শনিবার, জানুয়ারি ২২

বুদ্ধদেবের নিঃসঙ্গ মানুষেরা : কবিতায়, জাদুবাস্তবতায় কিংবা স্বপ্নে

1
বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত ২

বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত (১১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৪– ১০ জুন, ২০২১)


কবিতা ও চলচ্চিত্র স্বতন্ত্র দুটো শিল্পমাধ্যম হলেও চলচ্চিত্রের কিছু ইমেজ কিংবা কম্পোজিশনের অন্তর্লীন ভাষাশৈলীর কারণে কখনো কখনো একটি সিনেকাব্যের সৃষ্টি হতে পারে। বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত একজন কবি, তাই স্বাভাবিকভাবেই তার চলচ্চিত্রের বিভিন্ন ইমেজ কিংবা কম্পোজিশনে অন্তর্লীনভাবে প্রবাহিত হয় কবিতার শরীর। শুধু নির্মাণ ও সম্পাদনার শৈলীতে পুরো চলচ্চিত্র এক কাব্যময় গতিতে এগিয়ে যায় না, বরং তা এক গভীর মগ্নতাও ছড়িয়ে দেয়। বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের চলচ্চিত্র পাঠ করতে হয় সেই গভীর মগ্নতায়, না হলে কবিতার আবরণে সিনেমার শরীর ঢেকে গিয়ে তা ব্যার্থতায় পর্যবসিত হতে পারে, কারণ শেষ পর্যন্ত কবিতাকে কবিতা আর সিনেমাকে সিনেমাই হতে হয়। এই ব্যাপারে বুদ্ধদেবের ভাবনা এই রকম যে—

‘শুধুই একটি স্থির বা সচল কম্পোজিশন, বিশেষ লেন্স, বিশেষ ফিল্মের ব্যাবহার ও আলোছায়া এবং অন্ধকারে ট্রলি ও ক্রেনের ভেতর ক্যামেরা বসিয়ে দৃশ্য গ্রহণ বা দৃশ্যের ভেতর নৈঃশব্দ্যের উপস্থিতিকে ভিন্ন মাত্রা দেওয়া ইত্যাদি ও আরও অনেক কিছু সিনেমাকে কবিতার আবরণ দিতে পারে মাত্র, অন্য কিছু নয়। যে কোনো আবরণই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রাচীন হতে হতে একসময় ঝুরঝুর করে খসে পড়ে। সিনেমার সেই আপাত কবিতার আবরণটি কিছু বছর পর পুরনো হয়ে হঠাৎ এক ঝড়ে উড়ে গেলে দেখা যায় সিনেমার আসল শরীরটি— যা তেমন আকর্ষণীয় নয় কোনোভাবেই’।


উড়োজাহাজ

বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের ছবি উড়োজাহাজ’ (২০২০); পোস্টার ডিজাইন: ধ্রুব এষ


তবে বুদ্ধদেবের সিনেমার কাব্যময়তায় সিনেমাগুণ যে নষ্ট হয়নি— তা ইতোমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে। তার সিনেমায় ইমেজ ও কম্পোজিশনের অন্তর্লীন কবিতা গভীর এক নিঃসঙ্গতার বোধ নিয়ে আসে, নৈঃশব্দ্যের স্তব্ধতা নিয়ে আসে এবং তা ছড়িয়ে পড়ে কখনো বিস্তীর্ণ পটভূমির নিঃসঙ্গ বৃক্ষে, গোধূলির রঙে, বিভিন্ন জাদুবাস্তবতা এবং কখনোবা কিছু পরাবাস্তবতায়, যা তার শেষ সিনেমা ‘উড়োজাহাজ’ পর্যন্তও অনবদ্য এক কাব্যময়তায় উঠে এসেছে। বুদ্ধদেবের সিনেমায় নিঃসঙ্গ চরিত্রগুলো তাদের স্বপ্নে, ভাবনায়, জীবনদর্শনে বড্ড একা! গভীর এক বিষণ্নতায় বিচ্ছিন্ন হয়ে চরিত্রগুলো নৈরাশ্য ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত, তবে বুদ্ধদেব তার শেষ সিনেমা ‘উড়োজাহাজে’ মৃত মানুষের মুখেই শুনিয়েছেন, ‘বাঁচার মতো ভালো কিছু আর হয় না’। নিঃসঙ্গ মানুষগুলো মরে গিয়ে খুঁজে ফেরে নিরাপত্তার আশ্রয়, তাদের ভালোবাসার আশ্রয়। মৃত মানুষের আশ্রয় খোঁজার কোরিওগ্রাফিতে জন্ম নেয় স্বপ্নময় এক পরাবাস্তবতার, যেখানে আকিরা কুরোশাওয়ার ‘ড্রিম’ সিনেমার মানুষ থেকে ডেমনে রূপান্তরিতদের আহাজারির কোরিওগ্রাফেরও কিছুটা প্রভাব সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

তবে বুদ্ধদেবের সিনেমার কাব্যময়তায় সিনেমাগুণ যে নষ্ট হয়নি— তা ইতোমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে। তার সিনেমায় ইমেজ ও কম্পোজিশনের অন্তর্লীন কবিতা গভীর এক নিঃসঙ্গতার বোধ নিয়ে আসে, নৈঃশব্দ্যের স্তব্ধতা নিয়ে আসে এবং তা ছড়িয়ে পড়ে কখনো বিস্তীর্ণ পটভূমির নিঃসঙ্গ বৃক্ষে, গোধূলির রঙে, বিভিন্ন জাদুবাস্তবতা এবং কখনোবা কিছু পরাবাস্তবতায়, যা তার শেষ সিনেমা ‘উড়োজাহাজ’ পর্যন্তও অনবদ্য এক কাব্যময়তায় উঠে এসেছে।

‘উড়োজাহাজের’ কেন্দ্রীয় চরিত্র বাচ্চুমণ্ডলের সাথে নিঃসঙ্গ মৃত মানুষদের স্বাভাবিক কথোপকথনে, ‘ড্রিম’ এর সেনা কমান্ডারের সাথে মৃত সৈনিকদের কথোপকথনের কথাও মনে পড়ে, যেখানে মৃত সৈনিকেরা তাদের মৃত্যু নিয়ে ছিল সন্দিহান। গভীর অরণ্যে উড়োজাহাজের ধ্বংসস্তুপের উপর বাচ্চু মণ্ডলকে ঘিরে গাছগুলো অদ্ভুত রকমভাবে জীবন্ত হয়ে যায়, মৃত মানুষেরা স্বপ্নগ্রস্থ বাচ্চুমণ্ডলের মাঝে যেন তাদের হারিয়ে যাওয়া স্বপ্ন খুঁজে পায়, তাই তার কাছেই তারা তাদের গল্পের ডালি মেলে ধরে, যেখানে প্রতিটি গল্পতেই নিঃসঙ্গতা, বিষণ্ণতা ঘুরেফিরেই আসে। কেউ অতিরিক্ত খাদ্যের স্বপ্নে, কেউ ভালোবাসা হারিয়ে, কেউ স্বপ্ন ছুঁতে না পারায় মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছে।

