শুক্রবার, অক্টোবর ২২

দক্ষিণে দারুণ যুদ্ধ, পেরেকে বিদ্ধ হচ্ছে কবি

0

যুদ্ধ মানেই শত্রু শত্রু খেলা,
যুদ্ধ মানেই
আমার প্রতি তোমার অবহেলা৷
—নির্মলেন্দু গুণ

মুক্তিযুদ্ধের সময় আবুল হাসান ঢাকাতেই অবস্থান করেন। কখনো মেসে, কখনো আত্মীয়-বন্ধুর বাসায়। হুমায়ূন আহমেদ সেবারে ফাইনাল পরীক্ষার্থী। হাসানের বাল্যপ্রেমিকা রাজিয়ার ডিপার্টমেন্টের বড়ো ভাই। কিন্তু হুমায়ূন অমিশুক। একেইতো ছেলে-মেয়েদের কথা বলতে গেলে তখনও শিক্ষকের অনুমতি নেওয়ার নিয়ম আছে, তাঁর উপর হুমায়ূন রাশভারী। পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আগেই রাজিয়া বাড়ি যাওয়ার জন্য হুমায়ূনের সাহায্য নিতে চান, কিন্তু তাঁর সাথে কথা বলার সাহস পাচ্ছেন না। সাহসের অভাবেই বিখ্যাত হস্তরেখাবিদ হুমায়ূনের কাছে হাত দেখানোও হয়নি তাঁর।

‘…আর যদি একটা গুলি চলে, আর যদি আমার লোকদের হত্যা করা হয়, তোমাদের কাছে আমার অনুরোধ রইল; প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যা কিছু আছে তা-ই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে সবকিছু— আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি— তোমরা বন্ধ করে দেবে। আমরা ভাতে মারব। আমরা পানিতে মারব। … তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো। মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরও দেব, এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশা-আল্লাহ।

এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’

সাতই মার্চ বঙ্গবন্ধু আগুন ঝরানো স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেন—

‘…আর যদি একটা গুলি চলে, আর যদি আমার লোকদের হত্যা করা হয়, তোমাদের কাছে আমার অনুরোধ রইল; প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যা কিছু আছে তা-ই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে সবকিছু— আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি— তোমরা বন্ধ করে দেবে। আমরা ভাতে মারব। আমরা পানিতে মারব। … তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো। মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরও দেব, এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশা-আল্লাহ।

এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’

আন্দোলন থামানোর জন্য ইয়াহিয়া খান পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হিসেবে টিক্কা খানকে পাঠালেন। কোনো বাঙালিকে তারা আর বিশ্বাস করে না। ভাসানী আবার রং পাল্টালেন— বললেন, স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান চাই!

কারফিউ চলছে। মাঝে মধ্যে গোলাগুলি হচ্ছে। রংপুর শহরে গুলিতে মানুষ মারা গেল। স্কুল কলেজ কোর্ট কাচারি বন্ধ হয়ে গেল। ঝড় এসে যাচ্ছে। ছাত্র ছাত্রীরা অজানা আশংকায় হল ছেড়ে বাড়ি চলে যাচ্ছিল। হুমায়ূন আহমেদের ছোটো বোন শেফুও (সুফিয়া হায়দার) রোকেয়া হলের আবাসিক ছাত্রী। রাজিয়া শুনল শেফুরা হুলারহাট চলে যাচ্ছে। রাজিয়া গিয়ে শেফুকে ধরল, তোমরা বাড়ি যাবার সময় একসাথে লঞ্চে যাব। তোমার দাদাভাইকে বোলো প্লিজ। চাঁদপুরের দুই ছাত্রী, শেফু, রাজিয়ারা বরিশালের লঞ্চে উঠে গেল হুমায়ূনের নেতৃত্বে। ১৯৭১ সালে হুমায়ূন আহমেদ আর তাঁর পরিবার এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাবেন।

২৩ শে মার্চ পাকিস্তানের জাতীয় দিবস। সেদিন বঙ্গবন্ধু নতুন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। সেদিন সারা পূর্ব বাংলায় কোথাও পাকিস্তানের পতাকা উত্তোলিত হয়নি। টেলিভিশনে জামিল চৌধুরীরা রাত বারোটা পর্যন্ত ফাহমিদা খাতুনের কণ্ঠে ‘আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে’ বাজিয়েই চললেন, সাথে আরও দেশাত্মবোধক কোরাস গান। তাঁদের একটাই পণ ২৩ শে মার্চে কিছুতেই পাকিস্তানের পতাকা টিভির পর্দায় দেখাবেন না। ইতোমধ্যে ২রা মার্চ শিব নারায়ণ দাশের ডিজাইনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা নতুন দেশের পতাকা উত্তোলন করেছে আ স ম রবের নেতৃত্বে।

এদিকে পঁচিশে মার্চ রাতে সেই জিসি দেবের বাসায় কড়া নাড়ে পাক আর্মি। ব্ল্যাক আউটের মধ্যে তিনি একটি প্রদীপ হাতে দরোজা খুলে দেন। যে আলোকবর্তিকা হাতে তিনি জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে আসছিলেন, তা ওরা মাটিতে লুটিয়ে দিল। তাঁকে পৈশাচিক উল্লাসে হত্যা করে তাঁর লাশ টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গেল জগন্নাথ হলের মাঠে; প্রিয় ছাত্রদের সাথে গণসমাধিতে নিক্ষেপ করল।

২৫শে মার্চের কালো রাতে আবুল হাসান অসুস্থ হয়ে পড়লেন। পাগলা ইলিয়াস আবারও তাঁকে নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করালো। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে সে রাতে হাসান ঘুমাতে পারলেন না। বিছানায় শুয়ে শুয়ে শুনেছেন পাকিস্তানী বাহিনীর গোলাগুলির নারকীয় আওয়াজ। আমরা জানি জ্যোতিপ্রকাশের প্রশ্রয়ে জিসি দেবের বাসায় বসে বসে হাসান কবিতা লিখতেন, পড়াশুনা করতেন। এদিকে পঁচিশে মার্চ রাতে সেই জিসি দেবের বাসায় কড়া নাড়ে পাক আর্মি। ব্ল্যাক আউটের মধ্যে তিনি একটি প্রদীপ হাতে দরোজা খুলে দেন। যে আলোকবর্তিকা হাতে তিনি জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে আসছিলেন, তা ওরা মাটিতে লুটিয়ে দিল। তাঁকে পৈশাচিক উল্লাসে হত্যা করে তাঁর লাশ টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গেল জগন্নাথ হলের মাঠে; প্রিয় ছাত্রদের সাথে গণসমাধিতে নিক্ষেপ করল।

