রবিবার, জুন ২৩

জোহেবা : রুখসানা কাজল

0

১.
প্রতিদিন শহরের যে কোন একটি এতিমখানার সিঁড়িতে এসে বসে থাকে জোহেবা।

মরা গাছের শেকড়ের মতো ভেসে উঠেছে ওর গলার রগগুলো। শুকনো ঠনঠনে মুখ। দেবে যাওয়া দুটি চোখে ঘন হয়ে জমে আছে অবিশ্বাস আর সন্দেহের ঘোলা দৃষ্টি। সন্দেহময় সেই চোখে কর্মরত ম্যানেজার, কর্মচারী, আয়া সুইপার সবার দিকে ও তাকিয়ে থাকে। গেল চার মাস এভাবেই চলছে। সবাই চিনে ফেলেছে ওকে। জোহেবাও চিনে ফেলেছে শহরের এই বিশেষ এতিমখানাগুলোকে। এখানেই আইএস জিহাদিদের দ্বারা ধর্ষিতা এবং যৌনদাসী করে রাখা ইয়াজিদি মেয়েদের পরিত্যাক্ত সন্তানদের এনে রাখা হয়েছে। বিদেশীরা আসছে। পছন্দমত বাচ্চা দত্তক নিয়ে চলেও যাচ্ছে।

 

ওর দুচোখে জ্বলে ওঠে মর্মভেদী মায়ার আগুন। তোলপাড় কাঁপনে শিরশিরিয়ে ওঠে স্তনবৃন্তের শিরা-উপশিরা। আর শরীর ছেঁকে ধেয়ে আসে অজস্র স্নেহরস। স্তন ফুলে বেগবতী নদীর মতো ছটফটিয়ে ওঠে দুধের ধারাস্রোত। ও তখন দুহাত দিয়ে স্ফীত স্তন চেপে ধরে।

২.
হঠাৎ কখনও অন্দরমহলের বদ্ধ দরোজার ওপাশ থেকে হয়তো শিশুর কান্না ভেসে আসে। জোহেবা তখন পিঠ সোজা করে মাথা স্থির রেখে দরোজার দিকে ঘুরে বসে। ওর দুচোখে জ্বলে ওঠে মর্মভেদী মায়ার আগুন। তোলপাড় কাঁপনে শিরশিরিয়ে ওঠে স্তনবৃন্তের শিরা-উপশিরা। আর শরীর ছেঁকে ধেয়ে আসে অজস্র স্নেহরস। স্তন ফুলে বেগবতী নদীর মতো ছটফটিয়ে ওঠে দুধের ধারাস্রোত। ও তখন দুহাত দিয়ে স্ফীত স্তন চেপে ধরে। বোরখার নীচে ঝরে পড়ে দুধের ধারা। ভিজে যায় ওর কোল। ওর ইচ্ছে করে এই সুধারস সোনালি চুলের সেই শিশুটির মুখে ঢেলে দিতে। কিন্তু কোথায় সে শিশুটি?

আগুন নিভে কান্নায় ভেসে যায় ওর চোখ মুখ। নিয়ম নিষেধাজ্ঞার তোয়াক্কা না করে এতিমখানার ম্যানেজারের রুমে ছুটে এসে তার পা জড়িয়ে ধরে, আমার অ্যাডামকে ফিরিয়ে দিন। ফিরিয়ে দিন স্যার। আপনার করুণাময়ী খোদাতাল্লাহ্‌র দোহাই, ফিরিয়ে দিন আমার ছেলেকে।

কখনও আকুল হয়ে কাঁদে, দয়া করুন স্যার। দয়া করে শুধু একবার বলুন কোথায়, কোন দেশে কার কাছে অ্যাডামকে দত্তক দিয়েছে আমার স্বামী। আপনার আল্লাহর দোহাই, দোহাই আপনার জানের টুকরো ছেলেমেয়েদের। দয়া করে খুঁজে দেন আমার অ্যাডামকে।