ব্যাক্তিমানুষের স্বপ্ন কীভাবে রাষ্ট্রযন্ত্র দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতে পারে তার প্রতিফলন ঘটেছে বুদ্ধদেবের ‘উড়োজাহাজে’। উড়োজাহাজ চালানোর স্বপ্ন নিয়ে বাচ্চু মণ্ডল বড়ো নিঃসঙ্গ। তার এই স্বপ্ন নিয়ে বাচ্চু সবার কাছে পাগল হিসাবেই গণ্য হয়। পুলিশের কাছে বাচ্চুর এই স্বপ্ন রাষ্ট্রের সম্পত্তি হয়ে গেলেও বাচ্চু মণ্ডল যুদ্ধবিমানের ধ্বংসাবশেষকে নতুন করে সাজিয়ে তাতে লতা, পাখি, ফুল এঁকে দেয় গভীর মমতায়। এক অর্থে তা যুদ্ধের বিরুদ্ধে শান্তির এক বার্তাও বহন করে বটে। অনন্য এক জাদুবাস্তবতায় স্বপ্নগ্রস্থ, সংসারবিবাগী মোটর মেকানিক বাচ্চু মণ্ডলের শোয়ার ঘরকে বুদ্ধদেব সবুজ অরণ্যে নিয়ে যান, আবার কখনো অরণ্যের গাছকে নিয়ে আসেন তার খোলা জানালার কাছে, যেখানে অচেনা এক বাঁশিওয়ালা তার বাঁশি বাজিয়ে চলে যায়। স্বপ্ন ও বাস্তবতা মিলেমিশে এক মোহনীয় কাব্যময়তা সৃষ্টি হয়। বাচ্চুর বুকে তার স্ত্রীর শুয়ে হাত পা নাড়ানোর দৃশ্যে বুদ্ধদেবের ‘উড়োজাহাজ’ নামের কবিতার কথাও মনে পড়ে—

‘যখন তাকিয়ে থাকি, তোমার হাত দুটোকে মনে হয় ডানা/ যখন তাকিয়ে থাকি আমার পায়ের দিকে/বেঁকে, পাখার মতো ছড়িয়ে যায় পা।/আর মাথার ওপর দিয়ে কেবলই উড়ে যায় একটা উড়োজাহাজ, তার নিচে, মশারির ভেতর, আমাদের স্বপ্নরা চায় উড়ে যেতে,/ শেষে নেমে যায় নিচে, খাটের তলায় আবছায়া অন্ধকারে ঘাড় গুজে/ উড়ো-জাহাজের গর গর উড়ে যাওয়ার শব্দ শোনে সারারাত’

একদিন বাচ্চুর স্বপ্নের উড়োজাহাজ ছিনিয়ে নেয় রাষ্ট্রযন্ত্র, তাই মৃত মানুষের সমস্বরে উচ্চারণ ‘ক্ষমতা যার, প্লেন তার’। সে তবু স্বপ্ন দেখার সাহস হারাতে চায় না, তাই পুলিশের হাত থেকে পালিয়ে অরণ্য ছেড়ে চলে যায় তার স্বপ্নের রানওয়েতে। বাচ্চু যেন নিজেই এক উড়োজাহাজ হয়ে ছুটে যায় তার স্বপ্ন ছুঁবে বলে। যেভাবে ‘চরাচর’-এর লখাও একদিন ছুটে গিয়েছিল সমুদ্রপানে।


চরাচর

‘চরাচর’ (১৯৯৪) চলচ্চিত্রে লখা চরিত্রে রজিত কাপুর ; ছবি সৌজন্য : অলোকানন্দা দাশগুপ্ত


পাখি ধরে ছেড়ে দেওয়ার অদ্ভুত নেশা লখার, অথচ পাখি ধরা তার জীবিকা। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে পাখিও এক পণ্য! এ মুক্তবাজারে সবই বিক্রি হয়, তাই লখার গ্রামেও পাখিবেপারীরা পৌঁছে যায়।

উত্তরাধিকার সুত্রে লখা পাখিশিকারী হলেও, মনে তার উদাস বাউলের বাস। পাখিদের প্রতি তার অপার ভালোবাসা। তাই লো এঙ্গেল শটে পাখি হাতে লখার হাত দুটো যেন আকাশের কাছাকাছি চলে আসে, তারপর মুক্ত পাখি ডানা মেলে মুক্তির আকাশে। লখার এইরকম বারবার পাখিকে খাঁচায় বন্দি করা এবং খাঁচাছাড়া করার চিত্রায়ণ মনের বন্দিত্ব ও মুক্তির রূপক হিসেবে উঠে এসেছে।

লখাদের মতো পাখিশিকারিদের তাদের বড়ো প্রয়োজন। কিন্ত উত্তরাধিকার সুত্রে লখা পাখিশিকারী হলেও, মনে তার উদাস বাউলের বাস। পাখিদের প্রতি তার অপার ভালোবাসা। তাই লো এঙ্গেল শটে পাখি হাতে লখার হাত দুটো যেন আকাশের কাছাকাছি চলে আসে, তারপর মুক্ত পাখি ডানা মেলে মুক্তির আকাশে। লখার এইরকম বারবার পাখিকে খাঁচায় বন্দি করা এবং খাঁচাছাড়া করার চিত্রায়ণ মনের বন্দিত্ব ও মুক্তির রূপক হিসেবে উঠে এসেছে। লখার তিন বছরের মৃত সন্তান নিতাই পাখি হাতে লখার স্বপ্নে আসে বারবার। নিতাই মৃত পাখি মাটিতে পুঁথে রাখে, কারণ সে বিশ্বাস করে, পাখি একদিন গাছ হবে! সংসারের প্রতি উদাসীন লখা গাছকেও বড়ো ভালোবাসে, বৃষ্টিতে ভিজে গাছকে ধরে সোহাগ করতে তার বড়ো ভালো লাগে। গাছ, পাখি, আকাশ তার ভাবনা জুড়ে। তাদের নিয়েই লখার স্বপ্নময় জগৎ।

চরাচর

‘চরাচর’ সিনোমর পোস্টার

এই মায়াময় স্বপ্নজগৎ ভেঙে লখার স্ত্রী সারি লখার মনে প্রবেশ করতে পারে না। তাই লখা বড়ো নিঃসঙ্গ! লখার স্বপ্ন ও বাস্তবতার এই জগতের ফাঁক দিয়ে একদিন পাখির বেপারী নটেবর প্রবেশ করে লখার উঠানে, সারি লখাকে ছেড়ে দিয়ে নটেবরের হাত ধরে। গৌরীকে বলা লখার সেই কথাটি সত্য হয়ে যায়, ‘আমার বড়ো সমস্যারে গৌরী! সারি থাকলে পাখি থাকে না, পাখি থাকলে সারি পালায়’। সারি পালিয়ে যাবার পর লখার শুন্যঘর পাখিময় হয়ে যায়। লখার পাখি ধরে ছেড়ে দেওয়ার মধ্যে সারি বিরক্ত হলেও, গৌরী তাতে সৌন্দর্য খুঁজে পায়, মুগ্ধ হয়। তাই লখার আফসোস, ইস সারিটা যদি গৌরির মতোন হতো! কিন্তু লখা জানে না নিরাপত্তা ও সুখের প্রশ্নে গৌরিরাই একদিন সারি হয়ে যেতে পারে। লখার বিশ্বাস, পাপে নিমজ্জিত এই পৃথিবী একদিন পাখির হবে। এতো পাপ মানুষের! পাখিকে ঘিরে লখার সকল ভালোবাসা আবর্তিত হলেও, মনের গহীনে সারিরও বাস। তাই সারিকে ছিনিয়ে এনেও তাকে নটেবরের কাছে ফিরিয়ে দেয় লখা, কারণ নটেবরের কাছে সারি নিরাপত্তা পেয়েছে, অভাবহীনতার সুখ পেয়েছে। শুধু ভালোবাসা দিয়ে সে সারিকে ধরে রাখতে পারবে না। বলা যায়, ইচ্ছে করেই লখা তার স্বপ্নজগতে পুরোপুরি বিলীন হয়ে তার একাকিত্বকে বরণ করে নেয়। তাই বাস্তবতার দরজা খুলে লখা একদিন সমুদ্রপানে ছুটে যায়, যেখানে হাজার হাজার পাখির ভুবন। লখা যেন হয়ে ওঠে এক সমুদ্র সারস! সকল বন্ধন ছিন্ন করে লখা ছুটে চলে তার স্বপ্নপানে।

