বৃহস্পতিবার, মে ৩০

নিবেদিতা আইচের গল্প : শিং

0

আজ বারবার শামীমের ফোন আসবে আমি জানতাম। এমন খবরের পর ওর ফোন আসাটাই স্বাভাবিক। জেদ করে রাজধানীর কর্পোরেট জীবনের ডাক ফিরিয়ে দিয়ে এই গ্রাম্য এলাকায় চাকরি করতে আসায় একটা সময় পর্যন্ত আমার যতটা গর্ব ছিল, সে গর্ব দু’দিন পর কেটে গেলেও শামীমের শুরু থেকেই আমার এই চাকরিটার প্রতি একটা তাচ্ছিল্যের ভাব দেখতে পেয়েছি।

শামীম মাঝেমাঝেই বলে— জিদাজিদি কইরা খামাখা ঢাকার বাইরে গেলি। বেতনটা শুইনাই ফাল দিয়া গেলি গা।

আমি বলি— বেতন বেশি কি ভালো না? তুই না বলিস টাকাই সব!

ফোনের এপাশ থেকেও আমি ওর হাসিটা দেখতে পাই। সে বলে— এই টাকা কেমনে খরচ হয় দেখবি এইবার। কোনো ফ্যাসিলিটি নাই, কিচ্ছু নাই। একটা জাতের সিগারেট কিনতেও ঢাকা আসা লাগব তোর! তারপর মনে কর কোনো বিয়া শাদি, গেট টুগেদার-মুগেদারে আইতে পারবি না, তোর চেহারা মোবারক ভুইলা যামু আমরা।

শুক্র শনিবার ধরে আমি ঠিক প্রতি সপ্তায় ঢাকা চলে আসব। তিন সাড়ে তিন ঘন্টার দূরত্ব এমন কিছু নয়। ঢাকার বাস আছে রাত দুপুর অব্দি। আর শুনেছি অফিস থেকে আমরা গাড়ি পেয়ে যাব খুব শিগগিরই। যারা ঢাকায় যাওয়া আসা করে তাদের জন্য নাকি এই ব্যবস্থা হবে।

এবার আমার হাসি পায়। শুক্র শনিবার ধরে আমি ঠিক প্রতি সপ্তায় ঢাকা চলে আসব। তিন সাড়ে তিন ঘন্টার দূরত্ব এমন কিছু নয়। ঢাকার বাস আছে রাত দুপুর অব্দি। আর শুনেছি অফিস থেকে আমরা গাড়ি পেয়ে যাব খুব শিগগিরই। যারা ঢাকায় যাওয়া আসা করে তাদের জন্য নাকি এই ব্যবস্থা হবে।

এই আপ-ডাউন করতে গিয়া রাস্তায় চাপা পড়বি কোনদিন ঠিক নাই। বাসগুলা ক্যামনে চলে দ্যাখছস? যেন শালারা এরোপ্লেন চালাইতো আগে। তার উপর আছে কুত্তা মার্কা জ্যাম। তোর শুক্র শনি রাস্তাতেই খতম।

এমন সব পাল্টা যুক্তি দেয় সে।

গাড়ির কথা শুনে বলে— দ্যাখ, কতদিনে গাড়ি দেয়। এই বছর পাইলে বুঝমু তোর কপাল ভালো।

শামীমের কথা কিন্তু সত্যিই হয়। ঝাউপাড়ায় এসেছি পুরো ছয়মাস হয়ে গেছে, গাড়ির টিকিটাও দেখতে পাইনি আজ পর্যন্ত। আর আমার আগ্রহ, উদ্দীপনা সে সব তো উবে গেছে মাস ঘুরতে না ঘুরতেই। সত্যি বলতে বেশ কিছুদিন ধরে আমি ঢাকায় ফেরার নানারকম চেষ্টাচরিত্র শুরু করেছি।

