শুক্রবার, অক্টোবর ২২

বেবী সাউ-এর দশটি কবিতা

0

Start

.

.

.

.

ব্যক্তিগত

গোপনে একটা উদ্দেশ্য, যে পা ছড়িয়ে ধীরে ধীরে গুছিয়ে তুলছিল তার ঘরসংসার,
চোরাশিকারির দল ক্রমশ তাহাকে বিভ্রান্তের দিকে নিয়ে যাচ্ছে…

দরজায় টাঙিয়ে রাখা লেবু ও লঙ্কা,
বৃষ্টিপাতের ঘন ছায়া এবং ইশারায় সংগ্রহ করা সন্দেহপ্রবণ মন
দেওয়ালে আড়ি পেতে শুনে নিচ্ছে মায়া ও মাদকতা…
একটা ইঁদুর ঘুমিয়ে পড়েছে সাতসকালেই
সম্ভবত তাই কোনো ছ্যাঁদাফুটো নেই…
সম্ভবত এজন্যই বিবাহ আসরে ঘুমিয়ে পড়েছে শাঁখ ও উলু…

আসতে-যেতে এসব খোঁটা, হাতুড়ি,চিমটের দাগ কোলাহলের শহরে
মূর্তি বানাবে?

এসব শান্তির প্রস্তাব তোমাকে উদাসীন করে তোলে আরও একবার

বন্দি

ফেরে, যা ফেরার কথা ছিল না কখনও

কিন্তু ততক্ষণে আমরা হারিয়ে ফেলেছি নাম ও গোত্র
মিছিলের মাঠগুলোতে চরে বেড়াচ্ছে অসংখ্য ভেড়া এবং মেষপালক
যৌথ চিৎকার শহরকে ব্যতিক্রমী করে তুলছে

এরকম একটা পথ কিছুতেই তোমার বাড়ির রাস্তা এবং শ্মশান প্রান্তর ঠিকঠাক বলতে পারে না
কিছুতেই মনে থাকে না উপকণ্ঠের পানশালাটির কথা

যেখানে একটা বৃদ্ধ প্রত্যেকবার রূপকথার গল্প শোনাতে চাইত…

জরা

অনুশোচনার একটা পথ বাঁক নিতে নিতে ঘুরে যাচ্ছে করুণাময় নিশানার দিকে
ভিক্ষা এবং ভিখিরি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে
আর দীঘল ছায়ায় ঘন হচ্ছে অন্ধকার
যেহেতু ছায়াকে স্পষ্ট রূপে প্রতীয়মান করার জন্য চাই একটা নির্দিষ্ট এবং স্থির আলো
আর প্রতিফলিত হওয়ার মতো একটা সাবজেক্ট
ততক্ষণে তৈরি হওয়া বিরাট ছায়াগহ্বর, অনুশোচনাকে গিলে ফেলেছে
আর একেকটি শালিক তুলে দিচ্ছে স্বপ্নালু আখর
এসব ঝড়জলের দিনে তাই বেচছে বেচারা কলেজ স্ট্রিট…

শিল্পী

ধারালো ছুরির কাছে
আমার সমস্ত উপাসনা তুলে ধরি

মৃদু নুপূরে বাজে শহরের চাঁদ
মন্দিরের নকশা

নতজানু চোখ দেবী হয়ে ওঠে

কল্পিত ভুলের মাশুলে জেগে ওঠে
দলমার ছায়াচিত্র
নিপুণ কৌশল জানে সীমাবদ্ধ উৎসবে কীভাবে মেশাতে হয় নুন-দাগ!

মানগো ব্রীজে ঝুলতে থাকে পোষা আত্মহত্যা

অথচ তুমিও জানো, ক্ষতময় যোনী চিহ্ন তাহাকে ঈশ্বর সাজিয়েছে …

খবর

রুটি ও বর্ণমালা দেখলেই তোমার বিষণ্ণ মুখ নড়েচড়ে ওঠে

প্রকৃত সত্যের খোঁজ কখনোই ফুরাবে না জেনে
সবটুকু দরজা হাট করে খুলে রাখো তুমি
শীতল মেঝেতে কান পেতে শোনো গোপন সংকেত

