শনিবার, জুন ২২

কথোপকথন : অরুণ কুমার বিশ্বাস

0

চীনে রেস্তোরাঁর আবছা আলোয় লোকটিকে দেখে যতটা নিরীহ মনে হয়, আদতে তিনি তা নন। স্থান-কাল-পাত্রভেদে বেমালুম বদলে যান লোকটি। খুব নিরিখ করে না দেখলে বোঝা যায় না তার বাঁ গালের উপরের দিকে চোখের ঠিক নিচে একটা কাটাদাগ আছে। ওটা নেহাতই দুর্ঘটনাজনিত কারণে নয়, কেউ একজন ক্ষুরের পোচ মেরেছিল তার গালে। তার মানে এই নয় যে, ভদ্রগোছের ভালোমানুষের শরীরে কেউ ক্ষুরাঘাত করতে পারে না।

কাজল তার ফোনকলে সাড়া দিয়ে রেস্তোরাঁয় এসেছে। ওর ধারণা, স্যার আজ কিছু বলবেন। এমন কিছু যা কিনা এই মুহূর্তে কাজলের কাছে খুব প্রত্যাশিত। স্যার লোকটা বিশেষ সুবিধের না হলেও কাজলের কিন্তু বেশ লাগে।

কাজল তার ফোনকলে সাড়া দিয়ে রেস্তোরাঁয় এসেছে। ওর ধারণা, স্যার আজ কিছু বলবেন। এমন কিছু যা কিনা এই মুহূর্তে কাজলের কাছে খুব প্রত্যাশিত। স্যার লোকটা বিশেষ সুবিধের না হলেও কাজলের কিন্তু বেশ লাগে। তার নানামুখী চরিত্র কাজলকে খুব টানে।

বুঝলে কাজল, মানুষ জন্তুটা খুব বিচিত্র ধরনের। কোনটা এর মুখ আর কোনটা মুখোশ বোঝা কঠিন। স্যার বললেন। কাজলের কাছে সে স্যার, কারো কাছে হয়তো শালা।

জন্তু! মানুষকে আপনি জন্তু মনে করেন! কাজলের চোখে বিস্ময়ের প্রলেপ।

নয়তো কী! এই যে আমি এখানে সুটেড-বুটেড হয়ে ভদ্রলোকের মতো বসে আছি, কী মনে হয় তোমার, আমি কি ততটাই ভদ্র যেমন তুমি ভাবছো! অমনি আত্মতিরস্করণে ব্রতী হন তিনি।

হেসে ফেলল কাজল। ওটা আপনার বিনয় স্যার। আমি জানি, আপনার মতো মানুষ হয় না। কাজলের পরনে নীল-সাদা ফিনফিনে শিফন। স্যার তাকে যাতে নেহতাই গেঁয়ো না ভাবে তাই সে নিজেকে যতটা সম্ভব সাজিয়েগুছিয়ে এনেছে।

স্যার সাথে সাথে কিছু বলেন না। তার প্রায় প্রতিটি আঙুলে কিছু না কিছু আংটি শোভা পায়। কোনোটা পোখরাজ, কোনোটা বৈদূর্যমণি, আবার কোনোটা স্রেফ সৌন্দর্যবর্ধক গোমেধ পাথরের আংটি। ধরে নেওয়া যায়, তিনি ভাগ্যে বিশ্বাস রাখেন। এও ভাবেন, এই পাথরের কল্যাণে তার জীবনের নতুন কোনো দিক উন্মোচিত হবে। তিনি আরেকটু ভালো থাকবেন।

কী খাবে বলো। কিছু একটা অর্ডার না দিলে ওরা অযথাই আমাদের বিরক্ত করবে। তোমাকে আমাকে নিয়ে কিছু একটা গল্প ফেঁদে নিজেদের মাঝে অকারণ হাসাহাসি করবে।

কিসের গল্প স্যার? সুন্দর সেটিং করা দাঁত দেখিয়ে হাসে কাজল। এটা ওর একরকম পেটেন্ট করা হাসি। এই হাসি দেখে সুস্থির থাকা যেকোনো বয়সী পুরুষের পক্ষে কঠিন বৈকি। পুরুষ মানুষ, পাথর তো নয়!

