শুক্রবার, অক্টোবর ২২

মর্তেজা মমায়েজের সাক্ষাৎকার ।। ভাষান্তর : দৃষ্টি দিজা

0

Morteza Momayezমর্তেজা মমায়েজকে বিশ শতকের ইরানের অন্যতম প্রভাবশালী গ্রাফিক ডিজাইনার, ইলাস্ট্রেটর এবং মুদ্রাকর হিসেবে ধরে নেওয়ার সাথে সাথে ‘ইরানীয় গ্রাফিক্স ডিজাইনের পথিকৃৎ’ হিসেবেও দাবি করা হয়। তিনি তেহরানে ১৯৩৫ সালের ২৬ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন। মর্তেজা ১৯৬৫ সালে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফাইন আর্টসে তাঁর ব্যাচেলর ডিগ্রি এবং পেরিস, ফ্রান্সে ১৯৬৮ সালে একোল ন্যাশনাল সুপেরিয়ের ডেস আর্ট ডেকো থেকে ডিপ্লোমা সম্পন্ন করেন। মমায়েজ তাঁর বিশ্রুত ক্যারিয়ারে, ইরান আর্ট গ্যালারি (১৯৬২), চিলড্রেন এন্ড ইয়ং এডাল্টস অর্গানাইজেশনে (১৯৭৪), এশিয়ান কালচারাল ডকুমেন্টেশন, এশিয়ান গ্রাফিক ডিজাইন বায়ানিয়াল (১৯৭৭) ও ন্যাশনাল লাইব্রেরি অফ ইরান(১৯৮৯) প্রভৃতিতে সংরক্ষিত অত্যুৎকৃষ্ট ভিজুয়্যাল আইডেন্টিটি তৈরি করেছেন। তিনি তেহরান ইন্টারন্যাশনাল পোস্টার বায়ানিয়ালের সভাপতিও ছিলেন।

২০০৫ সালে মমায়েজের মৃত্যুর একবছর আগে, ২০০৪ সালে মমায়েজকে ‘আর্ট এন্ড কালচার’ পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। ‘নিশান’ ম্যাগাজিনের পক্ষে এই সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন সায়েদ মেসকি।


সায়েদ মেসকি : মি. মমায়েজ, ভিজুয়্যাল আর্টের জন্য আপনি অন্য যেকোনো আর্টিস্ট থেকে অধিক বার পুরস্কৃত হয়েছেন। আপনার জীবনচরিত আর কর্ম-ইতিহাস নিয়েও অন্য শিল্পীদের থেকে বেশি লেখা হয়েছে। আপনি নিজেও তাতে একমত হয়ে থাকবেন। চলুন কথা শুরু করা যাক।

মর্তেজা মমায়েজ : শুরুর আগে আমাকে একটা বিষয় পরিষ্কার করতে দিন, আমি চাই এই কথাগুলা আপনি অবশ্যই সাক্ষাৎকার থেকে মুছে দেন। জীবনের এই পর্যায়ে এসে, শব্দাড়ম্বরতা আমার বড্ড কানে লাগে, আমার ধৈর্যচ্যুতি ঘটে। আমি খুবই নিভাঁজ আর অকপটে কথা বলতে চাচ্ছি।

Morteza Momayez 1

মর্তেজা মমায়েজের শিল্পকর্ম


সায়েদ : আমি বোধহয় জানি। একবার আপনার এক সেমিনারে এক নবিশ আপনাকে ‘মর্তেজা মমায়েজ’ এর সংক্ষিপ্ত ও উপযোগী একটা সংজ্ঞা দিতে বলেছিলেন। আপনার উত্তর ছিল- অকপট, স্বচ্ছন্দ, বাস্তববাদী।

এবার… কথোপকথনের একটু ভিন্ন পর্যায়ে গিয়ে আপনার মানসিকতা তথা চিন্তা করার ধরনধারণে আলোকপাত করলে…

মমায়েজ : যেমন?

সায়েদ : যেমন… আচ্ছা, শেষ থেকে শুরু করা যাক। আপনার প্রস্থানের দুই রাত আগেও আমরা আপনার সাথে হসপিটালে সাক্ষাৎ করে এসেছিলাম। বেশ কয়েকবার আপনাকে বলতে শোনা গেছে, আপনার পা গুলা ক্লান্ত। বেশি হাঁটাহাঁটির কারণে আপনার পা জোড়া বিধ্বস্ত।

মমায়েজ : আমাদের পা জোড়া, সত্যিই কত আশ্চর্য! অদ্ভুত সঙ্গী। সেগুলো চাইলে আপনাকে কাঙ্খিত স্থানে নিয়ে দাঁড় করাতে পারে, চায় তো একবাক্যে মানা করে দিতে পারে। পৃথিবীর দূরতম অবস্থানে অবস্থিত দুটি জায়গা। দুটি সিদ্ধান্ত।

আমি সেসকল আর্টিস্টদের পক্ষপাতি, যাদের আচরণ বুলডোজারের মতো। তাঁরা তাদের টেকসই পরিশ্রম, উন্নত রুচি আর শক্তি দিয়ে নিজের রাস্তা নিজে ঢালাই করে চলে। আপনি জেনে থাকবেন, তাঁরা আর্টের ইতিহাসে কতটা প্রভাবশালী রূপে বিরাজমান।

মানবজাতি দুই রকমে আচরণ করে; এক তার সহজাত দৈনন্দিন পদ্ধতি। তুমি যখন তাদেরকে জিজ্ঞাসা করবে, কাজ কেমন চলছে, কেমন জীবনযাপন, তারা উশখুশ করবে; হাতড়াতে থাকবে। কী উত্তর হতে পারে, কিচ্ছু খুঁজে পাবেন না। এর কারণ, তাঁরা মনে করেন, তাঁরা এমন কোনো আহামরি কাজ করে ফেলেননি, যা তাদের এহেন প্রশ্নোত্তর পর্বের মুখে এনে ফেলতে পারে।