চুপচাপ হেঁটে যায় হরিধ্বনি, কয়েন ছড়ায়

চোখ বন্ধ করতে করতে এরকম শিহরিত দৃশ্য
বারবার মৃত্যুকে ঘোষণা করে…

সময়

একটা অতিকায় আগুনের ভেতর নিজেকে সমর্পণ করে দিচ্ছ

ওঁ স্বাহা…
ওঁ স্বাহা…

জন্মজাত পরিচয়, চিহ্ন নথিপত্রের মতো
খুঁদপিণ্ডের আশা ছেড়ে ঝাঁঝালো গন্ধ হয়ে উঠছে

এরকম আগুনের স্বপ্ন বহুবার তোমাকে বিহ্বল ও আশান্বিত করে

ধীরে ধীরে ফিনিক্স হয়ে ওঠে এ সমাজ, রাষ্ট্র, কাঁটাতার

নকশা

অন্তর্গতভাবে, সেখানেই ছেড়ে আসা ভালো—
যতটুকু প্রাচীর তোমাকে স্পর্শ করে

আলো অভিঘাত জেনে প্রতিটি ঘড়ি এবং কাঁটা
জীবনপ্রণালীর শরীরে হাত রাখে; মৃদু কষ্টে গিলে নেয় কফ থুতু
সালভাদরকে চিনি না আমরা! প্রসঙ্গত তাই কোনো ঋণ নেই আমাদের
শুধু অর্জিত সুখের কথা শুনতে শুনতে একেকটি ব্যাঙ ডেকে উঠছে
ঈশানের কোণে জমে আছে আগাছার হাবুডুবু
পিঙ্গল শূন্যতা আমাদের প্রতিঘাত দেবে?

আর এই নিশিভোর ক্ষণে তুমি, আকুলিবিকুলি, চেয়ে বসবে অপত্য সম্ভাবনা!

অহম

ঘুম এবং জীবনের মধ্যিখানে স্থির চেয়ে আছ তুমি

সুনিপুণ দৃশ্যে লকলক করে উঠছে থাবা ;
চোখের দৃষ্টি ক্ষণ ম্রিয়মাণ
পারদের স্তুপ ভেঙে, জলের প্রতিক্রিয়া সরিয়ে
তোমার ধারালো নখ এই জন্ম চুষে পুড়ে নিচ্ছে

আমাদের ডাক নেই; সম্ভবত পথও নেই তাই
মৃত খাটে পা ছড়িয়ে শুয়ে আছে অক্ষরবৃত্তের ছাঁদ

গরম জল চাই কারো! অহেতুক রোদ্দুর?

সারা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ উপসংহার নিয়ে আমরা আশ্রয় খুঁজছি
বাংলা কবিতা তুমি আমাদের ঘর-বাটি দিও

কবর

সাধারণত এসব অলীক গল্পে নটে গাছের প্রসঙ্গ এসে পড়ে
আর তখনই একটা গৃহপালিত জীবের জন্ম হয়…

যে প্রাণীটিকে তুমি কখনও দেখোনি, গন্ধ শোঁকোনি
অথচ বছর কেটে তার সঙ্গে পেরিয়ে আসছে তোমার কাঙ্ক্ষিত ইচ্ছে, সুনির্দিষ্ট কৌশল…
সেই ইচ্ছে প্রতিটি দৃশ্যকে করে তুলতে পেরেছে অস্থির ও সর্পিল
আর একটি বিরাট অজগর দুমড়ে মুচড়ে চৈত্র সন্ধ্যার কাছে জমিয়েছে কান্নাভরা বিকেল

এখানে বিভ্রান্ত অজগর নয়, বরং সাত-সালকীর বিলে পোঁতা সেই
মায়ার শরীর সমস্ত দৃশ্যকে মুড়ে দিয়েছে ছায়াকাতরতায়…

কূটনৈতিক

অথচ প্রস্তাব ছিল।

একটা সুনির্দিষ্ট রাস্তা পেরিয়ে, একটা অনাকাঙ্ক্ষিত নেটওয়ার্ক ভেঙে
সহজেই পৌঁছে যাওয়া যেত সৌজন্যমূলক হাসির কাছে

যেখানে বাঘ এবং একটা নির্মল হরিণ একসঙ্গে ডিনার সারছে

আপাত নিরীহ সেই চোখ হেঁটে যাচ্ছে বোধিপ্রিয় কোনো গাছের কাছে
ফুটে আছে দয়া ও করুণা…
বয়ে যাচ্ছে নদী, কাঠখড়, স্মৃতি

কয়েক সহস্র বছরের সতর্ক খেয়াল, নজর রেখেছে
বিভ্রান্ত বাঘের দেহে কীভাবে সামান্য শীতল সেই হাওয়া শিহরণ জাগিয়ে তুলছে

সভাকক্ষ বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত এ দৃশ্য চলতেই থাকবে স্পর্শকাতরতায়…

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

কবি ও প্রাবন্ধিক।  স্নাতকোত্তর, গবেষণারত। সাতটি কবিতার বই, দুটি প্রবন্ধের ও একটি অনুবাদের বই প্রকাশিত হয়েছে। দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলার  লুপ্তপ্রায় এক লোকসংগীত  কাঁদনাগীত : সংগ্রহ ও ইতিবৃত্ত-এর জন্য পেয়েছেন ২০২০ সালের ‘পশ্চিমবঙ্গ  বাংলা আকাদেমি’ পুরস্কার ‘কৃত্তিবাস মাসিক পুরস্কার ২০১৯' পুরস্কার।  তাঁর কবিতার বইগুলোও বিভিন্ন পুরস্কার পেয়েছে। যেমন : রাঢ় বাংলা রোদ্দুর সম্মান, বইতরণী পুরস্কার, শব্দপথ যুব সম্মান এবং এখন শান্তিনিকেতন পদ্য সম্মান। গবেষণা  ছাড়া অনুবাদের কাজেও অর্জন করেছেন দক্ষতা।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।