বৃহস্পতিবার, মে ৩০

চুরি নামক সমাজসেবা : চন্দন ভট্টাচার্য

0

০১.
কাঁসার গামলাটা কোত্থেকে গেঁড়িয়েছিস? গর্জন করে উঠলেন দারোগা নিমাই পাঁজা।

—গামলা না স্যার, জামবাটি। ওটা সাত্তুকি মণ্ডলের। শেষরাতে ওদের বাড়িতে ঢুকেই দেখলাম উঠোনের সাইডে পড়ে আছে।
—গুল মারার জায়গা পাওনি! রাত্তিরবেলা সাত্যকি উঠোনের সাইডে গামলা রেখে দিয়েছে তুমি এসে হাতাবে বলে?
—তাহলে সাইডের পাশে হবে, স্যার। আজকাল অন্ধকারে ভালো ঠাওর হয় না।

—গামলা না স্যার, জামবাটি। ওটা সাত্তুকি মণ্ডলের। শেষরাতে ওদের বাড়িতে ঢুকেই দেখলাম উঠোনের সাইডে পড়ে আছে।
—গুল মারার জায়গা পাওনি! রাত্তিরবেলা সাত্যকি উঠোনের সাইডে গামলা রেখে দিয়েছে তুমি এসে হাতাবে বলে?
—তাহলে সাইডের পাশে হবে, স্যার। আজকাল অন্ধকারে ভালো ঠাওর হয় না।

পাঁজা দারোগা হতবাক। ‘সাইডের পাশে’ আবার কী বস্তু রে বাবা! মাথায় টুপি নেই বলে চকচকে টাক আলো ছড়াচ্ছে। তার পেছনবাগে পালংশাকের মতো এক আঁটি চুলে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে তিনি শকটা সামলালেন।

—এমনভাবে বলছিস, যেন সরকার তোকে চুরি করার জন্যে মাইনে দেয়, যেমন আমাকে দারোগাগিরির জন্যে!

সবেধন বুঝল, এরকম কথাবার্তা চলতে থাকলে দারোগাবাবুকে অনেকদিন পর্যন্ত পালংশাকের গোড়ায় ঝাঁকুনি মারতে হবে। তার চেয়ে রহস্য ভেঙে দেওয়াই ভালো।

—মাইনে কী করে পাব, হুজুর। আমি তো প্রত্যহ রোজ কাজে বেরোই না! যে ক’টা দিন আকাশ থেকে দৈববাণী শুনতে পাবো, মাত্র সেই ক’টা…।

নিমাই দারোগা বুঝে গেলেন, এ-লোকের ব্যামো হচ্ছে একই শব্দের দুতিনটে প্রতিশব্দ উচ্চারণ করা, পর পর। কিন্তু ভাষাতত্ত্ব বিচার না করে এখন দরকার চোরের প্রতি দারোগার আচরণ, মানে খেঁকিয়ে ওঠা।

—নাম কী তোর?
—আজ্ঞে, নাম বলব, না টাইটেল?
—মানে!
—হুজুর, নাম আমার টাইটেল হয়ে গেছে। বলুন তো কী অন্যায়! বাপ-মায়ে রেখেছিল নীলমণি, শিবপুজোর দিন জন্ম যেকালে। কিন্তু এখন পাড়ার লোকে ডাকে সবেধন নীলমণি।

বলে সে দাঁত ছড়িয়ে হাসে।

পাড়ার একমাত্র সিঙ্গল চোর আমিই কিনা! বিশ্বাস করুন, বত্রিশ বছর হয়ে গেল এ-লাইনে, চোখের সামনে কত ভালো ভালো ছেলেকে দেখলাম বাপ-ঠাকুর্দার পেশা ছেড়ে ছিনতাইয়ে নেমে গেল। চুরি অনেক সূক্ষ্ম শিল্প স্যার, লেট স্বর্গীয় পি সি সরকার হয়তো মানতে চাইবেন না, কিন্তু আমরা মনে মনে ওনারই একলব্য শিষ্য। রাত্তিরে গিন্নি কর্তার পাশে শুয়েছেন— নাকে নথ, হাতে ছয়-ছয় বারোগাছি, গলায় মটরদানা হার। শুয়েছেন তো? সকালে উঠে দেখলেন গা-টা একটু হালকা ফিল হয়।

—পাড়ার একমাত্র সিঙ্গল চোর আমিই কিনা! বিশ্বাস করুন, বত্রিশ বছর হয়ে গেল এ-লাইনে, চোখের সামনে কত ভালো ভালো ছেলেকে দেখলাম বাপ-ঠাকুর্দার পেশা ছেড়ে ছিনতাইয়ে নেমে গেল। চুরি অনেক সূক্ষ্ম শিল্প স্যার, লেট স্বর্গীয় পি সি সরকার হয়তো মানতে চাইবেন না, কিন্তু আমরা মনে মনে ওনারই একলব্য শিষ্য। রাত্তিরে গিন্নি কর্তার পাশে শুয়েছেন— নাকে নথ, হাতে ছয়-ছয় বারোগাছি, গলায় মটরদানা হার। শুয়েছেন তো? সকালে উঠে দেখলেন গা-টা একটু হালকা ফিল হয়। যে কাতে শুয়েছেন, সে কাতে ঘুম ভেঙেছে, পাশও ফেরাইনি স্যার। নো ঘুমের গ্যাস, নো নকল কিত্তিম উপায়।

