শনিবার, জানুয়ারি ২২

কাঠগোলাপের শহরে মায়াও ফোটে : ফারুক আহমেদ

0

নভেম্বর মাসে এসে বৃষ্টিটা হলো। বৃষ্টি ফোঁটার সঙ্গে ভাত ছিটানোর মতো শহরে শীত ছিটিয়ে দিল। সোমেল পথে বেরিয়ে দেখল, ফুলহাতা শার্টেও ঠান্ডা লাগছে। আত্মহত্যা করতে যাওয়ার সময় এই শীত শীত লাগাটা তাকে একটা অস্বস্তির ভেতর ফেলে দেয়। ঠান্ডার ভেতর এতোটা পথ গিয়ে নদীতে ঝাঁপ দিতে হবে, মৃত্যুর আগে একটা শীত শীত অনুভূতি নিয়ে মরতে হবে— এটা কোনো ঠিকঠাক ব্যাপার নয়। ফুটপাত ভিজে আছে, তার ওপর পড়ে রয়েছে শুকনো পাতা। সোমেলের পাশ দিয়ে একজোড়া বালক-বালিকা হাত ধরে দ্রুত পায়ে চলে গেল। সামনেই একটা লোক একা দাঁড়িয়ে, তার ছায়াটা ফুটপাতের সঙ্গে একদম মিশে আছে। বৃষ্টিতে মনে হয় মানুষের ছায়াও ভিজে যায়।

আত্মহত্যা করতে যাওয়ার সময় এই শীত শীত লাগাটা তাকে একটা অস্বস্তির ভেতর ফেলে দেয়। ঠান্ডার ভেতর এতোটা পথ গিয়ে নদীতে ঝাঁপ দিতে হবে, মৃত্যুর আগে একটা শীত শীত অনুভূতি নিয়ে মরতে হবে— এটা কোনো ঠিকঠাক ব্যাপার নয়।

সোমেল প্রথম যাবে চায়ের দোকানে। যেখানে প্রতিদিন যাওয়া-আসার পথে সে একবার থামে, তাড়া থাকলে এককাপ চা খেয়ে নেয়। তাড়া না থাকলে চুপচাপ বসে থাকে। চায়ের কাপে চুমুক দিলেই মাথায় নানা কিছু এসে হাজির হয়। ভাবে, কীভাবে একইরকম দিন শরীরের ওপর, মনের ওপর নিঃশব্দে প্রভাব ফেলতে থাকে। কীভাবে অন্যরা সাই সাই ওপরে উঠে যায়। হুট করে গাড়ি কিনে ফেলে। অফিসে কমন স্পেস থেকে আলাদা কক্ষে চলে যায়। সেসব মানুষ তো ভেতরে ভেতরে অনেককিছু গুছিয়ে নেয়। সোমেল ঠিক বুঝতে পারে না, তার কী করা উচিত। সে সামনের কিছু দেখতে পায় না, ভাবতেও পারে না।

চায়ের দোকানে এককাপ দুধচা খেয়ে ফোনটা বন্ধ করে দেবে, তারপর সোজা বালু নদীর দিকে। বালু নদী পর্যন্ত সময়টুকু ফোন বন্ধই থাকবে। শহর থেকে যে পথ ধরে নদীটা, সে পথ স্মৃতির মিনার। ডুবা, টিনের বাড়ি, খানিকটা সবুজ ফসলি খেত— এরকম ছোটো ছোটো অনেক ব্যাপার পথে পথে দাঁড়িয়ে থাকে। যদিও অন্ধকারে এসবের কিছু দেখা যাবে না। তবে মহানগরে একটা মফস্বল বুকে নিয়ে ঘুরে বেড়ানো সোমেল ঠিক অনুভব করতে পারবে এইসব দৃশ্য। বাস থেকে নেমে একটু স্থির হয়ে ব্রিজের ওপর বসবে। তারপর নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে সে ভেসে যাবে, সঙ্গে একটা মফস্বল শহরও। মা আর খুঁজে পাবে না ছেলেকে। মায়ের জন্য সোমেলের মনটা ঘুরে যেতে চায়। এ অবস্থায় মায়ের কথা ঘুণাক্ষরেও মনে করতে চায় না। মায়ের কথা চিন্তা করতে গেলে ব্যাপারটায় গোলমাল লেগে যেতে পারে।