শুরুতে যেমন হয় সেরকম শর্তই দিয়ে রেখেছিল ওরা। তাই হুট করে চাকরি যে ছাড়ব সেই উপায় নেই। মানে ছাড়া যাবে বটে কিন্তু তার জন্য গুণতে হবে জরিমানা। এ পরিমাণ টাকা আমি বাপের কাছেও চাইতে পারব না। শামীমকে বললে হয়তো একটা ব্যবস্থা হবে কিন্তু ওকে এই সুযোগটা দিতে চাই না আমি। যতই বন্ধু হোক না কেন ওর যা স্বভাব, পরবর্তীতে এই প্রসঙ্গ তুলে ঠাট্টাচ্ছ্বলে কিছু না কিছু বলবে আর আমার আঁতে ঘা লাগবে।

ঢাকায় হেড অফিসে বদলির জন্যও চেষ্টা করেছি। কিন্তু এখনো বছর পার হয়নি এবং আমার কাজেও খুব একটা অগ্রগতি হয়নি বলে প্রতিবারই ফিরিয়ে দিয়েছেন এমডি স্যার।

সেই এমডি স্যারই আজ একটু আগে ফোন করে বললেন— বাড়ি যাও আশিক। অনেক পরিশ্রম গেছে, এবার রেস্ট করো।

ফোন রাখার আগে আরেকবার কংগ্রাচুলেটও করলেন। কথা শেষ করে সাথে সাথে বেরিয়ে এসেছি আমি। অনেকদিন পর আরাম করে ঘুমাব আজ। গতকাল রাতে বাড়ি পর্যন্ত ফিরতে পারিনি। ফ্যাক্টরিতে গণ্ডগোলের চূড়ান্ত হয়েছিল।

কিন্তু এতকিছুর পরেও এই বিশাল সমস্যার যে এমন অভিনব একটা সমাধান হয়ে যাবে তা কে জানত! অফিস থেকে বের হবার পথে খবরটা শামীমকে টেক্সট করেছি। তখন থেকে পকেটে ফোনটা ভাইব্রেট করছে। করুক না। ওপাশে আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষায় থাকুক ব্যাটা।

ডরমিটরিতে ফেরার এই শর্টকাট পথটা অন্যদিন আমি এড়িয়ে যাই। অন্ধকারে এ পথ এমনিতেও কেউ মাড়াতে চায় না। আজকে দিনের বেলায় আর ঘুরপথে গেলাম না। অনবরত ঝিঁঝিঁ ডাকছে। ঝাউপাড়ায় আসার আগে অব্দি এমন ছমছমে দুপুর বহুদিন দেখিনি। সেই কোন আদ্যিকালে নানা বাড়ির পেছনদিকে পুকুরপাড়ের জঙ্গলটায় এমন শব্দ হতো। এখনো আবছা আবছা মনে পড়ে। শুকনো পাতার ওপর নিজের পায়ের শব্দ নিজের কাছে অশরীরি কিছু বলে মনে হয়। অফিস থেকে ফেরার সময় ভরসন্ধ্যায় কতদিন ঐ শালগাছের মাথায় শাকচুন্নিকে বসে থাকতে দেখেছি!

নিজেকে আরেক দফা গালি দিই আমি। শুধু টাকার জন্য নয়, অ্যাডভেঞ্চারের ভূতও ভর করেছিল আমার ওপর। ভাবলে অবাক লাগে আরামের জীবন ছেড়ে এমন বিশ্রী গ্রাম্য জায়গায় এসে জুটেছিলাম কিনা নিজের বুদ্ধিতে। লজ্জায় কাউকে বলতে পারিনি পর্যন্ত। নিজের গোয়ার্তুমির কথা ভেবে ভেবে ঘেন্না ধরে গিয়েছিল আমার।