শশব্যস্ত হয়ে পা টেনে সরে যান ম্যানেজাররা। জোব্বার নীচে তাদের পিতার মন ব্যাকুল হয়ে ওঠে। শিরা রক্তনালী জুড়ে অস্ফুটে বেজে যায় মমতা, আহা মায়ের কি জাত হয় গো! এই ইয়াজিদি মায়ের মুখটি ঠিক যেন তার মুসলমান মায়ের মতোই পবিত্র। তার সন্তানদের গর্ভধারিণীর মতোই চঞ্চল, উৎকণ্ঠিত, স্নেহকাতর। আঁকড়ে রাখার মাতৃ অভ্যাসে যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরাকের প্রতিটি মা যেমন তার সন্তানদের বুকের গভীরে লুকিয়ে রাখতে চাইছে সেরকমই মায়াময়।

ম্যানেজারেরা সস্নেহে কথা দেন, মাগো ইনশাল্লাহ্‌ আপনার অ্যাডামের খোঁজ নেব। খোঁজ পেলেই আপনাকে খবর করব মা-জননী। মহিমাময় আল্লাহ্‌তায়লা চাইলে আবার আপনি অ্যাডামকে বুকে ফিরে পাবেন।

ম্যানেজারেরা সস্নেহে কথা দেন, মাগো ইনশাল্লাহ্‌ আপনার অ্যাডামের খোঁজ নেব। খোঁজ পেলেই আপনাকে খবর করব মা-জননী। মহিমাময় আল্লাহ্‌তায়লা চাইলে আবার আপনি অ্যাডামকে বুকে ফিরে পাবেন। এই যুদ্ধ, হামলা, দখলদারী, ধর্ষণ খুন, ধর্মের নামে যত নোংরা বাড়াবাড়ি চলছে, বড়ো খারাপ, বড়ো খারাপ মা।

কেউ আবার বিব্রত স্নেহ ও সম্মানে পাগড়ী খুলে মাথা চুলকান। বুড়ি পৃথিবী সাক্ষী, আজ অবধি পৃথিবীর কোনো ধর্ম মায়ের স্নেহের কাছে জয়ী হতে পারেনি, পারবেও না। মাতৃত্ব নিজেই যে একটি ধর্ম। অসম্ভব জেনেও তারা সান্ত্বনা দেন, অ্যাডাম ফিরে আসবে গো মা। ফিরে আসবে।

 

৩.
সন্ধ্যার রংধরা বিকেলে অভুক্ত, জীর্ণশীর্ণ জোহেবা নিজেকে গুছিয়ে ফিরে আসে ওর আস্তানায়। শহরের পরিত্যক্ত বাড়িগুলো এখন ওদের আস্তানা। আইএসের হাতে ধর্ষিতা যৌনদাসীদের সন্তানের মা হওয়া ইয়াজিদি নারীরা থাকে এখানে। এরা কেউ বাড়ি ফিরে যেতে পারেনি। এদেরকে ফিরিয়ে নিতে বাড়ি থেকে কেউ আসেনি। বাবা, মা, ভাই বোন আত্মীয়রা এই ধর্ষিতা মা, বোন, স্ত্রী, কন্যাকে ফিরিয়ে নেওয়ার কথা স্বপ্নেও ভাবতে সাহস করেনি। কী করে ফেরাবে তারা? এরা প্রত্যেকেই যে ছিল আইএস জিহাদিদের যৌনদাসী এবং তাদের সন্তানের জন্মদাত্রী। ইয়াজিদিদের ধর্ম বড়ো কঠিন। অব্যয় স্থির কড়া নিয়মনীতির অপরিবর্তনীয় অনুশাসনের আষ্টেপৃষ্ঠে বদ্ধ। তাছাড়া ইয়াজিদি সমাজে মেয়েদের মূল্যই বা কী! ঝরাপাতার চাইতেও কম। সামান্য বেচাল হলেই পারিবারিক সম্মান রক্ষার দোহাই দিয়ে খুন করে ফেলা হয় মেয়েদের। এমনকি নিজেদের ধর্মের বাইরে অন্য ধর্মের কাউকে বিয়ে করলে সেই মেয়েকে পাথর ছুঁড়ে হত্যা করতে বুক কাঁপে না, মন উদাস হয়ে হাত অবশ হয়ে যায় না ইয়াজিদি বাবা, ভাই, মামা চাচা, পুরুষ জ্ঞাতিগোষ্ঠীদের।