আপনি যা বলেন স্যার। আই’ম অ্যাট ইওর সার্ভিস স্যার। কাজলের কণ্ঠে তারল্য। স্যার লোকটি অবশ্য ওর কণ্ঠে তোষামোদির গন্ধ পান। ব্যাপারটা কেমন উল্টো হলো না! নারী-পুরুষের সম্পর্কটাই এমন, পুরুষ সচরাচর নারীর পেছনে ছোটে, তাকে ইনিয়েবিনিয়ে নানাভাবে কনভিন্স করার চেষ্টা চালায়।

মেয়েটা বেশ চালিয়াত, স্যার অমনি ধরে ফেলেন।

স্যুপ এলো, সাথে কিছু স্প্রিংরোল। এখানে তিনি খেতে আসেননি, বলা যায় কাজলের সাথে কথোপকথনই মূল কথা। এই মুহূর্তে মেয়েটি তার কাছে বিশেষ মূল্যবান। যে কাজে তিনি ফেঁসেছেন, কাজল তাকে সেখান থেকে টেনে তুলতে পারে। বলে নেওয়া ভালো, কাজল একসময় তার ছাত্রী ছিল। শিক্ষক হিসাবে তিনি সার্থক, কারণ কাজল একডাকে সাড়া দিয়ে তার সাথে দেখা করতে এসেছে।

বুঝলে কাজল, একটা বিপদে পড়ে আমি তোমাকে ডেকেছি। আশা করি তুমি আমাকে হতাশ করবে না।

বলুন স্যার, আপনার জন্য আমি কী করতে পারি! সাধ্যের মধ্যে থাকলে নিশ্চয়ই করব। আপনি আমার স্যার শুধু নন, বিশেষ প্রীতির পাত্র বটে। যথেষ্ট প্রাপ্তমনস্কের মতো গুছিয়ে বলল কাজল। স্যার তাতে খুশি হন, আবার শঙ্কিতও। তিনি অনুভব করেন, এই মেয়ে মচকালেও সহজে ভাঙবে না। সে ‘বাজার’ চিনে গেছে।

স্যার কিছু বলবেন, তক্ষুনি রেস্তোরাঁয় অনভিপ্রেত এক গ্যাঞ্জাম শুরু হলো। কোনো এক খদ্দের ওয়েটারের কলার ধরে ঝাঁকাচ্ছে আর বলছে, আমি কে তুই চিনিস, চিনিস আমাকে? সিড়িঙ্গিমতো লোকটাকে বেশ মারমুখী মনে হয়। এও বোঝা যায়, এই ব্যক্তি প্রায়শ নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারায়। এবং সে সব্যসাচী গোছের লোক, অর্থাৎ মারামারিতে তার হাত-পা দুটোই সমান চলে।

ওয়েটার বোধ হয় সদ্য এখানে এসেছে। তাকে দেখে কিঞ্চিত নির্বোধ বলেও মনে হলো। সে বলল, আপনি কেডায় হেইডা আমি কেমতে জানুম। নিজেই নিজের পরিচয় জানেন না…। কথা শেষ করার আগেই খেঁকুরে খদ্দের লোকটি তাকে আরও দুঘা বসিয়ে দিয়ে বলল, আমার সাথে ইয়ার্কি মারস, তাই না!

