বুধবার, ফেব্রুয়ারি ২৮

গৌতম চৌধুরীর গুচ্ছ কবিতা : অপরগুচ্ছ

0

Motif-01

১.
অহং এক বিস্মৃতি মাত্র। এক ভুল পরিতৃপ্তির অবসাদ। ভুলিলেই শান্তি। কারণ, প্রার্থনাগুলি তীব্র। প্রার্থনাগুলি যন্ত্রণার। শরীর ভেদ করিয়া যাওয়া কীলকের মতো। তীক্ষ্ণ। তাহাদের ভারবহন একাকীর। ভারবহন দীর্ঘ। পোড়ামাটির পুরাকীর্তির ঘাড়ে কখনও মুখ বাড়ায় পোড়ামাটির চাঁদ। মনে হয়, রণদগ্ধ প্রান্তরের বুকে সামান্য সান্ত্বনা বুঝি। কিন্তু সে-চাঁদ দৃশ্য মাত্র। অনাসক্ত। নির্বিকার। পৃথিবীর সকল নারকীয়তার সামনে মন্তব্যহীন। তাই সকল বিড়বিড় ভুলিলেই শান্তি। পরিতৃপ্তির অবসাদ। বাটি হইতে নুন-হলুদ মাখানো মাছ তুলিয়া লইয়া ওই পলাইতেছে বিড়াল। কে তাহাকে ধরিবে? পাঁচিলের উপর দিয়া ওই যে ছুটিতেছে। অহং…

 

২.
এমন তো হইতেই পারে, কার্তিক মাসের এই রাত্রি আচানক খালি পায়ে আসিয়া দাঁড়াইল মাঠের বুকে। ঘটনাক্রম অজানা থাকা এক ধরনের রোমাঞ্চ। তারাগুলি স্থির থাকে, না কি সাঁ সাঁ উড়িতে থাকে, তাহা সময়ের পাল্লার উপর নির্ভর করে। খড়ের গাদার ভিতর হইতে সাপ বাহিরিয়া চুম্বন করিয়া চলিয়া যায়। ধর্‌ ধর্‌ করিয়াও ধরা যায় না তাহাকে। কাহিনিকার কি পারে তাহার আখ্যানকে ধরিতে! অভিজ্ঞতাও এক প্রকার আলস্য, কেবলই কল্পনার পথ আটকায়। তবু ঘুড়ি বিলকুল কাটিয়া গেলে গিঁট-বাঁধা সুতাকে তো কিছুদূর ভাসিতেই হয়। কাহার না কাহার হাতে গিয়া পড়ে! আবার শুরু হইবে এক নতুন গ্রন্থি। মাঠ পার হইয়া চলিয়া যায় রাত্রি। তাহার পিছু পিছু কার্তিক মাস। সাপটিও যায়। শীতঘুমে …

 

৩.
কুয়ার ভিতর নিজেকে দেখিয়া কাঁপিতে থাকে সিংহ। ভাগ্যিস ছোটকালে পড়া গল্পটি সময়মতো মনে পড়িয়া যায়! জগতে শত্রুমিত্র বলিয়া কেহ নাই। মাথার উপর একাই ধরিতে হয় নক্ষত্রের ক্ষত। ভাবিতে ভাবিতে, ঘুম নামিয়া আসে চোখে। সকল প্রার্থনার ঊর্ধ্বে সেই ঘুম। পাথর হইয়া যাওয়া বরফ। বুঝি কোনও দিন গলিবে না। তবু হয়তো বল্গা হরিণের পিছু পিছু সেই অজানা তুষারপ্রান্তরে আসিয়া জুটিবে দুইচার ঘর মানুষ। হাতে হাতে গড়িয়া উঠিবে ইগলু। গোল ছাদ ও ঝকঝকে দেওয়াল হইতে ঠিকরাইবে মেরুপ্রান্তের আলো। যেন অন্য কোনও গ্রহ। দিগন্তে মুখ বাড়াইতেছে, ঘুমন্ত সিংহের স্বপ্ন…

 

