সোমবার, ডিসেম্বর ৫

গানচিরকার আগুন : আসমা বীথি

0

মান্দিদের আদি ধর্ম সাংসারেক অনুসারীদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ বলে গণ্য হন তিনি। যৌবনে অনেক ঘুরে বেড়ালেও জীবনের বেশিরভাগ সময় কাটিয়েছেন পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো পাতাঝরা বনগুলোর একটি মধুপুর শালবনের এক প্রাচীন গ্রাম চুনিয়ায়। পরে চুনিয়াই ছিল তাঁর পৃথিবী। এই পৃথিবী বিস্তৃত হয়েছে তাঁর গ্রামবাসী থেকে শুরু করে দেশ ও দেশের বাইরের অগণিত শ্রেণি-পেশা-লিঙ্গ-ধর্ম-জাতির মানুষের মধ্যে। উন্মুক্ত সংহতির এই জ্ঞানবলয়ে জনিক নকরেক পেয়েছেন দার্শনিকের মর্যাদা। ২০২১ সালের ১২ নভেম্বর তাঁর মহাপ্রয়াণ ঘটে। 

জনিক নকরেকের প্রয়াণে তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়ে ‘শ্রী’ একটি আয়োজনের ঘোষণা দেয় সেসময়। কিন্তু পর্যাপ্ত লেখা না পাওয়ায় পুরো আয়োজনটি আর সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। কবি ও আলোকচিত্রী আসমা বীথির এই লেখাটি তিনি শ্রী-র অনুরোধে তখন লিখে পাঠিয়েছিলেন। আমরা অপেক্ষা করছিলাম যদি আরও কিছু লেখা পাওয়া যায়! যায়নি। তাই সম্পূর্ণ একটি সংখ্যার পরিকল্পনা বদলে আচ্চুকে নিয়ে ভালো লেখা পাওয়া সাপেক্ষে আমরা প্রকাশের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

আসমা বীথির এই লেখাটির মধ্য দিয়ে সাংসারেকের শেষ পুরোহিত জনিক নকরেক, প্রিয় আচ্চুর প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা জানাই।


উঠোনে যখন পা রাখি রাতের দ্বিতীয় প্রহর। হালকা কুয়াশা। ঝিঁ-ঝিঁ-র ডাক। আজিয়ার করুণ সুর। আচ্চু তার নকমান্দিতে ঘুমিয়ে। সাদা কাপড়ে ঢাকা শরীর। প্রতিদিন একা ঘুমাতো আর আজ তাকে ঘিরে আছে আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী, ভক্তের দল। মাথার কাছে প্রদীপ, সুগন্ধিবাতি, কলাপাতায় মোড়ানো চালভাজা, মাটির পাত্রে চু আরও নানা উপকরণ। নাভি থেকে পাঁজর পর্যন্ত ফুল, পালক, মুদ্রা; পায়ের আঙুলে ছোট্ট একটি দো বাঁধা। চিঁক চিঁক করে ডাকছে। মাটির মেঝের ঠান্ডা লুকাতে সে আচ্চুর পায়ের ওমে বারবার লুকাতে চাইছিল। ওম কোথায়, মরে গেলে তো শরীর ঠান্ডা আর শক্ত হয়ে যায়।