ফোন বন্ধ করে দিল। ঠান্ডা বাতাস এসে গা কাঁপিয়ে দিচ্ছে। কিছুদূর হেঁটে সোমেলের মনে হলো, ফোন বন্ধ করার কথা চা খাওয়ার পর, এখন না। জীবনের শেষ কয়েকটা ঘণ্টা অন্তত যেভাবে ভেবেছে সেরকমভাবে কাজগুলো করতে হবে। এখানেও অস্থিরতা ঢুকে সব এলোমেলো করে ফেলবে, সে সুযোগ দেওয়া যাবে না।

সোমেল ফোনের সুইস অন করে। সুইস অন করামাত্র কলটা এলো। অচেনা নাম্বার। মনে হলো, আগে থেকেই চেষ্টা করছে। এ মুহূর্তে অচেনা নাম্বার থেকে আসা কোনো কল ধরা যাবে না। তাতে দেখা যাবে একটা বিশ্রি ব্যাপার শেষ মুহূর্তে মনটা বিষিয়ে তুলেছে। কথাগুলো ভাবতে ভাবতে কলটা আবারও আসে। এবার সোমেল কোনোকিছু চিন্তা না করে ফোনটা রিসিভ করে।

‘আপনার ফোন বন্ধ, আপনাকে পাচ্ছিলাম না, কোথায় আছেন?’

একটি মিষ্টি কণ্ঠ। কে ফোন করল, এভাবে কথা বলছে! সোমেল কোনো উত্তর দিতে পারে না। সোমেল যখন নিজের ভেতর বিষয়টা নিয়ে নাড়াচাড়া করতে যাবে, তখন অন্যপ্রান্ত থেকে আবারও প্রশ্ন।

‘কোথায় আছেন আপনি?’

এর উত্তরে সোমেল কী বলবে, ‘আপনি কে? আমি কোথায় আছি কেন জানতে চাচ্ছেন।’ সে বরং চুপ করে থাকে।

‘আপনি ধানমণ্ডি ৩২ নম্বর আসতে পারবেন, এক্ষুণি।’

সোমেল সময় দেখে নেয়। সন্ধ্যা ৬.৩০, ধানমণ্ডি ৩২ থেকে ঘুরে আসতে ঘণ্টা দুই লাগবে। তার মানে রাত সাড়ে আটটা তখন। তারপর থেকে বালু নদী পৌঁছাতে এক ঘন্টার বেশি লাগার কথা নয়। ৯.৩০ বা ১০টা বাজবে হয়তো, এ এমন কী রাত! ঠেলেঠুলে পৃথিবীতে ২ ঘণ্টা বেশি থেকে যাওয়াটাও কম কথা নয়।

সোমেল সময় দেখে নেয়। সন্ধ্যা ৬.৩০, ধানমণ্ডি ৩২ থেকে ঘুরে আসতে ঘণ্টা দুই লাগবে। তার মানে রাত সাড়ে আটটা তখন। তারপর থেকে বালু নদী পৌঁছাতে এক ঘন্টার বেশি লাগার কথা নয়। ৯.৩০ বা ১০টা বাজবে হয়তো, এ এমন কী রাত! ঠেলেঠুলে পৃথিবীতে ২ ঘণ্টা বেশি থেকে যাওয়াটাও কম কথা নয়।

‘অদ্ভুত, কথা বলছেন না কেন?’ তার কণ্ঠে একটু উষ্মা।

‘জ্বি।’ সোমেলের মুখ দিয়ে শব্দ বেরোয় এবার। বলে, এই যে রওনা হলাম। ৩২-এর কোথায় আসব, বলেন?

‘সন্তুর, বাসস্ট্যান্ডের মোড়েই। আপনি কোথায় আছেন, কতক্ষণ লাগবে, বলেন তো। আমাকে চিনতে পেরেছেন তো?’

