রবিবার, জুন ২৩

ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের ম্যাজিক ও তার ম্যাজিশিয়ানরা

0

বাংলা সিনেমার এক টিপিক্যাল দৃশ্য দিয়ে শুরু করা যাক। নায়ক জসীম পাহাড়ের পাদতলে ঘোড়ায় করে ছুটে যাচ্ছেন ভিলেন জাম্বুকে পাকড়াও করতে। ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক বাজছে এক ভুতুড়ে-রহস্যময় সুর। ড্রামের মৃদু তালে তালে ঠোঁটের শিষ। ট্রাম্পেটের ঢেউ। কখনও তা মিলিয়ে যাচ্ছে হ্রেষা ধ্বনিতে, কখনও খুরের টগবগে (সুরকে যদি ভাষায় প্রকাশ করা যেত)। গা শিউরে উঠছে দৃশ্য ও সুরের পরম্পরায়। কিন্তু তখন কি জানতাম, বাংলা সিনেমায় এমন মনোহর সুর নেওয়া হয়েছে ‘দ্য গুড, দ্য ব্যাড অ্যান্ড দ্য আগলি’ থেকে!


The Good Bad & Ugly

‘দ্য গুড দ্য ব্যাড অ্যান্ড দ্য আগলি’ সিনেমার পোস্টার


প্রয়াত কিংবদন্তি ইতালিয়ান কম্পোজার এন্নিও মোরিকোনের এই আবহ সংগীত বিশ্ব সিনেমার জগতে অনন্য হয়ে থাকবে সবসময়। তেমনি স্পেগেত্তি ওয়েস্টার্নের স্রষ্টা সার্জিও লিওনের ‘ডলার্স ট্রিলজি’। মোরিকোনোর মিউজিক কেবল ঢালিউডে নয়; বলিউডেও ব্যবহার হয়েছে বহু চলচ্চিত্রে। ডলার্স সিরিজসহ লিওনের আরও দুই মাস্টারপিস ‘ওয়ান্স আপন আ টাইম ইন ওয়েস্ট’ এবং ‘ওয়ান্স আপন আ টাইম ইন আমেরিকা’-এর মিউজিকও কম্পোজ করেছেন মোরিকোন।


Ennio Morricone

এন্নিও মোরিকোন


এমন আরও আরও অসংখ্য উল্লেখযোগ্য কাজ করেছেন তিনি। ইতালির নাম যেহেতু এলো, আরেক সুরস্রষ্টার নাম বলা যাক। রিজ ওর্তোলানি। ‘ক্যানিবাল হলোকাস্ট’ মুভ্যিটা দেখা না থাকলেও ইউটিউবে গিয়ে তার থিম সং-টা একবার শুনে দেখতে পারেন। এমন ভয়াবহ-ভায়োলেন্সে ভর্তি সিনেমার থিম সং এমন স্যুদিং কীভাবে হতে পারে! আশ্চর্য হওয়ারই বিষয় আসলে। যেন আমাজান জঙ্গলের রহস্যে ঘেরা ঘোরের মতো এই আবহ সংগীত। শোনার পর, পরিচিত কোনোকিছু হারানোর ব্যথা ঘিরে ধরবে আপনাকে।


Alejandro-Inarritu-01-thumb

আলেহান্দ্রো ইনারিতু


থিম সং-সাউন্ডট্র্যাক নিয়ে মেতেছি বেশিদিন হয়নি। শুরুর দিকটা আলেহান্দ্রো ইনারিতুর ‘ব্যাবেল’ দিয়ে। মুভ্যিটা দেখেছি দু’বার। পাহাড়ের উঁচু-নিচু কিংবা সমুদ্রের পাড়ে ধীরে ধীরে আছড়ে পড়া ঢেউ’র মতো এই ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর নিয়ে নতুন করে কিছুই বলার নেই। ‘ব্যাবেল’ মূলত আর্জেন্টাইন মিউজিশিয়ান গুস্তাবো সান্তাওলাল্লার অরিজিনাল মিউজিক অ্যালবাম। পরে ইনারিতু তা স্কোর হিসেবে ব্যবহার করেন বাবেলে। থিম সং নিয়ে ফ্যাসিনেশন থাকলে অবশ্যই আপনাকে ডুব দিতে হবে ‘ইন দ্য মুড ফর লাভে’। এই থিম সং শুনে আপনি সারাদিন কাটিয়ে দিতে পারবেন আনমনে। ফ্যান্টাসি ফিল্ম সিরিজ ‘পাইরেটস অব দ্য ক্যারিবিয়ান’ দেখেননি এমন চলচ্চিত্র প্রেমী খুব কমই পাওয়া যাবে। জনি ডেপের কৌতুকপ্রদ ও বুদ্ধিদীপ্ত চরিত্রের ভেতরে আপনি ডুব না দিয়ে পারবেন না। তবে নাবিকদের সমুদ্রযাত্রার অ্যাডভেঞ্চারে নতুন মাত্রা যোগ করেছে এর ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর। ‘পাইরেটস অব দ্য ক্যারিবিয়ান: দ্য কার্স অব দ্য ব্ল্যাক পার্ল’ নামে একটা অ্যালবামও আছে। দুই জার্মান কম্পোজার হ্যান্স জিমার ও ক্লস ব্যাডেল্টের।