‘টোপ’র গজা নামক ডাকপিয়নের চরিত্রটি দেখেও চরাচরের লখার কথা মনে পড়ে। ‘টোপ’র ডাকপিয়ন গজাও ডাকঘরে চাকরী করে। কিন্তু চাকরী তার ভালো লাগেনা, সংসার ভালো লাগেনা। তাই তার বিষাদ মাখা খোদোক্তি, ‘কী যে বলেন ছাই! এই এক ঘর, এক বউ, এক চাকরী, এক গ্রাম, এক পঞ্চায়েত, একই মোড়ল ভালো লাগে? বোরিং লাগে না!’ কিংবা ‘বাড়ি তো সবার হয়, গাছ কারো হয়’। তাই গজা ঘর ছেড়ে গাছে আশ্রয় নেয়। গাছের ডালে ঝুলে থাকে চিঠির ব্যাগ,ডাকপিয়নের পোষাক, স্যান্ডেল। রাজবাহাদুরের রক্ষিতা রেখা যখন জলের জীবন বেছে নেয়, গজা তখন বেছে নেয় গাছের জীবন। গাছে বানরদের সাথে তার সংসার।

টোপ

‘টোপ’ সিনেমার পোস্টার

ডাকঘরের পোস্টমাস্টার যখন সাইকেল নিয়ে গজার গাছের অনতিদূরে মেঠো পথ ধরে চলতে চলতে থেমে যান এবং গজার সাথে কথোপকথন শুরু করেন তখন স্থির ফ্রেমে যেন আমরা চিত্রশিল্পীর আরেকটা পেইন্টিং দেখতে পাই। বিস্তীর্ণ মাঠ, নিঃসঙ্গ গাছ, মাঠের মাঝখান দিয়ে চলে যাওয়া পথ, সাইকেলের দু চাকা যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে। তারাও যেন শুনতে পায় পোস্টমাস্টার ও ডাকপিয়ন গজার কথা। তাদের সাথে ওই গাছ, পথ, সাইকেলও সিনেমার চরিত্র হয়ে উঠে। গজা গাছ ভালোবাসে, তাই তাকে গাছ থেকে নামানোর জন্য গ্রামবাসীরা যখন গাছ কাটার প্রচেষ্টা চালায় তখন সে বানরদের নিয়ে অন্য গাছে আশ্রয় নেয়। তবু সে গাছ ছাড়ে না, জড়িয়ে থাকে গাছের গলা। এই প্রসঙ্গে বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের ‘গাছ’ কবিতার কয়েকটি লাইন পড়ে দেখা যায়।

‘…আজ বারবার/হাজার গাছের মাঝখানে গাছ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার কথা, গাছ হয়ে/মরে যাবার কথা ভাবি। একটা গাছ/আর একটা গাছের দিকে এগিয়ে যায়, জড়িয়ে ধরে অন্য একটা ডাল;/আমার একটা হাত এগিয়ে যায় তোমার গলার উপর, অন্য হাত/এগিয়ে যায় তোমার গলার নিচে,/তোমার গাছের শরীর মুখ থুবড়ে পড়ে মাটির ওপর,/ঠিকরে বেরিয়ে আসতে থাকে কচিপাতার চোখ।/আসলে গাছ হয়েও/ভোলা যায় না সবকিছু, গাছের মান-অপমান, ঘৃণা-প্রেম,/মর্মরের মতো কথা বলা না-বলা,/সব নিয়েই একটা গাছ অজস্র গাছের ভেতর মিশে থাকে, আর/এগিয়ে যেতে চায়/একট একটু করে, আত্মসাৎ করতে চায় আরেকটা গাছের শিকড়।’


টোপ-২

‘টোপ’ সিনেমারেএকটি দৃশ্য


এভাবেই হয়তো ডাকপিয়ন গজাও গাছকে ভালোবেসে নিজেকে গাছের মতোই ভাবে। তার কাছে তুচ্ছ হয়ে যায় তার সংসার, চাকরি। তার বউ, মা, গ্রামের মোড়ল শত চেষ্টায় তাকে গাছ থেকে নামাতে পারে না। সে গাছের ভালোবাসায় বন্দি। সে যেন কান পেতে শোনে পাতাদের মর্মর। আবার বাঘের টোপ হিসাবে ব্যবহৃত মুন্নির মায়ের চিৎকার যেন গাছেরা শুনতে পায়। মাতারীর খেলা দেখানো মুন্নি যখন বাঘের টোপ হিসাবে ব্যবহৃত হয়ে নিষ্প্রাণ, তখন আমরা একটি ফ্রেমে পাঁচটি গাছ দেখতে পাই, যার পাশ দিয়ে গজা দৌড়ে ফ্রেম আউট হয় আবার মুন্নির মা, বাবাকে নিয়ে ফ্রেম ইন হয়ে আউট হয়। মুন্নির মায়ের আর্তচিৎকারের সাথে গাছের কাণ্ডগুলোকে জুমশটে ও সম্পাদনার শৈলীতে আরও নিবিড়ভাবে দেখানো হয়, যেন গাছ কান পেতে শুনে মুন্নির মায়ের আর্তচিৎকার। বিবর্ণ রঙে প্রকাশ করে তাদের প্রতিবাদ। গ্রামের মানুষের কাছে গজা অস্বাভাবিক হলেও এই অস্বাভাবিকতার কারণেই হয়তো রাজাবাহাদুরের পথ আগলে ধরে কটাক্ষ করতে পারে ‘রাজাবাবু, আপনাকে দেখে খুব কষ্ট লাগে, এতদিন ধরে চিঠি বিলি করলাম, আপনাকে তো কেউ একটা চিঠিও লিখল না’। গজার এই উপহাসে রাজাবাহাদুরের নিঃসঙ্গতাও প্রকাশিত হয়।

বাঘ বাহাদুর

‘বাঘ বাহাদুর’ সিনেমার পোস্টার

‘বাঘ বাহাদুর’ এ প্রবীন ঢোলবাদক ‘শিবা খুড়ো’ ও বাঘ বাহাদুর ‘ঘুনুরাম’-এর অসহায়ত্ব ও নিঃসঙ্গতা গভীর এক মমতায় ফুটে উঠেছে। সিনেমার শুরুতে ঘুনুরামের গভীর অরণ্যপথে নিঃসঙ্গ যাত্রা, রাতের বৃষ্টির ছন্দে গভীর অরণ্যে তার বাঘনাচের ভাবনার চিত্রায়ণ এবং বিস্তীর্ণ মাঠের নিঃসঙ্গ গাছকে পেছনে রেখে ঢোলের তালে নৃত্যের ছন্দে গ্রামে প্রবেশ, এক মোহনীয় কাব্যময়তা সৃষ্টি করে। দর্শক মন এক কাব্যিক ছন্দ নিয়ে প্রস্তুত হয় কিন্তু ঘটনার পরম্পরায় মুখোমুখি হতে হয় এক কঠোর বাস্তবতার। প্রযুক্তির অবারিত জানালা দিয়ে বিশ্বায়নের সাংস্কৃতিক হাওয়া প্রবেশ করে দ্রুতই বদলে দিচ্ছে গ্রাম, তার সাথে শতশত বছরের ঐতিহ্য, শিল্প ও লোকসংস্কৃতির বিভিন্ন উপাদানও হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামের বুক থেকে। বিশ্বায়নের হাওয়ায় লোকজ সংস্কৃতি ক্রমেই দূর থেকে দূরে ভেসে যাচ্ছে। সবাই কেবল ছুটছে আর ছুটছে। ছুটছে বিনোদনের বিভিন্ন রঙিন জগতের পেছনে, ভুলছে তার শিকড়। তাই, যেদিন সার্কাসের সত্যিকারের বাঘ গ্রামে এলো, তখন ঘুনুরামের বাঘের নাচ তাদের কাছে ম্রিয়মান হয়ে গেল। যখনই ঘুনুরাম ঢোলের সাথে নাচ শুরু করে, সার্কাসের সংরা হিন্দি গানের সুরে নেচে গেয়ে তাদের পাশ দিয়ে চলে যায়। গ্রামবাসীরা ঘুনুরামের বাঘনাচ না দেখে তাদের পেছনে ছুটে যায়। বুদ্ধদেব বিশ্বায়নের সাংস্কৃতিক আগ্রাসনেরই এক নমুনা এখানে উপস্থাপনা করেছেন। অথচ গ্রামবাসীরা মাসের পর মাস এই বাঘনাচ দেখার জন্যই অপেক্ষার প্রহর গুনত।

