বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারি ২২

চিন্ ও অন্যান্য কবিতা : মোস্তফা হামেদী

0

চিন্


পরিখার ভিতর আমি একা বাড়ি। ঘিরে আছে লতা-ঝোপ।

গুঁজে দিয়েছি ছিদ্রসকল। শুধু ফুঁকছি নিজেকেই।

দম বাড়িয়ে নিই। যেভাবে চুলার আগুনকে জ্যাঁতা রাখা হয়।

লড়ছি একা ছোট ফুলের সাথে। তার ঘ্রাণ এখানে ব্যাকুল করে তুলছে।

সামান্য নিতে পারি। আর কিছু ছড়িয়ে দিই।

আমাদের এমন হলো! গুটিয়ে গেল ডালপালা।

যেন বহুদূরে কে ঘণ্টা পেটায়। আর বুকে ধুপধুপ করে বাজে।

একটু একটু করে ছিটাই। গাছের গোড়ায়। রহমের আবেশ।

আমার ভয় ভয় করে। পরিখার ভিতর আমি একা বাড়ি।

কাঁথার মাঝে ঘুমের মুহূর্তের মতো গুটিশুটি। এরই ভিতর—

নিজের উজ্জ্বলতাটুকু আরও ঘষেমেজে তুলি। ফেলে গেলে যেন চিনে নিতে পারো।


ধুতুরা ফুল


আমার মন শান্ত হয় সাধারণ কোনো দৃশ্যে,
সেখানে একটা ঝাড় দেয়া উঠানও হতে পারে
লোকেরা দূরে দূরে থাকে সেসব বয়ানে;

মানুষ মানে প্রচুর ক্যাওয়াজ মাঝে মাঝে মনে হয় ,
সেকারণে আমি একটা কলাপাতা দুলতে থাকা দেখি তার দিকে হা করে থাকা গরুটাসহ।

মোরগ কি ফুলের সাথে কাইজা করে আমগাছতলের ভিটায়?
সেই ভাষা বুঝি না বলে ভালো লাগে সেসব ইঙ্গিতপূর্ণ ঘনিষ্ঠতা।

খড়ির বেড়ার ফাঁক দিয়ে আলো আসার মতো
লোকের মধ্যে উঁকি দেই কখনো কখনো—

কস্তুর গন্ধের আশায় নাড়িভুঁড়িতে পাক খাওয়া ঘৃণাও পাই,
ঘৃণা ও প্রেমের এমন সহবাস আর কোথাও কি আছে?

বড় কোনো ভূ-দৃশ্যের ভিতর মানুষ একটা ধুতুরা ফুল,

দেখতে দেখতে শিখে গেছি ফুল মানে কেবল গন্ধ নয়।


টুকি


বহুদিন পর এক মেঘ মেঘ বিকালে তিনি নত হয়ে থামলেন। মুখভর্তি দাঁড়ি। বয়সে পেয়ে নরম আতার মতো কোমল। তাকালেন লজ্জা ও সংকোচে।

কে যেন বলে দিয়েছিল পরিচয়। নতুন রূপে।

ছোট বয়সে প্রতি বুধবারে ম্যাজিক নিয়ে হাজির হতেন তিনি। বিশাল এক বাউনির ওপর ডালায় সাজানো বাহারি জিনিস আমাদের কাছে মনে হতো রূপকথার গঞ্জ হতে ফিরে আসা সদাগরের সওদা যেন। সামান্যই পয়সা থাকতো হাতে। ধান মেপে মেপে কিনে নিতাম চকলেট, শনপাঁপড়ি।

নতুন জিহ্বায় সেসব স্বাদ আমাদের রসনাকে ভরে তুলতো গাছে বাদলা এলে পাতায় ভরে যায় যেমন।

