বৃহস্পতিবার, মে ৩০

বালক জানে না : মোশতাক আহমদ

0

১.
বালক সারা দিন মার্বেল খেলে, লাটিম ঘোরায়, লাটাই হাতে ঘুড়ি ওড়ায় আকাশে। আকাশে আরও ওড়ে পাখি। পাখি কিংবা ঘুড়িরা জানে আকাশ নীল নয়, বিনয় মজুমদারও একটা বর্ণহীন আকাশের খোঁজ পেয়েছিলেন গায়ত্রীর আদলে। কিন্তু বালক এইসব ফাঁকি বুঝতে পারে না। তার কাছে আকাশ বরাবরই নীল, ঘাস সবুজ। অথচ গরু সারা দিন ঘাসের স্বপ্নে মশগুল থেকেও ঘাসের রং দেখতে পায় না। আকাশ যে নীল নয়—সে কথা বালক জানে না।
জলের ভেতর ওই, আমাদের বালক-বয়স…

ঘুরন্ত লাটাই হাতে, একা একা, সারাবেলা আকাশের দিকে
চেয়ে থাকে। আকাশ যে নীল নয়, ঘুড়ি জানে, পাখি জানে— বালক জানে না।
(সুব্রত চক্রবর্তী)

 

বালকের দুচোখে বাষ্প— এক চোখে ছাদ থেকে পড়ে মারা যাওয়া খেলার সাথী টুটুলের জন্য, অন্য চোখে শাপলার মোহে জলের অতলে চলে যাওয়া পাশের বাড়ির ছোটো ছেলে মঈনের জন্য।

নীল আকাশ দেখে বেলা যাবে, সন্ধ্যার মাথায় লোডশেডিং হলে, গাঢ় আকাশে তারার দেশের হাতছানি। দুই রঙে ছাপা কিশোর বাংলায় আবদুল্লাহ আল মুতীর লেখা ফেলে বালক তখন ঢাকার গুলিস্তান হলে সিনেমা দেখে আসা ইয়াসিনের অভিনয় প্রচেষ্টা দেখে মুগ্ধ হবে। একক অভিনয়ে গোটা সিনেমার রুপালি গল্প! এক ফাঁকে ইয়াসিন তার মানিব্যাগ খুলে স্টুডিওর কারসাজিতে ববিতার পাশে বসা শাদাকালো ছবিটি বের করে দেখাবে। বালক এই ফাঁকিও ধরতে পারবে না। লোডশেডিং শেষ হলে পড়তে বসার জন্য দোতলার ঘরে ফিরতে হবে আবার। বালক পরের সন্ধ্যার লোডশেডিংয়ে আরেকটা সিনেমার গল্প শুনবে বলে প্রতিশ্রুতি নিয়ে রাখে। দুপুরে পত্রিকায় ‘লাভ ইন সিমলা’ কিংবা ‘আগুন’ সিনেমার বিজ্ঞাপনে চোখ বুলাবে— আনন্দ, মনিহার, উল্কা, ছায়াবানী, অভিসার, পূরবী, গুলজার— সবই কত দূর দূর নক্ষত্রের নাম। বালক জানত না একদিন এই সিনেমা হলে বোমা হামলা হবে; একদিন এইসব প্রেক্ষাগৃহ জাদুঘর হয়ে যাবে। জানে না বলেই জাবেদদের সিঁড়িঘরে বসে প্রেক্ষাগৃহের কাটা রিলগুলোতে আলোর বিন্দু ফেলে দেয়ালজোড়া নির্বাক ছবি দেখে বালকের দল।

বালকের বিছানার নিচে আরও আছে এক সেট চাক্কি, কালো পিচের রাস্তায় চালালে ভিন গ্রহজয়ী ভাইকিং ভাইকিং লাগে, স্কাইল্যাবের টুকরো নেমে এলে এই ভাইকিংয়ের চুম্বকে আটকে যাবে! স্কাইল্যাব এখন নীল মহাকাশে ভেংগে পড়েছে, নামছে আর নামছে—এই তার একমাত্র কাজ এখন। বালকের মেলা কাজ, ঘুরন্ত লাটাই গুটিয়ে রেখে ঢুকে যাবে লুতলুতে বংকইয়ের বনে। সেখানে বালকের দল এক নববধূর মৃতদেহ দেখতে পেয়েছিল। বালক জানতে পারেনি— সমুদ্রে ভাসছে নভোখেয়াযান।