যেদিন সার্কাসের সত্যিকারের বাঘ গ্রামে এলো, তখন ঘুনুরামের বাঘের নাচ তাদের কাছে ম্রিয়মান হয়ে গেল। যখনই ঘুনুরাম ঢোলের সাথে নাচ শুরু করে, সার্কাসের সংরা হিন্দি গানের সুরে নেচে গেয়ে তাদের পাশ দিয়ে চলে যায়। গ্রামবাসীরা ঘুনুরামের বাঘনাচ না দেখে তাদের পেছনে ছুটে যায়। বুদ্ধদেব বিশ্বায়নের সাংস্কৃতিক আগ্রাসনেরই এক নমুনা এখানে উপস্থাপনা করেছেন।

সিনেমায় বিস্তীর্ণ পটভূমিতে সুর্যাস্তের দৃশ্য বারবার ফিরে আসে নিঃসঙ্গতার বার্তা নিয়ে। পর্যটকদের উপহাসে, হেনস্তায় ঘুনুরাম যখন নদীতে ডুব দিয়ে তার শরীর থেকে বাঘের রং ধুয়ে ফেলে, তখন সে রং নদীর জলে মিশে গিয়ে মিলে যায় গোধূলির রঙে; যা ঘুনুরামের বেদনার রঙেরই প্রতিফলন।


বাঘ বাহাদুর ২

‘বাঘ বাহাদুর’ (১৯৮৯) চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্যে পবন মালহোত্রা ; ছবি সৌজন্য : দূরদর্শন


শেষ বিকেলে নদীতীরে বসে দুজন অসহায় মানুষ যেন নদীকে শোনায় তাদের আর্তি। ঘুনুরাম ও শিবাখুড়ো ক্রমেই বিচ্ছিন্ন হয়ে যান এক বিমর্ষ নিঃসঙ্গতায়। রাধাও সার্কাসের বাঘের মাস্টারের সাম্বার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে, চোখে মুখে তার মোহ। রাধাকে নিয়ে ঘর বাধার স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে যায় বাঘবাহাদুর ঘুনুরামের। বাপ দাদার শিল্পের প্রতি এ অপমান সহ্য হয় না তার। তাই লোকজ শিল্পের প্রতীক ঘুনুরাম একদিন সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের প্রতীক বাঘের সাথে দ্বন্দ্বে নামে, কিন্তু এই যুদ্ধ জেতার নয় কোনোভাবেই। শিবাখুড়র আপ্রান ঢোলবাদনের সাথে এ অসম যুদ্ধে ঘুনুরামের মৃতদেহ নিঃসঙ্গ পড়ে থাকে বাঘের খাঁচায়। লোকজ সংস্কৃতির এ এক দুঃখজনক প্রয়াণ,পরাজয়। খাঁচার ভেতর পড়ে থাকে সংশপ্তক বাঘবাহাদুরের নিথর দেহ কিন্তু শিবাখুড়ো তার ঢোল বাজিয়েই চলেন, যা আমরা এক্সট্রিম লং শটে দেখি। তিনি যেন জানান দিতে চান এই যুদ্ধ জিততে হবেই, চলমান রাখতে হবে নইলে শত বছরের এই লোকজ ঐতিহ্য হারিয়ে যাবে। আবার এই অবিরাম বাজিয়ে যাওয়া তো তার বুকের ভেতর হাহাকারের এক বহিঃপ্রকাশ।

দীর্ঘ এগারো বছর আন্দামানে বন্দি জীবন কাটিয়ে শিবনাথ যখন তার স্বাধীন দেশে ফেরে, তখন দেশভাগের করুণ পরিনতিতে সে একজন উদ্ভাস্তু! এমন স্বাধীনতা তো শিবনাথ চায়নি! স্বাধীন দেশে সবাই যখন যার যার আখের গোছাতে ব্যস্ত, তখন শিবনাথ এই স্রোতে গা না ভাসিয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, চিন্তা ও চেতনায় সে বড়ো একা হয়ে যায়! তাই সমাজের চোখে, পরিবারের চোখে সে পাগল। বিষণ্ণ মনে তাই তার ছেলেকে বলে, ‘পৃথিবীটা আসলে কমলালেবুর মতো নয়— কলার মতো, যে যেমন পারছে ছিলে খাচ্ছে।’

ঘুনুরামের মতো স্রোতে গা না ভাসিয়ে নিজের স্বপ্নকে নিয়ে বাঁচার আরেক যুদ্ধ আমরা দেখতে পাই ‘তাহাদের কথা’র শিবনাথের মধ্যে। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের একনিষ্ঠ কর্মী শিবনাথের স্বপ্নভঙ্গের এক আখ্যান উঠে এসেছে তাহাদের কথায়। স্বাধীন ভারতে শিবনাথ ফেরে বটে, তবে তার জন্মভূমিতে নয়। দীর্ঘ এগারো বছর আন্দামানে বন্দি জীবন কাটিয়ে শিবনাথ যখন তার স্বাধীন দেশে ফেরে, তখন দেশভাগের করুণ পরিনতিতে সে একজন উদ্ভাস্তু! এমন স্বাধীনতা তো শিবনাথ চায়নি! স্বাধীন দেশে সবাই যখন যার যার আখের গোছাতে ব্যস্ত, তখন শিবনাথ এই স্রোতে গা না ভাসিয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, চিন্তা ও চেতনায় সে বড়ো একা হয়ে যায়! তাই সমাজের চোখে, পরিবারের চোখে সে পাগল। বিষণ্ণ মনে তাই তার ছেলেকে বলে, ‘পৃথিবীটা আসলে কমলালেবুর মতো নয়— কলার মতো, যে যেমন পারছে ছিলে খাচ্ছে।’ পথচারী বৃদ্ধ যখন শিবনাথের কাছে স্বাধীনতার মর্ম জানতে চান, তখন শিবনাথ বাতকর্ম করে তার উত্তর দিয়ে দেয়।


