শুক্রবার, অক্টোবর ২২

কবিতার নিয়তিই যেখানে একটা রাজনৈতিক সত্যের চেয়েও বেশি সত্য হয়ে ওঠা

0

‘পরিস্থিতি যেহেতু আগুন হয়ে আছে’— কবিতার বইয়ে ঢুকলে শুরুতেই, কাভার উল্টানোর পরে প্রথমেই দেখা হয়— যেমন আমার দেখা হয়েছিল— একটা বুলবুলি পাখির সাথে। একটা মৃত বুলবুলি নীচে শুয়ে আছে, আর হয়তো মৃত্যুর পরেও খুব দুর্বলভাবে চেষ্টা করছে তার দুই পায়ের নখ দিয়ে বাতাসকে আঁকড়ে ধরার। শুরুতেই এই সুন্দর তবে এখন মৃত আর অসহায় বুলবুলির সাথে দেখা হওয়ার প্রাসঙ্গিকতা আবার ফিরে আসে বইয়ের কবিতাগুলি পড়া শেষ করার পরেও। তখন আবার সেই বুলবুলি পাখিটার কথা মনে পড়ে— যে আসলে আমাদেরকে আগেই বলে দিয়েছিল এই বইয়ে কবিতার যে নান্দনিকতার সাথে আমাদের দেখা হতে যাচ্ছে তা আমাদের পরিচিত শান্তির ও আরামের নান্দনিকতা না। এই কবিতাগুলির নান্দনিকতা ক্ষমতা ও বিশৃংখলার ভিতরে বা বাইরে যার যার কমফোর্টেবল জোনে বসে উপলব্ধি করা পরিচিত নান্দনিকতা না, যা আসলে আমাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে। এই কবিতাগুলির নান্দনিকতা আমাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে না, বরং আমাদের নিয়ন্ত্রণই সে নিয়ে নেয়; যেন তার কোনো লক্ষ্য আছে আমাদেরকে কোনো একটা কিছুর মুখে দাঁড়া করিয়ে দেওয়ার। এবং আসলে তাই হয়; এক নতুন নন্দন ও সত্যের চেয়েও বেশি এক সত্যের সামনে আমাদের দাঁড় করিয়ে দেয় এখানকার কবিতাগুলি। এই মৃত বুলবুলিটা শুয়ে আছে বইয়ের কাভারেও।

Cover

পরিস্থিতি যেহেতু আগুন হয়ে আছে | মাসরুর আরেফিন | প্রকরণ : কবিতা | প্রচ্ছদ : সব্যসাচী হাজরা | প্রকাশক : কথাপ্রকাশ | মূল্য : ২৫০ টাকা। বইটি সংগ্রহ করতে চাইলে এখানে ক্লিক করুন

পরিস্থিতি যেহেতু আগুন হয়ে আছে— এই নামের মধ্যেই, বিশেষ করে ‘পরিস্থিতি’ শব্দটার কারণে মনে হয় কবিতায় সমসাময়িক কোনো আগুনের কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু বিষয়টা এত সরল না, এই বইয়ের সবগুলি কবিতা মিলে যে আগুনের কথা বলছে তা একইসাথে সমসাময়িক এবং টাইমলেস। যেকোনো স্থানের যেকোনো সময়ে জ্বলতে থাকা চিরন্তন এক আগুন। এবং সেই চিরস্থায়ী আগুনের কারণে, কবিতাগুলি বলছে এই পৃথিবী নরকের কাছাকাছি কিছু একটা, বা এই পৃথিবীই হয়তো নরক যেখানে সবসময়ই জ্বলছে আগুন— বৈষম্যের আগুন, শ্রেণিঘৃণার আগুন, বর্ণবাদের আগুন, জাতিগত বিদ্বেষের আগুন, আর সর্বোপরি ক্ষমতার আগুন। দান্তে যেমন নরক দেখানোর জন্য আমাদেরকে জেরুজালেমের নীচে ভূ-গর্ভে নিয়ে যান, এখানে মাসরুর আরেফিন ঠিক তার বিপরীত, দেখান যে নরক ভূগর্ভে বা মাটির নীচে নয়, পৃথিবীই চিরকাল আগুন জ্বলা এক পরিস্থিতি নিয়ে নরক হয়ে আছে। বলা যায়, দান্তের এক ধরনের অ্যান্টিথিসিস দাঁড়া হয় যে নরক পৃথিবীর বাইরের কোনো বাস্তবতা নয়, নরক এই পৃথিবীরই একটা পরিস্থিতি।

