আবহমান বাংলার বউ-শাশুড়ীর দ্বন্দ্বও ঋতুপর্ণের চোখ এড়িয়ে যায়নি। ‘আবহমান’ চলচ্চিত্রে আমরা দুই প্রজন্মের মধ্যে এই দ্বন্দ্ব দেখতে পাই। অনিকেতের স্ত্রী দীপ্তি ও পূত্রবধু শিক্ষিত, আধুনিক ও স্মার্ট, অপরদিকে অনিকেতের মা প্রাচীনপন্থী প্রৌঢ়। সময়, মন ও চিন্তার পার্থক্যর কারণে দীপ্তির সাথে তার শাশুড়ির মানসিক দ্বন্দ্ব হয়তো স্বাভাবিক ছিল কিন্ত শিক্ষায় ও আধুনিকতায় সমমনা হয়েও দীপ্তির সাথে তার পূত্রবধুর দ্বন্দ্ব আমাদের একটি প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। এরপরও, সন্তাপে বউ-শাশুড়ির পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে কান্নার দৃশ্য দ্বন্দ্বের চেয়ে দুই নারীর মানসিক নির্ভরশীলতাই প্রাধান্য পায়। সমস্যাটা আসলে শিক্ষা, আধুনিকতা কিংবা স্মার্টনেসের উপর নির্ভর নয় মোঠেই, এটা সমাজ ও পরিবারের জীনগত সমস্যা। যুগের পর যুগ এ দ্বন্দ্বের ধারাবাহিকতা বহমান। চিন্তার মুক্তি ছাড়া মানসিক দ্বন্দ্বের এই জটিলতা থেকে মুক্তি সম্ভব নয়।

ঋতুপর্ণ নগরের মধ্যবিত্তের মন খুব ভালোভাবেই বুঝেছিলেন। তাই মধ্যবিত্তের বসার ঘরে, শোবার ঘরে, বিছানায়, বারান্দায় ও উঠানে ঋতুপর্ণের মনখারাপের মেঘপিওন তার ব্যাগ নিয়ে হাজির হয়। চিত্রনাট্যের শক্ত গাঁথুনিতে ও ঝরঝরে সংলাপের ঘাত-প্রতিঘাতে মনের হাহাকার, বিষণ্নতা, হতাশা এমনভাবে উঠে আসে যে প্রতিটি চরিত্রের কষ্ট নিজেদের মধ্যে ধারন করে সিনেমার শেষ পর্যন্ত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন।

ঋতুপর্ণ নগরের মধ্যবিত্তের মন খুব ভালোভাবেই বুঝেছিলেন। তাই মধ্যবিত্তের বসার ঘরে, শোবার ঘরে, বিছানায়, বারান্দায় ও উঠানে ঋতুপর্ণের মনখারাপের মেঘপিওন তার ব্যাগ নিয়ে হাজির হয়। চিত্রনাট্যের শক্ত গাঁথুনিতে ও ঝরঝরে সংলাপের ঘাত-প্রতিঘাতে মনের হাহাকার, বিষণ্নতা, হতাশা এমনভাবে উঠে আসে যে প্রতিটি চরিত্রের কষ্ট নিজেদের মধ্যে ধারন করে সিনেমার শেষ পর্যন্ত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন। মনে হয়, এ কষ্ট তো আমাদেরও আছে, যা বলা যায় না। এ হাহাকার, হতাশা, বিষণ্নতা, সম্পর্কের জটিলতা দর্শক হৃদয় ছুঁয়ে যায়। গল্পগুলোকে খুব চেনা চেনা মনে হয়। মন ও সম্পর্কের এই সেলুলয়েড কাব্যের কবি ঋতুপর্ণ যিনি আমাদের না বলা কথাই বলে যান, হৃদয় খুঁড়ে বের করে আনেন সকল সত্য, সকল কষ্ট। তাই ঋতুপর্ণের ঠাঁই সব দর্শকের মনের গহীনে। যদিও ঋতুপর্ণের ধারণা ছিল, ‘এই শহর না পারবে আমায় ধারন করতে, না উপেক্ষা করতে’। কে আর তাঁর মতো জটিল সম্পর্কের এমন বিশ্লেষণ করে সরল সম্পর্ককেই মহিমান্বিত করেছেন! শুরু করেছিলাম ‘তিতলি সিনেমায় ব্যাবহৃত গানের প্রথম কয়েকটি পংক্তি দিয়ে, শেষ করছি ঐ গানের আরও কয়েকটি পংক্তি দিয়ে, যা তাঁর সব সিনেমার জন্যও প্রাসঙ্গিক হয়ে যায়।

‘রোদের ছুরি ছায়ার শরীর কাটছে অবিরত
রোদের বুকের ভিতর ক্ষত।
সেই বুকের থেকে টুপ টুপ টুপ নীল কুয়াশা ঝরে,
আর মন খারাপের খবর আসে আকাশে মেঘ করে
সারা আকাশ জুড়ে।
মেঘ পিওনের ব্যাগের ভেতর মন খারাপের দিস্তা,
মন খারাপ হলে কুয়াশা হয় ব্যাকুল হলে তিস্তা।’

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

পেশায় ব্যাংকার। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থ বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর। শাবিপ্রবির চলচ্চিত্র বিষয়ক সংগঠন চোখ ফিল্ম সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক হিসাবে চলচ্চিত্র বিষয়ক ছোটোকাগজ ‘প্রক্ষেপণ’ সম্পাদনায়ও যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে বিভিন্ন ওয়েব পত্রিকায় নিয়মিতভাবে চলচ্চিত্র বিষয়ক প্রবন্ধ ও গল্প লিখছেন।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।