বুধবার, মার্চ ২২

দ্বিঘাত সমীকরণ : কৃষ্ণ জলেশ্বর

0

পৃথিবীতে আত্মহত্যামুখর এক সন্ধ্যায় তার সাথে আমার দেখা হয়। তখনও সূর্যের রং কতকটা মেঘে লেগে ছিল। কে জানে কেন শুভ্রপাখিরা আত্মাহুতি দিচ্ছিল ঘূর্ণাবর্ত এক করাতকলে। সে এক নিষ্ঠুর সুন্দর! শত শত শাদা শাদা পাখি উড়ে উড়ে আসছিল, আর করাতে কেটে কেটে লাল হয়ে ঝরে ঝরে পড়ছিল। দেখে মনে হচ্ছিল রক্তগোলাপের পাপড়ি উড়ে উড়ে যাচ্ছে— মৃত্যু যেন নেশার মতো, পাখিদের চোখে লেগে আছে।

 


তখন সে-ও এক পাখি। আবছা নীল রং। নদীর মতোন। দূর থেকে উড়ে আসতে আসতে বোধহয় নদীই হয়ে গেছে। এমন ঢেউ! আমি মুগ্ধ চোখে সেইসব ঢেউয়ে তলিয়ে যেতে চাই। সে আমার চোখ থেকে আলতো করে তুলে নেয় একটি পলক। আমি অন্ধ হয়ে যাই। রাত গাঢ় হয়ে নামে। আদালতপাড়ার শ্যাওলাজমা পথ ধরে আমি আর বাড়ি ফিরতে পারি না। সে বলে— সুন্দর মূলত অন্ধকার। তুমি অন্ধকারে ডুব দাও।

 


যে বছর আমি সাঁতার শিখতে গিয়ে তলিয়ে গিয়েছিলাম জলশঙ্খ নদীতে— চোখে ও নিশ্বাসে গাঢ় সুবজ নিয়ে; আর ভেবেছিলাম হয়তো মরে যাব। কিন্তু মরিনি। আমাকে পানির গভীর থেকে টেনে তুলেছিল অপরিচিত কেউ। তারপর বহুদিন তাকে খুঁজেছি। পাইনি। আমাদের ছোট্ট মফস্বল শহরে এর আগেও কোনোদিন দেখিনি। মনে মনে ভাবতাম— কে সে! আমাকে জীবন দিয়ে চলে গেছে! সব শুনে নানী বলেছিলেন— ফেরেশতা! তোর মৃত্যুর সময় আসেনি। তারপরও তুই মরতে গিয়েছিলি দেখে ফেরশতাই তোকে বাঁচিয়েছে। সে বছর ভাত খেতে বসে এক দুপুরে নানী মরে গেলেন। গরম ভাত, ধোঁয়া উঠছিল। নানী হাত ধুয়ে এসে ঢলে পড়লেন। তার না খাওয়া ভাতের প্লেট দিব্যি পড়ে ছিল সন্ধ্যা অবধি।

তারপর বহুদিন তাকে খুঁজেছি। পাইনি। আমাদের ছোট্ট মফস্বল শহরে এর আগেও কোনোদিন দেখিনি। মনে মনে ভাবতাম— কে সে! আমাকে জীবন দিয়ে চলে গেছে! সব শুনে নানী বলেছিলেন— ফেরেশতা!

 


এইরূপ হয়— বুকের গহীন থেকে একটা নিঠুর ঘ্রাণ বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে বলে মনে হয়; মনে হয় একটা স্বচ্ছ গ্লাসে শাদা শাদা জিরাকাটারি চালের মাঝে গেঁথে দেওয়া আগরবাতি পুড়ে পুড়ে এই ঘ্রাণ ছড়াচ্ছে; আর ঘন মৃত্যুর কথা স্মরণ হয়। সেই আত্মহত্যামুখর সন্ধ্যায় সে যখন এসে দাঁড়ায় আমার সামনে। আমার মনে হয়— সে নদী। আর তার ঢেউয়ে আমার তলিয়ে যেতে ইচ্ছে করে। সে বলে সে আমাকে ভালোবাসে না। আমার মনে হয় আমিও তাকে আর ভালোবাসি না। মানুষ কি সব ফুলকে ভালোবাসে! সব নদীকে? সব পাখিকে? ভালোবাসে হয়তো! কিংবা আদতে ভালোবাসতে পারে না। কিছুই আসে যায় না কারও পাখির পালক ঝরে গেলে। কিন্তু আমি আমাকে ভালোবাসি। আর আমার ইচ্ছে হয় শুভ্রপাখির মতো সুন্দর হয়ে উঠতে। আমার চোখ থেকে তুলে নেওয়া পলক আমি খুঁজতে থাকি। আদালতপাড়ার শ্যাওলাপড়া পথে আমি অন্ধের মতো হাতড়ে বেড়াই অনন্তকাল।

 


ধরি, তার নাম এক্স, আর আমি ওয়াই। আমাদের অজানা মান নির্ণয়ের স্বার্থে একটা সংখ্যা আমরা বেছে নিয়ে সমান হয়ে উঠতে পারি। তার আগে কাকে কত দিয় গুণ করলে সমান হবে তাও ভেবে নেওয়া প্রয়োজন। আমার পাশে আমি আমার মামাতো ভাইকে রাখলাম। যে ধনী ও সুদর্শন। আর এক্সের পাশে রাখলাম শাদা মেঘ। এবার আমরা দ্বিঘাত সমীকরণের মান নির্ণয় করব। তার আগে আরও এক সন্ধ্যার কথা বলি। তখনও সমান চিহ্নের প্রশ্ন আসেনি। আমরা পরস্পর মুক্ত এবং অস্থির। আমরা পাশাপাশি এসে আরও অস্থিরতার ভেতর চুম্বন আবিষ্কার করি। আমরা মুগ্ধ হয়ে মৌলিক একটা সংখ্যার ভেতর চুপচাপ বসে থাকি অনেক দিন।