আচ্চু

সাংসারেক ধর্মের শেষ পুরোহিত জনিক নকরেক।


প্রতিবার মধুপুরযাত্রা ছিল মধুর উৎকণ্ঠার, দুর্বার অগ্রহের। নিত্যনতুন অন্বেষণের। এবার কি শেষ হলো সব? এই শেষের ভয় অনেকবারই পাচ্ছিলাম। ‘গিত্তাল মি আচ্ছিয়া’ যখন এডিটিং প্যানেলে তখন একবার অসুস্থ হলেন। ভয় হচ্ছিল আচ্চু দেখে যেতে পারবেন তো? একবার রাফকাট দেখানো হলো ল্যপটপের মনিটরে। চোখে দেখতে পেতেন না ভালো। তাই কান পেতে নিজের বলে ওঠা মন্ত্র-কথার সাথে নিজেই সুর মেলাচ্ছিলেন, ‘হ এইডাই!’ আবার অগের-পরের সাথে সঙ্গতি খুঁজে না পেলে তাও বলে উঠছিলেন, ‘না না এইডা এরম না।’ তাঁর সেই দেখাটা আমাদের সম্পাদনার ক্ষেত্রে অনেক সাহায্য করেছিল। চলচ্চিত্রটির কাজ সম্পূর্ণ শেষ হওয়ার পরও মনের ভেতর তোড়ঘোড় চলছিল আচ্চুকে দেখাতে হবে। একটি প্রদর্শনীর আয়োজন অনেক জটিলতাপূর্ণ। শারীরিক নানা প্রতিবন্ধতার কারণে আচ্চুকে যেহেতু কোথাও নেওয়া যাবে না, স্থির হলো চুনিয়াতেই প্রদর্শনী হবে। সবার সহযোগিতায় সে-কাজটাও সম্পন্ন হলো। সিনেমা শেষ হলে পর্দা নামে। কিন্তু জীবনে জীবন আর মৃত্যুতে মৃত্যুর শেষ নেই। জনিক নকরেকের সাথে কাজের, ভালোবাসার এই জায়গাটি তৈরি হয়েছে দিনে দিনে, একটু-একটু করে। তাঁর মতো করেই তাঁকে ভাববার চেষ্টা করে গেছি সবসময়। প্রকল্প শেষ হলেই সব কাজ শেষ হয়ে যায় না, শেষ হওয়ার নয় এই ‘আগান মিয়াফা’ তাঁর সূত্রেই পাওয়া।

শিয়রে বসা কান্নারত পূর্ণিমা আচ্চুকে মুখের দিক থেকে কাপড় সরিয়ে দেখাল। আচ্চুর নিথর শরীর যেন কথা বলে উঠল, ‘যখন দেহের প্রাণ যায় তখন আমরা যাই। কে-যে কখন যাবগা, আমার জানা নাই। আমি কীভাবে কারো (কাউরে) রাখব জানা নাই। রক্ত-মাংস শরীর, মানুষের দয়ামায়া সব একইরকম।’


আচ্চু ২

জনিক নকরেককে নিয়ে আসমা বীথি নির্মিত ‘গিত্তাল মি আচ্ছিয়া’র রাফকাট দেখানো হচ্ছে তাঁকে।


তিনি খুব দ্রুত কথার বিষয়বস্তু বদলাতেন। প্রথম প্রথম যখন ইন্টারভিউ শুরু করি নিজেই ওলোটপালট হয়ে গেছিলাম। কী জানতে চাইলাম, আর কী উত্তর পেলাম। পরে বুঝলাম প্রসঙ্গান্তরেই প্রসঙ্গ ধরিয়ে দিতে চাইছেন, ধানের গল্পেই আছে সৃষ্টি-পুরাণ, জুমের ইতিহাস। রাং-খ্রাম-আদুরির তথ্যে শুধুই যন্ত্রবিশেষের গল্প নয়, উঠে আসে নানা প্রকার মিদ্দিদের ইতিহাস। বহু আজিয়া, শ্লোক, রে-রে, প্রবাদ, আপনমনে সুর করে গাইতে শুনেছি, শুনিয়েছেন। এসবের ভেতরেই গাঁথা আছে এক জাতি, বিশ্বসংসার। শুধু সূত্র মেলাও, খুঁজে নাও, বুঝে দ্যখো। চোখে ঝাপসা দেখতেন বলে শেষদিকে বেশিরভাগ সময় চোখদুটিকে আধবোজা রেখে খুব গভীর থেকে কথা বলতেন। হয়তো এত বিষয় নিয়ে চিন্তাচর্চা করতেন বলেই তা বহুমাত্রায়, বহু ঢং-এ প্রকাশ পেয়ে যেত।

বলতেন, আম্বি…
‘কিছু মনে আসে না
চাই না
শুধু মনে পড়ে’

বলতাম কী মনে পড়ে, আচ্চু?

