রবিবার, ডিসেম্বর ৪

‘কল্পনার গুরুত্বটা আমার কাছে অত্যন্ত বেশি’ : ফারুক মঈনউদ্দীন

0

Faruq Moinuddinগল্পকার, ভ্রমণ লেখক, অর্থনীতি বিশ্লেষক ও অনুবাদক। অধুনালুপ্ত দৈনিক বাংলায় প্রকাশিত প্রথম গল্পের মাধ্যমে ১৯৭৮ সালে গল্পকার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন তিনি। তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয় ১৯৯০ সালে। পরবর্তী সময়ে অর্থনীতি ও ব্যাংকিং বিষয়ক লেখালেখির মাধ্যমে কর্পোরেট জগতের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হন। ২০০০ সালের প্রথম থেকে মুম্বাই প্রবাসকালে দৈনিক প্রথম আলোতে তাঁর লেখা ‘মুম্বাইর চিঠি’ শিরোনামের নিয়মিত কলামটি যথেষ্ট জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। মূলত এই কলামটির মাধ্যমেই তাঁর ভ্রমণবিষয়ক লেখালেখির সূত্রপাত ঘটে। এযাবত প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে রয়েছে গল্পগ্রন্থ চারটি, অনুবাদ পাঁচটি, ভ্রমণ সাতটি, অর্থনীতি-ব্যাংকিং বিষয়ক গ্রন্থ চারটি এবং প্রবন্ধগ্রন্থ একটি। মার্কিন গবেষক ক্লিণ্টন বি সিলির লেখা জীবনানন্দ দাশের সাহিত্যিক জীবনী ‘অ্যা পোয়েট অ্যাপার্ট’ গ্রন্থের সফল অনুবাদ ‘অনন্য জীবনানন্দ’ বইটির জন্য তিনি ‘আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার ২০১১’ এবং ভ্রমণসাহিত্যে অবদানের জন্য ২০১৯ সালের বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। এই গুণী লেখকের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন কথাসাহিত্যিকি মোস্তফা অভি এবং রেজাউল করিম


মোস্তফা অভি: কেমন আছেন?

ফারুক মঈনউদ্দীন: হ্যাঁ ভালো। আমি তো করোনার সময় আরও কয়েকজনকে বলেছি, আসলে আমরা কেউ ভালো নাই। সবকিছু কেমন জানি স্থবির অবস্থায় না? সুতরাং ভালো আছি আমি একথা কাউকে বলবো না। দেশের কত লোক ভালো নেই, গরিবরা ভালো নেই, সাধারণ মানুষদের কী যে অবস্থা এই করোনার কারণে!

 

মোস্তফা অভি: লেখক হিসেবে আপনার একটা পরিচিতি গড়ে উঠেছে, এই যে আমরা চারপাশে আপনার কথা শুনি। পাঠক আপনার কথা বলে এটা আপনার কাছে কেমন লাগে?

ফারুক মঈনউদ্দীন: হ্যাঁ, এটা তো ভালো লাগারই কথা। তাই না? অনেক সময় দেখা গেছে নাম শোনার পর অনেকে আমাকে বলেছেন, ও আপনি! এটা অবশ্য ইন্টারভিউর অংশ হবে না। (রেকর্ডকৃত কথাগুলি আমরা এখানে লিখলাম না।)

সুতরাং এটা তো বলার অপেক্ষা রাখে না, খুব স্বাভাবিকভাবেই কেউ নাম শুনে যদি আমাকে শনাক্ত করতে পারে যে, আমিই সেই ব্যক্তি। তাহলে সেটা ভালো লাগারই কথা। এটা অবশ্য এক ধরনের প্রাপ্তি। আসলে আমরা তো কেউই অর্থের জন্য লিখি না। সাধারণত আমরা তৃপ্তির জন্য লিখি। সেই অর্থে কেউ যদি একজন বলে, আপনার লেখা আমি পড়েছি, আপনার লেখা আমার ভালো লাগে। সেটা তো খুশি হওয়ার কথা। আর একজন লেখকের জন্য এই প্রাপ্তিটা খুব যথেষ্ট বলেই আমি মনে করি।

 

মোস্তফা অভি: আপনার লেখালেখি শুরু হয়েছিল কীভাবে?

ফারুক মঈনউদ্দীন: লেখালেখি যেভাবে সবার শুরু হয় ঠিক সেভাবেই। আমার ক্লাস সিক্সে পড়ার সময় স্কুল ম্যাগাজিনে একটা ছড়ার মতো ছাপা হয়েছিল। আজকের সমকালের কালের খেয়াতে আমার একটা ইন্টারভিউ আছে ওখানে ঘটনাটা আছে। সেটা হলো, আমি যখন ক্লাস সেভেনে পড়ি তখন আমাদের স্কুল থেকে একটা রচনা লিখতে দেয়া হলো—বড়ো হইলে আমি কি হইব’। এটা শুনে আমার মা বললেন, তুই এভাবে লেখাটা শুরু করবি, এভাবে— আমরা বাসে করে কক্সবাজার যাচ্ছি হঠাৎ মাঝপথে গিয়ে বাস আর সামনে যাবে না। কেন যাবে না, তা হচ্ছে এলেঙ্গা ব্রিজটা ভেঙে পড়েছে। এই ব্রিজটাও তো ইঞ্জিনিয়াররা করেছিল একদিন অথচ, এটা ভেঙে গেছে। সুতরাং এটা দিয়ে শুরু করে তুই লিখবি, তুই একজন সৎ ইঞ্জিনিয়ার হতে চাস। ঠিক তোর বড়ো ভাইয়ের মতো।

তো, আমি রচনাটা লিখে যখন জমা দিলাম। অবশ্য সেটা আমার হোমওয়ার্ক ছিল। ক্লাস টিচার আমার রচনাটা পড়ে সেটাকে টিচার্স রুমে নিয়ে গেলেন। আমাকে কিছুই বলেননি। অবশ্য পরে আমাকে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়। তো, আমি গেলাম টিচার্স রুমে। গিয়ে বুঝলাম, যে উনি রচনাটা সম্পর্কে সবাইকে বলেছেন। আমাকে জিজ্ঞেস করা হলো, তুমি এটা কীভাবে লিখেছ? আমি বললাম, আমার মা আমাকে লেখাটা এভাবে শুরু করতে বলেছিলেন। অবশ্য তাঁরা সবাই আমার বাবাকে চিনতেন বলে খুব একটা অবাক হননি। তবে একটা বিষয় হলো যে, ফিকশনের মতো করে একটা স্কুলের রচনা যে শুরু করা যায় সেটা আমি মায়ের কাছ থেকেই শিখেছি।

তারপর যদি আরেকটু পরের দিকে এগিয়ে যাই তাহলে বলব, আমি যখন স্কুলে পড়তাম তখন কবিতা লিখতাম যখন কলেজে পড়তাম তখনও কবিতা লিখতাম। ক্লাস টেনে পড়ার সময় আমি কবি আহসান হাবীবের কাছে কবিতা নিয়ে যেতাম। তবে আমার সেইসব কবিতা কখনও কোথাও ছাপা হয়নি। তবে সত্যিকারার্থে আমার লেখা কবিতা যেটা প্রথম কোনো প্রচারমাধ্যমে গেছে তা হলো, ঢাকা রেডিও। তখন ঢাকা রেডিওতে ‘নবীন কণ্ঠ’ নামে একটা অনুষ্ঠান হতো।

 

মোস্তফা অভি: আচ্ছা।

ফারুক মঈনউদ্দীন: তিনটে কি সাড়ে তিনটার সময় কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের জন্য মানে যুবকদের জন্য এই অনুষ্ঠানটা হতো। আমি তখনো মেট্রিক পরীক্ষা দিইনি। তবে সেসময়ও আমার গোঁফটোফ ছিল বলে অনেকেই আমাকে ঢাকা কলেজের ছাত্র বলে মনে করত।

 

মোস্তফা অভি: আপনি তখন কুমিল্লা থাকতেন মনে হয়।

ফারুক মঈনউদ্দীন: না না, আমি কখনও কুমিল্লা ছিলাম না। আমি তখন ঢাকায় থাকতাম ইস্কাটন গার্ডেনে। যা হোক, ওখান থেকে শাহবাগে রেডিও স্টেশনে গিয়ে কবিতা দিয়ে এলাম। কিছুদিন পর আমার কাছে একটা চিঠি আসে, নবীন কণ্ঠ অনুষ্ঠানে স্বরচিত কবিতা পাঠের পাঁচ মিনিটের একটা প্রোগ্রাম। সম্মানী হচ্ছে ৩৫ টাকা।

 

মোস্তফা অভি: পয়ঁত্রিশ টাকা!

ফারুক মঈনউদ্দীন: এটা হচ্ছে তিয়াত্তর সালের কথা। তখন পঁয়ত্রিশ টাকারও অনেক দাম।

 

মোস্তফা অভি: হ্যাঁ অনেক মুল্য।

ফারুক মঈনউদ্দীন: তখন যেসব কবিতা রেডিওতে পড়তাম সেগুলো কোথাও যায় নাই, পড়ে আছে। মানে কোথাও প্রকাশ হয়নি। আর এগুলোকে কবিতা বলে কেউ স্বীকার করবে না, এমনকি আমিও হয়তো করবো না।

তো, এই ভাবে আমার শুরু। আমি ১৯৭৬ সালে ইন্টারমিডিয়েট পাস করলাম। পরীক্ষার পর এক বছর আমাদের বসিয়ে রাখা হলো কারণ সেভেনটি সেভেন ব্যাচের সাথে আমাদের একসাথে ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি করা হবে। তখন আমি জীবনে প্রথম একটা গল্প লিখলাম। তারপর আটাত্তর সালে ভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার পর কবি আহসান হাবীবের কাছে প্রথম লেখা এই গল্পটা নিয়ে যাই। আগে তো তাঁর কাছে কবিতা নিয়ে যেতাম, এবারে গল্প নিয়ে গেলাম। গল্পটা দুই তিন সপ্তাহের মধ্যে দৈনিক বাংলার সাহিত্য পাতায় ছাপা হলো। তখনকার দিনে কিন্তু দৈনিক বাংলায় গল্প ছাপা হওয়াটা বিরাট ব্যাপার ছিল।

তবে গল্পটা যে এত তাড়াতাড়ি ছাপা হবে সেটা জানতাম না। তাছাড়া তখন পত্রিকা সেভাবে পড়তামও না। কিছুদিন পর আমার এক বন্ধু রাবেয়া খাতুনের ছেলে অর্থাৎ সাগর ভাইয়ের ছোটো ভাই, বুয়েটে পড়তো। একদিন ওর সাথে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে আমার দেখা। ও বলল, তোর নাকি একটা গল্প ছাপা হয়েছে?

আমি বললাম, ওহ, তাই নাকি! কোথায়?
ও বলল, দৈনিক বাংলায়।
আমি বললাম, দৈনিক বাংলায় আমি গল্প দিয়ে এসেছি তবে তা এত তাড়াতাড়ি যে ছাপা হবে সেটা জানতাম না।
আম্মা তো তোর কথাই বলল, তোর গল্প ছাপা হয়েছে।
তখন দুই সপ্তাহ পার হয়ে গেছে। আমি লাইব্রেরির রেফারেন্স রুমে গিয়ে দৈনিক বাংলার ফাইল বের করলাম। পুরনো ফাইল। দেখি হ্যাঁ, আমারই গল্প সেটা। প্রথম লেখা গল্প কবি আহসান হাবীবের হাত দিয়ে ছাপা হলো।

 

মোস্তফা অভি: ওই গল্পটার নাম কী ছিল?

ফারুক মঈনউদ্দীন: গল্পটার নাম ছিল ‘কালবেলা’।

 

মোস্তফা অভি: কালবেলা!