হাটের একটা সংস্করণ নিয়ে তিনি বসতেন ঘর লাগোয়া উঠানে। মজমা মিলাতেন আর স্বতন্ত্র এক সুরে ডেকে উঠতেন—বুট, বাদাম, চানাচুরর…। বিকালের আড়ষ্টতাকে চূর্ণ করে দিয়ে আমরা ঝাঁক বাঁধতাম তার বাউনি ঘিরে। নায়কের মতো তিনি মধ্যমণি হয়ে দেখিয়ে যেতেন তার বাহারি সওদা। সারা সপ্তাহ ধরে জমানো সিকা আর কুড়ানো ধান তুলে দিয়ে আমরা হতাম মনগঞ্জের সদাগর।

বাকিতেও বিকোতেন। যাদের ধানগোলার জোর বেশি কিংবা পয়সার— তাদের। পাত্তা না পেয়ে একদিন তার ডালা দিলাম ফেলে। তেড়ে এসে জবাব দিলে ফোঁস করে উঠি আমি।

সেইসব ফণা তোলা দিন পেরিয়ে একদিন আচমকা রাস্তায় দেখা। মাথায় বাউনি ব্যবসার দিন উঠে গেছে। রিক্সায় ভর করে কিছুকাল জীবীকা করে এখন বসে। মূলত শরীরই গেছে বসে দেবে যাওয়া জমির মতো।

যেন আমি সেই গভীর গর্তের পাশে এক উঁচু গাছ কোনো। হত দৃষ্টি নিয়ে তাকালেন। যুগের ফেরে সেই নায়ক আজ যেন অবসিত।

কিছুটা মায়া, খানিক হাহাকার খেলে গেল মনে। তারপর আমি হাঁটা দিলাম আমার পথে।


মনেশ্বর রোড


দুপুরবেলা— মেসের মন্দ দিন। ঘুটঘুটে আলো। শুকনা আলুভাজি আর নিম ঝাল ডাল। বাজে মনির খান—দরদী গান। মনখারাপি সুর আর হলুদে ভরা ডাল, ফ্যাকাসে মুখ। ছিটকে যাই—সাইকেলের রিংয়ে মানাতে না পারা বল। কুড়াই বালককাল লতাপাতাছায়ায়। খুঁজি দুপুরকার মায়ায় হারানো নিজেরে। কাদা থিকথিকে আহা! আমার বাড়ি: তার ছ্যাতলা পড়া উঠান—নিপুণ গরিমা। দূরে সরে যায়।

গুণটানা নাও যেন জীবন, টেনে নিয়ে আসে পারে। এখানে আমি তল্লাবাগ রোডের মতো একা। এখানে আমি ট্যানারি মোড়, চামড়া পঁচা গন্ধে ভুরভুর।—গরম ভাঁপের দ্বিতল বাড়ি—সরু সিঁড়ি আমার নাম জড়িয়ে থাকে। এঁদো গলির ছোট্ট কোঠায় ঝুলছে শাদা জামা, বহু বছর ধরে, আমার স্মরণপাড়ের ঘরে।

সে অপরিচয়ের শহর। সংকোচ ঘিরে থাকা। আমার দুনিয়াজুড়ে আঁকা নীরব অহংকার। বিপুল বাক্যবিভায় আমি যৎসামান্য আকার।

কর্পোরেশনের বাঁশি, আমার ঘুমপাড়ানি মাসি। ছোট্ট কাঁচাবাজার, দাঁড়িয়ে মানুষ দেখি। গরুর গোশত দেখে মনে পড়ে মাংস খাওয়া দিন, মনে পড়ে ঝোলমাখা গোল আলু। আমার জিভ জড়িয়ে আসে। আমার ভীষণ খিদে পেয়েছে। তিতা করলা ভাজি থালায় পড়ে থাকে।

সে তক্তপোষ, গা জড়িয়ে থাকা সস্তা বিছনাপাটি, এখনও যেন আছে , আহা!মন পোড়ায়।

দুনিয়ার মনেশ্বর রোডের মাথায় আজও কে ঘুমায়, ক্ষীণ শরীরকাঠি?


