শনিবার, জুন ২২

কবর

0

মোষমরার চরে একটা কবর দেখা গেছে। তা নিয়েই সন্ধে থেকে গুঞ্জন। গুঞ্জন হবে না কেন! মানুষ মরলে কবর দেওয়া হয় গ্রামের গোরস্থানে। মোষমরার চরের মতো অমন নির্জন জনমানবহীন এলাকা কবর দেওয়ার উপযুক্ত জায়গা নয়। বিষয়টির সঙ্গে যেহেতু মানুষের মৃত্যু সম্পর্ক জড়িত, সেক্ষেত্রে সবার মনে একটা সংশয় থেকেই যাচ্ছে। সদ্য নির্মিত কবর। অথচ কী আশ্চর্যের বিষয় আশেপাশের গ্রামগুলিতেও কারও মারা যাবার কোনো সংবাদ নেই। মানুষ মরলে খবর কখনো চাপা থাকে না। মানুষের মুখে মুখেই ছড়িয়ে পড়ে। তাহলে কবরটি কার? কারাই বা প্রকাশ্য দিনের আলোয় একটা মৃত মানুষকে অমন ধূ ধূ প্রান্তরে মাটি খুঁড়ে কবর দিয়ে গেল!

তখনও সন্ধ্যা ঘনায়নি। বাগদী পাড়ার পুষ্করের বউ গিয়েছিল চরের খালে মাছ ধরতে। বর্ষাকাল। নদীর এখন ভরা যৌবন। সেই যৌবনেরই ছটা ছড়িয়ে পড়ছে নদীর আশেপাশের খালে-বিলে। মোষমরার চরটা ঠিক আজকালকার চর নয়। শোনা যায়, কোন যুগ আগে নাকি বান এসেছিল নদীতে। মাঠঘাট ডুবিয়ে যখন শান্ত হলো নদী, তখন পলি-বালি ফেলে ফেলে নদীটা অনেকদূর সরে পড়েছে। লাগারডাঙার ঘোষদের একটা হালের মোষ চরতে চরতে শক্ত ডাঙা ভেবে বালিতে পা দিয়ে জল খেতে নেমেছিল। আর উঠতে পারেনি মোষটা। ভড়ভড় করে ঢুকে গিয়েছিল নরম দক-মাটিতে। অনেক খোঁজাখুঁজির পর যখন রাখালের চোখে পড়েছিল, তখন শুধু একটা কালো মাথা দেখতে পেয়েছিল সে।চোখ বুজে ওপর দিকে মুখ তুলে যেন গভীর ধ্যানে মগ্ন। কেউ যেন গলাটি কেটে কাদার ওপর নামিয়ে দিয়ে গেছে।মোষটার মাথার ওপর দু-তিনদিন শকুন উড়েছিল। ভাগাড় খেকো কুকুরগুলো দহে নামতে সাহস পায়নি। দূর থেকে বসে বসেই জীভের জল ঝড়িয়েছিল— এ হলো মোষমরার চরের বৃত্তান্ত।

চরের আশেপাশে অনেক শাখা নালা আছে। যেগুলো মাঠ থেকে নেমে নদীতে মিশেছে। উজানি জলে নদী থেকে মাছ উঠে আসে। পুষ্করের বউয়ের সঙ্গে তার ন্যালা ছেলেটাও ছিল। কুড়োজালী দিয়ে খালে চুনো মাছ ধরছিল শুকমনি। আর ন্যালা ছেলেটা চরে খেলতে খেলতে কি দেখে মা মা করে ছুটে এসেছিল। হাঁফাচ্ছিল ছেলেটা। শুকমনি ছেলেকে অমন ভাবে ছুটে আসতে দেখে জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে তা? অমন ম্যা ম্যা করিস ক্যানে? ছেলেটা আঙুল বাড়িয়ে চরের পশ্চিমদিকটা দেখায়।

শুকমনি খাল থেকে উঠে পড়ে। জালটা নামিয়ে ন্যালা ছেলেটার সাথে সাথে এগিয়ে যায় খানিক। ছেলেটা ভয়ে এগোতে চায় না। মায়ের শাড়ির আঁচল ধরে সিঁটিয়ে থাকে। কিছুটা এগিয়েই থম মেরে দাঁড়িয়ে পড়ল শুকমনি। একটা কাঁচা কবর! আজই বানানো হয়েছে। বুকে থুতু দিয়ে কপালে হাত ঠেকিয়ে রাম নাম জপতে লাগল শুকমনি। বুকের ভেতরটা কেমন ধুকপুক করে ওঠে। তাদের গাঁয়ের তো কেউ মারা যায়নি! আর এই জায়গা কবর দেওয়ার জায়গাও নয়।