ফারুক মঈনউদ্দীন: ওই গল্পটা কোনো গ্রন্থভুক্ত হয়নি। জীবনের প্রথম গল্প, কাঁচাইতো ছিল। আমি গল্পটা কোনো গ্রন্থে রাখিনি, কোনো কপিও আমার কাছে নাই। তো ওইভাবেই আমি লেখালেখি শুরু করেছিলাম। সুতরাং আমার শুরুটা বিভিন্নভাবে হয়েছিল তবে কোনটাকে ধরব তা নির্দিষ্ট করে বলতে পারছি না।

 

রেজাউল করিম: অনেকের ক্ষেত্রেই তাই-ই হয়।

মোস্তফা অভি: আপনার সময় যাঁরা লিখতে শুরু করেছিলেন, বিশেষ করে লেখকদের এক ধরনের বন্ধুবান্ধব থাকে না? অর্থাৎ আপনার সেই সময়কার লেখক বন্ধুদের সম্পর্কে কিছু জানতে চাই।

ফারুক মঈনউদ্দীন: আমাদের ব্যাচে যারা লিখতে শুরু করেন তাদের কেউ কেউ আছেন আবার অনেকেই এখন নাই। যেমন আমাদের সাথে সৈয়দ কামরুল হাসান নামের একজন গল্প লিখত। ঈর্ষণীয়রকম ভালো গল্প লিখত সে।

রেজাউল করিম: সৈয়দ কামরুল হাসান?

ফারুক মঈনউদ্দীন: তখন ‘তক্ষক’ নামে ওর একটা গল্প ছাপা হয়েছিল।

রেজাউল করিম: সম্ভবত আমি এই কামরুল হাসানকে চিনি।

ফারুক মঈনউদ্দীন: সম্ভবত সে কোনো একটা এনজিওতে আছে।

রেজাউল করিম: হ্যাঁ হ্যাঁ। একটা এনজিও তে আছেন। সে আমার বন্ধু, ঢাকা ইউনিভার্সিটির ইতিহাসের ছাত্র।

ফারুক মঈনউদ্দীন: হ্যাঁ, হিস্ট্রির ছাত্র। তো, আমি যখন তার গল্প পড়ি মনে হতো ঈর্ষণীয় গল্প। তাকে সেই সময়ে হাসান আজিজুল হক পর্যন্ত চিনতেন। আমাদের অনেককেই তো হাসান আজিজুল হক চিনতেন না তখন। তার গল্প পড়ে আহসান হাবীব পর্যন্ত প্রশংসা করেছেন, অথচ এখন সে লেখালেখিতে নাই ।

রেজাউল করিম: নাই হয়তো এইজন্য যে, সে যে ধরনের গল্প লেখেন সম্ভবত তাঁর লেখার পাঠক বাংলাদেশে নাই। এটা হতে পারে!

ফারুক মঈনউদ্দীন: না, এটা একেবারেই ঠিক বলা যায় না। যদি সেটাই বলা হয়, তাহলে হুমায়ুন মালিকের কথা ধরা যাক। হুমায়ুন মালিক আমাদের সমসাময়িক একজন লেখক বরং বলা যায় তার লেখা বাংলাদেশের পাঠকদের ভালো লাগার কথা নয়। এটা যদি সৈয়দ কামরুল হাসান মনে করে থাকে তাহলে এটাও ভুল ধারণা কিংবা না লেখার একটা অজুহাত।

রেজাউল করিম: হতে পারে তিনি লেখাগুলো প্রকাশ করার জন্য পাবলিশার পাচ্ছেন না।

ফারুক মঈনউদ্দীন: আজকাল কি পাবলিশার পাওয়া এমন কঠিন? এখন তো পাবলিশাররা লেখকদের খোঁজে। অর্থাৎ তাদের এখন একটা ভালো বই বের করা দরকার। পাবলিশার পাওয়া যায় না এটা কোনো কথা নয়, অবশ্য সে কেন লিখছে না সেটা আসলে তার ব্যাপার।

সেই সময় আমাদের একটা গ্রুপ ছিল ‘সিম্ফনি’ নামে। সেটা ছিল কবিতা আন্দোলনের একটা গ্রুপ। আমি আস্তে আস্তে তখন কবিতা থেকে বের হয়ে আসছি, গল্পের দিকে চলে যাচ্ছি। সিম্ফনির মধ্যে একমাত্র তুষার দাশ ছাড়া সাহিত্যে এখন আর কেউ নাই। তাদের মধ্যে অনেকেই এখন আর লেখে না। কেউ কেউ আবার বিদেশে চলে গেছে। যারা আবার দেশে আছে কিন্তু তারা লেখালেখি একেবারেই ছেড়ে দিয়েছে। আমাদের সময়ের আরেকজনের নাম আলী রীয়াজ।

 

মোস্তফা অভি: মঈনুল আহসান সাবেরের কথা তো বললেন না।

ফারুক মঈনউদ্দীন: মঈনুল আহসান সাবের একটু সিনিয়র ছিলেন। রফিক উল্লাহ খান, সৈয়দ আজিজুল হক তাঁরা এখন তাঁদের জায়গায় স্বমহিমায় আছেন। আসলে কামাল চৌধুরী, রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, জাফর ওয়াজেদ— এরা খানিক সিনিয়র হলেও আমাদের সময়েরই তাঁরা।

 

মোস্তফা অভি: আচ্ছা, আপনার কি মনে হয়, লেখক হওয়ার পিছনে কোনো সূত্র আছে? অথবা কেউ যদি একদিন হঠাৎ মনে করেন, তিনি লেখক হতে চান সে ক্ষেত্রে তার কী হতে পারে?

ফারুক মঈনউদ্দীন: ঠিক এরকম কোনো সূত্র নাই যেটাকে তত্ত্বাকারে বলা যায়। থিওরিটিক্যাল অর্থে তেমন কিছু আছে বলেও তো আমার বিশ্বাস হয় না। তবে কেউ যদি মনে করে আমি লেখক হব তার মধ্যে যদি লেখক হওয়ার মতো দক্ষতা, কল্পনাশক্তি বা কাহিনি ফাঁদার মতো প্রবণতা থাকে তাহলে তিনি পারবেন। কেউ আর চাইলেই তো হুট করে লেখক হতে পারেন না! আমাদের মধ্যে অনেকেই আছেন যাঁরা লেখক হতে চান। কেউ কেউ আছেন, তাঁদের সামাজিক বা পেশাগত অবস্থানের কারণে লেখা ছাপা হয়, তবে সেই অর্থে তো আসলে তারা লেখক হন না। এক্ষেত্রে বলা যায় তাঁদের ইচ্ছে ছিল কিন্তু মেধা ছিল না।

মুরাকামির কথাটাই ধরেন না? হারুকি মুরাকামি, তিনি তো কখনও লেখক হবার কথা ভাবেননি। তাঁর লেখক হওয়ার কথাটা একদিন হঠাৎ করে মাথায় আসে।

 

মোস্তফা অভি: সম্ভবত রেস্টুরেন্ট চালানোর সময়।

ফারুক মঈনউদ্দীন: রেস্টুরেন্ট চালানোর সময় নয়, তিনি স্টেডিয়ামে বেসবল খেলা দেখতে গিয়েছিলেন। হঠাৎ করে একজন জোরে একটা শট মারলে ঠক করে একটা শব্দ হয়। ঠিক সেই সময় তাঁর মনে হলো যে তাঁকে লিখতে হবে। মানে তিনি লেখক হবেন। আসলে সেটা রেস্টুরেন্ট ছিল না, উনি একটা জ্যাজবার চালাতেন, সব কাজ শেষ হয়ে গেলে অনেক রাত পর্যন্ত উনি লিখতেন। প্রথম বইটা তো পুরস্কারও পেল। বিয়ে করার পর ওঁর স্ত্রীকে বললেন, আমি এগুলো সব ছেড়েছুড়ে দিয়ে লেখালেখির কাজে মনোনিবেশ করতে চাই। সুতরাং ওঁর ক্ষমতা ছিল At the same time ওঁর ইচ্ছেও ছিল, সেইসঙ্গে চেষ্টা। তাই উনি লেখক হয়ে গেলেন। সুতরাং লেখক হওয়ার ইচ্ছার ক্ষেত্রে কোনো সূত্র নয় বরং প্রখর ক্ষমতাও থাকতে হয়। যদি ইচ্ছে না থাকে তাহলে তিনি লেখক হতে পারবেন না, আবার ইচ্ছে আছে কিন্তু চেষ্টা নেই, তাহলে সেভাবেও সম্ভব না। এই দুইটা একসাথে যদি হয় সেটা সূত্র হলেও হতে পারে। লেখক হওয়ার জন্য ইচ্ছা, অধ্যবসায় এবং তার ভেতরকার ক্ষমতা এগুলো যদি একসাথে মেলে তাহলে সেটাকে একটা সূত্রে ফেলা গেলেও যেতে পারে। তবে কোনোটাকেই এককভাবে সূত্র বলা যাবে না। আমি তা মনে করি না।

 

রেজাউল করিম: একজন লেখককে সমাজের অন্য সব মানুষ থেকে পৃথক থাকতে হবে, এ সম্পর্কে আপনার মতামত কী? লেখক খুব বেশি বিনীত হবেন নাকি একটু আত্মকেন্দ্রিক হবেন? অনেক লেখকের ক্ষেত্রে দেখা যায়, খুব বেশি আত্মকেন্দ্রিক, আবার কেউ আছেন অত্যন্ত সামাজিক। আপনি কি মনে করেন, লেখকরা সমাজের অন্য মানুষের থেকে একটু ভিন্ন সত্তার হবেন?

ফারুক মঈনউদ্দীন: ভিন্ন সত্তার এই কারণে হবেন যে, একজন লেখক কোনো একটি জিনিসকে যেভাবে দেখেন, অন্য দশজন কিন্তু সেইভাবে জিনিসটাকে দেখবেন না। ওইটাই হচ্ছে একমাত্র ডিফারেন্স। অর্থাৎ যিনি লেখক তিনি যেভাবে জিনিসটাকে দেখবেন সেইম জিনিসটাকে যিনি লেখক না তিনি অন্যভাবে দেখবেন। এটাই হচ্ছে একজন লেখকের পারসেপশন বা সত্তা।

অন্যভাবে যদি বলি, আপনি একটা ফুলদানি যেভাবে দেখবেন, একজন লেখক হয়তো এটাকে সেভাবে দেখবেন না সুতরাং পার্থক্য হচ্ছে ওখানে। আর দুই নম্বর কথা হচ্ছে, আলাদা থাকবে কি থাকবে না সেটা কিন্তু নির্ভর করে একেবারেই লেখকের ওপর। কেউ কেউ মনে করেন, লেখকদের একেবারেই অসামাজিক হতে হবে। অসামজিক হলেই নিজের মতো করে চিন্তা করতে পারবেন, সময় কাটাতে পারবেন। বরং সামাজিক হলে অনেকের সাথে মিশতে হয়, অনেক সময় নষ্ট হয় এটাও তাঁর অসামাজিক হওয়ার কারণ হতে পারে। আমি অপ্রয়োজনীয় সামাজিকতা আগে করতাম কিন্তু এখন আর করি না।

 

রেজাউল করিম: একটা সাপ্লিমেন্টারি কোয়েশ্চেন করি। একজন লেখক যখন লেখেন তখন তার লেখার ভেতরে বিভিন্ন ধরনের শব্দ, বাক্য, উপমা ইত্যাদি আসতে পারে। এক্ষেত্রে তার পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুমহল এমনকি সমাজ থেকে কোনোরকম যদি বিরূপ প্রতিক্রিয়া আসে তাহলে লেখক কি সেটা কনসিডার করবেন, নাকি নিজস্বতা বজায় রেখেই তিনি লিখবেন?