মানবজাতি দুই রকমে আচরণ করে; এক তার সহজাত দৈনন্দিন পদ্ধতি। তুমি যখন তাদেরকে জিজ্ঞাসা করবে, কাজ কেমন চলছে, কেমন জীবনযাপন, তারা উশখুশ করবে; হাতড়াতে থাকবে। কী উত্তর হতে পারে, কিচ্ছু খুঁজে পাবেন না। এর কারণ, তাঁরা মনে করেন, তাঁরা এমন কোনো আহামরি কাজ করে ফেলেননি, যা তাদের এহেন প্রশ্নোত্তর পর্বের মুখে এনে ফেলতে পারে। তাঁরা সহজ সাধারণ দিনাতিপাত করেছে, এবং জীবনের সমস্ত কিছু তাদের স্বস্থানে আছে। এর একটা মূল কারণ হলো, তাদের অন্তস্থলের সাথে বাইরের জগতের কোনো বাঁধন না থাকা, একটা সটান দাগ। বাইরের জগতের সাথে সংযোগ স্থাপনের জন্য কোনো পদক্ষেপও ছিল না।

Morteza Momayez 2

মর্তেজা মমায়েজের শিল্পকর্ম


আদপে দুনিয়ার সব মানুষই তাদের নিজেদের সাথে এবং অন্য সকলের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপনে সচেষ্ট থাকে; যদি তাঁরা এই চেষ্টার বাইরের কেউ হয়, তবে তাদেরকে দ্বিতীয় গ্রুপে ফেলা যায়, যাঁরা তাদের মূল্যবান চিন্তা পদ্ধতি, উপাদেয় মনোনিয়োগ সত্তা, শক্তি সব সঠিক পথ খুঁজতে ব্যয় করে ফেলছেন এবং দিন শেষে কোনো নির্দিষ্ট স্থানই তাদের জন্য বরাদ্দ নয়। জীবন খরচ করে শেষে শূন্য ঝু্লি।

মানুষের জীবনে দুইটা জিনিস আছে। এক, যে পথে সে চিন্তা করছ, তার বহিঃপ্রকাশ। দুই, প্রথমকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা একটা লক্ষ্য।

আমি আমার কাজ, কাজের ধারা এবং ঐ বিভাগটাকে পরিচিত করে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে যতদূর সম্ভব কাজ করেছি। মূলত, ঐ ধারার শিল্পের অধিকার পুনরুদ্ধারও আমার কাজ, যা, বলা চলে, পূর্বে সবসময় আড়ালেই ছিল।

আজকে দাঁড়িয়ে তুমি অনুধাবন করতে পারছ যে, গ্রাফিককে সাহিত্য, চিত্রশিল্প, সিনেমা, থিয়েটার, আর্কিটেকচার থেকে মূল্য দরে কোনো ভাবেই কম ধরা হচ্ছে না। অবশ্যই কম নয়ও। এটি এর সামষ্টিক ধর্ম আর সমাজের দৈনন্দিন সংস্কৃতির জন্য এর দায়িত্বের খাতিরে একটি ভীষণ কার্যকর এবং মূল্যবান আর্ট।

সায়েদ : আপনি কী মনে করেন, আপনি যদি আজকে অন্য কোনো প্রফেশন বেছে নিতেন, ব্যাপারটা কেমন দাঁড়াত? আপনি পেশা হিসেবে কেন গ্রাফিকই বেছে নিয়েছিলেন?

মমায়েজ : আমি এটি দৃঢ় ভাবে বিশ্বাস করি যে, যে ক্ষেত্রেই কাজ করি না কেন, সেখানে সাবলীল রুচিটা যেন বজায় রাখতে পারি। এটাই আমার স্থায়ী লক্ষ্য এবং বিশ্বাস। আমি আজ পর্যন্ত কোনো কাজকে নিচু হিসেবে দেখিইনি। যেকোনো গতানুগতিক মামুলি কাজই আমার হাতে এসে পড়ুক, এর ধারণক্ষমতা অনুযায়ী আমি এতে সর্বদা যথাযথ দিয়েছি। আমি কখনও আমার নিজের থেকে নিজে কখনো কিছু চুরি করিনি৷ এটা আমার পেশাগত অভ্যাস।

সবাই চায় ছাপ রেখে যেতে, কোথাও না কোথাও তার নিজের জীবনকে লিপিবদ্ধ করে রাখতে, যাতে সে ভাবতে পারে যে, আমি বেঁচে আছি। মানবজীবন থেকে কী ভগ্নাবশেষ সবশেষে টিকে থাকে? এসব প্রয়াশেরই একটুকরো সংকেত, চিহ্ন। এমনকি একজন মানুষের কবরের একটা স্মৃতিফলকও এই চিহ্ন বহন করতে চায়।

সবাই চায় ছাপ রেখে যেতে, কোথাও না কোথাও তার নিজের জীবনকে লিপিবদ্ধ করে রাখতে, যাতে সে ভাবতে পারে যে, আমি বেঁচে আছি।

মানবজীবন থেকে কী ভগ্নাবশেষ সবশেষে টিকে থাকে? এসব প্রয়াশেরই একটুকরো সংকেত, চিহ্ন।

এমনকি একজন মানুষের কবরের একটা স্মৃতিফলকও এই চিহ্ন বহন করতে চায়। এবং আমাদের সমাজও একারণে আর্টকালচার আর হিউম্যান ক্রাফটসকে সমীহ করে, কারণ, শিল্পীর এইসকল কাজে মানুষ মানুষের তথা গোটা মানবজীবনের ঝরতিপড়তি অংশটুকু দেখতে পায়৷ এবং যে শিল্পী তা তৈরি করেছেন, তিনি জীবনে দুই দফা অমরত্বের স্বাদ গ্রহণ করতে পারেন। এটি শিল্পীর জন্য এমন এক রমণীয় অনুভূতি, যেন তাকে সমাজের রিপ্রেজেনটেটিভ হিসেবে বরাদ্দ করা হয়ে গেছে। যেন সে খুবই অহংকারসূচক কোনো উদ্দেশ্যর জন্য সমাজে ঈশ্বর প্রদত্ত।