তবে আপনাকে তো বললাম, চিরকাল ওই অডারি কাজ ছাড়া অন্য কিছু হাতে নিই না। রাতে সকাল-সকাল লাইটের মধ্যে হালকা কিছু খেয়ে শুয়ে পড়লাম। তারপর যেদিন হবে, ঠিক দুটো থেকে আড়াইটের মধ্যে দৈববাণী। পরশু যেমন শুনলাম সাত্তুকির মা স্বর্গ থেকে বলছে, ওরে সবেধন, আমার অমন সাধের জাম্বুটিখানা ছোটো ছেলে হত্তুকিকে দেয়ে এয়েচিলাম। কিন্তু আমি ঝিঙে তুলতেই (হৈমবালার সোয়ামির ডাকনাম যেহেতু পট্‌লা) সাত্তুকিও ওটা নিজের ঘরে নিয়ে তুলেছে। এর প্রতিশোধ নিতে পারিস একমাত্র তুই, বাবা!

 

০২.
সবেধনের সঙ্গে কথা বলতে বলতে ভোর হয়ে এলো। ঘাসের ওপর ফোঁটা-শিশির, একটা ফিঙে আধো-অন্ধকার শিরীষের ডাল থেকে ডানা মেলল স্লেটরং আকাশের দিকে।

মাসখানেক হয়েছে পাঁজা দারোগার আবির্ভাব এই মকরমপুর থানায়। পঞ্চাশ পার হওয়ার পর ইচ্ছে ছিল, রুটিন করে গিন্নিকে নিয়ে একটু মর্নি ওয়াকে বেরোবেন। কিন্তু তার আলস্যময়ী ওজনদার শ্রীময়ী ওই বিশেষ শব্দটাকে একটু বাড়িয়ে নিয়ে উচ্চারণ করেন: মর্নিং-ওয়াক-থুঃ! কাজেই মনের দুঃখে তার একাকী ভ্রমণ গিয়ে দাঁড়িয়েছে নাইট পেট্রলে। তবে দারোগা সাহেবদের একা থাকার সৌভাগ্য বিশেষ হয় না। এই যেমন আজ সবেধন নীলমণি জুটে গেল। আর মকরমপুর বাজারের ভোরের চা দোকান দেখল এক আশ্চর্য দৃশ্য, বেঞ্চে পাশাপাশি বসে থানার বড়োবাবু আর এলাকার একমাত্র সিঁদেল চোর চা খেতে খেতে গল্প করছে! শুনল, গদগদ হয়ে সবেধন বলছে—

ই তো গত শুক্কুরবার দৈববাণী শুনে পীযূষ সাঁতরার ফ্যাকটিরি থেকে একটা লেদার জাতীয় চামড়ার ব্যাগ তুলে আনলুম। পীযূষের বিরাট কারখানা, অথচ নিজের আপন ভাইপোর ইস্কুলে যাওয়ার ব্যাগ ছিঁড়ে গেছে, সেখেনে কিপটেমি। ওর স্বর্গীয় মৃত ছোটোকাকা স্বপ্নে আদেশ দিয়েছিল আর কি।

—সকালের এই প্রথম ফার্স্ট চা খাওয়ার ইমেজই আলাদা।
—তা, গামলার আগে আর কী ঝেঁপেছিস?
—এই তো গত শুক্কুরবার দৈববাণী শুনে পীযূষ সাঁতরার ফ্যাকটিরি থেকে একটা লেদার জাতীয় চামড়ার ব্যাগ তুলে আনলুম। পীযূষের বিরাট কারখানা, অথচ নিজের আপন ভাইপোর ইস্কুলে যাওয়ার ব্যাগ ছিঁড়ে গেছে, সেখেনে কিপটেমি। ওর স্বর্গীয় মৃত ছোটোকাকা স্বপ্নে আদেশ দিয়েছিল আর কি।
—এসব চোরাই মাল বেচিস কোথায়?
—আমি চুরি করি স্যার, কিন্তু বিক্কিরিতে নেই। বাড়িতেই লোক এসে দশ-বিশ টাকা দিয়ে নিয়ে যায়। ওটা মালের দাম নয়, সমাজসেবার মজুরি।

শুনেই দারোগার হাতে-ধরা বিস্কুট স্বেচ্ছায় আধখানা খ’সে মাটিতে পড়ে গেল! সন্দেহ নেই, সবেধনই সেই একমাত্র তস্কর, যে চুরির মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজের ভেতর দিয়ে নাগাড়ে সোশ্যাল সার্ভিস চালিয়ে যাচ্ছে।