এই বইয়ের কবিতায় বর্ণিত পরিস্থিতি একইসাথে খুব কসমিক এবং খুব লোকাল। একইসাথে টাইমলেস এবং কনটেম্পোরারি।

মহাবিশ্বের শুরু থেকে চলতে থাকা, পৃথিবীর ইতিহাসের শুরু থেকে চলতে থাকা ভায়োলেন্স যখন কবিতাগুলিতে রিক্রিয়েট করা হয়েছে, সেটা করা হয়েছে দুইটা টোনের মাধ্যমে। কবি এখানে নিজেই সেই ভায়োলেন্সের দর্শক আবার নিজেই ভায়োলেন্সের ভিক্টিম। একইসাথে তিনি এমপ্যাথি আর এপ্যাথি ধারণ করছেন নিজের মধ্যে। এবং এই দুই কন্ট্রাডিকশনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলার কারণে কবিতাগুলির মধ্যে মহাকাব্যিক আবহ চলে আসছে। এই বইয়ের সব কবিতা বা আরও বড়ো অর্থে মাসরুর আরেফিনের সব কবিতারই একটা বৈশিষ্ট্য এই জিনিস— মহাকাব্যিক আবহ। অনেক বড়ো স্পেস আর বড়ো টাইমফ্রেম আর বড়ো ক্যানভাস তৈরি করা, সেই বড়ো স্পেস বা ক্যানভাসের মধ্যে কবিতাকে সেট করা। যেমন এই বইয়ের পাঁচ নাম্বার কবিতা, দুনিয়া-মেশিন, সেখানে বলা হচ্ছে—

‘দূরে বিচ্ছেদকাতরতার ড্রাম বাজছে যে জোরে,
বহু মানুষ মারা যাবে নাকি? বহু মানে সংখ্যায় কত বলছে ওরা?
কোনো ডেফিনেটিভ ফোরকাস্ট আছে কাছে?
আর যুদ্ধের সময়েই মানুষ বড়লোক যা হবার হবে?
এটা লেখা আছে কোনো বইয়ে? কোনটাতে শুনি?
আর কি বলছ জানাজায় উপহাসবাণী?
উপহাস করবে কে, পাখি ও পশুগুলো নাকি?’

এটুকু এপ্যাথির কথা, যেখানে তিনি শুধু কৌতূহলী দর্শক। আর একই কবিতায়, একটু পরে এসে মহাকাব্যিক আবহের মোচড় নিয়ে তিনি কীভাবে হয়ে যাচ্ছেন ভিক্টিম, তার এমপ্যাথি সহ।

‘আমি এতগুলো মৃত্যুর কথা শুনে হিমশিম খেয়ে গেছি;
এতগুলো শত্রুভাবাপন্ন মানুষের একসাথে
জায়গা হবে তো নাকি সপ্তপাতালের মেঝে কিংবা ছাদে?

যেহেতু ত্রাণের ট্রাক এই এলাকা দিয়ে সকাল থেকে এখনও যায়নি তো
সামান্য পানিও দেয়নিকো কেউ’

কবিতাগুলির বয়ান রাজনৈতিক অবশ্যই। কিন্তু কোন ধরনের রাজনৈতিক কবিতা এইগুলি? কোনো রাজনৈতিক মতবাদের বা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দর্শনের? না, কখনোই না। এই বইয়ের প্রতিটা কবিতারই একটা দার্শনিক ডাইমেনশন আছে, দার্শনিক লক্ষ্য আছে, কিন্তু সেটা কোনো নির্দিষ্ট একটা রাজনৈতিক দর্শন বা মতবাদকেন্দ্রিক দর্শন না। কবিতাগুলি লক্ষ্য হলো রাজনৈতিক সত্যের চেয়েও বড়ো একটা সত্যের কাছে পৌঁছানো। যেই সত্যের ফেব্রিক দিয়ে পৃথিবীর সোসাইটি, দেশ ও রাষ্ট্র তৈরি। যেই সত্য একইসাথে তীব্র ভয়ের আর আতংকের। যে আতংক ছড়ানো আছে এই বইয়ের প্রতিটা কবিতাতে— যে আতংকের কথা কবি নিজেই বলেছেন— ‘কীভাবে আতংকের প্রেমে পড়ে গেছি আমরা’। আর সেই ভয়টা কেমন তীব্র আর কত গোপন, সেটা বুঝতে চাইলে আমার মনে আসে ডন ডেলিলোর হোয়াইট নয়েজ উপন্যাসের কথা।