তাহাদের কথা

‘তাহাদের কথা’ সিনেমার একটি দৃশ্য


‘তাহাদের কথা’য় ভানুমতীর খেলা দেখানো জাদুকর ও ফেরিওয়ালার মতো কয়েকটি চরিত্র প্রতীক হয়ে উঠে আসে। এখানেও বুদ্ধদেব বিস্তীর্ণ পটভূমিতে সুর্যাস্তের দৃশ্যে নিয়ে আসেন বার বার, ক্যামেরার ধীরগতির প্যানিং, বনভূমিতে শিবনাথের একাকী পথচলা দিয়ে নিঃসঙ্গতার এক বিমূর্ত ছবি আঁকেন। শিবনাথের ছুঁড়ে ফেলা আয়না ভেঙে কাচের টুকরো যখন সবুজ বনভূমিতে ছড়িয়ে পড়ে তখন সম্পাদনার শৈলীতে সৃষ্ট হয় অপূর্ব এক জাদুবাস্তবতার। এই কাচের টুকরো যেন বিদ্ধ হচ্ছে শিবনাথের কোমল হৃদয়ে। আবার ফেরিওয়ালার আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখে শিবনাথ থমকে দাঁড়ায়। এটাই যেন সে সমাজের আয়না, যে আয়নায় শিবনাথ তার প্রতিবিম্ব দেখতে চায় কিন্তু সেই ফেরিওয়ালা শিবনাথের কাছ থেকে পালিয়ে বেড়ায়। আবার ভানুমতীর জাদুকর যখন তার ছলনার জাদুতে সবাইকে ভেড়া বানিয়ে দেয়, সবাইকে তার কথামতো চলতে বাধ্য করে তখন এই জাদুকরকে চিনতে খুব কষ্ট হয় না। এই জাদুকর তো সেই লুটেরা পুঁজিপতি সমাজের প্রতিনিধি যারা ঘুমের গান শুনিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখতে চায়, বিভিন্ন মায়াজালে সমাজের বাস্তবতাকে আড়াল করতে চায়। তাই এই জাদুকর যখন শিবনাথকে পাতা খাইয়ে, তার থুথু খাওয়াতে চায় তখন শিবনাথ প্রতিবাদী হয়। শিবনাথ হত্যা করে ভানুমতীর এই জাদুকরকে, লুটেরা ও পুঁজিপতি সামাজের প্রতিনিধিকে। শিবনাথের পায়ে যেখানে তার স্ত্রী-কন্যা শিকল পরাতে ব্যর্থ হয়, সেখানে রাষ্ট্রের শিকলে আবার বন্দি হয় শিবনাথ। ছবির শুরুতে ট্রেনে করে বন্দিজীবন কাটিয়ে শিবনাথ একদিন ফিরে এসেছিল তার স্বাধীন দেশে, কুয়াশার ভেতর আরেক ট্রেনে করে শুরু হয় শিবনাথের বন্দিত্বের নতুন জীবন। শিবনাথের ছেলে পেছনে দাঁড়িয়ে দেখে কুয়াশার ট্রেনে তার পিতার প্রস্থান। হয়তো শিবনাথের ছেলের চোখেই শিবনাথের স্বপ্ন প্রবাহিত হয়ে নির্মিত হবে শিবনাথের স্বপ্নের স্বাধীন দেশ।


কালপুরুষ

‘কালপুরুষ’ (২০০৫) ছবিতে পিতা এবং পুত্রের চরিত্রে মিঠুন চক্রবর্তী এবং রাহুল বোস


প্রচলিত ধারণার যাপিত জীবনের অন্যরকম বিশ্লেষণের মাধ্যমে নিঃসঙ্গতার এক অনবদ্য কাব্য রচিত হয়েছে বুদ্ধদেবের ‘কালপুরুষ’ সিনেমায়। সিনেমার অন্যতম চরিত্র সুমন্ত অফিসে প্রমোশন না পেলেও সে সেইরকম বিচলিত নয় এবং তার জন্য সে উতলাও নয়। স্ত্রীর কাছে সে একজন ব্যার্থ মানুষ। তার প্রতি স্ত্রীর ভালোবাসা করুণায় রূপান্তরিত হলেও, সে বেদনাকাতর নয়। তার কাছে বরং সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে ছেলেকে জড়িয়ে ধরে রাস্তায় বাঁশিওয়ালার সুর শোনা অধিক আনন্দের মনে হয়। এই আনন্দ আরও বর্ণিল হয়ে যায়, যখন সেই মুহূর্তে তার মেয়ে গভীর মমতায় তার খোলা পিঠে ছবি আঁকে। এটাই তার সুখ, যদিও সে জানে বাচ্চাগুলোও তার নয়, এরা তার স্ত্রীর পরকীয়ার ফল। তবু জীবনের প্রতি তার গভীর মমতা, তারা তো তার আত্মার সন্তান। তার জীবনদর্শন কেবলই তার। সে বরং তার কৈশোরে হারিয়ে যাওয়া সেই বাঁশির সুর শুনতে চায় বার বার। কবীর সুমনের সেই গানটির মতোই–

ছেলেবেলার সেই/বেহালা বাজানো লোকটা/চলে গেছে বেহালা নিয়ে/চলে গেছে গান শুনিয়ে।
এই পাল্টানো সময়ে…/এই পাল্টানো সময়ে সে/ফিরবে কি ফিরবে না জানা নেই
গানওলা, আরেকটা গান গাও/আমার আর কোথাও যাবার নেই/কিচ্ছু করার নেই।

সুমন্তর অবচেতন মন খোঁজে তার অতীতকে, খোঁজে তার বাবা অশ্বিনীকে, যে বাবাকে সে গুলি করে মেরে ফেলতে চেয়েছিল অন্য নারীর সাথে সম্পর্কে জড়ানোর অভিযোগে। তাই নিঃসঙ্গ অশ্বিনী একদিন হারিয়ে গিয়েছেলেন তার স্বপ্নের ‘কুসুমপুরে’, যেখান থেকে কেউ কোনোদিন ফেরে না, তবু অশ্বিনী ফিরেছিলেন। তার ছেলে সুমন্ত, স্ত্রী পুতুলের সাথে মিশে গিয়ে নিঃসঙ্গ অশ্বিনী যেন নিজেকে প্রকাশ করেন গভীর এক দুঃখময়তায়, বলতে চান না বলা কথাগুলো। বাস্তব ও পরাবাস্তবতার এক স্বপ্নময় জগতে মুখোমুখি দাঁড়ান পিতা ও পুত্র। জীবনের এক অন্যরকম মানে খুঁজে পায় তারা। জীবনকে ভিন্নভাবে চিনতে শিখেছে সুমন্ত। তাই কিশোর বেলার বাবার প্রতি ক্ষোভ পরিণত হয় নিবিড় ভালোবাসায়। সে বার বার ফিরে যায় তার কৈশোরের বাঁশিওয়ালার কাছে। হন্য হয়ে খুঁজে ফেরে তাদের। নাগরিক জীবনের যন্ত্রণা থেকে সে অনেক দূরে থাকে। পার্কে বসা প্রেমিক প্রেমিকাদের কাছে ভালোবাসার অর্থ খুঁজে ফেরে, অর্থ খোঁজে এক পকেটমারের কাছেও। তাই পকেটমারের কাছে সুমন্তর কৌতুহল মেশানো প্রশ্ন, ‘ঘরে কে আছে তোমার? বৌ? বৌয়ের নাম কি? তোমাকে খুব ভালোবাসে, তাই না?’

