রবিবার, জুন ২৩

নিমক : রাজিয়া নাজমী

0

ভর দুপুরেই নাজিম তোপখানা থেকে বের হলো কলতাবাজারের উদ্দেশে। ঢাকা শহরের পুরানঢাকা অঞ্চলটা অত মুখস্থ না হলেও যে একদম না, তাও নয়। ইনফরমারের মুখের বর্ণনা শুনে শুনে টার্গেটের বাড়ির একটা নকশা মোটামুটি সে করেছে। তবে আজ সরেজমিনে দেখার পর, হামলার প্লান সাজাবে। নাজিমের আজ ঢাকা শহরে থাকার কথা ছিল না। গত দুদিন ধরে কয়েকটা বিস্ফোরণ ঘটাবার পর কয়েকদিন শহর থেকে গা ঢাকা দেবার কথা ছিল। কিন্তু কোনোভাবেই মন সায় দিল না চলে যেতে। থাকা-যাওয়ার দোটানার টানাপোড়নে শেষপর্যন্ত থেকে যাওয়ার দিকে মন হেলে গেল। এত বড়ো একটা টার্গেট হাতছাড়া করা ঠিক হবে না।

ইনফরমার আর দুইজন গেরিলাকে সংগে নিয়ে গতকাল রাতেই কমান্ডারের বাড়িতে মিটিং করে নাজিম নিজেই সিদ্ধান্ত নিল এই অপারেশনে সে থাকবেই। নাজিমের হিসাব আর নিশানা নিয়ে কারো দ্বিতীয় ভাবনা হয় না।

ইনফরমার আর দুইজন গেরিলাকে সংগে নিয়ে গতকাল রাতেই কমান্ডারের বাড়িতে মিটিং করে নাজিম নিজেই সিদ্ধান্ত নিল এই অপারেশনে সে থাকবেই। নাজিমের হিসাব আর নিশানা নিয়ে কারো দ্বিতীয় ভাবনা হয় না। তাই তার সিদ্ধান্তে আপত্তি ওঠে নাই। এই ধরনের কেস একবার হাতছাড়া হয়ে যাওয়া মানে আম আর ছালা দুটোই যাওয়া। টার্গেট ফসকে যাবে মাঝে থেকে এলাকায় মিলিটারির উৎপাত বাড়বে— অযথা ধরপাকড়, নিরীহ কিছু প্রাণ যাবে। বাড়ির মেয়েদের হিরহির করে টেনে সকলের সামনে মিলিটারি ভ্যানে তুলবে।

মিটিংয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নাজিম আজ একাই যাবে কলতাবাজার। অন্য দুজন যাবে আগামীকাল। রাস্তাঘাট দেখে এসে নাজিমের সাথে কাল আবার বসে ফাইনাল করে ওরা যোগ দেবে অপারেশনের দিন।

ধোলাইখাল থেকে একজনকে সংগে নেবার কথা উঠেছিল, কিন্তু ইনফরমার ব্যাটা জোর আপত্তি দিল। তা দেখে ওরা অবাক হলেও পাড়ার কাউকে জড়াবার যে রিস্ক আছে সেই যুক্তিও মানতে হলো। তবে, লোকটার কথার ধরণ নাজিমের কাছে একটু গোলমেলে লাগছিল। সে কারণেই হয়তো রিকশা নিতে গিয়ে মনের মধ্যে কেমন যেন খচখচ করছে। কত ভুলভাল খবরে উল্টা বিপদও হয়েছে ওদের।

তোপাখানা থেকে একটানা এক রিকশায় কলতাবাজার না গিয়ে নাজিম বলদাগার্ডনের কাছে এসে নেমে গেল। সেখান থেকে আরেক রিকশায় উঠে বসতেই আর্মির ট্রাক একদম রিকশার গা ঘেঁসেই থামে। নাজিম পকেটে থেকে মানিব্যাগে রাখা পাকিস্তানিদের আইডি কার্ড— মিলিটারিদের ভাষায় ডান্ডি কার্ড সংগে আছে কি না চেক করে নিল। গতরাতেই ইনফরমার দিয়ে গেল। কোথা থেকে যোগার করেছে জিজ্ঞাসা করতেই ইনিয়ে বিনিয়ে কী যে বলে গেল— লোকটা একটু চতুর ধরনের সেটা পরিষ্কার।