 

৪.
বিকেলের রোদ এসে পড়েছে আস্তানার বারান্দায়। জোহেবাকে ঘিরে বসে আছে কয়েকজন ইয়াজিদি নারী। উঠানে খেলছে ধর্ষিতাদের সন্তানরা। ইয়াজিদি মায়ের সন্তান হলেও এই বাচ্চাদের কেউ ইয়াজিদি নয়। কখনও হবে না। হতে পারবে না। কারণ ইয়াজিদি ধর্মের নিয়মে, একজন ইয়াজিদি পুরুষ এবং ইয়াজিদি নারীর সন্তানই ইয়াজিদি হতে পারবে। বুক ফেটে দীর্ঘশ্বাস উঠে আসে জোহেবা, শিরিন, আসমা, তাহেরাদের। সৃষ্টিকর্তা অন্যান্য ফেরেশতাদের সঙ্গে এই বিশ্বচরাচর রক্ষার দায়িত্ব দিয়েছেন তার পরমপ্রিয় পবিত্র আত্মা মেলেক তাউসকে। ইয়াজিদিরা এই মেলেক তাউস বা ময়ূর ফেরেশতার অনুসারী। তিনিও কি বুঝবেন না, এই নারীরা কেবলই ভুক্তভোগী। প্রতিপক্ষের ঘৃণার শিকার। এই সন্তানরা তাউসের প্রভু মহান সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছাতেই তাদের গর্ভে এসেছে! এরাও দাসিন বা দেবদূত। এদের শরীরে রয়েছে ইয়াজিদি মায়ের শরীরের অংশ। এই যুদ্ধ, হামলা, অত্যাচার, নির্যাতন, উচ্ছেদ, খুন, বোমাবাজি, ধর্ষণে ইয়াজিদি নারীদের কি কোনো অংশগ্রহণ ছিল বা আছে? তারা তো নিমিত্তের ভাগী মাত্র। ধর্ষণের সাধ উবে গেলে এক আইএস জিহাদির কাছ থেকে বিক্রি হয়ে আরেক আইএস জিহাদির হাত ঘুরে এরপর অন্য কেউ একজন, তারও পরে আরও কেউ—

বিশ্বের কোনো নারী কি স্বেচ্ছায় যৌনদাসী হতে চায়!

 

৫.
শিরিনের মেয়ে ত্বাহা খেলতে খেলতে পড়ে গিয়ে কেঁদে ওঠে। ছুটে আসে শিরিন। মেয়েকে কোলে তুলে নিতে গিয়ে ওর মনে পড়ে যায়, গত মাসে খুব গোপনে ওর মা এসেছিল ওর সঙ্গে দেখা করতে। জানিয়েছিল, ইয়াজিদি ধর্মীয় নেতারা কিছুটা নরম হয়েছেন ধর্ষিতাদের বেলায়। কিন্তু আইএস জিহাদির দ্বারা উৎপন্ন সন্তানদের বেলায় তারা খড়গহস্ত। এইসব সন্তানদের এতিমখানায় বা অন্য কোথাও দত্তক দিয়ে দিতে হবে। তবে তারা সমাজে ফেরার ছাড়পত্র পাবে।

মেয়ে শিশুটির দিকে ঘৃণার দৃষ্টি হেনে শিরিনের মা বলেছিল, একে এতিমখানায় দিয়ে দে শিরিন। তুই ফিরে আয় মা। কী হবে এ বাচ্চাকে রেখে! মুসলিম আর ইয়াজিদির বাচ্চা কি কখনও মানুষের বাচ্চা হয়? তুই ত জানিস, আমাদের কাছে এরা ‘শয়তানের বাচ্চা’ ছাড়া কিছুই না!