এত অপেক্ষার পর মনে হচ্ছে যেন ছয়মাস নয়, অর্ধযুগ পর মুক্তি মিলতে যাচ্ছে আমার! জংলা পথের ভেতর দিয়ে শিস বাজাতে বাজাতে হাঁটতে তাই এই প্রথম খুব ফুর্তি লাগছে।

শামীমকে বলেছি— ফয়সালের রিসেপশনের গিফটে ইনক্লুড করিস আমাকে। আসব, দেখা হবে। আর এ মাসের পার্টি কিন্তু আমার তরফ থেকে। গ্রুপে জানিয়ে দে সবাইকে।

মশকরা করতেছিস? চাকরি কি আছে নাকি গ্যাছে? কীসব আন্দোলন না বলে চলতেছিল? হঠাৎ কী এমন কাহিনি হইল যে অরা তোরে ঢাকায় পাঠাইব?

শামীম হড়বড় করে ওঠে। ওর গলায় কৌতূহল ঝরে পড়েছে। আন্দোলন সামলাতে গিয়ে দু সপ্তাহ ধরে সকাল-সন্ধ্যা সত্যিই মারাত্মক নাকানিচুবানি খেয়েছি। মেসেজে লিখেছিলাম ওকে। সেই আন্দোলন যে আমার জন্য শাপে বর হয়ে আসবে তা আমিও ভাবতে পারিনি।

বাসায় ফিরেই আরাম করে গোসল করলাম। শাওয়ারটা নষ্ট সেই প্রথমদিন থেকে। বালতি আর মগ দিয়েই কাজ সারলাম প্রতিদিনের মতো। ফ্রিজে গতকালকের বাসি ভাতটুকু ছিল। ডিম পোচের সাথে একগাদা পেঁয়াজ কাঁচামরিচ দিয়ে ওটা ভেজে নিতেই দুপুরের খাবার তৈরি হয়ে গেল। ঝাউপাড়ায় আসা অব্দি কতদিন এই এক খাবার খেয়ে পার করেছি!

এখানকার বাজারটা একদম অন্য মাথায়। অফিস সেরে আর ঘুরপথে বাজারে যাবার শক্তিটুকু থাকে না। শুক্র শনিবার আবার সেই ভোরবেলা গিয়ে না জুটলে মাছ মাংসের চিহ্নটুকু দেখা যায় না।

গরম চায়ে চুমুক দিতে দিতে ধীরে ধীরে সারা শরীরে আরাম জেঁকে বসছে।গতকালকের পত্রিকায় চোখ বুলানোর সময় হলো এখন। আমাদের ফ্যাক্টরির খবরটা ফ্রন্ট পেইজে এসেছে।

‘কয়েকজন শ্রমিককে অব্যাহতি দেওয়ার জেরে ঝাউপাড়ায় রপ্তানিমুখী একটি পোশাক কারখানায় সোমবার দুপুরে ভাঙচুর হয়েছে। বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা রড এবং লাঠিসোটা নিয়ে হামলা চালিয়ে কারখানার জানালার কাচ ভাঙচুর করে।’

ঐ কয়েকজনকে অব্যাহতি না দিয়ে উপায় ছিল না আমাদের। মূলত কচি মিয়াই মূল টার্গেট ছিল। লোকটা এত বেশি ঘোঁট পাকিয়েছে গত কয়েকমাস ধরে। এমডি স্যারের পরামর্শমতো সরাতে হলো তাকে।

লোকটার সাথে একবার কথা বলার সুযোগ হলে তাকে আমার ধন্যবাদ জানানোর আছে। ওরকম গণ্ডগোল করেছে বলেই না আমার কপাল খুলেছে। ভাগ্যিস কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার বুদ্ধিটা ঠিক সময়ে মাথায় এসেছিল। এবার একটু ভালোয় ভালোয় বদলির অর্ডারটা এলেই হয়। সেদিনই সব গুটিয়ে ঢাকায় ফিরব। এই জঙ্গলে সভ্য কারো বসবাস করা সম্ভব নয়। একমাত্র আমি বলেই এতগুলো দিন দাঁত কামড়ে পড়ে রইলাম।

