বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারি ২২

ঘাম ও সাদামেঘের ঘ্রাণ

0

এত সকালেই প্রখর রোদ্রের তেজ। গা পুড়ে যায়। আসমা দাঁড়িয়ে আছে, একটা খোলা জায়গায়, যেখানে নিয়মিত রাজমিস্ত্রী শ্রমিকেরা দাঁড়ায় এবং কর্মবন্টনের পর, যার যার কর্মস্থলে পোছানোর পূর্বে নিকোটিনের তীব্র গন্ধ আর ঝাজ মিশিয়ে নেয়। কেউ কেউ রতন জর্দা আর তাম্বুল মিশিয়ে বিড়ির নিকোটিনকে আরও ভিন্ন মাত্রায় আনে।

কিন্তু আজ সকালের চিত্র ভিন্ন, হেড রাজমিস্ত্রীর তিনটা সাইট চলতেছে, কিন্তু মালিকপক্ষ ঠিকঠাক মজুরি দিতেছে না, আবার জোরাজোরি করলে বলে, ‘কাম করনের দরকার নাই’।

এই ঘোর করোনাকালে, রাজমিস্ত্রীরা কি কাজ করবে! তাই যত কমই দিক, তবু কাজ চালিয়ে যেতেই হবে।

হেড রাজমিস্ত্রী ইয়াছিন আলী, এমাথা থেকে ওমাথা পর্যন্ত যাচ্ছে আর আসছে। তার উদ্বিগ্নতার রেশ অন্যদের মাঝে ছড়িয়ে যায়। তার উপর এই রাজমিস্ত্রীর দলটার খুব কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়ে রয়েছে আসমার উদভ্রান্ত চোখ আর অনিশ্চিত গন্তব্য।

মিস্ত্রিদের সাইটে পাঠানো আর মহিলাটির ইতিউতি তাকানো, দুটোই এখন ইয়াছিন মিয়ার টেনশানের কারণ। এর মধ্যে শুনে, ইছব আলীর জোগালী মোয়াজ্জেম, তরমুজ বিক্রি করতে নাকি ঢাকায় চলে গেছে।

ইয়াছিন আলীর মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে যাচ্ছে। ‘হারামজাদারা, পায়ের কাছে পইড়া থাহস, এহন কাম পাইয়া তরমুজ বেচতে গেছস, আমারে না কইয়া’ স্বগতোক্তির মতো বলে, আর ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন করে তার নিজ আর পরিপার্শ্বকে।

‘এহন, শিকারীকান্দা সাইটে ইছব আলীর সাথে কারে জোগালি দেই!’

এমন সময় মহিলাটি ইয়াছিন আলীর নিকটবর্তী হলে, ইয়াছিন আলী টের পান, সে পরিপূর্ণ মহিলা নয়, সদ্য কিশোরী বয়স পেরিয়ে, নারীর দিকে যাত্রা। ইয়াছিন আলী মেয়েটির করুণ মুখ আর শারীরিক ভংগুর অবস্থা অবলোকন করে।

এমন সময় মহিলাটি ইয়াছিন আলীর নিকটবর্তী হলে, ইয়াছিন আলী টের পান, সে পরিপূর্ণ মহিলা নয়, সদ্য কিশোরী বয়স পেরিয়ে, নারীর দিকে যাত্রা। ইয়াছিন আলী মেয়েটির করুণ মুখ আর শারীরিক ভংগুর অবস্থা অবলোকন করে। কিন্তু পূর্ণ মনোযোগ তার ইছবের জোগালীহীনতায়। এই সময়ে জোগালী হিসেবে যারে তারে তো আনলেই হবে না।

অবশেষে মেয়েটি, ইয়াছিন আলীর চোখের দিকে পুরোপুরি দৃষ্টি না দিয়েই বলে, ‘আমারে কামে নিবেন?’