 

৬.
এই আস্তানাটি কয়েকটি পরিত্যাক্ত বাড়ি নিয়ে গড়ে উঠেছে। সাঁঝ সন্ধ্যার সন্ধিক্ষণে আস্তানার আশেপাশে বোমায় ধসে যাওয়া বাড়িগুলো কংকাল রাক্ষুসীর মতো জ্যান্ত হয়ে ওঠে। যেন শত সহস্র মোটা চিকন লম্বা বেঁটে বেঁকাত্যাড়া হাত বাড়িয়ে এখুনি ওদের গলা টিপে ধরতে ছুটে আসবে! সেদিন সন্ধ্যার আবছা আলোতে শিরিনের মনে হচ্ছিল, ওর নিজের মা-ই একজন রাক্ষুসী। রক্তসম্পর্কের দ্বান্দ্বিকতায় শিরিনের মন দুলে গিয়েছিল, যে বা যারা শিশুদের ভালোবাসতে পারে না, সে বা তারা কি মানুষ? যে ধর্ম বুক পেতে অন্যদের গ্রহণ করতে পারে না তার প্রসরতা কি কখনও বিশ্বব্যেপি ছড়িয়ে পড়তে পারে?

সূর্য অস্ত যাওয়ার সময় হয়ে এসেছে। শিরিন মেয়েকে কোলে তুলে সূর্যের দিকে মুখ করে প্রার্থনা করতে বসে। ওর বুকের ভেতর নিজের মায়ের কথাগুলো কাঁটাচামচের খোঁচার মতো কুরে খাচ্ছে। এই পৃথিবীতে ওরা কতজন ইয়াজিদি আছে? কত লক্ষ? কোথায় আছে তারা? ইরাকের যে অঞ্চলে ওদের ভূমি ছিল সেই অঞ্চল কি আর ওদের নিজেদের আছে? ইয়াজিদি নারী পুরুষ শিশুরা ভেসে বেড়াচ্ছে এদেশ ওদেশের শহর গ্রামে গঞ্জে। পড়াশোনা করার সুযোগ পেয়েছিল শিরিন। শিয়াসুন্নি মুসলিম, কুর্দি মুসলিম কিছু বন্ধুও হয়েছিল ওর। জ্ঞানীরা বলে, জাতিগত দিক দিয়ে ওরা কুর্দিদেরই একটি প্রজাতি। যে ভাষায় ওরা কথা বলে সেই কুরমানজি ভাষাও কুর্দি উপভাষা। কুর্দিদের মতো ওদের গায়ের রং ধুসর আর চোখ দুটি নীল। অথচ আইএস জিহাদিরা যখন ওদের লুটেপুটে, তাড়িয়ে-পাড়িয়ে, গুলি করে, বোমা মেরে, খুন-জখম করে, পশুর মতো নারীপুরুষ শিশুদের বন্দি করে নিয়ে যাচ্ছিল—কুর্দি সেনাবাহিনী তখন ওদের রক্ষা না করে চলে গিয়েছিল ব্যারাকে।

 