সন্ধ্যায় শামীমের ফোন পেয়ে ঘুম ভাঙল। পত্রিকা পড়তে পড়তে কখন চোখ লেগে এসেছে টের পাইনি। ঘড়ি দেখলাম। আটটা বেজে গেছে। রাতে খাবার কিছু তৈরি করা নেই। রান্নাঘরে যাবারও মুড নেই একদম। ভাবছি হাঁটতে হাঁটতে সামনের হোটেল থেকে একটা বিরিয়ানির প্যাকেট নিয়ে এলেই হয়।

মতিঝিলের জ্যামে বসে তিতিবিরক্ত হয়ে আছে শামীম। আমার কাছে কাহিনির সারসংক্ষেপ শুনে জানতে চাইল কচি মিয়ার আপডেট কী।

ওরে খুন টুন করে ফেলে নাই তো?

খুন টুন হয়নি। কিন্তু ধোলাইটা একটু বেশি পড়ে গেছে এটা সত্য। হেলথ কমপ্লেক্সে নিয়ে গেছে বলে শুনে এসেছি।

ধুর, খুন টুন হয়নি। কিন্তু ধোলাইটা একটু বেশি পড়ে গেছে এটা সত্য। হেলথ কমপ্লেক্সে নিয়ে গেছে বলে শুনে এসেছি।

খোঁজ নিয়া দ্যাখ, মইরা গেলে আবার কেইস কিন্তু খারাপ হইয়া যাইব। খবরাখবর রাখিস।

শামীমের গলায় সত্যি সত্যি দুশ্চিন্তা ঝরে পড়ছে। কচি মিয়ার নিজের লোকেরাই যদি ওকে মারতে যায় তাতে কার কী করার আছে! মালিকপক্ষ তো চেয়েছেই মীমাংসা করে দিতে। আমি ওকে আশ্বস্ত করলাম।

আচ্ছা এরকম হয় নাকি মানুষের? অদ্ভুত না?একটা ছবি থাকলে পাঠা তো আমারে।

কচি মিয়ার কোনো ছবি নেই আমার কাছে। কিন্তু গুগল বলছে এরকম হতে পারে। মানুষের মাথাতেও নাকি গজাতে পারে শিং। এ খুবই বিরল এক চামড়ার রোগ। মেডিকেল সায়েন্সের লোকজন ‘সেবাসিয়েস হর্ন’ বলে খটোমটো এক নাম দিয়েছে এর। এই নাম মনে রাখতেই আমার ঘাম ছুটে গেছে।

বিরিয়ানি একটু আগে শেষ হয়ে গেছে। তেল ঝোলের সমুদ্রে গোটা কয়েক ডিম তখনো হাবুডুবু খাচ্ছে। আর কিছু আছে কি না জানতে চাইলে হোটেলের ছেলেটা বলল— শিং মাছের ঝোল আছে স্যার। দিমু?

বেচারা শিংওয়ালা!

শামীমের মেসেজটা দেখতে দেখতেই ছেলেটার কথায় চমকে মুখ তুলে তাকালাম একবার।

পারতপক্ষে এসব সস্তা হোটেলে আমি আসি না। রান্নার স্বাদ যতটা বাজে তারচেয়েও পরিবেশটা ভীষণ নোংরা। তাছাড়া শ্রমিকদের আনাগোনাও লেগে থাকে সারাদিন। আজকের মতো একেবারে ঠ্যাকায় পড়লে অবশ্য আসতে হয়। আর তো কয়েকদিন। তারপরই মুক্তি। নিজেকে সান্ত্বনা দিয়ে ঐ বিস্বাদ ঝোল তরকারি নিয়ে বাসার দিকে পা বাড়ালাম৷

টের পেলাম আজকে এলাকায় আড্ডার বিষয়বস্তু একটাই। লোকজন ভীত। চাপা ক্ষোভও বিরাজ করছে সবার মধ্যে।

কেউ বলছে— এমুন আজব কথা শুনি নাই আর। শয়তান না তো আর কী? মাইনষের মাথায় শিং থাকে নি!