সন্ধে হতে আর খুব বেশি দেরি নেই। পশ্চিম আকাশে সূর্য অনেকক্ষণ আগেই ঢলে পড়েছে। খালে নামতে আর সাহসে কুলাল না শুকমনির। জালটা কাঁধে ফেলে, ছেলেটাকে নিয়ে এক দমে হেঁটে হেঁটে মাঠ পেরিয়ে গাঁয়ের তে-মাথার মোড়ে এসে থেমেছিল। একবারও পেছন ফিরে তাকায়নি।

২.
কার্তিকের চা-চপের দোকানে সন্ধেবেলা পাঁচরকম পাঁচটা মানুষ এসে জড়ো হয়। বাঁশের বেঞ্চিতে পা ঝুলিয়ে চা খেতে খেতে দেশ-দুনিয়ার সাতকাহন তুলে আনে। শুকমনি ভিজে কাপড়ে দাঁড়িয়েই গিয়াসউদ্দিন মোল্লাকে ডাকে, চাচা একবার শুনে যাও এদিকে।
গিয়াসউদ্দিন মোল্লা চায়ের কাপ হাতেই উঠে এলো। বলল, একটু আগেই তো পুষ্কর টাকা নিয়ে গেল, তোকে কিছু বলেনি?
শুকমনি বলল, বেতন চাইতে আসিনি চাচা। অন্য কেস আছে। তারপর গলাটা খাদে নামিয়ে শুকমনি জিজ্ঞেস করে, আজ তুমাদের স্বজাতি কেউ মরেছে চাচা?
—কই না তো! কী হয়েছে একটু খুলে বলদিনি।
—চাচা গো! এখনো বুকটা আমার ধুকপুক করছে। সাঁঝেরবেলা ছেলে নিয়ে মিছে কথা বলবনি। মোষমরার চরে একটা কবর দেখে এলাম।
গিয়াসউদ্দিন মোল্লার চোখ কপালে উঠল।
—বলিস কী? কবর! ঠিক দেখেছিস তো?
—আমাদের ভোলা চরে খেলছিল চাচা। হঠাৎ কবরটা দেখে হাঁফাতে হাঁফাতে ছুটে আসে। তারপর আমিও গিয়ে দেখে এলাম। তুমাদের গোরস্থানে যেমন কবর দেয়, ঠিক তেমন পারা।
ওদের কথাবার্তা শুনে আরো দু-চারজন এগিয়ে এলো। পুষ্করের বউয়ের কথাটি রাষ্ট্র হতে বেশি সময় লাগল না।

মোষমরার চরটাকে যদি মাঝে রাখা হয়, তাহলে নদীর এপারে আরো দুটি গ্রাম পড়ে। ওই গ্রামগুলিতেও যার যত আত্মীয়স্বজন ছিল, সবাইকে ফোন করা হলো। কেউ কোনো সংবাদ দিতে পারল না। চারিদিকে হুলুস্থুল পড়ে গেল। রাতের বেলাতেই অনেকে গিয়ে ব্যপারটা চাক্ষুষ দর্শন করে আসতে চায়। এতবড় একটা ঘটনা শুধু মাত্র পুষ্করের বউয়ের জবানের ভিত্তিতেই সম্পূর্ণ বিশ্বাস করে ছেড়ে দেওয়া যায় না। খবরের সত্যাসত্য বিচারের জন্য মোষমরার চরে একবার রাতারাতি যাওয়া প্রয়োজন। তবে এই অন্ধকার রাত্রে, জল-কাদা, ঝোপ-জঙ্গল মাড়িয়ে কে যাবে? পথটা তো সোজাসাপটা নয়। রাতের বেলা সাপখোপের ভয় আছে। আবার না গেলেও সারারাত চোখে ঘুম আসবে না কারও।