এইরকম হঠাৎ বিশাল পুরুষের দলের মধ্যে, একটা মহিলা কথা বলে উঠতে পারে, তা যেন ইয়াছিন আলীর চিন্তার বুদবুদে ফেনা তুলে দেয়।

ইয়াছিন বলে, ‘তুমি, তুমি… মাইয়্যা মানুষ, আবার গতরও তেমন পিডানো না, তুমি পুরুষের জুগালীর কাম করতে পারতা না, হুদাহুদি আমার সময় নষ্ট কইরো না, এমনেই মাথামুথার ঠিক নাই, এক হারামজাদায় নাকি তরমুজ বেচতেছে ঢাকায়, হুনছে, তরমুজ কেজি দরে বিক্রি অইতাছে।’

ইয়াছিন আলীর কথার মধ্যে একটা কাজ পাবার গন্ধ পায়, আসমা একটু সাহস সঞ্চারিত করে বলে, ‘আমি ইছব আলী ভাইয়ের সাথে জুগালীর কামডা করি?’

ইয়াছিন বিরক্তি আর উষ্মা নিয়ে বলে ওঠে ‘কী!’

‘তুমি কিভাগে জুগালীর কাম করবা? জীবনে কোনদিন তাগার, কোদাল, বালু, সিমেন্টের ঘর করছ? তোমার বিয়া হইছে নি?
আর তুমি দুনিয়ার কাম বাদ দিয়া এইকামে আইলা, কারণডা কি?’

অনেকগুলো প্রশ্ন শুনে, আসমা কোন প্রশ্নের, কোন উত্তর দিব, তা ভেবে পায় না। শুধু তার দুধের বাচ্চার মুখের করুণ চিত্রটি ফুটে ওঠে। এদিক ওদিক তাকায় আর ভাবে, কেউ হয়তো তার দিকে মমত্বভরা হৃদয় নিয়ে দাঁড়াবে। কেউ তার দয়ার কথাটা ইয়াছিন আলিরে বোঝাইয়া বলবে।

অনেকগুলো প্রশ্ন শুনে, আসমা কোন প্রশ্নের, কোন উত্তর দিব, তা ভেবে পায় না। শুধু তার দুধের বাচ্চার মুখের করুণ চিত্রটি ফুটে ওঠে। এদিক ওদিক তাকায় আর ভাবে, কেউ হয়তো তার দিকে মমত্বভরা হৃদয় নিয়ে দাঁড়াবে। কেউ তার দয়ার কথাটা ইয়াছিন আলিরে বুঝাইয়া বলবে। কিন্তু নিষ্ঠুর ক্ষুধা আর করোনার করাল থাবা যে তার পরিবারে, ভাংগাবেড়ার ফাঁক গলে আসা সামান্য জোসনার আলোর মতো সুখ, ওটাকেও নিভিয়ে দিয়েছে। এই সারা পৃথিবীর সমস্ত অন্ধকার যেন তার দুচোখে নেমে এসেছে।

তবুও ইয়াছিন আলীকে না বোঝাতে পারলে, আজ ভিক্ষার মতো, সারাজীবনের অপছন্দের কাজ তাকে করতে হবে, সেটাও করোনার জন্য ঝুকিপূর্ণ তার কাছে।

একটা বড়ো দম নিয়ে আসমা বলতে শুরু করলে, এতগুলো পুরুষের বিড়ির টানে অনেকটা ভাটা পড়ে যায়। তবু সে দমে যায় না।

‘ভাই, আমার দুধের শিশু বাসায় রাইখ্যা আইছি, পাশে হুইয়া আছে আমার অসুইখ্যা জামাই, হেও রাজজুগালির কাজ করতো, দুইতালা থেইক্যা মাল তুলবার যাইয়া নিচে পইড়্যা ঠ্যাং ভাংছে। এরে তারে ধইরা, প্লাস্টার করাইয়া আনছি। টাউনহল থাইক্যা বারবার মনে হইছে, ভিক্ষা করি, আমার মন সায় দেয় নাই, বাসায় কামেও কোনো নিশ্চয়তা নাই, তাই সোজা হুনছি, এইখানে বিল্ডিংয়ের কাম অইতাছে, আমার এইটুকু তো জানা আছে, আমি সাহায্য করতে পারমু, আমারে আমনে কামে নেন, আমারে কইয়া দিলে, আমি ঠিকই পারমু।’