‘এক ঘণ্টা বা তার কিছু কম, চলে আসব।’ সোমেল ব্যাখ্যা করে। তারপর হাসতে হাসতে বলে, ‘জ্বি, আপনি তিথি, কণ্ঠ শুনেই চিনেছি।’ মুখে হাসি লেগে থাকে।

‘ঠিক আছে, সরাসরি সন্তুরে চলে আসবেন, আমি ভেতরেই থাকব।’ কথা শেষ হতে না হতেই ফোন কেটে যায়।

একটু তাড়াতাড়িই যাওয়া উচিত, সোমেল নিজেকে তাগিদ দেয়। ফাঁকে পকেটের অবস্থাটাও দেখে নেয়, সর্বসাকুল্যে আছে ৬০ টাকা— হিসাব করা, চায়ের খরচ, বাস আর রিক্সা ভাড়া। নদীতে ঝাঁপ দেওয়ার আগে হাতে আর কিছুই থাকবে না। যদি কোনো কারণে মন শেষ মুহূর্তে ঘুরে যায়, তবে ফিরে আসতে চাইলে পুরোটা পথ হেঁটে আসতে হবে। সারারাত ধরে হয়তো হাঁটতে হবে। তখন ছিনতাইকারির ছুরকিাঘাতেও মৃত্যু ঘটতে পারে। কিন্তু এরকম একটা মৃত্যুর কথা সে ভাবতে পারে না। এটা তার নিজেরই করতে হবে এবং পরিকল্পনামাফিক গুছিয়ে। অন্যের হাতে এ দায়িত্ব দেওয়া যাবে না। লাফ দিয়ে একটা বাসে উঠে পড়ে। উঠে পড়ার পর মনে হয়, এই দেখা করতে যাওয়ার কারণে ৬০ টাকার অর্ধেকই তো খরচ হয়ে যাবে। তখন বালু নদী পৌঁছাবে কীভাবে? বাসে উঠে সামনের সিটটা পেয়ে যায়। সিটে বসে টাকার চিন্তাটা জানালা দিয়ে ফেলে দেয়। জীবনের শেষ ক’টা ঘণ্টাও কয়েকটা কাগজের কথা ভেবে এভাবে চাপ নেয়ার কোনো মানে নেই।

 

২.
বাস থেকে নেমে সোমেল দেখে পৌঁছাতে লাগল ৪৭ মিনিট। তার মানে নির্ধারিত সময়ের বেশি সে নেয়নি। ভালোলাগার অনুভূতি তার হাত কাঁপিয়ে দেয়। সেই কম্পিত হাতে তিথিকে ফোন করে। ফোন বন্ধ! সোমেল আবারও চেষ্টা করে, এভাবে আরও কয়েকবার। ফলাফল একই। সোমেল কম্পন থেকে এবার বিচলিত হয়ে পড়ে। তার মনে হয় মরীচিকার মতোই সবকিছু আশেপাশে ঘুরে বেড়ায়। তবে অন্য কোনো ব্যাপারও তো হতে পারে। তখন সে রেস্টুরেন্টের নামটা মনে করার চেষ্টা করে। মনে আসে না। অনেকগুলো নাম এসে মাথায় ভিড় করে, যার কোনোটাই মেলে না। এদিক-সেদিক দেখে, খুঁজে। বাসস্টপেজের সঙ্গেই বলেছিল। এই তো, ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনেই সন্তুর। ৩২ নম্বর বাসস্টপেজ আর সন্তুর যেন হাত ধরাধরা করে আছে। সোমেল দেরি না করে ঢুকে পড়ে। কয়েকটা গাছ পাশাপাশি, মৃদু আলো, দারোয়ান— এসব মিলে একটা আবহ। নিজে ঠেলার আগেই একজন সালাম দিয়ে দরজা খুলে ধরে। সোমেল ঢুকে কোন দিকে যাবে বুঝে উঠতে পারে না। তখন আরেকজন সহাস্যে এগিয়ে আসে, স্যার কাউকে খুঁজছেন?

আরও দু’পা ফেললে রেস্টুরেন্টের প্রায় পুরোটাই সোমেলের চোখে ধরা পড়ে। ওই তো তিথি, বা দিকের একদম শেষ টেবিলটায়। কী দারুণভাবে পেয়ে গেল। সোমেলকে দেখে হাত ইশারায় ডাকে, মনে হলো, আগে থেকে নজরে রাখছিল। কেমন আশ্চর্যের সব ব্যাপার ঘটে চলেছে।

