রবিবার, জুন ২৩

নির্বাচিত দশ কবিতা : মোশতাক আহমদ

0

অনুপস্থিত জলের এলিজি


এই দেশে একদিন থাকবে না যে নদী,
তার তীরে বিছিয়েছে ঘুমের বাঁশির আঁচল
.                 ..আমাদের মেরুদণ্ড, সফেদ নমুনা;
কশেরুকার শার্সিপথে বিবাগী সুরের গতায়াত।

যে চোখে একদিন থাকবে না কোনো অশ্রুজল,
তার পাশে জমকালো আয়োজন
………………………….রাত্রি- উদ্বেল
……………অবহেলার অন্তিম চাঁদমারি উল্লাস।

বিভিন্ন জনপদে তরুণ-তরুণীর স্বপ্নিল ক্যানভাস –
সময়ের অ্যাসফল্ট রঙ-ডুবানো তুলি
………………মধ্যবয়সের ইজেল কংকালে
…………………………………ছায়া ফেলে যায়।


দূরত্বের গান


As for me, I am a watercolor.
I wash off.
—Anne Sexton

বটবৃক্ষ থেকে
……..নেমে আসা
…………..ঝুরি হয়ে থেকো
নিরাপদে, অবুঝ সবুজ;
কখনো ছুঁয়ো না যৌথ আকাঙ্ক্ষার মাটি।

জলরঙ ছবি আমি,
ধুয়ে যাব প্রথম বর্ষায়।

যত বেশি দূরে যাওয়া,
তত বড় ব্যাসার্ধের বেসাতি,
…………….পরিধির পূর্ণতা;

যত বেশি দূর—
ততই বিশাল বিরহের ক্ষেত্রফল,
……………………ভালোবাসার অভিজ্ঞান।


ডাইলেমা


রূপকথার পাতা থেকে লাফ দিয়ে পালানো বিড়ালের হাসি
অস্তনীল আকাশের রঙে হারায় কবিতার মতো,
বেওয়ারিশ ভাসছে ছন্দের শাদা ইজেল।
বিড়ালেরা হারিয়ে যায় হাসিগুলো রেখে
আকাশ হারিয়ে গেল গাঢ় নীল ছোপে।

তাহলে কবিতা লিখো না, ছন্দই লিখো
মনে কর যদি
অমরতা আর ঋদ্ধি
ওখানেই জায়মান!

তাহলে ছন্দে লিখো না, কবিতাই লিখো
মনে কর যদি
রক্ত অশ্রু নদী
শিয়র অবধি!


চন্দ্রনাথের প্রজাপতি

বন্ধু পারভেজ সাজ্জাদ রাজুর স্মৃতির উদ্দেশে


শীতকাল, অ্যাজমা ছিল, গলায় মাফলার—
নয়নতারার খুব কাছটি ঘেঁষে
ফুসফুসদুটো উড়বে রঙিন প্রজাপতি ;
উপায় ছিল না, বাবা চন্দ্রনাথ, পাহাড়ে না উঠে!
বন্ধুরা জড়ো হয়েছিল, ধর্মশালার বটতলায়—
ধুম্রধুসর হবার কটু প্রলোভন;
আমিতো শ্বাসরুদ্ধ মাতাল, অ্যাজমায় কষ্ট পাই—
উপায় ছিল না বাঁশের লাঠি ঠুকে ঠুকে
………………………………অনন্তের সিঁড়ি না গুনে!

শীতকাল ফিরে ফিরে আসে,
চন্দ্রনাথ পাহাড়ে আমার ফুসফুস দুটো
…………………..নিমেষে হাজার প্রজাপতি,
আর আমি তিরিশ বছর ডুবে আছি, খুব সম্ভবত
অবিশ্বস্ত কোনো লুপ্ত ফেরিঘাটে, নিঃস্ব হয়ে যাওয়া
……………………বন্ধুদের অনুমানমাফিক;
কিন্তু অ্যাজমাটা আছে দোস্ত—
অ্যাজমা কি আর সারে!