৭.
শিরিন ওর কলেজের বন্ধুদের অনেক করে বোঝাতে চেষ্টা করেছে, ইয়াজিদিরা আসলে অতি প্রাচীনকালের এক সম্প্রদায়।  ইহুদিরা যেমন প্রিয় ধর্মস্থান একবার হলেও জেরুসালেমের প্রধান সিনাগগে প্রার্থনা করতে চায় তেমনি ইয়াজিদিদেরও রয়েছে পুণ্য পবিত্রময় ধর্মীয় স্থান। ইরাকের মসুল শহরের উত্তরে অবস্থিত লালেশ এলাকায় ধর্মগুরু শেখ আদি ইবনে মুসাফিরের মাজার হচ্ছে ইয়াজিদিদের সেই পবিত্র তীর্থস্থান। ইয়াজিদিরাও স্বপ্ন দেখে, পূণ্য অর্জনের জন্য একবার হলেও পরমগুরু শেখ আদির মাজারে সাত দিনের তীর্থভ্রমণে যেতে হবে। এখানে মালিক তাউসের মূর্তি রয়েছে। অজু করে সেটি ধুয়ে একশ মোমবাতি জ্বেলে আগামী দিনগুলো, স্বামী-স্ত্রী, বাবামা, সন্তানসন্ততিসহ পৃথিবীর মঙ্গল কামনা করে একটি ষাঁড় উৎসর্গ করবে তারা। তাছাড়া বিশ্বজুড়ে অন্যধর্মের অনুসারীরা যদি তাদের নিজেদের ধর্ম পালন করতে পারে তো ইয়াজিদিদের অপরাধ কোথায়?

 

৮.
এসব কথা ওর বন্ধুরা বুঝতে চায়নি। অবজ্ঞায় হেসে ঠাট্টা করেছে। ভয়ংকর সেই দিনগুলোতে শিরিন দেখেছিল, ওদের আশেপাশের গ্রাম মহল্লার চেনাজানা মুসলিমদের অনেকেই এসেছিল আইএস জিহাদিদের সঙ্গে ওদের উপর হামলা করতে। সূর্যমুখী ফুলগুলোর মুখ ঘুরে নুয়ে পড়েছে। আইএস জিহাদির ধর্ষণে জন্ম নেওয়া তার মেয়ে সন্তানটিকে নিয়ে শিরিন ঘরে চলে আসে।

ক্লান্ত শরীরটাকে বারান্দায় ঠেস দিয়ে সারা রাত বসে থাকে জোহেবা। দুটো রুটি, শুকনো আঙুর আর এক কাপ চা খেয়ে ধসে পড়া বিল্ডিংগুলোর দিকে ঘুম অঘুমে চেয়ে থাকে। মনে মনে চাঁদের আলোর সঙ্গে কল্পনার রং মিশিয়ে ও বিল্ডিংগুলোকে আগের মতো সতেজ সরব কোলাহলমুখর বানানোর চেষ্টা করে। এরকমই এক আলো ছড়ানো রাতে আইএস জিহাদিরা তিনটি সন্তানসহ জোহেবাকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল। ও পড়েছিল কম্যান্ডার তিউনিসের ভাগে। তিনবার পালানোর চেষ্টা করেছিল। কয়েক মাস পর বিক্রি করতে গিয়ে তিউনিস জানতে পারে জোহেবা তার সন্তানের মা হতে চলেছে। বিক্রি বন্ধ করে একজন সাধারণ পিতার মতো জোহেবার গর্ভের সন্তানসহ জোহেবার আগের পক্ষের সন্তানদের প্রতি যত্নবান হয়ে উঠেছিল তিউনিস। জিহাদি হলেও ওর প্রাণের কোথাও শেষপর্যন্ত মনুষ্যত্ব বেঁচে ছিল। কিন্তু জোহেবা যখন সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা সে সময় এক যুদ্ধে তিউনিস খুন হয়ে যায়। চারিদিকে যুদ্ধ, খাদ্য, পানির তীব্র অভাব। তিনটি ছেলেমেয়েকে নিয়ে এক ধ্বংসস্তুপ ছেড়ে আরেক ধ্বংস্তুপে পালিয়ে বেড়াতে থাকে জোহেবা। ভয়ের ব্যাপার ছিল আরও। এই যুদ্ধ আতঙ্কের মধ্যে শিকারে নেমে পড়েছে আন্তর্জাতিক মানব পাচারকারীদল। এরা জিহাদিদের ব্যবহৃত, পরিত্যক্ত ইয়াজিদি নারীশিশু পুরুষদের ধরে বিক্রি করে দিচ্ছে, পাচার করে দিচ্ছে দেশ দেশান্তরে। এরকম এক পলায়নপর রাতে জন্ম হয় ধর্ষণের ফসল জোহেবার অ্যাডামের। নিরন্তর ভয় ছাড়া কেউ ছিল না ওর পাশে। সোনালি চুল, সবুজ চোখের শিশুটির জন্মকালে মাকে সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছিল তার দুই বালকপুত্র তকির, নিজার এবং বালিকা কন্যা হাওয়া। প্রসব শেষে হাওয়ার কোলে যেন আলোর জ্যোতি হয়ে জ্বলছিল অ্যাডাম। দুই ভাই হাসিমুখে ছুঁয়েছিল সেই জ্যোতি। অ্যাডাম আহ্লাদ অভিমানে অনুচ্চস্বরে সুর করে কাঁদছিল। জোহেবা দুধের ধারা তুলে দিয়েছিল ওর মুখে। কান্না থামিয়ে কিছুক্ষণ চেয়েছিল অ্যাডাম। যেন চিনে নিচ্ছিল ওর মাকে। আর সেই মুহূর্তে জোহেবার মনে হয়েছিল, আজ উৎসবের দিন। মহান সৃষ্টিকর্তাকে শত শত ধন্যবাদ। শুকরিয়া মালিক তাউস এবং মহাপুরুষ সদগুরু শেখ আদি। বেঁচে থাকলে ছেলেমেয়েদের নিয়ে লালেশের নদীর পানিতে অজু করে শেখ আদির মাজারে সে একশ মোমবাতি জ্বালাবে।

