বুধবার, ফেব্রুয়ারি ১

‘পথের পাঁচালী’র পশ্চাৎপট : এক সিসিফাস-কথা

1

Sattajit Ray_Head Strip_Sreeএমন নয় যে সত্যজিৎ রায় বিভূতিভূষণের রচনাকে আগে থেকেই খুব ভালেবাসতেন; কিংবা ‘পথের পাঁচালী’ তাঁর খুব প্রিয় উপন্যাস ছিল। সত্যজিৎ তেইশ বছর বয়সে প্রথম ‘পথের পাঁচালী’ পড়েন; তাও আরেকজনের কথায়। আর ছবি তিনি করবেন, চলচ্চিত্র পরিচালক হবেন— এমনটা আগে ভাবেনওনি। কিন্তু সত্যজিৎ ‘পথের পাঁচালী’ উপন্যাসকে চলচ্চিত্ররূপ দিলেন; দিলেন কি, ভারতীয় চলচ্চিত্রকে ভারতীয় মহিমা দিয়ে আন্তর্জাতিক করে তুললেন। কিন্তু এটা কীভাবে সম্ভব হলো? বহুবছর আগে সাদাকালো এই সিনেমাটি দেখার পর আমার ভিতরে এই ভাবনাটা কাজ করত।

আমাদের ভিতরে সবসময় একটা সাধারণ ধারণা কাজ করে যে বিরল প্রতিভা নিয়ে জন্মগ্রহণ করেই মানুষ অসাধ্যকে সাধন করে তোলে। এছাড়া বড়োঘরের সন্তান হলে তো কথাই নেই। যেমন টলস্টয়, রবীন্দ্রনাথ কিংবা সত্যজিৎ। কিন্তু প্রতিভাকে যে লড়াই করতে হয় প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে; শান দিয়ে কেজো করে তুলেই যে সৃষ্টির জগতে প্রবেশ করতে হয় এটা অনেকে মনেও আনি না।

আমাদের ভিতরে সবসময় একটা সাধারণ ধারণা কাজ করে যে বিরল প্রতিভা নিয়ে জন্মগ্রহণ করেই মানুষ অসাধ্যকে সাধন করে তোলে। এছাড়া বড়োঘরের সন্তান হলে তো কথাই নেই। যেমন টলস্টয়, রবীন্দ্রনাথ কিংবা সত্যজিৎ। কিন্তু প্রতিভাকে যে লড়াই করতে হয় প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে; শান দিয়ে কেজো করে তুলেই যে সৃষ্টির জগতে প্রবেশ করতে হয় এটা অনেকে মনেও আনি না। সত্যজিতের বেলায় যেমনটা ভাবা হয়; বিখ্যাত ঠাকুরদা উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, পিতা সুকুমার রায় যার—তিনি তো সত্যজিৎ হবেনই। কথাটা আংশিকভাবে সত্য হতে পারে, কিন্তু পুরোটা নয়; অন্য সকল প্রতিভাবানের মতো সত্যজিৎকেও কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে অনেক; ঝরাতে হয়েছে অনেক রক্ত ও ঘাম। তিলে তিলে তৈরি করতে হয়েছে তাঁকে বছরের পর বছর ধরে। আর ছবি তৈরির আগেই তাঁকে গিলতে হয়েছে পৃথিবীর বিখ্যাত সব ছবি ভুবুক্ষুর মতো; আত্মস্থ করতে হয়েছে চলচ্চিত্রের নানা তত্ত্ব, নির্মাণকলা ও নন্দন। করতে হয়েছে অমানুষিক পরিশ্রমও।

আবার এমনও নয় সত্যজিৎ চাইলেন সিনেমা করবেন; আর একদিন সকালে নেমে গেলেন কাজে ক্যামেরা নিয়ে। কাজটা সত্যজিতের জন্য মোটেই সহজ ছিল না। পারিবারিক জীবনে বিধবা মায়ের সংসারে একদিকে যেমন ছিল টানাপোড়েন, অপরদিকে ছবি তৈরির জন্য যে-টাকা লগ্নির দরকার তার জন্যও তাঁকে ঘুরতে হয়েছে মানুষের দরজায় দরজায়। নিজের বিমা ভাঙাতে হয়েছে, বন্ধুদের কাছে হাত পাততে হয়েছে; টাকার অভাবে ছবি তৈরির কাজ বন্ধ থেকেছে, কালক্ষেপণ করে আবারও কাজে হাত দিয়ে ছবি শেষ করতে হয়েছে। এমন ঝামেলা, সংকট ও টানাপোড়নে কোনো ছবি এর আগে তৈরি হয়েছে কিনা আমার জানা নেই। এছাড়া বিকল্পধারার এই অবাণিজ্যিক ছবির ব্যবসায়িক সাফল্যের সম্ভাবনা ছিল শূন্যের কোঠায়। চিত্রনাট্য দেখে প্রডিউসার তাঁকে ফিরিয়ে দিয়েছেন; কাহিনিতে গান নেই বলেও আরেক দরজায় পা বাড়াতে হয়েছে। ভয়াবহ অভিজ্ঞতা নিয়ে অবশেষে হয়েছেন চূড়ান্তভাবে প্রত্যাখ্যাত। তারপরেও সত্যজিৎ ‘পথের পাঁচালী’ তৈরি করতে পারলেন তাঁর দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি ও মনোবলের কারণেই। পরে আর সত্যজিৎকে পেছনে ফিরতে হয়নি।

এই পেছনের গল্পটুকু আমাকে বরাবর আকৃষ্ট করে; সত্যজিতের বলি, রবীন্দ্রনাথের বলি আর টলস্টয়েরই বলি। কিন্তু এই গল্প সবসময় জানা হয়ে ওঠে না তথ্যপ্রমাণের কারণে; কিংবা স্রষ্টারা নিজে না-লিখে যাওয়ার কারণে। তখন আমাদের বিকল্প পথ খুঁজে নিতে হয়। হয় লেখকের আত্মজৈবনিক রচনা, নয় স্মৃতিচারণমূলক অন্যের রচনা। সত্যজিতের ক্ষেত্রেও আমাদের তা-ই করতে হয়েছে। তাও প্রস্তুতি বা সংগ্রামের সবটা কি জানা সম্ভব?

 

২.
সত্যজিতের আত্মজৈবনিক রচনা দুটো ‘যখন ছোটো ছিলাম’ এবং ‘মাই ইয়ার্স উইথ অপু’। প্রথমটি নিজের শৈশব ও কৈশোর নিয়ে এবং দ্বিতীয়টি স্মৃতিকথামূলক; নিজের ও নিজের কাজ নিয়ে। চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎকে জানার জন্য কিংবা তাঁর প্রস্তুতিপর্ব সম্পর্কে জানতে হলে ‘মাই ইয়ার্স উইথ অপু’ খুব গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া ‘পথের পাঁচালী’, ‘অপরাজিত’ ও ‘অপুর সংসার’— এই ত্রয়ী চলচ্চিত্র কেমন করে, কতখানি বাধাবিপত্তি ও বিচিত্র অভিজ্ঞতায় মধ্যে তিনি সৃষ্টি করেছিলেন তারও নেপথ্য-কাহিনি জানার উৎসও রচনাটি। সত্যজিৎ বাংলা ও ইংরেজি দুভাষায়ই সমান দক্ষ ছিলেন; সুতরাং প্রথমটি বাংলায় ও দ্বিতীয়টি ইংরেজিতে লিখেছিলেন। ‘মাই ইয়ার্স উইথ অপু’ লিখতে তিনি নিশ্চয়ই আন্তর্জাতিক পরিসরের কথা চিন্তা করেছিলেন। এটি সত্যজিতের একটি মূল্যবান রচনাও। প্রকাশিত হয়েছিল মৃত্যুর পর।

এখানে একটি গল্প আছে। সত্যজিতের সর্বশেষ রচনা ‘উত্তরণে’র চিত্রনাট্য। এটি শেষ করার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং নাসিং হোমে ভর্তি হন, আর ফেরত আসেননি। কিন্তু এক্ষেত্রে একটা গড়বড় হয়ে গেল। ‘উত্তরণের’ আগে সত্যজিৎ লিখেছিলেন ‘মাই ইয়ার্স উইথ অপু’। সবসময় যা করতেন, যেকোনো রচনা শেষ হওয়ার পরে স্ত্রী বিজয়া রায়কে প্রথম পড়তে দিতেন। দ্রুত লিখতেন বলে পাণ্ডুলিপিতে মাঝে মাঝে দু-একটা ভুল থেকে যেত, বিজয়া রচনাটি পড়ে সেটা মার্জিনে ‘টিকচিহ্ন’ দিয়ে রাখতেন। পরে তা শুধরে নিতেন লেখক। প্রত্যেক রচনায় সত্যজিতের ড্রাফট থাকত তিনটি— প্রথম, দ্বিতীয় ও সর্বশেষ বা চূড়ান্ত পাণ্ডুলিপি। কিন্তু ‘মাই ইয়ার্স উইথ অপু’ লেখার পর তা আর দিলেন না; বিজয়া একদিন জিজ্ঞেসও করেছিলেন ব্যাপারটি। সত্যজিৎ জবাবে বলেছিলেন, ‘উত্তরণ’র চিত্রনাট্য শেষ করে পুনর্বার ‘মাই ইয়ার্স উইথ অপু’ ব্রাশ-আপ করে তবে পড়তে দেবেন। তারপরে ব্রাশ-আপ করেও ছিলেন; কিন্তু সেটা পাওয়া যায়নি।