তারাপদবাবুর কাণ্ড


তারপর একদিন
‘তারাপদ রায়ের শ্রেষ্ঠ কবিতা’ হাতে
………………….ট্রেন থেকে নামলে—
আলপথ খাল পেরিয়ে
……………….সেতুর মুখে দাঁড়ালে
পোষা পুকুরটির হাত ধরে
………….বাঁশঝাড়ের পটভূমিতে
হতভম্ব দেশগেরামের বাড়ি।

প্রগাঢ় পগার থেকে
…………ভেসে আসবে সোঁদা গন্ধ,
পটকা মাছ সুতোয় বেঁধে
দৌড়ে আসবে দু একটা ন্যাংটো ছেলে;
মান্দা সেঁচতে সেঁচতে
…………..উঠে আসে জ্যাঠাতুতো ভাইবেরাদার,
‘অনেকদিন পরে এলে
ভুলেই গেছ আমাদের!’

বৌ-কথা-কও পাখির ডাকে
…………..দুপুর উদাস হলে মাটির চুলায়
লাউয়ের সালুন, মাসকলাইয়ের ডাল
…………………….গন্ধ ছড়ায়—
স্মৃতির কলাপাতায়
………….ছোট কাকার বিয়ের ভোজ,
আবদুল আলীম বেজে চলেছেন
………………সরষে খেতের বাতাসে-
উঠোনে উঠোনে
…………….হলুদিয়া পাখিদের খুদকুঁড়া,
খড়ের গাঁদায়
…………..আলিফ লায়লা, শাহনামা।
সন্ধ্যায় ঝিঁঝিঁদের ডানায়
কুপির আলো ছড়িয়ে পড়লে
বাহির বাড়িতে ভিড় করে শুনব
……………ভুলি মণ্ডলের রূপকথা,
অনেক রাতে মাফলার জড়িয়ে
বাড়ি ফেরা ট্রানজিস্টার
কুয়াশা হটিয়ে বাজায়
…………অনুরোধের আসর।

ফিরতি ট্রেনে
ভুলিয়ে ভালিয়ে
আরেক বিভ্রান্তির দেশে নিয়ে যান
…………………তারাপদবাবু।


দীর্ঘ গ্রীবার কবি


দীর্ঘতম গ্রীবার কবিটি হারিয়ে গেলেন, গঙ্গাসাগরে
………………………..মনিয়ার মতো—
অস্তগামী আকাশে উড়ছে মরাল
…………………………স্মৃতির চারপাশে।

নয় দরজার বাতাস
………………….ঘুরপাক খায়—
অমীমাংসিত ধুসর চোখ
লেখা না-লেখা কবিতার খাতা
…………………………অঘ্রান প্রান্তর।

নীলসিয়া আকাশের ছায়ায় মাখামাখি
…………………………কবরের সবুজ ঘাস,
গাঢ় বেদনার নীল অন্তর্জাল
………………………শ্বেত পাথরের পাশে।

বছরটা দ্রুত হারিয়ে যায় সমুদ্রগর্ভে,
গজেন্দ্র জাহাজ উজানের টানে;
প্রতিটি বৃক্ষই আজ কফিন হতে চায়।


স্বপ্ন দুজন


ঠিকানা বদল হয়েছে, ফুরিয়েছে ধাক্কাধাক্কি নৈকট্য।

এ পাড়ার ফুটপাতে আমার স্বপ্নেরা হাঁটে বিকেলবেলা সব্জির ভ্যান, কলাবিক্রেতা পাশ কাটিয়ে; তোমার অভিজাত স্বপ্ন হাঁটে সকাল সকাল রবীন্দ্র সরোবর— স্বাস্থ্যসম্মত উন্নাসিকতায়; ধাক্কা লাগা তো দূরের কথা— ওদের দেখাও হয় না আজকাল।

আমার স্বপ্নগুলো রাত করে বাড়ি ফেরে— বেদনার বৈঠক শেষে দু একটা সুখী সুখী কবিতার রাজহাঁস হাতে করে; তোমার স্বপ্নেরা ততক্ষণে স্বাতী নক্ষত্রের কোলে হাওয়ার রাতের মশারিদূর্গ।

আমাদের সঙ্গবিহীন স্বপ্নেরা এতিম পায়ে হেঁটে চলেছে অলৌকিক কোনো সম্পর্কের দিকে!