ফলে যা হলো, রেস্তোরাঁর তাবৎ ওয়েটার একাট্টা হয়ে খদ্দেরের খুঁটি নাড়িয়ে দিল। মারের চোটে তার কষ বেয়ে রক্তের ধারা নামল। তবে পুলিশ পর্যন্ত গড়াতে দেয়নি ম্যানেজার। তাতে রেস্তোরাঁর বদনাম হয়।

এর নাম শ্রেণিসংঘাত, বুঝলে কাজল। সবখানেই আছে। খেয়াল করে দেখবা, রাস্তায় গাড়ির সাথে রিকশা ঠোক্কর খেলে বেহুদাই সব রিকশাঅলা জড়ো হয়, তারপর জোর করে গাড়িঅলার কাছ থেকে প্রচুর ক্ষতিপূরণ আদায় করে। এ একরকম পারভারশনও বলতে পারো। নিজের অযোগ্যতা বা না-পাওয়ার জ্বালা অন্যকে ঠকিয়ে মেটানো।

জি স্যার। কী বলবেন বলছিলেন? কাজল খেই ধরিয়ে দেয়। ও খুব সুন্দর একটা সুগন্ধী মেখেছে। বিদেশি কিছু হবে। দেশে তো আর অরিজিনাল জিনিস হয় না, সব ভেজালে ভরে গেছে। স্যার খেয়াল করে দেখলেন, মেয়েটা এখন আর তরুণী নেই, চেহারায় কেমন যেন অভিজ্ঞতার ছাপ পড়ে গেছে। তবে কি ও ভুলপথে এগোচ্ছে! মনটা খানিক খচখচ করে স্যারের। লেনেদেনের হিসেবটা যদি ও শিখে নেয়, কাজলকে তাহলে খুব সহজে তিনি কব্জা করতে পারবেন না।

কী সুগন্ধী মেখেছ? ভ্রু নাচিয়ে স্যার জানতে চান।

তেমন স্পেশাল কিছু নয়, লোকাল।

সে কী করে হয়! এমন মনোলোভা বেলী দেশে তুমি কই পাবা? ইউ মাস্ট বি কিডিং! স্যার সহসাই কথ্যালাপে মেতে ওঠেন।

শব্দ করে হেসে ওঠে কাজল। স্যার, আপনি সত্যি প্রলুব্ধ হচ্ছেন! দ্যাটস মাই প্লেজার স্যার। আপনার মতো কেষ্টবিষ্টু মানুষ…! আবারও ওর কণ্ঠে তেলের আভাস পান সম্মানিত স্যার।

ওদিকের গ্যাঞ্জাম মিটলে স্যার কিছু বলবেন বলে মন ঠিক করেন। লক্ষ্য করলেন সামনেই অনতিদূরে যে কাপল বসে আছে, তাদের একটিকে তিনি বিলক্ষণ চেনেন। মেয়েটি তার চেনা। তার স্বামী আছে। কিন্তু যার সাথে বসে সে হা-হা হি-হি করছে, এটি তার স্বামী নয়। বয়ফ্রেন্ড! পরকীয়া চলছে! বেশ তো, চালিয়ে যাও। আনমনে হেসে ফেললেন তিনি। দুনিয়া আনন্দময়, যার যা চিত্তে লয়! পাপবোধ অপরাধবোধ— নিছক কেতাবি বাত। কে মানছে এসব!

উসখুস করে কাজল। তার মানে সে উঠতে চায়! মোটেও না। স্যার কি জানেন, কাজল এরই মধ্যে একবার বিয়ে করে আবার পাত্র খুঁজছে! বিয়েটা টেকেনি। কারণ ওর খাই বেশি। কাজলের ধারণা, বিয়ে টেকানোর জন্য ভালোবাসা-টাসা জোলো ব্যাপার, আসলে কৌশলী হতে হয়।

উসখুস করে কাজল। তার মানে সে উঠতে চায়! মোটেও না। স্যার কি জানেন, কাজল এরই মধ্যে একবার বিয়ে করে আবার পাত্র খুঁজছে! বিয়েটা টেকেনি। কারণ ওর খাই বেশি। কাজলের ধারণা, বিয়ে টেকানোর জন্য ভালোবাসা-টাসা জোলো ব্যাপার, আসলে কৌশলী হতে হয়। অভিনয়টা ভালো না জানলে শুধু বিয়ে কেন, কিছুই টেকে না।

