বৃহস্পতিবার, মে ৩০

ঘ্রাণকণ্টক ও কতিপয় প্রেমের কবিতা : নির্ঝর নৈঃশব্দ্য

0

Utsob-Songkha_Motif

নামকীর্তন


ছবি আঁকলে আমি মূলত তোমাকেই আঁকি। তোমার মুখ আঁকি না বলেই তুমি টের পাও না। আমার ছবির কালো, হলুদ বা নীল রং মূলত তুমি। আমার ছবির গাছবন, বনপাহাড়, সরুনদী, নদীর তলায় নিষ্পলক মাছ ও পাথর, সাপ ও সংহার, বাড়ির ভেতর ঘর, অতনু ঋকবেদ, ফেরিঅলার ঝাপি, মাঠ প্রান্তর, জিরাফের দিঘল উড়াল সবই মূলত তোমার ভঙ্গি। আমি যে ফুলের ঘ্রাণ আঁকি, সেই পুষ্পকুসুম মূলত তোমারই শরীরজাত।

এমন করেই আমি কবিতা লিখলে মূলত তোমাকেই লিখি জন্মাবধি। কেবল তোমার নাম করি না বলে আমার কবিতা হয়ে ওঠে না তোমার নাম সংকীর্তন।


একটি গোপন প্রমাদ


তোমার ছায়ার ভেতর থাকি। তুমি দিলে পথের নদী। নদীপাড়ের চায়ের দোকান। ফুলকপির খেত। হাতের বাঁধন দিলে। পথ-ঘাট, রিকশা, বৃন্দাবনী, টমেটোর রং, সূর্যমুখী, নুন, নৌকা সব দিলে। তবু উইপিং উইলোর ধারে কাঁদে পথের দীর্ঘ পা, ঝরাপাতায় ঢাকা। পথের পায়ে বসি কোনোদিন তোমার ডান পাশে, একা। ঢেউ ঢেউ ঘুম এসে ভিজিয়ে দেয় আরক্ত কথার কবর।

অনেক পথের শেষে পুরোনো এক পথ পেয়ে গেলে দাঁড়াও সমুখে। আমার মাথায় চুলের কাক আর রক্তে কাকস্য পরিবেদন। তোমার হাতে ক্যামেরা, আর পেছনে সূর্য। সূর্য তোমাকে দেখে বিকেলের রং মাখিয়ে। আমি সূর্যকে অস্বীকার করে তোমার দিকে তাকিয়ে রই। তুমি ফটো তোলো একটা। তারপর কাছে এসে বলো, ‘দেখো এই ছবিতে রয়েছি আমিও’। দেখি সূর্য আড়াল করে তোমার দিঘল ছায়া এসে আশ্লেষে আছড়ে পড়েছে আমার উপর।

একদিন আমি তোমার ছায়ার ভেতর হারিয়ে গিয়েছি বলে এখনো তোমার দেহে লেগে থাকে আমার শরীরের দাগ। আর থাকে একটি গোপন প্রমাদ।


ঘ্রাণকণ্টক


ঋক তার রাত্রির ডান পাশে বসে আছে রাত্রির ঘ্রাণে বিবশ হয়ে। রাত্রির হাতের মুঠোয় তার একটি দরিদ্র হাত। রাত্রি নামছে বনপাহাড়ের পাড়ে একটা তপ্ত-পুকুরে। রাত্রির কণ্ঠে পারভিন শাকিরের লেখা হাহাকার।

রাত্রি: ওহ তো খুশবু হ্যায় হাওয়ামেঁ বিকার যায়েগা…

ঋক: রাত্রি! আমি তো তোমার ঘ্রাণ ভুলতে পারি না, এক মুহূর্তের জন্যেও না। তুমি কাছে থাকলেও পারি না, দূরে থাকলেও। যখন তুমি এক হাজার এক রাত্রি আমাকে বিরহ দিয়েছিলে তখনো একমুহূর্ত ভুলতে পারিনি।

রাত্রি: ঋক! তুমি অদ্ভুত সুন্দর করে আমার ঘ্রাণ নিতে পার। আর কেউ পারে না।

ঋক: সেই রাতে যখন তোমার ঘ্রাণ শ্বাসের মধ্যে টেনে নিতে নিতে শিরার ভেতর বানিয়ে দিচ্ছিলাম রূপকথার ললিত মীন, তার আগেই অকস্মাৎ সেই ঘ্রাণ আমার মাথার ভেতর ঢুকে গেল, আর স্নায়ুর ঝাড়ে ছড়িয়ে পড়ল অগণিত কাঁটা হয়ে। কী ভয়ানক যন্ত্রণা, বলো!

