শুক্রবার, ডিসেম্বর ৯

তমাল রায়ের গল্প : সময়যানের সওয়ার হয়ে বাঁধা ধারনার সঙ্গে এনকাউন্টার

0

দুই বাংলার লেখালিখির জগতে তমাল রায় সুপরিচিত। তিনি লেখেন কম। প্রকাশিত হয় আরও কম। সেই সূত্রে তাঁর নিজের লেখারা কুলুঙ্গিতে তুলে রাখা যেন পুরনো দস্তাবেজ। দরকার না-পড়লে নেড়েচেড়ে দেখা হয় না। দরকার যে তবু হয়, কেন-না তার গুরুত্ব অপরিসীম। বলা যায়, সম্পাদক সত্তা লেখক তমাল রায়কে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে খানিকটা কোণঠাসা করে দিয়েছে। এ-হেন অবস্থাতেও তাঁর বেশ কিছু গল্প একত্রিত হয়ে প্রকাশিত হচ্ছে, সংকলনের নাম, ‘স্বেদ, রক্ত ও ক্রুসেডের গল্প।’ ঘটনাক্রমে প্রকাশের আগেই সেই বইয়ের গল্পগুলি পড়ে ফেলার সৌভাগ্য হওয়া এবং সেই সূত্রেই দু-চার কথা বলার সুযোগ ঘনিয়ে ওঠা- এই হেতুই আরও একবার ঢুকে পড়া গেল তমাল রায়ের গল্পভুবনে।

এই সংকলনের গল্পগুলি আমাদের প্রচলিত গল্পপাঠ অভিজ্ঞতাকে খানিকটা হতচকিত করে। এখন, এখানে ‘প্রচলিত’ কথাটি নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। নানা নিরীক্ষায় আমাদের বাংলা গল্প এত বিস্তার ও বৈচিত্র্য পেয়েছে যে, ‘প্রচলিত’ অভিজ্ঞতার ধার-ভার-ব্যাপ্তি যে ঠিক কতখানি তা আমাদের বুঝতে অসুবিধা হয় না। তা সত্ত্বেও তমাল রায়ের গল্প আমাদের সেই অভিজ্ঞতার সাধারণ ধারণার সঙ্গে মেলে না। মেলে না, কারণ, লেখক মেলাতে চান না। কোনো নির্দিষ্ট তত্ত্ব, সংজ্ঞা যদি গল্পের জন্য ধার্য হয়ে থাকে, এই সংকলনের লেখক প্রথমেই তা থেকে নিষ্ক্রমণ প্রত্যাশী। কেন-না এইটিই তাঁর কাম্য। তিনি সমস্ত চেনা ধারণার সঙ্গে এক ধরনের মোলাকাত বা এনকাউন্টার চাইছেন। প্রথমত, তা এই সাহিত্যবিশ্বের বেঁধে দেওয়া তাত্ত্বিক ধারণার সঙ্গে। এই সংকলনের গল্পগুলি যখন পরপর পড়ে যাওয়া হয়, তখন পাঠক নিজেই একরকম পরীক্ষার মুখে পড়েন। কোনটাকে ছোটগল্প বলা হবে, নাকি বলা হবে না, নাকি শুধু গল্প-ই বলা যায়- এই নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ লোফালুফি চলতে পারে। একসময় বিবিধ সংজ্ঞা ছেড়ে আখ্যান তাকে জাতসাপের মতোই কামড়ে ধরে, তখন সমস্ত ধারণার অন্তে লেখক-প্রার্থিত এক বোধের ভূমিই গন্তব্য এবং একমাত্র সুস্থিতির প্ল্যাটফর্ম হয়ে ওঠে। অর্থাৎ, তমাল রায়ের গল্পপাঠ আমাদের আর-দশটা গল্প পড়ার সমঅভিজ্ঞতার সঙ্গে মেলে না। দ্বিতীয় যে এনকাউন্টার এখানে লেখক চান, তা আমরা দেখব গল্পের অন্দরমহলে।

স্বেদ, রক্ত ও ক্রুসেডের গল্প ।। তমাল রায় ।। প্রচ্ছদ: পার্থ প্রতীম দাস ।। প্রকাশক : সৃষ্টিসুখ

 