মারা যাওয়ার দশ/বরোদিন পর পুত্র সন্দীপ ও পুত্রবধূ ললিতা ঘরগোছাতে গিয়ে ‘মাই ইয়ার্স উইথ অপু’র চূড়ান্ত ড্রাফটা কোথাও খুঁজে পাননি। ড্রাফটা রাখা ছিল চেয়ারের সামনে টেবিলের ওপর। কিন্তু তন্ন-তন্ন করে খুঁজেও পাওয়া গেল না। সন্দেহ রইল না কারও যে ওটা চুরি গেছে। সন্দীপ প্রথম ড্রাফটটা পেয়েছিলেন; বিজয়া সেটা দেখে চোখ কপালে তুললেন। স্বয়ং সত্যজিৎ ছাড়া এ-লেখা কারও পক্ষে উদ্ধার করা অসম্ভব। সে-এক দুরূহ কাজ। কাটাকাটিতে ভরপুর, অসমাপ্ত বাক্য, দশপাতা লিখে তিনপাতায় ফিরে আসতে হয়; বিজয়ার কথায় দুর্বোধ্য ছিল সে-ড্রাফট। মনে হতাশা আসলেও বিজয়া দমে যাওয়ার পাত্রী ছিলেন না। পাক্কা একবছর আটমাসের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় পাণ্ডুলিপিটি তৈরি করতে পেরেছিলেন তিনি। কিন্তু যে-জিনিসটা খোয়া গেছে তা তো অমূল্য; চূড়ান্ত ড্রাফটে সত্যজিৎ নিশ্চয় অনেক ঘষামাজা করেছেন, বিভিন্ন তথ্য যোগ করেছেন, কিছুটা সংশোধন করেছেন। হয়তো আরও কিছু। কিন্তু তা পাওয়ার সুযোগ থাকল না। এ-বই পরে অনুবাদে ‘অপুর পাঁচালি’ নামেই প্রকাশিত হয়।

 

৩.
সত্যজিৎ চলচ্চিত্র নির্মাণকে বলতেন ‘ছবি-তোলা’। আর উনিশশ বায়ান্নসালের শরতের এক বিকেলে তিনি ‘পথের পাঁচালী’র ‘ছবি-তোলা’ শুরু করেছিলেন। তখন সত্যজিৎ ব্রিটিশ বিজ্ঞাপন কোম্পানির একজন আর্ট ডিরেক্টর ছিলেন। কাজ করে আসছেন দশ বছর ধরে। বছরখানেক আগেও ভাবেননি তিনি পেশা হিসেবে ছবি-তোলাকে বেছে নেবেন। কিন্তু একজন আর্ট ডিরেক্টর হিসেবে সত্যজিৎ সৃষ্টিশীলতার পরিচয় দিতে পারছিলেন না; কারণ ওসব কাজ ছিল গৎবাঁধা। কিন্তু তিনি চাকরি করে যাচ্ছিলেন। চাকরিটা তার দরকার ছিল।

জীবিকা হিসেবে এরকম চাকরি বেছে নেওয়াটাও সত্যজিতের জন্য দৈব ঘটনা ছিল। ঠাকুরদা কিংবা বাবা কেউই ও-পথে যাননি। উপেন্দ্রকিশোর প্রতিভাবান ছিলেন; সত্যজিৎ মনে করতেন তিনি রেনেসাঁ-পুরুষ। লিখতেন, ছবি আঁকতেন, বেহালা বাজাতেন, গানরচনাও করতেন। পেশা হিসেবে দেশসেরা ছাপাখানা ছিল তাঁর। উপেন্দ্রকিশোর ছেলে সুকুমারকে ইংল্যান্ডে পাঠিয়েছিলেন ছাপার কাজ শেখার জন্য এবং দেশে ফিরে বাবার ব্যবসায় যোগও দেন। এর মধ্যে দুটো ঘটনা ঘটে। ১৯২১ সালে সত্যজিতের জন্ম হয় এবং তার ছবছর আগে ঠাকুরদা মারা যান। আবার, সত্যজিতের বয়স যখন আড়াই বছর সুকুমার রায়ও মারা যান। তিনিও লিখতেন, আঁকতেন এবং ছোটোদের জন্য পত্রিকা ‘সন্দেশ’ সম্পাদনা করতেন। মাত্র ছত্রিশ বছর বয়েসে এই বিরল প্রতিভার মৃত্যু হয় এবং মৃত্যুর তিনবছরের মাথায় ব্যবসার হাতবদল হয়। পরে একমাত্র সন্তান সত্যজিৎকে নিয়ে বিধবা মা তাঁর দাদার বাড়িতে আশ্রয় নেন। সত্যজিৎ মামার বাড়িতেই মানুষ। এখানেই তৈরি হয়েছিলেন ভারতবর্ষের এই শিল্পরত্ন মানুষটি।

সত্যজিৎ নিজেই রেনেসাঁর সময়কার মতোই বহুমুখী প্রতিভা নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। উনিশশতকে রেনেসাঁ পুরুষদের মধ্যে আমরা সেসব উদ্যোগ-উদ্যম ও শক্তি দেখি সত্যজিতের মধ্যে সবই ছিল বিরাজমান। ছবি আঁকতেন, সংগীত জানতেন, সাহিত্য করতেন, পত্রিকা-সম্পাদনা করতেন, চিত্রনাট্য লিখতেন, চলচ্চিত্র নির্মাণ করতেন ইত্যাদি।

আসলে সত্যজিৎ নিজেই রেনেসাঁর সময়কার মতোই বহুমুখী প্রতিভা নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। উনিশশতকে রেনেসাঁ পুরুষদের মধ্যে আমরা সেসব উদ্যোগ-উদ্যম ও শক্তি দেখি সত্যজিতের মধ্যে সবই ছিল বিরাজমান। ছবি আঁকতেন, সংগীত জানতেন, সাহিত্য করতেন, পত্রিকা-সম্পাদনা করতেন, চিত্রনাট্য লিখতেন, চলচ্চিত্র নির্মাণ করতেন ইত্যাদি। এসবের মধ্যে কোনটাতে যে তার প্রতিভা বেশি ছিল তা বলা শক্ত। তবে চলচ্চিত্র নির্মাণেই সবচেয়ে বেশি পারঙ্গমতা দেখিয়েছেন সত্যজিৎ। আর চলচ্চিত্রের প্রতি তাঁর আগ্রহ আমরা দেখতে পাই সেই ছেলেবেলা থেকে। যখন তিনি স্কুলের ছাত্র। স্কুলে পড়ার সময়েই পাঠ্যবইয়ের পড়াকে ফাঁকি দিয়ে চলচ্চিত্র-বিষয়ক পিকচারগোয়ার-ফোটোপ্লে গোগ্রাসে পড়তে দেখি। তখন হেড্ডা হপার ও লুয়েলা পার্সন্সের লেখা হলিউডি গুজব তাঁর মনকে খুব দোলা দিত। এ-সময়েই ডিয়েনা ডার্বিন তাঁর প্রিয় অভিনেত্রী হয়ে উঠেছিলেন। ডিয়েনা ডার্বিনের ললিত চেহারা, জাদুকরি অভিনয়-নৈপূণ্যর কারণেই নয়; তাঁর ‘সোপ্রানো’ কণ্ঠও তাঁকে আকর্ষণ করত। ফ্রেড অ্যাস্টেয়ার ও জিঞ্জার রজার্সও সত্যজিতের কাছে প্রিয় হয়ে উঠেছিলেন। এতটাই যে, এই দুই অভিনেতা-অভিনেত্রীর প্রতিটি ছবি সত্যজিৎ বারবার দেখেছেন। এদের অভিনয়ই তাঁকে টানত না; ছবিতে আরোপিত আর্ভিং বার্লিন ও জেরোম কার্নের দেওয়া সুরও তিনি উপলব্ধি করতে চাইতেন।

এ তো গেল চলচ্চিত্রের প্রতি আগ্রহের কথা; এরসঙ্গে সংগীতও তাঁকে অনিবার্যভাবে বেষ্টন করে তুলেছিল। কেননা ভারতীয় সংগীত, বিশেষ করে রবীন্দ্রসংগীতের আবহে সত্যজিৎ বড়ো হচ্ছিলেন। মাতৃকুলের সকলেই গান গাইতেন। ছোটোবেলায় রবীন্দ্রসংগীতের বাইরে ওয়াল্জ ও মার্চ শুনতেন। জন্মদিনের উপহার হিসেবে পাওয়া খেলনা-গ্রামোফোন তাঁকে পাশ্চাত্যসংগীতে রপ্ত করার সুযোগও এনে দেয়। শুধু তাই নয় জনপ্রিয় ওয়ার্ল্ড ক্লাসিক ভোর্জাকের নিউ ওয়ার্ল্ড সিম্ফনি, চাইকোভস্কির পিয়ানো কনচের্টো, লিটসের হাঙ্গেরিয়ান র‌্যাপসডি প্রভৃতির সঙ্গেও তাঁর পরিচিতি ঘটে। তখন থেকেই হাত-খরচা জমিয়ে রেকর্ড কিনতে শুরু। পয়সার অভাবে চোরাবাজার থেকে সেকেন্ডহ্যান্ড রেকর্ড কিনতেন। বেঠোফেনের এগমন্ট ও কোরিওলান ওভারচার্সের রেকর্ড সত্যজিতের কমবয়েসের সংগ্রহ।