৪.
আকাশের বুকে বাতাসের বাড়ি। বানাইতেছে অনুপম মিস্তিরি। কত রকম যে বাতাস! আকাশও কত ঢেউ-খেলানো। ছাদ ঢালা হইয়া গিয়াছে। উপরে মশলা মাখিতেছে জোগাড়ে। ভারায় দাঁড়াইয়া দেওয়াল গাঁথিতেছে রাজ। নিচে, রাস্তায়, বাবু উপর পানে তাকাইয়া আছে মুগ্ধ চোখে। নিজেই তিন জন হইয়া তিন রকম কাজ চালাইতেছে মিস্তিরি। বাতাস কখনও নরম, কখনও কঠিন। ইটও বাতাসেরই মতন। চুন সুরকিও সেরকম। তিন হাতে কাজ চলিতেছে জোরকদম। দেখিতে দেখিতে আকাশের বুকে ছায়া ফেলিতেছে বাড়ি। তৈরি হইলেই তিন জনের ছুটি। কিন্তু তাহাদের তো দেশঘর বলিয়া কিছু নাই, যাইবে কই! অন্যমনস্ক হইয়া মিস্তিরি ভাবে – একটি ছোট্ট কামরা হয়তো চাহিলেই পাওয়া যায়। কিন্তু আবার কখন কোথায় কাজের ডাক পড়ে। আকাশের তো কোনও শেষ নাই …

 

৫.
চাষবাসের দিকে মিঞাসাহেবের মন নাই। তাহাকে পাইয়া বসিয়াছে গুপ্তধন আবিষ্কারের নেশা। একবার দুইবার বোধহয় বনবাদাড় ঢুঁড়িয়া জুটিয়া গিয়াছিল পুরাতন কিছু সিক্কা। তাহাদের ঘষা-খাওয়া শরীর আর অজানা অচেনা হরফের দিকে হুমড়ি খাইয়া পড়িয়াই ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়া যায় তাহার। লোকে ভাবে, নির্ঘাত জাদুঘর-টাদুঘরে দু-চার পিস বেচিয়া ভালোমতো দাঁও মারিয়াছে মিঞা। নহিলে কি সংসার চলে! বেচিতে সে যায় নাই, তাহা নয়। কিন্তু ফ্যাসাদ তাহাতে কম নয়। একে তো দরদাম হইল নিঃশব্দে। জামার ভিতর হাত ঢুকাইয়া, আঙুল টিপিয়া টিপিয়া মাতবরেরা হাজার টাকাকে দুইশ টাকায় নামাইয়া রফা করিল। তাহার মতো বুরবক আর কী করে! তবে আসল সমস্যা আরও জটিল। কেতাবদুরস্ত মানুষগুলি এখন থাকিয়া থাকিয়াই আরও গুপ্তধনের জন্য এত্তেলা পাঠায়। আরে ভাই, গুপ্তধন কি হামেশা মিলে? মিঞাজান ভাবিতেছে, এই লাইন ছাড়িয়া এইবার চাষবাসেই নজর ফিরাইবে …

 

৬.
মন তখন পড়িয়া রহিত ভূতেদেরই আড্ডায়। কত সহজেই না তাহাদের সহিত মোলাকাত হইত! মানুষের ধারণা, বুঝি রাত বিরেতের অন্ধকার ছাড়া সেসব সম্ভব নয়। শুনিলেও হাসি পায়। একটু কোণা-কানচি পাইলেই হইল, দিনকে রাত বানাইতে আর কী লাগে! বাঁশঝাড়গুলি যে বিলকুল লোপাট হইয়া গিয়াছে, ফৌত হইয়া গিয়াছে দিপির দিপির করিয়া জ্বলা জোনাকির ঝাঁক, সে মোটেই ভালো ব্যাপার নয়। সেগুলি ভূতেদেরও আহ্লাদের জায়গা ছিল বই কি। তাই বলিয়া ভূতেরা তো আর ঘাপটি মারিয়া বসিয়া নাই। মন চাহিলে তিরিশ-চল্লিশ তলা ইমারতের লিফটেও অনায়াসে সিন্ধাইয়া যায়। আলমারির ভিতর, টেবিলের তলায়, কোথায় না কোথায়। কিন্তু মুশকিল তো ওই মনকে লইয়াই। কী যে হইয়াছে, মন আর নড়িতে চড়িতে চায় না। ভূতেরাও তাই বেমালুম উধাও …

 

৭.
যে-দিনটি আর কিছুতেই আসিতে চাহে না, একদিন আঁকশি দিয়া তাহাকে টানিয়া নামানো হইল। চপলমতি বালিকাবালকদের কাজ আর কী! মহল্লার বুড়াবুড়ি জোয়ান-মরদ সকলেই অবশ্য মজা দেখিতে ভিড় জমাইল। দিন চোখ পিটপিট করে। তাহারা হাসে। দিন কান চুলকায়। তাহারা হাসে। দিন মাথা ঝাঁকায়। তখন দেখা যায়, ঢেউখেলানো চুলের আড়াল হইতে উঁকি মারিতেছে একজোড়া বাঁকানো শিং। দেখিয়া, মানুষজন একটু ঘাবড়ায়। দিগ্‌গজেরা আঁক কষিতে বসেন : এই দুইটি কি তাহার আত্মরক্ষার অস্ত্র, না আক্রমণের! দিন তখন মাথা হইতে শিং-বসানো টুপি নামাইয়া, সেলাম ঠুকিয়া বলে – আপনারা যাহার কথা ভাবিতেছেন, আমি সে নই। সেই দিনটি আসিতে আজও দেরি আছে। তাহার আগে আমি একটু ভাঁড়ামি করিয়া গেলাম মাত্র …