এই সংকলনের একধিক গল্পে ফিরে ফিরে এসেছেন রেনেসাঁ সময়কাল এবং পরবর্তীর বাংলা মনীষার শ্রেষ্ঠ মানুষদের কেউ কেউ। কালীপ্রসন্ন সিংহ, পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মাইকেল মধুসূদন দত্ত বা ঋত্বিক ঘটক— এঁদের লেখক নিয়ে এসেছেন এই একুশ শতকের প্রথম কি দ্বিতীয় দশকে। এখানে স্পষ্ট করে দেওয়া ভালো যে, বিষয়টি কখনই এমন নয় যে এঁরা এসে আজকের পৃথিবীতে হাঁটছেন-চলছেন আর বিস্মিত হচ্ছেন এবং সেইহেতু বেশ কিছু কথোপকথন ঘনিয়ে উঠছে। বরং উল্টোটাই ঘটছে। এক আশ্চর্য সময়যান যেন গল্পগুলির অন্দরে রাখা আছে। যা দুই ভিন্ন কালকে মুখোমুখি এনে দিচ্ছে এমন এক অবতলে, যেখানে জীবনের গূঢ়তর কিছু প্রশ্নের মাধ্যমে সফলতা ও নিস্ফলতার ধারণার এক দ্বান্দ্বিক মোলাকাত সম্ভব হচ্ছে। এইখান থেকে তমাল রায়ের গল্পকে চিনতে গেলে আমাদের বুঝে নিতে হবে এই শতকের সময়ের অসুখ এবং অসহায়তা। যুগপৎ বিপন্নতা সময়ের শিরদাঁড়াকে যেভাবে ভঙ্গুর করে তুলেছে, সেই অনুধাবন থেকেই যেন একটা প্রকল্প নিলেন লেখক। যা একাধারে আমাদের শ্রেষ্ঠ মনীষার মুখোমুখি করাচ্ছে, অসুখের বিপ্রতীপে দাঁড়িয়ে আমাদের সম্মিলিত স্মৃতির জাগরণ প্রত্যাশা করছে; আবার একই সঙ্গে পণ্যসভ্যতার বেঁধে দেওয়া সফলতা-নিষ্ফলতার ধারণাকে একটি দ্বন্দ্বের মুখে ফেলে দিয়ে একপ্রকার নৈতিক উদ্ভাস প্রার্থনা করছে। এই যা কিছু প্রত্যাশা তা কিন্তু কোনো কেন্দ্র বা অথরিটিকে মান্য করে নয়। গল্পের ক্ষেত্রেও দেখা যাবে, এক একটি গল্পে হয়তো একজন কেন্দ্রীয় চরিত্র থেকে যাচ্ছেন, কিন্তু গল্প শেষ হলেই বোঝা যায়, এখানেই গল্পের শেষ নয়। আর-এক ব্যক্তিকে আশ্রয় করে যখন আমরা পরের গল্পে ঢুকছি, দেখব সময়ের একটাই চাদরের উপর দিয়ে যেন আমরা হাঁটছি। এমনকি যে-গল্পে এই ধরনের কোনও বিখ্যাত ব্যক্তির উপস্থিতি নেই, সেখানেও এই মনে-হওয়া জারি থেকে যায়। ফলে, কে যে এখানে কেন্দ্র, তা নির্দিষ্ট নয়। অথরিটি কারও নেই। আখ্যানের গোড়া শক্ত করে ধরে আছে এই শতকের বিপন্নতা, বিপর্যস্ত, ক্লান্ত, বিস্ময়হীন যাপনের অভিশাপ।