কলেজে উঠে সত্যজিতের আগ্রহটা পালটাতে থাকে। চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে তারকার পরিবর্তে মন চলে যায় পরিচালকদের ওপর। এর পেছনে কারণও আছে; তখন তিনি চলচ্চিত্রতত্ত্বের ওপর পুডভকিনের বইদুটো পড়েন। পড়ার ফল হিসেবে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিও পালটে যায়। এমনটাই যে এতদিনকার বুঁদ করা গ্রেট গার্বে, মারলিন ডিয়েট্রিখ, গ্যারি কুপার, ক্যারি গ্র্যান্টের পরিবর্তে মন ঝেঁকে বসে আর্নস্ট লুবিশ, জন ফোর্ড, ফ্র্যাংক কাপরা, উইলিয়াম ওয়াইলার, জর্জ স্টিভেনস প্রমুখ। ‘সাইট অ্যা- সাউন্ড’ পত্রিকার হাল সংবাদ নতুন জগতের দিকে তাঁকে ধাবিতও করে। সুতরাং নামকরা অভিনেতা-অভিনেত্রী কী করেন না-করেন, এটা নয়; নজর চলে যায় চলচ্চিত্রের অন্তরালের দিকে। চিত্রগ্রাহকরা ছবি তুলতে ক্যামেরা কীভাবে কাজে লাগান, কোন দৃশ্য কোথায় কাট করা হয়, গল্প কীভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়, এর বৈশিষ্ট্যাবলিই-বা কী— এসব তাকে আকর্ষণ করতে থাকে। এমনকি কীসব বৈশিষ্ট্যগুণে একেক পরিচালকের কাজ স্বতন্ত্র হয়ে ওঠে— তাও তিনি রপ্ত করা শুরু করেন। সংগীতের ক্ষেত্রেও বড়ো পরিবর্তন এসে গেল, তাঁকে টানতে শুরু করলো পাশ্চাত্য ধ্রুপদীসংগীত। স্বুলজীবনের সেই আগ্রহের কথা আগেই আমি বলেছি। সারাবিশ্বের বিখ্যাতসব সংগীতরেকর্ড তখন তাঁর শয্যাসঙ্গী হয়ে উঠেছে। তারওপরে টোভির চার-ভল্যুমের ‘এসেজ ইন মিউজিক্যাল অ্যানালিসিস’ গ্রন্থ নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে। অভ্যাস হয়ে উঠেছিল মিনিয়েচার স্কোরের দিকে চোখ রেখে রেকর্ড শোনাও।

 

৪.
ফিল্ম আর পাশ্চাত্যসংগীত দুয়েই যাঁর জীবন; কলেজশিক্ষা তো তাঁর লাটে উঠবেই। আগ্রহও নেই বিজ্ঞানের বিষয়গুলোতে। তাই ডিগ্রিতে এসে ইকনোমিক্স নেওয়া হলো। সেটাও যে খুব ভালো লাগত তাও না। অনার্স শেষ করেই দৌড়াতে হলো এবার শান্তিনিকেতনে। সত্যজিৎ ঠিক করে নিলেন কমার্শিয়াল আর্টিস্ট হবেন। যেহেতু ঠাকুরদা উপেন্দ্রকিশোর ও বাবা সুকুমারও এই পেশায় ছিলেন। পেইন্টিং আর ইলাস্ট্রেশন। একটা স্বাভাবিক ঝোঁকও ছিল তাঁর এ ব্যাপারে। কিন্তু ডিপ্লেমা কোর্সে ভর্তি হয়েও শেষ করতে পারলেন না, আড়াইবছরের মাথায় বেরিয়ে গেলেন। কিন্তু এই আড়াইবছর তাঁকে শিল্পবিদ্যায় অসামান্য কিছু দিয়েছিল। শিখতে গিয়েছিলেন ভারতীয় শিল্পবিদ্যা, চেতনাজুড়ে বসল পশ্চিমা-ঐতিহ্যের নন্দনতত্ত্ব— রেমব্রান্ট, ভিঞ্চি তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করল। এছাড়া চিনে ল্যান্ডস্কেপ, জাপানি কাঠখোদাই ইকিউয়েও টানল খুব। ভারতীয় মিনিয়েচারও সত্যজিৎকে নতুন করে ভাবাল। নিজের শিল্পবোধকে উসকে দিল। এসময়ে তিনি দেখতে যান প্রাচীন ভারতীয় শিল্পৈশ্বর্যের তিন তীর্থক্ষেত্র— অজন্তা, ইলোরা ও খাজুরাহ। সত্যজিতের দেখার চোখ খুলে গেল এবার।

শিখতে গিয়েছিলেন ভারতীয় শিল্পবিদ্যা, চেতনাজুড়ে বসল পশ্চিমা-ঐতিহ্যের নন্দনতত্ত্ব— রেমব্রান্ট, ভিঞ্চি তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করল। এছাড়া চিনে ল্যান্ডস্কেপ, জাপানি কাঠখোদাই ইকিউয়েও টানল খুব। ভারতীয় মিনিয়েচারও সত্যজিৎকে নতুন করে ভাবাল। নিজের শিল্পবোধকে উসকে দিল। এসময়ে তিনি দেখতে যান প্রাচীন ভারতীয় শিল্পৈশ্বর্যের তিন তীর্থক্ষেত্র— অজন্তা, ইলোরা ও খাজুরাহ। সত্যজিতের দেখার চোখ খুলে গেল এবার।

নিজেকে তৈরি করার ক্ষেত্রে শান্তিনিকেতনের আরও দুই প্রভাবের কথা বলতে হয়। জন্ম থেকেই সত্যজিৎ শহুরে ছিলেন। গ্রামকে নিবিড়ভাবে দেখার সুযোগ হয়নি আগে; শান্তিনিকেতন গ্রাম্যবেষ্টনীতে থাকায়, তখন বের হওয়া যেত গ্রামের ভিতরে, স্কেচও করা হতো গ্রামে গিয়ে। ফলে গ্রামাবাংলার রূপবৈচিত্র্য তিনি দেখতে পেলেন কাছ থেকেই; অনুভব করতে পারলেন প্রকৃতির ভিতরে অবস্থান করেই। প্রকৃতি ও মানুষের পারস্পরিক সহাবস্থানও স্পষ্ট হলো তাঁর কাছে। দ্বিতীয়টি হচ্ছে, শান্তিনিকেতনের জার্মান-ইহুদি অধ্যাপক অ্যালেক্সের সুবাদে পাশ্চাত্য ধ্রপদীর ভাণ্ডারে আবারও যুক্ত হওয়া গেল। ভদ্রলোকের সংগ্রহে ছিল অনেক ক্ল্যাসিকেল রেকর্ড আর হিজ মাস্টার্স ভয়েসের পোর্টেবল গ্রামোফোন। গ্রামোফোনে চেম্বার মিউজিক বাজত, সেটাতেই বিভোর থাকতেন সত্যজিৎ। শান্তিনিকেতনে তখনও সিনেমা হল হয়নি; সত্যজিতের তাই অস্থির লাগত। খবর পেতেন কলকাতায় ‘সিটিজেন কেন’ দেখাচ্ছে, কিন্তু ওই পর্যন্তই। কিন্তু চলচ্চিত্র-বিষয়ে পড়াশোনা বন্ধ হয়নি; লাইব্রেরিতে সিনেমার ওপর বইপত্র ছিল। সেখানেই পড়া হয় পল রথারের ‘দ্য ফিল্ম টিল নাউ’ এবং রেমন্ড স্পটিসউডের ‘অ্যা গ্রামার অব দ্য ফিল্ম’। এসব পড়ার অর্থ এই ছিল না যে সত্যজিৎ চলচ্চিত্র বানাবেন। তখন পর্যন্ত ছবি নির্মাণের চিন্তাও তাঁর মাথায় ছিল না। শুধুমাত্র একটা বিশেষ শিল্পমাধ্যমের প্রতি গভীর আগ্রহই তাঁকে এই রাস্তায় নিয়ে গিয়েছিল। ছবি বানানোর প্রেরণাও তাঁর মধ্যে ছিল না। একটা জায়গায় সত্যজিৎ লিখেওছেন যে, বরং চলচ্চিত্র-সংস্কৃতিটা বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়ে ভারতীয় ও বাংলা ছবির উৎকর্ষ কীভাবে বাড়ানো যায় সেই চিন্তাই তাঁর মাথায় কাজ করে।

যাই হোক কোর্স শেষ না-করেই শান্তিনিকেতন ছাড়লেন সত্যজিৎ। ওস্তাদ নন্দলাল বসুকে জানালেন পেইন্টার হওয়ার অভিলাষ তাঁর ভেতরে নেই। সুতরাং কমার্শিয়াল আর্টিস্ট হতে বাধা নাই— বসু তাঁকে অভিনন্দন জানান। যেহেতু এই আড়াই বছরে শিল্পক্ষেত্রে সত্যজিৎ অভতপূর্ব দক্ষতা অর্জন করে ফেলেছেন। বিশেষ করে জাপানি ক্যালিওগ্রাফিক তুলির ব্যবহারে তাঁর অভিনবত্ব। এ-সময়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে, জাপানিরা কলকাতায় বোমা ফেলে শহরের চেহারাই পালটে দিয়েছে। রাস্তাঘাটে মার্কিন সেনাদের ভীড়। মার্কিনিদের জন্যই হবে হয়তো, তখন কলকাতায় হলে হলে হলিউডের টাটকা ছবি প্রদর্শিত হচ্ছে। সে-সুযোগে সস্তা বাজারদরে তখনকার বিখ্যাতসব ছবির একটাও বাদ দিলেন না সত্যজিৎ।

 