Morteza Momayez 3

মর্তেজা মমায়েজের শিল্পকর্ম


গ্রাফিকের প্রতি আমার অনুরক্তির একটা কারণ হলো, আমি লক্ষ্য করেছি যে, গ্রাফিক কাজকে প্রতিপাদিত হতে ভালো সাহায্য করে। আমি দেখেছি, একটা লেখাকে ইলাস্ট্রেটিং করা, লেখাটিকে তুলনামূলক বেশি কৌতুহলোদ্দীপক আর সুখপাঠ্য করে তুলতে সক্ষম। অন্য ভাবে বললে, একে অগোচরে পড়ে থাকা থেকে রক্ষা করে, এতে আলোকপাত করে, এতে ভিন্নতার সংযুক্তি ঘটায়। গ্রাফিক মানুষকে তার জীবনের যেকোনো পর্যায়েই তার অধিকার সম্পর্কে ভাবতে উদ্ভুদ্ধ করে। যেমন আমি আগে বলেছি, গ্রাফিক আর্কিটেকচারের মতো সময়কে ফুরসতে ফেলে দেয়না৷ এই মাধ্যম আর্কিটেকচার থেকেও বরং এগিয়ে। গ্রাফিক যখনই সম্মুখে হাজির হয়, তখন থেকে মস্তিষ্ক তা নিয়ে চিন্তা করতে শুরু করে দেয়৷ অপরদিকে যেখানে তখন আর্কিটেকচারের ক্ষেত্রে পদার্থগত সাহায্যের দরকার পড়ে। একটি দালানের ভিত যতই পোক্ত হোক, দেখতে দেখতে একটা সময় পর মস্তিষ্ক সাড়া দেওয়া ছেড়ে দেয়। কিন্তু গ্রাফিক, সিস্টেমের যেকোনো মুহূর্তে নিজেকে প্রস্ফুটিত করতে সক্ষম। দৈনিক পত্রিকা, লে-আউট, ইলাস্ট্রেশন, মোটিফ এডভাটাইজমেন্ট, কালার, সাইন, প্যাকেজিং, সবই গ্রাফিকের অন্তর্ভুক্ত। সত্য বলতে, আমার দৃষ্টিকোণ থেকে পেইন্টিঙে স্বভাবগত উনতা পরিলক্ষিত হয়। এমনকি সাহিত্য এবং আরো অন্যান্য আর্টও, যা, মানুষের অবসর যাপনের ফসল এবং মানুষ যার সাথে নিজেকে রুটি-রুজির খাতিরে একাত্ম করে নেয়ার প্রয়াসে থাকে।

আমার মতে, এমন এমন সব ক্ষেত্রে কাজ করা জরুরি, যে সম্ভাবনাময় ক্ষেত্রগুলো খালি পড়ে আছে। সেজন্যই আমি গ্রাফিক্সের ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করেছি৷ যে জায়গায় আমি একটা স্থানই আঁকড়ে ধরে রেখে কাজ করে গেলে বেশি বাস্তবিক দেখাত।

যে জায়গায়ই কাজ করি না কেন, আমার মূল লক্ষ্যই ছিল এই ক্ষেত্রকে আর্ট দরবারে পরিচয় করিয়ে দেওয়া এবং এর জন্য সম্ভাবনাময় মেধাবী গ্রাফিক আর্টিস্টদের তুলে আনার চেষ্টা করা। আমার একমাত্র অভিপ্রায়ই ছিল সঠিক গ্রাফিক সক্ষমতা সকলের সামনে নিয়ে আসা, দ্যাটস অল।

যে জায়গায়ই কাজ করি না কেন, আমার মূল লক্ষ্যই ছিল এই ক্ষেত্রকে আর্ট দরবারে পরিচয় করিয়ে দেওয়া এবং এর জন্য সম্ভাবনাময় মেধাবী গ্রাফিক আর্টিস্টদের তুলে আনার চেষ্টা করা। আমার একমাত্র অভিপ্রায়ই ছিল সঠিক গ্রাফিক সক্ষমতা সকলের সামনে নিয়ে আসা, দ্যাটস অল।

যখন একজন মানুষ ঘুম থেকে উঠে, সে উঠে গ্রাফিক সাথে নিয়ে; একটা ঘড়ি, নাম্বারের ডিজাইনগুলো এবং বর্ণমালাগুলো গ্রাফিক্স। মানুষের সর্বক্ষণ গ্রাফিক্সকে সাথে নিয়ে চলতে হয়। প্রকাশনা, বিজ্ঞাপন, কার্পেট ডিজাইন, ফ্লোরিং, ট্রাফিক সাইন, সবই গ্রাফিক্সের অন্তর্ভুক্ত। যেখানেই তাকিয়ে দেখো না কেন, দেখবে গ্রাফিক্স বিদ্যমান।

সায়েদ : এখন আমরা আপনার পেশাগত গ্রাফিক কাজগুলোর দিকে আসছি। আমার মনে হয় এবার আপনি আপনার গ্রাফিক্স ডিজাইনিঙের নিজস্বতার ব্যাপারে জানালে দারুণ হয়। আপনার কাজের স্বভাবগত অভিনবত্ব কোথায় এবং কী?

মমায়েজ : আমার কাজ আসলে একটা খালি মাঠেই এক নতুন কাঠামো ধারণ করে নিয়েছে। আমি এই খালি ক্ষেত্রকে ভিজুয়্যাল উপাদানসমূহকে আরো তীব্রতর, অকপট আর আরো স্পষ্টতর রূপে দর্শাতে কাজ করেছি। এটা সম্ভবত আমার নিজের অকপট আর সূক্ষ্মীগ্র চরিত্র থেকে এসেছে। এখানে গ্রাফিকের খালি জায়গায় উপাদানগত বিন্যাসে একটা আর্কিটেকচারাল কাঠামো ছিল, তার ভিতে সবসময় পূর্ণ পরিকল্পিত পদ্ধতিতে কাজ করে উপাদানগুলোকে মজবুত স্থায়িত্ব দেয়ার চেষ্টা করেছি। আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে, বিভিন্ন উপলক্ষ্যগুলোতে, আমি একপর্যায়ে উপাদানের সমন্বয় আর কাঠামোগুলোকে একই সাথে আলাদা আলাদা স্বাধীন পথে ভাসতে দিয়েছি। এবং আশ্চর্য! অন্তিমে এসে দেখেছি, তারা একে অন্যর সাথে সংযুক্ত হয়ে শক্ত স্থায়িত্ব স্থাপন করে নিয়েছে।