 

৯.
চার সন্তানকে নিয়ে পালিয়ে পালিয়ে থাকার কোনো এক সময় পাচারকারীরাদের হাতে ধরা পড়ে গিয়েছিল জোহেবা। এদিকে কিছুটা স্তিমিত হয়েছে যুদ্ধের শিখা। জোহেবার স্বামী খেদর। খুঁজতে খুঁজতে একসময় পেয়ে যায় ওদের সন্ধান। চড়া ডলারে তকির, নিজার, হাওয়াকে ছাড়িয়ে আনে। কিন্তু জোহেবাকে নিয়ে কি করবে এখন খেদর? ইয়াজিদি ধর্মনেতারা কিছুতেই গ্রহণ করবে না ইয়াজিদি ধর্ষিতা ও যৌনদাসীদের। জোহেবা অ্যাডামকে নিয়ে আশ্রয় নেয় ওদের জন্য নির্দিষ্ট আস্তানায়। বিস্তর আলোচনা সমালোচনা, অনুরোধ উপরোধ, যুক্তি তর্কের শেষে মানবতার দোহাই দিয়ে ইয়াজিদি ধর্মনেতারা রাজী হলেও ফতোয়া দেয়, শুধুমাত্র ভুক্তভোগী ধর্ষিতাদের গ্রহণ করা হবে। কিন্তু তাদের ধর্ষণের ফসল সন্তানদের নয়। শত্রুর সন্তানদের স্থান নেই তাদের কাছে। ইয়াজিদি ধর্মে এরা পতিত। অগ্রহনীয়। পরিত্যাজ্য।

কিন্তু মাতৃত্ব কি ত্যাজ্য-বর্জন স্বীকার-অস্বীকার মানে? না মানবে বলে আশা করে ধর্মীয় নেতারা? জোহেবা এবং আরও কিছু ইয়াজিদি মেয়ে সন্তান ছেড়ে কিছুতেই ফিরতে চায় না আপন সমাজে। এ সন্তানরা যতখানি মুসলিম জিহাদিদের ঠিক ততোখানি ইয়াজিদি নারীদের। তবে কেন ফেলে দেবে তারা?

