রবিবার, জুন ২৩

গুম : রোমেল রহমান

0

তোরাপের মা কয়, এইখানেই গাছখান আছিল কিন্তু এহন নাই। এইখানে তার লম্বা ছায়া পড়তো। এইখানে হাওয়ায় সে তার ঝাঁকড়া মাথা দোলাইতো, এইখানে বর্ষায় ভিজা সবুজ হয়্যা থাকতো থির; কিন্তু এখন সে নাই। তার ছায়া নাই, পাতার চিহ্ন নাই; গতরের গোন্ধ নাই। ফলে আমরা সবাই পরস্পরের দিকে তাকাই। তারপর তোরাপের মা কয়, গাছটা যেইদিন নিখোঁজ হয় তার পরেরদিন মা গাছখান খালি কান্দে! বিনবিন কইরা কান্দে; পিনপিন কইরা কান্দে, জারি কইরা কান্দে, হাউকাউ কইরা কান্দে। তারপর একদিন মা গাছটার কান্দন থামে। তারপর তার জবান বন্ধ হয়া থাকে অনেক অনেক দিন। তারপর অন্যগাছ গুলান তারে খুঁচায়। ক্যান সে কথা কয় না, ক্যান সে বোবা হয়া থাকে। তারপর তোরাপের মা কয়; গাছে পাখিরা বসা বন্ধ কইরা দেয় কিংবা পাখিদেরও শোক হয় কিংবা পাখিরা তার দুঃখের ভাগিদার হইতে পারে বইলা তারা লজ্জায় তার ডালে বসে না। তখন একদিন এক হরিয়াল পাখি কইত্থন আইসা বসে, হ হরিয়ালই আছিল পাখিটা, তারপর সেই পাখির সঙ্গে মা গাছের কি বাৎচিত হয় আমি জানি না তয় হরিয়াল উইরা গিয়া বসে এই জঙ্গলের সব থেইকা বুইরা বট গাছের ডালে। হরিয়াল বট গাছেরে কি কয় সেইটা বাল আমি জানি না, আসলে আমি বুঝি না হরিয়ালের ভাষা। তয় যখন হরিয়ালের বাৎচিত থামে তখন শুনতে পাই বুইরা বটগাছটা একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলায়! তখন আমার মনে হয় যে বুইরা বটগাছ আসলেই বুইরা হইয়া গেছে বইলাই দুঃখে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে কিংবা হয়তো সেইটা সে এম্নেই ছাড়ে হয়তো আমার শোনার ভুল যে বুইরা বট গাছটা দীর্ঘশ্বাস ফেলায়। তারপর হরিয়াল পাখিটা অন্য গাছ গুলার ডালে ডালে গিয়া বসে আর কি যেন ফিসফাস কইরা কয়, তারপর সারা জঙ্গলে কি যে হয় চারিদিকে ফিসফাস শোনা যায়। হইতে পারে আমার শোনার ভুল কিংবা সত্যই তারা ফিসফাস করে। তারপর হরিয়াল পাখিটা পাতার আড়ালে হারায় যায় কিংবা হয়তো সে এমন গভীর কোনো গাছের আড়ালে ডুব দেয় যেন তারে আর খুঁইজা পাওয়া যায় না।

আমারা তোরাপের মায়ের এই বয়ান শুনে আবার পরস্পরের দিকে তাকাই। আমাদের খারাপ লাগে। আমরা টের পাই তার বেদনার গভীরতা। তখন তোরাপের মা বলে, এরপর একদিন দেখা যায় মা গাছটার পাতা গুলান হইলদা হয়া আসতে থাকে আর বাপ গাছটার পাতা গুলান ন্যাতায় শুকায় আসতে থাকে

আমারা তোরাপের মায়ের এই বয়ান শুনে আবার পরস্পরের দিকে তাকাই। আমাদের খারাপ লাগে। আমরা টের পাই তার বেদনার গভীরতা। তখন তোরাপের মা বলে, এরপর একদিন দেখা যায় মা গাছটার পাতা গুলান হইলদা হয়া আসতে থাকে আর বাপ গাছটার পাতা গুলান ন্যাতায় শুকায় আসতে থাকে, তহন আমগোর নজরে আসে ভাই গাছ আর বইন গাছ দুইটার পাতায় ঝিমঝিম ভাব। আর গায়েব হয়া যাওয়া গাছটার পাশের গাছ, যেইটা আমার বিবেচনায় গায়েব হয়া যাওয়া গাছটার ভালোবাসার গাছ সেই গাছটার পাতায় পাতায় কান্নার পানি। কিন্তু সেই কান্নায় শব্দ নাই। আসলে শব্দ কইরা লাভ নাই যেই জীবনে সেইখানে হাউকাউ কইরা কিসের লাভ? কয়দিন পর দেহা যায় মা গাছটার পাতা হলুদ হয়া আসে। বাপগাছটার পাতা শুকায় আসতে থাকে আর ভাই গাছা বইন গাছ দুইটার ডালে বিমার লাগে। আর গায়েব হয়ে যাওয়া গাছটার ভালোবাসার গাছটা খাওয়া দাওয়া ছাইড়া দেয়। সেদিন শোনা যায় বনের অন্য গাছগুলার দীর্ঘশ্বাস। তারা কেউ কিছু কয় না। শুধু বুইরা বট গাছটারে দেখা যায় শোকে আরও বুইরা হয়া আসতে। এর কিছুদিনের মইধ্যে দেখা যায় মা গাছ বাপ গাছের সব পাতা খইসা পড়ে ভাই গাছ বইন গাছের ডাল বিমারে শুকায় আসে। আর গায়েব হয়া যাওয়া গাছটার ভালোবাসার গাছটা ন্যাতায় পড়ে। তখন একদিন বিষম বৃষ্টি হয় আর বিষম বৃষ্টির শেষে দেখা যায় নরম মাটি পায়া বাপ গাছটা হুমড়ি খায়াপইড়া যায় আর মা গাছটা বৃষ্টির জল পেয়েও জ্যান্ত হয় না। ফলে সেই মৃত্যুর খবর সারা জঙ্গলে ছড়ায় যায়। তখন অন্যরা ভাবে যে, ভাই গাছ আর বইন গাছের মৃত্যু নিকটে আর গায়েব হয়ে যাওয়া গাছটার ভালোবাসার গাছটাও অপেক্ষায় অপেক্ষায় ন্যাতায় আসে। এই পর্যন্ত বলে তোরাপের মা থামে। আমাদের মন খারাপ লাগে আমাদের মনে হতে থাকে তাহলে কি হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যাওয়া গাছটার জন্য তার পরিবার গাছগুলা অনশন করে মৃত্যুকেই আপন করে নেয়?