এশার নামাজের পর গ্রামের মসজিদের ইমাম বারাকতুল্লাহ বললেন, শোনেন ভাইসকল। সবার যাওয়ার দরকার নেই। আমার সঙ্গে দু-একজন গেলেই হবে।
ইমাম সাহেব কত যে মরা মানুষকে ইসলামিক তরিকা অনুযায়ী কবর দিয়েছেন তার কোনো হিসেব নেই। ওনার যাওয়াটা অনেকের কাছে খুব মূল্যবান বলে মনে হলো। তবে শুধু ইমাম সাহেবই নয়, সঙ্গে গেল বেশকিছু কৌতুহলী জনতা আর ক্লাবের ছেলে-ছোকরারা। কেউ কেউ পুষ্করের বউকে সঙ্গে করে নিয়ে যাওয়ার কথা তোলে। তাতে গিয়াসউদ্দিন মোল্লা বলে, ওকে নিয়ে যাওয়ার দরকার নাই। উ যে জায়গার কথা বলেছে, সে জায়গা আমি খুঁজে বার করে নেব।

নদীর কোলঘেঁষা এই গ্রামটির মানুষজন সারাদিন মাঠেঘাটে খেটে এসে রাত ন’টা না বাজতে বাজতেই বিছানায় গা এলিয়ে দেয়। আবার উঠে পড়ে পুবের আকাশ ফরসা হতে না হতেই। আজ কারও চোখে ঘুম নেই। ইমাম সাহেব যখন দলবল নিয়ে মোষমরার চরে গেছেন, নতুন কোনো সংবাদ না নিয়ে ফিরবেন না। সবাই জেগে আছে সেই অনাগত খবরটুকু শোনার অপেক্ষায়।

গ্রামটিকে নদী থেকে পৃথক করেছে একটি বিশাল মাঠ। আমনধানের কচি চারাগুলি টর্চের আলোয় ঝিলিক দিয়ে উঠছে। একটা মোটা আলপথ ধরে এগিয়ে যাচ্ছে সব। পলিবেষ্টিত মাঠ। গ্রামকে পেছনে ফেলে দলটি যখন নদীর পাড়ে উঠল, তখন আকাশের সন্ধ্যা তারাটি মেঘ কাটিয়ে বেশ জ্বলজ্বলে হয়ে উঠেছে।

নদীর এপারটায় ছোটছোট লতা-গুল্মের ঝোপ আর কাশবনের রাজত্ব। কোথাও বা প্রহরীর মতো বাবলা, খেঁজুরের গাছ দাঁড়িয়ে। সেসব ডিঙিয়ে ওরা মোষমরার চরে গিয়ে উঠল। টর্চের আলো পড়ছে এদিকসেদিক। দলের মধ্যে বৃদ্ধ রমজান আলী আছে। বিচার-আচারের সভার মুখ্য ব্যক্তি সে। গিয়াসউদ্দিন মোল্লাকে উদ্দেশ্য করে সে বলে উঠল, গিয়াস ভাই, তুমি খুঁজে বের করো। কোন জায়গার কথা বলেছে পুষ্করের বউ?

গিয়াসউদ্দিন একাই হন হন করে এগিয়ে গেল। পশ্চিমদিকটায় বর্ষার জল পেয়ে প্রচুর ঘাস জন্মেছে। ঘাসের চটানেই নদীর কিনারা ঘেঁষে পড়ে আছে একটা কবর। পলিমাটি দিয়ে গড়া হয়েছে কবরটি।

ইমাম সাহেব কাছে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ ধরে পর্যবেক্ষণ করলেন। একে একে সবাই কবরটিকে গোল করে ঘিরে ফেলল। কবরের ভেতরে অন্ধকারে শুয়ে থাকা মৃত মানুষটিকে নিয়ে অনেক কল্পনা-জল্পনা চলল। একসময় ইমাম সাহেব বললেন, এটা কোনো বড় মানুষের কবর নয়, আমার মনে হচ্ছে কোনো শিশুর কবর।
—ঠিকই বলেছেন জি। বড় মানুষের কবর হলে আরো লম্বা হতো।
—শিশুর কবর হলে এতটা লম্বা করারই বা কী দরকার?
—অন্য কোনো কেস নয় তো? যদি কেউ খুনটুন করে নদীর চরে পুঁতে দিয়ে গেছে!
—তাহলে তো পুঁতে মাটি চাপা দিয়ে দিত। কবর বানানোর কী দরকার ছিল?
—প্রকাশ্য দিনের বেলায় একটা লাশকে বয়ে এনে এখানে কবর দিয়ে যাবে, এমন সাহস কার হবে? চরে কি লোকজন একদমই ছিল না?
—আরে মিঞা লাশ বয়ে আনতে হবে কেন? ধরো খুনটা এখানেই করেছে। কোনো নারী সংক্রান্ত কেস। বা টাকাপয়সার ভাগাভাগি।
—আমার মনে হয় ইমাম সাহেবের কথাটাই ঠিক। রমজান আলী সবাইকে থামিয়ে দিয়ে আচমকা নিজের মত প্রকাশ করে,— হয়তো কোনো বাচ্চা মেয়ে শুয়ে আছে কবরের নিচে। চারিদিকে যা আকছার ঘটনা ঘটছে। কিছুদিন আগে শুনো নি তুমরা। জঙ্গলে শালপাতা কুড়োতে গিয়ে এক আদিবাসী মেয়ে একটা বাচ্চা কুড়িয়ে পেল। কারা যেন জঙ্গলে ফেলে দিয়ে গিয়েছিল। সারা গায়ে পিঁপড়ে ধরেছিল বাচ্চাটার, ভাগ্যিস চোখে পড়েছিল, তাই বেঁচে গেল মেয়েটা!