ডানা ও শেকড়


শেকড় বিছাইনি আর, ডানাই সম্বল— আলবাট্রস নৈপুণ্যে পঞ্চাশ বছরের উড়াল; মধুপুরের জংগলমহলে কিংবা ঝিনাই তীরে, অতি শৈশবে শেকড়ের পাখা গুটানো জাতিস্মর বিষণ্ণতায়।

তারপর, বহুল পরিচিত মনোভূমি থেকে পত্রপাঠ উচ্ছেদ, পুনর্বাসিত অতিরমনীর ডানাপুটে, টাইমলাইনে স্মৃতিভষ্ম উড়িয়ে দিল উচ্ছ্বল আত্মজা।

এখন এই হ্রদের পাড়ে সবুজ ঘরে বাস— জড়াচ্ছি না আর তবু, শেকড় লুকোনো আছে হয়তোবা নাড়িপোতা মৌজায়, তারে আমি বৃথাই খুঁজি বহুদিন বহুক্রোশ। গ্লোবাল ভিলেজে অপেক্ষায় আছে নিশ্চিত কোনো কোণে দ্বিধান্বিত মৃত্তিকা, ডালিম বৃক্ষের ছায়ায় সবুজ উদারতায়— ডানাহীন।


ছাপার অক্ষর


ছাপার অক্ষরে উঠে আসবার আগে
বালুকাবেলায় ছিলে স্মৃতির বানানে,
বিকেলের রোদে ভাসা নারকেলডাঙা
ঢেউ এসে মুছে যাওয়া অংকুরোদগম।
মগ্ন চুপিসারে অনূদিত হয়ে ওঠা
নীলাভ উঠোনে ছিলে জলজ বুদবুদ,
কার ধ্যান তুলে আনে আকাশকুসুম
জমাট বুননে গাঁথা কথার বকুল।

বিজিত হয়ে এলে আলোকবর্ষ দূরে
ধীবর মেতেছে ভিন্ন কবিতা-কংকালে,
পাঠের সুড়ঙ্গ পথ দশদিক খোলা
কবিতা ধারন করে হাজার দুয়ার,
সপাটে গোপন রাখে লক্ষ বাতায়ন ;
ছাপার অক্ষর তুমি যাবে কতদূর!


সমুদ্রপীড়া


ঢেউয়ের পিঠে সূর্য শাঁখের করাত
পিয়াসি ঠোঁটে আদিগন্ত লবন তৃষা।
নিদ্রামগ্ন স্থিতিজড়তা,গতিজড়তা—
দু দিক থেকে হানে গভীর প্ররোচনা:
ফেনিল ঢেউয়ে গাংচিলের উস্কানি,
জীবনজাহাজে বাজে গৎবাঁধা ধ্বনি;
দ্বিমুখী গতির তাড়ায় বেগতিক ধী—
ক্যালেন্ডার থেকে উধাও দিনরাত্তির।
কাঠের কেবিনবন্দি, ও সুদূরতমা—
দুলছে প্রচণ্ড সামুদ্রিক সংসার;
আকাশযাত্রার মিলেছে অবকাশ
স্বপ্নে, মায়ায় আর নিঃশব্দ মতিভ্রমে।
গোধুলির মুখোমুখি আড়মোড়া ভাঙে
সমুদ্র—আকাশের নীলাভ বিহ্বলতা:
গড়িয়ে পড়ছে জলে দালির ঘড়িটা—
পাণ্ডুর সময় গিলেছে সমুদ্রপীড়া ।

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

জন্ম ৪ জানুয়ারি ১৯৬৮। মূলত কবি। আটটি কবিতার বই ছাড়াও লিখেছেন ছোটোগল্প, প্রবন্ধ, স্মৃতিপাঠের বই। পেশাগত জীবনে জনস্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করেন। প্রকাশিত কবিতার বই : সড়ক নম্বর দুঃখ বাড়ি নম্বর কষ্ট, আমার আনন্দ বাক্যে, পঁচিশ বছর বয়স, মেঘপুরাণ, ভেবেছিলাম চড়ুইভাতি, বুকপকেটে পাথরকুচি, ডুবোজাহাজের ডানা, অন্ধ ঝরোকায় সখার শিথানে । গল্পের বই : স্বপ্ন মায়া কিংবা মতিভ্রমের গল্প।প্রবন্ধ : তিন ভুবনের যাত্রী । স্মৃতিপাঠ : অক্ষরবন্দি জীবন। স্বনির্বাচিত কবিতা (প্রকাশিতব্য) : পদ্যাবধি । স্মৃতিকথা (প্রকাশিতব্য): গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের গল্প : পাবলিক হেলথের প্রথম পাঠ । ডকুফিকশন (প্রকাশিতব্য) : ঝিনুক নীরবে সহো

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।