রবিবার, জুন ২৩

বরফকল ও অন্যান্য কবিতা : মাসুদুল হক

0

বরফকল


থানচি বাজারে একটা আশ্চর্য রাত পেয়েছিলাম
ডুপ্লেক্স দোকানের উপর তলায় রাতটা থিতু হয়ে বসেছিল টর্চ লাইটে

অবশ্য শাকনা ম্রোর বার্মা ভ্রমণের শব্দচিত্র
আমরা যখন দেখছিলাম ওর নিজের বাংলায়
তখন ওকে সত্যি সত্যিই ক্রামা মনে হয়

একটা বনমোরগ ডেকে উঠেছিল হেঁসেলে

সে রাতে খাবারের টেবিল কোনো আমিষ ছিল না
দূরে বরফকলে আমরা শুধু মেঘের শব্দ পাচ্ছিলাম


৪৬/পি- ভিরটানেন


অন্ধকার থেকে উঠে আসছে ধূমকেতু
মুখ আর নিঃশ্বাস থেকে
ছড়িয়ে পড়ছে অ্যালকোহল

অন্ধকার যেন শুধু মাতালের;
এক চূড়ান্ত মদ্যপ ঢুকে পড়েছে সৌরমণ্ডলে!

আপাদমস্তক মদে চুর
ঘুরে বেড়ায় সূর্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে

টেলিস্কোপের কাঁচ ভিজে যায়
মহাকাশে ছড়িয়ে পড়া অ্যালকোহলে

মাতালেরা খোঁজ পেয়ে গেছে ধূমকেতুর!


আমার প্রিয় দিলীপ কুমার


সেলুলয়েডের দিলীপ কুমার
ইঞ্জিনে কয়লা ফেলে আজীবন ছুটতে থাকবেন
ঘোড়া টানতে টানতে গান গাইবেন

যে কোনো সময় আমরা তাকে দেখতে পাব
দীদার, দাগ, দেবদাসে…

নয়া দৌড়ে টাঙ্গাওয়ালা
বাবুলে পোস্টমাস্টার
আমার প্রিয় দিলীপ কুমার

খুব কম কথায় মন্ত্রমুগ্ধ করে
রেখেছিলেন তার দর্শক ও নায়িকাদের

আর বাস্তবে ইউসুফ খান
দিনরাত্রির ম্যাচে ডিফেন্স খেলতে খেলতে
৯৮-এ এসে ঘুমিয়ে পড়লেন অনন্তের রেলগাড়িতে…


সারস-সারসীর মতো


ধরো ক্রোয়েশিয়ায় গিয়ে আমি যদি গুলিবিদ্ধ হই;
সঙ্গে তুমি বেঁচে গেলে গুলির আঘাত থেকে
কেননা সে সময় আমরা দুটো সারস

পথ ও প্রান্তে আমাদের হাজার মাইল ছুটে চলতে হয়
যা কিছু বলি না কেন
আমাদের বাঁচতে হয় ঋতুর বৈভবে

ধরো এখন আমি মালিনা
আহত হয়ে বেঁচে আছি জিপান ভস্কির ঘরে

দীর্ঘ একটা শীত পেরিয়ে
তুমি কি আসতে বসন্তে
ক্লেপিতানের মতো ক্রোয়েশিয়ায়
স্মৃতিতে গুলির শব্দ, ডানায় ক্ষতের চিহৃ নিয়ে
মালিনা যেমন অপেক্ষায় থাকে

তুমি কি আসতে আমার কাছে
১৪৫০০ কিলোমিটার পেরিয়ে
সুদূর দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে

মানুষ কিংবা সারস
যা কিছু বলি না কেন
আমরা তো এখনো মেশিন হয়ে যাইনি

 

২.
এখনো পৃথিবীতে আছে
জিপান ভকিচের মতো মানুষ
বৃদ্ধ হয়েও মালিনাকে নিয়ে যায় মাছ শিকারে
শীতে আশ্রয় দেয় নিয়ন্ত্রিত তাপে;
বসন্তে ঘর সারস-সারসীর প্রিয় মিলনে

ধরো ক্রোয়েশিয়ায় গিয়ে আমি যদি গুলি বিদ্ধ হই
সারস কিংবা মানুষ যাই বলো না কেন
জীবনচক্রের প্রয়োজনে
তোমাকে কেপটাউনে ফিরে যেতে হলেও
তুমি কি ফিরবে ক্লেপিতানের মতো!