সোমেল মুচকি হাসিতে প্রশ্নটাকে এড়িয়ে যায়। আরও দু’পা ফেললে রেস্টুরেন্টের প্রায় পুরোটাই সোমেলের চোখে ধরা পড়ে। ওই তো তিথি, বা দিকের একদম শেষ টেবিলটায়। কী দারুণভাবে পেয়ে গেল। সোমেলকে দেখে হাত ইশারায় ডাকে, মনে হলো, আগে থেকে নজরে রাখছিল। কেমন আশ্চর্যের সব ব্যাপার ঘটে চলেছে।

সোমেল হাসি মুখে সামনের চেয়ারে বসে পড়ে, মানে মুখোমুখি। বসার পর তিথির সঙ্গে চোখাচোখি হয় না। পথে আসতে আসতে যে উত্তেজনা, তাও স্তিমিত হয়ে আড়ষ্টতায় পরিণত হয়। এর মধ্যে একটা মিষ্টি ঘ্রাণ নাকে এসে লাগে। যেটা আগেও পেয়েছে অনেকবার। ঘ্রাণ মানুষের এক বিরাট স্মৃতির আলখেল্লা, অনেক কিছু জাগিয়ে দিতে পারে। সোমেলের মনে পড়ে সে অফিস ডেস্কে মাথা গুজে কাজ করছে। একটা ঘ্রাণ নাকে এসে লাগলে মাথা তুলে দেখে তিথি পাশের ডেস্কে দাঁড়িয়ে।

‘চিনতে অসুবিধা হলো?’

সোমেল মুচকি হেসে মাথা নাড়ায়। মানে অসুবিধা হয়নি।

‘ফোন করেছিলেন? বন্ধ পেয়েছেন নিশ্চয়?’

‘জ্বি।’ সোমেল মাথা নাড়তে নাড়তে বলে।

‘আচ্ছা আগে আমরা খাবারের অর্ডার করি। তারপর কথা। কী খাবেন বলেন।’ তিথি খাবারের মেন্যুটা সোমেলের দিকে এগিয়ে দেয়।

‘আমি? আমি কী অর্ডার করব? আপনার যা ভালো লাগে করেন।’ সোমেল মেন্যুটা তিথির দিকে ঠেলে দিতে দিতে আড়চোখে দু’একটার দাম দেখে নেয়। এর কোনোটার দাম পরিশোধ করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। পকেট তো ৩০ টাকায় ঠেকেছে। অবশ্য মৃত্যুপথযাত্রী একজন মানুষের এসবে কোনো চাপ নাই।

‘আচ্ছা, ফোন কেন বন্ধ ছিল, জানেন?’

‘না, বলেননি তো।’

‘ফোনটা নিজেই বন্ধ করেছি। দু’টা কারণে, কেউ যাতে এ মুহূর্তে আমাকে বিরক্ত করতে না পারে। যেন শান্তিতে অপেক্ষা করতে পারি। তাছাড়া আপনার সঙ্গে ফোনে নয়, কথার শুরুটা সামনাসামনি হোক, সেটাও কারণ। আপনি যে খুঁজে বের করে আসবেন, সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিতই ছিলাম।’

সোমেল এবার মাথা তুলে তিথির দিকে তাকায়। তার মনে হয়েছিল, এই অপরূপ বালিকার সামনে এসে কিছুতেই দাঁড়াতে পারবে না। তার ব্যক্তিত্বের সামনে এসে সে মুখ থুবড়ে পড়বে। অবশ্য কিছু যায়-আসে না তাতে। সে এখন অর্ধেক পৃথিবীর, অর্ধেক মহাজগতের। কিন্তু তিথি তো মায়া ছড়াচ্ছে। যার সঙ্গে এককাপ চা খাওয়ার ব্যাকুলতা নিয়ে অনেক ঘুরে বেরিয়েছে সোমেল, সে ডেকেছে এমন নিপাট এক রেস্টুরেন্টে। সঙ্গে মায়াও বরাদ্দ করছে। আশ্চর্য!

সোমেলের আড়ষ্টতা কাটে না। তিথি সোমেলের চোখে চোখ রেখে বলে, ‘ওই যে পলাশীর কাঠগোলাপ গাছ, তার তলায়, বহু বছর আগে আপনি ঘুরঘুর করছিলেন আমার পিছু পিছু, মনে আছে তো? তখন থেকেই ভেবে রেখেছি একবার আমাদের দেখা হবে।’

‘মানে?’ সোমেল অবাক হয়ে যায়।

একজন ওয়েটার এসে দাঁড়ালে তিথি মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করে— হাঁসের মাংস হবে?