স্যার নানা ঘাটের পানি খেয়ে অভ্যস্ত। মৃদু আলো-আঁধারিতেও কাজলের শিফনের তলদেশে তার দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়। তিনি ধরে ফেলেন কাজল আর অনূঢ়া নেই, টলায়মান শরীর সেই নির্দেশ করে। সেখানে মেলা ধরপাকড় চলেছে।

স্যার আরও খানিকটা সতর্ক হন। কাউকে ধরতে এসে নিজে ধরা খাওয়া চরম বোকামি। স্যার ক্লাসে যেমন সাবলীল, তেমনি অভিনয়ে পাকা। গলিগমনেও তিনি কম পারঙ্গম নন। মাংসাশী হিসেবে বন্ধুমহলে তার বিশেষ পরিচিতি আছে। তিনি নিরামিষ নন।

অনতিদূরের সেই অযাচিত প্রেম বেশ জমে উঠেছে। স্যারের চেনা নারীটি পরপুরুষের খুব কাছে ঘেঁষে বসেছে। পারলে যেন তাকে কোলে তুলে নেয় আর কি! সবার দৃষ্টি বাঁচিয়ে টুকটাক চুকচুকও করছে নাকি! ফিলিংস, বুঝলে কাজল, এই আবেগটাই যত নষ্টের গোড়া। কারো থাকে নারীতে, আবার কারো হাঁড়িতে। হাঁড়ি মানে টাকাকড়ি, যশের মোহ।

আপনি কিন্তু স্যার, নারীকে একতরফা দোষ দিচ্ছেন! কথায় বলে, নো স্মোক উইদাউট ফায়ার। আবেগের পলতেতে আগুন কে জ্বালায় বলুন তো!

বেড়ে বলেছ হে! একদম খাঁটি কথা। নারীর মনে তেল যতই থাক, ওটা জ্বালাতে গেলে দেশলাই চাই। ওটা কে ধরায়— পুরুষ! মনে হতে পারে, এই স্যার লোকটি অকারণ সময় নষ্ট করছেন, নয়তো কাজলকে সামনে বসিয়ে রেখে একরকম বিকৃত রিরংসা চরিতার্থ করছেন। কিন্তু আদতে তা নয়, স্যার মূলত মেয়েটিকে বুঝে নিতে চাইছেন। তিনি বিষম বিপদে পড়েই একে ডেকেছেন। একটি বিশেষ কাজে কাজলকে তার চাই। কিন্তু কীভাবে! কিসের বিনিময়ে! স্যারের ধারণা ছিল, কাজল এখনও সেই আগের মতোই তার জন্য পাগল। বলা মাত্র পানাপুকুরে ঝাঁপ দেবে। ছাত্রী-শিক্ষক প্রেম মোটামুটি বিশ্বজনীন ব্যাপার। সবখানেই টুকটাক আছে, থাকবেও।

স্যার হয়তো ভুলে গেছেন, সময় বদলায়, মানুষও বসে থাকে না। সেও সময়ের সাথে সাথে নিজেকে মানিয়েগুছিয়ে নিতে অনেক সময় খোল-নলচে বদলে ফেলে। কাজলও অনেক পরিপক্ক এখন, চোখের কাজল প্রয়োজনে সে নাকেমুখে মাখতে পারে!

স্যুপের বাটি শেষ, স্প্রিঙরোলও নিঃশেষিত প্রায়। ভাবছেন, কাজটা তিনি না করলেও পারতেন। কাঁটা আছে জেনেও মুড়োসুদ্ধ মাছ খাওয়া বুঝমানের কাজ নয়। কারবারে ধরা খেয়ে তিনি এখন ধর্ষকামী হয়ে উঠেছেন। যেমন করে হোক, লাবুকে উচিত শিক্ষা দিতে হবে।
এই লাবুটা কে স্যার! কাজল সহসাই বলে উঠল। তার মানে স্যারের ভাবনার সাথে কোনোভাবে প্রযুক্ত হয়েছে কাজল। এটা কীভাবে সম্ভব! মেয়েটা কি তবে থট-রিডার! নাকি বিড়বিড় করে তিনি নিজেই উগড়ে দিয়েছেন অবদমিত অভিসন্ধি!