গোলোকায়নের মায়াহরিণ আমাদের আদপে উপহার দিয়েছে বিচ্ছিন্নতা ও শূন্যতা। আমাদের শিকড় নড়ে গেছে আক্ষরিক অর্থেই। আমরা খেয়াল করলে দেখব, সেই যে বিভূতিভূষণের হরিহরকে গ্রাম ছাড়তে হয়েছিল পেটের তাগিদে, সেইটেই এই সময়ের বাঙালির এক স্থায়ী বিপর্যয়। বিভূতিভূষণ তাঁর দূরদৃষ্টিতে এই সম্ভাব্য অসুখ চিনতে পেরেছিলেন, জানিয়ে দিয়েছিলেন। সেটিই ক্রমে মহামারী হয়ে উঠল। গ্রাম সংস্থানগুলো যখন ব্যাপকহারে ভাঙতে শুরু করল, মানুষ শিকড় হারাল। চেনা ভূমি, পরিমণ্ডল, সংস্কৃতি এবং পরিচিত মানুষ ছেড়ে সে ছড়িয়ে পড়ল নগরে নগরে। অপরিকল্পত নগরায়নে ফুলে ফেঁপে উঠল নগরসভ্যতা। কিন্তু এখানে মাথা-গোঁজা মানুষ ফিরে পেল না সেই আত্মিকতা, যার অংশীদার সে ছিল তার পুরনো বাসস্থানে। এখানে মানুষ অনেক বেশি একা, বিচ্ছিন্ন তাই খানিকটা অবধারিতভাবেই স্বার্থপর। বা, বলা ভালো আত্মকেন্দ্রিক। এই আত্মকেন্দ্রিকতা আসলে ধনতান্ত্রিক সভ্যতার পুঁজি। একলা মানুষকে সে সহজেই চালিত করতে পারে তার নিজের উদ্দেশ্যপূরণে। এই যদি হয় নয়া কিসিমের উদ্বাস্তু হওয়ার এক স্বরূপ, দ্বিতীয় যেভাবে সে উদ্বাস্তু হলো, তা তার স্মৃতিতে। তার নিজের জীবন, বীজের জীবন ছেড়ে এসে পাওয়া এই জীবন তাকে তার সম্মিলিত স্মৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করল। করার জন্য আসরে নামল, সংস্কৃতির নামে কিছু ‘কলে ছাঁটা সংস্কৃতি’র আয়োজন। এই পসরা থেকে একজন একলা মানুষ মনোহারী সবকিছু বেছে নিয়ে তার জীবনকে ফেলে দিল এক ছাঁচে, যা এক বানিয়ে-তোলা সংস্কৃতির ফটোকপি বিলি করে যায় প্রদেশে প্রদেশে; সর্বত্র একই মুখ, তাদের রেখায় কোনো স্বাতন্ত্র্য নেই যেন। এর ফলে ক্রমশ তার নিজের জীবন আর নয়া এই ‘কাস্টোমাইজড’ জীবনের স্মৃতির ভিতর ব্যবধান বাড়তে থাকল হু-হু করে। এই একলা মানুষের যেন দেশভাগ নেই, দুর্ভিক্ষ নেই, বন্যা নেই, মহামারী নেই, আন্দোলন নেই, উত্তরাধিকার নেই, প্রিয়জন বিচ্ছেদ নেই। যেন অযোনিসম্ভূতা এসেছে সে শুধু পণ্যায়নের নৌকাবিলাসে ক্ষণিকের রঙ্গে মজে থাকতে। এই সুযোগে সে যেন খেয়াল করেও ধরতে পারছে না একে একে কীভাবে লুট হয়ে যাচ্ছে তার প্রকৃতি, প্রকৃতির সম্পদ, তার মানবিকতা, মৌলিক অধিকার এবং বেঁচে-থাকার ন্যূনতম স্বাধীনতাটুকুও। এক চূড়ান্ত অসহায়তা তার শিরদাঁড়া পেঁচিয়ে মাথায় উঠতে থাকে। কিন্তু এই অসহায়তার মারাত্মক স্বরূপ এই যে, অসহায় জেনেও তা স্বীকার নয়, ক্রমশ অস্বীকারের জায়গায় যেতে প্ররোচনা জোগায় তা। ফলে, কিছুতেই সমষ্টি আর গড়ে ওঠে না। মিলেমিশে একটা পণ্ডের জীবন যেন পরিবেশিত হতে থাকে ধনতন্ত্রের ভোজসভায়। এই যে বিপন্নতা ও বিপর্যয়, যা বাঙালির জীবনেও নেমে এল, তার বিপ্রতীপ অবস্থান কী? এই সময়ের অনেক লেখকই সে উত্তর খুঁজছেন। কেউ লিখছেন বদলে যাওয়া গ্রামের কথা। সেই ভেঙে পড়া দৃশ্যকল্প যদি আমাদের বিদ্ধ করে, এই প্রত্যাশায়। কেউ আবার এই পণ্যসভ্যতার দিকে ছুড়ে দিছেন বিদ্রূপ, কেউ-বা এই নয়া ঔপনিবেশিকতা থেকে বেরোতে তাঁদের নিজেদের গল্প বলছেন খানিকটা কুহকের আড়াল নিয়ে। তমাল রায়-ও নিজের মতো করে এই উত্তর খুঁজেছেন। তাঁর অনুসন্ধানের অভিমুখ আলোকপ্রাপ্তির ইতিহাসের দিকে।বাঙালি মনীষার বেশ কয়েকজনকে তাই তিনি আখ্যানে তুলে নিয়ে একটি অভিজ্ঞান অঙ্গুরীয় রচনা করতে চাইছেন। চাইছেন, অর্থের নিরিখে মেপে দেওয়া সফলতার মানদণ্ডটিকে অস্বীকার করতে? সেখানে তাঁর অবলম্বন এই মনীষা। কালীপ্রসন্ন সিংহ-কে কি আমরা ভুলে যাব? যিনি কুবেরের ধন আগলে রেখে সোনার তাল না করে বিলিয়ে দিলেন অকাতরে, এই সমাজের জন্য, এই সমাজের সূচীভেদ্য অন্ধকারে আলোক প্রবেশের জন্য, তাঁকে কি আমরা আজ অসফল ব্যর্থ মানুষ বলে অস্বীকার করব! যেহেতু আমাদের সমাজ পুনরায় পাঁকে পড়েছে, সেহেতু কি আমরা ভেবে নেব যে, সেদিনের সব আয়োজন প্রয়োজন বৃথা ছিল! নাকি, উত্তরাধিকারী হিসেবে ব্যর্থ আমরাই, এই গন্তব্যে পৌঁছাব! আমরা কি ভাবব না যে সিংহের যে তেজ আমাদের করতলগত হলেও হতে পারত তা আমরা হেলায় হারিয়েছি কোনো অজানা সম্মোহনে! তমাল রায় ঠিক এইখানে দাঁড়িয়েই তাঁর স্বেদ-রক্তের গল্প বলেন। আজ যখন, তথাকথিত সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অবসান হয়েছে, আজ যখন সমাজতন্ত্রের স্বপ্ন দেখাকেও একধরনের বিলাসিতায় প্রতিপন্ন করার চেষ্টা চলছে, আজ যখন দিকে দিকে সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রক্রিয়ায় বামপন্থী দলগুলির কর্মসূচি ভ্রান্ত প্রমাণিত হচ্ছে বারংবার, তখন সমালোচনামুখর দ্য গ্রেট ঋত্বিক ঘটককে কি একজন চলচ্চিত্র পরিচালকের বাইরে দার্শনিক হিসেবে পুনরাবিষ্কার করব না! আমরা কি ফিরে চাইব না আমাদের মদন তাঁতিকে! আজ যখন বিস্ময় নেই, কল্পনা নেই, কল্পনাহীন বলে নতুন সময়ের স্বপ্ন অব্দি নেই, আজ যখন কবিতা কেবল কন্টেন্ট হয়ে উঠছে তখন আমরা কি চাইব না র্যাবোর অগ্নিস্পর্শের অভিলাষ? এই প্রশ্নগুলো তমাল রায় করেননি। করেছে তাঁর গল্পেরা। গল্পের ভিতর বলে যাওয়া ইতিহাস। গল্পের অনুষঙ্গে জমে থাকা সময় যেন আজকের দিনকে প্রশ্ন করেছে, কেন আমরা এমন বেসামাল হয়ে পড়লাম! এত অগোছালো হয়ে পড়ার তো কথা ছিল না আমাদের।