ওয়েটারের সম্মতি পেয়ে তিথি খাবার অর্ডার করে সোমেলের দিকে মুখ ফেরায়, ‘আপনি নিশ্চইয় অবাক হয়েছেন, কেন আপনাকে ডেকেছি। ক’দিন ধরে মনে হচ্ছিল, কোথাও বসে ডিনার করব আপনার সঙ্গে। আপনি ভাটি অঞ্চলের ছেলে, হাঁসের মাংস আপনার পছন্দ হওয়ারই কথা। কী বলেন?’

সোমেল যথারীতি কোনো উত্তর না দিয়ে বসে থাকে। ফলে কথা আর এগোয় না।

 

৩.
ওদের কাছাকাছি টেবিলে পুরো একটা পরিবার বসেছে। পরিবারের সদস্যরা খাবারের সঙ্গে খুব হাসাহাসি করছে। আরেকটু দূরে একটা যুগল। তারা নিজেদের মতো করে আছে। অন্য সব টেবিল ফাঁকা এখনও। এমনসব দৃশ্যের ভেতর দুজন চুপচাপ বসে থাকে। এতো চুপচাপ যে, মনে হয় দু’জন অচেনা মানুষ নিরুপায় হয়ে একটা টেবিল ভাগাভাগি করছে। এখন আর তিথিও কথা বলছে না। খাবার এলে, তিথি সোমেলকে এগিয়ে দেয়। বলে, ‘আপনাকে খুব বিক্ষিপ্ত লাগছে। আমরা খেতে শুরু করি, কী বলেন?’

মনে হয় দু’জন অচেনা মানুষ নিরুপায় হয়ে একটা টেবিল ভাগাভাগি করছে। এখন আর তিথিও কথা বলছে না। খাবার এলে, তিথি সোমেলকে এগিয়ে দেয়। বলে, ‘আপনাকে খুব বিক্ষিপ্ত লাগছে। আমরা খেতে শুরু করি, কী বলেন?’

‘জ্বি’, সোমেল অস্ফুটস্বরে কথাটা উচ্চারণ করে। সে নিজের ভেতর ঢুকে গিয়ে তিথিকে দেখে। এমন একটা ব্যাপার ঘটতে পারে, এটা তো কল্পনাতেও নাই। এখন এর ভেতর যদি ঢুকতে চায়, যদি তিথির চোখে চোখ রাখে, তাহলে তো সিন্ধান্তটা নড়বড়ে হয়ে যাবে। এগারোটায় এসে বারোটার কাটা আটকানো সম্ভব নয়। তবু চোখের সামনে শহর কী সুন্দর হয়ে উঠছে!

‘আপনাকে কেন ডেকেছি, জানেন?’ তিথি বলে।

‘না’

‘আপনার কথা শুনব বলে।’

‘আমার কথা!’ সোমেল আশ্চর্য হয়। আড়চোখে তিথিকে দেখে নেয় একবার।

‘অনেকদিন মনে হয়েছে, আপনি আমাকে কিছু একটা বলতে চান। আমিও আপনার জন্য কাঠগোলাপ আর গন্ধরাজের গল্প বলব বলে ঠিক করেছিলাম…’

সোমেল এ কথায় হেসে ওঠে, বলে, ‘সে গল্প কীরকম?’

‘সে গল্প অন্য সময়ের। এখানে ওটা বলা যাচ্ছে না।’

‘আচ্ছা।’ সোমেল চুপ হয়ে যায় আবারও, সঙ্গে একবার সময়টাও দেখে নেয়। আসা-খাওয়া সব মিলিয়ে দুই ঘন্টা তো এরই মধ্যে হয়ে গেছে।

‘আপনার চাকুরি চলে যাওয়ার পর বহুবার খোঁজ নেয়ার চেষ্টা করেছি, কোনো খোঁজ পাইনি। আমার ধারণা ছিল, আপনি একদিন ফোন করবেন।’

সোমেল মাথা নীচু করে খেতে থাকে। সে কোনো উত্তর দেয় না।

কথা আর বাড়ছে না। দু’একবার চাহনি ছাড়া ওদের ভেতর আর কথা হয় না। এমন যে, দু’টা মানুষ তাদের বিচ্ছেদকে সেলিব্রেট করে বিদায় নিচ্ছে। উঠে পড়ার পর তিথি সোমেলের কাছে এসে ফিসফিস করে বলে, আপনার হাতটা একটু ধরি? আর তো আমাদের দেখা হবে না।