নাজিম লক্ষ্য করে রাস্তায় আর্মির গাড়ি যেন একটু বেশি চলছে। অবশ্য কাউকে তেমন চেক করছে না। ডান্ডি কার্ড ছাড়াও নাজিমের আরেকটা সুবিধা আছে— পাকিস্তানে বড়ো হওয়ার সুযোগে সে ভালোই উর্দু বলতে পারে। এই সময়ের জন্য একটা বিশাল প্লাস পয়েন্ট!

গতমাসে জিঞ্জিরার ওপার থেকে বোমা বানাবার মাল-মসলা আনতে গিয়ে আর্মির নজরে পড়ে যায়। সারা শরীর সার্চ করে দুনিয়ার জেরার সব উত্তর খাস উর্দুতে দেওয়াতে আর্মিরা ডান্ডি কার্ড ছাড়াই তাকে নিজেদের একজন মনে করে নৌকায় উঠতে আর বাধা দিল না।

রিকশা যতই পুরান ঢাকার দিকে আগাচ্ছে নাজিমের হাতের মুঠি ততই শক্ত হয়ে উঠছে। শাঁখারিপট্টি ও তাঁতীবাজারের আগুনপোড়া গন্ধ যেন নাকে লাগছে। রিকশা নারিন্দা ছেড়ে লালমোহন সাহা রোডে উঠতেই নাজিম রিকশাওয়ালাকে বলল, ভাই একটু কলতাবাজার দিকে চলেন। ঘাড় ফিরিয়ে রিকশাওয়ালা বলল, উঠলেন ধোলাইখাল যাওনের কথা পাইরা, এলা ঘুরাইবার লাগছেন কেলা?

নাজিম ফিসফিস করে বলে, যুদ্ধের সময় এত কথা কেন জিজ্ঞাস করেন। বলছিলাম ধোলাইখাল, কিন্তু বলি নাই তো কলতাবাজার যাব না। হাতের কাগজের দিকে আরেকবার দেখে নাজিম রিকশাওয়ালাকে বলে, কলতাবাজারের মসজিদের পাশের রাস্তা দিয়ে শেষমাথায় নিয়ে যান।

নাজিম ফিসফিস করে বলে, যুদ্ধের সময় এত কথা কেন জিজ্ঞাস করেন। বলছিলাম ধোলাইখাল, কিন্তু বলি নাই তো কলতাবাজার যাব না। হাতের কাগজের দিকে আরেকবার দেখে নাজিম রিকশাওয়ালাকে বলে, কলতাবাজারের মসজিদের পাশের রাস্তা দিয়ে শেষমাথায় নিয়ে যান। ভাড়া নিয়ে চিন্তা কইরেন না।

রিকশাচালক কি বুঝল কে জানে, নাজিমের দিকে একবার তাকায়ে— সোজা হয়ে রিকশা ঘুরিয়ে সেই যে প্যাডেলে পা দিল, একবারে পাঁচভাই লেন পার করে কুঞ্জবাবু লেনের বাদিক ঘুরে আবার ডানদিকে এসে রাস্তার শেষ মাথায় মসজিদের সামনে এনে ছেড়ে দিয়ে বলল, ভাই, কেলা কামে আপনি আইছেন জানবার চাই না। মাগর যাই করেন জান বুঝ কইরা কইরেন।

নাজিম পকেটে হাত দিয়ে ভাড়া বের করতে গিয়ে এক মিনিট থমকে যেয়ে বলে, তুমি এই পাড়ার নাকি!