স্কুল ছুটি হলে বন্ধুরা হই হই করে ফুটবল নিয়ে নেমে যাবে। বালক মন খারাপ করে খেয়াঘাটে যাবে। একটি বালিকা খেয়াপার হয়ে ওপারে যাচ্ছে। ওপারে নেমেও ছাতিম গাছের নিচে দাঁড়িয়ে একটু বুঝি ঘুরে দাঁড়ায়। এতটাই দূর যে, কারু চোখের ভাষা বোঝা যায় না। এপারে মুখর হলো মান্নাদের কেকা, ওপারের কুহু তো মান্নাদের গাওয়া, কিন্তু তাঁর নাম নীরবতা। কিন্তু বালক এই অনুরাগ পুষে রাখবে তার হৃদয়ে।

 

বালক জানে না তো পুষবে অনুরাগ
হৃদয়ে কতদিন, কার বা চলা-পথে
ছড়াবে মুঠো-মুঠো বকুল ফুলগুলো;
কোথায় যেতে হবে, যাবে না কোন দিকে,
ব্যাপক হাঁটাহাঁটি করবে কোন পথে!
(রফিক আজাদ)

 

২.
কবিতার খাতা ভরে উঠতে থাকে; কবিতা হয়তো হয় না— অন্তঃমিলের পদ্য আর ছড়া, নানা রঙের ক্রেয়নের হাতে অলংকরণের ভার। সবুজ সাথী, মাধ্যমিক গণিত অবহেলায় পড়ে থাকে; ফুটবল খেলার নেশা আস্তে আস্তে গোলপোস্টে থিতু হয়, তারপর সাইডলাইনে বসে বাদামের খোসা ভাঙে। দৌড়ের চক্করে সেলিম আর মিন্টু আধা চক্কর এগিয়ে থেকে বুকে ফিতা নিয়ে আরও কোয়ার্টার চক্করের গতিজড়তায় মেডেল ঝুলিয়ে ঘরে ফেরে। বালক দু-একবার যেমন খুশি সাজে—কিন্তু ভিক্ষুক আর পাগলের মাঝামাঝি কিছু একটা হয় বলে, আর থুতনি থেকে পাটের দাড়ি খসে যায় বলে, মান্যবর বিচারকগণ বিভ্রান্ত হয়। ‘মান্যবর’ শব্দটা বালক শিখে গেছে অনধিকার চর্চায়, ‘মার্চেন্ট অব ভেনিস’-এর অনুবাদ পড়ে। বালক তার অতিরঞ্জিত খাতার কাছে ফেরে, দু-চোখের বাষ্পগুলো কাচের জারে রাখবে বলে। জানালার পাশে কাচের জারে পাতাবাহার, শেকড়গুলো কী সজীব, এঁকেবেঁকে যায় রোজ।

 

‘বালক জানে না তো জীবন থেকে তার
কতোটা অপচয় শিল্পে প্রয়োজন!’
( রফিক আজাদ)

 

ওদিকে, সেই খেয়াঘাটে এসে দাঁড়ালে, হয়তো ‘সীমাবদ্ধ জলে, সীমিত সবুজে’, আকাশের মিছা নীলে অপসৃয়মান বালিকার মুখ— ‘প্রাণেশ্বরী পরমা যন্ত্রণা’র।

বিকেলে হালকা নীল রঙের রাশান সাইকেলে চড়ে, পুনর্বাসন প্রকল্পের সবুজ-শাদা ডোরার পুলোভারে বালক বকুল কুড়াতে যায়। পাবলোর সাথে দেখা হয়। একটা ভারী পাগল ছেলে! খুব সুন্দর ছবি আঁকে। নেংটি ইদুরের গল্প ধার দেয়। বাসায় গেলে ওর মা নুডলস খেতে দেয়। পাবলোর বাবা আর্টের টিচার, সিঁড়ির নিচে জমানো ক্যানভাস দেখতে দেখতে বালক ভাবে, আমার আর ছবি এঁকে কাজ কী! বালক তো কোনোভাবেই জানত না, কবে কোন দূর ভবিতব্যে পাবলোর জন্য এক আলীশান দরবার হলের নিভৃতে কয়েকটা বুলেট নিজেদেরকে কোনো অন্ধকার গোলাঘরে শান দিচ্ছে। পাবলোর অন্তিম এসএমএসগুলো বিজলির মতো এসে ঢুকে যাবে ওর অর্ধাঙ্গিনীর সেলফোনে! বন্ধুরা সেই খুদে বার্তাগুলোর সম্প্রচার ধরে ধরে ঢাকা শহরের নানা প্রান্ত থেকে বুকে হেঁটে হেঁটে এগিয়ে যাবে পিলখানার সামনে, জোড়া শ্বেত হস্তী ব্যর্থ নমস্কারে বিচারের বাণী শুনতে রেডিওর স্টেশন বদলাতে থাকে। বালকেরা সুয়ারেজ লাইন ধরে ধরে হেঁটে মিটফোর্ডের মর্গে পৌঁছে যায়। আহ, পিলখানা! বালক কী করে জানবে ‘সময় প্রতিকূল/ সাঁতার না শিখে সে সাগরে ঝাঁপ দেয়’। অবশ্য সাঁতার শেখার সুযোগ ছিল নানাবাড়ির সুগন্ধা নদীতে। বালক অবহেলা করে গেছে।