৫.
কলকাতায় ফিরে নতুন বোধোদয়ও হলো; চাকরি একটা তাঁকে জোগাড় করতেই হবে। বড়ো মামা মারা যাওয়ায় হঠাৎ করে সংসারের সদস্যসংখ্যাও বেড়ে গেছে। বাড়িভরা লোকজন, কিন্তু উপার্জনোক্ষম একজনই; বিমা-কোম্পানির আশ্রয়দাতা ছোটো মামা। তিনিও বিয়ে করেছেন। মা সামান্য আয়রোজগার করেন বিধবাশ্রমে সূচিকর্ম শিক্ষা দিয়ে; সেটাও বলার মতো নয়। সুতরাং চাকরি একটা চাই। এবং বলা যায় অনায়াসেই পাওয়া গেল তা; ব্রিটিশ বিজ্ঞাপনী প্রতিষ্ঠান ডি জে কিমার অ্যান্ড কোম্পানিতে। কলকাতা অফিসের বাঙালি ম্যানেজার দিলীপকুমার গুপ্ত ওরফে ডি কে গুপ্ত কোম্পানির সঙ্গে যোগসূত্র করে দিয়েছিলেন। আর স্বল্পবেতনে চাকরি দিলেন ব্রিটিশ ম্যানেজিং ডিরেক্টর মিস্টার ব্লুম।

উনিশশ তেতাল্লিশেই সত্যজিৎ কিমারে যোগ দেন আর্ট ডিরেক্টর অন্নদা মুন্সির শিক্ষানবিশ হিসেবে। কেননা ক্যাপশান, কপি, ইলাস্ট্রেশন, লেগো প্রভৃতি শান্তিনিকেতনের বিদ্যার একেবারেই বাইরে ছিল। সত্যজিতের মাথার উপরে ছিলে ডি কে গুপ্ত। তাঁর আবার আগ্রহ ছিল পুস্তক-প্রকাশনায়। কিছুদিনে মধ্যেই চাকরিরত অবস্থায় তিনি বিখ্যাত সিগনেট প্রেস প্রকাশনা-প্রতিষ্ঠান করেন। সিগনেট প্রেসের বইয়ের প্রচ্ছদ ডিজাইনের ভার পড়ল সত্যজিতেরই ওপর। আর এতে বিশুদ্ধ বঙ্গীয় মোটিফে অলংকৃত প্রচ্ছদ, হস্তলিপির আদলে গ্রন্থনাম কিংবা তুলি বা কলমে-আঁকা-ছবিতে তিনি অদ্ভুত সৃষ্টিশীলতা ও পারঙ্গমতা দেখাতে শুরু করলেন। সঙ্গে কোম্পানির বিজ্ঞাপন-কাজের লে-আউট ও বুক-ডিজাইনও চলতে লাগল।

কদিনের মধ্যেই প্রকাশিত বইগুলো শিল্পসাফল্যের সঙ্গে বাণিজ্যিক সাফল্য অর্জন করায় সিগনেট প্রেস নামকরা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। গোড়ার দিকে এঁরা কবিতার বইই প্রকাশ করে এবং প্রকাশনা জগতে হইচই ফেলে দেয়। কেননা কবিতার বই কম চলত বলে কবিরা সম্মানীও পেতেন না বলতে গেলে। সিগনেট-প্রকাশিত বইগুলো এবার হু হু করে বিক্রি হতে থাকে। কবিতার বইয়ের একাধিক সংস্করণও বের হতে থকে। এতে প্রকাশকের সঙ্গে লাভবান হলেন কবিরাও। তাঁরা রয়্যালিটি পেতে লাগলেন। এটা একটি বড়ো ঘটনাও। কবিতার বইয়ের সাফল্যের পর ডি কে গুপ্ত কথাসাহিত্যের দিকে ঝুঁকলেন। সেখানেও ডিজাইনার সত্যজিৎ রায়।

উনিশশ চুয়াল্লিশ সালে ডি কে গুপ্ত ‘পথের পাঁচালী’র কিশোরপাঠ সংক্ষিপ্ত সংস্করণ প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নেন। সেটার ডিজাইনারও যথারীতি সত্যজিৎ হবেন। কিন্তু বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অপূর্ব সেই সৃষ্টিকর্ম তখনও সত্যজিতের পড়া হয়ে উঠেনি। কারণ তাঁর সত্যিকার মনোযোগ ছিল চলচ্চিত্র ও সংগীতে। সাহিত্য বলতে বিদেশি কিছু গল্প-উপন্যাস পড়েছেন। রবীন্দ্রনাথও তখন তাঁর পড়া হয়ে উঠেনি। ডি কে গুপ্ত সত্যি অবাক হলেন এবং ‘পথের পাঁচালী’ পূর্ণাঙ্গ বইটি পড়ার জন্য হাতে তুলে দিলেন। বইখানা প্রথমপাঠেই সত্যজিৎ মুগ্ধ ও বিস্মিত হলেন। এটি যে একটি সত্যিকারের সাহিত্যকীর্তি তিনি নিঃসন্দেহ হলেন। মনে হলো বাংলার গ্রামজীবন এই বইয়ে নিখুঁতভাবে প্রতিফলিত হয়েছে এবং এখানকার প্রত্যেকটি চরিত্রই জীবন্তসৃষ্টি। কিশোরপাঠ্য সংক্ষিপ্ত সংস্করণটিও সত্যজিৎ পড়লেন; মনে হলো সংক্ষিপ্ত হলেও পরিপাটিভাবে কাজটি করা হয়েছে। প্রধান প্রধান চরিত্র ও ঘটনা কোথাও বাদ পড়েনি এবং কাহিনিরও অঙ্গহানী হয়নি কোথাও। ভালোবাসা ও অন্তরের উপলব্ধি মিশিয়ে বইটির প্রচ্ছদ-ইলাস্ট্রেশান সব করলেন সত্যজিৎ। সেটাও সর্বত্র প্রশংসিত হলো।

ডি কে গুপ্ত নিজেও একজন চলচ্চিত্র অনুরাগী ছিলেন। কোম্পানিতে যোগ দেওয়ার আগে সিনেমা-পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। তিনিই একদিন ‘পথের পাঁচালী’র চলচ্চিত্রায়ন নিয়ে সত্যজিতের কাছে কথা তুললেন। অবশ্য তা ছিল কথাপ্রসঙ্গে। তাঁর কথা ছিল সংক্ষিপ্ত সংস্করণ অবলম্বনে ‘পথের পাঁচালী’র চমৎকার একটা ফিল্ম হতে পারে। কথাটা মনে ধরেছিল সত্যজিতের।

 

৬.
নেশা সংগীত আর চলচ্চিত্র; পেশা কমার্শিয়াল আর্ট এ নিয়ে কেটেই যাচ্ছিল সত্যজিতের দিন। এদিকে সিগনেট প্রেস থেকে নিজের ডিজাইন-করা বাবার ‘আবোল-তাবোল’ ও ‘হ-য-ব-র-ল’ও প্রকাশিত হয়েছে নান্দনিকভাবে। যথারীতি বেস্ট সেলারও হয়েছে। সে-সময়ে সমসাময়িক পত্রিকার একটি প্রবন্ধ-সূত্রে নীরোদচন্দ্র চৌধুরীর সঙ্গে পরিচয়। প্রবন্ধটির বিষয় ছিল পাশ্চাত্য ধ্রুপদী সংগীত। নীরোদচন্দ্রও পাশ্চাত্য ধ্রুপদীর ভক্ত ছিলেন। প্রথমদিনের পরিচয়েই গ্রামোফোন-যন্ত্রে হাইডনের কোয়ার্টেটসহ অন্যান্য রেকর্ড বাজিয়ে শোনালেন। এরপর নিয়মিত তাঁর বাড়িতে পাশ্চাত্য ধ্রুপদী শুনতে যেতেন সত্যজিৎ। নীরোদের বাড়িতে দুষ্প্রাপ্যসব কালেকশন ছিল।

সে-সময়ে নর্মান ক্লেয়ার নামক ব্রিটিশ রয়্যাল এয়াফোর্সের এক ইনটেলিজেন্সের সঙ্গেও সত্যজিতের পরিচয় হয়; তিনিও গানপাগল ছিলেন। এরকম আরও কিছু সংগীত ও ফিল্মপাগল মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ে এবং বন্ধুত্ব হয়ে ওঠে। সপ্তাহান্তে ফিল্মদেখা অভ্যাসে পরিণত হয়। হয়তো ফিল্ম দেখতে গিয়ে আরও লোকের সঙ্গে পরিচয়-যোগাযোগের গণ্ডী বাড়ছে। এসময় ইউনাইটেট স্টেটস ইনফরমেশন সার্ভিসের লাইব্রেরিতে ‘থিয়েটার আর্টস’ পত্রিকার সংখ্যাগুলো পড়তে যেতেন সত্যজিৎ; সেখানেই বংশী চন্দ্রগুপ্তের সঙ্গে পরিচয় হয়। তিনিই পরে ‘পথের পাঁচালী’র আর্ট ডিরেক্টরের দায়িত্ব পালন করেন। এই বংশী কাশ্মিরী ছিলেন; পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন পেইন্টিং। কিন্তু চলচ্চিত্র-শিল্প নিয়ে ছিল তাঁর ব্যাপক আগ্রহ ও পড়াশোনা। সম্পর্ক জমে গেলে ফিল্মই হয়ে উঠল দুজনের আলোচনার মুখ্য বিষয়। দুজনের চিন্তার একটা জায়গায় বড়ো মিল যে ভারতীয় ফিল্মের ওপর দুজনেই ছিলেন বেজায় অখুশি এবং দুজনেই চাইতেন এব্যাপারে কিছু একটা করা।

 