মাথা নেড়ে রিকশাচালক বলে, হ, এই পাড়ায় আমার ভিটাবাড়ি, পাড়ার হক্কল আমার চেনা।

তয় আপনা কাম আপনি করেন। কথাটা বলেই রিকশা ঘোরাল ভাড়া না নিয়েই। নাজিম ডাকতেই একটু তেজ দেখিয়ে বলল, আপনে কইলাম আমার রিকশাত আহেন নাই।

নাজিম কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে, পা বাড়াল মসজিদের পাশ দিয়ে বাদিকের রাস্তায়। হাতের কাগজে বাড়ির বর্ণনা মিলিয়ে বুঝল, সে একবারে বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে। দোতলা বাড়িটার বারান্দার কোনার রেলিং ঘেঁষে হাসনাহেনা গাছের ঝোপ ঝুলে আছে। পুরান ঢাকার বাড়িগুলো একবারেই অন্যধাঁচের। এইবাড়িটা ততটা অন্যরকম না, তেমন বড়োও না। তবে ঢাকার বনেদি ছাপ ঠিকই আছে। দোতলার রেলিংটা বেশ অন্যরকম লাগল নাজিমের কাছে। একেকটা রড একেক রঙের। মাঝেমাঝে খোদাই করা নকশা।

নাজিম সিগারেটে আগুন ধরিয়ে রেকি করার জন্য রাস্তায় এদিক ওদিক হাঁটে। এ পাড়ার লোক তাকে চেনে না তা-ই বেশিক্ষণ এখানে থাকাও যাবে না। এটাও ঠিক। কিন্তু যে কাজে এসেছে সেটা করতে পারছে না একটা অস্বস্তির জন্য। খবরটা কতটুকু সত্য তার খোঁজ করার সময় পায়নি বলেই ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। আবার যদি ঠিক হয় তবে এই কাজ না করে ফিরেও সে যাবে না। তার হাতে আছে মাত্র তিনদিন। এর ভিতরে যা করার করতে হবে।

দুপুর বলেই হয়তো রাস্তা এখন বেশ ফাঁকা। এটাই সুযোগ। ইনফরমার এই সময়ের মধ্যেই তাকে আসতে বলেছিল। এই পাড়ার ইট বালু সুরকি— নাড়ি-নক্ষত্র, সবই নাকি তার জানা। কার বাড়িতে কে কখন আসে তাও তার জানা। এই বাড়ির বড়োছেলে নাকি মিলিটারিদের প্রিয়ভাজন। বাড়িতেই সে তার নিজের সাঙ্গোপাঙ্গদের নিয়ে সবসময় মিটিং করে। পরশু রাতেও এই বাড়িতে বৈঠক বসবে। দুয়েকজন আর্মি মেজর আসবে।

পায়ে পায়ে রাস্তার মাপ নিয়ে নিল নাজিম। রাস্তা থেকেই বাড়ির ভিতর পর্যন্ত যাওয়ার মাপ চোখের আন্দাজ করে ফেলে। এই ব্যাপারে তার হিসাব নির্ভুলই হয়। রাস্তা থেকে বাড়ির বারান্দা ছাড়িয়ে ভেতর যেতে লাগবে ২০ ফিট। বাড়ির ছাদ থেকে দোতলা-একতলা- মোটামুটি কয়টা গ্রেনেড কাজ শেষ হতে পারে সেই হিসাব করে, নাজিম হিসাব লেখা কাগজ পকেটে ঢুকিয়ে পা বাড়াতেই খুব পরিচিত কণ্ঠ শুনে থমকে দাঁড়াল। বারান্দার রেলিং ঝুঁকে মনে হয় তাকে কেউ জিজ্ঞাসা করছে, আপনি কাউকে খুঁজছেন?

নাজিম ঘুরে তাকাতেই, তার বুকের ভিতরে এতক্ষণের হিসাবে করা গ্রেনেড যেন একে একে ফেটে উঠল।

মিষ্টি কণ্ঠ আবার ডাকে, আপনি নাজিম ভাই না? আমি রেখার বান্ধবী অহনা। চিনতে পারছেন? একটু দাঁড়ান, আমি নিচে আসছি। বলতে বলতে মুহূর্তেই অহনা সিঁড়ির দরজা খুলে দিয়ে সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলে, নাজিম ভাই ভেতরে আসেন। নাজিম বুকের ভিতরের গ্রেনেডের আওয়াজ থামাবার ব্যর্থ চেষ্টা করে একবারে কাঠ শুকনো গলায় বলে, তোমরা এই বাড়িতে? তোমরা পুরানা পলটনে থাকো না?