 

১০.
এবার নাট্যমঞ্চে আসে জোহেবার স্বামী খেদর। সংসার, স্বজন, প্রেম ভালোবাসার কথা তুলে অনুনয় করে। কাঁদে। ছেলেমেয়েদের দোহাই তুলে অ্যাডামকে ফেলে চলে আসতে বলে নিজের সংসারে। জোহেবা ফিরিয়ে দেয় খেদরকে। অ্যাডামকে ফেলে দেওয়ার কথা একবারের জন্যও ভাবতে পারে না। এদিকে প্রতিদিন ইয়াজিদি আত্মীয় স্বজনদের সঙ্গে থেকেও মাকে এনে দেওয়ার দাবী জানাচ্ছিল নিজার, তকির, হাওয়া। খেদরকে তারা অনুরোধ করছিল, ‘আমাদের আম্মাকে এনে দাও আব্বা। এখানে কিছুই ভালো লাগছে না। আম্মা নাই তো কিছু নাই। কবে আসবে, কবে আনবে আম্মাকে?’

অনুনয় ছেড়ে খেদর এবার ধর্মীয় সমাজপতি এবং নিজের পরিবারের আত্মীয়দের সঙ্গে শলাপরামর্শ করে অ্যাডামসহ জোহেবাকে নিয়ে আসে নিজেদের সমাজ-সংসারে। বাচ্চারা খুশি। জোহেবাও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে অনেক খুশি। হাওয়ার কোলে কোলে ঘুরে বেড়ায় শিশু অ্যাডাম। সপ্তাহখানেক পর ডাক্তার দেখানোর কথা বলে অ্যাডামকে নিয়ে শহরে আসে খেদর। কোনো এক এতিমখানায় অ্যাডামকে দিয়ে একাই ঘরে ফিরে আসে খেদর। জোহেবা ব্যাকুল হয়ে জানতে চায়, অ্যাডাম কোথায়? কোথায় রেখে এলে ওকে?

খেদর মিথ্যে করে বলে, অ্যাডাম অনেক অসুস্থ। ওকে কয়েক দিনের জন্য হাসপাতালে ভর্তি করে নিয়েছে ডাক্তার। এই তো সামনে সপ্তাহে নিয়ে আসব।

কেউ জানতে চায় না, ছোট্ট শিশুটা কোথায়, কেমন আছে এখন! অজানা আশঙ্কায় জোহেবার খাবার থালাতেই শুকিয়ে যায়। গলার কাছে পানি আটকে শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। ঢনঢন করে প্রাণ। বুকের দুধ নামিয়ে দেখে হলুদ হয়ে যাচ্ছে দুধ। রাতে পাথুরে উঠানে চাঁদ নেমে আসে।

জোহেবা ঘর উঠান ঝেড়ে রান্না বসায়। ছেলেমেয়ে স্বামী শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়রা মজা করে খায়। কেউ জানতে চায় না, ছোট্ট শিশুটা কোথায়, কেমন আছে এখন! অজানা আশঙ্কায় জোহেবার খাবার থালাতেই শুকিয়ে যায়। গলার কাছে পানি আটকে শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। ঢনঢন করে প্রাণ। বুকের দুধ নামিয়ে দেখে হলুদ হয়ে যাচ্ছে দুধ। রাতে পাথুরে উঠানে চাঁদ নেমে আসে। আলো ফেলে অক্ষর লেখে চাঁদ। তাতে শব্দ ফুটে উঠে। জোহেবা সেই শব্দের অর্থ মিলিয়ে এবার শঙ্কায় কেঁপে ওঠে। আবার একটি দিন আসে। রাত নামে। ম্লান মুখে সরে যায় চাঁদ। খেদরের বাড়িময় কেমন যেন চাপা খুশি খেলে যাচ্ছে। একশটি মোমবাতি জ্বালিয়ে দিয়েছে আত্মীয়স্বজনরা। সুরামন্ত্র পড়ে ঘরে ঘরে পবিত্র পানি ছিটাচ্ছে তারা। হালাল করা হচ্ছে খেদরদের বাড়িঘর উঠান খামার! কেন? এ সংসারে কী ছিল হারাম? কে ছিল পাপী দুরাত্মা?