কী বললে! লাবু! আরও একধাপ সিঁড়ি বাকি আছে, এরকম ভুল ভেবে পা ফেললে যেমন অস্বস্তিকর অনুভূতি হয়, ঠিক তেমনি বেকায়দায় পড়ে যান কাজলের অঘটন-ঘটন-পটিয়সী স্যার।

ও হ্যাঁ, লাবুর সাথে আমার একটা হিসাব বাকি আছে। ইন ফ্যাক্ট, সেই জন্যই তোমাকে আমার দরকার, ভীষণ দরকার। কেমন যেন বেসামাল হয়ে যান স্যার। কাজল ঠিক বুঝে উঠতে পারে না, এক্ষেত্রে তার করণীয় কী!

ও একটা চুকলিখোর, প্রতারক। ও আমার মুখের গ্রাস কেড়ে নিয়েছে। ওকে একটা শিক্ষা দিতে চাই। একমাত্র তুমি কাজটা করতে পারবে কাজল। আশা করি আমাকে তুমি হতাশ করবে না। সেই কথা, শুরুতে যা তিনি বলেছিলেন।

কাজল এবার খানিক ভয় পায়। কেমন যেন শীত শীত করে। লোকটা কি তাকে খারাপ কোনো কাজে ডেকেছে। এই প্রথম স্যার থেকে ‘লোকে’ নেমে এলো কাজল। এভাবেই আসলে আমাদের প্রত্যহিক সম্পর্কগুলো বাঁক বদলায়। মানুষকে চিনতে না পারা বা ভুল মানুষকে আপন ভাবলে যা হয় আর কি!

লাবু কে স্যার? বলুন আমাকে। কাজল শেষ দেখতে চায়। রাত বাড়ছে, তাকে এবার উঠতেও হবে। ততক্ষণে রেস্তোরাঁর মাখোমাখো ভিড় অনেকটাই ফিকে হয়ে এসেছে।

ও একটা পিম্প, মানে মেয়েছেলের দালাল।

লাবুকে আপনি চেনেন কী করে? দুম করে বলে বসল কাজল।

নিজের অবস্থান থেকে ক্রমশ গড়াতে শুরু করে স্যার বা লোক, সে যেই হোক। বললেন, আমরা একসাথে বিজনেস করতাম। ও আমাকে ঠকিয়েছে। লাবুটা একটা লম্পটও।

কিসের বিজনেস স্যার? মেয়েছেলের দালালি?

ওই আর কি! এই দুনিয়ায় আমরা সবাই দালাল। দালালি করেই তো বেঁচে থাকা। কেউ বুদ্ধির দালালি করে, কেউ মেয়েছেলের, কেউ বা বীমা কোম্পানির, আবার কেউ স্রেফ একটু ভালো খাওয়া বা ভালো থাকার জন্য যার তার দালালি করে বেড়ায়।

কাজল জানে, কথা মিথ্যে নয়। দালালির অপর নাম লবি। লাবু লবি করবে না তো কে করবে! কিন্তু তাই বলে মেয়েছেলের দালালি! এই স্যার লোকটা নাকি আবার তার সাগরেদ! কাজলের সহসাই বিবমিষা বোধ হয়।

কাজল জানে, কথা মিথ্যে নয়। দালালির অপর নাম লবি। লাবু লবি করবে না তো কে করবে! কিন্তু তাই বলে মেয়েছেলের দালালি! এই স্যার লোকটা নাকি আবার তার সাগরেদ! কাজলের সহসাই বিবমিষা বোধ হয়। যা খেয়েছে সব গলা বেয়ে উঠে আসতে চায়। বলল, আমি এখানে কী করতে পারি স্যার! ভুলে যাবেন না, আমি আপনার ছাত্রী।

ছিলে একসময়, এখন তো নয়! ডোন্ট ওয়রি, ভালো পারসেন্টিজ পাবে!