এটা আমার দাদার বাড়ি। দুইমাস হলো এখানে চলে এসেছি।

নাজিম পকেটে হাত দিয়ে কাগজটাকে আরও চেপে চেপে ভিতরে ঢুকাতে ঢুকাতে গলা ঝেড়ে বলল, এই অসময়ে নাই-বা এলাম। আমার কিছু কাজও আছে। আজ যাই। পরে কোনোদিন আসব। তবে নাজিমের অহনা সম্পর্কে যে সামান্য ধারণা আছে তাতে সে জানে ওর হাত থেকে বাড়িতে না ঢুকে রেহাই সে পাবে না।

হাঁটাপথের দূরত্বেই থাকে দুজনে। রেখাদের বাড়িতেই অহনাকে দেখেছে কয়েকবার। কথা তেমন কখনই হয়নি ওর সাথে। অহনা সহজভাবে কথা বললেও নাজিম কখনই পারে নাই। ওকে দেখলেই শরীরে শিহরন জেগে উঠত। নাজিম জানত এটা অন্যায়।

অহনা ওর চাচাতো বোন রেখার বান্ধবী। হাঁটাপথের দূরত্বেই থাকে দুজনে। রেখাদের বাড়িতেই অহনাকে দেখেছে কয়েকবার। কথা তেমন কখনই হয়নি ওর সাথে। অহনা সহজভাবে কথা বললেও নাজিম কখনই পারে নাই। ওকে দেখলেই শরীরে শিহরন জেগে উঠত। নাজিম জানত এটা অন্যায়। অহনা ওর নিজের পছন্দের মানুষের সাথে বাগদত্তা। তবুও বহুরাতের নিদ্রা অহনা কেড়ে নিয়েছে। অহনাকে এড়াবার জন্য রেখাদের বাড়ির দাওয়াতে অহনা থাকলে কাজের উছিলা দেখিয়ে সে যেত না। এত বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা, তেজী এবং মায়াবী ব্যবহারের মেয়ে— নাজিমের মনে হয় এই পৃথিবীর সব সুন্দরকে এক করলেও এই শ্যামলা মেয়েটির কাছে সবাই ম্লান হয়ে যাবে।

অহনা রাগের ভান করে বলে, এত বায়নাক্কা করছেন কেন? পরে আবার আসতে তো বারণ করব না। আজ বাড়ির দোরগোড়ায় এসে না বসে যে যেতে পারবেন না। কখন বেড়িয়েছেন কে জানে, মুখ দেখে তো মনে হয় সকাল থেকে এখন পর্যন্ত দানাপানি পেটে দেওয়ার কথা ভুলে গেছেন।

নাজিমের ইচ্ছা করলো বলতে— তুমি কী আমার মনের কথা আমার চোখে দেখ!

অহনার পিছেপিছে নাজিম ঢুকল ওদের ড্রইংরুমে। ভিতরে গিয়ে নাজিমের মনে হলো আগামী পরশু এই বাড়িটায় বোমা হামলার জন্য যে মাপ করেছে তা নির্ভুল।

চারদিক দেখে এ বাড়ির আভিজাত্যের ছাপ বেশ বোঝা যায়। দেয়ালে বেশ কিছু ছবি প্রমাণ করে এদের বংশমর্যাদার মাপকাঠি। রেখার প্রাণপ্রিয় বান্ধবী অহনা। আর তার নীরব ভালোবাসা অহনার বাড়িতে সে বসে আছে মৃত্যুর নীল নকশা পকেটে নিয়ে।

নাজিমকে বসিয়ে রেখে অহনা ভেতরে যাওয়ার সময় একটু থেমে বলে, নাজিম ভাই একটু বসুন আমি আসছি, আপনার সাথে কথা আছে। অহনা চলে যাবার পরপরই সাদা শাড়ি লাল চওড়াপাড়ে পান মুখে একজন পর্দা ঠেলে ঢুকতেই নাজিম উঠে দাঁড়ায়। ভদ্রমহিলা উল্টোদিকের সোফায় বসে বললেন, বসো বাবা, আমি অহনার মা। তুমি তো রেখার ভাই। রেখা কেমন আছে? বাড়ির সবাই ভালো আছে?