স্ত্রীর সাথে সুমন্তর দূরত্বের ছবি উঠে আসে তাদের এক রাতের কথোপকথনে। সুমন্ত স্ত্রীর সাথে গভীর একান্ত সময় কাটাতে চাইলে, স্ত্রী জানতে চায় সুমন্ত সাবান মেখে স্নান করেছে কি না, ব্রাশ করেছে কি না! তখন সুমন্ত জানায়,

‘আমি যদি একটা আস্ত সাবান, ব্রাশ, পেস্ট, পুরো বোতল ডেটল ছিপিসুদ্ধ চিবিয়ে খেয়ে ফেলি, তাহলেও তোমার ঘেন্না যাবে না’

তাই সাগর সৈকতে পিতা পুত্র গভীর বেদনায়ও বেঁচে থাকার সৌন্দর্য খোঁজে। বাস্তবতা ও পরাবাস্তবতা একাকার হয়ে, সকল মলিনতা ধুয়ে মুখ্য হয়ে উঠে জীবনেরই সৌন্দর্য। তারা জেনেছে জীবন অনেক রকম হয়। তাই গোধূলিলগ্নে বালুকাবেলায় শান্তা ও শান্তনুর সাথে সুমন্তর আনন্দঘন হৈ-হুল্লোড়ের মাধ্যমেই সিনেমার সমাপ্তি ঘটে। কানে অনুরণিত হয় সুমন্তকে উদ্দেশ্য করে বলা অশ্বিনীর সেই কথা, আসলে আমাদের ভালোবাসা ততক্ষণ, যতক্ষণ ভালোবাসার হিসেবনিকেশ ঠিকঠাক থাকে।


লাল দরজা

‘লাল দরজা’ সিনেমায় শুভেন্দু চট্টপাধ্যায়, ইন্দ্রানী হালদার এবং চম্পা


‘কালপুরুষের’ সুমন্ত যখন নগরজীবনের যন্ত্রণা এড়িয়ে কেবল ভালোবাসতে শেখে, ক্ষমাশীল হতে শেখে, সেখানে ‘লাল দরজা’র নবীন নাগরিক যন্ত্রণায় যেন যন্ত্রমানব হয়ে যান। কাউকেই ভালোবাসতে পারেন না। তার ভেতর ভালোবাসা নেই, আছে কেবল ঈর্ষা আর প্রতিশোধস্পৃহা। তাই স্ত্রীর সাবেক প্রেমিককে হত্যা করার জন্য তার খুনি ভাড়া করার অভিপ্রায় জাগে। স্ত্রী, পুত্র তার কাছ থেকে অনেক দূরে চলে যায়। নিঃসঙ্গ নবীন তাই বার বার ফিরে যান তার শৈশবের লাল দরজার কাছে এবং শৈশবের নবীনও তার কাছে বার বার ফিরে আসে। নবীন মুক্তি চান তার এই যন্ত্রজীবন থেকে। শৈশবের পাহাড়কোলের কুয়াশাময় হৃদয়খানি যেন তার হারিয়ে গেছে। যে প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসে পাহাড়কোলের সেই লাল দরজা খুলতে পারত, আজ শত চেষ্টায় তার মনের দরজা কিছুতেই খুলতে পারেন না নবীন।

এদিকে নবীনের গাড়ির ড্রাইভার দিনু দুই বউ ও এক প্রেমিকাকে নিয়ে জীবন উপভোগ করে নিজের মতো করে। কোনো জটিলতা নেই। এখানে অভাব আছে কিন্তু সুখের কোনো কমতি নেই। নবীন যখন স্ত্রীর সাবেক প্রেমিকাকে খুন করার জন্য লোক ভাড়া করতে চান, তখন দিনু তার দ্বিতীয় স্ত্রীর সম্পর্ককে সহজভাবে মেনে নিচ্ছে। নবীন তার ড্রাইভার দিনুর সুখি জীবনের সাথে নিজের জটিল জীবনের তুলনা করে নিজেকে বুঝবার চেষ্টা করেন। নবীন ও তার গাড়ির ড্রাইভারের দুটো বিপরীতমুখি চরিত্রকে বুদ্ধদেব সমান্তরালভাবে টেনে নিয়ে গিয়ে দেখিয়েছেন সুখ, সম্পর্ক, ভালোবাসাকে সমাজবদ্ধ কোনো ছকে আটকে রাখা যায় না, তা সময় ও প্রয়োজনের তাগিদে আপেক্ষিক হতে বাধ্য। নিঃসঙ্গ নবীনের সম্পর্কের সব সুতো যখন ছিঁড়ে যায়, তখন নবীনের বৃদ্ধ মাকে দোতলার সিঁড়ির মুখে বসে উল বুনতে দেখা যায়। এক সময় সুতোয় টান খেয়ে উলের বল সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে নামতে থেমে যায়, কিন্তু সুতোর মাথা মায়ের হাতেই থাকে। চারিদিকে সম্পর্কের টানাপোড়েনে নবীনের মা-ই যেন সম্পর্কের সুতো বুনে চলেছেন আপনমনে। নবীনের মা-ই তার একমাত্র আশ্রয়স্থল যিনি নবীনকে শিখিয়েছিলেন, লাল দরজার সহ্যক্ষমতা অসীম। নবীন নিজের মনের লাল দরজার সহ্যক্ষমতা বাড়াতে চান, নাগরিক জীবনের অসহ্য এই একাকিত্ব ভুলবেন বলে।


জানালা

‘জানালা’ সিনেমার পোস্টার


বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের ‘জানালা’র বিমল তার স্বপ্ন নিয়ে ভীষণ একা। সে তার শৈশবের স্বপ্ন ধরবে বলে চাকরি হারায়, মীরার সাথে নতুন সংসার পাতার স্বপ্নও ভেঙে যায়। বিমলের শৈশবের স্কুলের জানালা তৈরির স্বপ্নের বিভোরতার কোনো যুক্তি কেউ খুঁজে পায় না। এই স্বপ্নের কোনো মুল্য নেই মীরার কাছে, হেড মাস্টারের কাছে, স্কুল কমিটির কাছে— কিন্তু তার নিজের কাছে তার এই স্বপ্ন তুলনাহীন। সেই জানালার পাশ দিয়েই তো বয়ে গেছে তার শৈশবের নদী। কত দুপুর এই জানালা দিয়েই দেখেছে তার নিজস্ব সমুদ্র। সেই যে ভূগোল ক্লাসে কী এক অনন্য জাদুবাস্তবতায় বিমলের জানালা দিয়ে প্রবেশ করে সমুদ্রের ঢেউ।

অনেকদিন পর হঠাৎ একদিন বিমল যখন ঝুমুরপুরের বাসে চেপে তার স্কুলে পৌঁছে, তখন আমরা বিমলের সেই শৈশবের জীর্ণ হয়ে যাওয়া, ভেঙে যাওয়া জানালা দিয়ে দেখতে পাই বয়ে যাওয়া তার শৈশবের নদী। কী অপূর্ব ডিটেইলে দেখানো হয়েছে পুরনো জানালাকে। ঘুণে ধরা, ঝুল লাগানো, বিবর্ণ, ভেঙে যাওয়া জানালা, যেখানে অস্পষ্ট হয়ে যাওয়া বিমলের নাম ঠিক বোঝা যায়। যেন স্বপ্ন দেখতে ভুলে যাওয়া কোনো মনের প্রতিফলনের সামনে দাঁড়িয়ে আছে স্বাপ্নিক বিমল। বিমল তাই জীর্ণ হয়ে যাওয়া জানালাকে নতুন করে তৈরি করতে চায়। বৃদ্ধাশ্রমের সামান্য মাইনে পাওয়া কেয়ারটেকার বিমলের পক্ষে বিশাল এই জানালার খরচ দেওয়া একটু কষ্টকর বটে, তার উপর তাদের নতুন সংসারে নতুন মুখের আগমন বার্তা। তবু বিমল তার স্বপ্নের জানালা তৈরি করবেই। লং মিড শটে স্বাপ্নিক বিমলকে তখন বাইরে থেকে জানালার ভেতর দিয়ে দেখতে পাই। যেন রং তুলিতে আঁকা চিত্রশিল্পীর আরেক পেইন্টিং। বিমলের সেই জানালায় ফিরে আসে জাদুকরের পালিয়ে যাওয়া কবুতর, শৈশবের ছেঁড়া রঙিন ঘুড়ি।