আরেকজন বলল— এত বছর ধইরা হালায় আমাগের উপ্রে সর্দারি করল! আর আমরারেও মনে হয় কানা ওলায় ধরছিল! হালার বিষয়ডা কেউই টের পাই নাই।

যেমন চেয়েছি তাই হয়েছে। আন্দোলনের কথা ভুলে গেছে সবাই৷ কচি মিয়ার জন্য একটু মায়াই লাগছে এখন। পুরো ব্যাপারটা সত্যি বলতে বেশ অদ্ভুত। ঠিক তার চেহারা সুরতের মতোই। দুই গালে অসংখ্য গুটি বসন্তের দাগ। খনখনে গলার স্বর। মাথায় সারাবছর একটা পাগড়ির মতো কাপড় প্যাঁচানো। প্রায় ছয় ফুট লম্বা গড়ন। সব মিলিয়ে নামটার সাথে ভীষণ বেমানান লাগে তার অবয়ব।

কচি মিয়ার কোনো ছবি নেই আমার কাছে। কিন্তু গুগল বলছে এরকম হতে পারে। মানুষের মাথাতেও নাকি গজাতে পারে শিং।

এই দু’দিন আগে আমার সঙ্গে দেখা করতে এসে তর্কাতর্কির এক পর্যায়ে দরজার পাল্লার সাথে ঠুঁকে গিয়ে পাগড়িটা খুলে গিয়েছিল। ওকে ঐ অবস্থায় আবিষ্কার করে আমি বেশ ভড়কে গিয়েছিলাম। এদিকে তার নেতৃত্বে বেতন বাড়ানো আর ঈদের বোনাস নিয়ে আন্দোলন ঘন হয়ে উঠছিল৷ আমরা প্রায় কোনঠাসা হয়ে পড়েছিলাম।

অনেক ভাবতে ভাবতে হঠাৎ করে তখন মাথায় ফন্দিটা এলো। এমডি স্যারকে বলতেই পিঠ চাপড়ে দিলেন আমার। সময় নষ্ট না করে গভীর রাতেই জায়গামতো লোক পাঠিয়ে দিলেন। আর আমাদের কল্যাণে কচি মিয়ার অদ্ভুত অঙ্গটির কথা এলাকায় জানাজানি হতে দেরি হলো না।

শামীমকে এতটা বিস্তারিত বলিনি আমি। মানে বুদ্ধিটা যে আমারই তা জানাইনি। ও শুনলে বলত— তুই কবে থেইক্যা এমন ধুরন্ধর হইলি রে?

সত্যি নিজের কীর্তির কথা ভাবতে গেলে আমিও অবাক হয়ে যাচ্ছি মনে মনে। কাজটা ভালো করিনি। কিন্তু আমার আর উপায়ও ছিল না।

ডরমিটরির সামনে আসতেই ইলেক্ট্রিসিটি গেল। স্যারের ফোনটাও তখন পেলাম। অর্ডারটা নাকি কাল পরশুর মধ্যে হয়ে যাবে। আমার ধন্যবাদের উত্তরে স্যার বললেন— ইয়্যু ডিজার্ভ ইট আশিক! গুডলাক!