নাজিম কী বলবে! এখনো ভালো আছে। তবে পরশুর পরে রেখা কতটা ভালো থাকবে কে জানে! তার সামনে বসে আছে তারই মায়ের মতো একজন। নিরপরাধ নারী— স্বামীর অপরাধের শিকার! নিরপরাধ তার অহনাও। কিন্তু নাজিম কী করবে! পিতার পাপের শাস্তির দায় তাকেও দেবে? নাহ; নাজিমের এখন এসব যুক্তি নিয়ে ভাবার সময় নেই। অহনার মায়ের দিকে সরাসরি না তাকিয়ে সে বলে, জি সবাই ভালো আছে। ভালো থাকলেই ভালো। চারদিকে যে অবস্থা চলছে। কবে যে সব ঠিক হবে। তোমরা বাবা সাবধানে থেক।

অহনার মায়ের কথায় নাজিম কিছুটা ভয় পেল। এরা জানে নাকি! রেখার যে পাতলা মুখ। উনি আরও কী কী বলছিলেন নাজিমের ভাবনার মধ্যে তা তলিয়ে গেছে। সে ফিরে এলো যখন অহনা ওদের কাজের মেয়ের হাত থেকে ট্রে টেবিলে রাখতে রাখতে বলল, মা তুমি এখন নাজিম ভাইকে ছেড়ে দাও। বেচারার মুখ দেখছ। এত বেলা হয়েছে এখনও হয়তো খাওয়া হয়নি কিছু।

মেয়ের কথা শুনে মা যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলেন নাজিমকে সময় দেওয়া থেকে। উঠতে উঠতে বললেন, ঠিক মতো খেয়ে যেও বাবা। দোয়া করি আল্লাহ্‌ তোমাদের সবাইকে হেফাজতে রাখেন।

নাজিম আর দোয়া নিতে পারছিল না। যে মানুষের হাতেই দুইদিন পরে পোড়া লাশ হয়ে পড়ে থাকবে হয়তো এই ঘরে, এই সোফায়; সেই মানুষের জীবনের জন্য দোয়া করছে না জেনেই! ভাবতেই প্রচণ্ড একটা চিৎকার দিতে ইচ্ছা করল। আহা; যদি বলতে পারত তোমরা কদিনের জন্য চলে যাও অন্য কোথায়!

এতসব ভাবতে ভাবতেই কী মনে করে পায়ে হাত দিয়ে ছালাম করে নাজিম বলল, খালাম্মা, মৃত্যু যার যেভাবে, যে সময় লেখা আছে সেভাবেই সেই সময়ে যে হবে। এই নিয়ে আমি ভাবি না। আপনিও চিন্তা করবেন না। উপারয়ালার উপরে ছেড়ে দেন।

অহনার মা কি বুঝল কে জানে, একটু অবাক চোখে নাজিমের দিকে তাকিয়ে বলল, ঠিক বলেছ বাবা, আজরাইলের যখন আসার কথা তখনই আসবে। যাই বাবা, আমার নামাজের সময়ে হয়েছে।

মা চলে যেতেই নাজিমের প্লেটের পাশে চামচ রেখে আদেশের ঢঙে অহনা বলল, শুরু করেন! আপনাকে দেখেই মনে হচ্ছে বেশ একটা ভাবনায় পড়ে গেছেন। নাজিম ভাই আমি জানি।