 


সময় এক মাত্রা। না ধরলেও ধরার ভেতর থাকে। নানীর না খাওয়া ভাতগুলো ঠান্ডা হয়ে যায়। ঠান্ডা ভাতের পাশে বাটিতে পড়েছিল ইলিশের ঝোল। সে রাতে আমাদের আর ভাত রান্না হয়নি। পাশের বাড়ি থেকে এসেছিল সবজি খিচুড়ি আর ভাজা ডিম। নানীর মৃত্যু অনেকগুলো বিষয়কে পাল্টে দেয়, বেঁচে থাকলে যে বিষয়গুলো হতো অন্যরকম। নানী যদি ইলিশের ঝোল দিয়ে ভাতগুলো খেয়ে নিতে পারতেন, সেই দুপুরে; তারপর তার ঘরের বিছানায় শুয়ে ভাতঘুম শেষে বিকালে জেগে উঠতেন; বিকেলে শাজাহান উকিল চলে আসতেন; চায়ে বিস্কুট ডুবিয়ে খেতে খেতে লিখে নিতেন আমাকে উইল করে দেওয়া নানীর সম্পত্তির কিছুটা। নানী হয়তো তার ভারী চশমাটা চোখে লাগিয়ে সই করে দিতেন গোটাগোটা অক্ষরে ‘রওশনারা বেগম’। তখন আমার মান কিছুটা বেড়ে যেত। কিংবা একটা অবলম্বন আমাকে সাহসী করে দিত হয়তো। কিন্তু হায়! সময় এমনই এক মাত্রা! বইতে বইতে চিহ্ন ফেলে দেয়। নানীর মৃত্যুই সে সময় প্রকট হয়ে উঠলেও, এতো বছর পর তার ‘সই করতে না পারা’ বিষয়টি প্রকটতম হয়ে ওঠে। আর আমার মামাতো ভাই ধনী এবং সুদর্শন হয়ে ওঠে।

নানী যদি ইলিশের ঝোল দিয়ে ভাতগুলো খেয়ে নিতে পারতেন, সেই দুপুরে; তারপর তার ঘরের বিছানায় শুয়ে ভাতঘুম শেষে বিকালে জেগে উঠতেন; বিকেলে শাজাহান উকিল চলে আসতেন; চায়ে বিস্কুট ডুবিয়ে খেতে খেতে লিখে নিতেন আমাকে উইল করে দেওয়া নানীর সম্পত্তির কিছুটা। নানী হয়তো তার ভারী চশমাটা চোখে লাগিয়ে সই করে দিতেন গোটাগোটা অক্ষরে ‘রওশনারা বেগম’।

 


সে বলত ‘তোমাকে ভালোবাসি না’। আমি বলি না কিছু। ঠোঁট থেকে উড়ে যেতে থাকে গোপন প্রজাপতি। মৌলিক সংখ্যার বিভাজনহীনতায় বিরক্ত বোধ হয়। আমি আর শাদা মেঘ কাটাকাটি। সমান চিহ্নের একপাশে পড়ে থাকে এক্স আর অন্যপাশে মামতো ভাই। বয়স তখন হয়তো সতেরো। অগোছালো হয়ে, অপারগতায় ভেঙে পড়তে ইচ্ছে হয়। মনে হয়— দূরে কোথাও, গাঙচিল হয়ে উড়ে যেতে। বাতাসে উবে যেতে। কিন্তু আমি ঠিক আমিই থেকে যাই, অযাচিতভাবে, নিস্তরঙ্গ; আমার কোথাও যাওয়ার ছিল না বলে।

 


অস্তিত্ব গাঢ় এক বেদনার মতোন। বৃষ্টিহীন দিনেও লাল টুকটুকে জবাফুল ফুটে থাকে। একটা গোলকধাঁধায় আমরা তিনজন। সে, মামাতো ভাই আর আমি। আর একাধিক ব্যাসার্ধে ঝুলে থাকে অনেকজন। মনে পড়ে নানীমারাযাওয়া সন্ধ্যায় ঠান্ডা ভাতগুলো ইলিশের ঝোল দিয়ে মেখে খেয়ে নেব কি না ভেবেছিলাম। উঠোনে হ্যাজাকবাতির আলোয় কাফনে মোড়ানো নানীর লাশটিকেও একটা বড়োসরো ভাত মনে হচ্ছিল আমার। উঠোনের শেষ কোনায় মেহেদী গাছ। কে যেন আমার সামনে থেকে নিয়ে ভাতগুলো ফেলে দেয় মেহেদী গাছের তলায়। তখন সন্ধ্যা ফুরিয়ে যায় যায়। কোথা থেকে একটা কাক এসে সেই ভাত খুঁটে খুঁটে খায়। পরদিন একটা কাক মেহেদী গাছ থেকে কিয়ৎ দূরে মরে পড়ে ছিল। মামাত ভাই কাকটাকেও নানীর মতো কবর দিয়ে দেয়।

 


তারপর সেই দৃশ্য থেকে সরে এসে তিনজন একটা বৃত্তের পরিধিতে ঝুলে থাকে। সে, সে আর সে। আমাকে কোথাও খুঁজে পাই না আমি।

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

জন্ম বাংলাদেশে। প্রকাশিত গল্পের বই 'আনোহাবৃক্ষের জ্যামিতি'।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।