ফারুক মঈনউদ্দীন: এটা কিন্তু লেখক টু লেখক ভেরি করবে, কারণ খুব বাস্তব বুদ্ধিসম্পন্ন অনেকেই কিন্তু লেখেন তবে বেশিরভাগ লোক তাঁদেরকে বাস্তব জ্ঞানবুদ্ধিসম্পন্ন লোক মনে করেন না। তাঁরা মনে করেন এঁরা কল্পনার জগতে বসবাস করেন, বাস্তব জীবনের সাথে এঁদের কোনো যোগাযোগ নাই। বিশেষ করে এটা কবিদের ক্ষেত্রে বেশি হয়। কবিদের সম্পর্কে সব সময়ই সাধারণ মানুষ মনে করে, এরা তো পাগল টাইপের লোক, এদের কোনো বাস্তব বুদ্ধি নাই, আর এঁরা কল্পনার জগতে ডুবে থাকতে ভালোবাসেন।

 

মোস্তফা অভি: বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একজন লেখকের ওপর কী ধরণের প্রতিক্রিয়া আসে বলে আপনার মনে হয়?

ফারুক মঈনউদ্দীন: ওই যে বললাম, লেখক একটা কল্পনার জগতে বিরাজ করেন। আর এটা নিয়ে কারো কারো বিরূপ প্রতিক্রিয়া থাকতে পারে, বিশেষ করে এটা পরিবার থেকে বেশি আসে। কারণ তারা মনে করে, লেখালেখির জগতে গেলে কেউ আর তখন প্র্যাকটিক্যাল জীবনে থাকেন না। অনেকক্ষেত্রে একজন লেখকের জীবন এবং পেশায় চেঞ্জ আসতে পারে। আবার এসবের উল্টোও হতে দেখা যায়। অনেকেই কিন্তু পরিবার থেকে লেখালেখির জন্য খুব বেশি সাপোর্ট পান। তবে অ্যাবসল্যুটলি বা নিরঙ্কুশভাবে কোনোটাই বলা যাবে না।

 

রেজাউল করিম: একজন লেখকের লেখালেখির সাথে জীবনধারণেরও একটা ব্যাপার থাকে। আপনার কি মনে হয়, আমাদের দেশে লেখালেখি করে খেয়ে পরে বেঁচে থাকা সম্ভব?

ফারুক মঈনউদ্দীন: আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে যদি বলি, এদেশে এখনো সেই সুযোগ আসেনি। আমাদের দেশে লেখালেখি করে কেউ একজন সৎভাবে বসবাস করতে পারবে এমনটা আশা করার সময় আসেনি। অথচ আপনারা পশ্চিমাবিশ্বে এমনকি আমাদের পাশের দেশ ভারতের দিকে তাকালেও দেখবেন, একজন মানুষ শুধুমাত্র লেখালেখির ওপরে বেঁচে থাকতে পারেন। আমাদের দেশে এরকম কজন আছেন যারা লেখালেখিকে উপজীব্য করে জীবন ধারন করতে পারছেন!

 

রেজাউল করিম: আমি পাঁচ সেকেন্ডের ব্রেক চেয়ে একটা কথা বলতে চাই। আমি ‘হিমালয়ের দেশে’ নামে একটা বই লিখেছিলাম। যেহেতু আমি নেপালে সাতবার গিয়েছি। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে দশটা গল্প নিয়ে আমি বইটা লিখেছি। সেখানে একটি ভ্রমণগদ্যের প্রসঙ্গ ছিল যে, লাইভ গড্রেজকে নিয়ে। আপনি নিশ্চয়ই লাইভ গড্রেজ সম্পর্কে জেনে থাকবেন। তো, সেখানে ঘটনা হচ্ছে রাজার দরবারে পাঁচ বছরের একটি কন্যাকে আনা হতো এবং সেই মেয়েটির বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য থাকতে হতো। যেমন তার সুমসৃণ কণ্ঠদেশ, সুডৌল বক্ষযুগল এরকম সাতটি বৈশিষ্ট্য। আর এসব ঠিক করতেন একজন ব্রাহ্মণ পণ্ডিত। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, পাঁচ বছরের একটি মেয়ের বক্ষদেশ কীভাবে সুডৌল হয়! সে যা ই হোক আমি মোট সাতটি বৈশিষ্ট্য লিখে রেখেছিলাম। তো হলো কী, একবার আমার বাচ্চার স্কুলে আমার ওয়াইফের সঙ্গে একজন মহিলার দেখা হয়েছিল। সেই মহিলা আমার ওয়াইফকে বলল, আপনার স্বামী এগুলো কী লেখে? আপনি তাকে কিছু বলেন না! মজার ব্যাপার হলো, এইটা গতকাল আমার ওয়াইফ আমাকে বলেছে। আমি তাকে বললাম, কতদিন আগেকার ঘটনা?

সে বলল যে, এটা চার বছর আগের।

আমি বললাম, এই চার বছর তুমি এটা তোমার ভেতর লুকিয়ে রেখেছো?

সে বলল, না, তুমি তোমার মতো করে লেখ আর এটা নিয়ে আমি তো তোমাকে বেশি কিছু বলতে পারি না। তাছাড়া তোমার ওপর আমার বিশ্বাস আছে। তাছাড়া এটা তো তোমার ব্যক্তিগত চরিত্র না।

আবার ইনবক্সে অনেক আত্মীয়স্বজন এমনকি অনেক পাঠকও আমাকে বলেন যে, আপনার যেহেতু লেখালেখির একটা ক্ষমতা আছে, সেটা দিয়ে পরকালের জন্য কিছু করেন। এখন পরকালের জন্য তো আমার কিছু লেখার ক্ষমতা নাই আর তাছাড়া আমি তো ধর্ম সম্পর্কে অত ভালো কিছু জানিও না। এই বিষয়টা আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

ফারুক মঈনউদ্দীন: না, সেটা ঠিক আছে। আমাদের সমাজের জন্য এখনো কেউ সত্যিকারার্থে একটি বিশ্বস্ত আত্মজীবনী লিখতে পারেননি। নেরুদার আত্মস্মৃতিতে দেখেন, সেখানে তিনি বলেছেন, এক কৃষক পরিবারের সাথে থাকতে গিয়ে রাত্রিবেলা খড়ের গাদার ভেতরে কি হয়েছিল। আবার রেঙ্গুন যাত্রার সময় নাইট ক্লাবে বসে একজন তার সঙ্গে কি করেছিল সেসব অকপটে বলা আছে। মহাত্মা গান্ধী তাঁর আত্মজীবনীতে কী লিখছেন! তার বাবা যখন মারা যান তখন তিনি তাঁর বাবার শয্যার পাশে থাকতে পারেননি। অথচ তিনি রাত্রিবেলায় বরাবর বাবার পাশেই থাকেন। তাঁর বাবা যখন মারা যান তখন তিনি তার নবপরিণীতা স্ত্রীর সঙ্গে বিছানায় ছিলেন। গান্ধীজী কিন্তু এই কথাটা আত্মজীবনীতে লিখেছেন। কিন্তু আমাদের দেশে এটা কি কেউ লিখবে!

এই যে মোস্তফা অভি বলছেন, সমাজে বিরূপ প্রতিক্রিয়া কিছু থাকে, আর এসব কারণেই কিন্তু আমাদের দেশের লেখকেরা অকপট হতে পারেন না, এসব কারণেই কিন্তু আমরা কোনো আত্মজীবনীতে প্রকৃত সত্যটা খুঁজে পাই না।

 

মোস্তফা অভি: এই কথার প্রসঙ্গে বহু বছর আগের একটা লেখার কথা মনে পড়ে গেল। সেটা হচ্ছে মীর মশাররফ হোসেনের ‘গাজী মিয়ার বস্তানী’ বইটা বহুবছর আগে পড়েছিলাম। যেখানে তিনি লিখেছেন, তাদের ঘরের কাজের মেয়ের সঙ্গে তার বাবার একটা অনৈতিক সম্পর্ক ছিল সেইসঙ্গে মীর মশাররফ হোসেনেরও সেই মেয়েটির সঙ্গে একই সম্পর্ক। সম্পর্কটা ঠিক এরকম, একজন মহিলার সঙ্গে একজন পুরুষের বিছানায় যাওয়ার ব্যাপার-স্যাপার। অথচ মীর মশাররফ হোসেন কিন্তু তাঁর বাবার ব্যাপারটা জানতেন। তিনি কিন্তু এই দুঃসাহস দেখিয়েছেন অর্থাৎ তিনি অকপট স্বীকার করেছেন পিতাপুত্রের সেই নিষিদ্ধ সম্পর্কের কথা। তিনি আত্মজীবনী বলতে সৎ ছিলেন এবং অকপট ছিলেন। তাহলে এখন, এই সময়ে, কেন এই ধরনের সাহস কোনো লেখক করেন না এবং তারা কেন একটি বিশ্বস্ত এবং সত্যিকারের আত্মজীবনী লেখেন না?

ফারুক মঈনউদ্দীন: খোয়াবনামা তে নাই? সেখানে সৎ মায়ের সঙ্গে ছেলের শারীরিক সম্পর্ক আছে।

 

মোস্তফা অভি: হ্যাঁ আছে তো। ওই যে বাবা যখন মারা যায়। ছেলে এবং সৎ মা শোকে মুহ্যমান। তারপর ছেলের শরীরে মা মৃত স্বামীর ঘ্রাণ খুঁজে পায়। আছে তো।

ফারুক মঈনউদ্দীন: একেবারে যে লিখেন না বিষয়টা তা নয়, তবে অনেক রেখে ঢেকে লেখেন আর কি। তবে সেভাবে সাহসী লেখা আসছে না। গড়পরতা লেখা। আসলে এইটা কেউ করে না আমাদের সামাজিক সমস্যার জন্য।

 

রেজাউল করিম: তাহলে কি মনে করব এটা এখন আরও বেশি নেতিবাচক হয়ে যাচ্ছে?

ফারুক মঈনউদ্দীন: হ্যাঁ খুবই নেতিবাচক হয়ে যাচ্ছে। সামনে যে দিনগুলো আসছে সেটা আরও কতটা হবে কে জানে! তাই না?

 

মোস্তফা অভি: আমার মনে হচ্ছে যে সাম্প্রদায়িকতার জন্য ধীরে ধীরে লেখকদের ভেতর থেকে এই সাহসটাই হারিয়ে যাচ্ছে।

রেজাউল করিম: সাম্প্রদায়িকতার জন্য সেটাও ঠিক বলা যায় না। আপনার কি তাই মনে হয়?

 

ফারুক মঈনউদ্দীন: সেটা তো ওখান থেকেই আসছে অর্থাৎ তার সাম্প্রদায়িকতা তো একটা পর্যায় এসে যায়।

 

মোস্তফা অভি: সাহিত্য তৈরির ক্ষেত্রে একজন লেখকের আসলে কতটা নির্দয় হওয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?