রাত্রি: হয়। পৃথিবীর শেষরাত্রি ছিল, মনে আছে।

ঋক তার রাত্রির ডানপাশে বসে আছে রাত্রির ঘ্রাণে বিবশ হয়ে। ঋক দেখছে প্রাচীন এক পুকুরের পেটে রাত্রি ডুবে যাচ্ছে। কিন্তু তার ঘ্রাণে বাতাস ভারি হচ্ছে, তার ঘ্রাণ বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে না।


প্রেম


যদি ঢেউ আসে, যদি কেউ আসে! ঢেউয়ের সঙ্গে কেউয়ের অন্ত্যমিলে তাকে লিখি এক পঙ্‌ক্তিতে। সে নদীর পাড়ে শুয়ে নদীমধ্যে মাছের দিকে তাকিয়ে থাকে। সে পেছনে ডানাভাঙা চাঁদ জিইয়ে রেখে মাছের চোখে তাকিয়ে কাঁপে একা রাত্রির সুতীব্র রতি ও আরতি যেন বা কুসুমফুলের দেশ।

আমার মুঠোতে সর্বনাম। আমার মুঠোতে বাঁধা বাড়িঘর আর রাস্তার বিশদ উড়াল। যদি ঢেউ আসে, যদি সেও আসে! সে আর ঢেউ অভিন্ন জেনে তাকে লিখি সংগোপনে।

শৈশব ভুলে যাই, মাতৃস্তন ভুলে পড়ে থাকি কদাকার সন্ধ্যার ক্ষতে, বহুদিন বহুদিন। তারপর কোনোদিন আমার ডাকনাম চুরি করে প্রতি রাতে পালিয়ে যায় যে-ময়ূর, সেই পাখির পাখা থেকে নাচ চুরি করে আমি বাসনার চারধারে তুলি নৃত্যপ্রাচীর, বন্দি করি। যদি ঢেউ আসে, ঢেউ হয়ে সেও আসে গোপনে! তাকে লিখে ভেঙে ফেলি শ্বাসরুদ্ধ চুম্বনে।


দেখা হয়নি


একটা হাওয়াই জাহাজ বহুদূর উড়ে গিয়ে একটা দুপুরের রেলক্রসিং বা একটা দিঘল খেচর ব্রিজ, একটা পীতবর্ণ লোহার পুল রোদে পুড়ে যাচ্ছিল, দেখা হয়নি।

নদীর ওপারে গিয়েছিলাম। কারো সঙ্গে দেখা হয়নি, না নদী, না নৌকা বা রিকশার মায়া, না স্রোতের করাত, বাঁধাকপির খেত। দুপুরের পেট থেকে বিকেলের পিঠে ফুটে উঠছিল ইয়েলো-অকার পুডিং। নদীর পাড়ে একরত্তি চায়ের দোকান বাতাসের ভাঁজে ধোঁয়া ওড়ায়। দুপুরের পুডিং, চায়ের দোকান কারো সঙ্গে দেখা হয়নি। নদী পার হতে হতে ফুরিয়ে যাচ্ছে অর্ধেক জীবন, টের পাইনি। কেননা নদীর সঙ্গে দেখা হয়নি।

পাতাবর্ণ উত্তরীয়! অজানিত ছাতিমের ঘ্রাণে উড়েছিল নিমগ্ন সন্ধ্যায়। সন্ধ্যা এমন বিক্ষত হতে পারে কেউ কি জেনেছিল? সন্ধ্যা ও ঘ্রাণের সঙ্গে আমার কখনো দেখা হয়নি।

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

  • মূলত লেখেন ও আঁকেন। জন্ম : ২৪ আগস্ট ১৯৮১, চকরিয়া, কক্সবাজার, বাঙলাদেশ। পড়াশোনা : চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে চিত্রকলায় স্নাতকোত্তর। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ১৮টি।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।