এ কথায় সোমেল চমকে ওঠে। তিথি কী করে জানে আর দেখা হবে না! এই কথার পর সোমেল এক ঝটকায় ওখান থেকে বেরিয়ে পড়ে। একবারও পেছন ফিরে তাকায় না। ওয়েটার বিনয়ের সঙ্গে দরজা খুলে ধরে, স্যার আবার আসবেন। তিথি পেছনে পড়ে থাকে। সোমেল বাসস্টপেজে এসে একটা বাসে উঠে পড়ে। মনে হয় যেন বাসটা ওর অপেক্ষায়ই ছিল।

 

৪.
চায়ের দোকানে পৌঁছে দেখে রাত ৯.৩০। হিসেবের থেকে সময় একটু বেশিই হয়েছে। অবশ্য তাতে কিছু যায় আসে না, পুরো রাত পড়ে আছে। পলাশীর কাঠগোলাপের ব্যাপারটা অদ্ভুত। মেয়েদের হৃদয় এরকম নানা অদ্ভুত গল্পের ভাণ্ডার। একটা রং-চা অর্ডার করে সোমেল বেঞ্চের একপাশে বসে পড়ে। এখানে আসতে আসতে তার অন্তত একশবার মনে হয়েছে, এই বুঝি কলটা এলো। কিন্তু তেমন কোনো ব্যাপার ঘটেনি। তার এই আচরণে মেয়েটা নিশ্চইয় মর্মাহত হয়েছে। অবাক হওয়ারও কথা। এই তো চা শেষ হয়ে এলো। এক্ষুণি ফোনের সুইচ অফ করে দেবে। তারপর মহাজগতের সঙ্গে, আকাশ, নক্ষত্রপুঞ্জ, গ্রহমণ্ডলী এদের সঙ্গে একটা যোগসুত্র তৈরির পথটা খুলে যাবে তার।

পলাশীর কাঠগোলাপের ব্যাপারটা অদ্ভুত। মেয়েদের হৃদয় এরকম নানা অদ্ভুত গল্পের ভাণ্ডার। একটা রং-চা অর্ডার করে সোমেল বেঞ্চের একপাশে বসে পড়ে। এখানে আসতে আসতে তার অন্তত একশবার মনে হয়েছে, এই বুঝি কলটা এলো। কিন্তু তেমন কোনো ব্যাপার ঘটেনি।

রংচায়ের বিল পাঁচ টাকা পরিশোধ করে বাকি ২৫ টাকা নিয়ে বাসস্টপেজের দিকে হাঁটতে শুরু করে। এই হাঁটাটা তার শেষ যাত্রার। শহর একটা গম্ভীরতা নিয়ে দূরে দাঁড়িয়ে আছে। চায়ের দোকানের পাশে লেক, তার পাশে আলো ঝলমলে বাড়িগুলো। এসবের কিছুই তার নয়। একটা প্রজাপতি বা একটা গাছ বা একটা মানুষ ভালোবাসা দিয়ে ডাকেনি কখনো তাকে। প্রয়োজনে ডেকেছে, পরস্পর চায়ের দোকানে জড়াজড়ি করে থেকেছে, তাও প্রয়োজনেই। একটা নামও ভালোবাসায় তালিকায় ঢোকেনি। কিন্তু এই অগস্ত্য যাত্রার ঠিক আগে কেন যে তিথি নামক একটি বালিকা এতো মায়া ছড়াল। এর আগে যাদের দেখে সে মুগ্ধ হয়েছে, তারা কেউ কোনোদিন তাকে ডাকেনি।

বড়ো রাস্তায় এসে পড়েছে, সামনেই বাসগুলো দেখা যাচ্ছে। তখনই লোকটাকে দেখতে পায় সোমেল। লোকটা হাউমাউ করে কাঁদছে।

কী আশ্চর্য, লোকটা এভাবে কাঁদছে কেন? লোকটার কষ্ট কি তার থেকেও বেশি।

পথের এসব ঘটনায় কখনই আগ্রহ তৈরি হয় না। কিন্তু আজকে তার যেতেই হবে।

‘কী হয়েছে আপনার?’ সোমেল লোকটার মুখোমুখি হয়ে প্রশ্ন করে।

লোকটা চোখ মুছতে থাকে। চেহারায় বহু বছরের টানাপোড়েনের ছাপ স্পষ্ট হয়ে আছে।

‘কী হয়েছে আপনার?’