ইস্পাতের গাধা


পূর্বপুরুষের একটা ইস্পাতের গাধা ছিল
মুদ্রার বিনিময়ে চুক্তিবদ্ধ হয়ে
হেটে এসেছিল আমাদের বাড়ি

ও ঘাস খাবে না জেনেও প্রায়‌ই আমরা ওকে
বাগানে রেখে আসতাম
প্রখর রোদে ওর শরীর ঘেমে উঠতো কি না
জানি না; তবে বৃষ্টি এলে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভিজতো

আমাদের সংসারে ওর কোনোই চাহিদা ছিল না
মাঝে মাঝে পায়ে ক্ষত হলে চিকিৎসা করানো হতো

ওর যখন অনেক বয়স হয়ে গিয়েছিল
আমরা প্রায়ই ওকে জ্যোস্নামাঠে ফেলে দিয়ে আসতাম
তারপরেও কেউ না কেউ ওকে বাড়ি পৌঁছে দিতো

যুদ্ধের বছর ও আমাদের সঙ্গে পালিয়ে যায়
ওর পায়ে ক্ষত হতে হতে বসে পড়লে
আমরা একটা মরা নদীর পাশে ওকে ছেড়ে দেই

আমরা বাড়ি ফিরে এসেছি কবে! ও আজ‌ও ফেরেনি!

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

মূলত কবি ও কথাসাহিত্যিক; অনুবাদ ও গবেষণায় রয়েছে সমান আগ্রহ। বাংলা একাডেমির রিসার্স-ফেলো হিসেবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা থেকে পি-এইচ. ডি সম্পন্ন করেছেন ২০০৪ সালে। বাংলাদেশের সরকারি কলেজে দর্শন বিভাগে অধ্যাপনায় নিয়োজিত। তার কবিতা তাইওয়ানিজ, চীনা, নেপালি, আজারব‌ইজানিজ, তার্কি, রোমানিয়ান, আরবি, ইতালীয়, অসমীয় ও স্পেনীয় ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ইংরেজি ভাষায় বিশ্বের বিখ্যাত জার্নাল ও ব্লগগুলোতে নিয়মিত কবিতা লিখে যাচ্ছেন। ২০২০ সালের নভেম্বর মাসে তিনি ইংল্যান্ডের ‘THE POET’ পত্রিকা কর্তৃক ‘International Poet of the Week’-‌এ ভূষিত হয়েছেন। প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ২৫টি। বগুড়া লেখক চক্র পুরস্কার (২০১১); চিহ্ন পুরস্কার (২০১৩); দিনাজপুর জেলা শিল্পকলা একাডেমি গুণীজন সম্মাননা (২০১৪); উপমা সাহিত্য পুরস্কার (২০২১) অর্জন করেছেন। উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ : ‘টেনে যাচ্ছি কালের গুণ’, ‘ধ্বনিময় পালক’, ‘ধাঁধাশীল ছায়া’, ‘জন্মান্ধের স্বপ্ন’, ‘সার্কাসের মেয়ে ও অন্যান্য কবিতা’, ‘The shadow of illusion’, ‘Blind Man's Dream’. গল্পগ্রন্থ : ‘তামাকবাড়ি’, ‘আবার কাৎলাহার’, ‘ঢুলকিপুরাণ’, ‘নাবিকের জুতো’। প্রবন্ধ : ‘বাংলাদেশের কবিতার নন্দনতত্ত্ব’, ‘হাজার বছরের বাংলা কবিতা’, ‘জীবনানন্দ দাশ ও অন্যান্য’, ‘বাংলা সাহিত্যে নারী’, ‘বাংলা উপন্যাস অধ্যয়ন’। অনুবাদ : ‘চৌদল ঐকতান’, মূল: টি. এস. এলিয়ট; ‘ধূসর বুধবার’, মূল: টি. এস. এলিয়েট; ‘বালি ও ফেনা’, মূল: কাহলিল জাফরান; ‘হল্লা’, মূল: অ্যালেন গিনসবার্গ।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।