‘শুধু ছিলাম মানুষ
জ্ঞান ছিল না, বুদ্ধি ছিল না’

অপেক্ষা করি… বলেন—

‘সব জাতিরই এক মালিক। মালিকের কাছে মান্দিরা চাইছিল জুম। গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া, মানুষ, সর্প, বাঘ, ভালুক, হাতি… মালিক সবাইরে ভাগ কইরা দিসে, যা যা ভাগ কইরা দিসে সবাই তা তা খাইতাসে। তা দিয়া চলতাসে। পৃথিবীটা এইভাবে আছে।’


আচ্চু ৪

লেখক ও চলচ্চিত্রকার আসমা বীথির তোলা আলোকচিত্রে জনিক নকরেক।


শুধু নারী নয়, শুধু পুরুষ নয়, শুধু এক ধর্ম নয়, শুধু এক জাতি নয়; জল-হাওয়া-মাটি-মাটির তলদেশ এবং যেকোনো প্রাণের এক সর্বাঙ্গীন বোঝাপড়ায় নিজ অস্তিত্বকেই যেন বারবার ভাবনার অতলে নিয়ে যায়। শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের প্রচেষ্টা নাই, দাবীদাওয়া নাই। জগতের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র প্রাণকে—প্রকৃতিকে বিবেচনায় এনেছেন, শুধু আগান মিয়াফার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে রাখেননি; যাপনে তার ছাপ রেখে গেছেন প্রতিনিয়ত। বলেছেন কর্ম করে খাওয়ার মতো জীবনের সারকথা। তাঁর বাক্যে দার্শনিকতার বোধ, কাব্যের সুষমা মিলত সহজাত মাধূর্যে।

তিনি বলেছেন প্রতি হাজিরাবারে তিনি বনে যেতেন। এত প্রকার গাছ, লতাপাতা, শেকড়ের কথা বলেছেন, মাঝে মাঝে সেগুলোর কার্যকারিতার কথা বলেছেন সেসব আর হয়তো খুঁজেও পাওয়া যাবে না। এতসব প্রাকৃত জ্ঞান তিনি কী করে, কোন সাধনায় আহরণ করলেন, আগ্রহ জাগায় না?

লাঠির ঠকঠক শব্দটা শালবনে শুকনো পাতাদের মাড়িয়ে অনেকদূর পর্যন্ত হেঁটে যেত। প্রার্থনার শব্দ এখনও শুনতে পাই যেন— হানিমা, সালনিমা, সালজেম ফা… এই মন্ত্রে মাটির মা, সূর্যের মা-কে ডাকছেন। কর্ষণের সময় যেন করুণাময় দয়া করে। মাটির তলদেশে যে-জলধারা কান পেতে সেই শব্দ শুনতে বলেছেন।

কঠিনকে সহজ করে দেখা ও সেইমতো সহজ-যাপন তাঁর জীবনজুড়ে। সংগ্রাম আছে, সংঘাত আছে, অভাব আছে, তীব্র প্রতিবাদও আছে; কিন্তু আওয়াজ বা চিৎকারটা কখনই শুনতে পাইনি। আজীবন অবিচল থেকেছেন সাংসারেক বিশ্বাসে। এক উজানতরী যেন। যখন একটি জাতিগোষ্ঠীর প্রায় সকলে ধর্মান্তরিত, বিবর্তিত-পরিবর্তীত সংস্কৃতিতে আস্থা খুঁজেছে তাদের জোর করে নিজের দলে ভেড়াবার কথা ভাবেননি, বরং নিজের কর্ম করে গিয়েছেন। স্বভাবজাত হাসিতে-ঠাট্টায়-নম্রতায় বলেছেন, ‘ওরা না জানে নিজের না জানে অপরের।’ কিন্তু ঠিকই আমুয়ার আয়োজন করলে গ্রামের সব লোক এক হয়েছে, অংশগ্রহণ করেছে। এটাই হয়তো তাঁর জাদু, বড়ো ক্ষমতার জায়গা।


আচ্চু ৩

আচ্চু জনিক নকরেকের সঙ্গে লেখক ও চলচ্চিত্রকার আসমা বীথি।


তাঁকে ঘিরে আজিয়া করতে করতে শোক প্রকাশ করছিল তাঁর ভালোবাসার মানুষেরা। সবচেয়ে বড়ো প্রশ্নটা মনে নিয়ে ঘুরছি। মৃত মানুষের পরিবার, মৃত মানুষের সমাজ কি তাঁর ইচ্ছের, সাধনার গুরুত্বকে সম্মানিত করবে?