এই বইয়ের প্রতিটা কবিতারই একটা দার্শনিক ডাইমেনশন আছে, দার্শনিক লক্ষ্য আছে, কিন্তু সেটা কোনো নির্দিষ্ট একটা রাজনৈতিক দর্শন বা মতবাদকেন্দ্রিক দর্শন না। কবিতাগুলি লক্ষ্য হলো রাজনৈতিক সত্যের চেয়েও বড়ো একটা সত্যের কাছে পৌঁছানো।

‘তারপরও আমরা হাঁটি, মানুষের সাথে কথা বলি, খাই এবং পান করি। আমরা সক্রিয় থাকতে পারি। এই ভয়ের কি আমাদেরকে অবশ করে দেওয়া উচিত না? আমরা কীভাবে এই ভয়গুলিকে নিয়ে টিকে থাকি, অন্তত একটু ক্ষণের জন্য হলেও? আমরা গাড়ি চালাই, ক্লাসরুমে শিক্ষাদান করি। এটা কীভাবে হয় যে কেউ দেখে না আমরা কতটা মারাত্মকভাবে ভীত ছিলাম, গতকাল রাতে, আজকে সকালে? এটা কি এমনকিছু যে আমরা সবাই প্রত্যেকে প্রত্যেকের কাছে থেকে লুকাচ্ছি, সবার সম্মতিতেই? নাকি আমরা না জেনেই সবাই এই গোপন ব্যাপারটা শেয়ার করছি? একই রকম ছদ্মবেশ ধারণ করে?’

এই গোপন ও তীব্র ভয় আর আতংকের কথাই মাসরুর আরেফিন বলেছেন পরিস্থিতি যেহেতু আগুন হয়ে আছে বইয়ের কবিতাগুলিতে।

ক্ষমতা কীভাবে কাজ করে, ক্ষমতার জার্ণি, ফাংশন আর গন্তব্য কী, ক্ষমতার সাথে এর বাইরে থাকা মানুষের টানাপোড়েন কেমন সেটা এই বইয়ের আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আর সেই বিষয়টা তুলে আনতে, সেই ক্ষমতার অন্দর-বাহির দেখাতে গিয়ে মাসরুর আরেফিন জীবনানন্দের পথে হাঁটেন না, মডার্ণিস্ট ওয়েতে সমালোচনাটুকু করে নিজের সাথে ডিটাচমেন্টের ব্যাপারটাতে বেশি ফোকাস করেন না। ক্ষমতার প্রসঙ্গে মাসরুর আরেফিন প্রচণ্ড, প্রচণ্ড সিনিক্যাল হয়ে উঠেন, এবং এই সিনিক্যাল হয়ে ওঠাটা তিনি নিজেও অনেক উপভোগ করেন সেটা বোঝা যায়। নিজের এই সিনিক্যাল হয়ে ওঠাটাকে উপভোগ করা— এটুকুকে হয়তো জীবনানন্দীয় বলা যায়।

‘অ্যান্ড এন্ড অব দি ডে বাইরে আর্মির গাড়িও রাখা আছে,
আর এটা বাংলাদেশ যেহেতু তাই রবীন্দ্রনাথও আছে
তার বলা সোনার বাংলাও আছে বটে
তাই এটা কলম্বিয়া হবে না কখনোই ভয় নেই সোনা’
…..
‘আমি তাহার এই দয়ার কথা শুনিয়া ভয়মুক্ত হইলাম
সাউন্ড সিস্টেমে বলা হইল সবকিছু নরমাল
এক পিংক পাঞ্জাবি পরা গেস্ট পুকুরের পাড়ে হাঁসদের দল
অবলোকন করিতে করিতে চিল্লাইয়া বলিলেন,
‘সবচাইতে বড় কথা দেশে আইন আছে।’

মাসরুর আরেফিন দেখান যে ক্ষমতা সমাজ ও রাষ্ট্রে কীভাবে শ্রেণী ও বৈষম্যের সুপারফিশিয়াল ফুয়েল ব্যবহার করে সামনে আগায়, কীভাবে সুপারফিশিয়ালি ফাংশন করে। ক্ষমতা ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক সবকিছুর বেশিরভাগটাই যে সুপারফিশিয়াল– ক্ষমতাকে বুঝলে এই সত্যটাও বুঝতে হবে। ক্ষমতার অপরিহার্য অংশ সুপারফিশিয়ালিটি— এই সত্যকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ নাই।