মা চলে যেতেই নাজিমের প্লেটের পাশে চামচ রেখে আদেশের ঢঙে অহনা বলল, শুরু করেন! আপনাকে দেখেই মনে হচ্ছে বেশ একটা ভাবনায় পড়ে গেছেন। নাজিম ভাই আমি জানি। রেখা আমাকে বলেছে। ভয় করবেন না আমি বাড়িতে কাউকে আপনার কথা বলি নাই। আপনি খেয়ে নিন।

খালি বাটিতে হাত ধুয়ে ভাতের প্লেটের পাশে লবণের বাটির দিকে হাত বাড়াতেই নাজিমের হাত কেঁপে উঠল। সে খুব আস্তে করে হাত সরিয়ে নিয়ে অসহায় চোখে অহনার দিকে তাকিয়ে বলল, না খেলে তুমি কি মনে কষ্ট পাবে? আমাকে এক কাপ চা দিলেই ভালো হতো। দুপুরে ভাত খাওয়ার অভ্যাস এই কয়েকমাসে একেবারেই চলে গেছে।

অহনা এতক্ষণ ধরে নাজিমকে দেখছিল, এবার নাজিমের বুকের ভেতরটা ভেঙে তছনছ করে যে হাসি; সেই হাসিতেই বলল, থালায় হাত দিয়ে কেউ বুঝি উঠে যায়। আর কে বলেছে আপনাকে আমি চা দেব না। চুলায় চা বসিয়ে রেখে এসেছি।

নাজিমের শরীর হিম করে দেবার জন্য একদম পাশে এসে দাঁড়িয়ে প্লেটে ভাত তুলে দিয়ে, ভাতের পাতে মুরগির বুকের টুকরো ঝোলসহ দিয়ে, লবণের বাটি সামনে টেনে দিয়ে বলল, রেখা বলে আপনি তরকারিতে লবণ হয়েছে কি না তা না দেখেই লবণ আগে নেন। রেখা আপনার কথা উঠলেই বলে, আমার নিমক হালালি ভাই! তা-ই কি নাজিম ভাই?

নাজিম ভাতের লোকমা মুখে দিচ্ছিল না রক্তেমাখা তাজা মাংসপিণ্ড মুখে দিচ্ছিল— সে জানে না। কোনোভাবে খাওয়া শেষ করেই বসার ঘরের লাগোয়া বাথরুমে হাত ধোয়ার নাম করে চলে যায়। গলায় হাত দিয়ে বমি করে পেটে থেকে সব ফেলার জন্য আঙুল তুলেও থামতে হলো। বমি করার শব্দ এড়াতে পারবে না। অহনা শুনতে পাবে। উফ; বমি করতে পারলে বেঁচে যেত।

সে কিছুতেই হিসাবে মেলাতে পারছিল না— সে কি এক নিমকহারাম?

ইনফরমারের উপরে তার বিশ্বাস অবিশ্বাসের খচখচ বেড়েই চলছে। অহনার বাবার নাম আবার মিলিয়ে নিল দেয়ালে রাখা বাঁধানো বেশ কয়েকটা সার্টিফিকেটের সাথে। অহনাই বলল, আমার বাবার কাজের সার্টিফিকেট। জানেন তো বাবা একসময় ইনডিয়ান এয়ারফোর্সে পাইলট ছিলেন। নাজিম বোকার মতো তাকাতেই অহনা হেসে বলল, মানে পাকিস্তান হবার আগে।

এখন?

এখন তো বাবা ব্যবসা করেন।

অহনা উঠে গিয়ে চা নিয়ে এসে নাজিমের হাতে দিতে দিতে বলে, নাজিম ভাই আমার কিছু কথা ছিল আপনার সাথে— আমার একটা…

অহনার কথা শেষ না করতে দিয়েই নাজিম বলল, পুরানা পলটনে কবে ফিরে যাবে? তুমি বলছিলে একা একা বোর হয়ে যাচ্ছ, তা কদিন রেখার বাড়িতে গিয়ে থাক। দুই বান্ধবী একসাথে সময় কাটাবে। যাবে আজকে? আমার সাথেও যেতে পার।

একটু অবাক চোখেই নাজিমের দিকে তাকিয়ে অহনা বলল, রেখা কিছু বলে নাই আপনাকে? অবশ্য রেখার সাথে এখন ফোনে কথা হলেও, না জিজ্ঞাসা করা যায়— না বলা যায় কিছু। ফোনও আজকাল নিরাপদ না।

মার্চের পরে রেখার সাথে আমার দেখা হয় নাই অহনা। কি বলবে রেখা? কিছু ঘটেছে? যুদ্ধের জন্য তোমার বিয়ে পিছিয়ে গেছে?