যদি না করে?

আচ্চুর বুড়ো আঙুলে বাঁধা ছোট্ট দো চিঁক চিঁক স্বরে ডেকে উঠল আবার; যেন জানান দিল আমিইতো আত্মাকে স্বর্গলোকে নিয়ে যাব উড়তে উড়তে। আচ্চু জনিক নকরেকের শেষকৃত্যে এসেছিল সম্মান জানাতে সব ধর্মমতের লোক। তাঁর ধর্মের ধর্মান্তরিত মানুষেরা। দাহ করা হয়েছিল তাঁকে। মাঙফং-এ করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল দাহ করার নির্ধারিত স্থান গানচিরকা-তে। ‘গানচিরকা’র বাংলা ধারণা হতে পারে চিতা। চিতা জ্বলে উঠল তো। মধুপুরের চুনিয়া গ্রামে প্রায় পঁচিশ, ত্রিশ বছর বাদে এইভাবে এমন সর্বমান্যতায়, সার্বজনীনতায় গানচিরকার আগুন জ্বলে উঠতে দেখল সবাই।

আপন মহিমায় ভাস্বর হয়ে ওঠা, বিশ্বাস ও যুক্তিকে ভালোবাসতে পারা একজন জনিক নকরেক তাই বারবার কাছে টেনেছে। যিনি এক পর্বের শেষে, অজস্র শুরুর বীজ বুনে দিয়েছেন।

‘বনের বাঘ কান্দে
জলের কুমির কান্দে
কেন?’

যতদিন ‘গানচিরকা’র আগুন বুকে জ্বালিয়ে রাখতে পারব, এই ‘কেন’ আমাদের নানা অন্বেষণের দিকে নিয়ে যাবে। পৃথিবীতে মানবের বেঁচে থাকা, পৃথিবীতে অপরাপর প্রাণের বেঁচে থাকার মধ্যে অদৃশ্য যে সংযোগ ও সংহতি রয়েছে তার তো নিশ্চয় বড়ো কোনো কারণ ও সম্ভাবনা রয়েছে।


কিছু গারো শব্দের অর্থ নিচে দেওয়া হলো—

 

আচ্চু : দাদু বা নানুকে এই সম্বোধনে ডাকা হয়
আম্বি : দাদী বা নানী (এখানে আদর করে নাতনীকে ডাকা হয়েছে)
নকমান্দি : মান্দিদের ঐতিহ্যবাহী ঘর
আমুয়া : পূজা
আজিয়া : মান্দিদের নিজস্ব পদ্ধতিতে গান গাইবার রীতি। শোকের ও আনন্দের দুইরকম আজিয়াই হতে পারে। মৃত ব্যক্তির আত্মার উদ্দেশে কান্না করে করুণ সুরের মাধ্যমে যে আজিয়া পরিবেশন করা হয় তাকে বলে মীমাংদংনাবা দো-মুরগি
আগান মিয়াফা : জ্ঞানবাক্য
রাং-খ্রাম-আদুরি : মান্দিদের নিজস্ব বাদ্যযন্ত্র
মিদ্দি : দেবতা
মাংফঙ : যে বাঁশের সাথে বেঁধে লাশকে চিতায় বহন করে নেওয়া হয়
গানচিরকা : মান্দি শব্দ। গানচিরকার বাংলা ধারণা হতে পারে চিতা। বলশাল, বলংদানিফা, বলথাজং, চা.খু ইত্যাদি গাছের কাঠ ব্যবহার করা হয় গানচিরকাতে

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

জন্ম চাঁদপুরে। চট্টগ্রামে বসবাস দুই বছর বয়সকাল থেকে। কবিতার পাশাপাশি আগ্রহের বিষয় আলােকচিত্র। প্রকাশিত কবিতার বই ‘আধখাওয়া ফলের জীবন’ (২০১০), টুকরাে হয়ে ছড়িয়ে পড়ি (২০১৬) এবং ‘এসো হে জন্ম’ (২০১৯)। ২০২০ সালে নির্মাণ করেন সাংসারেক ধর্মের শেষ পুরোহিত জনিক নকরেকের উপর প্রমাণ্য চলচ্চিত্র ‘গিত্তাল মি আচ্ছিয়া’।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।