 

৮.
নদীতীরবর্তী বৃক্ষমূলে পড়িয়া আছে শাপগ্রস্ত এক জড়ভরত। উড়িয়া যাইতে যাইতে পাখিটি তাহার শিরোদেশে খানিক পুরীষ ত্যাগ করিল। পাখির মর্মে কোনও রকম ঘৃণা বিদ্রূপ বা প্রতিশোধস্পৃহা ছিল না। নিছকই প্রাকৃতিক এই কাণ্ড। নিচের নদীতীর, বৃক্ষমূলে পড়িয়া-থাকা জড়ভরত, নিজের পুরীষত্যাগ – কোনও কিছুকেই আমলে না-লইয়া সে উড়িয়া গেল এক প্রান্ত হইতে আর এক প্রান্তে। সূর্য পাটে নামিবার আগে গগনপটে তখন অদ্ভুত সব রং। আর নদীর জলে তাহাদের আরও গভীর সব মায়া। কাহার না শিহরন জাগে! জড় তো মৃত নয়, মৃতবৎ। মাথার উপর উষ্ণ তরল মলের স্পর্শে তাহার ভিতরেও ঈষৎ ঢেউ খেলিয়া গেল। আকাশে তাকাইয়া উড্ডীন পাখিটির পানে একটি নমস্কার ঠুকিল সে। ইহার পিছনে কোনও ভক্তি নাই প্রার্থনা নাই দৃষ্টি আকর্ষণী প্রস্তাব নাই। সে সামান্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিল মাত্র।। কিন্তু কেন? এই প্রশ্ন বক্ষে ধারণ করিয়া নদীতীরে সন্ধ্যা নামিয়া আসিল। উত্তর খুঁজিবার নক্ষত্রময় রাত্রি এখন সম্মুখে …

 

৯.
স্নায়ু ও শিরা হইতে কিলবিল তারগুলি সব খুলিয়া লওয়া হইয়াছে। অবশ্য তাহারা ছিল অদৃশ্য। তবু তাহাদের ভিতর দিয়াই বহিয়া আসিত তড়িৎ প্রবাহ, ছায়াপথের নানান ইশারা। কিম্ভুত কিমাকার যন্ত্রটি বহুবছর আগে উৎক্ষিপ্ত পাথরখণ্ডের মতো এখন মরা জ্যোৎস্নার প্রান্তরে পড়িয়া আছে। ভাবিতেছে, এই চুপচাপ পড়িয়া থাকাও আসলে এক রকম খেলা! রাত পোহাইলে কৌতূহলী বালিকারা আসিয়া দনাদ্দন লাঠির বাড়ি দিবে উহার গায়ে। যেন কোনও ভূতের ঘুম ভাঙাইতে চায় তাহারা। বালকেরাও আসিয়া জুটিবে। পড়িয়া থাকা বস্তু দেখিলেই তাহাদের পায়ের পাতা সুড়সুড় করে। মনে মনে সকলেই হইয়া উঠিবে মেসি বা রোনাল্ডো। পাড়ার জেঠামশায় দেখিয়া হায় হায় করিয়া উঠিবে। পুষ্করিণী পাড়ের পাকুড় গাছটি ডালপালা দুলাইয়া বলিবে – ভয় নাই, উহা দুষ্কৃতীদের ফেলিয়া যাওয়া বোমা নয়। খেল, তোমরা খেল। যেন, মুহূর্তেই জয়-পরাজয়ের নিষ্পত্তি হইয়া যাইবে। যেন, খেলার ঘোষণাই এক রকম জয়। হর্ষে হট্টগোলে ভরিয়া উঠিবে প্রান্তর …

 