আমার কাজের আরেকটা স্বভাব হলো সমতল ও সগোত্রীপৃষ্ঠতা। উদ্দেশ্যহীন ভাবেই সমতল। অবচেতনেই কাজগুলো সরল। কোনো দূরদর্শিতা ছাড়াই আমি ফ্ল্যাট কাজ করি। আমি বিষয়বস্তুকে ভিন্ন পরিপ্রেক্ষিত থেকে দেখতে পারিনা। পরিপ্রেক্ষিত আমার তরফ থেকে সংসৃষ্ট হয় না। আমি সবকিছু সাধারণ করে দেখি— যেমন আমাদের পেইন্টিংসগুলো- আমি আমার নিজের অজ্ঞাতেই যেন আমাদের নিজস্ব পেইন্টিং এবং ভিজুয়্যাল আর্ট দ্বারা প্রভাবিত হয়েছি।

মানুষ প্রভাবিত হয়, যখন প্রভাব সৃষ্টিকারী মাধ্যমগুলোর প্রতি তাঁর অনুরক্তি থাকে৷ কিন্তু আমার এই প্রভাবিত হওয়ার প্রক্রিয়া মডার্ন সমসাময়িক পরিচিতির সাথে বন্ধন স্থাপন করে আছে।

এবং সবশেষে আমার দক্ষতা হলো কনট্রাস্টে। কালার কনট্রাস্ট, আকৃতি, রেখাচিত্রে এবং অন্যান্য। জেনে থাকবে, কনট্রাস্ট পদ্ধতি সহজেই দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম। তোমার যদি শিল্প-সংবলিত কনট্রাস্ট তৈরি করতেই হয়, তাহলে তোমার এটা জানা থাকা জরুরি যে, সুপরিকল্পিত ভাবে স্পেসকে কীকরে ভাগ করতে হয়, যাতে করে তা সহজে এবং দ্রুত মনোযোগ আকর্ষণ করে। তোমার কালার বিন্যাস পরিকল্পনা স্পষ্ট হতে হবে, যাতে করে প্রথমে মূল বিষয়গুলো, তারপর অন্যান্যর উপর মনোযোগ স্থাপন হয়। এগুলোই আমার কাজের স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য যা আমার কভার ডিজাইন, পোস্টার ডিজাইন, লে-আউট ফর্ম ও অন্যান্য বহুমুখী সংকলনে কাজে দেখতে পাওয়া যায়।


Morteza Momayez 4

মর্তেজা মমায়েজের শিল্পকর্ম


মূল বিষয় হলো আমার সরলতা আর অকপটতা যা আমার ব্যক্তিগত অভিব্যক্তি। আমার নিজস্ব অভিব্যক্তি আছে। সেই একই স্বতন্ত্রতা আমার কাজেও প্রতিফলিত হয় যা তাদেরকে অকপট, পরিষ্কার, যথাযথ ও অহেতুক বাহবা থেকে মুক্ত রাখে। প্রশংসা দ্বারা কখনো নৈকট্য, খাতির প্রকাশ পায় না। এগুলো আসলে প্রশংসারও বেশি, মূলত, তারচেয়েও বেশি শ্রদ্ধার ইঙ্গিত করে। আমার অকপটতা যদি সবার কাছে উপাদেয় মনে হয়ে থাকে, তাহলে এটা একমাত্র আমার সহজাত বিনয়ের কারণে এবং আমি মনে করি সব মানুষের মধ্যেই এই বৈশিষ্ট্য থাকা উচিত৷ আমি এও মনে করি অকপটতা অনেক সময়ই অনেকের সামনে অত্যুগ্র আর কঠোর হয়ে ধরা দেওয়া স্বাভাবিক। সে যাই হোক, আমি সবসময়ই আমার অবলোকন স্পষ্ট, সরল আর ক্যানডিড ভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছি। তজ্জন্য, মন্দ ভালো সমস্ত সুস্পষ্ট ভাবে প্রকাশিত হয়েছে।

গ্রাফিক-ওয়ার্কের ক্ষেত্রে আমার নিজস্ব ডাইসের অভিগমন আছে, এবং আমার কাজে প্রাপ্য কোনো হুকুম, কোনো শৃঙ্খলার তোয়াক্কা করতে গিয়েই আমি আমার নিজস্ব অভিগমন ধারাকে বিসর্জন দিইনি। আমার কাজে রঙের পৃষ্ঠ-সারল্য আর বিমূর্তকে সংক্ষেপণের প্রবণতা আছে। কাজগুলো মনোযোগ দিয়ে নিরীক্ষণ করলে দেখতে পাবেন, এখানে আমাদের নিজস্ব আলংকারিক প্রভাব স্পষ্ট। আলংকারিক শোভাময়তা আমাদের সবরকমের ভিজুয়্যাল আর্টেরই একপ্রকার চারিত্রিক বিশেষক। তাঁরা এর বিরোধী, যাঁরা আলংকারিক প্রভাবকে সমর্থন করে না। অনুমোদন দেয় না। তুমি লক্ষ্য করো, আমাদের আচার ভিত্তিক এবং প্রাচীন সমস্ত শিল্পগুলো যেসকল দর্শন আর চিন্তার উপর স্থাপিত, তাদের সবারই একটা ডেকোরেটিভ কাঠামো আছে। পরিপ্রেক্ষিত এখানে সবসময়ই শঠ প্রকৃতির এবং সত্যকে আড়াল করে চলে৷ সারল্য, যদি আদৌও অর্জনসাধ্য হয়, যেকোনো প্রচরণেরই মূল অন্ত-শাঁস, মূল নির্জাস, মূল ফিগার, যেকোনো মার্জিন আর ভূমিকা ব্যতিরেকে৷ এটাই আমার জাদুমুগ্ধ করার শক্তি। আর আমার ব্যক্তিগত পক্ষপাত শূন্যতাই আমার কাজকে অকপট এবং সরল করে তোলে। তুমি যদি পাবলিশার্সগুলোর জন্য আমার তৈরি ইউনিফর্মগুলো দেখো, দেখবে, গড়নে ধাঁচে তারা আলাদা হলেও প্রত্যেকে আমার বিশেষ বৈশিষ্ট্যটা ধারণ করে আছে। আর আমার বিশেষ রুচি মূলত আমাদের ঐতিহাসিক অলংকারিক আর্ট থেকে অথবা আমার নিজের কর্ম-পিরিয়ড থেকেই প্রভাবিত হয়ে এসেছে।