তার মানে আমার পরবর্তী কর্মস্থল রাজধানীতে। এই শুক্রবার এবং পরবর্তী সব শুক্রবার আমি নিজের বাসায় থাকব। আহা মুক্তি মুক্তি! আর দেরি নয়, কাল থেকেই গোছগাছ শুরু করতে হবে।

বারান্দায় উঠতেই যে দৃশ্য দেখতে পেলাম তার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না একদম। হৃদপিণ্ডটা যেন তড়াক করে গলার কাছে এসে লাফ দিল। ফোনে কথা বলার সময় আবছায়া আলোতে এতক্ষণ যেটাকে গাছ ভেবেছি সেটা আসলে সচল এক ছায়ামূর্তি। 

মুঠোফোনের আলোয় পথ দেখতে দেখতে খুশিতে শিস বাজাচ্ছিলাম। বারান্দায় উঠতেই যে দৃশ্য দেখতে পেলাম তার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না একদম। হৃদপিণ্ডটা যেন তড়াক করে গলার কাছে এসে লাফ দিল। ফোনে কথা বলার সময় আবছায়া আলোতে এতক্ষণ যেটাকে গাছ ভেবেছি সেটা আসলে সচল এক ছায়ামূর্তি।

আমার জিহবা নড়ছে না। গলা শুকিয়ে গেছে কখন। তবু সমস্ত শক্তি দিয়ে বলে উঠতে চাইলাম— কে?

ছায়াটি ক্রমশ এগিয়ে আসছে। ওর মাথার উপর অদ্ভুত শৃঙ্গটা আরও বেশি প্রকট হয়ে উঠছে। আমি নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারছি না। এ নিশ্চয়ই বিভ্রম। নিশ্চিত হতে আলোটা আরেকটু উঁচু করে ধরলাম।

তবে কি লোকটা কোনোভাবে পালিয়ে এসেছে? কিন্তু ওরা যে বলল লোকটা অচেতন ছিল। মাথায়, বুকে ভালোই চোট পেয়েছে, সাত আটটা করে সেলাই লেগেছে। হাসপাতালে ভর্তি রাখা হয়েছে ওকে।

ও কি জেনে গেছে মাথায় পাগড়ি পরিয়ে সেদিন গভীর রাতে আমরা লোক পাঠিয়েছিলাম? তার পরদিনই পাঁচ ছয়টা বাড়িতে গরুছাগল মারা পড়ল মারাত্মক বিষক্রিয়ায়। আমাদের ভাড়া করা লোক মাথায় নকল শিং পরে বিষ খাইয়ে এসেছিল পোষা প্রাণিগুলোকে। আসবার সময় পাগড়ি ফেলে চলে এসেছে ইচ্ছা করেই। যথারীতি সবাই ধরে নিয়েছে ওর মধ্যে কোনো রকম অপশক্তি আছে। সত্যিই তো মানুষের মাথায় কেন শিং থাকবে? এ তো শয়তানের নমুনা। নাগাল পাওয়া মাত্রই গণধোলাই দেয়া হয়েছে লোকটাকে।

আমার হাত থেকে টুপ করে খাবারের প্যাকেটটা পড়ে গেছে। ফ্লোরে গড়াগড়ি খাচ্ছে শিং মাছের ঝোল। দেয়ালে হেলান দিয়ে কোনোক্রমে দাঁড়িয়ে আছি আমি।

চোখের সামনেই ছায়ামূর্তিটি দীর্ঘতর হচ্ছে। হাত পা অসাড় হতে হতে টের পাচ্ছিলাম সংজ্ঞা হারাচ্ছি। চোখের উপর কালো পর্দাটা নেমে আসার আগ মুহূর্তে দেখতে পেলাম অদ্ভুত শিংটি আমার দিকে তাক করে অতিকায় মানুষটি সশব্দে পা ফেলে এগিয়ে আসছে।

 

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

জন্ম ২ এপ্রিল, চটগ্রামে। তার শৈশব কৈশোর কেটেছে বিভিন্ন মফস্বল শহরে। পেশায় চিকিৎসক। লেখালেখিতে তিনি মনের খোরাক খুঁজে পান। প্রকাশিত গল্পগ্রন্থসমূহ : কিছু গল্প অবাঙমুখ (২০১৮), নৈর্ঋতে (২০২০), বিহঙ্গম (২০২১)।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।