রবিবার, এপ্রিল ১৪

ফুটবল, ছেলেবেলা আর হ্যান্ড অব গড : হাসনাত শোয়েব

0

Eid Motifহঠাৎ মায়ের ডাকে তোমার ঘুম ভাঙবে। তুমি জানতে পারবে, খেলার সময় দুই পক্ষের মাঝে ঝগড়া শুরু হয়। একপর্যায়ে মারামারি। সে সময় কারা জানি জায়েদকে ছুরি মেরেছে। খেলার মাঠেই মারা গেছে সে। শোনার পর থেকে তোমার শরীর অবশ হয়ে যেতে শুরু করে। কেউ যেন তোমার পায়ের নিচ থেকে মাটি কেড়ে নিয়েছে। সেই সময়ের অনুভূতিটুকু তুমি কখনোই ভুলতে পারনি। উন্মত্ত মহিষের শিংয়ে চেপে তুমি মুহূর্তের মধ্যে জায়দদের বাড়িতে পৌঁছাবে। জায়েদের মায়ের আর্তচিৎকার বাতাসকেও ভেঙে গুঁড়ো গুঁড়ো করে দিচ্ছে। এমন চিৎকার খোদার আরশকেও যেন কাঁপিয়ে দেয়। সেদিন জায়েদের লাশ দেখার মতো শক্তি তোমার ছিল না।

তাকে কবর দেওয়ার পর সবাই চলে আসলেও তুমি অনেকক্ষণ বসে ছিলে। জায়েদের সঙ্গে তোমার বন্ধুত্ব সেই প্রাইমারি স্কুল থেকে। কতগুলো সকাল, দুপুর, বিকেল এক সঙ্গে কাটিয়েছ তার হিসেব নেই। এমনকি একমাত্র জায়েদদের বাসাতে রাতে থাকার অনুমতি ছিল তোমার। আজ সব সম্পর্কের সুতো মুহূর্তের মধ্যে ছিঁড়ে গেছে।

জায়েদের কোনো ভাই ছিল না। তোমরা বন্ধুরাই সেদিন জায়েদের লাশ বহন করে কবর পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছিলে। তাকে কবর দেওয়ার পর সবাই চলে আসলেও তুমি অনেকক্ষণ বসে ছিলে। জায়েদের সঙ্গে তোমার বন্ধুত্ব সেই প্রাইমারি স্কুল থেকে। কতগুলো সকাল, দুপুর, বিকেল এক সঙ্গে কাটিয়েছ তার হিসেব নেই। এমনকি একমাত্র জায়েদদের বাসাতে রাতে থাকার অনুমতি ছিল তোমার। আজ সব সম্পর্কের সুতো মুহূর্তের মধ্যে ছিঁড়ে গেছে। তোমার জীবনের প্রথম জুটিটাই সেদিন ভেঙে গেছে। জায়েদের মৃত্যুর স্মৃতি তুমি এখনো বুকে পুষে রেখেছ। কিন্তু আজ তোমাকে ভুলতে হবে। জায়েদের মুখ তুমি শেষ বাররে মতো মনে করার চেষ্টা করবে। তোমার পাস থেকে বল পেয়ে লেফট উইং দিয়ে প্রতিপক্ষের ডি-বক্সে ঢুকে পড়েছে জায়েদ। ওয়ান টু ওয়ানে এখন শুধুই গোলরক্ষক। না জায়েদ শট নেবে না, চিপও করবে না। ম্যারাডোনা ভক্ত জায়েদ গোলকিপারকে টেনে হিঁচড়ে নাজেহাল করে পোস্টে বল ঠেলে দেবে। আর এরপরই ঝুম অন্ধকার। প্রচণ্ড ঘুমে তলিয়ে গেলে তুমি। সঙ্গে তলিয়ে গেল জায়েদের সমস্ত স্মৃতিও।