সকল ইরানিয়ান ভিজুয়্যাল স্যাম্পলস আসলে একই। ছাদের টালির কাজের দিকে তাকাও। কম্বলের দিকে তাকাও। গিলটির কাজই দেখ। কবিতা খোদাই শিলাস্তম্ভের কাজ দেখ। এদের সবকিছুর মাঝেই রঙের সাজশ, কাঠামোগত ঐক্য অথবা বাহ্যিক গঠনের মিল পাওয়া যাবে।

সকল ইরানিয়ান ভিজুয়্যাল স্যাম্পলস আসলে একই। ছাদের টালির কাজের দিকে তাকাও। কম্বলের দিকে তাকাও। গিলটির কাজই দেখ। কবিতা খোদাই শিলাস্তম্ভের কাজ দেখ। এদের সবকিছুর মাঝেই রঙের সাজশ, কাঠামোগত ঐক্য অথবা বাহ্যিক গঠনের মিল পাওয়া যাবে। তৎসত্ত্বেও কেউ বলতে পারবেনা যে, ইরানিয়ান শিল্প একদম সূত্রপাত থেকে এখন পর্যন্ত অপরিবর্তিত রয়ে গেছে। হাফিজের মতে, যাঁর শিল্প নেই, সে ত্রুটিবিচ্যুতির দিকে তাকাও।

এইক্ষেত্রে মনোযোগ আকর্ষণ করছি যে, আমাদের সকল শিল্পীরাই সরল, স্পষ্ট। অন্য শব্দে বললে, পুরাআচার, ঐতিহ্য থেকে প্রভাবিত। স্টাইলাইজড।

আমাদের সকল পিরিয়ডের নকশাশৈলিই, আখেমেনীয় যুগ থেকে কাযার যুগ পর্যন্ত একটা নির্দিষ্ট বহির্ভঙ্গি, একটা নির্দিষ্ট শৃঙ্খলা রক্ষা করে আসছে। আমাদের সবরকমের রঙের কাজ, নকশা একটা সারল্য, সংক্ষিপ্ততা রক্ষা করে। এই সমস্ত কাজের অন্দরে প্রখর দর্শন আর সমীপবর্তিতা বিদ্যমান। এই সারল্য কে নীরস, একঘেয়ে বলে অনুযোগও করা যায় না।

তবে যে সকল সুকল্পিত ত্রুটি খুঁজে বের করা হয়, তা সবই জনপ্রিয়, মার্কেট-রমরমা শিল্পর কাছে এসমস্ত শিল্পকে ছোট করার উদ্দেশ্যে। সব রকমের প্রায়োগিক এবং গঠনবিন্যাস সম্পর্কিত বৈচিত্র্যের পরও আমার কাজে একটা গতানুগতিক অধ্যায় থাকে, খালি ধূ ধূ মোহনা, যেখানে রং এবং নকশা একে অপরকে ত্যাগ করে সামনে এগিয়ে চলে।

টানা ত্রিশ বছর নানান ভিজুয়্যাল ক্ষেত্র এবং সাহিত্য স্তরে কাজ করে আশার পরও আমি আমার এই নির্দিষ্ট বিশেষত্ব অটুট রেখেছি। এটা হলো আমার দ্বারা আমার কাজের গঠন কাঠামোকে ঠিক রাখার জন্য গঠিত আমার মানসিক গঠন কাঠামো। হাহা। কাজের শুরুর দিনগুলোতে এইসব অনুভূতি, মনোভাব সামনে তুলে ধরার প্রবণতা সব সরল এবং এই শূন্য ক্ষেত্রগুলোর পেছনে থেকে যেত।

সায়েদ : আমাদের এতক্ষণের আলাপে আমরা দুইটা গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট উন্মোচন করতে পারলাম। এক, আপনার দৃঢ় এবং অটল কাজ করার প্রতি আকাঙ্খা, আর দুই হলো, ইরানিয়ান শিল্প। আপনার কী মনে হয়, কোন জিনিসটা আপনাকে এই পর্যায়ের মজবুদ, বলিষ্ঠ কাজ করতে উদ্ভুদ্ধ করে?

মমায়েজ : আমি উঠতেবসতে আমার কৌতুহলের জায়গা নিয়ে ভাবতে থাকি, যা দ্বিধাহীন স্থায়িত্ব দিতে সাহায্য করে। আমি এমনকি ইচ্ছাকৃত ভাবে ঝুলন্ত দ্বিধাবিভক্ত কাজ তৈরির চেষ্টা করেছি। এবং, পরে, আমি যা আগে বললাম, দেখি কোথাও না কোথাও এই কাজ শক্তভাবে শক্ত ভিতের সাথে কোথাও সংযুক্ত হয়ে আছে।

আমি যখন আমার পূর্বের জীবনের দিকে তাকাই, সেই কাহিনিতে আমার বাবার অফুরন্ত বেকারত্বের প্রগাঢ় প্রভাব দেখতে পাই। ছোটবেলায় বাবা যখনই ঘরে ঢুকতেন, আমরা শঙ্কা নিয়ে বাবার দিকে তাকাতাম, তার চাকরি বহাল তবিয়তেই আছে, না ছেড়ে দিয়ে এসেছেন!