রমজান আলী কি ইঙ্গিত করতে চাইছে, তা কারও বুঝতে বাকি নেই। মালু সেখ কথার খেই ধরে বলে, বাচ্চা মেয়েই হবে এমন কোনো কথা নেই। ছেলেও তো হতে পারে। বিয়ের আগেই এখনকার ছেলে-মেয়েরা যা ‘জেনা’ করছে! কেউ যদি পেট খসিয়ে গেছে?

দলের মধ্যে বুজুর্গ মানুষরা এতক্ষণ কথা বলছিল বলে ছেলে-ছোকরারা চুপ করে ছিল। তাদেরও কিছু বলার আছে।কৌতুহল আছে। কিন্তু তা প্রকাশ করার জন্য সাহসে কুলায়নি। আজফরের মেজো ছেলেটা কলেজের গন্ডী ছাড়িয়ে এবার চাকরির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। চোখে চশমা পরা ছেলেটা আর পাঁচজনের থেকে এমনিতেই চুপচাপ থাকে। তার মাথায় যে এমন একটা ভাবনা আসবে, তা কেউ কল্পনাও করেনি। হঠাৎ সে বলল, করোনার মরা নয় তো! ধরো নদীর ওপারের কোনো লাশ। করোনায় মৃত বলে, লাশটা কেউ ছোঁয়নি। গ্রামের গোরস্থানে কবর দিতে দেয়নি। তাই নৌকায় এসে এপারে চুপিচুপি পুঁতে দিয়ে গেছে।

আজফরের ছেলের কথা শুনে সবাই কবর থেকে পিছিয়ে গেল কয়েক হাত।

কবরটিকে ঘিরে গভীর নীরবতা নেমে এলো। ব্যাপারটার যে এমন একটা দিক ছিল, তা এতক্ষণ কারও মাথায় খেলেনি।কাহিনির একটা অন্য দিগন্ত খুলে গেল। এবার চলল নানাজনের নানারকম কথা।

একজন বলল, করোনায় মরলে তো লাশ দিচ্ছে না। হাসপাতাল থেকেই সৎকার করে দিচ্ছে। তাহলে লাশ পাবে কী করে!

আরও একজন সহমত প্রকাশ করল, হ্যাঁ ভাই, তাও তো বটে। যা ঘটছে এখন! কিছুদিন আগে কী করল বলত?
—তুই কোন কেসটার কথা বলছিস?
—ওই যে রে, হিন্দুর লাশ ভুল করে কবর দিল, আর মুসলমানেরটা পোড়ালো। শালার কি কাণ্ড বলদিনি।
ছেলে-ছোকরাদের আলোচনা শুনে এখন সবার ধারণায় বদ্ধমূল হলো, লাশটি কোনো সাধারণ নয়। করোনাতেই মৃত।তবে একটি বিষয় এখনও সবার কাছে অস্পষ্ট। তা হলো, করোনার রোগী মরলে তো সহজে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেবে না। তাহলে ঘটনাটা কী? কে শুয়ে আছে কবরের নিচে? কোনো ধর্ষিতা নারী? কোনো অবৈধ শিশু? যেই শুয়ে থাকুক, সে যে ধর্মে মুসলমান এটাই সবাই নিশ্চিত। না হলে কবর দেবে কেন! তাই ইমাম সাহেব আর দেরি করলেন না। ঘোষণা করলেন, ভেতরে যেই শুয়ে থাকুক, আজ রাতের বেলা কিছু করা সম্ভব নয়। সকাল হোক। কাল এর কূলকিনারা হবে। নদীর ওপারেও খবর পাঠাতে হবে। এখন আমরা সবাই মৃত মানুষটির উদ্দেশ্যে দোয়া করব। সবাই চুপ করুন।