Mostaque Ahmed

ছবি : ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত

২৭ তারিখের পর কারফিউয়ের ফাঁকে নির্মল এসে বলে গেছেন, অসীম সাহা সে রাতে জগন্নাথ হলে ছিলেন না, তার রুমে ছিলেন কবি আবুল কাশেম। অসীমের বদলে কাশেম লাশ হয়ে ভেসে রইল পুকুরে। ‘এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়’-খ্যাত হেলাল হাফিজ ছিলেন না ইকবাল হলে। তাই পরদিন সকালে নির্মলের আলিঙ্গনে ধরা দিতে পারলেন। ইকবাল হলে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের দপ্তর ছিল বলে পাকিস্তানীদের ক্ষোভ ছিল। আর জগন্নাথ হলের হিন্দু ছাত্র আর প্রভোস্টকে মেরে ফেলার যুক্তি হিসেবে ওখানে অস্ত্রাগার আছে বলে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল ওরা। কিন্তু হুমায়ুন কবির কোথায়? আর শশাঙ্কটা? ঢাকা শহর ইতোমধ্যে শ্মশান। রক্তগঙ্গা বয়ে গেছে বিশ্ববিদ্যালয়, পুলিশ লাইন, পিলখানাসহ আবাসিক এলাকাগুলোতেও। পাকিস্তানী সেনাবাহিনী তখন অন্যান্য শহর ও গ্রামে হামলার পরিকল্পনা করছে। অধ্যাপক ফজলে রাব্বী হাসপাতালে আহতদের চিকিৎসা নিয়ে প্রচণ্ড ব্যস্ততার মাঝেও হাসানকে দেখতে আসেন। তাঁর মুখ থম থম করছে। আহমদ রফিকের বাবা ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি। তাঁকে দেখে ফজলে রাব্বী বললেন, ‘আপনি সরে যাচ্ছেন না কেন?’ আহমদ রফিক বললেন, ‘বাবাকে এ অবস্থায় রেখে কীভাবে যাব?’ ফজলে রাব্বী বললেন, ‘ভালো দেখে একটা জায়গা দেখেন, যেখান থেকে যোগাযোগটাও রাখা যাবে। আমি আর আলীমও একটু সরে থাকতে চাই। কিন্তু এদিকটা কে সামলাবে?’

কবি আবুল হাসানের প্রতিকৃতি এঁকেছেন রেইনহার্ট হেভিক

পনেরই ডিসেম্বরে শহীদ হবার আগ পর্যন্ত তিনি গোপনে গোপনে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা ও সার্বিক সাহায্যে কাজ করে যাবেন।

৩১ শে মার্চ কাকডাকা ভোরে কয়েকটি ট্যাঙ্ক ছুটে এলো ‘দৈনিক সংবাদ’ অফিসের দিকে। এসেই ঠা ঠা ছুঁড়তে লাগল গুলি। তারপর আগুন। দাউদাউ করা আগুনে দগ্ধিভূত হলো ‘সংবাদ’ অফিস আর ভেতরে থাকা একজন মানুষ। আগুনের লেলিহান শিখায় আর সবকিছুর সঙ্গে পুড়ে অঙ্গার হয়ে যান শহীদ সাবের। তার আর কোথাও যাবার জায়গা ছিল না। এত সব দুসংবাদ শুনে হাসান ভীষণ নিরালম্ব বোধ করতে লাগলেন। রুগ্ন শরীরের কথা ভুলে দেশের এই ঘোর দুর্দিনে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে কাটানোর অসহায়ত্বে আরও মুষড়ে পড়লেন।

হাসপাতালে শুয়ে শুয়ে শৈশবের কথা মনে পড়ে হাসানের। হাসান তখন ছোট্ট টুকু। বিকেলে সবাই খেলার মাঠে। কিন্তু টুকু খেলতে যেতে পারে না। ওর জ্বর। প্রায়ই জ্বর হয়। একটু সুস্থ বোধ করলে নানার সাথে হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির কাছেই বর্ণির হাওরের দিকে চলে যায়। নানা মোহাম্মদ আবদুল গফুর মোল্লা কৌতুকপ্রিয় মানুষ। গল্প উপন্যাস পড়েন। টুকুর বাবা তখন ঢাকার মুন্সিগঞ্জে কাজ করেন; ওর দাদুবাড়ি পিরোজপুরে, বিখ্যাত দাড়িয়া বংশের বংশধর তাঁরা। তাঁদের বাড়ি দাড়িয়াবাড়ি নামেই পরিচিত। সবার নামেও দাড়িয়া শব্দটি যুক্ত করেই ডাকা হয়— যেমন আমির দাড়িয়া, আয়ুব দাড়িয়া। দাড়িয়াবাড়ির পূর্ব পুরুষেরা এসেছিলেন পার্শ্ববর্তী কোটালিপাড়া থেকে। মাঝখানে বিশাল বিল। দাড়িয়াকে কেউ বলেন ফারসি (দাহরিয়া) শব্দ, কেউ বলেন বাংলা শব্দ। স্থানীয় প্রবীণদের মতে এঁদের পূর্বপুরুষের কেউ দাঁড়িপাল্লার ব্যবসা করতেন— সেই থেকে দাড়িয়া; অন্য মত হচ্ছে দাঁড় বাওয়া থেকে দাড়িয়া কেননা পূর্বপুরুষ মাছ ধরতেন। যাহোক, সাতচল্লিশের দেশভাগের পর থেকে আলতাফ হোসেন ঢাকার আশেপাশেই চাকুরি করছেন।

টুকু আজানের সুললিত সুর শোনে। ওর কানে এসে লাগে সান্ধ্যকালীন শঙ্খধ্বনিও। সরজুদিদের শূন্য ভিটার পাশ দিয়ে ফিরতে ফিরতে বিষণ্ন বোধ করে। সরজুদিদের বাগান থেকে ডালি ভর্তি করে কত ফুল তুলেছে, সরজুদি ওকে কাপড়ের পুতুলও বানিয়ে দিয়েছেন।
‘নানাভাই, সরজুদিরা আর আসবে না?’
‘না নানাভাই, ওরা কোলকাতায় চলে গেছে।’
‘তাহলে ওরা বাবার মতো আবার ঢাকায় চলে আসবে?’

বর্ণির হাওরে আদিগন্ত জলরাশি। আর সবুজ প্রান্তর। হাঁসগুলো কোলাহল করতে করতে দলে দলে ফিরছে আজানের সুর ভেসে এলে নানা তাড়া দেন। টুকু আজানের সুললিত সুর শোনে। ওর কানে এসে লাগে সান্ধ্যকালীন শঙ্খধ্বনিও। সরজুদিদের শূন্য ভিটার পাশ দিয়ে ফিরতে ফিরতে বিষণ্ন বোধ করে। সরজুদিদের বাগান থেকে ডালি ভর্তি করে কত ফুল তুলেছে, সরজুদি ওকে কাপড়ের পুতুলও বানিয়ে দিয়েছেন।
‘নানাভাই, সরজুদিরা আর আসবে না?’
‘না নানাভাই, ওরা কোলকাতায় চলে গেছে।’
‘তাহলে ওরা বাবার মতো আবার ঢাকায় চলে আসবে?’
নানা প্রবোধ দিয়ে ঘরে ফিরেন। এরপর টুকু নিজেই উঠোনের পাশে একটা ফুলের বাগান করে ফেলে।
নানার সাথে বসে নামাজ পড়তে থাকে টুকু। নামাজের পর নানা কুরআন শরীফ নিয়ে বসেন। তাঁর ক্বিরাতের সুর হাসানকে অপার্থিব আচ্ছন্নতায় ঘিরে রাখে। নিজেও গুন গুন করতে থাকে। কিছুদিন পর নিজেও সুন্দর কণ্ঠে কুরআন তেলাওয়াত করতে পারে। নাতির কুরআন রপ্ত করার আগ্রহ দেখে গফুর মোল্লা তাকে একটা বাংলা কুরআন শরীফ এনে দেন। অর্থ জানলে কুরআন আত্মীকরণ করতে সহজ হবে।

গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার বর্ণি গ্রাম ছিল হিন্দু মুসলমানের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে সমৃদ্ধ সামাজিক-সাংস্কৃতিক পীঠস্থান। হাসান মন্ত্রমুগ্ধের মতো যেতেন যাত্রার আসরে, শুনতে পেতেন উপনিষদ বা রামায়ণের পাঠ। গিয়েছেন কীর্তনের আসরেও কখনো কাছের সিংগারকুল বা সিমলা গ্রামে। একাত্তর সালে হাসানের ঝনঝনিয়ার বাড়িতে ছিলেন ছোটো বোন বুড়ি (হোসনে আরা খানম)। তাঁর স্মৃতিচারণায় দেখি, পিরোজপুরের সেই গ্রামেও অসাধারণ সামপ্রদায়িক সমপ্রীতি ছিল— ‘আমি যখন ক্লাস ফাইভে পড়ি, আব্বা ঢাকার দৌলতপুর থানা থেকে আমাদের গ্রামের বাড়িতে নিয়ে আসেন। গ্রামের চারিদিকে ছিলো সবুজের সমারোহ। পাশে বয়ে চলেছে নদী মধুমতি। আর মধুমতির কোল ঘেঁষে একটি ছোট্ট অথচ গভীর খাল চলে গেছে আমাদের বাড়ির পাশ দিয়ে। হিন্দু-মুসলমান একসাথে ওঠাবসা। সবার মধ্যে সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন ছিলো সুদৃঢ়। অনেক হিন্দু সমপ্রদায়ের মানুষজন আমাদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিল। পুরুষেরা যুদ্ধে আর মহিলারা সন্তানকে নিয়ে আমাদের বাড়িতে। শাঁখা খুলে, সিঁদুর মুছে আমাদের সাথে বসবাস করে। এমনকি যুদ্ধের সময় আমাদের খাল দিয়ে মিলিটারিরা গানবোটে করে যেতো কিন্তু ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করতে পারেনি যে আমাদের বাড়িতে ওরা আশ্রয় নিয়েছে। এমনই ছিলো ভালোবাসার বন্ধন। অবশ্য এখন সেদিন আর নেই। মাটির সোঁদা গন্ধও নেই, মানুষের মনে কোমলতা আর প্রাকৃতিক পরিবেশের সৌন্দর্যও নেই।’ অথচ, খুব কাছাকাছি এলাকায় হুমায়ূন আহমেদের পরিবারে নেমে এসেছিল মহা দুর্যোগ। যুদ্ধের শুরুতে পলিমার কেমিস্ট্রি বই সরিয়ে রেখে হুমায়ূন সেই ‘শঙ্খনীল কারাগার’ লিখে ফেলতে পেরেছিলান। আর যুদ্ধের শেষের দিকে মুক্তিযুদ্ধে সহায়তার অভিযোগে তাঁর বাবাকে পাকিস্তানী আর্মি রাজাকারদের সহায়তায় হত্যা করে।

সেই ঝনঝনিয়া! নিসর্গ ও সমপ্রীতির ঝনঝনিয়া। মাঝে মধ্যে মায়ের সাথে পিরোজপুরের ঝনঝনিয়াতে বেড়াতে গেলে দাদীমার মুখে গল্প শুনে সময় কাটতো বালক ‘টুকু’র। কবি দাদীমার কথা লিখেছেন, ‘আমাদের পরিবারের কালো গাইয়ের শাদা দুধের দুগ্ধবতী আমলে দাদীমার নিজের নামাজ পড়ার জন্য সূক্ষ্ম পশমি সুতোর লাল লতাপাতার কারুকাজ করা একটা জায়নামাজ আমি তার জলচৌকিতে পাতা দেখতাম। লোকশ্রুতি ওটা নাকি পারস্যের বিখ্যাত গালিচা বংশের অন্যতম। এক সময় দাদীমাকে দেখতাম উঠোনে ধান ছিটিয়ে কাক ডাকছে— ‘আয় কাক, আয়।’ কাককে খাবার দেওয়ার শৈশব স্মৃতি বুঝিবা উঠে আসে ‘একমাত্র কুসংস্কার’ কবিতায়—

আমার বোনটি বারান্দায় দাঁড়কাক ডাকলেই বলে ওঠে, ভাই—
গুনে গুনে সাতটি চাল ফেলে দে তো কাকটার মুখে ?
চালের গন্ধ পেয়ে দেখিস কাকটি উড়ে যাবে
আমাদের বিপদ আসবে না।

কবির দু’বছরের বড়ো ফাতিমা ফুফু শৈশবে আবুল হাসানকে লেখায় উৎসাহ দিতেন। ফুফু চমৎকার কুরআন তেলাওয়াত করতে পারতেন। ফুফুর কথাও বড়ো মনে পড়ছে এই নিঃসঙ্গ হাসপাতালে—

অবশেষে জেনেছি মানুষ একা!
জেনেছি মানুষ তার চিবুকের কাছেও ভীষণ অচেনা ও একা!
দৃশ্যের বিপরীত সে পারে না একাত্ম হতে এই পৃথিবীর সাথে কোনোদিন।
ফাতিমা ফুফুর প্রভাতকালীন কোরানের
মর্মায়িত গানের স্মরণে তাই কেন যেন আমি
চলে যাই আজও সেই বর্ণির বাওড়ের বৈকালিক ভ্রমণের পথে,

মনে পড়ে সরজু দিদির কপালের লক্ষ্মী চাঁদ তারা
নরম যুঁইয়ের গন্ধ মেলার মতো চোখের মাথুর ভাষা আর
হরিকীর্তনের নদীভূত বোল!
বড়ো ভাই আসতেন মাঝরাতে মহকুমা শহরের যাত্রাগান শুনে,
সাইকেল বেজে উঠত ফেলে আসা শব্দে যখন,

আর অন্ধ লোকটাও সন্ধ্যায়, পাখিহীন দৃশ্য চোখে ভরে!
দিঘিতে ভাসত ঘনমেঘ, জল নিতে এসে
মেঘ হয়ে যেত লীলা বৌদি সেই গোধূলিবেলায়,
পাতা ঝরবার মতো শব্দ হতো জলে, ভাবতুম
এমন দিনে কি ওরে বলা যায়—?
স্মরণপ্রদেশ থেকে এক একটি নিবাস উঠে গেছে
সরজু দিদিরা ঐ বাংলায়, বড়োভাই নিরুদ্দিষ্ট,
সাইকেলের ঘণ্টাধ্বনি সাথে করে নিয়ে গেছে গাঁয়ের হালট!
একে একে নদীর ধারার মতো তারা বহুদূরে গত!
বদলপ্রয়াসী এই জীবনের জোয়ারে কেবল অন্তঃশীল একটি দ্বীপের মতো
সবার গোচরহীন আছি আজও সুদূরসন্ধানী!
দূরে বসে প্রবাহের অন্তর্গত আমি, তাই নিজেরই অচেনা নিজে
কেবল দিব্যতাদুষ্ট শোনিতের ভারা ভারা স্বপ্ন বোঝাই মাঠে দেখি,
সেখানেও বসে আছে বৃক্ষের মতন একা একজন লোক,
যাকে ঘিরে বিশজন দেবদূত গাইছে কেবলি
শতজীবনের শত কুহেলি ও কুয়াশার গান!
পাখি হয়ে যায় এ প্রাণ ঐ কুহেলি মাঠের প্রান্তরে হে দেবদূত!

(পাখি হয়ে যায় প্রাণ)

এই কবিতায় মেঘদূতের প্রভাবও লক্ষ্যনীয়— ‘যেখানে নদীর ভরা কান্না শোনা যেত মাঝে মাঝে/ জনপদবালাদের স্ফুরিত সিনানের অন্তর্লীন শব্দে মেদুর!’