 

১১.
জোহেবা যা বোঝার বুঝে যায়। সমাজপতি আর ধর্মনেতাদের সঙ্গে নিয়ে খেদর প্রতারণা করেছে ওর মাতৃত্বের সাথে।

এবার জোহেবাও চালাকি করে। অসুস্থ হওয়ার ছল করে বড়ো ছেলে তকিরকে নিয়ে শহরে আসে অ্যাডামের খোঁজে। এখানে সেখানে খোঁজ নিয়ে জানতে পারে, খেদর একটি শিশুকে কোনো এক এতিমখানায় দিয়ে দিয়েছে দত্তক দেওয়ার জন্য। কারা যেন অ্যাডামকে দত্তক নিয়ে চলেও গেছে দেশ ছেড়ে। তার মানে জোহেবাকে গ্রহণ করলেও সমাজপতিদের নির্দেশে অ্যাডামকে সরিয়ে দিয়েছে খেদর। মাতৃত্বের সঙ্গে সন্তানকে নিয়ে ধর্মনেতাদের এ কী জঘন্য ষড়যন্ত্র!

ইয়াজিদি ধর্মমোল্লারা যতই বলুক, আইএস জিহাদিদের ধর্ষণে ইয়াজিদি নারীদের গর্ভে উৎপন্ন সন্তানরা ‘শয়তানের বাচ্চা’, ‘ইবলিশ’, ‘লুসিফার’, জোহেবা তা মানে না। অ্যাডাম ওর শরীরের অংশ। কী এক মায়ায় আডামকে কিছুতেই ভুলতে পারে না জোহেবা। শিশুটি তো নিষ্পাপ। ওর কী দোষ ছিল এ পৃথিবীতে? তাছাড়া ও তো এই যুদ্ধের সংঘটক নয়। তবে কেন এত ঘৃণা ওর উপর!

স্বামীর কাছ থেকে তালাক নিয়েছে জোহেবা। অ্যাডামকে খুঁজে চলেছে সে। ও তো কোনো খুনী বা ধর্মের সন্তান নয়। ও শুধু জোহেবার সন্তান। মাতা জোহেবার অপমান, অশ্রু, নির্যাতনের পরিত্রাণ ছিল অ্যাডাম। ছিল ওর মানসিক আশ্রয়।

 

১২.
বুকের দুধ জমে পাথর হয়ে গেছে স্তন। ব্যথায় টনটন করছে দুটি মাতৃসরোবর। শেষবারের মতো আলো ছড়িয়ে ডুবে যাচ্ছে চাঁদ। পূবের আকাশ আলো করে সকাল আসছে আরেকটি নতুন দিন নিয়ে। দুহাতে নিংড়ে দুধ ঝরিয়ে ফেলে জোহেবা। সূর্যমুখি ফুলগুলো উদীয়মান সূর্যের দিকে মুখ ঘুরিয়ে প্রার্থনা করছে। ভিজে ন্যাকড়ায় বুক মুছে উঠে দাঁড়ায় জোহেবা। গোসল করে আজকেও সে বেরিয়ে পড়বে অ্যাডামের খোঁজে। তার একটিই প্রার্থনা, অ্যাডামকে সে কিছুতেই হারিয়ে যেতে দেবে না।

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

একাডেমিক পড়ালেখা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে। পারিবারিক আবহে লেখালেখির শুরু। নিভৃতে থাকতে ভালোবাসেন। স্বদেশ এবং পার্শ্ববর্তী দেশের বিভিন্ন পত্রপরিকায় গল্প ও নিবন্ধ লেখেন। এ পর্যন্ত দুটি ছোটো কলেবরের উপন্যাস, কয়েকটি গল্প এবং অণুগল্পের বই প্রকাশিত হয়েছে। উত্তরণ প্রকাশনা থেকে সদ্য প্রকাশিত হয়েছে একটি গল্পের বই, ‘করালদুপুরের গল্পগুলো’। পেশায় অধ্যাপক । দেশি বিদেশি সাহিত্য, রাজনৈতিক সংস্কৃতি, ইতিহাস বিষয়ে  পড়ালেখা করতে ভালোবাসেন।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।