৩.
সকালবেলায় সারা চর জুড়ে মানুষের জটলা। মোষমরার চরে যেন মেলা বসেছে। শুধু এই গ্রামের নয়, আশেপাশের গ্রাম থেকেও অনেকে এসেছে সাইকেল, মোটরবাইক ছুটিয়ে। এমন একটি ঘটনা, এই এলাকায় কক্ষনও ঘটেনি। প্রবীণ বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা মাথা নেড়ে বলে, আজব কান্ডকারখানা বাপু! দ্যাশ-দুনিয়ার হলোটা কী! গজব নামতে আর বেশি দেরি নাই। কাল কেয়ামতের দিন ঘনিয়ে এসেছে।

কবরটি দেখতে অনেক মানুষের আনাগোনা। হিন্দুরা মন্দির দর্শনের মতো জুতো খুলে দূর থেকে দাঁড়িয়েই দেখে চলে আসছে। মুসলমানরা কপালে হাত ঠেকিয়ে সালাম জানাচ্ছে। নানাজনের মুখে নানারকম কথা। সেই এক-একজনের কথা নিয়ে চলছে তর্কবিতর্ক। ছেলে-ছোকরাদের ইচ্ছা কবরটি খোঁড়া হোক। মাটির তলে চিরনিদ্রায় শায়িত মানুষটি কে, সে দেখতে কেমন, নারী না পুরুষ, শিশু না বৃদ্ধ— তা জানার জন্য সবার মন উদগ্রীব। কিন্তু কবর খোঁড়ার কথা নিজের মনে এলেও তা কারও কাছে প্রকাশ করা যায় না। না-জায়েজ কাজ! এমন কাজ করলে গোটা গ্রামে গজব নেমে আসতে পারে। যে নদীটিকে এত শান্ত দেখছ, তা খ্যাপা মোষের মতো গর্জন করে গ্রামকে গ্রাম গিলে নিতে পারে।ভূমিকম্পে উলটপালট হয়ে যেতে পারে। পোকায় মাঠের সমস্ত ফসল শেষ করে দিতে পারে।

কোথা থেকে খবর পেয়ে সাংবাদিক চলে এসেছে। মানুষজনের গুঞ্জনটা হঠাৎ থেমে গেল। সবাই পায়ে পায়ে অগ্রসর হলো কবরটির দিকে। ক্যামেরাম্যান ফটাফট ছবি তুলছে। ইমাম সাহেব দেখলেন ব্যাপারটা বেশ বাড়াবাড়ির পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। গ্রামের গোরস্থানের ঘটনা হলে, সাংবাদিক কেন! কোনো বেদাতিকেই নাপাক শরীরে প্রবেশ করতে দিতেন না। আসলে মোষমরার চরটা ঠিক জামবনির মৌজার মধ্যে পড়ে না। নদীর খামখেয়ালিপনায় জন্ম নিয়েছে চরটা। সরকারি ভেস্টের আওতায়। তাই নরম গলাতেই বললেন, এই যে ভাই, ফটো তুলছেন তুলেন। জুতোগুলো খুলে যান। মৃত মানুষের সমাধি।

ফোটোগ্রাফার ছেলেটির ততক্ষণে ছবি তোলা হয়ে গেছে। ইমাম সাহেবের কথা শুনে ছেলেটি বলল, স্যরি স্যরি! কিছু মনে করবেন না। একদম খেয়াল ছিল না,—বলে ক্যামেরা ঘোরাল। ফোকাসে ইমাম বারাকতুল্লাহ। শুধু কি তিনি? পেছনে আরও অনেক মুখ। ভিড়টা ক্রমশ যে হারে সকাল থেকে বাড়ছে, মোষমরার চরটাই না বুঝি ধ্বসে নেমে যায় নদীতে!