মূলত, মূল কারণ আসলে উদ্ভূত হয়েছে এই জায়গা থেকে, প্রত্যয়ের অভাব, অস্থিতিশীলতা সংক্রান্ত ডর, যা আমি ব্যক্তিগত জীবনের শুরুতে অথবা এবং সমাজে বিভিন্ন রকমে দেখেছি। অবচেতনে এসব আমাকে এরকম মজবুদ আর অটল কম্পোজিশনের, কাঠামোর কাজ করার প্রতি টেনে নিয়েছে। এখন যেন আমি সবসময়ই অবচেতনে চাই, আমার কাজ যেন আমি স্থিতিশীল, সুগঠিত রূপে দেখতে পাই। খালি একবার নয়, প্রতিবার। এবং এজন্যই সম্ভবত আমার কাজ এমন কিছু হয়ে উঠে, যা মূল বাতাবরণ বা মূল বাস্তবতার একেবারে বিপরীত। নিশ্চিতভাবেই সত্য যে, আমি আমার জীবনে ভিজুয়্যাল স্থিতিস্থাপকতার অসংখ্য স্তর বাস্তবায়ন করেছি, এবং বহুমুখী কাজের উপর চর্চার দ্বার উন্মোচনও করেছি, যা টেকসই শিল্প তৈরির প্রতি আমার যত ভালোবাসা, তা প্রকট ভাবে জানান দেয়৷

সায়েদ : আমি একবার এক এ সংক্রান্ত স্টেটিস্টিকস কার্যক্রমের অংশ হয়েছিলাম, যেখানে দেখানো হয়েছিল, আপনার প্রায় ষাট শতাংশ কাজ হলো বর্গক্ষেত্র নিয়ে করা। ত্রিশ শতাংশ কাজ গোলাকৃতির ভিত্তিতে এবং দশ শতাংশ কাজ ত্রিভুজ আকৃতিতে করা৷ পোস্টার ডিজাইনিং এবং এর ছন্দে আপনার নিজস্ব সিগনেচারের একটা মূল অংশ দৈবাৎ ব্যবহার করার নিমিত্তে এই আপাত স্টেটিস্টিকটি নিশ্চিত হয়েছে।

আপনি ইরানিয়ান শিল্প নিয়ে বলেছেন। নিজের ইরানিয়ান আইডেন্টিটি এবং একজন ইরানিয়ান শিল্পী হিসেবে আপনার কাজ এবং জাতিগত ঐতিহ্যের শিকরের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে বলেছেন। আপনার কী মনে হয়, গ্রাফিক কালচারে ইরানিয়ান অভিগমন কেমন? এতো বছর ধরে এই লাইনে থাকার পর, গ্রাহকদের, বিশেষ করে কৃষ্টিকলা সংযুক্ত গ্রাহকদের সংস্পর্শে থাকার পর আপনার অভিজ্ঞতা কেমন?

মমায়েজ : পারসিও ভঙ্গিমা সাধারণত গোচরীভূত এবং গূঢ়। প্রথম প্রথম এটা বিনয় এবং নম্রতার মোড়কে বাঁধা থাকে, যা শুরুতে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে না, এবং প্রথম দর্শনে যা সাময়িক ভাবে গতানুগতিক কাজের ন্যায় পর্যবসিত হয়। ইরানিয়ান কাজে, প্রারম্ভেই দৃষ্টি আকর্ষণের ব্যবস্থা নাই। বরং ধীরে ধীরে মরমে পশে, পারিপার্শ্বিকের মাঝে প্রভাব ফেলতে থাকে। এবং হঠাৎ একসময় তুমি দেখতে পাও, তুমি সম্মুখের কাজটি দ্বারা বশীভূত হয়ে গেছ, তুমি এতে দ্রবীভূত হয়ে আছ।

আমার ধারণা, ইরানিয় কাজের চরিত্রগত বৈশিষ্ট্যেই বাকি সমস্ত প্রকারের অতীন্দ্রিয়তাকে ছাপিয়ে বড় অতীন্দ্রিয়তা আছে।

Morteza Momayez 5

মর্তেজা মমায়েজের শিল্পকর্ম


সূর্যের নিচে, বালু ধূসরিত একটা মরুভূমির দৃশ্য, প্রাচীন নিস্তব্ধ পর্বতমালা, নম্র হৃতমান শতবর্ষী গাছ, সবকিছু কেমন এতো সাধারণ ভাবে থরেবিথরে রুটিনমাফিক সাজানো, যেন তুমি মনেই করতে পারবে না, মহাকাল কী বস্তু। কী কেমন শক্তি আর কী কেমন ঐতিহ্য সংস্কৃতি এখানে লুকিয়ে আছে, কালের আবর্তে কী কী কিচ্ছা আর কী কী পরিবর্তনের অভিজ্ঞতা তাঁরা লাভ করেছে। ইরানের নিশ্চুপ স্তব্ধ ল্যান্ডস্কেপ একই সাথে অক্ষত উদ্যম এবং একই সাথে অজানা গল্পগুলোর প্রতিনিধিত্ব করে।

অনেক রং আছে, অগভীর দর্শকদের হতে পারে আকর্ষণ করছে না, বিরক্তিকর লাগবে।

এসব কাজগুলো নিজেদের কাছে কেবল গূঢ় দৃষ্টিশক্তি সম্পন্ন দর্শক, এবং গভীর মননশীল মানুষই কামনা করে।

অন্যদিকে, আমরা চাতুর্য, সুকৌশল পছন্দ করি। আমরা ইরানিয়ানরা বলি, ধী শক্তি আর তীক্ষ্ণ দক্ষতা একসাথে সারল্য দ্বারা সুকৌশলে সংযুক্ত থাকে।

যখন এই আন্তরিক অকপটতার ব্যাঘাত ঘটে, আমরা এক অন্য মাত্রার কৌশল বাস্তবায়ন করতে মুখোমুখি হই, যা কেবল একজন শিল্পীর নিজস্ব রুচি নিয়েই কাজ করে৷ একে বলে কূটনীতি। যাঁরা কম আন্তরিক, কম কৌশলী, তাদের প্রতি আমরা সহজেই আস্তা হারিয়ে ফেলি।

আমরা কৌশলী হতে পছন্দ করি, কারণ আমাদের অনিরাপদ রাষ্ট্র ব্যবস্থায় সুকৌশলই একমাত্র অস্তিত্ব রক্ষাকারী পন্থা। আমাদের নিজেদেরকে নিজে নিজে বাঁচাতে হলে এসব ডিভাইস বেছে নিতে হবে।

আমরা কৌশলী হতে পছন্দ করি, কারণ আমাদের অনিরাপদ রাষ্ট্র ব্যবস্থায় সুকৌশলই একমাত্র অস্তিত্ব রক্ষাকারী পন্থা। আমাদের নিজেদেরকে নিজে নিজে বাঁচাতে হলে এসব ডিভাইস বেছে নিতে হবে।