ফারুক মঈনউদ্দীন: হ্যাঁ, লেখালেখির জন্য একজন লেখককে অবশ্যই নির্দয় হতে হয়। সে ক্ষেত্রে পাঠক কী ভাববে কী ভাববে না সেটা নিয়ে লেখকের কোনো দায় নেই কিন্তু। এক্ষেত্রে খুব সাধারণ একটা উদাহরণ দেয়া যায় সেটা হচ্ছে বাকের ভাইয়ের ফাঁসি। আমাদের মতো দেশে টিভি নাটকের একটি দৃশ্য নিয়ে কী একটা কাণ্ড হয়ে গেল। বিদেশে কী হয় সেটা আমি জানি না, তবে একজন লেখকের লেখার একটি চরিত্রের ফাঁসি হবে এবং চরিত্রটিকে ফাঁসি না দেয়ার জন্য ঢাকা শহরে মিছিল হয়, এটা কিন্তু সত্যিই ইউনিক। কিন্তু তিনি তো নির্দয় হয়েই বাকের ভাইকে ফাঁসি দিয়েছেন। হুমায়ুন আহমেদ পপুলার সাপোর্ট যেটা অর্থাৎ যেটা পপুলার দাবি তা কিন্তু মানেননি। সুতরাং লেখককে নির্দয় হতে হয়, তা না হলে কোনো লেখক তার চরিত্রকে কখনও হত্যা করতেন না। লেখক নির্দয় না হলে লেখাগুলো হতো অনেকটা রূপকথার মতন। অবশেষে তাহারা অতি সুখে শান্তিতে দিন কাটাইতে লাগিল–এরকম। লেখককে তার লেখার জন্য নির্দয় হতে হবে এটাই আসল কথা।

 

মোস্তফা অভি: অনেককেই বলতে শোনা যায়, লেখালেখির জন্য একটা নির্জন পরিবেশ দরকার আবার কেউ কেউ মনে করেন, সংসারধর্ম পালন করে লেখালেখি করা যায় না। এই প্রসঙ্গে আপনার আসলে কী বলার আছে।

ফারুক মঈনউদ্দীন: আমি আসলে সত্য কথাটাই বলি। লেখালেখির জন্য একটা নির্জন জায়গায় গিয়ে লিখতে হবে, নির্জন জায়গায় গিয়ে বসতে হবে এটা আমি আসলে বিশ্বাস করি না। এই যে আমি এখন কোনো চাকরি করছি না। আমার হাতে এখন অঢেল সময় তার মানে কি আমার লেখার কোয়ান্টিটি এখন বেড়ে গেছে? বরং আমি যখন চাকরি করতাম তখন এখনকার চেয়ে আরও বেশি পরিমাণে লিখতাম। তারচেয়ে বরং কেউ চাইলে হাজার ঝামেলার মধ্যেও লিখতে পারেন। আবার অনেকের কাছে শুনি যে, ঈদ সংখ্যায় একটা উপন্যাস লেখার জন্য হোটেলে রুম ভাড়া করে থাকেন। সেটাও তো আমাদের দেশে আছে, তাই না? আমি কারো নাম বলছি না তবে এখনও এটা অনেকে করেন। সুতরাং আমি মনে করি, লেখালেখির জন্য কোনো নির্জন জায়গা বেছে নিতে হবে এটা মনে হয় ঠিক না। তবে হ্যাঁ, কোনো কিছু থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা সেটা আলাদা কথা। আমার তো লেখালেখির জন্য আলাদা কোনো রুম নাই। অনেকের আছে না? থাকে তো। লেখালেখির জন্য আলাদা কোনো রুম থাকে। বেডরুমের একটা কোনায় টেবিল-চেয়ার আছে, সেখানে বসেই আমি লিখি। এটাতে আমি কখনও যে খুব বেশি ঝামেলায় পড়ি বা ডিসট্র্যাকশন হয় তা কিন্তু নয়।

 

মোস্তফা অভি: কারো কারো মতে অস্তিত্বের সংকট, অভাব, নিরাপত্তাহীনতা ইত্যাদির কারণ মানুষকে একটা নিরন্তর কষ্টের ভেতর ঠেলে দেয়। আর সেই কারণে মানুষ লিখতে উদ্বুদ্ধ হয়। আপনি এটাকে কতটুকু সত্য মনে করেন?

ফারুক মঈনউদ্দীন: এটা আমি অনেকাংশে সত্য মনে করি। যারা খুব বেশি নিস্তরঙ্গ, সুখি জীবনযাপন যারা করেন, আপনি লক্ষ্য করবেন তাঁরা কিন্তু বেশিরভাগই ভালো লেখেন না। তাঁদের যে লেখার ক্ষমতা নেই তা কিন্তু নয়। যেহেতু তাদের জীবনের ঘাত-প্রতিঘাত মানে আমি অর্থকষ্টের কথা বলেছি সেসব দেখা হয় না সেজন্য তারা মনস্তাত্ত্বিক বিষয় নিয়েই বেশি লেখেন। আপনি যদি অন্যভাবে মনে করেন, এই যেমন, দস্তয়েভস্কি জুয়া খেলে সর্বস্বান্ত, দেনার দায়ে তলানো। তাঁর টাকা দরকার। অবশেষে তিনি পাবলিশারের সাথে একটা চুক্তি করলেন। চুক্তিটা ছিল এক ধরনের আন্ডারটেকিংয়ের মতন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যদি পাবলিশারকে একটা পাণ্ডুলিপি না দেওয়া হয় তাহলে আগামী নয় বছর তাঁর লেখা যত পাণ্ডুলিপি হবে সেগুলোর রাইট পাবে পাবলিশার। দস্তয়েভস্কি সেই মুচলেকায় স্বাক্ষর করেছিলেন। তিনি সেটা মেনে নিয়েছেন আর ওটার বদৌলতে তিনি জুয়াড়ি উপন্যাসটা অর্থাৎ দ্যা গ্যাম্বলার লিখতে পেরেছেন। তবে সত্যিকারের একটা লেখার জন্য ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখ আনন্দ কান্না যাকে আমরা অভিজ্ঞতা বলি, সেটা থাকা দরকার। আর এটা যদি থাকে তাহলে আমার মনে হয় লেখাগুলো অনেক জীবনঘনিষ্ঠ হয়। তিনি এক দ্বিখণ্ডিত সত্তার মানুষ। প্রাণশক্তিতে ভরপুর, ক্ষুরধার বুদ্ধি এবং বিরল প্রতিভার অধিকারী। উনবিংশ শতকে পাশ্চাত্যকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছে তাঁরই কীর্তি। তাঁকে বলা হয় পৃথিবীর লেখকদের লেখক। তিনি দস্তয়েভস্কি।

 

রেজাউল করিম: তাহলে কি আর্থিক স্বাধীনতা লেখালেখির ক্ষেত্রে একটা ফ্যাক্টর?

ফারুক মঈনউদ্দীন: সেটা কোনো কোনো ক্ষেত্রে থাকা দরকার। আমি যেটা বলছি সেটা হলো জীবনের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা একজন লেখকের জন্য থাকা দরকার। যদি মার্কেজের কথাই ধরি, তাহলে দেখা যায় তাঁর অনেক গল্প এমনকি উপন্যাসও ব্যক্তিগত জীবনপ্রসূত। এই যে ‘ক্রনিকল অভ অ্যা ডেথ ফোরটোল্ড’। এটা তো তাঁর মায়ের এক বান্ধবীর ছেলের কথা। তাঁর মা জীবিত থাকতে ওটা তিনি লেখেনি। মা মারা যাওয়ার পরেই তিনি এই লেখাটা লিখেছেন।

তারচেয়ে বরং অর্থনৈতিক স্বাধীনতা থাকলেই একজন লেখক অর্থসংস্থানের জন্য যে বাড়তি সময়টুকু দিতেন সেটা তিনি লেখালেখিতে দিতে পারেন। অ্যা লট মোর টাইম ফর ইউর রাইটিং, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অবশ্যই প্রয়োজন। অনেকেই এমন আছেন যাদের লেখালেখির একটা ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নেই বলেই তারা কিন্তু লেখালেখিতে আর সময় দিতে পারেননি।

 

রেজাউল করিম: অনেককে কিন্তু বলতে শোনা যায়, সংসার ধর্ম পালন লেখালেখির পথে অন্তরায়। এটা আপনার কাছে কতটুকু সত্য?

ফারুক মঈনউদ্দীন: এটা আমার কাছে ঠিক বলে মনে হয় না। আমাদের দেশের লেখকরা বিশেষত বিশ্ব সাহিত্যের বহু কালজয়ী লেখক কিন্তু সংসার ধর্ম পালন করেছেন। তাই না? ওই যে অর্থকষ্টের কথা বললেন। একটা কথা মনে পড়ে গেল। আপনি ভ্যানগঘের উদাহরণটাই নিতে পারেন। সাংঘাতিক অর্থকষ্টে তাঁর জীবন কেটেছে। না খেয়ে থেকেছেন, নেশা করার জন্য তারপিন তেল খেয়েছেন। তাই না? সুতরাং দুইটাই এখানে কাজ করে। একচ্ছত্র বা নিরঙ্কুশভাবে কোনোটাই বলা যাবে না।

 

মোস্তফা অভি: আপনি তো বহু বছর ধরে লিখছেন। তা প্রায় তিন দশকের কাছাকাছি বলা যায়। এই যে তিন দশক ধরে আপনি লিখছেন, লেখালেখির ক্ষেত্রে আপনার যদি কোনো বিশেষ অভিজ্ঞতা থাকে আমরা সেটা সম্পর্কে জানতে চাই। এছাড়াও লেখালেখির ক্ষেত্রে আপনার যদি কোনো ব্যর্থতা থাকে সেটাও আমাদের বলতে পারেন।

ফারুক মঈনউদ্দীন: অভিজ্ঞতার কথা যদি বলেন তাহলে এই মুহূর্তে আমাকে ভেবে বলতে হবে।

 

মোস্তফা অভি: আচ্ছা।

ফারুক মঈনউদ্দীন: ব্যর্থতার কথা তো আমার অনেক আছে। আসলে আমি যেটা মনে করি সেটা হচ্ছে আমি অনেক কিছু করতে গিয়ে সত্যিকার অর্থে কিছু করতে পারিনি। আমি যদি জীবনে একটা ফিল্ডে থাকতাম তাহলে হয়তো আরও বেশিকিছু করতে পারতাম। আমি তিন চারটা ফিল্ডে কাজ করি। যেমন আমি অনুবাদ করি, ভ্রমণ কাহিনি লিখি, গল্প লেখার চেষ্টা করি কিংবা অর্থনৈতিক বিষয় নিয়ে লিখি। এমনকি প্রবন্ধও লিখি কখনও। সুতরাং একসঙ্গে এতগুলো ক্ষেত্রে কাজ করতে গিয়ে কোনোটাই আমার সেভাবে হয়নি। এযাবৎ কালে আমি কোনো উপন্যাস লিখতে পারিনি এটা আমার ব্যর্থতা বলে মনে করি।

 

রেজাউল করিম: আমরা জানি আপনি এদেশের একজন স্বনামধন্য ব্যাংকার। অর্থনীতি-বিষয় নিয়েও বহুবার লিখেছেন। সেক্ষেত্রে আমরা জানতে চাই যে আপনি নিজেকে একজন ব্যাংকার হিসেবে পরিচয় দিতে পছন্দ করেন নাকি আপনি লেখক হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।

ফারুক মঈনউদ্দীন: ইনফ্যাক্ট এটা আমার মধ্যে একটা দ্বৈত সত্ত্বা কাজ করে। আমার ৩৮ বছরের ব্যাংকিং ক্যারিয়ার। ইন্টারেস্টিংলি ব্যাংকারমহলে আমাকে চিনত অন্যভাবে। কেননা আমি অর্থনৈতিক বিষয় নিয়ে লেখালেখি করি। অনেক ব্যাংকার আমাকে বাইনেম চিনতেন, অনেকে আবার জানতেনই না আমি ব্যাংকে কাজ করি। কারণ আমি লেখালেখি করি, আমাকে তাঁরা সেভাবেই চেনেন। সুতরাং আমার পরিচয়টা দুই ভাবেই হতে পারে। আমাকে যখন কোনো টিভি চ্যানেল ডাকে তখন তারা লেখে ব্যাংকার এবং অর্থনৈতিক বিশ্লেষক। তারা কিন্তু আমাকে লেখক হিসেবে পরিচয় দেয় না। কারণ সেখানে অর্থনৈতিক বিষয়-আশয় নিয়ে আলোচনা থাকে। আমি নিজের সম্পর্কে কখনও কোথাও পরিচয় দিই না যে, আমি অমুক। সুতরাং যে যেভাবে আমাকে চেনে সে আমাকে সেভাবেই সম্বোধন করে। যেমন, আজকে আমার বিডিনিউজে নোবেল প্রাইজ নিয়ে বড়ো একটা লেখা আছে।

 

মোস্তফা অভি: আবদুলরাজাক গুরনাহকে নিয়ে?