১০.
উল্লাসই হউক বা হাহাকার, একটি রক্তাক্ত আলোড়নই ছিল বেচারা ফুলটির ডানা। আঁটোসাঁটো বৃন্তের উপর বসিয়া সে বাজাইতে থাকিত তাহার উদ্দাম বীণা। আর সেই মাংসল সংগীতের ভিতর দিয়া দিগ্বিদিকে উড়িত। আকাশপারের লাল গ্রহটির সাথেও তাহার ফিসফাস। ধারালো দাঁতওয়ালা লাল স্ন্যাপার মাছের সাথেও উথালপাতাল। পুরুষ্টু টকটকে পাপড়িগুলিই যেন তাহার মন। যাহার শাঁশাঁ ছুটের পাল্লার কাছে আলোও হারিয়া ভূত। কিন্তু সময় ভারি চঞ্চল আর সময় বড় অজানা। একদিন সে টের পাইল তাহার বৃন্ত কেবলই স্ফীত হইতেছে। কমিতেছে পাপড়ির রক্তচ্ছটা। দেখিতে দেখিতে শিথিল হইয়া খসিয়া পড়িতে লাগিল তাহারা। আর টইটম্বুর বৃন্তটি ফাটিয়া বাতাসে উড়িতে লাগিল তুলা। নিজের ধ্বংসাবশেষ হইতে ক্লান্ত চোখ মেলিয়া সে দেখিতে পাইল কোমল ফুরফুরে সেই উড়াল। বীজ বুকের ভিতর ধরিয়া কোন মৃত্তিকার অভিমুখে ছড়াইয়া পড়িতেছে সেই সাদা রৌদ্রের গান। মীড় গমক সবই যাহার আলাদা। এখন কে তাহাকে শিখাইবে সেই জন্মান্তরের মূর্ছনা…

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

জন্ম ১৮ ফাল্গুন ১৩৫৮, ২ মার্চ ১৯৫২, কানপুর, উত্তর প্রদেশ, ভারত। শিক্ষা : উচ্চ মাধ্যমিক। পেশা : লেখালেখি। প্রকাশিত বই : কবিতা— কলম্বাসের জাহাজ [১৯৭৭, উলুখড়, হাওড়া] হননমেরু [১৯৮০, উলুখড়, হাওড়া] পৌত্তলিক [১৯৮৩, উলুখড়, হাওড়া] অমর সার্কাস [১৯৮৯, আপেক্ষিক, হাওড়া] চক্রব্যূহ [১৯৯১, আপেক্ষিক, হাওড়া] নদীকথা [১৯৯৭, যুক্তাক্ষর, হাওড়া] আমি আলো অন্ধকার [১৯৯৯, অফবিট, কলকাতা] সাঁঝের আটচালা [২০০২, কীর্তিনাশা, কলকাতা] আধপোড়া ইতিহাস [২০০৪, কীর্তিনাশা, পুরুলিয়া] অক্ষর শরীরে মহামাত্রা পাব বলে [২০০৬, কীর্তিনাশা, পুরুলিয়া] নির্বাচিত কবিতা [২০১০, সংবেদ, ঢাকা] আখেরি তামাশা [২০১৩, ছোঁয়া, কলকাতা] ঐতরেয় [২০১৩, রূপকথা, ক্যানিং] উজানি কবিতা [২০১৪, মনফকিরা, কলকাতা] ধ্যানী ও রঙ্গিলা [২০১৫, চৈতন্য, সিলেট] কলম্বাসের জাহাজ (২য় সং) [২০১৬, রাবণ, কলকাতা] বনপর্ব [২০১৬, সংবেদ, ঢাকা] কে বলে ঈশ্বর গুপ্ত? [ধানসিড়ি, কলকাতা, ২০১৬] বাক্যের সামান্য মায়া [ভাষালিপি, কলকাতা, ২০১৭] রাক্ষসের গান [চৈতন্য, সিলেট, ২০১৭] কবিতাসংগ্রহ [প্রথম খণ্ড, রাবণ, কলকাতা, ২০১৭] ইতস্তত কয়েক কদম [কাগজের ঠোঙা, কলকাতা, ২০১৮] বাজিকর আর চাঁদবেণে [পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি., ঢাকা, ২০১৮]  দীনলিপি [শুধু বিঘে দুই, আন্দুল, ২০১৯]   গদ্য— গরুররচনা (বৈ-বই বা ই-বুক) [২০১২, www.boierdokan.comখেয়া : এক রহস্যময় বিপরীতবিহারের ঝটিকালিপি [কুবোপাখি, কলকাতা, ২০১৭] বহুবচন, একবচন [বইতরণী, কলকাতা, ২০১৮] সময়পরিধি ছুঁয়ে [ঐহিক, কলকাতা, ২০১৮  অবাক আলোর লিপি [অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, নয়াদিল্লি, ২০১৯]    নাটক— হননমেরু [মঞ্চায়ন : ১৯৮৬] অনুবাদ— আষাঢ়ের এক দিন [মোহন রাকেশের হিন্দি নাটক, শূদ্রক নাট্যপত্র, ১৯৮৪] যৌথ সম্পাদনা— অভিমান  (১৯৭৪-৯০), যুক্তাক্ষর (১৯৯২-৯৬), কীর্তিনাশা (২০০২-০৫)  ই-মেইল : gc16332@gmail.com

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।