অন্তর্যানে


একদিন করিমগঞ্জ দিয়ে ঢুকে পড়ি গৌহাটির দিকে। ধরি, ঊনিশশ আট—শরতের রোদেধোয়া দিন। আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের পথ, কাঁচা কাঁচা লতার গন্ধ ধরে পুবের দুয়ারে৷ সকালের আলো যেসব পাহাড়ে বাড়ি খেয়ে আমাদের উঠানে নামে, গায়ে গায়ে ঠেস দিয়ে যেন তারা এখানে ঝিমায়। এখানে দুপুর তখন, পল্লবের ফাঁকে ফাঁকে ছায়াশান্ত হাওয়া। দেখি, দুই একটা পাখির একান্ত ওড়া। যেসব পশুদের নাম শুনে শুনে ঘুমে চমকে উঠি, পর্বতের ভাঁজ ধরে বহুদূরে সরে গেছে। তৃণে ভরা, আর কিছুটা জলমগ্ন, সে চারণভূমি।

কামরূপের রূপ দেখি। ঢিপঢিপ বুকে । জগতের সমস্ত তান্ত্রিকেরা ঠাঁই গাড়ে যে অপূর্ব পূর্বদেশে, তা নাকি এই! ত্রিপুরা পাহাড়শ্রেণি বেয়ে তারা নিম্নভূমির দিকে হেঁটে আসে, জোছনারাতে। পিঠে পুটলি বেঁধে ঘোরে নদীবঙ্গের বাজারে বাজারে। জটাধারী মুখাবয়ব নিয়ে ঢুকে পড়ে আমাদের ঘুমের ভিতর। তাদের কাছে বসি। বাগানের কাঁচা পাতার চা’য় — তন্দ্রা টুটায়। বোড়ো ভাইয়ের ঘাড়ে হাত রেখে গেয়ে উঠি ভাটিয়ালি গানের কলি। চকবাজারের মুরলিতে বেঁধে ফেলি প্রেমে। বলি, আমাদের দেখা হবে মিথের ঢাকায়। ব্রহ্মপুত্রজাত আমরা গেঁথে থাকবো কিনারে কিনারে। আসামবাড়ির উঠানে উঠানে রুয়ে দিই সুপারির চারা। পাহাড়ি পানের খিলি ভরে ওঠে রসে। মজে যাই গল্পগাথায়—আদিবাসী গানে।

কাছে কোথাও ডিব্রুগড়, এক ভাবীকালের কবি শোভনা নামের ভিতর পোরে চিরায়ত হাহাস্বর। সেগুনের জৌলুশভরা ঘ্রাণ আর মহুল ফুলের মায়া নিয়ে চলে চিররহস্যের দিকে। দাঁড়িপড়া এক চিত্র ফেঁড়ে এফোঁড়ওফোঁড় হয় হৃদয়। ছুটে চলে ছুটে চলে অন্তর্ঘাতে—বেদনায়। জমে উঠার আগেই ভেঙে যাওয়া সংসারের মতো দুয়ারের ঐ পাশে ফোটা ফুলের ঘ্রাণ টেনে আনে অন্তর্যানে, ঘরের খুব কাছে পুবের দুনিয়ায়।

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

জন্ম  ২৭ আগস্ট, ১৯৮৫ খ্রি. চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে নোয়াখালীর সরকারি মুজিব কলেজে বাংলা বিভাগেই প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন পার করছেন। প্রকাশিত বইসমূহ: মেঘ ভবঘুরে খরগোশ [কবিতা, কা বুকস, ঢাকা, ২০১৫], তামার তোরঙ্গ [কবিতা, জেব্রাক্রসিং প্রকাশন, ঢাকা, ২০১৮], জড়োয়া [কবিতা, তবুও প্রয়াস, কলকাতা, ভারত, ২০১৯], শেমিজের ফুলগুলি [কবিতা, প্রিন্ট পোয়েট্রি, ঢাকা, ২০২০]

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।