বর্ণির স্কুলে ক্লাস ফোরে উঠে একটি অনুষ্ঠানে প্রথম স্বরচিত কবিতা পাঠ করে টুকু। ক্লাস সিক্সে উঠে গোপালগঞ্জের হাই স্কুলে ভর্তি হলো টুকু। ক্লাস এইটে উঠে নজরুল জয়ন্তী অনুষ্ঠানে বেলায়েত হোসেনের লেখা ‘নজরুলকে দেখে এলাম’ নাটকে প্রমীলা নজরুলের ভূমিকায় টুকুর অভিনয় সবাইকে মুগ্ধ করে। ক্লাসের সেরা মেধাবী ছাত্র সে। হেড স্যার রুস্তম আলী মোল্লা টুকুকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখেন। আর নানা সাংস্কৃতিক যজ্ঞে যুক্ত করে টুকুকে স্বপ্ন দেখান আবদুল কুদ্দুস মিয়া।

টুকু ক্লাস নাইনে প্রথমবার ঢাকায় এসেছিল। বাবা তখন ঢাকা জেলায় চাকুরি করেন। টুকু উঠল বড়ো মামার গেণ্ডারিয়ার বাসায়। মামার বাসায় সাহিত্যের অনেক বইপত্র। টুকু আনন্দ নিয়ে বই পড়ে, লেখে। বড়ো মামার বাসায় ছোটো ভাইবোনেরা এলে পকেট থেকে সিকি বা আধুলিটা বের করে দিত— এই নে, চকলেট খাস!

তখনকার স্মৃতি মনে পড়ে— “আমদের তখন অল্প বয়স, ইচ্ছে হলেই যত্রতত্র দাঁড়িয়ে হাফ প্যান্টের ইলাস্টিক ফিতে শিথিল করে দেই, শহরের রাস্তাঘাটও একটু একটু চিনি। হাতে বাবার ঘড়িও লুকিয়ে লুকিয়ে পরি। চাই কি তখন মাঝে মাঝে ক্যাপস্টানের ‘সুগন্ধি শুখা’ রাখা কৌটা থেকে সিগ্রেট চুরি করেও, তখন আমাদের খেতে একটুও ভয় জাগে না— অর্থ্যাৎ সেই বয়সে তখোন আমরা পৌঁছে গেছি, যখোন সামাজিক ব্যাপার- স্যাপার দেখে দেখে সবাই ঝুঁকে পড়ে— আমরাও পড়েছিলাম। পাশের বাড়ির হারমোনিয়ামের ‘তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে’ তখোন আমরাও ব্যাডমিন্টন খেলতে খেলতে গাইতাম।”

এই পোলা তুমি এই হানে হান্দাইছো ক্যালা? মতলব কি?
আমি গান শুনছিলাম। অনেক রকমের গান শুনেছি। কিন্তু এই ধরণের গান কখনো শুনিনি তো…
আচ্ছা। কি কি গান আগে হুনছ, কও দেখি?

ম্যাট্রিক পরীক্ষার আগে আগে একটা ঘটনা ঘটে যায়। আরমানিটোলা স্কুলের এক শিক্ষকের বাসায় অঙ্ক করে হাসান সেদিন মামার রজনী চৌধুরী লেনের বাসায় ফিরছিল। সন্ধ্যা উৎরে গেছে। কোথা থেকে বাতাসে হাসনুহেনার ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়েছে। গলির মুখে ভিন্ন ধরণের একটা গান শুনতে পেয়ে দাঁড়াল সে। একটা বাড়িতে ঠুমরীর আসর চলছে আর সেই বাড়ির মালিক হাবীব সর্দার ধূমপানের জন্য বাগানে হাঁটছেন। হাসানকে একটা গন্ধরাজের ঝোপের আড়ালে দেখে ইশারায় ডাকলেন। মহল্লায় ইদানিং চুরি হচ্ছে। ছেলেটাকে একটু বাজিয়ে দেখা যাক। দৌড়ে যেহেতু পালায়নি, তাহলে সে মন্দ লোক নয়। হাসান এগিয়ে গেল।

এই পোলা তুমি এই হানে হান্দাইছো ক্যালা? মতলব কি?
আমি গান শুনছিলাম। অনেক রকমের গান শুনেছি। কিন্তু এই ধরণের গান কখনো শুনিনি তো…
আচ্ছা। কি কি গান আগে হুনছ, কও দেখি?
কীর্তন, গজল, নজরুল গীতি, রবীন্দ্র সঙ্গীত…
ভালোই হুনছ। তয়, এই গান কেমুন লাগতাছে?
অন্যরকম। সম্পূর্ণ অন্যরকম। এই গান এতোদিন কোথাও শুনিনি।
আইচ্ছা, ভিতরে আহো। গান হুনো।

গানের চাতক হাসান যেন মেঘ না চাইতেই জল পেল। হাসান সেই থেকে হাবীব সর্দারের বৈঠকখানায় ঠুমরী গায়িকা হাজেরা খাতুনের আসরে ডাক পায়। হাবীব সর্দার কেন যেন হাসানকে পছন্দ করলেন। হাজেরার স্নেহ থেকেও বঞ্চিত হলো না কিশোর হাসান। লখ্নৌ ঘরানার গায়িকা। হাসানের ভালো লাগে দাদরায় হাজেরা খাতুন কীভাবে রাধার আকুতি ফুটিয়ে তোলেন, আবার কাহারবায় কেমন রাধাকৃষ্ণের লীলা ফুটিয়ে তোলেন। প্রেম, বিরহ, বিবাদ, অপেক্ষা, অভিমান, অভিযোগ, মিলনের অভিব্যক্তিগুলো যথার্থ ফুটিয়ে তুলতেন হাজেরা। হাসানের মতো সমঝদার পেয়ে হাজেরা খুশি, হাবীব সর্দারও নবাব ওয়াজেদ আলী শাহের উদারতায় এক অপ্রত্যাশিত স্নেহের বাঁধনে বেঁধে ফেললেন হাসানকে।
হাজেরা খাতুন এখানে গান গাইতে এলেই হাসানকে খুঁজেন। আমরা জানি, হাসানের নাম তখন আবুল হোসেন।
আইচ্ছা সর্দার সাব, আপনার মহল্লার বৈজু বাওরা কুন হানে?
হুছেন মিয়ারে বৈজু বাওরা কইবার লাগছ ক্যালা?
দেখেন নাই, বৈজু বাওরা ফিলমে ছোটো বৈজু যখন ঘর ছাইড়া বাইর হয়, এক পুরুতের লগে যমুনা পাড়ের গ্রামে চইলা যায়…
হ, হ, গৌরী নাও বাইয়া নদী পার করাইলো…
এই পারে আইসাই তানসেনের নাম হুইনা আবার বিগড়াইয়া গেল, নদীত গিয়া পড়ল।
হ হ মনে আছে।
তখন গৌরী আইসা বৈজুরে পানি থিকা তুইলা কইল, এই পোলা তো এই হানে ডুবতে আইছে।
হুছেন মিয়া কি ডুবতে আইছে?
হুছেন মিয়া এই ঢাকা শহরে ডুবতেই আইছে। হুছেন বহুত বড়ো কলাকার হইব! শায়েরিতে সে বহুত তানসেনেরে হারাইয়া দিব!