জানি, রেখা বলেছে, আপনি না বলেই বাড়ি ছেড়ে চলে গেলেন, অনেকদিন কোনো খোঁজ খবর ছিল না। শেষমেশ আপনার একটা চিঠি লন্ডনের এক বন্ধুর মারফত এলো। তাও ভালো বুদ্ধি করে যে এই কাজটি করেছিলেন। আমার কথা ছাড়, তুমি কিছু বলবে বলেছিল। সেটাই বলো। অহনা আমার সত্যি কিছু কাজ আছে।

নাজিম ভাই আমার আব্বা ব্যবসার কাজে ইংল্যান্ডে গেছেন সেই মার্চ মাসে। প্লেন বন্ধ থাকায় ফিরে আসতে পারছেন না। এই বাড়িতে পুরুষলোক বলতে আমার দাদা আর ছোটা চাচা— দুজনেই অসুস্থ।

পুরানা পলটনের বাড়িতে আমাকে নিয়ে মা একা। সবাই চিন্তা করে। জানেন তো আমার বড়ো ভাই বোন চিটাগাংয়ে থাকে। ভাই মাঝে মাঝে এসে দেখে গেলেও বেশিরভাগ সময় আমরা একাই ছিলাম। এই বাড়িতে তাও লোকজন কিছু আছে, পাড়ার সবাই আপনজনের মতো। তাই বাবা না আসা পর্যন্ত এখানেই থাকব।

আপনি আমার বিয়ের কথা জানতে চাইলেন; তিনমাস ধরে আমি ওর কোনো খবর জানি না। কোথায় আছে কেমন আছে জানি না। ওদের বাড়ির সবাই ইন্ডিয়া চলে গেছে।

নাজিম ভাই, আপনি আমার দুটো কাজ করে দেবেন? নাজিম ভাই শুনছেন? নাজিম ভা ই…

নাজিমের মাথায় ‘আমার আব্বা ব্যবসার কাজে ইংল্যান্ডে’, এই কথাটাই ঘুরছে। অহনার ডাকে সে ফিরে তাকিয়ে বলল, হ্যাঁ, বলো !

মুক্তিযুদ্ধের ক্যাম্প সিমুলিয়া থেকে ওর শেষ চিঠিটি এসেছিল। আপনি একটু ওর খোঁজ করবেন।

নাজিম মাথা ঝুঁকিয়ে বলে, নামটা লিখে দিও। কিন্তু তুমি তো দুটো কাজ বলেছিলে, আরেকটা কি কাজ?

হাতের মুঠো থেকে একটি কাগজ বের করে দুইটা নাম নাজিমের চোখের সামনে তুলে ধরে, দ্বিতীয় নামের উপরে আঙুল রেখে বলল, এই লোকটি আমাকে খুব বিরক্ত করছে। পুরানা পলটনের বাড়ি ছাড়ার এটাও একটা কারণ। আমাকে হুমকি দিচ্ছিল, আমি রাজি না হলে আমাকে ও দেখে নেবে।

অহনা হাতের মুঠো থেকে একটি কাগজ বের করে দুইটা নাম নাজিমের চোখের সামনে তুলে ধরে, দ্বিতীয় নামের উপরে আঙুল রেখে বলল, এই লোকটি আমাকে খুব বিরক্ত করছে। পুরানা পলটনের বাড়ি ছাড়ার এটাও একটা কারণ। আমাকে হুমকি দিচ্ছিল, আমি রাজি না হলে আমাকে ও দেখে নেবে। আমি জানি না লোকটি আমার এই ঠিকানাও বের করতে পারবে কি না। এখানে আসার পরে আর ফোন করে নাই। হয়তো আর ঝামেলা করবে না তবু যদি একটু খোঁজ নিতে পারেন।