৭.
সেই কিছু একটা করা হলো উনিশশ সাতচল্লিশে; কলকাতা ফিল্ম সোসাইটির প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। অবশ্য এর মধ্যে ঘটে-যাওয়া ঘটনাগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের ব্রিটিশবিদায়ে ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান এবং দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে দেশভাগ। এর প্রভাব সমাজ ও ব্যক্তিজীবনে তো ছিলই। ফিল্ম সোসাইটি প্রতিষ্ঠায় প্রধান সারথী ছিলেন দুজন। একজনের কথা আগে উল্লেখ করা হয়েছে; বংশী চন্দ্রগুপ্ত অপরজন চিদানন্দ দাশগুপ্ত। চিদানন্দ হাজারিবাগের লোক; পেশায় ইংরেজির অধ্যাপক, সাহিত্য করেন; ‘পরিচয়’গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। হাজারিবাগে সিনেমাহল থাকলেও সেখানে বিদেশি সিনেমা দেখানো হতো না, চিদানন্দ এমনকি চার্লি চ্যাপলিনের ছবিপর্যন্ত দেখেননি। আবার, তাঁর বাবা ছিলেন ব্রাহ্মসমাজের প্রচারক, সিনেমা দেখাকে তিনি পাপজ্ঞান করতেন। সত্যজিতের সংস্পর্শে এসে তাঁরই দোসর হয়ে উঠলেন এবার। বিভিন্ন লেখায় চিদানন্দ এটা স্বীকারও করেছেন। সিগনেটে সত্যজিৎই তাঁকে চাকরি দিয়ে নিয়ে আসেন। সত্যজিৎ ভালো ছবির খবর পেলেই আর সকলের মতো তাঁকেও জানাতেন; টিকেট কিনে নিয়ে আসতেন। ডেভিড লিনের ‘ব্রিফ এনকাউন্টার’ সত্যজিৎই তাঁকে দেখিয়ে দলে টানেন। ছবিটি সত্যজিৎ দেখেছিলেন চিদানন্দের মতে, দশ-পনেরো বারের কম নয়। যাই হোক বংশী চন্দ্রগুপ্ত ছিলেন সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, আর চিদানন্দ দাশগুপ্ত যুগ্ম সম্পাদক। সর্বমোট পঁচিশজন সদস্য নিয়ে সত্যজিতের ফিল্ম সোসাইটি যাত্রা শুরু করে। সোসাইটির প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ভালো ছবি জোগাড় করা, তা দেখা; অন্যকে দেখানোর সুযোগ দেওয়া এবং ফিল্ম নিয়ে আলাপ-আলোচনা। প্রথম প্রথম সত্যজিৎদের বাড়ির বৈঠকখানায়ই ফিল্ম দেখতেন সবাই মিলে। প্রথম দেখানো হয়েছিল আইজেনস্টাইনের ‘ব্যাটলশিপ পোটেমকিন’। ছবিটি সংগ্রহ করা হয়েছিল ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউটের কাছে থেকে। এরপর দেখানো হয় ‘দ্য গ্রেট ওয়ালজ’। এটি সংগ্রহ করা হয় মেট্রো-গোল্ডউইন-মেয়ারের পরিবেশকের কাছ থেকে। এভাবে হলিউড পরিবেশকের কাছ থেকেও পয়সার বিনিময়ে ছবি জোগার করা হতো। এতে মুখ্য ভূমিকা ছিল সত্যজিতের।

এছাড়া হলিউডের ছবির প্রধান বৈশিষ্ট্য কারিগরি নৈপূণ্য, ভারতের পক্ষে যেটা কোনোভাবেই আয়ত্ত করা সম্ভব নয়। সুতরাং ভারতীয় ফিল্মে চাকচিক্যের পরিবর্তে কল্পনাশক্তি ও জীবনের প্রতি সততাকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন বলে তাঁর মত।

সেই সময়েই ‘স্টেটসম্যান’ পত্রিকায় সত্যজিতের চলচ্চিত্র-বিষয়ক প্রথম রচনা ‘হোয়াট ইজ রং উইথ ইন্ডিয়ান ফিল্মস’ প্রকাশিত হয়। এই প্রবন্ধে সত্যজিতের চলচ্চিত্র-বিষয়ক মনোভাবের প্রকাশ ঘটে এবং ভারতীয় চলচ্চিত্রের হাল-হকিকত ও ভবিষ্যৎ নিয়েও নিজের মত প্রকাশ করেন। এ-মত থেকে আমার বিশ্বাস করতে অসুবিধা হয় না যে, ভারতীয় ছবির অপূর্ণতা থেকেই পরবর্তীকালে চ্যালেঞ্জ নিয়েই সত্যজিৎ ছবি-তোলার কাজে নামবেন। সত্যজিতের দৃষ্টিতে তখনকার গড়পড়তা মার্কিন ফিল্ম মডেল হিসেবে যুৎসই ছিল না। কেননা আমেরিকার জীবনবিন্যাসের সঙ্গে ভারতীয় জীবনবিন্যাসের এতটুকু মিল নেই। এছাড়া হলিউডের ছবির প্রধান বৈশিষ্ট্য কারিগরি নৈপূণ্য, ভারতের পক্ষে যেটা কোনোভাবেই আয়ত্ত করা সম্ভব নয়। সুতরাং ভারতীয় ফিল্মে চাকচিক্যের পরিবর্তে কল্পনাশক্তি ও জীবনের প্রতি সততাকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন বলে তাঁর মত। এমনকি এক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতাগুলোর উপলব্ধিও দারুণ কাজের হবে বলে তাঁর ধারণা। সত্যজিতের আরও ধারণা যে, ছবি বানাবার যন্ত্রপাতির ঘাটতিও এদেশে নেই। তাছাড়া কারিগরি সীমাবদ্ধতা স্বীকার করেও, যা আছে তাকে বুদ্ধি দিয়ে ব্যবহার করেই ভালো ছবি বানানো সম্ভব। প্রবন্ধের সার কথা হলো যে, ভারতীয় সিনেমার জন্য সবচেয়ে বড়ো দরকার নিজস্ব আঙ্গিক এবং সে-অনুযায়ী প্রকাশভঙ্গি, সর্বোপরি স্বতন্ত্রতা। ছবির সর্বত্র যেন ফুটে ওঠে ভারতীয়তা এবং দেখামাত্র যেন তা-ই অনুভূত হয়।

আমি এখানে এসব উল্লেখ করছি এই কারণে যে, পরবর্তীকালে সত্যজিৎ যখন ‘পথের পাঁচালী’ শুরু করবেন এবং একের পর এক ছবি তুলবেন তাতে দেখা যাবে এই কথাগুলো থেকে তিনি এক পা-ও নড়েননি। উনিশশ আটচল্লিশ ও উনপঞ্চাশ সালের দিকে সত্যজিৎ আরও কিছু প্রবন্ধ লিখেছিলেন। সেসব প্রবন্ধেও তাঁর চলচ্চিত্র-বিদগ্ধতা, আকাক্সক্ষা ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় মেলে।

রেঁনোয়ার ছবিগুলো বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ছিল; সত্যজিতের প্রিয় ছিল ‘দ্য সাদার্নার’ ছবিটি। এ-থেকে সত্যজিৎ দুটো শিক্ষা পেয়েছিলেন। এর একটি হচ্ছে ফিল্মের চরিত্রগুলোর মধ্যে কেউ বিশেষ ভালো হবে, আর কেউ বিশেষ মন্দ হবে; এটা দেখানোর আসলে প্রয়োজন নেই। বরং দোষেগুণে মানুষও দেখানো যেতে পারে। দ্বিতীয়টি হলো, নকল সেটে বাইরের দৃশ্য দেখানোর চেয়ে, লোকেশন বেছে দৃশ্যধারণ করাই ভালো।

৮.
উনিশশ উনপঞ্চাশ সালে জাঁ রেঁনোয়া কলকাতায় আসেন। উদ্দেশ্য ‘দ্য রিভার’ ছবি নির্মাণের জন্য লোকেশন বাছাই এবং অভিনেতা-অভিনেত্রী সংগ্রহ। সত্যজিৎ রেঁনোয়ার হলিউডে নির্মিত ছবিগুলোই দেখেছেন তখন পর্যন্ত। তা দেখেই তিনি তাঁর ভক্ত হয়ে পড়েছেন। রেঁনোয়ার ছবিগুলো বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ছিল; সত্যজিতের প্রিয় ছিল ‘দ্য সাদার্নার’ ছবিটি। এ-থেকে সত্যজিৎ দুটো শিক্ষা পেয়েছিলেন। এর একটি হচ্ছে ফিল্মের চরিত্রগুলোর মধ্যে কেউ বিশেষ ভালো হবে, আর কেউ বিশেষ মন্দ হবে; এটা দেখানোর আসলে প্রয়োজন নেই। বরং দোষেগুণে মানুষও দেখানো যেতে পারে। দ্বিতীয়টি হলো, নকল সেটে বাইরের দৃশ্য দেখানোর চেয়ে, লোকেশন বেছে দৃশ্যধারণ করাই ভালো। যাই হোক, সত্যজিতের সাক্ষাৎ হলো রেঁনোয়ার সঙ্গে। সেবার মাসখানেকের জন্য সস্ত্রীক এসেছিলেন; সপ্তাহান্তে সত্যজিৎ আলাপ-আলোচনা করতেন। রেঁনোয়া অত্যন্ত বিনয়ী ও বন্ধুসুলভ ছিলেন; সত্যজিৎ তাঁর কাজ সম্পর্কে এত জানেন দেখে বিস্মিতই হয়েছিলেন। কথা হয় রেঁনোয়ার সঙ্গে মার্কিন ও ফরাসি ফিল্ম নিয়েই। জানতে পারেন নিও-রিয়ালিস্টদের আগেই তিনি সরাসরি লোকেশনে গিয়ে চিত্রধারণ শুরু করেছিলেন। এমনকি অরসন ওয়েলসের ‘সিটিজেন কেনে’র চারবছর পূর্বে রেঁনোয়া ‘দ্য রুলস অভ দ্য গেমে’ ডিপ ফোকাস ব্যবহার করেন। রেঁনোয়ার চোখই ছিল একটা ক্যামেরা। এতটা পর্যবেক্ষণ করতে পারতেন যে সত্যজিৎ বিস্মিত হতেন। গাছ-গাছালি, মাঠ, মানুষ, বাড়িঘর, পুকুর, জঙ্গল, পশুপাখি, ঘাস-লতা প্রভৃতি এতটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতেন যে তা পরে সত্যজিৎকেও প্রভাবিত করে।