একটানে কথা বলায় আসমার মাথা ঝিমঝিম করতে থাকে, সে রাজমিস্ত্রীদের ধোঁয়ার কুণ্ডুলির মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা নারু মিয়ার মাঝখানের সামান্য ফাঁকটায় বসে পড়ে।

যাই হোক, ইয়াছিন আলীর মনের মধ্যে মোয়াজ্জেমের উপর যে রাগ, তরমুজের পানির মতো লাল টকটক করতেছিল, তা আসমার কথায় কিছুটা ভরসা পেল।

ইয়াছিন আলী সকল রাজমিস্ত্রী আর জুগালীদের তাগার, কোদাল, কনি নিয়ে তিনটা সাইটে যাবার নির্দেশনা দেন। অবশেষে অবজ্ঞা আর উপায়হীনতায় বেতনের কোনো ফয়সালা ছাড়াই আসমারে শিকারীকান্দার সাইটের লোকদের সাইটে যেতে বলে।

গনগনে রৌদ্র যেন, আরও আরও তেজ নিয়া মিস্ত্রিদের মাথার উপর কিরণ দিতে থাকে। এগিয়ে যায় পুরুষ মিস্ত্রি, সাথে জুগালীদের সাথে যায় আসমাও।

সাইটে পৌঁছে যে যার মতো জুগালীদের নির্দেশ দেয়, বালু, সিমেন্ট নামানোর।

ইছব আলীর দ্বিগুন যন্ত্রণা, রাগে গনগন করেও সিমেন্ট আর বালু এনে ঠাস করে আসমার সামনে ফেলে আর বলে ‘হুন, তোমারে নিয়া যে কত্তানি কাম আজ্ঞামু, আমি জানি না, ওইহান থেকে পানি আইন্যা, দুই তাগার বালু, এক তাগার সিমেন্ট, কোদাল লইয়া মিশাও। আইছ তো লাফাইয়া, মনে করছ, বালু আর সিমেন্ট মিশানো, এ আর এমুন কি বিষয়! কিন্তু না গো, পড়ালেহার অংকের মতো এও জটিল বিষয়, কম বেশি হইলেই প্লাস্টার অইতোনা, আর আমি খামু ইয়াছিন আলীর ঠাডানি।’

মাচার উপরে ওঠার আগে, ইছব আলী বিড়ির প্যাকেকটা বের করে, একটা বিড়ি ধরাইয়া টান দিয়া বিরক্তিতে মুখচোখ বিকৃত করে ফেলে। আর আসমাকে বলে, ‘হুন, পরথমেই বালু আর সিমেন্ট মিশায়া লও, কোদাল দিয়া ভাইংগা ভাইংগা মিশাবা। তারপরে, এগুলারে গোল কইর্যান, মাঝখানে পানি দিবা দুই বালতি, তারপর মিশাবা খুব তাড়াতাড়ি। হেরপর তাগারে তুইল্যা আমারে দিবা।’

প্রখর রৌদ্রে কনির নিপুন বুননে, দেয়ালগুলি যেন ফ্যাসিয়াল ফাউন্ডেশন করে দিচ্ছে ইছব আলী। কত মমতা নিয়ে, ভালোবাসার স্পর্শের মতো করে সেটা, সেই জানে। প্রচণ্ড দাবদাহে পুড়ে যাচ্ছে, প্রান্তর, মাঠ ঘাট, এমনকি আত্মাও।

তাগারে সিমেন্ট বালুর মিশ্রণ তুলে দিচ্ছে আসমা। মনমতো হচ্ছে না আর রোদ্রের তেজের মতো তিরিক্ষি মেজাজ, আরও তিরিক্ষি হয়ে ওঠে। বারবার আসমার দিকে তাকাচ্ছে আর দেখছে আসমা যেন কি চিন্তা করছে!