নাজিমের চোখের সামনে দুটি নাম জ্বলজ্বল করছে। প্রথম নামটি কদিন আগে নিহত মুক্তিযোদ্ধার। দ্বিতীয় নাম তাদের ইনফরমারের।

নাজিম উঠে দাঁড়িয়ে বলে, দ্বিতীয় নামের লোকটিকে নিয়ে তুমি আর ভেবো না।

নাজিমের হাত ধরে ভেজা চোখে অহনা করুণভাবে তাকিয়ে বলল, আর, ওর খবর আমি কবে পাব?

এই প্রথম অহনার ছোঁয়া তার শরীরে— নিজেকে সামলে নেওয়া কঠিন হয়ে পরলেও, সামলে নিয়েই অহনার হাতে হাত রেখে মিথ্যেই বলতে হলো— আমি চেষ্টা করব, তবে আমরা যারা স্বাধীনতার যুদ্ধে গেছি তারা সবাই নাও ফিরতে পারি। এই খবরের জন্য প্রস্তুত থেক।

অহনাদের বাড়ির ড্রাইভার গাড়ির দরজা খুলে দাঁড়িয়েছিল— নাজিম ওকে হাত দিয়ে ইশারা করে রাস্তায় বের হয়ে এলো। অহনার ছোঁয়াকে সযত্নে রেখে দিতে নাজিম নিজের হাত বুকের সাথে সেটে ধরে হাঁটতে লাগল হঠাৎ মেঘ করে আসা বৃষ্টির মধ্যে। কিছুটা আশা কিছুটা নিরাশা নিয়ে।

তার মন বলছিল অহনা বৃষ্টির ঝাপটার মধ্যে বারান্দায় দাঁড়িয়ে— সে ফিরে তাকাল না! অনেকক্ষণ ধরে সিগারেটের তৃষ্ণা মেটাবার জন্য প্যান্টের পকেটে হাত দিয়ে প্যাকেটের সাথে অহনার দেওয়া কাগজ বের হয়ে এলো।

নাজিম সিগারেটে আগুন ধরিয়ে, গোটাগোটা হাতের লেখা আরেকবার পড়ে, প্রেমপত্রের মতো সযত্নে বুক পকেটে রেখে, দাঁড়িয়ে থাকা রিকশায় উঠে বসে।

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

গল্পকার, সেইসাথে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের নির্মোহ ভাষ্যকার রাজিয়া নাজমী। থাকেন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরে, কিন্তু তাঁর বিশ্বাস ও অভিজ্ঞানে প্রাত্যহিক ধারণ করেন এক ভুবন বাংলাদেশ। তিনি গল্পে বয়ান করেন সময়ের নৈর্ব্যক্তিক বোঝাপড়া, বুননে থাকে ইতিহাস ও নৃতত্ত্বের পলিমাটি, আর এক নির্দয় মায়া। রাজিয়া নাজমী ঘড়ি ধরে ধরে শব্দ গুণে লেখেন না-- লেখেন এক অনিবার্য জেরা ও জন্মদানের রোখে। একটিই বই তাঁর: ‘চৌকাঠের বাইরে’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর। যুক্তিগ্রাহ্য, আইনসঙ্গত একটি সমাজ দেখার প্রত্যয়ে আইনশাস্ত্রে স্নাতক করে বার কাউন্সিলের সনদ নিয়েছিলেন; মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রযুক্তিবিদ হিসাবে কাজ করেছেন। লেখালেখির পাশাপাশি নিউইয়র্ক কেয়ার, বাংলাদেশ পরিবেশ নেটওয়ার্ক, এবং বাপা'র সদস্য হিসাবে কাজ করেন। নিউইয়র্কের কুইন্সে ফ্রেন্ডস অব হোলিস লাইব্রেরির ভাইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করছেন।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।