জাঁ রেঁনোয়ার সঙ্গে সত্যজিতের সাক্ষাৎকার ভারতীয় সিনেমার জগতে নাটকীয় ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। সত্যজিৎ স্বীকার করেছেন ছবি-তোলার ব্যাপারটা রেঁনোয়াই তাঁর মাথায় ঢুকিয়ে দেন। সত্যজিৎকে সরাসরি প্রশ্ন করেছিলেন, সত্যজিৎ চলচ্চিত্রকার হতে চান কিনা? তখন, উত্তরে সাতপাঁচ না-ভেবেই সত্যজিৎ উত্তর দেন, হ্যাঁ। বিষয়ের প্রসঙ্গে ‘পথের পাঁচালী’র কথাই বলেন এবং গল্পটাও শুনে নিলেন রেঁনোয়া। পূর্বেও বলেছি বিষয়টা তাঁর মাথায় ছিল আগে থেকেই। তখনও সত্যজিতের মনে সংক্ষিপ্ত সংস্করণের কাহিনি। পরে রেঁনোয়াকে কিছু বাংলা ছবিও দেখান। লাভ হলো এই যে রেঁনোয়া মন্তব্য করলেন হলিউডের ছবি নকল না-করে তোমরা নিজেদের ছবিই বানাতে পারো। তোমরা চাইলেই ঘুরে দাঁড়াতে পারো। কথাটা খুব মনে ধরল সত্যজিতের। রেঁনোয়ার সঙ্গে এই সাক্ষাৎকার সত্যজিৎ লিখেওছিলেন লিন্ডসে এন্ডারসন-সম্পাদিত ব্রিটিশ ফিল্ম ম্যাগাজিন ‘সিকোয়েন্সে’।

রেঁনোয়ার সঙ্গে দেখা হওয়ার বছরেই সত্যজিৎ বিজয়া দাশকে বিয়ে করেন। সম্পর্কে তিনি তাঁর মামাতো বোন ছিলেন। ফিল্ম ও সংগীতে দুজনের সমান রুচি ছিল। সত্যিকার অর্থে বিজয়া ছিলেন সত্যজিতের সুযোগ্য সঙ্গী। বিজয়ার সঙ্গে প্রেম-ভালোবাসা ও দাম্পত্য-যুক্ততা তাঁর পথহাঁটা ও জীবনকে সহজ করে দিয়েছিলে। সত্যজিৎ এ-সময়েই চিত্রনাট্য লিখতে শুরু করেন। তবে, অবশ্যই তা ‘পথের পাঁচালী’র নয়। সত্যজিতের কথায়, ¯্রফে মজা লাগত বলে এই লেখা। এর পেছনে কারণও আছে যে, তখন তাঁর হাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বই এসে পড়েছিল। জন গ্যাসনার ও ডাডলি নিকল্সের ‘টুয়েন্টি বেস্ট ফিল্স প্রেজ’। বইটি খুব মনোযোগ দিয়ে পড়েছিলেন সত্যজিৎ। এর মধ্যে কিছু দেখাও ছিল। সুতরাং চিত্রনাট্যের সঙ্গে ছবিগুলো মনের আয়নায় মিলিয়ে নিতেন সত্যজিৎ; সব চরিত্র, সব দৃশ্য। সত্যজিতের এও মনে হয়েছিল চলচ্চিত্র সফল হওয়ার অর্ধেক কৃতিত্ব আসলে চিত্রনাট্যকারেরই। অথচ বাস্তবে তা হয় না।

চিত্রনাট্য রচনার ক্ষেত্রে সত্যজিতের কৌশলটা ছিল অভিনব। ফিল্ম করবেন এমনটা মাথায় না এনেই স্রেফ চিত্রনাট্য রচনা করার জন্য একের পর এক চিত্রনাট্য রচনা করতে শুরু করলেন। নিজেকে কঠিন পরীক্ষায় ফেলে দিতেও তিনি কুণ্ঠিত হলেন না। যেমন, কোথাও শুনলেন এই উপন্যাস অবলম্বনে চলচ্চিত্র হতে যাচ্ছে। সত্যজিৎ নিজেও চিত্রনাট্য রচনা করলেন সে-উপন্যাস অবলম্বনে। ফিল্মটি মুক্তি পেলে নিজের চিত্রনাট্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতেন গোটা ছবি। এমনকি ফিল্মটি দেখে দ্বিতীয়বারও চিত্রনাট্য লিখে নিতেন তিনি। কখনও মনে হতো ফিল্মের চিত্রনাট্যের তুলনার তাঁর চিত্রনাট্যটি যথার্থ। এসময়ে সত্যজিৎ হরিসাধন দাশগুপ্তের জন্য রবীন্দ্রনাথের ‘ঘরে-বাইরে’র চিত্রনাট্য রচনা করেন। ছবিটা পরে আর হয়নি। এভাবে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বিলামসন’, শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ঝিন্দের বন্দির’ চিত্রনাট্যও তখন তিনি রচনা করেন। কিন্তু ডিরেক্টরদের সঙ্গে মতের অমিলে তা আর ফিল্ম হয়ে উঠেনি।

এদিকে উনিশশ পঞ্চাশে আবারও সদলবলে রেঁনোয়া কলকাতায় আসেন ‘দ্য রিভার’ করতে। হরিসাধনকে নিলেন সহকারী এবং বংশী চন্দ্রগুপ্তকে আর্ট ডিরেক্টর হিসেবে। রুমার গডেনের উপন্যাস অবলম্বনে ‘দ্য রিভারে’র চিত্রনাট্য লিখেছিলেন রেঁনোয়া নিজে। চিত্রনাট্যের একটা কপি সত্যজিৎকেও দেওয়া হয়েছিল। সত্যজিতের ইচ্ছে ছিল রেঁনোয়ার কাজের ধরন পুরাটাই পর্যবেক্ষণ করবেন। কিন্তু চাকরির ব্যস্ততা থাকায় সাপ্তাহিক ছুটির দিনের দুইবার ব্যতীত তা সম্ভব হচ্ছিল না। আর রেঁনোয়ার কাজ করার রীতিটাও দেখা হলো না শেষপর্যন্ত; সত্যজিৎকে সস্ত্রীক জাহাজে উঠতে হলো লন্ডনের উদ্দেশে।

 

৯.
জাহাজে লন্ডন যেতে সময় লেগেছিল ষোলোদিন। সত্যজিৎ ভাবলেন রেঁনোয়ার কাজ দেখতে না-পারার ক্ষতিটা পুষিয়ে নেবেন, লন্ডনে কালজয়ী চলচ্চিত্র দেখে ও হলে কনসার্ট শুনে। প্রতিভাবানদের ক্ষেত্রে এটাই হয়, ক্ষতিপূরণটা কোনো না কোনোওভাবে পুষিয়ে নেন। এছাড়া লন্ডনে তাঁর সেই স্বজনরা তো রয়েছেনই। ‘সিকোয়েন্স’ পত্রিকার নিষ্ট তিন সম্পাদক-কর্মী গ্যাভিন ল্যাম্বার্ট, লিন্ডেসে এন্ডারসন ও পিটার এরিকসন। এঁদের সঙ্গে পত্রযোগাযোগও আছে তাঁর।

জাহাজে সত্যজিৎদের দেখানো হতো হলিউডের নতুন নতুন ছবি। এটা একটা আনন্দের ব্যাপার। জাহাজে আর ছিল অফুরন্ত অবসর। সত্যজিৎ একটা নোটবই সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন ‘পথের পাঁচালী’র জন্য। এখান থেকেই ‘পথের পাঁচালী’ ছবি-তোলার ব্যাপারে কিছু মনে এলেই টুকে রাখতে শুরু করেন। অবশ্য এর আগেই বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে কথাবার্তা শুরু করেছিলেন তিনি। বিশেষ করে ডি কে গুপ্ত; ‘পথের পাঁচালী’তে কী থাকবে, কী থাকবে না; কে কোন ভূমিকায় অভিনয় করবেন, এমনকি বিশেষ দৃশ্য কীভাবে তোলা হবে তাও পরামর্শ দিতেন। বংশী চন্দ্রগুপ্তকে বিশেষ কিছু দৃশ্যের বর্ণনা সত্যজিৎ নিজেই দিতেন। রেলগাড়ি দেখা, পিসির মৃত্যু, হার-চুরি, ঝড়, বৃষ্টি; দুর্গার মৃত্যুও। বংশী এতেই খুশি; ‘পথের পাঁচালী’ নিশ্চয়ই দারুণ ছবি হবে। এর বেশি পরিকল্পনা সত্যজিৎ কাউকে জানাতেন না। যদিও ভিতরে ভিতরে অনেকটাই ঠিক করে রেখেছেন; কাজটা কীভাবে করবেন, কাকে দিয়ে কী করাবেন। তবু সংশয় কাটাতেই তাঁর সিদ্ধান্তগুলো বংশীকে বলতেন। শুটিং লোকেশন কেমন হবে, অনভিজ্ঞদের দিয়ে অভিনয় করানো, মেক-আপবিহীন ছবি ইত্যাদি ইত্যাদি। বংশী এটাকে অসম্ভব বলেই মত দিতেন। আর সত্যজিৎ মনে করতেন সত্যিকার শিল্পরূপ দিতে হলে এটাই জরুরি। জাহাজে সত্যজিৎ ‘পথের পাঁচালী’র অনেক নোট নিলেন।