স্বপ্নের জানালা বিমল তৈরি করবেই, কিন্তু সমাজ বাস্তবতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় স্বপ্ন দেখার সাহসও মানুষ হারিয়ে ফেলেছে যেন। তাই জানালায় বিমলের সাথে জড়িয়ে যায় এক চোর। প্রতিকী এই চরিত্র রূপায়নে ছিলেন অভিনেতা তাপস পাল। এই স্বপ্নচোর যেন সেই সমাজের প্রতিনিধি, যে কোনো না কোনোভাবে বিমলের স্বপ্নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। প্রথমেই চোর বিমলের স্যুটকেস চুরি করে যাতে মীরার জন্য কেনা খেলনা ছিল, তারপর বিমলের স্কুলের ছুটির ঘন্টা। বৃদ্বাশ্রমের সদস্যদের জামা কাপড়ও চুরি করে, যার কারণে বিমলের চাকরি চলে যায় এবং শেষে চোর বিমলের সেই জানালাটাই চুরি করে নিয়ে যায়। আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় বিমলের বানানো সেই জানালা আর স্কুলে দেওয়া হয় না। স্বপ্নের সেই জানালা অন্য কেউ গ্রহণও করে না অথচ এই জানালা তৈরি করতে গিয়ে তাদের জমানো টাকা খরচ করে, যা তিলে তিলে সঞ্চিত হচ্ছিল নতুন সংসারের জন্য, অনাগত সন্তানের জন্য। তাই বিমল তার স্বপ্নের বিশালতা নিয়ে বড়ো একা হয়ে যায়। চোর যখন বাজারে বিমলের জানালা বিক্রি করতে চায় তখন জনৈক ক্রেতাকে বলতে শোনা যায়, এত বড়ো ঘরই নেই, এই জানালা লাগাব কোথায়! এই সংলাপ বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। আসলেই তো এত বড়ো স্বপ্ন ধারন করার মতো সমাজ কিংবা রাষ্ট্র কি সেভাবে প্রস্তুত আছে?

বুদ্ধদেবের অন্যান্য সিনেমার মতো ‘জানালা’য় ও গাছ, পটভূমি, প্রকৃতির সাথে জানালা নিজেও একটা চরিত্র হয়ে যায়। সিনেমার শেষাংশে পথের ধারে একটি নিঃসঙ্গ গাছ দেখা যায়, যার পাশ দিয়ে আদিবাসীদের দল কোনো গন্তব্যে ফেরে, যেমন জানালা ফেরে জঙ্গলে গাছের কাছে।

বুদ্ধদেবের অন্যান্য সিনেমার মতো ‘জানালা’য় ও গাছ, পটভূমি, প্রকৃতির সাথে জানালা নিজেও একটা চরিত্র হয়ে যায়। সিনেমার শেষাংশে পথের ধারে একটি নিঃসঙ্গ গাছ দেখা যায়, যার পাশ দিয়ে আদিবাসীদের দল কোনো গন্তব্যে ফেরে, যেমন জানালা ফেরে জঙ্গলে গাছের কাছে। গাছের নিচে পড়ে থাকা বিমলের স্বপ্নের জানালাকে বুদ্ধদেব ক্যামেরার ধীরলয়ে প্যানিং করে বিভিন্ন দূরত্ব থেকে দেখান। পাতাদের মর্মরে জানালাকে ফিরে পেয়ে যেন প্রকাশিত হয় গাছেদের আনন্দের বার্তা। তারপর কী এক নৈঃশব্দ্যের ভেতর দিয়ে সময় বয়ে যায়, গভীর স্তব্দতায় অন্ধকার নামে!

বিমলের স্বপ্নের জানালার মতো ‘স্বপ্নের দিন’ সিনেমায়ও পরেশের প্রজেক্টর চুরি করে নিয়ে যায় এক বামন লোক, যে বামনেরা বুদ্ধদেবের বিভিন্ন সিনেমায় নানাভাবে আসে, নানা ব্যঞ্জনায়। বিস্তীর্ণ পটভূমিতে এক নিঃসঙ্গ গাছের পাশ দিয়ে প্রজেক্টর কাঁধে বামনের পালিয়ে যাওয়ার দৃশ্যের কাব্যময়তার এক বেদনাবোধ জাগে। এই প্রজেক্টরের মাধ্যমেই পরেশ খুঁজে পেত তার স্বপ্নের নায়িকা। সরকারি প্রজেক্টর হারিয়ে চাকরি হারানোর ভয় পরেশকে ততটা তাড়িত করে না, যতটা করে তার স্বপ্ন হারিয়ে গেল বলে।

স্বপ্নের দিনে তিনজন নিঃসঙ্গ মানুষ ঘটনাচক্রে এক হয়ে যায়। সরকারি তথ্য অফিসের প্রজেক্টেরম্যান পরেশ, যার মা ছোটোবেলায় পালিয়ে গিয়েছিল অন্য লোকের হাত ধরে, পরেশকে বহনকারী সরকারি গাড়ির প্রক্সি ড্রাইভার চপল, যার পরিচয় ঢাকা পড়ে গেছে কোনো এক মাখন দাসের পাসপোর্টের আড়ালে এবং সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় স্বামী হারানো আমেনা। পরেশ খোঁজে তার স্বপ্নের নারী, চপল খোঁজে তার বিদেশ যাবার স্বপ্ন আর আমেনা খোঁজে তার দেশ, যে দেশে তার অনাগত সন্তানের জন্ম দিয়ে বৈধ কাগজ তৈরি করবে। পরেশের হারানো প্রজেক্টর খুঁজতে খুঁজতে তিনজন মানুষ যেন পরস্পরের খুব কাছে আসে। রাতের অন্ধকার জঙ্গলে তারা শোনায় তাদের নিঃসঙ্গতার গল্প, তারা ভালোবাসার মানে খোঁজে নিজেদের মতো করে। জঙ্গলে জোছনাময় রাতের আবছায়ায় গাড়িতে শুয়ে থাকা তিনজন নিঃসঙ্গ মানুষকে কেন্দ্র করে ক্যামেরার ১৮০ ডিগ্রিতে প্যানিং, আবহসংগীত এক মায়াবী কাব্যময়তা সৃষ্টি করে। একাকী মনের বেদনা ছড়িয়ে পড়ে। ঘুমন্ত তিনজনের স্বপ্ন এসে বাস্তবে মিশে যায়। বিচ্ছিন্নবাদীরা যখন তাদের গাড়িও ছিনিয়ে নেয় তবু তারা বিচ্ছিন্ন হয় না। তবে সীমান্ত পেরিয়ে একসাথে বেঁচে থাকার স্বপ্নের মৃত্যুতে তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ঘটনাচক্রে এক হয়ে যাওয়া তিনজন নিঃসঙ্গ মানুষ আবার একা হয়ে যায় সীমান্তআইন লঙ্গনের দায়ে। আমিনার সন্তানের জন্য একটা বৈধ কাগজের স্বপ্ন হারিয়ে যায় চিরতরে।