‘আমার সবকিছু ওরা নিয়ে গেছে। ছেলেটার জন্য দুটা খেলনা কিনেছিলাম কতদিন পর, ওগুলো ফেরত চাইলে আমার দু’গালে কষে চড় দেয়, এই দেখেন। অনুনয় বিনয় করার পরও শোনেনি।’

লোকটার দুটা গাল সত্যি সত্যি লাল হয়ে আছে। সে হাউমাউ করে আবারও কাঁদতে কাঁদতে বলে, ‘আমি এ মুখ নিয়ে কীভাবে যাব ছেলেটার কাছে?’

সোমেল তখন লোকটার মুখের কাছে গিয়ে বলে, ‘এখন কি তাহলে আপনি আত্মহত্যা করবেন?’

এই কথায় লোকটার কান্না থেমে যায়। চোখ বড়ো বড়ো করে সোমেলের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘আপনি কে? আমার ছেলে আপনাকে অভিশাপ দেবে।’

সোমেল লোকটার সামনে থেকে সরে পড়ে। এটা সে কী বলল! আচ্ছা, তিথি যে বলল, আর দেখা হবে না। এটা কেন বলল?

সোমেলের সবকিছু ঝাঁপসা হয়ে আসে। বাসস্টপেজের দিকে সে প্রায় দৌড়াতে শুরু করে। এ বাসস্টপেজ বালুনদীর নয়, নিউমার্কেটের। সঙ্গে সঙ্গে একটা বাসও পেয়ে যায়।

প্রায় রকেটের গতিতে বাসটা ৩২ নাম্বার এনে সোমেলকে নামিয়ে দেয়। নেমে দেখে সব ফাঁকা। সন্তুরের মূল গেইট এরই মধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। সোমেল তিথিকে ফোন করে। ফোন বন্ধ, তার বুকটা কেঁপে ওঠে। আরও আগে কেন ফোন করেনি।

এখানে একজন মানুষও নাই। মিরপুরগামী একটা বাস যাত্রী না পেয়ে বাসস্টপেজে দাঁড়িয়ে ডাকাডাকি করছে। রাত অনেক হলো। তবু বালু নদীতে যাওয়ার জন্য এখনো অনেক সময় পড়ে আছে। তিথি বলেছিল, ‘আপনি যে খুঁজে বের করে আসবেন, সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিতই ছিলাম।’ সোমেল বিড়বিড় করে বলে, এই তো এলাম।

অনেক রাত হলো। তবু বালু নদীতে যাওয়ার জন্য এখনো অনেক সময় পড়ে আছে। তিথি হাতটা ধরতে চেয়েছিল আর সে বলেছিল, আর তো দেখা হবে না। তাহলে মেয়েটা কোথায় যাবে! এরকম একটা অপরূপ মেয়ে পৃথিবীর বাইরে কোথাও যাওযার কথা কি চিন্তা করতে পারে? তার কি সোমেলের থেকে বড়ো কোনো কষ্ট আছে? না, তা কোনোমতেই হতে পারে না।

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

জন্ম ২১ মে  ১৯৮০। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর। সাহিত্য সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত প্রায় ২০ বছর। বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ তিনটি: ‘কয়েকজন দীর্ঘশ্বাস', ‘অবজ্ঞাফল আবেগসকল বিবিধ’ ও ‘মন এইভাবে স্থির করা আছে’। ২০২২-এর বইমেলায় প্রকাশ হচ্ছে চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ ‘উপমাজংশন’। এছাড়া রয়েছে উপন্যাস, 'ঘূর্ণির ভেতর জীবন,' শিশুতোষ, ‘গল্পগুলো সবুজ, মেঘেদের মাঠে গহীন’ গল্পগ্রন্থ ‌‘আজিজুল একটি গোপন নামতা’ ইত্যাদি প্রকাশিত গদ্য। বর্তমানে ‘অধ্যায়’ নামে একটি মাসিক সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্বরত।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।