লন্ডনে পৌঁছে সত্যজিৎ স্ত্রীকে নিয়ে আস্তানা গাড়লেন হ্যাম্পস্টেডে। পাশেই কিমার কোম্পানির অফিস। এখানেই তাঁকে কাজ করতে হবে। কিন্তু লন্ডন অফিসের আর্ট ডিরেক্টর মিস্টার বুলকে সত্যজিতের পছন্দ হলো না। এঁর কাছে শেখার মতো আসলে কিছু নেই। সত্যজিৎ কিমারের বদলে বেনসনের এজেন্সিতে কাজে যোগ দেন। কিন্তু নিজের যা কাজ তা করতে থাকেন প্রথম দিন থেকেই। বিষয় চলচ্চিত্র। ‘সিকোয়েন্সে’র কর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ হলো যথারীতি। ফিল্ম নিয়ে আলোচনা হলো সন্ধ্যার পর সন্ধ্যা। এখানে পরিচয় হয় পেনেলোপি হুস্টনের সঙ্গে। লিন্ডসের বাড়ির পার্টিতে দেখা ক্যাথারিন দ্য লা রোশ আর থরোল্ড ডিকিনসনের সঙ্গেও। ক্যাথারিন ছিলেন চিত্র-সমালোচক এবং ডিকিনসন ‘কুইন অব স্পেডস’-খ্যাত চলচ্চিত্রের পরিচালক। এঁদের সঙ্গে কথা বলে সত্যজিৎ নিজেকে ঋদ্ধ করতে পারলেন।

মেফেয়ারের কার্জন সিনেমায় সত্যজিৎ দুটি ছবি দেখেছিলেন পরপর শোতে; ‘অ্যা নাইট অ্যাট দ্য অপেরা’ এবং ‘বাইসিকল থিফ’। প্রথমটি আগেই দেখা ছিল, দ্বিতীয়বারে ভালোও লাগল। কিন্তু ‘বাইসিকল থিফ’ মনের ওপর প্রভাব ফেলে বেশি। ছবিটির ডিরেক্টর ডি সিকা মোক্ষম অভিনয়টা করিয়ে নিয়েছিলেন অভিনেতা-অভিনেত্রীদের দিয়ে। এঁরা ছিলেন অনভিজ্ঞ লোক। ‘বাইসিকল থিফে’ যাঁকে দৈবজ্ঞের চরিত্রে দেখানো হয়, তিনিই একমাত্র ও-ছবির পেশাদার অভিনেত্রী ছিলেন। লন্ডনে এই ছবিটা সত্যজিতের দেখা যথার্থ ছিল। এই ছবি দেখেই তিনি সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছিলেন ‘পথের পাঁচালী’ কাদের দিয়ে করাবেন এবং দৃশ্যগুলো কীভাবে তুলবেন। সত্যজিৎ জেনেছিলেন প্রয়োজনীয় নেগেটিভের অভাবে ডি সিকা পরিত্যক্ত নেগেটিভের মাধ্যমে ফিল্মটি করেছেন। তা সত্ত্বেও যথার্থ পরিকল্পনা, বাস্তবানুবর্তিতা, পরিমিতিবোধ, স্বাভাবিকতা এবং সম্পাদনার গুণে ‘বাইসিকল থিফ’ সর্বকালের মান্য ছবি হয়ে উঠেছে। এজন্য পরে যখন সত্যজিৎ ছবি তুলবেন সর্বজয়া, অপু কিংবা দুর্গা প্রভৃতি চরিত্রাভিনয়ে আনাড়িদের বেছে নিতে এবং বৃষ্টির মধ্যে শুটিং করতে মনে দ্বিধা কাজ করেনি।

লন্ডনে রেঁনোয়ার আরও ছবি দেখা হলো, বিশেষ করে ফরাসি ছবিগুলো; তাতেও সত্যজিৎ মনে অনেক শক্তি পেলেন। কিন্তু ‘বাইসিকল থিফ’ই যেন তাঁর আদর্শ হয়ে উঠল। লন্ডন ছাড়াও প্যারিস, ভেনিস, লুসার্ন ও সলজবুর্গেও একসপ্তাহ করে চারসপ্তাহ কাটালেন তাঁরা। সব জায়গায়ই বিখ্যাতসব ছবি দেখলেন। লুসার্ন ও সলজবুর্গের মিউজিক ফেস্টিভাল দিল তাঁকে অতিরিক্ত কিছু; নানাবিধ পাশ্চাত্য সংগীতের জীবন্ত ছোঁয়া। এই দান সত্যজিৎকে আমৃত্যু প্রেরণা ও শক্তি দিয়েছে।

সবমিলিয়ে ছয়মাস থাকা হলো ইউরোপে, আর এখানে সর্বমোট ফিল্ম দেখলেন নিরান্নব্বইটি। সত্যজিৎ একে বলছেন, জীবনের স্মরণীয় ঘটনা। যখন ফিরবেন লন্ডন থেকে, ‘চুসান’ জাহাজে করে; সেটিও অভাবনীয় ঘটনা। এটি ছিল এই জাহাজের প্রথম সমুদ্রযাত্রা। এবারও পক্ষাধিক কাল লাগল তীরে ভিড়তে। জাহাজের অসাধারণ পরিবেশ আর বিশালতায় এই ফিরতি পথেই সমাপ্ত হলো ‘পথের পাঁচালী’র প্রাথমিক চিত্রনাট্য। কিন্তু সেটা খসড়াই।

 

১০.
‘পথের পাঁচালী’র পূর্ণাঙ্গ চিত্রনাট্য সত্যজিৎ আদপে লিখেনইনি। অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানের বাকিও রয়ে গিয়েছিল। সেটা সমাপণ হলো দেশে ফিরে। আবার পরে যখন ‘ছবি-তোলা’ শুরু হলো তখনও নিজের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগালেন তিনি। রেঁনোয়া ‘দ্য রিভার’ শেষ করে চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু বংশী চন্দ্রগুপ্ত নিজেকে তৈরি করে নিয়েছেন। চিদানন্দও ফিল্ম সোসাইটি নিয়ে আছেন; সত্যজিৎ আসলে সোসাইটির কার্যক্রম বাড়ল। এবার সোসাইটির উদ্যোগে প্রথমে বুলেটিন ও পরে কোয়াটার্লি বেরুতে থাকে। এসব প্রকাশনায় সত্যজিৎ ইটালির নব্যরীতির ফিল্মসহ চলচ্চিত্র-বিষয়ক তাঁর মত-মতাদর্শ ও অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। এখানে একটা কথা বলা দরকার; সোসাইটি একসময় ষোলো মিলিমিটার ছবির পরিবর্তে পয়ত্রিশ মিলিমিটার ছবি দেখার বন্দোবস্ত করে। এরকম একটা মেক্সিকান ছবি ছিল ‘মারিয়া কান্দেলারিয়া’। ডিরেক্টর এমিলিও ফার্নান্দেজ; এবং অভিনেতা-অভিনেত্রী পেট্রো আরমান্দারিজ ও দলোরেম দেল রিও। ছবিটি ছিল ‘পথের পাঁচালী’র অনুরূপ। চিদানন্দ বলেছেন, ভাবতে গেলে মনে হয় যেন মেক্সিকোর ‘পথের পাঁচালী’। চিত্রনাট্য ও দৃশ্যকল্পনায় এ-ফিল্মও সত্যজিতের মনে রেখাপাত করতে পারে।

উনিশশ বায়ান্ন সালের গোড়ার দিকে কলকাতায় অনুষ্ঠিত হলো আন্তর্জাতিক ফিল্ম ফেস্টিভাল। সোসাইটি থেকে ফেস্টিভালের জন্য একশটি ফিল্মের তালিকা বুলেটিনে ছাপানো হয়। কর্তৃপক্ষ যাতে এগুলো প্রদর্শনের ব্যবস্থা করেন। ফেস্টিভাল ছিল ভারতের আর সকল প্রধান শহরেও। সত্যজিৎ ও তাঁর বন্ধুরা মিলে পাগলের মতো ছুটোছুটি করে গড়ে চারটি করে ফেস্টিভালে আটাশটির মতো ছবি দেখেন। আকিরা কুরোশাওয়ার ‘রশোমন’, ডি সিকার ‘মিরাকল ইন মিলান’, টাটির ‘জুর দ্য ফেথ’, রসেলিনির ‘ওপেন সিটি’সহ এসেছিল বিশ্বখ্যাত সকল চলচ্চিত্রকারের সব ছবি। সত্যজিৎকে সবচেয়ে বেশি নাড়া দিল জাপানি চলচ্চিত্র ‘রশোমন’। জাপানি চলচ্চিত্র সম্পর্কেও একটা ধারণা হলো তাঁর। ফিল্ম ফেস্টিভাল শেষে সত্যজিৎ নিঃসংশয় হলেন তিনি ছবিই তুলবেন। আর ‘পথের পাঁচালী’ই হবে তাঁর প্রথম ছবি।