আঠারোশো শতকে অ্যাডাম স্মিথ তার ওয়েলথ অব নেশন বইতে যেটা বলেছিলেন— সমাজ ও সমাজের মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করে গুটিকয়েক মানুষ। স্মিথ যাদেরকে বলেছিলেন— মাস্টার অব ম্যানকাইন্ড। একবিংশ শতাব্দীতে এসে এই মাস্টার অব ম্যানকাইন্ডরা আরও বেশি ক্ষমতাবান। মাস্টার অব ম্যানকাইন্ড মানেই সুপার ধনী, সুপার ওয়েলদি। পৃথিবীতে, প্রতিটা রাষ্ট্রেই, প্রতিটা সমাজেই এই সুপার ধনী অংশ নিয়ন্ত্রণ করে সম্পদের বেশিরভাগ অংশ। তাই বৈষম্য মানেই, কোথাও শ্রেণিগত বৈষম্য ও শ্রেণিগত টানাপোড়েন তৈরি হওয়ার পূর্বশর্তই হলো এই সুপার ধনীদের কাছে সম্পদের পুঞ্জীভূত হওয়া।

সেই মাস্টার অব ম্যানকাইন্ডদের কথা আর তার বিপরীতে থাকা অসংখ্য মানুষদের কথা আর টানাপোড়েন এই বইয়ের কবিতাগুলিতে এসেছে প্রবলভাবে। সেই বিপরীতে থাকা মানুষদের বাস্তবতা স্যাঁতস্যাঁতে ভাবাবেগ হয়ে আসেনি, এসেছে এই পৃথিবীর জোড়াতালি দেওয়া সিস্টেম কীরকম বিশৃংখলভাবে জোড়াতালি দিয়ে তাদের বাস্তবতা তৈরি করেছে সেই সত্য সহ।

সেই মাস্টার অব ম্যানকাইন্ডদের কথা আর তার বিপরীতে থাকা অসংখ্য মানুষদের কথা আর টানাপোড়েন এই বইয়ের কবিতাগুলিতে এসেছে প্রবলভাবে। সেই বিপরীতে থাকা মানুষদের বাস্তবতা স্যাঁতস্যাঁতে ভাবাবেগ হয়ে আসেনি, এসেছে এই পৃথিবীর জোড়াতালি দেওয়া সিস্টেম কীরকম বিশৃংখলভাবে জোড়াতালি দিয়ে তাদের বাস্তবতা তৈরি করেছে সেই সত্য সহ। সিস্টেম কীভাবে, একটা গেম তৈরি করে আর দুইটা পক্ষ তৈরি করে দেয়— অবাস্তব দুইটা পক্ষ— একপাশে সুপার ধনী আর আরেক পাশে প্রিক্যারিওয়াস প্রোলেতারিয়েত। আর তারপর সিস্টেম নিজেই উপভোগ করতে থাকে সেই খেলা, উপভোগ করতে থাকে সেই খেলার অবাস্তবতা।

যেমন, নিয়ম মানতে হবে না দুনিয়াতে! আমার বিশেষ দুর্বলতা এই কবিতার প্রতি— যেটাকে আমি বাংলা সেরাদের সেরা কবিতাগুলির একটা বলব আর আমার বিচারে সবচেয়ে সেরা রাজনৈতিক কবিতাগুলির একটা। ফাইজুদ্দিন আর ড্রাগন— এই দুইটা ক্যারেক্টার দিয়ে যেন সিস্টেমকে চোখে চোখ রেখে বলা হলো— তোমার যা খুশি করো না!

‘বলি, ড্রাগন, অন্যায় হয়ে গেছে… ন্যায়বিচার সবচে’ বড় কথা।
ড্রাগন এই দফা মেঝের উঁচু দিয়েও আসে, মেঝের নিচু দিয়েও আসে।
সে বলে, স্যার অনেককাল আগে পাবনায় বিমল বিশ্বাসের দলে
কাজ করে বুঝেছি শ্রেণীশত্রু বলে একটা কথা আছে,
আবার শহরের সৌন্দর্য বলেও তো আছে কিছু,
তাই ফাইজুদ্দিনকে মানাতো না এইখানে,
অতএব ন্যায়বিচার নিষ্পন্ন করা গেছে শহরের তরফের থেকে।’