হয়তো সেদিনই ঢাকা শহরে কবি হিসেবে তাঁর অভিষেক। প্রথম স্বীকৃতি! সে সময় ঠুমরীর আসর থেকে ফিরে আচ্ছন্ন অবস্থায় কবিতাও লিখে ফেলতেন,

নিটোল শরীর এক সান্ত্বনার কোমল গান্ধারে
পৌষের ফালি রোদে এক চিলতে হলুদ সকাল,
নাবিক সে খুঁজে ফেরে আলোর বাহক
বৃত্ত, ছন্দ, মাত্রার সুর।

(কোমল গান্ধার, মেঘের আকাশ আলোর সূর্য)

হাসপাতালে শুয়ে শুয়ে নির্মলের কথা ভাবেন, মনে কত অমঙ্গল আশংকা বন্ধুকে নিয়ে। সর্বহারার রাজনীতি করা শশাঙ্ক পালকে প্রতিপক্ষরা নির্মমভাবে হত্যা করেছে সাভারের দিকে কোথাও, সে খবর পেয়েছেন। নির্মলের না জানি কি হয়!

হাসপাতালে শুয়ে শুয়ে নির্মলের কথা ভাবেন, মনে কত অমঙ্গল আশংকা বন্ধুকে নিয়ে। সর্বহারার রাজনীতি করা শশাঙ্ক পালকে প্রতিপক্ষরা নির্মমভাবে হত্যা করেছে সাভারের দিকে কোথাও, সে খবর পেয়েছেন। নির্মলের না জানি কি হয়! কবিতার পাশাপাশি গদ্যও লিখতে থাকেন পত্র-পত্রিকায়, প্রিয় বন্ধুর জন্য স্মৃতিকাতর লেখাটি ‘যে যার স্বভাবে’ শিরোনামে পাক জমহুরিয়াতে একাত্তরের ফেব্রুয়ারির ৬ তারিখে ছাপা হয়। এই লেখাটিতে প্রাক্তন প্রেমও বুঝি এক ঝলক উঁকি দিয়ে যায়—

“ভার্সিটিতে ছিলাম ভালো। কি জানি কোন অলৌকিক অন্ধকার আলোর মতো সঠিক হয়ে বাজলো রক্তে। ছেড়ে দিলাম তার সোনালি করিডোর। কান্নার মতো দীর্ঘ অথচ সংক্ষিপ্ত স্বপ্নগুলো আমার সাযুজ্য পেলো না বলে বুঝিবা ছেড়ে দিলাম ছত্রবদ্ধ ভবিষ্যৎ। বাঁধতে পারলাম না তাকে তুমুল রঙ্গীন কোনো মলাটের মর্মার্থে। একটি বিষাদের উজ্জ্বল আক্রমণ যখন আমাকে পেয়ে বসলো, তখন ধীরে-ধীরে গুটানো মাঝির মতো নিজের নিয়তির নৌকা উজান পথে ইচ্ছার রশি দিয়ে টেনে যেতে থাকলাম। কোথাও কোনো পার নেই। সাথী নেই। সঙ্গী নেই। কারো সাথে গলা মিলিয়ে গলায় গলায় গাইতে পারি না। কিন্তু না, মিলে গেলো। ধীর মফঃস্বল দৃশ্যের মতো নমনীয় একটি লোক এলো। দেখা স্টেডিয়ামের মোড়ে। বললাম, কি করবেন? কবিতা লিখছেন দেখলাম পত্র-পত্রিকায়। কোথায় পড়বেন? ‘ভার্সিটিতে।’ মনটা দমে গেল। অন্তত একটা গুণটানার সঙ্গী চাই। টেপ রেকর্ডারের গানে সমভাবে ঘুরপাক খাওয়ার জন্য আরও একটি সমান বেদনা চাই। পরিশেষে তার ভর্তি। পরিশেষে তাঁর খোপায় গোলাপ খোঁজা। পরিশেষে নিজের বুকের ভিতর বাঘিনীর দাঁতের ধার পুষে সে নিষ্ক্রান্ত হলো। যেন একটি দুপুর এল আর একটি দুপুরের কাছে। হেঁটে হেঁটে ছায়ার তলা থেকে। অবশেষে দুই দুপুরের রোডের সমকোণে মিলে অপরাহ্নের মতো একাত্ম হলাম। থাকি এখানে ওখানে। টেপ রেকর্ডারের মতো গুটিয়ে যাই স্মৃতির ভিতর। মফস্বল ফিরতি দুজন। কিন্তু একাধিক স্বাতন্ত্র লুকিয়ে আছে দুই দরিদ্রের আস্তিনে। সব তুমুল, তুঙ্গ মানুষের মধ্যে, মহিলার মধ্যে বিচরণ করি; কিন্তু নই আমি তাদের কেউ। শুধু জানি, এইই আমার অবহিতি। এর থেকে দূরে যেতে পারবো না কখনও। তবুও তো বন্ধু, বিরচিত বাক্যে তাকে মনে হয়েছিল আমার আলোর মতো সঠিক। যখন চলি শহরের পথ দিয়ে দু’জন। মাঝে মধ্যে পকেটে পরিচ্ছন্ন পরিতাপ ছাড়া পয়সা বাজে না। স্মৃতি সম্ভাবিত সংগ্রহের মতো দুর্বল দেহ ধারণ করে আবার অন্ধিকভাবে দিনে একবার উপোস দিই। তবু দুজনে কবি বলেই একই রেখার মধ্যে একটি রাগিণী খুঁজে পেলাম। হোক নিহত সুখ, তবু দু’জন আছি কথাবার্তায়। পরস্পর পরিচিত বেদনায়। তাই ভালো লাগে উল্লোল জাগরণ। কত জায়গায় রাতবিরেতে ঘুরি। আড্ডা দিই। নিখুঁত সঞ্চয়ের মতো এঁকে অপরের নিঃসঙ্গতায় লেগে থাকি।…”

এদিকে নির্মলও ঢাকা ছাড়বার সময় বন্ধুর সাথে দেখা করে যেতে পারেননি। পাকে চক্রে তিনি কোলকাতায় গিয়ে পৌঁছেন।

হাসপাতাল থেকে হাসানের ছুটি হলো। কিন্তু কোথায় যাবেন এবার? ঢাকা শহর থমথমে। সন্ধ্যার পর থেকে কারফিউ। হাসান কিছুদিন মেডিকেল হোস্টেলেই সুকান্ত চট্টোপাধ্যায় আর মাসুদ আহমেদের রুমে থাকলেন। এরা মাঝে মধ্যে কবিতা নিয়ে শরীফ মিয়ার ক্যান্টিনে আড্ডা দিত বলে আগে থেকেই পরিচয় ছিল। এক পর্যায়ে হাসান ঢাকা মেডিকেল হোস্টেল ছেড়ে দেন। এপ্রিল মাসের শেষ দিকে শাহজাহান চৌধুরীর বাসায় এসে বললেন, ‘শাহজাহান আমি তোদের সঙ্গে থাকতে চাই। আমার হার্ট-এর প্রবলেম। মাঝে মাঝে বুকে ব্যথা হয়। শরীর খুব খারাপ।’
‘অবশ্যই থাকবি। তুই আমাদের এলার্ম ক্লক হবি!’