Hans Zimmer

হ্যান্স জিমার


জিমারের নাম যেহেতু এলো, তাকে নিয়ে কিছু না বললে এই লেখা অসম্পূর্ণই রয়ে যাবে। মোরিকোন যেমন ওয়েস্টার্ন মুভ্যিতে দুর্দান্ত সব ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর করে সিনেমাকে অন্যমাত্রা দিয়েছিলেন, তেমনি হলিউডের মুভ্যি মানেই যেন হ্যান্স জিমার। ‘ইনসেপশন’, ‘টুয়েলভ ইয়ার্স আ স্লেভ’, ‘দা লাস্ট সামুরাই’, ‘ডানকার্ক’, ‘গ্লাডিয়েটর’, ‘দ্য লায়ন কিং’, ‘দ্য ডার্ক নাইট’, ‘রেইন ম্যান’-এর মতো অনেক বিখ্যাত ও অস্কারজয়ী মুভ্যির স্কোর করেছেন তিনি। ইতোমধ্যে মুভ্যিতে তার কাজের সংখ্যা ১৫০ ছাড়িয়ে গেছে। জিমারকে মিউজিকের জীবন্ত কিংবদন্তী বলাই যায়। কখনো মেলানকোলিক, কখনও রক-ব্লুজ, কখনো নাটকীয়তা-সাসপেনশনের চরম মাত্রাকে মিউজিকে সম্মিলন ঘটিয়েছেন তিনি। কেবল স্কোরই করেন না জিমার। সুরের জাদুতে কখনো কখনো স্টেজও মাতান। জিমারের মিউজিক ট্রাডিশনাল ধাঁচের। তবে এর সঙ্গে যোগ করেন জার্মান সিম্ফনি ও সমকালীন মিউজিককে। এখানেই তিনি অনবদ্য।

আদিকথনে, জগতে সুর ছিল এক। পরে তা বিভিন্নভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে জাতি-গোষ্ঠী-ভাষার মতো। হয়তো দেখবেন, আফ্রিকার জঙ্গলে বসে কেউ পাতার বাঁশিতে সুর তুলছে বাংলা লোকগীতি, ‘ও কি গাড়িয়াল ভাই…’। এ যে অসম্ভব তা নয়, মিল-অমিলের ব্যাপারটা থাকবে। তার বাইরেও রয়েছে সাদৃশ্যতার অদ্ভূত এক রহস্য।


vangelis

ভ্যাঙ্গেলিস


সে সাদৃশ্যতার বাইরে, লেখালেখিতে ‘প্লেইজারিজম’-এর মতো সুরেও একটা কপি বা চুরির বিষয় রয়েছে। ইংলিশ ফিল্ম ডিরেক্টর রিডলি স্কট বিখ্যাত ঐতিহাসিক ঘটনাকে উপজীব্য করে চলচ্চিত্রের জন্য। ‘গ্লাডিয়েটর, ‘দ্য কিংডম অব হেভেন’, রবিন হুড, দিয়ে বিশ্ব মাতানো স্কটের আরেক ফিল্ম— ‘১৪৯২: কনকোয়েস্ট অব প্যারাডাইস’ (রিলিজ: ১৯৯২)। এই মুভ্যি বিখ্যাত হয়ে আছে তার থিম সংয়ের জন্য। যার মিউজিক কম্পোজার ভ্যাঙ্গেলিস।

ভ্যাঙ্গেলিসের এই মিউজিক হুবহু থিম সং হিসেবে ব্যবহৃত হতে দেখা যায় বলিউডে রাকেশ রোশন পরিচালিত কয়লা (১৯৯৭) এবং ২০০০ সালে রিলিজ হওয়া ‘জোশ’ সিনেমায় ‘হরে হরে’ গানটির সুরও একই। মজার ব্যাপার হলো, দুই সিনেমায় আছেন বলিউড কিংবদন্তি শাহরুখ খান।

কেবল সিনেমা বা চলচ্চিত্রে নয়, থিম সং বা সাউন্ডট্র্যাকে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের সিরিজগুলোর কথাও বলা যায়। যুদ্ধ ও ঐতিহাসিক জনরার ‘ভাইকিংস’-এর থিম সং ‘ইফ আই হ্যাড অ্যা হার্ট’, দ্য লাস্ট কিংডমের সাউন্ডট্র্যাক এবং অতি-অবশ্যই ‘দ্য গেম অব থোনস’। এপিসোডে এপিসোডে এই সিরিজের ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর আপনার হৃদয়কে ডুবিয়ে দেবে সাসপেন্স, রহস্য ও ভাবনায়।

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

উপল বড়ুয়া। জন্ম: ১৯ ডিসেম্বর। রামু, কক্সবাজার। প্রকাশিত বই: কানা রাজার সুড়ঙ্গ (কবিতা), উইডের তালে তালে কয়েকজন সন্ধ্যা (কবিতা), তুমুল সাইকেডেলিক দুপুরে (কবিতা) ও ডিনারের জন্য কয়েকটি কাটা আঙুল (গল্প)।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।