মাত্র ১৭ দিন হইছে বাচ্চাটা, নিশ্চয়ই খুব তারস্বরে বুকের দুধ খাওয়ার জন্য চিৎকার করছে, আর করোনার কালের দীর্ঘ বাতাসে তার বাবার অসহায়ত্ব দেখছে বারবার, তাই খেয়ালই নাই। মাচার উপর তাগারে সিমেন্ট তুলে দেওয়াটা তার অসুস্থ শরীর করছে বটে। কিন্তু বাচ্চাটির করুণ চিৎকার যেন মরমে লেগেছে জোর। আর দুধের ব্যাথায় টনটন করছে তার বুক, ভারী হয়ে আসছে পৃথিবীর সমস্ত সময়।

মাত্র ১৭ দিন হইছে বাচ্চাটা, নিশ্চয়ই খুব তারস্বরে বুকের দুধ খাওয়ার জন্য চিৎকার করছে, আর করোনার কালের দীর্ঘ বাতাসে তার বাবার অসহায়ত্ব দেখছে বারবার, তাই খেয়ালই নাই। মাচার উপর তাগারে সিমেন্ট তুলে দেওয়াটা তার অসুস্থ শরীর করছে বটে। কিন্তু বাচ্চাটির করুণ চিৎকার যেন মরমে লেগেছে জোর। আর দুধের ব্যাথায় টনটন করছে তার বুক, ভারী হয়ে আসছে পৃথিবীর সমস্ত সময়। নিজের শরীরের ঘাম আর ইছব আলীর ফোটায় ফোটায় ঘাম, আসমার শাড়ির আঁচলে পড়ছে। এতে প্রায় সারা শরীরেই ঘামে ভিজে চপচপে।

হঠাৎ একটা তাগাগের সমস্ত সিমেন্ট তাগার সহ, ছিটকে পড়ে আসমার মাথার উপরে। মুহূর্তে হতচকিত হয়ে পরে ইছব আলী, ছিটিকে পড়ে আসমা আর সিমেন্টবালু গুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে যায় এদিক সেদিক। মাচা থেকে দ্রুত নেমে এসে ইছব আলী, আসমারে তুলতে গিয়ে চোখ আটকে যায়, আসমার বুকে। সেখানে সাদাদুধ গড়িয়ে পড়ছে যেন মেঘের মতো। আর আসমা ব্যথা নয়, তাকিয়ে আছে ঐ শিশুটির মুখের দিকে, যে এই দুধটুকুর জন্যই কাঁদছে হয়তো।

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

কথাসাহিত্যিক, অনুবাদক। পেশায় শিক্ষক এই লেখক জন্মগ্রহন করেন ২৮ জুলাই ১৯৭৮ সালে, ময়মনসিংহে। শূন্য দশকের গোড়ার দিকে তার গল্প, প্রবন্ধ, অনুবাদ প্রকাশ হয়েছে, বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিনে। তার প্রথম প্রকাশিত গল্পগ্রন্থর নাম ‘ফাঁসির দূরত্বে থাকা মানুষ’ প্রকাশিত হয় পরম্পরা থেকে ২০২০ সালের একুশের বইমেলায়। এরপর তিনি অনুবাদ করেন ফ্রানৎস ফ্যানোর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ব্ল্যাক স্কিন, হোয়াইট মাস্ক’। যার বাংলায় নাম দিয়েছেন ‘কালো চামড়া, সাদা মুখোশ’। এছাড়া তিনি অনুবাদ করেন ন্যাডিন গার্ডিমার, মাও সেতুং, অক্টাভিও পাজ, ওরহান পামুক, মার্কেজ, জি এম কোয়েটজির উপন্যস সহ, অসংখ্য লেখকের কবিতা।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।