তিন বন্ধু কবি গোলাম সবদার সিদ্দিকী, কবি আবুল হাসান ও কবি মুহাম্মদ নূরুল হুদা

তখন তিন বন্ধু শাহজাহান চৌধুরী, কবি ও গীতিকার কে. জি. মোস্তফা আর সংবাদ-এর বিনোদন বিভাগ প্রধান হারুনুর রশীদ খানের সাথে মগবাজার-এর পেয়ারাবাগ রেললাইনের উত্তর দিকে একটা বাসা ভাড়া করে থাকেন। তারপর থেকে আবুল হাসান তাদের সাথে রয়ে গেলেন। তাঁরা একই বিছানা, একই লেপ ব্যবহার করতেন। হাসান ভোর রাতে বসে বসে কবিতা লিখতেন। মাঝে মাঝে তখন গোলাগুলির শব্দ হতো। পরিবেশটা তখন কেমন বিজাতীয়। হাসান, কে জি মোস্তফাকে বললেন, “মোস্তফা ভাই আপনার ‘তোমারে লেগেছে এত যে ভালো চাঁদ বুঝি তা জানে’ গানটা কি আজকের চাঁদের আলোতে কেমন নিরর্থক হয়ে যাচ্ছে নাকি এই এত ভালো লাগার রাতগুলোকে আবার ফিরিয়ে আনার প্রেরণা দিচ্ছে?”
কে জি মোস্তফা বললেন, ‘তোমার মতো একজন প্রেমিক কবি যে যুদ্ধের ডামাডোলের মধ্যেও গানটা মনে করেছে, এটাই আমার গানের স্বার্থকতা!’
আবুল হাসান রাত জেগে ঘণ্টার পর ঘন্টা গভীরভাবে ধ্যানস্থ অবস্থায় বসে কবিতা লিখতেন, আর ছিঁড়তেন। লেখা পছন্দ হলে মুখে একটা স্বর্গীয় হাসি ফুটে উঠত।

আবিদ আজাদকে হাসান খুব স্নেহ করতেন। সুমন নামেই তাকে ডাকতেন। একাত্তর সালে কবির ঢাকা-অবস্থান আবিদ আজাদের স্মৃতিতে ধরা আছে এভাবে—

‘৭১ এর মে-র দিকে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে ছড়িয়ে পড়া আমরা এসে আবার মিলতে লাগলাম একটি ছিন্নমূল সূত্রে। মেঘের মতো শরিফ মিয়ার ক্যান্টিনে জড়ো হলাম আমরা। তখন আবুল হাসান ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের আরেকটি মেসে তার কয়েকজন বন্ধুর সাথে থাকে। আমিও জুটে গেলাম তার সাথে। সে সময় সে কিছুদিন শাহজাহান চৌধুরীর সাথে পেয়ারাবাগের মেসেও ছিলো। নামে মাত্র বিশ্ববিদ্যালয় খুলেছে। ছাত্র নেই খুব একটা। ভাঙ্গা আড্ডাগুলো জোড়া লাগছে না। বন্দুক, গুলি, মৃত্যু ও আতঙ্কের মধ্যে শুরু হলো আমাদের নরক গুলজার করা কীটের জীবন। বন্দিত্বের মধ্যে উইপোকার মতো আমরা যেন মাটির ভিতরে পথ কেটেছি পরস্পরের দিকে। দুঃসময় মিলিয়ে দিল আমাদের প্রাণের আলোয়। এই বন্দিকালের ভেলায় আমরা সঙ্গী হলাম নিঃসঙ্গের। যেটুকু দূরত্ব ছিল ঘুচে গেল অবলীলায়। আমার সে সময়কার দৈন্যদশার তুলনা হয় না। আবুল হাসানের প্যান্ট পরেছি, শার্ট গায়ে দিয়েছি। হাসানের নিজেরও কোনো চাকুরি ছিল না তখন। লেখলেখির টাকায় চলতো। সে সময় হাসানের অ-কবি বন্ধুরাই ছিল ওর নির্ভর। কবিতার স্বপ্নের লালচুল চোখে-মুখে ছড়িয়ে না পড়লে অকর্মন্য সময় এমন সুন্দর হয় না বুঝি কোনোদিন। আমি আমার অসহায়ত্ব সেদিন ভাগ করে নিয়েছিলাম কোনো সমকালীন কবিবন্ধুর সঙ্গে নয়, অগ্রবর্তী দশকের এক কবির সঙ্গে। ঢাকা এবং আবুল হাসান আমার জন্য হয়ে উঠলো একমাত্র নির্ভর।’

হাসান সুমনের কাছেই খবর পেলেন আফজাল চৌধুরী নাকি আলবদর বাহিনীতে যোগ দিয়েছে। রফিক আজাদ রণাঙ্গণে গেছেন, কাদেরিয়া বাহিনীর হয়ে অস্ত্র হাতে গেরিলা যুদ্ধ করছেন। সখিপুরে আছেন তিনি। আর এক বন্ধুস্থানীয় কবি নাকি যুদ্ধ থেকে দলছুট হয়ে ফিরে এসে রফিক আজাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়েছে! হাসান সুমনকে বললেন, ‘রফিক ভাই যদি রণাঙ্গন থেকে একটা বই ছাপাতে পারতেন! বিরাট একটা ঘটনা হতে পারত!’
সুমন জিজ্ঞেস করল, ‘সেখানে প্রেস পাবেন কোথায়?’
হাসান বললেন, “শোনো সুমন, আমাদের হয়তো সেই পরিবেশ নাই। ঢাকা শহরেও আর আড়াল নাই। স্পেনে কি হয়েছিল শোনো; গৃহযুদ্ধের শুরুতেই জাতীয়তাবাদী মিলিশিয়ারা লোরকাকে মেরে ফেলল। কবিদের অধিকাংশই সেই ক্ষোভে সোশালিস্ট। কবিরা যুদ্ধের মাঠে। ম্যানুয়েল নামে এক সৈনিক কবি যুদ্ধক্ষেত্রের কাছাকাছি একটা প্রেস বসালেন। সৈনিকদেরকে কম্পোজ করা শিখালেন। কাগজ তো নাই। পরিত্যাক্ত একটা কারখানায় শত্রুপক্ষের ছেঁড়া পতাকা, মৃত সৈনিকের রক্তাক্ত পোশাক থেকে শুরু করে হাতের কাছে যা পাওয়া গেল তাই দিয়ে কাগজের মণ্ড বানানো হলো। আকাশ থেকে বোমা পড়ছে। বাতাসে বারুদের গন্ধ। এর মধ্যেই আগ্নেয়াস্ত্র পিঠে বেঁধে চলছে কম্পোজ। ছেপে বের হলো পাবলো নেরুদার ‘প্রাণের স্পেন’!”

হাসানের সাথে একদিন সায়েন্স ল্যাবরেটরির শামসুল আলমের দেখা হলো। আবু বাকারের মাধ্যমে পরিচয় ছিল। শামসুল আলম নিজেও ‘প্রত্যয়’ নামে সাহিত্য পত্রিকা বের করেছেন, আবু বাকারের সাথে নাটকের সূত্রেও পরিচয়। হাসানকে খুব পছন্দ করতেন। তিনি জোর করেই হাসানকে তাঁর গ্রিন রোডের ল্যাবরেটরির কোয়ার্টারে নিয়ে গেলেন। সেখানে আরও দুজন অপরিচিত তরুণ উঠেছে।