কী বললেন? গলা চড়ায় কাজল। ওর আঁতে ঘা লাগে।

পারসেন্টিজ, মানে বখরা। যা পাবে তাতে বেশ পুষিয়ে যাবে। নির্লজ্জের মতো বললেন। আসলে মানুষ নিজেকে দিয়ে অপরকে বিচার করতে চায়।

কাজল যা বোঝার বুঝে গেছে। তাও শেষদৃশ্য দেখার জন্য মরিয়া হয়ে বলল, আমাকে ঠিক কী করতে হবে বলুন তো! নইলে মিছে সময় নষ্ট হবে।

ওয়েট, বলছি। বললেন চোখের নিচে ক্ষুরের পোচঅলা ভদ্রস্থ দেখতে লোকটা। তখনই একটা ফোন এলো। ফোন পেয়ে তিনি ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। আমাকে এক্ষুনি যেতে হবে, বুঝলে! এই নাও, ঠিকানাটা রাখো। লাবুকে তুমি ফাঁসাবে। কীভাবে ফাঁসাবে জানি না। তবে ও বড্ড নারীলোলুপ। আমার ধারণা, তুমি বুঝতে পারছো তোমাকে ঠিক কী করতে হবে।

আপনি নিশ্চিত যে কাজটা আমি করব? কণ্ঠে একরাশ তিক্ততা মিশিয়ে বলল কাজল।

কেন করবে না কাজল! আমি জানি তুমি আমাকে অনেক ভালোবাসতে। এখনও বাসো। ভালোবাসার জন্য এটুকু করতে পারবে না! কথা শেষ করে লোকটা বোকার মতো চোক চোক করে হাসলো। সে নিজেও জানে, যা বলছে তার আসলে কোনো মানে নেই।

কাজল তাও বলল, আপনি বোধ হয় জানেন না, ভালোবাসা কখনও বিনিময়ের ভিত্তিতে হয় না। লভ্ ইজ নট ই-কমার্স বিজনেস। আমার আফসোস, আমি একজন ভুল মানুষকে ভালোবেসেছিলাম। আমি মানুষ চিনতে পারিনি। চোখের নিচে ওই কাটা দাগঅলা লোকটা যে তিনি নন, এটুকু এখন বুঝতে পারছি।

নিচে সাইরেনের শব্দ শোনা যায়। পুলিশ আসছে। যেতে যেতে স্যার শুধু বললেন, সময়, বুঝলে কাজল, সময় মানুষকে আমূল বদলে দেয়— নায়ককে খলনায়ক, আর প্রেমিককে ক্লাউন।

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

এক্স-নটরডেমিয়ান, ইংরেজি সাহিত্যে এমএ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে আন্তর্জাতিক মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় মাস্টার্স করেন লন্ডনে। লেখালেখির শুরুটা তার কলেজকাল থেকেই। তিনি অসম্ভব প্রাণোচ্ছল একজন মানুষ। ঘুরতে পছন্দ করেন। নতুন দেশ নতুন মানুষ তার আগ্রহের বিষয়। বিভিন্ন দৈনিক ও সাময়িকীতে শিশু-কিশোরদের জন্য লিখছেন ছড়া, কবিতা, অ্যাডভেঞ্চার, উপন্যাস, ভুতুড়ে ও গোয়েন্দাগল্প। পেশাগত কাজের ফাঁকে (বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস) তিনি সমসাময়িক বিষয় নিয়ে নিয়মিত কলাম লিখছেন। তিনি আড্ডার আমেজে জম্পেশ গল্পও বলেন। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৩০ এর অধিক।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।