সাংবাদিক ছেলেটি ইমামের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করল, কবরটি কারা দিয়ে যেতে পারে বলে মনে হয় আপনার?
ইমাম সাহেব বললেন, দেখুন সেটা জানলে এত কাণ্ড হবে কেন! তবে আমাদের জামবনির কেউ নয়, এটাই আমরা নিশ্চিত!
—এতটা নিশ্চিত হচ্ছেন কী করে?
—কবরটা দেখেই বুঝতে পারছেন কাল দিনের বেলা দেওয়া। গ্রামের কেউ হলে সেটা কি দিনের আলোয় সম্ভব?
সাংবাদিক এবার ক্যামেরার দিকে ঘুরল,—আপনারা এতক্ষণ শুনছিলেন জামবনির ইমাম সাহেবের কথা। দর্শক, এখানে যা কিছু ঘটছে, আজ আমরা একদম সরাসরি লাইভ দেখাব আপনাদের। আমাদের সঙ্গে থাকুন।
পাশের গ্রাম শিতলপুর, ঝুঁঝকিডাঙা থেকে এসেছেন বেশকিছু প্রবীণ লোক। তিনগ্রামের মাতব্বররা মূলস্থান থেকে সরে এসে একটা গাছের তলায় পরামর্শ করতে বসলেন।

শিতলপুরের এক ব্যক্তি বললেন, ব্যাপারটা আমাদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। সাংবাদিক যখন এসেছে, এটাকে নিয়ে অনেক জলঘাটা হবে। তার আগেই একটা ব্যবস্থা করতে হবে।
—কী ব্যবস্থা করবেন আপনি? কবরটিকে তুলে নিয়ে গিয়ে গ্রামের গোরস্থানে বসাবেন? তার থেকে ছেড়ে দিন না, যা পারে করুক। ঝুঁঝকিডাঙার একজন নেতাগোছের লোক নিজের মত প্রকাশ করেন।
জামবনির গিয়াসউদ্দিন মোল্লা আছেন, রমজান আলী আছেন, আর আছেন ইমাম বরাকতুল্লাহ। ইমাম প্রতিবাদ করলেন ঝুঁঝকিডাঙার লোকটির কথাতে,—আপনি একদম বত্তামিজের মতো কথা বলছেন মশাই। ছেড়ে দেব মানে!জানেন এর পরিনতি কি হবে?

ইমামকে সাপোর্ট করল শিতলপুরের একজন,—কথাটা ঠিকই বলেছেন আপনি। ব্যপারটা প্রশাসনের আওতায় চলে গেলে কবর থেকে লাশ তুলে বের করবে। পোস্টমর্টেম-এ পাঠাবে। এগুলি করতে দেওয়া কি ঠিক হবে? কবরের নিচে যেই থাকুক, সে তো একজন মুসলমান। মুসলমান হয়ে একজন মুসলমানের লাশ নিয়ে এমন টানাহেঁচড়া করতে দেব কেন?
—হ্যাঁ দেব কেন! আরো একজন উসকে দিল শিতলপুরের লোকটিকে।
—এই চিন্তাভাবনাগুলো এবার ছাড়ুন তো! কোনো খুন খারাপির কেসও তো হতে পারে। আমাদের ভুলে একজন অপরাধী হয়তো বেঁচে যাবে। তাতে আরো পাঁচটা মানুষের প্রাণ যাবে।
ইমাম সাহেব এবার চটে গেলেন, আপনি কি কবর খোঁড়ার পক্ষে মশাই? কী বলতে চাইছেন আপনি?
সবাই হৈ হৈ করে উঠল। নেতাগোছের লোকটিকে মারার জন্য উদ্যত হলো। এমন সময় মোষমরার চরকে কাঁপিয়ে একটা গাড়ির গর্জন ভেসে এলো। সবাই তাকাল সেদিকে। নেতাগোছের লোকটি বললেন, ওই দেখুন, পুলিশ এলো। এবার আটকান।

৪.
পথ ছাড়ুন, পথ ছাড়ুন। কেউ অযথায় ভিড় করবেন না।
থানার বড়বাবু নন্দলাল গূহ রুল দিয়ে দু-পাশ ফাঁকা করতে করতে এগিয়ে গেলেন কবরটির কাছে। পেছন পেছন আরো দু-জন কনস্টেবল।
বড়বাবু কবরটির চারপাশ ঘুরে ফিরে পর্যবেক্ষণ করলেন। বেশ চিন্তিত দেখাচ্ছে ওনাকে। প্যাকেট থেকে সিগারেট বের করে ধরালেন তিনি। পায়চারি করতে করতে কাকে যেন ফোন লাগালেন।
জনতার ভিড় লাগামছাড়া হয়ে উঠছে। এখন শুধু একজন নয়, বেশ কয়েকটি চ্যানেল থেকেই সাংবাদিক এসেছে। একটু বেলার দিকে মোষমরার চরে এস.পি সাহেবের গাড়ি এসে থামল।