আমরা ইতোমধ্যেই জানি, হাসান মাঝে মধ্যে টেলিভিশনে কবিতা পাঠের অনুষ্ঠান করতেন। এইভাবেই প্রযোজক কাজী আবু জাফর সিদ্দিকীর সাথে আলাপ। তাঁকে তিনি একটি নাটক লিখে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সেদিন রাতে হাসান স্বপ্নে দেখেছিলেন একটি রেলস্টেশনে কয়েকজন তরুণ তরুণী। ওরা কোথাও বেড়াতে যাচ্ছে। এক আগন্তুক যুবক ওদের কথাবার্তা শুনছিল। শেষে সে অবাক হয়ে লক্ষ্য করল ওরা কেউই এক গন্তব্যে যাচ্ছে না। সবার গন্তব্য ভিন্ন, কেউ সমুদ্রে যাবে, কেউ পাহাড়ে যাবে, কেউ মফঃস্বলে নিজের বাড়ি যাচ্ছে, কেউবা কোথাও যাবে না। আগন্তুকের কাছেই নাটকের নায়িকা ধরা দেয়, কিন্তু সেই নায়িকা বসবাস করে একটা পারদ-লেপা আয়নার মধ্যে। ঘোরের মধ্যে হাসান লিখে ফেললেন মাটি-মানুষ, প্রেম-ভালোবাসা, সৌন্দর্য-ঐতিহ্য, আলো-অন্ধকারে মেশা ছোট্ট একটি কাব্যনাট্য। নাম দিলেন ‘ওরা কয়েকজন’। নাটকটি জমা দিয়ে টেলিভিশন থেকে টাকাও পেয়েছিলেন। তারপর কি মনে হতে পরিবর্তন-পরিবর্ধনের জন্য ফেরত নিয়ে এসেছিলেন। এই ছোট্ট কাব্যনাট্যটির মধ্য দিয়ে তিনি একটা বহুস্তরবিশিষ্ট আখ্যান বলে যেতে চেয়েছেন। তারপর তো অসুস্থতার জন্য আর লেখাটি ধরা হয়নি। কাব্যনাট্যটি সাথে আছে। মাঝে মধ্যে কাটাছেঁড়া করেন। মনে মনে এমন একটা পিকনিকে কয়েকজন বন্ধুকে হাজির করতে চান যেখানে পিকনিকের আনন্দ শেষে ফেরার পথে এক সাঁকোর নিচের জলে সবার মুখের প্রতিচ্ছবি ধরা পরবে, যেখানে পরস্পরের জন্য শুধু অপরিসীম ঘৃণা আর বিদ্বেষ ফুটে উঠতে দেখা যাবে। ‘বনভূমির ছায়া’ কবিতায় ভাবনাটি লিখে উঠতে পারলেও এই ভাবনাটি নাটকে রূপান্তর করতে পারেননি। হাসপাতালে একদিন ইলিয়াসের আনা খাবার খেতে গিয়ে নিউজপেপারের ঠোঙ্গার কাগজে বিজ্ঞান অনুষদের পুরনো পিকনিকের ছবিতে দেখেন তাঁর প্রাক্তন প্রেমিকার সাথে এক সানগ্লাস পরা বিদেশি সিগারেট হাতে এক লোক হেসে হেসে কথা বলছে। বুকের কাছটা চিন চিন করে উঠল— ‘ঐ লোকটা কে?’ অগত্যা ‘বদমাশ, স্টুপিড’ ইত্যাদি গালি দিয়ে কবিতা লিখে তাৎক্ষণিক ক্ষুব্ধ কবিতার জন্ম হয়ে গেল। কিন্তু ‘ওরা কয়েকজন’ কাব্যনাট্যে সবকিছু আর গুছিয়ে বলতে পারছেন না। যা মাথায় ঘুরছে তা লিখতে গিয়ে যে বেদনার ভার বইতে হবে, কিছুতেই তা গ্রহণ করার সাহস করলেন না। চটের থলের নিচে লেখাটি চালান করে দিলেন। এর পর ‘পরিস্থিতি’ নামেও টেলিভিশনের জন্য একটি নাটক লিখেছিলেন। নাটকটি ছিল শান্তিকামী ও পরিবেশবাদী।

এক সময় তরুণ বা যুবকদের জন্য মেসে থাকা কঠিন হয়ে পড়ল। স্থানীয় রাজাকার বাহিনীর সদস্যদের বশ্যতা বা আনুগত্য স্বীকার না করলে প্রাণনাশ হওয়াটা তখন স্বাভাবিক। শহর ওদের দখলে। শামসুল আলম ভাইয়ের গ্রিন রোডের মেসে হাসানের সাথে যে দুজন তরুণ ছিল, ওরা ছিল ক্র্যাক প্লাটুনের গেরিলা

এক সময় তরুণ বা যুবকদের জন্য মেসে থাকা কঠিন হয়ে পড়ল। স্থানীয় রাজাকার বাহিনীর সদস্যদের বশ্যতা বা আনুগত্য স্বীকার না করলে প্রাণনাশ হওয়াটা তখন স্বাভাবিক। শহর ওদের দখলে। শামসুল আলম ভাইয়ের গ্রিন রোডের মেসে হাসানের সাথে যে দুজন তরুণ ছিল, ওরা ছিল ক্র্যাক প্লাটুনের গেরিলা। সে খবর জানাজানি হয়ে যাওয়াতে, আর তিন তলায় মতিন নামের একজন মুক্তিযোদ্ধা থাকেন সেটাও প্রকাশ হয়ে যাওয়াতে অফিসের চাপে শামসুল ভাই নিজেই সেই বাস ছেড়ে দিয়েছেন। হাসান পুরান ঢাকায় এক আত্মীয়ের বাসায় গিয়ে উঠলেন। একদিন ঝনঝনিয়া চলে যাবেন কি যাবেন না ভাবতে ভাবতে অনির্দিষ্টভাবে হাঁটতে হাঁটতে পুরান ঢাকার বিভিন্ন রাস্তা ঘুরে হাসান দেখতে পান পাকিস্তানী সেনাবাহিনী আর তাদের দোসরদের ধ্বংসের চিহ্ন। হাসানের বুকটা হু হু করে ওঠে, ক্রোধও জমে ওঠে। পাটুয়াটুলিতে সওগাত প্রেসের সামনে যখন নিজেকে আবিষ্কার করেন, তখন দেখেন একটি খাটিয়াতে মৃতদেহ নিয়ে ছোটোখাটো একটি মিছিল যাচ্ছে। হাসানের কানে আসছে মাঝে মাঝে উচ্চৈঃস্বরে ধ্বনিত ‘আশহাদু আল্লাহ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু…’; মানুষগুলো পাথরের মতো মুখ করে যেনবা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কালেমাগুলো উচ্চারণ করে যাচ্ছিল। কর্পূরের ঘ্রাণে শোকসন্তপ্ত শীতল পরিবেশ। হাসান নিজেও কালেমা উচ্চারণ করতে করতে কবরস্থান পর্যন্ত শবযাত্রীদেরকে সঙ্গ দিলেন। বিহ্বল অবস্থায় হাসান সদরঘাট পৌঁছে যান। হয়তো অবচেতনে দেশের বাড়ি তাঁকে টানছিল। টার্মিনালে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছেন। হাসানের হাতে একটি পোঁটলায় নারকেল তেলের বোতল, ঘাড়ে ঝোলা। নারকেল তেলটা ছোটো বোন বুড়ির জন্যে নিয়েছিলেন। আদর করে ওর নাম দিয়েছেন কেয়া। হাতের পোঁটলাটা পেট্রোল বোমাজাতীয় কিছু ভেবে পাতাল ফুঁড়েই যেনবা দুই পাকিস্তানী সৈন্য উদয় হয়ে হাসানকে টেনে হিঁচড়ে রাস্তার মাঝখানে নিয়ে উর্দু ভাষায় কিছু বলছিল, যার বিন্দু বিসর্গ বুঝবার মতো মানসিক অবস্থা হাসানের ছিল না। কোনোক্রমে বলতে পেরেছিলেন, হাম বিমার হু, ম্যায় শায়ের হু। ওদের কানে সে কথা পৌঁছল কিনা কে জানে। একজন প্রহার করছিল, আরেকজন উল্টাপাল্টা লাথি দিচ্ছিল। একজন একটু সদয় হয়ে বলল, কালেমা তামজিদ বলতে পারলে ছেড়ে দিবে। হাসান ‘সুবহানআল্লাহি’ বলতে বলতে রাস্তায় লুটিয়ে পড়ে জ্ঞান হারালেন। অপরিচিত কোনো সহৃদয় মানুষ হাসানকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছে দিলেন। হুমায়ুন কবির ঘটনাটা জানতে পেরে একদিন রাস্তায় দেখা হতে আবু বাকারকে জানায়। বাকার এই খবর আগেই জেনে গিয়েছিল শামসুল ভাইয়ের কাছ থেকে। কিন্তু তা প্রকাশ করল না। বরং হিমুর ভাষ্যটা শুনল আর হিমুর মধ্যে ঘটে যাওয়া পরিবর্তনটুকু লক্ষ্য করতে লাগল। হিমু তাকে সেদিন যেভাবে লুকিয়ে লুকিয়ে মালিবাগের এক বাসায় নিয়ে গেল, আর শশাঙ্কের বরিশালে অবস্থানের কথা জানিয়ে বলল, ‘আজ রাতে আমিও বরিশাল চলে যাচ্ছি’, তাতে আবু বাকারের সন্দেহ বদ্ধমূল হয়ে গেল যে হিমু কোনো না কোনোভাবে মুক্তিযুদ্ধে জড়িয়ে গেছে।