 

১১.
বায়ান্ন সালে পুদভকিন ও চেরকাসভের আগমনও এক্ষেত্রে বড়ো একটা ঘটনা এবং সত্যজিৎ-মানসে তাঁদের প্রভাবও স্থায়ী। এদিকে জাহাজে শেষ-করা খসড়া চিত্রনাট্য তো আছেই; পূর্ণাঙ্গ করার ইচ্ছেও সত্যজিতের নেই। ছবিতে কাহিনির কোথায় কী হবে তার জন্য পূর্ণাঙ্গ চিত্রনাট্যের দরকারও ছিল না। কেননা সারাটা ঘটনা সত্যজিৎ মনের মধ্যেই গেঁথে নিয়েছিলেন। এছাড়া সংক্ষিপ্ত সংস্করণের কাহিনির সঙ্গে খসড়া চিত্রনাট্যের ব্যবধান তেমন ছিল না। তবে চিত্রনাট্য পরিকল্পনায় সত্যজিৎ কিছু পরিবর্তন আনেন, যেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে চলচ্চিত্রের কাহিনির জন্য অপ্রয়োজনীয় উপাদান ছেঁটে দিয়ে নতুনভাবে বিন্যস্ত করে ঠাস বুনট তৈরি। অপরগুলো হচ্ছে ইন্দিরা ঠাকুরণ ও দুর্গার মৃত্যু ইত্যাদি। উপন্যাসের কাহিনি অনুযায়ী পিসির মৃত্যু হয় অপুর জন্মের কদিন বাদে। কিন্তু চিত্রনাট্যে সত্যজিৎ পিসিকে বাঁচিয়ে রেখেছেন দুর্গার বয়স যখন দশ-এগারো, আর অপুর ছয়। সত্যজিতের মতে, এমন একটি চরিত্রকে এত অল্প সময়ের জন্য পর্দায় দেখালে দর্শক হতাশ হতে বাধ্য। দ্বিতীয়ত, ভাই-বোনে একসঙ্গে পিসির মৃতদেহ আবিষ্কারের দৃশ্য বইয়ে নেই। কিন্তু সত্যজিৎ গুরুত্বসহকারে বাঁশঝাড়ের মধ্যে অপু ও দুর্গাকে পিসির মৃতদেহ দেখিয়েছেন। মৃত্যু কী জিনিস সেটা তারা জানল। কেননা তাদের জীবনে এই মৃত্যুর একটা মূল্য তৈরি করবে; দর্শকের মনেও ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করবে। আবার বৃষ্টিতে ভেজার ফলে দুর্গার মৃত্যু হলো, এমনটা উপন্যাসে নেই। কিন্তু ঝড়ে-বৃষ্টিতে নাকাল হয়ে তার অসুস্থতা ও মৃত্যু, ছবিতে তা-ই দেখালেন সত্যজিৎ এবং দুর্গার মৃত্যুর পরে উপসংহারও টানলেন। পিতৃপুরুষের ভিটে ছেড়ে হরিহর-পরিবার কাশীতে রওয়ানা দিচ্ছেন।

এছাড়াও, উপন্যাসে দুর্গা দুবার চুরি করেছে; প্রথমবার পুঁতির মালা ও দ্বিতীয়বার সোনার কৌটো। পুঁতির মালা চুরির পর একটু খোঁজাখুঁজিতেই পাওয়া গেল, কিন্তু সোনার কৌটো অপু পেল নিশ্চিন্দিপুর ছাড়ার আগের দিন। চিত্রনাট্যে কেবল পুঁতির মালা চুরির ঘটনাই রাখা হয়েছে; প্রথম খোঁজায় তা পাওয়া যায়নি, অপু সেটা পায় গ্রাম ছাড়ার আগের দিন। সত্যজিতের কথায়, শুধু খুঁজে পেলেই হবে না, পাওয়ার মুহূর্তটিকেও ব্যঞ্জনাময় রাখা দরকার।

আরেকটি ঘটনা, হরিহরের পরিত্যক্ত ভিটায় সাপের প্রবেশ। এটি উপন্যাসে নেই। ছবিতে সত্যজিৎ সেটা দিলেন। নিজের কথায়, এটি অপ্রত্যাশিত কিন্তু অস্বাভাবিক নয়। আর পুরো ফিল্মে সাপের কোনো ভূমিকা নেই বলে হয়তো এই দৃশ্য লোকের মনে গভীর দাগ কাটে। যে-বাড়ি এতদিন ছিল মানুষের, এখন থেকে হবে সাপের বাসা। হয়তো এখানে সত্যজিতের আরও কোনো ইঙ্গিত আছে।

 

১২
সত্যজিৎ জানতেন এই যে নিজেকে তিলে তিলে গড়া; এই যে সারাপৃথিবীর ফিল্মকে চষেবেড়ানো; এই যে নব্যরীতির ফিল্মনির্মাণ তাতেও তাঁকে শরিক হতে হবে। নতুবা তাঁর এই প্রস্তুতি, এই সাধনা ও শ্রম সকলই বৃথা যাবে। আর ‘পথের পাঁচালী’ অন্যসাধারণ ভারতীয় ছবির মতো হবে না, এটাও তিনি জানতেন। ফলে পূর্ণাঙ্গ চিত্রনাট্যের পরিবর্তে নোটবুকে যত্ন সহকারে কমিক্সের ঢঙে একের পর এক স্কেচ এঁকে নিয়েছিলেন বিস্তারিতভাবে; স্থির করলেন এরূপ চিত্রনাট্য অবলম্বনেই দৃশ্যের পর দৃশ্যে কাহিনি এগোবে পরিণতির দিকে। প্রয়োজনে ছবি তুলতে গিয়ে যোগ করবেন আরও নতুন দৃশ্য, হয়তো ঘটনাও। করেও যে ছিলেন তার একটি বলি, অপু-দুর্গার ট্রেন দেখার দৃশ্যটি ছবি তোলার সময় হঠাৎ দেখা গেল চলে-যাওয়া-ট্রেনের কালো ধোঁয়া আকাশের উপর দিয়ে গড়িয়ে যাচ্ছে। এমনটা হবে সত্যজিৎ ভাবেননি কখনও, কিন্তু এটি দুর্দান্ত একটি দৃশ্য। দেখামাত্রই ক্যামেরার মুখ ঘুরিয়ে শটটা নেওয়া হলো। অথচ সেটাই হয়ে গেল ট্রেন দেখার দৃশ্যের শেষ শট। এরকম অনেক আছে। সুতরাং ‘পথের পাঁচালী’র চিত্রনাট্য বলতে যে-টুকু সত্যজিতের সৃষ্টি ছবির ইতিহাসে সেটা ব্যতিক্রম বলতেই হবে। তবে এরূপ চিত্রনাট্যের জন্য সত্যজিৎকে প্রডিউসারের দরজা থেকে যেমন ফিরতে হয়েছে, তেমনি অর্জন করতে হয়েছে নির্মম অভিজ্ঞতাও। প্রডিউসার-প্রত্যাখ্যাত সত্যজিৎকে তো পরে নিজের বিমা ভাঙিয়ে এবং বন্ধুদের কাছে হাত পেতে টাকা জোগাড় করতে হয়েছিল ফিল্মনির্মাণের জন্য। শুরু হয়েছিল ‘পথের পাঁচালী’র ‘ছবি-তোলা’ এক শারদ-বিকেলে; দীর্ঘ সাদা কাশফুলে-ছাওয়া এক মাঠে।


দায়

অনিল চৌধুরী : পথের পাঁচালী’র নেপথ্যে;
চিদানন্দ দাশগুপ্ত : পথের পাঁচালী’র পূর্বকথা;
দিলীপ বন্দ্যোপধ্যায় : পথের পাঁচালী’ : অজানা কথা;
বিজয়া রায় : আমাদের কথা;
রবিন উড : অপু ট্রিলজি (ভাষান্তর : চিন্ময় গুহ);
সত্যজিৎ রায় : ‘যখন ছোটো ছিলাম’, ‘অপুর পাঁচালি’ (‘মাই ইয়ার্স উইথ অপু’); ‘পথের পাঁচালী : চিত্রনাট্য প্রসঙ্গে’; ‘পথের পাঁচালী’র পঁচিশ বছর’, ‘চলচ্চিত্রের ভাষা : একটি দৃশ্যে’;
সুগত সিংহ : ‘বই থেকে ছবি : ‘পথের পাঁচালী’র উত্তরাধিকার’।

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

জন্ম সিলেটে, ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ২১ ডিসেম্বর। তিনি একাধারে কবি, আখ্যান-লেখক, প্রাবন্ধিক ও গবেষক। তাঁর এ-যাবৎ প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা তিরিশ। ‘নির্বাচিত কবিতা’ ও ‘কবিতাসংগ্রহ’ প্রকাশিত হয়েছে যথাক্রমে ২০১৭ ও ২০২০ খ্রিষ্টাব্দে। সর্বশেষ প্রকাশিত কাব্য ‘তিনভাগ রক্ত’ (২০২০), আখ্যান ‘একটা জাদুর হাড়’ (২০২০), ভ্রমণ-আখ্যান ‘না চেরি না চন্দ্রমল্লিকা’ (২০২১), ও গবেষণা ‘বঙ্গবন্ধু ও নয়াচীন’ (২০২১)। সম্পাদনা করেন ছোটোকাগজ ‘সুরমস’ ও গোষ্ঠীপত্রিকা ‘কথাপরম্পরা’।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।