এস.পি সাহেব সব দেখেশুনেও নিজে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারলেন না। ডি.এমের সঙ্গে ফোনাফোনি আলোচনা করে নিলেন। তারপর জানালেন, কবরটি খোঁড়ার ব্যবস্থা করতে হবে। নাহলে এর কূলকিনারা হবে না।

ক্যামেরার ফোকাস এখন কবরের দিকে। থানার বড়বাবু কবর খোঁড়ার ব্যবস্থা করলেন। ভিড়টা এখন মূল দৃশ্যে উপচে পড়তে চাইছে। কনস্টেবল দু’জন বার বার চিৎকার করে উঠছেন, এখানে ভিড় করবেন না। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখুন।

কনস্টেবলের ধমক খেয়ে ভিড়টা একটু পিছিয়ে যায় কয়েক মিনিটের জন্য। এক-পা দু-পা করে এগোতে এগোতে আবার যে কে সেই। একজন সাংবাদিক ফলাও করে বলে উঠলেন, আপনারা কেউ নিরাশ হবেন না। যারা দেখতে পাচ্ছেন না, বাড়িতে গিয়ে টিভি খুলুন। আমাদের চ্যানেলে সরাসরি লাইভ দেখানো হচ্ছে।

কবরটি ভিজে কাদামাটি দিয়ে তৈরি। তাই মাটি খুঁড়তে বেশি বেগ পেতে হচ্ছে না। কোদালের চোটে খুব সহজেই সরে যাচ্ছে নরম মাটি। যারা ভিড়মিড় ঠেলে কবরের ধারেপাশে আসতে পেরেছে, তাদের চোখ টান টান। কেউ চোখের পলক ফেলছে না। চোখ বুজলেই যদি কোনো মহামূল্যবান দৃশ্য থেকে বঞ্চিত হয়ে পড়ে! তা কেউ হতে দেবে না। এই ঐতিহাসিক ঘটনার সবাই সাক্ষী থাকতে চায়।

কবরের মাটি প্রায় সরানো হয়ে এসেছে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত কোনো বাঁশের দেখা মিলল না। মাটিতে খাল কেটে মৃতদেহকে কাফনে মুড়ে শোয়ানো হয়। তারপর খালের ওপর সারি সারি কাঁচা বাঁশ চাপিয়ে আড়াল করে, খড় দিয়ে ছিদ্রগুলো ঢেকে মাটি চাপানো হয়। মাটির নিচে কোনো বাঁশ দেখতে না পেয়ে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল কবর খোঁড়ার লোকটি। এস.পি সাহেব ধমক দিয়ে উঠলেন, খোঁড়ো খোঁড়ো, আরো তলা অবধি খোঁড়ো।

আরো কিছুটা খুঁড়তেই কোদালটি গাছের ডালে লেগে ঠক শব্দ করে উঠল। বাঁশের বদলে নদীর আশেপাশের গাছের ডালপালা দিয়ে কাজ সেরেছে। এবার একে একে ডালপালাগুলি সরানোর পালা। তাহলেই মূল রহস্য উন্মোচন হবে।সবাই উত্তেজনায় টান টান হয়ে দাঁড়িয়ে। গাছের ডালগুলি সরাতেই কবর খোঁড়ার লোকটি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। উঁকি মেরে দেখার পর বড়বাবু, এস.পি সাহেব সবাই হতভম্ব। কারও মুখে কোনো কথা নেই। যাদের নজর খালের তলা অবধি যাচ্ছে না, তাদের কৌতূহলের পারদ চড়চড় করে উপরে উঠছে। নীরবতা ভঙ্গ করে জনতার মধ্যে থেকে কে যেন প্রশ্ন করে ওঠে, কী আছে খালে? কথা বলছেন না কেন! আমাদের দেখতে দিন।