গল্পের অনুষঙ্গে জমে থাকা সময় যেন আজকের দিনকে প্রশ্ন করেছে, কেন আমরা এমন বেসামাল হয়ে পড়লাম! এত অগোছালো হয়ে পড়ার তো কথা ছিল না আমাদের।

এর উত্তর কে দেবে? এখান থেকে লেখকের প্রস্থান, পাঠক এখন একা। গল্প ছেড়ে এক ধূসর জগতে প্রবেশ এবার তার। এই সংকলনের গল্পের অনেকখানি বরং আমাদের চেনা; এই উত্তরটিই বরং অচেনা, রহস্যময়, অস্পষ্ট এক সিঁড়ি। পাঠকের উত্তরণ সেই সিঁড়ি খুঁজে পাওয়ায়। সেই অর্থে এই যাত্রা এক ধর্মযুদ্ধও বটে। রিলিজিয়ন অর্থে নয়, ধর্মের প্রকৃত, সত্য এবং ব্যাপ্ত অর্থে। বিশেষত যখন ধর্মের মতো একটি বিষয় ও শব্দকে ডানা ছেঁটে সংকীর্ণ ন্যারেটিভে ঢুকিয় নেওয়া হচ্ছে, তখন তমাল রায়ের গল্পেরা আমাদের দিতে চায় স্বধর্মের ধারণা। এই সংকলনের গল্পেরা তাই আখেরে হয়ে উঠছে আমাদের স্টেটমেন্ট, আমাদের এই সময়ের এক অভ্রান্ত স্বর, যা বেঁধে দেওয়া মূলধারার শরীর থেকে সমস্ত উদাসীনতা মুছিয়ে দিয়ে প্রত্যাশা করে গণজাগরণ, নতুন সূর্যোদয়। এই সংকলনের অনেকগুলির গল্পের গায়ে অতীত লেগে থাকলেও তাদের গন্তব্য সেই নতুন দিনের ভোরেই

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

কবি জন্ম পশ্চিমবঙ্গে, থাকা কলকাতায়। বর্তমানে একটি প্রকাশনা সংস্থায় কর্মরত। লেখালেখির জগতে বিচরণ সর্বত্র। পড়তে, বই নিয়ে থাকতে ভালোবাসেন। প্রকাশিত বইসমূহ:

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।