 

জলের চোরাস্রোত গোপনে ব’য়ে যায়,
বালক ভুল ক’রে নেমেছে ভুল জলে!
( রফিক আজাদ)

 

 

৩.

শিউলি বকুল কুড়োবার পালা শেষ
কুয়াশাকাতর আজ সকালের ঘুম
নীল খামে আঁকা স্বপ্ন সীলমোহর
শৈশব কেটে গেছে।

 

সকালবেলা বাসার সামনে শিউলির গাছ থেকে অজস্র শাদা শাদা ফুল ঝরে পড়ে, গেরুয়া বৃন্ত তাদের৷ বালক সবুজ শিশির থেকে কুড়িয়ে নেয়, মালা গাঁথে; বৃন্তের রং কবিতার খাতার শিরোনামগুলোতে এসে মেশে। দেরাজের ভেতরে সদ্য প্রয়াত নজরুল আর জয়নুলের আবক্ষ পেপারকাটিং—ওখানে শিউলির মালা, দু-একটা কাঁঠালচাঁপা, বেলি আর গন্ধরাজের এক লুকানো বেদী।

বালক একদিন তার আগডুম বাগডুম কবিতার খাতাটি এক বালিকার হাতে দিতে চাইল। বালিকা হেড মিস্ট্রেসের স্বরে বলল, ‘বানান দেখে দিতে হবে, নাকি ব্যাকরণ?’ বালকের পৃথিবী অন্ধকার হয়ে আসে। সে যে বরাবর বাংলা পরীক্ষায় বেশি নম্বর পেয়ে থাকে—সে কথা ভুলে অপ্রতিভ ঠোঁট কাঁপে। বুকের লাবডাপ সামলে নিয়ে অভিমানে বাগানের ঝোপের আড়ালে বসে থাকে। মা সেদিন মাসকালাইয়ের ডাল রান্না করে বসে থাকেন। বালক খেতে যায় না। কাঁচা ঢেঁড়স, বরবটি আর টমাটো চিবিয়ে ক্ষুন্নিবৃত্তি।

 

বালক ভুল ক’রে পড়েছে ভুল বই,
পড়েনি ব্যাকরণ, পড়েনি মূল বই!
(রফিক আজাদ)

 

বালক চিনল না ‘ফুলের নামে কতো কাঁটারা জেগে থাকে’।

বালক দেশান্তরী হতে চায়।

 

৪.
বালক রেলগাড়িতে চড়ে বসে। পকেটে মায়ের শাড়ির ভাঁজ থেকে আত্মসাৎ করা টাকা। বালক বহুদূর যেতে চায়, পিসি সরকারের কাছে যাবে জাদু শিখতে। ট্রেনে এক বিদগ্ধ জনের সাথে দেখা। এটা ওটা দিয়ে আপ্যায়ন করে সবকিছুই জেনে নিলেন। তাঁর নামও পিসি সরকার, শম্ভুগঞ্জ ইস্কুলের হেডমাস্টার। বললেন, ‘খোকা এতক্ষণে তো তোমার মা শয্যা নিয়েছেন। আর তোমার কালাজ্বরে মারা যাওয়া বোনটির স্বপ্ন কী তুমি পূরণ করবে না? তোমার পকেটের টাকার খবর পেলে গুণ্ডাদের দল টাকার জন্য তোমাকে মেরে ফেলবে। আর পাসপোর্ট ছাড়া ভারতে যাবে কী করে।’ —এই কথা বলতে বলতে জাদুমন্ত্রে পকেট থেকে একটা পোস্টকার্ড বের করে বাবার ঠিকানায় চিঠি লিখে ফেললেন। কুষ্টিয়া নেমে বালকটিকে স্টেশন মাস্টারের জিম্মায় রেখে পিসি সরকার চলে গেলেন।

সেই প্রথম বাড়ি ছাড়া। সেই শেষ নয়। বালক জেনে গেল ‘কতোটা হেঁটে এলে/ফেরার পথ নেই, থাকে না কোনো কালে।’