ফারুক মঈনউদ্দীন: না, সেটা না। সামগ্রিক নোবেল প্রাইজ নিয়ে। ওখানে কিন্তু আমার পরিচয় লিখেছে, কবি, প্রাবন্ধিক, লেখক। এখন এখানে তো কিছু বলার থাকে না। তবে আমি বলেছি যে আমাকে কবি লিখেছেন কেন? দুই একটা কবিতা আমি লিখেছি বটে, তবে সেগুলো তো বলার মতো কিছু না আর এখন তো আর আমি কবিতা লিখি না।

 

মোস্তফা অভি: আমরা আসলে আপনার ব্যর্থতার কথাটা জানতে চাইছি।

ফারুক মঈনউদ্দীন: আমার ব্যর্থতা হচ্ছে দুইটা। আমি অনেক কিছু হতে চেয়েছি, কিন্তু আসলে হয়েছি জ্যাক অভ অল, মাস্টার অফ নান। আর দ্বিতীয় কথা হচ্ছে উপন্যাস না লেখাটা আসলে আমার ব্যর্থতা।

 

মোস্তফা অভি: এমন অনেক লেখকই তো আছেন, যারা জীবনে কখনও উপন্যাস লেখেননি। এক্ষেত্রে আমরা হোর্হে লুইস বোর্হেসের উদাহরণ দিতে পারি। বিশ্বনন্দিত এই লেখক অথচ তাঁর জীবনে তিনি একটাও উপন্যাস লেখেননি। এটা নিয়ে বিশ্ব সাহিত্যমহলে প্রচলিত অনেক কথা আছে।

ফারুক মঈনউদ্দীন: তিনি চাইলে কিন্তু উপন্যাস লিখতে পারতেন সেটা আমরা বিশ্বাস করি। কেন তিনি লিখেননি এটা আপনি বা আমি কেউ বলতে পারব না।

 

মোস্তফা অভি: আসলে আমাদের বোর্হেসের কাছে তো জানতে চাওয়ার সুযোগ নেই। সুতরাং আমরা আপনার কাছে জানতে চাইছি যে, এত কিছুই তো লিখলেন, কেন আপনি উপন্যাস শুরু করলেন না।

ফারুক মঈনউদ্দীন: সেটা হচ্ছে যে, উপন্যাস লেখার ইচ্ছা যে আমার একেবারেই নেই তা কিন্তু নয়। এই ব্যাপারটা নিয়ে আসলে আমি সেভাবে কখনও ভাবিনি। আসলে একটা উপন্যাস লিখতে গিয়ে অনেক সময়ের প্রয়োজন হয়, অনেক কিছু ভাবার থাকে। আবার এরকম অনেকে আছেন যে একটা উপন্যাস এক রাতের মধ্যেই লিখে ফেলেন। আমি এটাতে বিশ্বাস করি না। আমি তো একরাতে একটা গল্পও লিখতে পারি না অথচ কারও কারও একরাতে একটা উপন্যাস লেখা শেষ হয়ে যায়। আমি ভাবি, মানুষ এটা কীভাবে পারে! আসলে আমি একরাতে লেখা উপন্যাসের মতো কিছু লিখতে চাই না। এটা আমি সবসময় বিশ্বাস করি, এলেবেলে কোনো একটা জিনিস কখনওই আমি লিখব না। আমি সেই জিনিসটাই লিখব যেটা আমি লিখতে চাই। সেটার জন্য যদি সময় লাগে তা লাগুক। একটা লেখা লিখব আর সেটা কেউ পড়ে মনে রাখবে না সে রকম লেখা আমি মোটেও লিখতে চাই না। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস জীবনে কয়টা উপন্যাস লিখেছেন? অথচ ‘খোয়াবনামা’ উপন্যাসটা বাস্তবমুখী এবং জীবনঘনিষ্ট করার জন্য যে কী পরিমান কষ্ট করেছেন সেটা তো আপনারা অবশ্যই জানেন।


Photo 1

সাক্ষাৎকার গ্রহণের একটি বিশেষ মুহূর্তে লেখক ফারুক মঈনউদ্দীনের সাথে মোস্তফা অভি এবং লেখক রেজাউল করিম।


মোস্তফা অভি: হ্যাঁ। তিনি খোয়াবনামা উপন্যাসের জন্য যথেষ্ট পরিশ্রম করেছেন। বারবার তিনি বগুড়ার সেই স্থানে গিয়েছেন। এবং বহু নোট নিয়েছেন আবার লিখেছেন।

ফারুক মঈনউদ্দীন: হ্যাঁ। সুতরাং আমি এটা বিশ্বাস করি, হয়তো এজন্যই আমি উপন্যাস লিখতে পারিনি। তবে আমি যেটা লিখব সেটার জন্য ওরকম সময় বরাদ্ধ চাই। আমি হুট করে একটা কিছু লিখব, লিখে শেষ করব সেটা করব না। এখন তো দেখা যায় প্রতিবছর একটা উপন্যাস বের করে ফেলেন অনেকে। আমার কোনো পরিচিতজনের সাথে বইমেলায় দেখা হলো। সে আমাকে বলল, স্যার, এটা আমার লেখা তৃতীয় উপন্যাস। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি লেখ নাকি? এরকম একটা অবস্থা আর কি!

 

মোস্তফা অভি: (হাসি…) আছে আছে, হ্যাঁ, সেরকম লোক লেখকপাড়ায় আছেন।

রেজাউল করিম: একজন লেখকের জন্য প্রেরণাদায়কের প্রয়োজন হয় যেটা আমরা কখনও কখনও শুনে থাকি। এছাড়াও আমাদের সমাজে এভাবে একটা প্রচলিত কথাও রয়েছে—কবি লেখকদের প্রেরণাদায়ক প্রয়োজন। তো আপনি কি মনে করেন, লেখালেখির জন্য সত্যিই একজন প্রেরণাদায়কের প্রয়োজন আছে?

ফারুক মঈনউদ্দীন: (হাসি…) আপনার প্রশ্নটা বুঝতে পারেছি আমি। হ্যাঁ, অনেকেই বলে থাকেন, লেখালেখির ক্ষেত্রে একজন প্রেরণাদাতা কিংবা প্রেরণাদাত্রী থাকা প্রয়োজন হয়। এক্ষেত্রে আমি মনে করি, একজন লেখককে যখন কেউ ইনসিস্ট করে কোনো একটা লেখা চান, এটাই হচ্ছে লেখকের জন্য সবচেয়ে বড়ো প্রেরণা। একজন লেখক কিন্তু তখন মনে করতে পারেন, হ্যা, আমার লেখার ডিমান্ড আছে বলেই তো তিনি লেখা চাইছেন। তাই না? সুতরাং এর চেয়ে বড়ো প্রেরণা আমার কাছে অন্য কিছু মনে হয় না। আমি যখন ইউনিভার্সিটি থেকে বেরিয়ে গেছি ওই সময়ে কবি হেলাল হাফিজ দৈনিক দেশের সাহিত্য সম্পাদক। তাঁর কাছে একটা গল্প দিয়ে এসেছিলাম। অবশ্য তখন দেশ ছিল বিএনপির দলীয় পত্রিকা, সে কারণে লেখাটা দিতে ইচ্ছা করেনি। তবে হেলাল ভাই ওখানে ছিলেন বলেই আমি লেখাটা দিয়েছিলাম। ওটা ছাপা হওয়ার পর হঠাৎ একদিন তাঁর সাথে ইউনিভার্সিটির লাইব্রেরির ওখানে দেখা। তিনি আমাকে দেখে বললেন, ও তুমি! আমি তো তোমাকে মনে মনে খুঁজছিলাম। তুমি মহসীন হলের অমুক নাম্বার রুমে থাকো না? তোমার সঙ্গে দেখা না হলে আমি আসলে তোমার কাছে যেতাম। তুমি আমাকে আরেকটা গল্প দেবে। তোমার গল্পে যে উপমা থাকে, এই যে বিভিন্ন রকমের উপমা দিয়ে তুমি গল্প লেখ; আমাকে ভালো ভালো উপমা দিয়ে একটা গল্প লিখে দেবে। তিনি আমাকে উৎসাহ দিয়ে একটা গল্প লেখালেন, যদিও সেই লেখাটা এখন আর কোথাও নাই। তার মানে হেলাল হাফিজ, যাকে আমি এতটা শ্রদ্ধা করি তিনি আমাকে দিয়ে একটা একটা গল্প লেখালেন। তারপর আমি খুলনায় চলে গেলাম, খুলনা থেকে যখন আবার ঢাকায় এলাম তখন একদিন হেলাল ভাইয়ের সঙ্গে দেখা। তিনি আমাকে দেখে বললেন, তুমি আবার ঢাকায় কবে আসছো? এটাও জানতে চাইলেন যে, তুমি কতদিন থাকবা।

আমি বললাম, তিন সপ্তাহ কমপক্ষে।

তিনি বললেন, যাওয়ার আগে আমাকে একটা গল্প দিয়ে যাবা। সেদিন থেকে তাঁর সঙ্গে বাংলা একাডেমির বই মেলায় যতবারই দেখা হয়েছে ততবারই জানতে চেয়েছেন, এই তুমি লেখাটা শুরু করেছো? শেষ পর্যন্ত তিনি কিন্তু আমাকে দিয়ে গল্পটা লিখিয়েই ছাড়লেন। সুতরাং আমি মনে করি, এটাই একজন লেখকের জন্য প্রেরণা। আবার কবি আহসান হাবীবের কথা যদি বলি, তিনি আমাকে দিয়ে কিছু অনুবাদ করিয়েছিলেন। প্রথমে আমি জন স্টেইনবেকের একটা গল্প অনুবাদ করে তাঁর কাছে নিয়ে গেলাম। তিনি আমাকে বললেন, তুমি আমাকে স্টেইনবেকের আরও কিছু গল্প অনুবাদ করে দাও। স্টেইনবেকের লেখা আমার খুব ভালো লাগে। এগুলোই হচ্ছে প্রেরণা। ওই যে কথায় আছে না, যেকোনো একজন নারী ইত্যাদি…. এসমস্ত কথা আমি বিশ্বাস করি না।

সেই গল্পটার পর বহুবছর আমার আর বেশি গল্প লেখা হয়নি। তাছাড়া চাকরিতেও ঢুকে গেছি।

 

মোস্তফা অভি: (হাসি…) আপনার ‘হেমিংওয়ের নারীরা’ বইটিতে আর্নেস্ট হেমিংওয়ের প্রেরণাদাত্রী হিসেবে বহুসংখ্যক নারীর কথা কিন্তু বলা হয়েছে! এটা তো আপনার গবেষণাধর্মী বই। বহু প্রসিদ্ধ বইয়ের রেফারেন্স দিয়েছেন অধ্যায়গুলোতে। অবশ্য যথেষ্ট পরিশ্রম করেছেন বইটার জন্য। সেই বইয়ের তথ্যমতে সমালোচকরা কিন্তু বলেছেন, হেমিংওয়ের প্রত্যেকটা উপন্যাসের পেছনে একজন করে প্রেরণাদাত্রী ছিলেন।

ফারুক মঈনউদ্দীন: (উচ্চ হাসি…) হ্যাঁ, এটা সত্য। তবে ওঁর জীবনে যে এত নারী এসেছেন, তাদের অনেকেই তাঁর উপন্যাসের প্রেরণাদাত্রী ছিলেন। অনেক নারীকে তিনি উপন্যাসের চরিত্রে চিত্রায়ন করেছেন। বহু উপন্যাসে অনেক নারী চরিত্র কিন্তু নেগেটিভভাবেও উপস্থাপন করেছেন তিনি। এখানে কিন্তু প্রেরণা এবং উপন্যাসের বিষয়বস্তু– দুটো জিনিসই কাজ করেছে। তবে একেবারেই প্রেরণাদায়ক বা দাত্রী থাকে না তা কিন্তু নয়। থাকে। হ্যাঁ, এটা কিন্তু আমার নিজের মতামতটাই বললাম।

 

মোস্তফা অভি: আমরা জানি, লেখকরা লেখালেখির ক্ষেত্রে বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা এবং কল্পনার আশ্রয় দুটোই কাজে লাগান। আমরা জানতে চাই, আপনার কাছে কল্পনা এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রে সবচেয়ে কোনটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়?