আমাদের হ্যান্ড অব গড দেখার শুরুটা হয় এভাবে। এমন ফিকশন ও বাস্তবতার মাঝামাঝি একটা ভূমি থেকে। জায়েদ কে? জায়েদ হতে পারে বাস্তব কেউ আবার হতে পারে কল্পিত কোনো চরিত্র। তার সম্পর্কে আমরা ততটাই জানি যতটা আমরা জানি ডিয়েগো ম্যারাডোনার হ্যান্ড অব গড সম্পর্কে। ম্যারাডোনা সেই আইকনিক গোলের আরও ২ বছর পর আমার জন্ম। তাই এই গোল নিয়ে জানতে জানতে ঊনবিংশ শতাব্দী পেরিয়ে বিংশ শতাব্দীতে চলে আসি আমরা। জায়েদই প্রথম আমাকে শুনিয়েছিল ঈশ্বরের বাঁ পা ও অমর হাতের গল্প। যদিও তত দিনে আমি ব্রাজিল ও ফেনোমেনন রোনালদোর ভক্ত। তবে কোথাও যেন ম্যারাডোনাকেও ভালোবাসতে শুরু করেছিলাম। আর ফুটবলকে তো বটেই। এরপর একদিন জায়েদ মারা যায়। তার অনেক বছর পর মারা যাবেন ম্যারাডোনাও। আমার সেই জেলে পাড়া বিচের ম্যারাডোনা ও বুয়েন্স আইরেসের ‘কিং দিয়েগো’ দুটোই হারিয়ে যাবে। এতটাই নিঃস্ব ও নিঃসঙ্গ হয়ে পড়া!

ম্যারাডানা সম্পর্কে আমি যা জানি, আমি ততটাই আমার শৈশব সম্পর্কে জানি। জায়েদই একবার আমাকে বলেছিল, তাঁর বাঁ পা নাকি ইচ্ছে করলে স্তব্ধ করে দিতে পারত গোটা পৃথিবীকে। তাঁর বাঁ পা চাইলেই মুহূর্তের মধ্যে সৃষ্টি করতে পারত ‘ওয়েস্টল্যান্ড’ কিংবা ‘নিঃসঙ্গতার একশ বছর’র মতো অনবদ্য আরেকটি সাহিত্যকর্ম।

ম্যারাডানা সম্পর্কে আমি যা জানি, আমি ততটাই আমার শৈশব সম্পর্কে জানি। জায়েদই একবার আমাকে বলেছিল, তাঁর বাঁ পা নাকি ইচ্ছে করলে স্তব্ধ করে দিতে পারত গোটা পৃথিবীকে। তাঁর বাঁ পা চাইলেই মুহূর্তের মধ্যে সৃষ্টি করতে পারত ‘ওয়েস্টল্যান্ড’ কিংবা ‘নিঃসঙ্গতার একশ বছর’র মতো অনবদ্য আরেকটি সাহিত্যকর্ম। মিকেলাঞ্জেলোর বিখ্যাত ‘দ্য ক্রিয়েশন অব অ্যাডাম’ ছবির দিকে তাকালেও নাকি মনে পড়তে পারে ম্যারাডোনার কথা। এসব শুনে আমি হাসতাম আবার আশ্চর্যও হতাম। তখন ইউটিউব ছিল না। এসব গোল বা গালগল্প সম্পর্কে জানারও সুযোগ ছিল না। তাই মনে মনে দৃশ্যগুলো কল্পনা করতাম। একেকবার একেকটি দৃশ্য। একটা দৃশ্যের ভেতর ঢুকে পড়ত আরেকটি দৃশ্য। জোড়াতালি দেওয়া দৃশ্য। এসব ভাবতে ভাবতেই ঘুমিয়ে পড়তাম বা ঘুম ভাঙত।

পরে বুঝেছি ম্যারাডোনা ঠিক মানুষ না। মানুষের মতো দেখতে একজন। বেঁচে থাকতেই স্বর্গ-নরক দুটোই এক সঙ্গে দেখে গেছেন। জায়েদও কী তাই! আহা আমাদের ম্যারাডোনা! ম্যারাডোনা আসলে কেমন, তা জানাতে গিয়ে তার আত্মজীবনী ‘এল দিয়েগো’র ভূমিকায় মার্সেলো মুরা যা লিখেছেন তা অনেকটা এরকম– ঈশ্বর থেকে রাজনৈতিক কৌশলী, সন্ত থেকে মাদক সেবনকারী এবং ভিলেন থেকে নির্যাতিত সবকিছুই যেন এক সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। ম্যারাডোনা এমনই। ভক্তরা যতই তাঁকে স্বর্গের দূত বানাতে চেয়েছেন ম্যারাডোনা যেন ততই চেয়েছেন নিজেকে রক্তমাংসের একজন হিসেবে দেখাতে। ম্যারাডোনা যেন প্রশংসা ও নিন্দার মাঝে ঝুলতে থাকা ধাঁধা। নেপলসে নেমেই আবার এই ম্যারাডোনা তাই বলতে পেরেছিলেন, ‘আমি নেপলসের দরিদ্র শিশুদের আদর্শ হতে চাই। কারণ, তারা আমার মতোই। বুয়েন্স আয়ার্সে ছোটোবেলায় আমি এমনই ছিলাম।’