 

৫.
বালকের অভিমান বাড়তে থাকে। গন্ধবিধুর ধুপ হয়ে আপনার মনে পুড়তে থাকে। বাংলার শিক্ষক কয়েকটা কবিতায় সবুজ পেন্সিলে টিক দিয়ে বিভিন্ন পত্রিকায় পাঠাতে বলেন। বালক উদ্যমী হয় না। অনেক দিন পর অপ্রকাশের ভারে দিকে দিকে কবিতা পাঠায়, অভিষেক হয় বালকের। কিন্তু বিষণ্ণতা কুরে কুরে খায়।

বালক আর বালক থাকে না। নদী ও নারীতে অনেক জল বয়ে যায়।

 

জলের স্পর্শে, নারীর স্পর্শে দুইটি জীবন পুণ্যে ভরা:
একটা জীবন নিদ্রাহারা, অন্য জীবন ঘুমের ঘোরে।
(সুব্রত চক্রবর্তী)

 

বালক জানতে পারেনি, তার স্মৃতিভ্রংশ নারকোলেপসির শিয়রে অপেক্ষায় ছিল কোন নদী, কোন বালিকা।
বালিকাও জানেনি এই তরফের কোনো উদ্বেগ।

এক বালকের শূন্যতার ভেতরে এক বালিকা বেড়ে উঠতে থাকে। বালিকা হারিয়ে যায়। আরেক বালিকা খেয়াঘাটে আসে। বালিকা অপসৃয়মান হলে আরেক বালিকা ওইপারে হেঁটে যায়। বালিকা হারিয়ে যায়। বালিকারা। আরেক বালিকা। বালিকারা।

 

৬.
বালকের জেদ হয়। বালক জানে না যে কয়েক দশক আগে জন্ম নেওয়া আরেক বালকেরও খুব জেদ হতো, অভিমান হতো। একদিন চল্লিশের দশকের সেই বালক কলম ফেলে দিয়ে যুদ্ধে গিয়েছিল; বালক জানত না সে একদিন অস্ত্র হাতে নেবে। যুদ্ধ থেকে ফিরে এসে বলবে আমার অনেক ক্ষুধা, বাগানে লুকিয়ে লুকিয়ে অভিমানের লবণে মাখানো ঢেড়শ নয়, আমি কাঁচা লংকা দিয়ে গরম ভাত খেতে চাই— না হলে বিপুল ক্ষুধায় আমি মানচিত্র চিবিয়ে খাব! সে সব এখন ইতিহাস। আমাদের বালক জানে না তার জন্যও ভিন্ন মাত্রার এক যুদ্ধ অপেক্ষা করে আছে, চিরকালই থাকে। বালককে কেন বিরুদ্ধ স্রোতে সাঁতার কাটতে হয়, ঈশ্বর কেন বালকদেরকে বালক করেই রাখেন না! বালকের চোখের সামনে কীভাবে পৃথিবী তার শিশুতোষ সবুজ হারায়; লাবণ্য হারায়; ভালোবাসা হারায়। বালকেরা কিছুই জানে না। জানবে না। পৃথিবীতে একটা স্থিতিস্থাপক বালকের জীবন নিয়ে বেলা যাবে।

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

জন্ম ৪ জানুয়ারি ১৯৬৮। মূলত কবি। আটটি কবিতার বই ছাড়াও লিখেছেন ছোটোগল্প, প্রবন্ধ, স্মৃতিপাঠের বই। পেশাগত জীবনে জনস্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করেন। প্রকাশিত কবিতার বই : সড়ক নম্বর দুঃখ বাড়ি নম্বর কষ্ট, আমার আনন্দ বাক্যে, পঁচিশ বছর বয়স, মেঘপুরাণ, ভেবেছিলাম চড়ুইভাতি, বুকপকেটে পাথরকুচি, ডুবোজাহাজের ডানা, অন্ধ ঝরোকায় সখার শিথানে । গল্পের বই : স্বপ্ন মায়া কিংবা মতিভ্রমের গল্প।প্রবন্ধ : তিন ভুবনের যাত্রী । স্মৃতিপাঠ : অক্ষরবন্দি জীবন। স্বনির্বাচিত কবিতা (প্রকাশিতব্য) : পদ্যাবধি । স্মৃতিকথা (প্রকাশিতব্য): গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের গল্প : পাবলিক হেলথের প্রথম পাঠ । ডকুফিকশন (প্রকাশিতব্য) : ঝিনুক নীরবে সহো

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।