যারা হাসানের প্রতি এই অত্যাচারের কথা শুনেছেন, সকলেই একমত যে এই ঘটনা তাঁর অসুস্থ শরীরে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছিল।

যারা হাসানের প্রতি এই অত্যাচারের কথা শুনেছেন, সকলেই একমত যে এই ঘটনা তাঁর অসুস্থ শরীরে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছিল।

হাসপাতালে চেতনা ফিরে এলেও সেই মৃতদেহ বহনকারী খাটিয়া চোখে ভাসে হাসানের। বাহকদের কাঁধে বাহিত হয়ে কেবলমাত্র শবদেহকে জায়গা দেয়াই এই খাটিয়ার কাজ। দেখতেও খাট বা পালঙ্কের চাইতে আলাদা। নারিন্দার সেই নির্জন মসজিদের বারান্দায় এরকম একটি খাটিয়াকে একাকী অপেক্ষা করতে দেখেছিলেন। কয়েকদিন পর হাসান স্বপ্নেও সেই খাটিয়ার দেখা পেলেন। চারপাশে অনেক মোমবাতি জ্বলছে। খাটিয়ার পিছনে একটা উজ্জ্বল আলোর বলয়। কর্পূরের ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়েছে। সবার চাইতে আলাদা এই খাটিয়া— পৃথক এক পালঙ্ক!

কয়েকদিন পর হাসান স্বপ্নেও সেই খাটিয়ার দেখা পেলেন। চারপাশে অনেক মোমবাতি জ্বলছে। খাটিয়ার পিছনে একটা উজ্জ্বল আলোর বলয়। কর্পূরের ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়েছে। সবার চাইতে আলাদা এই খাটিয়া— পৃথক এক পালঙ্ক!

ডিসেম্বরে হাসান আর আবিদদের রাত্রির আস্তানা বদল হতে হতে ১৩ কি ১৪ তারিখ নাগাদ তারা আটকা পড়লেন গিয়ে কলাবাগানে, শাহাদাত বুলবুলের মেসে। সন্ধ্যার আগেভাগে তারা কলাবাগানের ঐ মেসে গিয়ে হাজির। আবুল হাসান জামাকাপড় ছেড়েই রেডিও নিয়ে বসে গেলেন। চিৎকার করে বললেন, ‘শোন সুমন, বুলবুল! চরমপত্রে মুকুল ভাই কি বলতেছে, পিঁয়াজির দল গাবুইয়া মাইর খাইয়া নাকি আত্মসমর্পণের কথা চিন্তা করতেছে!’ স্বাধীন বাংলা বেতার হয়ে আকাশবাণী, বিবিসি— সব শেষ করে সবাই মিলে খেতে বসলেন। পরদিন প্রচণ্ড বিমান হামলার আকাশ মাথায় নিয়ে দুজনে বেরিয়ে পড়লেন। আবুল হাসান গেলেন গেণ্ডারিয়ায়, আবিদ আজাদ গেলেন বোনের বাসায়, কমলাপুর।


পাঠসূত্র এবং ভাবনা সূত্র

বইপত্র
আবুল হাসান, বিশ্বজিৎ ঘোষ, জীবনী গ্রন্থমালা, বাংলা একাডেমি
আবুল হাসান সমগ্র, বিদ্যাপ্রকাশ
মহাজীবনের কাব্য (আত্মজীবনী গ্রন্থত্রয়ী), নির্মলেন্দু গুণ, কথাপ্রকাশ
সানজিদা খাতুন, সহজ কঠিন দ্বন্দে ছন্দে, নবযুগ
একাত্তর এবং আমার বাবা, হুমায়ূন আহমেদ, সময়
জোছনা ও জননীর গল্প, হুমায়ূন আহমেদ, অন্যপ্রকাশ
কবিদের কবি, গাজী আজিজুর রহমান, বাংলা একাডেমি
আবুল হাসানের নাটক, মোহাম্মদ জয়নুদ্দিন, মূল্যায়ন, শওকত হোসেন সম্পাদিত
বীরের এ রক্তস্রোত মায়ের এ অশ্রুধারা, রফিকুল ইসলাম, বাংলা একাডেমি
একাত্তরে ঢাকার মানু, আবু বাকার, জ্যোতি প্রকাশ
কবিতার ঘর ও বাহির, পূর্ণেন্দু পত্রী, প্রতিভাস

পত্রপত্রিকা
আবুল হাসান : তাঁর প্রথম কবিতা, জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত, শালুক
আমার বন্ধু অমর কবি আবুল হাসান, শাহজাহান চৌধুরী, শালুক, ওবায়েদ আকাশ সম্পাদিত

অনলাইনের লেখাপত্র
কালাম আজাদ, একাত্তরের শহীদ বুদ্ধিজীবী শহীদ সাবেরের জীবন ও জগৎ

কথাবার্তা
হোসনে আরা খানম, অমি রহমান পিয়াল, কাওসার মাসুম

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

জন্ম ৪ জানুয়ারি ১৯৬৮। মূলত কবি। আটটি কবিতার বই ছাড়াও লিখেছেন ছোটোগল্প, প্রবন্ধ, স্মৃতিপাঠের বই। পেশাগত জীবনে জনস্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করেন। প্রকাশিত কবিতার বই : সড়ক নম্বর দুঃখ বাড়ি নম্বর কষ্ট, আমার আনন্দ বাক্যে, পঁচিশ বছর বয়স, মেঘপুরাণ, ভেবেছিলাম চড়ুইভাতি, বুকপকেটে পাথরকুচি, ডুবোজাহাজের ডানা, অন্ধ ঝরোকায় সখার শিথানে । গল্পের বই : স্বপ্ন মায়া কিংবা মতিভ্রমের গল্প।প্রবন্ধ : তিন ভুবনের যাত্রী । স্মৃতিপাঠ : অক্ষরবন্দি জীবন। স্বনির্বাচিত কবিতা (প্রকাশিতব্য) : পদ্যাবধি । স্মৃতিকথা (প্রকাশিতব্য): গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের গল্প : পাবলিক হেলথের প্রথম পাঠ । ডকুফিকশন (প্রকাশিতব্য) : ঝিনুক নীরবে সহো

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।