ফারুক মঈনউদ্দীন: কল্পনার গুরুত্বটা আমার কাছে অত্যন্ত বেশি। কারণ একজন লেখকের কল্পনাশক্তি যদি প্রখর না থাকে সে ক্ষেত্রে তিনি শুধুমাত্র বাস্তব অভিজ্ঞতা দিয়ে কিন্তু একটি গল্প লিখতে পারবেন না। সমাজে এমন কতগুলো লোক আছে, যারা চমৎকার চমৎকার জীবন অভিজ্ঞতার আখ্যান জানেন। একজন লেখক সেই ঘটনাটা শুনে বা ওই জিনিসটা জানার পরে কল্পনার নানান রং মিশিয়ে সেটাকে একটা ভালো গল্পে রূপান্তর করতে পারেন। কিন্তু সেই ঘটনাটা যতই আকর্ষণীয় হোক না কেন, সেটা কিন্তু কল্পনার রং না মেশালে খুব ভালো একটা গল্প হয়ে ওঠার সম্ভাবনা নাই।

 

মোস্তফা অভি: আপনি যদি বিষয়টি আমাদের জন্য আরেকটু খোলাসা করতেন! বা যদি আপনি কোনো উদাহরণ দিয়ে একটু বলতেন, তবে দারুণ হতো।

ফারুক মঈনউদ্দীন: তাহলে আমি মার্কেজের দিকে ফিরে যেতে চাই। মার্কেজের অনেক উপন্যাস আছে যা তার বাস্তব জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনা। তাঁর বাস্তব জীবনের ঘটা ঘটনার সাথে জাদুবাস্তবতা মিশিয়ে বিশাল বিশাল উপন্যাস তিনি লিখে গেছেন। তাঁর যে কালোত্তীর্ণ গল্প বা উপন্যাসগুলো রয়েছে সেগুলো কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কল্পনার আশ্রয় নিয়ে লেখা। তিনি খুব গভীরভাবে কল্পনা করতে পারতেন আর কল্পনার আশ্রয় আছে বলেই কিন্তু সেই লেখাগুলো কালোত্তীর্ণ হয়েছে। বাস্তব অভিজ্ঞতা একজন লেখককে কাহিনি নির্বাচনে অত্যন্ত হেল্প করে কিন্তু তার সঙ্গে অবশ্যই তার কল্পনা শক্তি প্রবলভাবে থাকতে হয়। কল্পনাশক্তি না থাকলে আমার মতে ভালো লেখক হওয়া যায় না।

 

রেজাউল করিম: সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যানে আমরা প্রচুর নারী লেখক দেখছি। বিশেষত প্রতি বছরই তাদের কারো কারো বই বের হচ্ছে। কিন্তু আমার মনে হয়, বাংলাদেশের নারী লেখকরা সংসার, পারিবারিক জীবন, ননদ শাশুড়ি থেকে কেন যেন বের হতে পারছেন না। কিছুদিন আগে আমি এই সময়ের তিনজন নারী লেখকের তিনটি উপন্যাস পড়লাম। আমি লক্ষ করলাম, ঘুরেফিরে তিনজনেরই একই বিষয়, একই বক্তব্য। এটা নিয়ে আমি ফেইসবুকে একটা পোস্টও করেছিলাম। অবশ্য পরে আমি পোস্টটা সরিয়ে নিতে বাধ্য হই। কারণ আমি কারো বিরাগভাজন হতে চাই না। এই ব্যাপারে আপনার মতামত জানতে চাই।

ফারুক মঈনউদ্দীন: আপনি তিনজন নারীর কথা বললেন না? তারা কিন্তু আসলে সেই পারিবারিক জীবনটাই বেশি দেখেছেন। যদি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আমি বলি, তাহলে একজন নারীর জন্য তাঁর বাবা, ভাই, শ্বশুরবাড়ির লোকজন ইত্যাদিই তার কাছে বাস্তব। তার জীবনে এটাই তিনি বেশি দেখেছেন। তাঁরা অন্য কিছু দেখেননি বলেই তাঁদের তিনজনই শাশুড়ি ননদের সাথে সংঘাত এবং তাদের জীবনের দেখা পারিবারিক ঘটনা নিয়েই কিন্তু উপন্যাস লিখেছেন। তাঁরা যদি তাদের এই বাস্তব জীবনের কাহিনিগুলোতে কল্পনার মিশ্রণ ঘটাতেন তাহলে তিনজনের লেখা কিন্তু তিন ধরনের হয়ে যেত। তিন ধরনের ডাইমেনশন থাকত, তিন ধরনের মিশ্রণ থাকত, তিন ধরনের উপস্থাপনা থাকত। এই আর কি!

 

মোস্তফা অভি: ইদানিংকালে বিভিন্ন অনলাইন পোর্টাল অথবা গল্পসংকলনগুলোতে দেখা যায়, প্রায় অর্ধেক লেখকই হচ্ছেন নারী। আমি এখনকার সময়ের কথা বলছি। তাদের উপস্থিতি আছে এটা সত্য, তারা নিজেদের জানান দিচ্ছেন সেটাও আমাদের জন্য আশার কথা কিন্তু তারা আসলে সেভাবে আলো ফেলতে পারছেন না। কেন তারা নিজেদের গণ্ডি থেকে বের হয়ে আসতে পারছেন না?

ফারুক মঈনউদ্দীন: এটা অত্যন্ত ভালো একটা প্রসঙ্গ বলে আমি মনে করি। প্রথমত কথা হচ্ছে, নারী লেখকরা যে ভালো লিখতে পারেন না এটা আমি কখনওই মনে করি না। এখানে তো এখনো পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা। সুতরাং এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় যাঁরা একটু আলাদাভাবে বেরিয়ে আসার ক্ষমতা এবং সাহস রাখেন তারাই হয়তো লেখালেখির ক্ষেত্রে টিকে যান। আবার যাঁরা পুরুষতান্ত্রিক সমাজের ভেতর অবদমিত থাকেন, যাঁরা নিজের ব্যথাটাকে দেখানোর জন্য ঠিকমতন সুযোগ পান না, তাঁরা আস্তে আস্তে পিছিয়ে যান। কেননা, অন্যান্য দেশে তো প্রচুর নারী লেখক আছেন এবং তাঁরা খুব ভালো করছেন। আমাদের দেশের পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় নারীরা অবহেলিত, তাঁরা এখনো পশ্চাৎপদ। তাদের বাইরের জগত দেখার মতো যথেষ্ট সুযোগ এখনো তৈরি হয়নি বলেই কিছু নারী লেখক উঠে আসলেও তাঁরা এক সময় আর টিকে থাকতে পারেন না। এটা আমি তাৎক্ষণিকভাবে ভাবলাম, এছাড়া আমি দ্বিতীয় কোনো কারণ খুঁজে পাই না। কেরালায় কিন্তু নারী লেখকরা খুব ভালো ভালো কাজ করেছেন। যদি আপনি লেখালেখির কথা বাদ দেন তাহলে দেখবেন যে তাঁরা এদেশে সমাজের অনেক গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় প্রতিষ্ঠিত। আমরা প্রধানমন্ত্রী অথবা স্পিকারের কথা বাদই দিলাম। আপনি ভেবে দেখেন, বাংলাদেশে এই সময়ে পাঁচ-ছয়জন লেডি পাইলট আছেন। আপনি জানেন কি না জানিনা, তাঁরা কিন্তু সবাই ছোটো প্লেন না, ঠিক বড়ো প্লেন চালায়। সুতরাং তাঁদের মেধা ও যোগ্যতাকে কোনোভাবেই খাটো করে দেখার সুযোগ নাই।

আমি আরেকটা কথা বলি–আপনি দেখবেন, যারা মঙ্গলয়েড জাতি। সেই বার্মা থেকে শুরু হয়ে পুর্বদিকের ওই অংশটার কথা বলছি। আপনি খেয়াল করলে দেখবেন, মঙ্গলয়েড গোষ্ঠীর ভেতরে মেয়েরা মাতৃতান্ত্রিক পরিবারে বসবাস করে। আর সেই কারণে তাদের ওখানে কিন্তু মেয়েরা সবসময় সামনে এগিয়ে থাকেন এবং পুরুষেরা সেখানে পিছিয়ে আছেন। সেখানে কিন্তু মেয়েরাই সব কাজকর্ম করে। এই যে ভিয়েতনাম বা আশেপাশে যা আছে সেখানে কিন্তু কাজকর্ম মেয়েরাই করে। বার্মাতেও তো তাই। সেখানেও কিন্তু মেয়েরা কাজকর্ম করে ছেলেরা কিছুই করে না বা অলস। তবে ওইসব জায়গার লেখকদের অবস্থা কী সেটা সম্পর্কে আমার ধারণা নাই। ওই যে মঙ্গোলয়েড জাতিগোষ্ঠীর ভেতরে যারা মাতৃতান্ত্রিক পরিবারের, তাদের ওখানে লেখালেখির ক্ষেত্রে মেয়েরা কতটা এগিয়ে আছেন বা পিছিয়ে আছেন সেটা জানা না থাকলেও এটা কিন্তু বলা যায়, কাজের ক্ষেত্রে নারীরা এগিয়ে আছেন। আমরা যদি ওখানকার লেখালেখির ফিরিস্তি জানতে পারতাম তাহলে আমাদের একটা ভালো সিদ্ধান্তে আসা সম্ভব হতো।

 

মোস্তফা অভি: তাহলে আমরা এটাই বলতে পারি, এদেশে নারীদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা, পশ্চাৎপদতা আর বাইরের দুনিয়া না দেখাই লোখিলোখিতে টিকে থাকতে না পারার কারণ।

ফারুক মঈনউদ্দীন: আমি আগেও বলেছি, আমাদের দেশীয় সমাজ ব্যবস্থার কারণে। তাঁরা যেহেতু সংসার ছেড়ে বাইরে বের হতে পারছেন না সেজন্য বাস্তব জগতটাকে তারা সেভাবে দেখতেও পারছেন না। এটাও তাদের লেখার বিষয়বস্তু নির্বাচনের বড়ো একটা ফ্যাক্টর। সেজন্য খোলা দুনিয়ার অনেক ইউনিক বিষয়গুলোকে সুক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ তারা ধরতে পারছেন না।

 

মোস্তফা অভি: এই সময়ে অনিতা দেশাই, ওলগা তোকারচুক বা এলিস মুনরোর মতো একেবারে ভিন্ন প্লটে কেন এখানকার নারীরা লিখতে পারছেন না? এলিস মুনরোকে দেখেন, তিনি যে গল্পগুলো লিখেছেন এবং সেখানে তিনি যে সমস্ত কাহিনি নির্বাচন করেন এবং তার যে অভিজ্ঞতা সেটা সত্যিই একটা ইউনিক। তবে অল্প কয়েকজন এখানে ভালো করছেন সেটা কোনো উদাহরণ নয়।

ফারুক মঈনউদ্দীন: হ্যাঁ, এলিস মুরনো সম্ভবত কোনো একটা পত্রিকার সম্পাদকও। হ্যাঁ, ওই যে বললাম– পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা, মেয়েদের পৃথিবীর বাইরের রূপ না দেখতে পারা ইত্যাদি।

 

মোস্তফা অভি: এবার অন্য প্রসঙ্গে আসি। অনেকেই হয়তো নিজের লেখার ভেতর ফেলে আসা জীবনের কথা বলে থাকেন। জ্ঞাতে বা অজ্ঞাতে সেটা যেকোনো ভাবেই হতে পারে। আপনার কোনো লেখায় নিজ জীবনের অভিজ্ঞতার কথা কি লিখেছেন?