ক্ষমতা আর শ্রেণীর টানাপোড়েন ধরতে আর ধরে ফেলার পর সেই টানাপোড়েনকে কবিতার ভাষায় ট্রান্সলেট করতে যেমন ক্ষমতা ও শ্রেণীর ভিতরের সিনট্যাক্স জানতে হয়, সেরকম ভাষার সিনট্যাক্স নিয়ে খেলতে জানতে হয়, খেলার দক্ষতা থাকতে হয়। পরিস্থিতি যেহেতু আগুন হয়ে আছে— বইয়ে এই ব্যাপারটা প্রমাণিত যে ভাষার সিনট্যাক্স ও ভাষার অভ্যন্তরীন কাঠামোর ওপর মাসরুর আরেফিনের সেই মাস্টারিটা দারুণভাবে আছে। তিনি এই ক্ষমতাকে, তার দখল ও দক্ষতাকে ব্যবহার করেন যা বলতে চান সেটা বলার জন্য, কবিতার নামে তার এই দক্ষতা এক্সারসাইজ করার জন্য না। সচেতনভাবেই। অনেক কবিতার কথা বলা যায়, এই বইয়েরই। যেমন জিনারদী জিনারদী, তারিন্দ, এমত দৃশ্য দেখিছু কিছু আরু, মেঘনার পাড়ে, ততক্ষণে স্টেডিয়াম ঘিরে এবং আরও।

‘সে বলল সাবমেশিন গানের মতো ঠ্যাররর আওয়াজ করে:
‘না ভাই, আমি জাহাঙ্গীর, হর্সম্যান, জাতির ঘোড়াগুলো দেখাশোনা করি,
তবে ওই নামে ওই ‘আইনের উর্ধ্বে’ নামে এক লোক আছে,
আপনার অগ্নিখাত্রী বন্ধুর মা তাকে চেনে,
তারা সিলিন্ডার ও অক্সিমিটারের ব্যবসাপাতি করে,
থাকে ঘোড়া নিয়ে “জিনারদী” নামে এক অঞ্চল জুড়ে।’

আল জাজিরার ডকুমেন্টারি, তিস্তা ব্যারেজ, ডোনাল্ড ট্রাম্প, করোনা, কামারজুড়ি, ছোটোবেলার বনরুটি, আর্মির গাড়ি, সাগর ব্র্যান্ডের দা সবকিছুর কিছু অনুষঙ্গ আর কিছু বিষয় হিসাবে কবিতার জটিল ঘূর্ণির মধ্যে ফেলে সামনে নিয়ে যেতে যেতে এই বই তার সবগুলি কবিতাসহ দাঁড় করিয়ে দেয়, যা সকল গ্রেট কবিতাই দেয়— এক কসমিক ইনডিফারেন্সের সামনে। যে ইনডিফারেন্স একইসাথে বিশৃংখল এবং হয়তো পবিত্র— যেমন বলেন আমার প্রিয়তম লেখক— নিকোস কাজানজাকিস, যে জীবনের উদ্দেশ্য কী— এর উত্তরে। বলেন যে, জীবনের উদ্দেশ্য হলো, পবিত্র বিস্ময়ের মুখোমুখি হওয়া— টু ফেস দ্য স্যাক্রেড অ (Awe)।

একই রকমভাবে ওসিপ মান্দেলেশতাম যে প্রশ্ন বয়ে বেড়ান— And I was Alive কবিতায়—

“What is being? What is Truth?

Time intensified and time intolerable, sweetness raveling rot.
It is now. It is not.”

যেমন একইরকমভাবে এই বইয়ের ‘তারিন্দ’ কবিতার শেষে বলা হয়েছে—

‘আমাদের জীবনের সারাংশ একবারে এক ডাকে তুলে ধরে—
ওদিকে তারিন্দ যে তার দু বানানের ঘোলা নিয়ে শীতের নরম রোদ গায়ে মেখে
তাঁবু গেড়ে
বসে গেছে
গোলাবাড়ি আনাজ ও আমাদের নাটকীয় বনমহোতসব সব ঘিরে,
তাহা আহা-আহা কুকুরের নেত্র দিয়ে চতুর্দিকে প্রত্যক্ষ করে।’

ব্রুস চ্যাটউইন বলেছিলেন, লাইফ ইজ এ জার্ণি। এ জার্ণি ইজ এ ফ্র্যাগমেন্ট অব হেল। সংলাইনস উপন্যাসে।

আমি এই কবিতার বই, এর অনেক কবিতা অনেক অনেক বার পড়ার পরে বলতে চাই— এই বই তার প্রতিটা কবিতা সহ একটা জার্ণি, আর প্রতিটা কবিতা হলো ‘ফ্র্যাগমেন্ট অব হেল’। কবিতায় ভাষা দিয়ে ‘ফ্র্যাগমেন্ট অব হেল’ তৈরি করা, মহাবিশ্ব, পৃথিবী ও এই সিস্টেমের বিশৃংখলা আর ভায়োলেন্স ধরা সহজ কথা নয়।

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

জন্ম  টাংগাইলে। পড়াশোনা কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিতে। পেশায় আইটি প্রফেশনাল। গল্প, উপন্যাস ও চিত্রনাট্য লেখেন।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।