অন্য গাছেরা কি তার নিখোঁজ হয়ে যাওয়া কিংবা তাকে নিখোঁজ করে দেয়ার ঘটনায় ভয় পেয়ে চুপ মেরে থাকে? ফলে তারা ব্যাপারটায় দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে কিন্তু কোনো প্রতিবাদ জানাতে সাহস করে না যদি তাদেরকেও গায়েব হয়ে যেতে হয় প্রশ্ন করার অপরাধে। ফলে আমাদের এটাও মনে হয় যে এই মৃত্যুর দায় আসলে কার কান্ধে পড়ে??

অন্য গাছেরা কি তার নিখোঁজ হয়ে যাওয়া কিংবা তাকে নিখোঁজ করে দেয়ার ঘটনায় ভয় পেয়ে চুপ মেরে থাকে? ফলে তারা ব্যাপারটায় দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে কিন্তু কোনো প্রতিবাদ জানাতে সাহস করে না যদি তাদেরকেও গায়েব হয়ে যেতে হয় প্রশ্ন করার অপরাধে। ফলে আমাদের এটাও মনে হয় যে এই মৃত্যুর দায় আসলে কার কান্ধে পড়ে?? তখন তোরাপের মা মুখ খোলে, সে বলে; নিখোঁজ হয়া যাওয়া গাছটার ভালোবাসার গাছটা একদিন মইরা সিটকি মাইরা থাকে। আর তার কয়দিনের মইধ্যে ভাই গাছ আর বইন গাছের শুকনা গোঁড়ায় উঁই বাসা বান্ধে। কিন্তু মা গাছ তখনো মরে না। ন্যাতায় ন্যাতায় বাঁইচা থাকে ইন্তেজারে। লোকে কয়, মা গাছের মন হইলো ফুলের মতন নরম কিন্তু শরীর হইলো পাত্থরের মতন শক্ত। তারপর সেই বনের অন্য গাছেরা আফসোস করে কারণ মা গাছের মাথায় আউলা দোষ হয়, কিংবা অন্যরা তারে আউলা ভেবে নিষ্কৃতি নেয়। কারণ মা গাছটা দিন রাইত খালি বিড়বিড় কইরা কয়, কই গেছে আমার খোকন? …কেডা তারে নিয়া গেছে? …খবিশ তারে বেভুল দেশে হারায় দিছে নি? …কই গেছে রে আমার খোকন খোঁজ জানো নি? …মায়ে কান্দে বাপে কান্দে কান্দে পরাণ পাখি, …ভাইয়ে কান্দে বইনে কান্দে ভাইয়ের খোঁজ জানো নি? মা গাছের এই বিলাপে বনের অন্য গাছেরা এইবার কান্দে। তাদের শোক হয়। তাদের ডালে ডালে বিচিত্র পাখি আসে বাসা বান্ধে ডিম পাড়ে। ডিম ফুটায়া উইড়া যায়। ঋতুর বদলে নয়া পাতা আসে পুরাতনেরা হলুদ হয়া খসে যায়। আর যহন হাওয়ায় ভাইসা তাগোর কানে বুড়ি মা গাছের বিনবিনানি কান্না আইসা লাগে তহন তাগোর অপরাধ অপরাধ লাগে। চুপ থাকার অপরাধ। তারা কেউ কেউ চোখ মোছে। শব্দ কইরা কানতে তাদের ভয় হয়। বুইড়া বট গাছটা আরও বুইড়া হয় আর দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। এই পর্যন্ত বলে তোরাপের মা বিনবিনায়ে কান্দে। আমাদের কারো কারো মায়া লাগে, চোখ ভিজে আসতে চায়। আমাদের অপরাধ অপরাধ লাগে।

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

কবি ও নাট্যকার। প্রকাশিত কবিতার বই : বিনিদ্র ক্যারাভান (২০১৫, অনন্যা)। বাংলাদেশের খুলনায় থাকেন।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।