জনতার ধৈর্যের বাঁধ ভাঙতে বসেছে। পেছন থেকে ঠেলাঠেলি আরম্ভ হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য বড়বাবু এবার ঘোষণা করলেন, কবরের নিচে কোনো মানুষের লাশ নেই।
—লাশ নেই মানে! তবে কী আছে?
—একটা মরা কুকুর পড়ে আছে।
—মরা কুকুর!
কেউ বিশ্বাস করতে চায় না কথাটা। সবাই নিজের চোখে উঁকি মেরে দেখতে চায়।
বড়বাবু চিৎকার করে উঠলেন, আস্তে,আস্তে। কেউ হইহট্টগোল করবেন না। সবাই একে একে দেখে যান।
ভিড় ঠেলে বেড়িয়ে পড়লেন অফিসাররা।

মোষমরার চর জুড়ে আবার গুঞ্জন উঠল। ইতিমধ্যেই কুকুরটিকে দেখার জন্য বেশ ঠেলাঠেলি লেগে গেছে। যাদের দেখা হয়ে গেছে, তারা এখন নিজেদের মধ্যে তর্কবিতর্ক করতে করতে বাড়ি ফিরছে। কেউ বলল, এটা কোনো দুষ্টু রাখাল বালকদের কাজ। গোরু চরাতে এসে কাজটি করে গেছে।

একজন বলল, আরে কুকুরটা তো চেনা! সেই পাগলটার কুকুর না!

লোকটির কথা শুনে এবার অনেকের মনে পড়ল পাগলটিকে। বেশকিছুদিন হলো এই এলাকায় ঘাঁটি গেড়েছে একটা লোক। মাঝেমধ্যেই তাকে দেখা যাচ্ছে। কোথায় ঘোর-দোর তা কেউ জানে না। এর-তার কাছ থেকে পয়সা চেয়ে চেয়ে দোকান থেকে খাবার কিনে কুকুরটার সঙ্গে ভাগাভাগি করে খায়। গাছের তলে, দোকানের শেডের নিচে শুয়ে থাকে।একদিন রাস্তায় এক্সিডেন্ট হয়ে মরে যাওয়া একটা কুকুরের বাচ্চাকে ধরে তাঁকে কাঁদতেও দেখা গেছে।
একজন চ্যাংড়া ছেলে প্রশ্ন করে ওঠে, কুকুরটাকে কবর দিল কেন? তাহলে কি পাগলটা মুসলমান?
গুঞ্জন থামে না। তর্কবিতর্ক চলতেই থাকে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই জনতার ভিড় কমে মোষমরার চর শুনশান হয়ে পড়ল। গুটি গুটি পায়ে নেমে এলো সেই আগের নির্জনতা। এমন নির্জন পরিবেশেই আচমকা ঝোপঝাড় মাড়িয়ে একটা লোক চুপিসারে বেরিয়ে এলো। উসকোখুসকো চুল, ময়লা তেলচিটে জামাপ্যান্ট। না খেতে পাওয়া কঙ্কালসার চেহারা। লোকটা চারিদিকে চাইতে চাইতে খুব ভয়ে ভয়ে কবরটির কাছে এগিয়ে গেল। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল লোকটা। ওর কান্নার আওয়াজ মোষমরার চর ছাড়িয়ে সভ্য মানুষদের কানে পৌঁছাল না।

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

হামিরউদ্দিন মিদ্যার জন্ম ১৪ই জানুয়ারি ১৯৯৭ সালে পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলার সোনামুখীর একটি প্রত্যন্ত গ্রামে। মূলত গল্পকার। প্রথম গল্প প্রকাশিত হয় ২০১৬ সালে। বর্তমান, এই সময়, সাপ্তাহিক বর্তমান, আজকাল, প্রতিদিন, অনুষ্টুপ, পরিচয় প্রভৃতি পত্র-পত্রিকায় গল্প লিখেছেন। বিভিন্ন ওয়েব পোর্টালেও লিখে থাকেন। ২০১৯ সালে কলকাতা বইমেলায় 'সৃষ্টিসুখ' প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত হয়েছে গল্পগ্রন্থ 'আজরাইলের ডাক'। লেখালেখির জন্য ২০১৮ সালে পেয়েছেন 'প্রতিশ্রুতিমান গল্পকার সম্মান'। ২০২১ সালে 'আজরাইলের ডাক' গল্পগ্রন্থটির জন্য পেয়েছেন 'দৃষ্টি সাহিত্য সম্মান'। তাঁর গল্প ইংরেজি ও হিন্দিতেও অনুবাদ হয়েছে।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।