ফারুক মঈনউদ্দীন: আছে। একাধিক লেখায়ই আমার এরকম বাস্তব জীবনের একান্ত অভিজ্ঞতার কথা আছে। এই প্রসঙ্গে আমি একটা কথা বলি সেটা হলো, তাহমিমা আনামের একটা উপন্যাসের প্রকাশনা উৎসব ছিল। সেখানে সৈয়দ শামসুল হক একটা কথা বলেছিলেন, ‘প্রত্যেক মানুষের ভেতরে একটা করে উপন্যাস কিংবা গল্প থাকে। সুতরাং একটি গল্প কিংবা একটি উপন্যাস কিন্তু প্রত্যেক লেখকই লিখতে পারেন। পরবর্তীতে সেই লেখকের কাছেই বিছানা থেকে লেখার টেবিল পর্যন্ত মেরুদূর মনে হয়।’ তার মানে হচ্ছে একটি লেখা কিন্তু সবাই লিখে ফেলতে পারেন, কিন্তু এর পরবর্তী লেখায় লেখকের ধৈর্য এবং অধ্যাবসায়ের দরকার।

 

রেজাউল করিম: আপনি তো চট্টগ্রামের মানুষ। সাধারণত আপনার কোনো লেখায় আমরা চট্টগ্রামের আঞ্চলিক কোনো শব্দ বা সংলাপের ব্যবহার দেখতে পাই না। এটা আমাদের জানার সীমাব্ধতাও হতে পারে। তাই জানতে চাই, আপনি কেন চট্টগ্রামের ভাষা লেখায় ব্যবহার করেন না।

ফারুক মঈনউদ্দীন: করিনি এই কারণে যে, চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা গল্পের সংলাপে ব্যবহার করে কেউ সফলতা পাননি। তবে একজন এটাকে খুব স্বল্প পরিসরে, চমৎকারভাবে ব্যবহার করে দেখিয়েছেন এবং সম্ভবত সফলও হয়েছেন। তিনি হচ্ছেন শহীদুল জহির। হি ইজ নট ফ্রম চিটাগং, কিন্তু আমি তো চট্টগ্রামের মানুষ, তাই দেখেছি, তিনি চমৎকারভাবে চিটাগাংয়ের ভাষাটাকে সুন্দরভাবে তাঁর লেখার ভেতর ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন এবং সফলও হয়েছেন।

 

মোস্তফা অভি: হ্যাঁ। তিনি চট্টগ্রামের ভাষার মতোই পুরান ঢাকা এবং ময়মানসিংহের ভাষা ব্যবহার করেও সফলতা দেখিয়েছেন।

ফারুক মঈনউদ্দীন: তিনটি না আমি যতটুকু জানি, তিনি আরও একটি ভাষা বিশেষত কোথায় যেন আমি পড়েছি যে তিনি নওগাঁ বা কাছাকাছি কোনো অঞ্চলের ভাষাও লেখায় ব্যবহার করেছেন। আসলে চট্টগ্রামের ভাষাটা এতটাই দুর্বোধ্য, সেটা লিখতে গিয়ে কোথাও কোথাও ব্র্যাকেটে নোট লিখতে হবে। ঠিক সেই কারণে আমি এটা চাইনি। আবার অন্যদিকে, ঢাকার আশেপাশে যে একটা কথ্যভাষা আছে, সংলাপ লেখার ক্ষেত্রে লেখকরা প্রায় সবাই ওই ভাষাটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তার মানে, বস্তির ভাষা মানেই ওই ভাষাটা। আমি খুলনার ভাষাটা ব্যবহার করি কারণ আমার কাছে সেটা ভালো লাগে। যেহেতু আমি তিনবছর খুলনায় ছিলাম আর খুলনার ভাষাটা আমার ভালোও লাগে। তাছাড়া আই ক্যান স্পিক ইন সিলেটি। এই কারণে অনেকেই মনে করেন, আমি সিলেটের লোক।

 

মোস্তফা অভি: আমার মনে হয় সংলাপে আপনি যে ভাষাটা ব্যবহার করেন সেটা সম্ভবত বাগেরহাটের ভাষা।

ফারুক মঈনউদ্দীন: সেটা আপনার মনে হতে পারে কারণ খুলনা এবং বাগেরহাট পাশাপাশি জেলা। একটা সময় তো একই জেলার অন্তর্ভুক্ত ছিল। তাদের মুখের ভাষাটা এখনো খুব কাছাকাছি। এটা মনে হওয়া বা না হওয়ার কিছু নেই তবে যেটা হয় সেটা হচ্ছে, আমি সংলাপ ব্যবহারে খুলনার ভাষাটাই পছন্দ করি। তবে হয় কি, আমি যে অঞ্চলের সংলাপের ব্যবহার করতে চাই সেখানকার কোনো বন্ধুর কাছে ফোন করে আমি ওখানকার ভাষাটা ভালো করে জেনে নিই। কিন্তু অনেককেই দেখা যায় যে, খুব ভুলভালো আঞ্চলিক শব্দ ব্যবহার করেন সেটা আমার মোটেই পছন্দ না।

 

মোস্তফা অভি: ভাষার কথা যখন এসেই গেল তখন প্রসঙ্গত আরেকটি কথা বলতে চাই। সেটা হচ্ছে যে, আপনার গদ্য পড়লে অনেক সময় মনে হয়, ভাষাটা সংবাদপত্রের ভাষার কাছাকাছি কিছু। এটা কি আপনার নিজস্বতা বা স্টাইল?

ফারুক মঈনউদ্দীন: এটার কারণ ঠিক আমার জানা নাই। আমার গল্প পড়তে গিয়ে যিনি পাঠক তার অনুভূতি কেমন হবে সেটাও আমার জানার কথা না। এটা যদি সত্যি হয়ে থাকে তাহলে সেটা কি কারণে তাও আমি জানি না।

 

মোস্তফা অভি: যেহেতু আপনি অনুবাদ করেন, আপনার এই ভাষার প্রভাবটা কি অনুবাদের কারণে হতে পারে বলে মনে করেন?

ফারুক মঈনউদ্দীন: না, সেটা আমি মনে করি না। কারণ আমি অনুবাদ তো অনেক পরে করেছি। তাছাড়া আমি অনুবাদ করার সময় আমরা যেভাবে বাংলা বলি এবং লিখি সেভাবেই অনুবাদ করার চেষ্টা করি।

আমার অনুবাদগুলো সাধারণত একটু শ্রমসাধ্য হয় আর আমি এই কাজটাকে সাজিয়ে, গুরুত্ব দিয়ে করি। একবার কাজটা করি আবার সেটাকে পড়ে অনুধাবন করার চেষ্টা করি তারপর আবার পড়ি। যেখানে যে বাক্যটা আমার অন্যরকম মনে হয়, সেটাকে সংশোধন করি। বাক্যটাকে আগে পিছেও করে থাকি। কখনও বাক্য ভাঙি আবার গড়ি। এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই একটা অনুবাদ ঠিকঠাক তৈরি হয়ে যায়। তবে এখানে ভাষার কিরকম তারতম্য ঘটে তা আমার জানা নাই।

 

রেজাউল করিম: আপনি তো অত্যন্ত ব্যস্ত মানুষ। একটা ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ পদে চাকরি করেছেন এবং সেইসঙ্গে লেখালেখি করেছেন আবার পড়াশোনা আছেই। আমরা আসলে জানতে চাইছি, সমসাময়িক লেখকদের আপনি কি কারো লেখা পড়েন? এই সময়ে যেসব তরুণ লিখছেন তাদের সম্পর্কে আপনার ধারণা কী?

ফারুক মঈনউদ্দীন: আমি সাধারণত সব ধরনের লেখাই পড়ি। সেটা দেশের লেখা হতে পারে এমনকি দেশের বাইরেরও হতে পারে। হ্যাঁ, এই সময়ে যারা গল্প লিখছেন তাদের লেখা পড়ি। কারণ সংকলনগুলো যখন পাই, সেখান থেকে দেখে দেখে পড়ি। এটা অস্বীকার করার উপায় নাই, যেকোনো একটা গল্প সংকলনের সেটা কালি ও কলম বা অন্য যে কোনো পত্রিকা হোক, সেখানকার সবগুলো লেখা আসলে পড়া যায় না। এমন না যে, আমি তরুণদের লেখা পড়ি না। আমি তরুণদের লেখাই বেশি পড়তে চাই। কারণ তারা এই সময়ে কি দিচ্ছেন এটা একটু বোঝার জন্য। যেমন এই মুহূর্তে আমার মনে পড়ছে ফয়জুল ইসলামের নাম। কোনো এক পত্রিকার ঈদ সংখ্যায় ফয়জুল ইসলামের একটা উপন্যাস পড়েছিলাম। সেটা পড়ে তাৎক্ষণিকভাবে আমার অন্যরকম ভালো লাগল। তারপর আমি একবার প্রথম আলো বর্ষসেরা বইয়ের বিচারক প্যানেলে ছিলাম। ‘খোয়াজ খিজিরের সিন্দুক’ নামে সেখানে তার দ্বিতীয় বই পেলাম। এই গল্পের বইটা পড়েও আমার খুবই ভালো লাগল। পরে আমি বিচারকমণ্ডলীর অনেকেই আমার সাথে একমত হয়েছিলেন, যাতে এই বইটা পুরস্কার পায়। সুতরাং আমি সমসাময়িক অনেকের লেখা পড়ার চেষ্টা করি, যেমন মোজাফফর হোসেনের লেখা। আমি তো মোস্তফা অভির ‘সিএস খতিয়ান’ বইটা মেলার স্টল থেকেই কিনে পড়েছিলাম। তখন আমি তাকে চিনতামও না। সুতরাং যাদের কোনো লেখা আমাকে টেনেছে, চোখে পড়েছে সেই লেখাটা আমি সংগ্রহ করেছি এবং পরবর্তীতে পড়েছি। তবে নবীন অথবা প্রবীণ এসব ব্যাপারে আমি কোনো বাছবিচার করি না।

 

মোস্তফা অভি: আপনার প্রিয় লেখকদের সম্পর্কে কিছু জানতে চাই।

ফারুক মঈনউদ্দীন: এই প্রশ্নটা অনেকেই করে থাকেন। কিন্তু এভাবে যদি বলা হয় তাহলে তো কাকে বাদ দিয়ে কাকে বলি অবস্থা। আমরা যখন পড়াশোনা শুরু করি আমাদের অধিকাংশেরই তো সাহিত্য পড়া শুরু হয়েছিল রুশ সাহিত্য দিয়ে। তারপর যখন আমি একটু ম্যাচিউর হয়ে পড়াশোনা শুরু করলাম, আমাদের দেশের মাহমুদুল হক লিখতেন, হাসান আজিজুল হক, তাদের লেখা পড়তাম। বিশেষ করে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। এছাড়া পশ্চিমবঙ্গে শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়, স্বপ্নময় চক্রবর্তীর লেখা পড়েছি। একসময় শীর্ষেন্দু আমার খুবই প্রিয় ছিল সেটা আমার ইউনিভার্সিটির প্রথম দিককার কথা। তবে এখন তাঁর লেখা আমাকে আর টানে না। এমনিভাবে, আমাদের দেশে ওয়াসি আহমেদ একদম নতুনদের ভিতরে আমি ফয়জুল ইসলামের লেখা পড়তে পছন্দ করি। এরকম অনেকের নাম বলা যায়। তবে প্রিয় বলে এভাবে সংক্ষেপে জবাব দেয়াটা খুব মুশকিল। কখন যে কোন লেখাটা মানুষের প্রিয় হয়ে যায়, আবার কোন প্রিয় লেখক যে কখন অপ্রিয়দের তালিকায় চলে যান সেটা বলা কঠিন। সুতরাং এটা বলা ডিফিকাল্ট।


Photo 2

লেখক ফারুক মঈনউদ্দীন প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন


 

রেজাউল করিম: একসময় মনে করা হতো যে ইওরোপিয়ানরা সাহিত্যে রাজত্ব করছেন, কিন্তু আপনার কি মনে হয় যে, ধীরে ধীরে ইউরোপের সাহিত্যের সেই জৌলুস আমেরিকার দিকে সরে যাচ্ছে?