—চল, তোর বাড়িটা দেখে আসি। দেল্‌ফির গুহায় থাকিস তো?
—না হুজুর, দিলখুশপুর। সে পড়ছে গিয়ে আপনার শিবালয়ের দক্ষিণে।
—তার মানেই তাই। শোন, গ্রিস বলে একটা দেশ আছে। আড়াই-তিন হাজার বছর আগে গ্রিসের দেল্‌ফি শহরে ছিল আপোলোর মন্দির। আপোলো গান, কবিতা, ছবি, অসুখ, ওষুধ, আলো, জ্ঞান এসব অনেক কিছুর ঠাকুর। তার আন্ডারে তোমার ওই দৈববাণীও পড়ে। তিনি অনেক দেবাদেশ শোনাতেন, তুই যেমন অল্পস্বল্প শুনতে পাস। তবে তোর কিনা মরা মানুষ নিয়ে কারবার।

—কী জানি স্যার! সবাই তো পরিচয় দেয় না। কোনও কোনও গলা বেশ চেনাও লাগে, রাস্তা-সড়কে শুনিছি যেন। তবে আমার কাছে এরাই হলো গিয়ে আপনার আপেল, মানে ভগবান।

ঈশ্বরের যাতায়াতের পথটা আবিষ্কার করতে বেশিক্ষণ লাগল না পাঁজা দারোগার। সবেধনের বাড়ির পেছন দিক ঝোপঝাড়ে ঢাকা; তার মধ্যে সরু পায়ে চলা রাস্তা এসে থেমেছে বেড়ার ঘরের ঠিক পেছনে। সেখানে দেওয়ালে একটি মাপসই ফুটো। উঁকি দিলে ওপাশে খাট; বালিশের অবস্থান বলে দিচ্ছে সবেধন এদিকেই মাথা রেখে ঘুমোয়। নাহ, নিদ্রিত হয় আর কোথায়! ঘাপটি মেরে পড়ে থাকে, আর জলজ্যান্ত দেবতারা আকাশবাণী শোনানো মাত্র তড়াক করে লাফ দিয়ে হাতের-কাজ করতে বেরিয়ে যায়।

সবেধন হঠাৎ খেয়াল করল দারোগার পকেট থেকে একখানা পঞ্চাশ টাকার নোট বেরিয়ে তার ডানহাতের তেলো খুঁজে বেড়াচ্ছে।

—সে কী স্যার, আপনি স্বয়ং দারোগা হয়ে চোরকে ঘু…ঘু… মানে অর্থসাহায্য!
—কে বলেছে চোর? তুই না সমাজসেবী!

এতক্ষণে নিজের বয়েসে আর ভয়েসে ফিরে এলেন নিমাইবাবু।

এক্ষুনি গিয়ে সাত্যকির বাড়িতে গামলা রেখে আয়। বেড়ার দেওয়ালের ফুটোটাও সারিয়ে নিবি দুপুরের মধ্যে। আজ থেকে তোর দৈববাণী শোনা বন্ধ হলো। হ্যাঁ, বেলার দিকে একবার থানায় আসিস তো, এমন চমৎকার সুন্দর বিউটিফুল কল্পনাশক্তি যার, একটা কাজে ঠিক লাগিয়ে দেওয়া যাবে।

—এক্ষুনি গিয়ে সাত্যকির বাড়িতে গামলা রেখে আয়। বেড়ার দেওয়ালের ফুটোটাও সারিয়ে নিবি দুপুরের মধ্যে। আজ থেকে তোর দৈববাণী শোনা বন্ধ হলো। হ্যাঁ, বেলার দিকে একবার থানায় আসিস তো, এমন চমৎকার সুন্দর বিউটিফুল কল্পনাশক্তি যার, একটা কাজে ঠিক লাগিয়ে দেওয়া যাবে।

নীলমণির মনে হলো, এ-ভাষা যেন বড্ড চেনা চেনা, নিজের সংলাপের মতোই ঠ্যাকে! গদগদ হয়ে বলল, গরীবের বাড়ি যখন এলেনই হুজুর, এককাপ চা…।

নিমাই দারোগা উঠে পড়েন ব্যস্তভাব দেখিয়ে। না না, স্নান-খাওয়া সেরে কমপ্লিট করে থানায় গিয়ে বসতে হবে ন’টার মধ্যে। হাতে আর সময় কোথায়? দেরি করলেই লেট হয়ে যাবে!

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

জন্ম  ৭ শ্রাবণ (২৪ জুলাই), ১৯৬০, পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার দত্তপুকুরে। পূর্বপুরুষের ঠিকানা ছিল তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানের খুলনা জেলার সেনহাটি গ্রামে। রসায়ন নিয়ে স্নাতক হয়েছেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। সরকারি চাকরি করতেন। এখন অবসরপ্রাপ্ত। ২০০০ সালে বের হওয়া ‘জাতকের কবিতা’ কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ। এ পর্যন্ত মোট আটটি কবিতার বই, একটি ছড়াসংগ্রহ ও একটি প্রবন্ধপুস্তক প্রকাশিত হয়েছে তাঁর। সম্প্রতি শিশুকিশোরদের জন্যও লিখছেন চন্দন, যা বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় নিয়মিত প্রকাশ হচ্ছে।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।