আমাদের শত্রুদের বিরুদ্ধে রণক্ষেত্রে আসলে আমাদের সুকৌশলী বৈশিষ্ট্যর ব্যবহার করতে পারে, বরং যেন তারা আমাদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হতে পারে, বরং যেন তাদেরকে আমরা আমাদের সংস্কৃতি কিংবদন্তিতে দ্রবীভূত করে ফেলতে পারি৷ আমাদের সংস্কৃতিতে এমন পর্যায়ের বড় বড় উদাহরণও আছে। আমাদের ইতিহাসে এমন এমন চতুর মেধাবী ব্যক্তিত্বে ভরপুর, যাদের খড়্গ-বন্দুক ছিল না। তাদের চিকন সরু হাত, সরু ঘাড় আর ছিল মিঠা লাল জিহ্বা। তাঁরা মানুষকে ক্ষমতার বিরুদ্ধে হাসাতে পারত, এমনকি ক্ষমতাসীন লোকজন তাদের পাল্লায় পড়ে নিজেরা নিজেদের দেখে হাসতে পারতেন।

আমরা হাসতে বেশ ভালোবাসি। কারণ হাস্যের একটা মানে আছে। হাসি মূলত একপ্রকার চাতুর্য, যখন হাসানো কেবল একটা শারীরিক কসরত দ্বারা নির্মিত সরল অভিনয়, এবং যেখানে হাসির কোনো কিউট মর্মার্থ নেই।
উবেইদ যাকানির কথা কাউকে মুচকি হাসায় না। মোল্লা নাসেরুদ্দিনের ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার। কারিম শিরেয়িই একমাত্র নাসিরুদ্দিন শাহ্কে ঠা ঠা করে হাসাতে পারতেন। আমাদের জাতি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মৃদু হাসতে পছন্দ করে। আমরা জোরে জোরে হাসিতে কখনোই তেমন অভস্ত্যত নই।

আরেকটা বিষয় হলো ভৌগলিক গঠন৷ আমার মনে হয়, জীবনের প্রথম বিদেশ ভ্রমণের আগে আমি জানতাম না ইরানিয়ান হওয়ার উপলব্ধিটা ঠিক কেমন। আমি যখন নানান জাতির নানান মানুষের ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির সাথে পরিচিত হচ্ছিলাম, দেখলাম আমি আসলে ”ইরানিয়ান কালচার’ বলে অতিরিক্ত বিশেষ কিছু আচার উপভোগ করতে পারছি।

আমি ব্যক্তিগত ভাবে মনে করি, যেকোনো কাজই হোক, সেটা একটা জাতিগত পরিচয় বহন করে, কারণ এই কাজ কোনো একটা গূঢ় চাহিদার উত্তর হিসেবে মূলত তৈরি হয়েছে।

কোনো কোনো যে পরিচয়ের অভাব, তা একক কোনো দলের একক বৈশিষ্ট্য নয়। এটা একটা সাধারণ সমস্যা। বিশেষত তাঁদের, যাঁরা আইডেন্টিটি জনিত চিহ্ন নিয়ে নিন্দা-সমালোচনা করে।

আজকে আমাদের কাছে আমাদের নিজস্ব সময়ের নিজস্ব পরিচয় আছে। এই পরিচয়ের সাথে এই চিহ্নর সাথে যদি তুমি এমনকি পাঁচবছর আগের কাজেরও তুলনা কর, দেখবে বেশকম আছে। এটা স্বাভাবিক, এখানে ভিন্নতাই বাঞ্ছনীয়।

আমরা ইরানিয়ান আছি এবং সারাজীবন ইরানিয়ানই থাকব। কারণ আমরা একটা আলাদা বিশেষ পৈতৃক মাতৃক ঐতিহ্যর ছায়াতলে গড়ে উঠেছি। স্বাভাবিকভাবেই আমাদের এ ঐতিহ্য, মহাকাল, গোটা বিশ্ব আর চলমান বর্তমান পরিবর্তন দ্বারা প্রভাবিত।

সেজন্যই আমাদেরকে বর্তমান অবস্থানে দাঁড়িয়ে ঐতিহ্যকে যথাযথ ভাবে ব্যবহার করতে জানতে হবে; বিচক্ষণ এবং চিন্তাসমৃদ্ধ ব্যবহার।

আমি যখন আমাদের ক্যালিগ্রাফির প্রশংসা করতে আসি, তখন একই সাথে সাহিত্যকেও অনুভব করতে পারি। আমি আমাদের কবি-সাহিত্যিক, আর্কিটেক্টদের আমাদের সঙ্গীতশিল্প এবং আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির সাথে সংযুক্ত করতে সক্ষম হয়েছি।

আমি আমার চোখের সামনে এই সেতুবন্ধনকে দুলতে দেখেছি। এই সতেজ সঞ্জীবনী দৃশ্য আমার সকল ক্লান্তি, সকল অবসাদ দূর করে দিয়েছে।

আমার কাছে, নাস্তালিক (Nastaligh/Nastaliq) ক্যালিগ্রাফিকে আমাদের ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির যথাযথ প্রতিচ্ছবি মনে হয়। নাস্তালিক মানে হলো, পার্সিয়ান সংস্কৃতি। এটা আমাদের মনোরম, স্পর্দাশীল ভাষা, আমাদের বৈশিষ্ট্য, আমাদের শক্তির একপ্রকার দৃশ্যমান কাহার স্বরূপ। বর্তমান আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ব্যবস্থায় আমি যখনই আমার ঐতিহ্যগত ধরনধারণ, পার্সিয়ান ভাষাকে মিস করি, আমি আমার নাস্তালিক, সেখাস্তেহ্ (shekasteh) ফন্টগুলো সামনে মেলে ধরি। এগুলো আয়নার মতো, মুভির মতো, আমার/আমাদের সমগ্র অতিত-বর্তমানকে চোখের সামনে তুলে ধরে। ক্যালিগ্রাফি আমার অতীতের সমস্ত স্মৃতিবেদনাকে নিমেষে পুনরুজ্জীবিত করতে পারে। আমাকে, আমার আত্মা, প্রাণ সব ধুয়ে সতেজ করে দেয়।