ফারুক মঈনউদ্দীন: ধন্যবাদ। আপনি একটা ভালো প্রশ্ন করেছেন। এই প্রসঙ্গে আজকে বিডিনিউজে আমার একটা বড়ো লেখা রয়েছে। সেখানে আমি বলার চেষ্টা করেছি যে, উনিশ শ এক সালে নোবেল পুরস্কার চালু হওয়ার পর এই পর্যন্ত অর্থাৎ ২০২১ সাল পর্যন্ত নোবেল সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন ১১৮ জন অর্থাৎ ১২০ বছরের ইতিহাসে ১১৮ জন সাহিত্যে নোবেল পেয়েছেন। আমি শুধুমাত্র সাহিত্যের কথাই বলেছি। কোনো কোনো বছর আবার পুরস্কার স্থগিত ছিল। তবে এটা শুনে আপনি আশ্চর্য হবেন, ১১৮ জনের মধ্যে ৮৫ জনই হচ্ছেন ইওরোপিয়ান লেখক। এই সমস্ত তথ্য আমার আজকের লেখাটিতে আছে। এখন কিন্তু নোবেল কমিটিও ভাবছেন, তাদের ইউরোসেন্ট্রিক বদনামটা ঘোচানো দরকার। তারা এখন ভাবছেন, প্রত্যেক ভাষা থেকে কিছু বিশেষজ্ঞ রাখবেন এবং সেইসব বিশেষজ্ঞরা সংশ্লিষ্ট ভাষার সাহিত্য সম্পর্কে নোবেল কমিটিকে ধারণা দেবেন। ২০১৮ সালে নোবেল কমিটির বিরাট স্ক্যান্ডালের পর এই ভাবনাটা তাদের ভেতরে আসে। তবে দেখা যাক, এটা হয়তো ২০২২ সাল থেকে শুরু হতে পারে। নোবেল কমিটি কিন্তু এটা স্বীকার করেছে যে, এশিয়া এবং আফ্রিকার সাহিত্য সম্পর্কে তাঁদের ধারণা কম। তাঁদের ভাষ্যমতে, আমরা এইসব ভাষা থেকেও নোবেল পুরস্কারের জন্য বই পেতে চাই।

এখন আমি একটু অন্যভাবে বলি। এই যে, ইওরোপিয় সাহিত্য নিয়ে এত জয়জয়কার তার একটা বিশেষ কারণ হলো ১১৮ জন নোবেলজয়ী সাহিত্যিকের মধ্যে ৮৫ জনই ইওরোপিয়ান। এটা যে কি পরিমান একপেশে আপনি চিন্তা করে দেখেন! আমাদের দেশের কথা বাদই দিলাম, ওপার এপার মিলিয়ে বাংলা ভাষায় তো অনেকেই ছিলেন যাঁরা নোবেল পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য বা নোবেল পুরস্কার পেতে পারতেন। এছাড়া আফ্রিকার কথা বললে, কতজন তো বছরের পর বছর ধরে এই পুরস্কার পাচ্ছেন না। আরও অবাক করার মতো তথ্য হলো, ১১৮ জনের ৮৫ জন ইওরোপিয়ান আবার সেই ৮৫ জনের মধ্যে ৮ জন আবার সুইডেনের লেখক। এছাড়াও সুইডিশ অ্যাকাডেমির একজন সদস্য, নোবেল কমিটির দুজন এই পুরস্কার পেলেন একই বছর। আমি তো মনে করি, স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও যদি গীতাঞ্জলি অনুবাদ না করতেন, তাহলে উনিও নোবেল পুরস্কার পেতেন বলে মনে হয় না। তিনি শুধু অনুবাদই করেননি, সেটা ইয়েটসের নজরেও আনতে হয়েছে। সুতরাং এসব ব্যাপার যদি না করতেন তাহলে উনি নোবেল পুরস্কার পেতেন না।

এটা অনেক কিছুর ওপর ডিপেন্ড করে। এই যেমন, ইদানিং মিশরের একজন লেখকের লেখা আমি পড়ছি। সেই সুবাদে আলা আল আসোয়ানির একটা বইয়ের উপর আমি আলোচনা করেছি। এই মুহূর্তে মিশরের আরেকজন লেখকের কথা উল্লেখ করতে চাই। তিনি হচ্ছেন ইউসুফ ইদ্রিস।

 

মোস্তফা অভি: আমি তার গল্প পড়েছি ‘এক কামরার ঘর,’ তিন মেয়ে এবং ওদের মা। একজন অন্ধ কোরআনের হাফেজ।

ফারুক মঈনউদ্দীন: আমি সেই গল্পটার কথাই বলেছি। কী মারাত্মক গল্প! তাঁর এই গল্পটি তাঁর কোনো বইতে পাইনি। তাঁর বেশ কয়েকটা বই আমার কাছে আছে।

এই ইওরোপ কোনোভাবে লাইমলাইটে এসে গেছে কিন্তু আমি আসলে ইওরোপের থেকে অন্য দেশের লেখকদের লেখা পড়তে বেশি পছন্দ করি। তার মানে ৮৫ জন ইওরোপিয়ান লেখক নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন বলে যে তারা খুব ভালো কিছু করেছেন এটাতে আমি খুব একটা বিশ্বাস করি না।

 

মোস্তফা অভি: তবুও তো দেখা যায়, আমাদের সবারই প্রায় শুরুটা হয় ওই রুশ সাহিত্য পড়ে। কারণ ওই রুশ সাহিত্য পড়েই তো আপনারা আমরা যাত্রা শুরু করেছি। তারপর ধীরে ধীরে আমাদের রুচির বদল হয়ে ম্যাচিউর পাঠক হয়েছি। একটা সময় তো আমরা বুঝতে পেরেছি, কোনটা আমাদের প্রয়োজনীয়, সেটাই পড়ার চেষ্টা করেছি। রুশ সাহিত্য সম্পর্কে সামান্য কিছু বলেন।

ফারুক মঈনউদ্দীন: এক্ষেত্রে প্রগতি প্রকাশনকে আমাদের ধন্যবাদ দিতেই হয়। কারণ মস্কোর প্রগতি প্রকাশন যদি এই উদ্যোগটা না নিত এবং বেশকিছু ভালো অনুবাদককে যদি সেখানে না নিয়ে যেত, তাহলে কিন্তু আমরা চমৎকার এই বইগুলো পেতাম না। আমাদের সাহিত্যের প্রথমদিককার আগ্রহ কিন্তু প্রগতি প্রকাশনই তৈরি করেছে।

 

মোস্তফা অভি: বাংলাদেশ এবং ভারতের মধ্যে যদি আপনি বর্তমান সময়ে লেখার একটি তুলনা করেন তাহলে কি আপনার মনে হয়, যে ধীরে ধীরে বাংলাদেশের সাহিত্য একটু উন্নতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে?

ফারুক মঈনউদ্দীন: একসময় ধারণা ছিল যে বাংলাদেশ কবিতায় এগিয়ে এবং পশ্চিমবাংলা কথাসাহিত্যে এগিয়ে। যদিও এটা বিতর্কের বিষয়। আমি এটা নিয়ে বিতর্কে যেতেও চাই না। যদি সত্যিই এটা নিয়ে বিতর্ক হয় তাহলে পক্ষে এবং বিপক্ষে সমানসংখ্যক লোক পাওয়া যাবে। তবে আশার কথা হচ্ছে, বর্তমানে আমাদের এখানে কথাসাহিত্যে অনেক প্রতিশ্রুতিশীল লেখক উঠে আসছেন এবং তাঁরা খুব ভালো করছেন। কথাসাহিত্য নিয়ে আমি একটা ভালো কিছু আশা করছি বা একটা ভালো ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছি। বাংলাদেশের কবিতা সম্পর্কে এই মুহূর্তে আমি ভালো একটা খোঁজ খবর রাখি না বিধায় কবিতার ব্যাপারে খুব একটা ভালো বলতে পারছি না। আবার আমি যে কবিতা সম্পর্কে কিছু বলব, নিজেকে সেভাবে যোগ্যও মনে করি না। তবে ষাট অথবা সত্তর দশকে অনেক আউটস্ট্যান্ডিং কবিতা এখানে লেখা হয়েছিল বলে আমি মনে করি। অন্যদিকে, কথাসাহিত্য এক্ষেত্রে একটু ব্যতিক্রম। আমি মনে করি, আগের থেকে এখন কথাসাহিত্য অনেক বেশি সমৃদ্ধ। সেভাবে যদি তুলনা করা হয় তাহলে সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশ আসলে কথাসাহিত্যে অনেকটাই উঠে এসেছে।

 

মোস্তফা অভি: আমার মনে হয় পাঠকেরও অনেকটা উন্নতি হয়েছে এদেশে। এদেশের পাঠকরা আজ থেকে পাঁচ বছর আগেও হারুকি মুরাকামিকে চিনতেন না। অথচ আমি যেটুকু আন্দাজ করছি, বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় ত্রিশ পার্সেন্ট পাঠকের কাছে মুরাকামি পৌঁছে গেছেন। আপনি যেহেতু মুরাকামিকে নিয়ে কাজ করেছেন, আপনার কাছে তাঁর সম্পর্কে জানতে চাই।

ফারুক মঈনউদ্দীন: আমি একটা কথা বলি, মুরাকামি এমনই একজন লেখক, নোবেল পুরস্কার পাবেন বলে ছয় সাতবছর পর্যন্ত তার নাম বারবার উঠে আসছে এবং তার দেশ-বিদেশের ভক্তবৃন্দ বারবার তাঁর নাম বলছেন। এটা অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয় যে, সম্ভাব্য একজন নোবেল পুরস্কার বিজয়ী লেখকের লেখা বাংলা ভাষায় এত বেশি অনুবাদ ইতোপূর্বে আর হয়নি।

 

মোস্তফা অভি: অনেককেই বলতে শোনা যায় যে, মুরাকামি হচ্ছেন জাপানের হুমায়ুন আহমেদ। এই সম্পর্কে আপনার ধারণা কী?

ফারুক মঈনউদ্দীন: না, না। এটা ঠিক না। যদি সেটা সত্যিও হয় তাহলেও জাপানে মুরাকামি সেই টাইপের থেকে অনেক উপরের মাপের লেখক। এটা সচেতনভাবেই মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের পাঠক আর জাপানি পাঠকের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য।

 

মোস্তফা অভি: আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ। আমরা প্রয়োজনে আরেকবার আপনার কাছে আসব।

রেজাউল করিম: আপনার মুল্যবান সময় থেকে আমাদের খানিকটা দিয়েছেন এজন্য কৃতজ্ঞতা জানাই।

ফারুক মঈনউদ্দীন: আপনাদের ধন্যবাদ। প্রয়োজনে নিশ্চয়ই আবার আসবেন।

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

মোস্তফা অভি মূলত তরুণ গল্পকার। জন্ম বাংলাদেশের পটুয়াখালী জেলার বিঘাই গ্রামে ১৯৮৪ সালে। পড়াশোনা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতোকত্তোর। পেশায় ব্যাংকার। বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিকে বেশ কিছু গল্প ছাপা হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ, ভারত উভয় দেশের বিভিন্ন সাহিত্যপত্রে ছাপা হয়েছে বেশ কিছু লেখা। প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ দুটি। ‘বাজপাখির পুনর্জন্ম’ এবং ‘সিএস খতিয়ান ও একটি মামলার ইতিবৃত্ত’।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।