টোপ ৩

‘টোপ’ সিনেমার একটি দৃশ্য


বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের ‘টোপ’ সিনেমায় আমরা মুক্তিকামী নিঃসঙ্গ নারী রেখার দেখা পাই। রাজাবাহাদুরের প্রাসাদে বন্দি রেখা প্রতিনিয়ত মুক্তির স্বপ্ন দেখে। বাস্তবে বসবাস হলেও স্বপ্নে যার নিত্য চলাফেরা। তাই আমরা রেখার চোখে, স্বপ্নে কিংবা ভাবনায় বারবার জলে তার অবাধ সাঁতার কাটা দেখি। রেখা যেন তখন এক স্বপ্নের জলপরী। ঘুরেফিরে কয়েকবার এই দৃশ্য আসে। এ যেন এক চিত্রশিল্পীর জলরঙে আকা পেইন্টিং যার সাথে মিশে আছে আরও না দেখা ইমেজের। জলে মেঘের ছায়া, শ্যাওলার সবুজ রং, মাছ, তাদের সাথে রেখা ও তার স্বপ্নপুরুষের অবাধ সাঁতার ইত্যাদির মাধ্যমে অপূর্ব এক কম্পোজিশন তৈরি হয়। বাস্তবতায় নিস্পৃহ রেখা দূরবীনেও যখন জলমগ্ন এই দৃশ্য দেখতে দেখতে বাস্তব কোনো দৃশ্যে ফিরে আসে তখন রেখার মুখের নিস্পৃহতা আরও প্রবলভাবে প্রকাশিত হয়। তাই হয়তো রেখাকে দেয়ালে ঝুলানো তৈলচিত্র শুন্যে উড়িয়ে জলে বিসর্জন দিতে দেখা যায়। এ যেন রেখারই আত্মবিসর্জন। জলে ছিল আকাশের ছায়া, যা ভেঙে যায় বিসর্জিত তৈলচিত্রে। রেখা তার স্বপ্নজগতে এত বিভোর যে, যখন তথ্যনির্মাতা দলের একজন তাকে মুক্ত করে তাদের সাথে কলকাতায় নিয়ে যাবার প্রস্তাব দেয় তখন রেখা তা প্রত্যাখান করে, কারণ সে একজনকে কথা দিয়ে রেখেছে। পরবর্তীতে আমরা দেখি সেই একজন তার স্বপ্নের জল থেকে উঠে আসা পুরুষ।

রেখা ভাবে, যেদিন সে বুড়ি হয়ে যাবে, চুল সাদা হবে, বুক ঝুলে যাবে, গায়ের চামড়া কুঁচকে যাবে তখন সে নিজের মতো বাঁচবে, তখন তাকে দেখে আর কারো ইচ্ছে হবে না। তাই স্বপ্নের জল থেকে উঠে আসা পুরুষের আহ্বানে সে একদিন তার সাথে চলে যায়, যার সমস্ত শরীর থেকে জল ঝরে। সৃষ্টি হয় এক জাদুবাস্তবতার। জানালা খুলে জানালার শিকগুলো আলাদা হয়ে দুদিকে চলে যায়। রেখা বেরিয়ে যায় স্বপ্নের জলেভেজা পুরুষের সাথে যেখানে স্বপ্ন ও বাস্তবতা মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। রেখা নিজেও সমাজের এক ‘টোপ’ হিসাবে ব্যাবহৃত হয়েছে, হয়তো তার অজান্তেই। কিন্ত এই টোপের জীবন তার ভালো লাগেনি। তাই রেখা বেছে নিল জলের জীবন।

বুদ্ধদেবের নিঃসঙ্গ চরিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে এক গভীর যোগসূত্র, যেখানে বৈসাদৃশ্যের চেয়ে সাদৃশ্যেই বেশি। প্রত্যেকটি চরিত্রের রয়েছে নিজস্ব স্বপ্নজগৎ, যে জগৎ নিয়ে তারা বিভোর। বুদ্ধদেব তাই এইসব স্বপ্নকে আলাদা করে বোঝাতে চান না। বাস্তবতার ভেতরেই স্বপ্ন নিয়ে আসেন। স্বপ্ন ও বাস্তবতা একাকার হয়ে মিশে যায়।

বুদ্ধদেবের নিঃসঙ্গ চরিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে এক গভীর যোগসূত্র, যেখানে বৈসাদৃশ্যের চেয়ে সাদৃশ্যেই বেশি। প্রত্যেকটি চরিত্রের রয়েছে নিজস্ব স্বপ্নজগৎ, যে জগৎ নিয়ে তারা বিভোর। বুদ্ধদেব তাই এইসব স্বপ্নকে আলাদা করে বোঝাতে চান না। বাস্তবতার ভেতরেই স্বপ্ন নিয়ে আসেন। স্বপ্ন ও বাস্তবতা একাকার হয়ে মিশে যায়। এখানেই আসে কাব্যময়তা, জাদুবাস্তবতা। বুদ্ধদেবের ভাষায় ‘একটি গ্লাসে কিছু স্বপ্ন, কিছু জাদু, আর কিছু বাস্তবতা নিলাম, তারপর ঝাঁকালাম। এটাই আমার সিনেমা’। কোনো তুলনামূলক আলোচনায় না গিয়েও নিঃসন্দেহে এটা বলা যায় যে বুদ্ধদেব তার সিনেমার ইমেজে ও কম্পোজিশনের কাব্যময়তায়, দৃশ্যপরম্পরায় নৈঃশব্দ্যের যে ভাষার প্রকাশ ঘটিয়েছেন, তা ভবিষ্যতে চলচ্চিত্রবিদ্যার জন্য গবেষণার বিশাল এক দ্বার খুলে দিয়েছেন। বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের চলচ্চিত্রে কবিতার প্রসঙ্গে আমরা স্মরণ করতে পারি কবি শঙ্খ ঘোষের চলচ্চিত্র ও কবিতা সম্পর্কিত একটি ভাবনাকে। শঙ্খ ঘোষের সেই ভাবনার কথা বলে লেখাটির ইতি টানছি ‘আমরা কি আজ দাবি করতে পারি না সেই ভাবনা? আমরা কি চাইব না যে বাংলা ছবি আজ সম্পূর্ণত গল্পনির্ভর না থেকে কখনো কখনো হয়ে উঠুক কল্পনির্ঝর? চিত্রকল্পের নির্ঝরে, ছবির পর ছবির মন্তাজে, এই সময়ের কোনো একটি ঘুর্ণি-চেহারা তো আজ কবিতার মতোই ব্যাঞ্জনাময় হয়ে আসতে পারে কোনো ফিল্মে!’


তথ্যসূত্র :
১) ছবি কেন করি : বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত, শতবর্ষে চলচ্চিত্র, প্রথম খণ্ড, সম্পাদনায় : নির্মাল্য আচার্য ও দিব্যেন্দু পালিত, আনন্দ পাবলিশার্স,কলকাতা।
২) ফিল্মের মধ্যে কবিতা : শঙ্খ ঘোষ, শতবর্ষে চলচ্চিত্র, প্রথম খণ্ড, সম্পাদনায় : নির্মাল্য আচার্য ও দিব্যেন্দু পালিত, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা।
৩) কবিতাসংগ্রহ : বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা।
৪) বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের সিনেমা টোপ : কবিতা ও জাদুবাস্তবতায় শিকার ও শিকারির গল্প : শ্যামল কান্তি ধর, প্রভাত ফেরী, প্রকাশকাল : ২৬ আগস্ট, ২০২০।
৫) বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের সাক্ষাৎকার, ভূমিকা ও ভাষান্তর : নাফিস সাদিক, শ্রী, প্রকাশকাল : ২৫ জুন, ২০২১।
৬) বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের চলচ্চিত্রের ভাষা ও নান্দনিকতা : সাজেদুল আউয়াল, শিল্প ও শিল্পী, প্রকাশকাল, ১৪ জুলাই, ২০১৬।
৭) চলচ্চিত্রের নন্দন তত্ত্ব, পার্থপ্রতিম বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রথম ও মুশায়েরা সংস্করণ, কলকাতা।

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

পেশায় ব্যাংকার। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থ বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর। শাবিপ্রবির চলচ্চিত্র বিষয়ক সংগঠন চোখ ফিল্ম সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক হিসাবে চলচ্চিত্র বিষয়ক ছোটোকাগজ ‘প্রক্ষেপণ’ সম্পাদনায়ও যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে বিভিন্ন ওয়েব পত্রিকায় নিয়মিতভাবে চলচ্চিত্র বিষয়ক প্রবন্ধ ও গল্প লিখছেন।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।