সায়েদ : আমার ধারণা ‘নাস্তালিক’ আমাদের সভ্যতার অ্যারিয়ান(Aryan/আর্য) ভাগের একটা অংশ; সেই অংশ, যে অংশকে আমরা সংস্কৃতের ভাণ্ড বলতে পারি। যেমন আপনি বললেন, সব রুচিশীলতা, দৃঢ়তা, আন্তরিকতা, কবিত্ব গুণ, সংক্ষেপে, আমাদের সভ্যতার সব শৈল্পিক গুণাবলির নির্যাস একত্রে নাস্তালিকে পাওয়া যায়, এর নিশ্চিত একটামাত্র কারণ হলো, এটি কেবলমাত্র ইরানিও ভাষার একক ক্যালিগ্রাফিক ফর্ম। যদি অন্যান্য দেশেও পূর্বে নাস্তালিক ফর্ম ব্যবহৃত হয়ে থাকে, সেটা এই ফর্মের একটা আদীম ধারা হতে পারে।

মমায়েজ : অদ্ভূত এবং মজার ব্যাপার হলো, যদিও আমরা ইরানিয়ানরা সবকিছু এমনকি খবরের কাগজ নাস্ক (Naskh/ tafsir font)- স্ক্রিপ্টে, বইপুস্তক সব দিন-রাত এরাবিক ফন্টে পড়তে লিখতে থাকি, যখন ব্যক্তিগত যোগাযোগের স্বার্থে ভাষা ব্যবহার করার কথা আসে, তখন কেবল নাস্তালিক ফন্ট ব্যবহার করি। চেতনে অবচেতনে নাস্তালিক স্টাইল, সেখাস্তেহ্-নাস্তালিক সব আয়ত্তে থাকলেও; ব্যবহার করি কেবল ব্যক্তিগত কাজে, অনাড়ম্বরে। ফরমাল এবং যোগাযোগ সংক্রান্ত কাজে ব্যবহার করি না।

এমনকী আজকের অল্পবয়সীদেরই দেখ, তারা লেখা এবং পড়া সমস্ত নাস্ক ফন্টের বইয়ের মাধ্যমে শিখছে; নাস্ক শব্দগুলোকে অবলম্বন করা বর্ণের সমাহার দেখছে। বড় হয়ে তারাও দেখবে নাস্তালিক বা সেখাস্তেহ-নাস্তালিক কেবল ব্যক্তিগত লেখার খাতিরে ব্যবহৃত ফন্ট। নাস্তালিক ফন্ট একটা গুরুতর গোপনীয় ব্যাপার।

আমাদের পরিচয়, ঐতিহ্যকে জানার এটাই আসলে মূল চাবিকাঠি।

Morteza Momayez 6

মর্তেজা মমায়েজের শিল্পকর্ম


সায়েদ : এই সাক্ষাৎকারে আপনি, পেশাগত নৈতিকতা, আচারনীতির প্রতি সংগত নির্দেশ করেছেন। আমার মনে আছে, আপনি আপনার ক্লাসরুম গুলোতেও এই বিষয়ের উপর ভীষণ জোর আরোপ করেছিলেন। আমি তখন ভেবেছিলাম, এসব উদ্দীপনা দান, আর নৈতিকতার পাঠের পিছনে নিশ্চয়ই কোনো ওরিয়েন্টাল প্রভাব আছে, যা ধর্মনীতি গাথা গাওয়ায়ও উদ্ভুদ্ধ করছে। কিন্তু এখন…

মমায়েজ : দুনিয়ার সকল মানুষই ধর্মচারী। কিন্তু ধর্ম তার তার নিজ নিজ রূপে, নিজ নিজ ঠাঁটে উন্মোচিত হয়। সব ধর্মেরই মূল লক্ষ্য হলো, সঠিক লোকেদের এনে যূথবদ্ধ করা। স্বর্গ কেন্দ্রিক সব ধর্মের ঐশ্বরিক অনুশাসনেরও এটিই মূল লক্ষ্য। সৃষ্টিকর্তা মূলত তার নিজের সদৃশ কোনো একটা চিহ্ন তৈরি করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু মনুষ্যজাতি এর বিপরীত। আমি সাধারণত এমন মানুষ হয়ে জীবনযাপন করতে চাই, যেমনটা ঈশ্বর তার পক্ষপাতিত্বে বানানোর চেষ্টা করেছিলেন।

আমি দৃঢ় ভাবে এটি বিশ্বাস করি যে, মানবজাতি এখনো চাইলে সুস্থ, শুদ্ধ হয়ে উঠতে পারে। ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস থাকতে হবে। তার নিজস্ব আর্থিক এবং আধ্যাত্মিক চাহিদা কতটুকু কী, সে সম্পর্কে অবগত থাকতে হবে।
নিজের লক্ষ্য আর গন্তব্য সম্পর্কে জানতে হবে।

এইধরনের মানুষকে কেবলমাত্র ধার্মিক বলে দেয়া যায় না। বরং বলা ভালো, ইনি ইতিবাচকতা দিয়ে তৈরি এমন একজন মানুষ, যাঁর বারবার জন্ম নেয়া উচিত।

সায়েদ : সময়ের এই সংকট মুহূর্তে আপনার অনুভূতি কী?

মমায়েজ : কারোরই কারিগরি দক্ষতা এবং জ্ঞান কখনো যথেষ্ট নয়৷ তোমার পেশাজীবনের আলাদা আলাদা পর্যায়ে, তোমার বিচার-বিবেচনাবোধ, সমস্যা, জটিলতাও ভিন্ন হবে। একজন গ্রাফিক ডিজাইনার হিসাবে উচিত সেই প্রবাহে স্থায়ী ভাবে যুক্ত হওয়া, এবং নিজের জ্ঞানকে পুনঃ পুনঃ হালনাগাদের মাধ্যমে নিজেকে আধুনিক করে রাখা।


Saed Meshkiসায়েদ মেসকির জন্ম ১৯৬৪ সালে ইরানে। তিনি তেহরান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্রাফিক ডিজাইনে পড়ালেখা শেষ করেন। বর্তমানে তিনি সেই বিশ্ববিদ্যালয়েরই শিক্ষক হিসেবে কর্মরত।

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

কবি, সাহিত্যিক, অনুবাদক, পেইন্টার। প্রকাশিত গল্পের বই ‘বিলুপ্তি ফেরাতে আসা রানী মাছ’ ২০২১।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।