অথচ ম্যারাডোনার আগে নাপোলিকে না করে দিয়েছিলেন ইতালির কিংবদন্তি তারকা পাওলো রসি। কারণ একটাই, নেপলসে মাফিয়াদের দৌরাত্ম্য। আত্মজীবনীতে ম্যারাডোনা লিখেছিলেন, ‘সত্যি কথা হচ্ছে, আমি আসার আগে কেউ নেপলসে আসতে চাইত না।’ নেপলসের সঙ্গে ম্যারাডোনার সম্পর্ক নিয়ে সত্য, অর্ধ সত্য ও মিথ্যা অনেক গল্প চালু আছে। কথিত আছে, একবার নেপলসের জয়ের পর রাস্তায় নেমে হুল্লোড় করছিলেন ম্যারাডোনা ও তাঁর সতীর্থরা। এক বুড়ি লাঠি হাতে রাগ দেখিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন, এরা কোন শয়তান! ম্যারাডোনা পালটা উত্তর দিয়ে বলেন, আমি ডিয়েগো নেপলসের রাজা! বুড়ি চিনতে পেরে আদর করে দিয়ে বলেন, আরে সত্যিই তো, এ তো আমাদের রাজাই দেখছি।

আত্মজীবনীতে ম্যারাডোনা লিখেছিলেন, ‘সত্যি কথা হচ্ছে, আমি আসার আগে কেউ নেপলসে আসতে চাইত না।’ নেপলসের সঙ্গে ম্যারাডোনার সম্পর্ক নিয়ে সত্য, অর্ধ সত্য ও মিথ্যা অনেক গল্প চালু আছে। কথিত আছে, একবার নেপলসের জয়ের পর রাস্তায় নেমে হুল্লোড় করছিলেন ম্যারাডোনা ও তাঁর সতীর্থরা।

ম্যারাডোনার গল্প এবার শেষ করা যাক। সেদিন ছিল ২৫ নভেম্বর ম্যারাডোনার প্রথম মৃত্যু বার্ষিকী। অফিসে বসে ম্যারাডোনা নিয়ে কী লেখা যায় ভাবছিলাম। হঠাৎ দেখি জায়েদের ছোটো বোন অ্যানির ফোন, ‘ভাইয়া, আজকে জায়েদ ভাইয়ের মৃত্যু বার্ষিকী। কাজ শেষ করে রাতে মা তোমাকে বাসায় আসতে বলেছে।’

অতঃপর স্মৃতি আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে ২০ বছর আগের এক বৃষ্টিভেজা দুপুরবেলায়। তিন ডিফেন্ডারদের কাটিয়ে জায়েদ ঢুকে পড়েছে প্রতিপক্ষ ডি-বক্সে। ওয়ান টু ওয়ানে এখন শুধুই গোলরক্ষক। না জায়েদ শট নেবে না, চিপও করবে না। ম্যারাডোনা ভক্ত জায়েদ গোলকিপারকে টেনে হিঁচড়ে নাজেহাল করে পোস্টে বল ঠেলে দেবে। আর এরপরই ঝুম অন্ধকার। প্রচণ্ড ঘুমে তলিয়ে গেলে তুমি। সঙ্গে তলিয়ে গেল জায়েদের সমস্ত স্মৃতিও।

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

কবি ও কথাসাহিত্যিক জন্ম ১৯৮৮, চট্টগ্রাম। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনশাস্ত্রে স্নাতকোত্তর। প্রকাশিত বই : সূর্যাস্তগামী মাছ (কবিতা) ব্রায়ান অ্যাডামস ও মারমেইড বিষ্যুদবার (কবিতা) শেফালি কি জানে (না কবিতা, না গল্প, না উপন্যাস) ক্ল্যাপস ক্ল্যাপস (কবিতা) দ্য রেইনি সিজন (কবিতা) প্রিয় দাঁত ব্যথা (কবিতা) বিষাদের মা কান্তারা (উপন্যাস) সন্তান প্রসবকালীন গান (কবিতা)

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।