বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারি ২২

মর্মান্তিক ধর্মান্তর

0

কানন সরকার। আমাদের পতাকার মধ্যবৃত্তে মিশে আছে তাঁর সিঁথির সিঁদুর। তিনি প্রখ্যাত প্রাবন্ধিক, শিক্ষাবিদ ও সমাজচিন্তক যতীন সরকারের সহধর্মিনী। ময়মনসিংহের একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। ১৯৬৭ সালে প্রাবন্ধিক যতীন সরকারের সাথে তাঁর মালাবদল হয়। তাঁর ভাই শচীন আইচ ছিলেন যতীন সরকারের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। শচীন স্থানীয় একটি হাই স্কুলের হেডমাস্টার ছিলেন। বিয়ের দুই বছর পর যতীন-কানন দম্পতির কোলজুড়ে জায়গা করে নেয় আদরের ফুটফুটে সন্তান সুমন সরকার। এরই মাঝে শুরু হয় ইতিহাসের নানান চড়াই-উৎরাই। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন এবং একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধ। এসময় যতীন সরকার সমাজতান্ত্রিক রাজনীতিতে প্রবলভাবে জড়িয়ে পড়লেন। তিনি ছিলেন মস্কোপন্থী সমাজতান্ত্রিক দলের সমর্থক। মস্কোপন্থী সমর্থনপুষ্ট এই দলটি স্বাধীনতা যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। তাই স্বভাবতই আওয়ামী লীগের পাশাপাশি এই দলটিও পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর রোষানলে পড়েছিল। হিন্দু অধ্যুষিত ভারত মুক্তিযুদ্ধে আমাদের সহায়তায় এগিয়ে আসায় এদেশের হিন্দু জনগোষ্ঠীর ওপর পাকিস্তানি বাহিনী খুবই ক্ষুব্ধ ছিল। স্বাধীনতাযুদ্ধে তারা যতটা-না আওয়ামীপন্থী মুক্তিযুদ্ধের সমর্থকদের নির্যাতন-হত্যা করেছে, তার চেয়েও বেশি অত্যাচার-খুন-ধর্ষণ-লুটপাট করেছে হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর। জীবন বাঁচাতে তাদের কেউ কেউ আশ্রয় নিয়েছিল ভারতে। যারা সে সুযোগটুকু পাননি, তাদের অধিকাংশই ধর্মান্তরিত হয়ে ছিলেন প্রাণের তাগিদে। তারপরও তাদের অনেকেই বাঁচতে পারেননি। ধর্মান্তরিত হওয়ার পর তাদের কাউকে কাউকে জোর করে বিয়েতে বাধ্য করা হয়েছিল। কেউ কেউ শিকার হয়েছিলেন ধর্ষণ ও হত্যার। এমনই এক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে পাড়ি দিয়েছিলেন কানন সরকার। যতীন সরকার ঘটনাক্রমে সীমান্তবর্তী অঞ্চলে আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু কানন সরকার সে সুযোগটুকু পাননি। তিনি যুদ্ধের এক পর্যায়ে বাধ্য হয়েছিলেন বয়োবৃদ্ধ বাবা, দুই ভাইসহ সপরিবারে ধর্মান্তরিত হতে। ধর্মান্তরিত হওয়ার বেদনাবিধুর সেই মুহূর্তগুলোতে অসংখ্যবার মরতে মরতে বেঁচে যাবার রোমহর্ষক স্মৃতি নিয়ে তিনি ‘মর্মান্তিক ধর্মান্তর’ নামে এই স্মৃতিগদ্যটি লিখেছেন। এই স্মৃতিগদ্যটি পাঠে বিদগ্ধ পাঠক মুক্তিযুদ্ধের একটি অনোন্মোচিত ও অনুচ্চারিত বিষয়ে অনুরণিত হবেন বলেই আমি বিশ্বাস করি। এই লেখাটি রশীদ হায়দার সম্পাদিত ‘১৯৭১ : ভয়াবহ অভিজ্ঞতা’ সংকলনে প্রথম প্রকাশিত হয়। কানন সরকারের অনুমতিসাপেক্ষে শ্রী-তে লেখাটি পুনর্প্রকাশিত হলো।

—মাইনুল ইসলাম মানিক


Jatin Sarkar

৮৫তম জন্মদিনে স্ত্রী কানন সরকারের সঙ্গে অধ্যাপক যতীন সরকার ।। ছবি : মাইনুল ইসলাম মানিকের সৌজন্যে প্রাপ্ত

মুক্তিযুদ্ধের দীর্ঘ নয় মাসের মধ্যে অনেকবার মরতে মরতে বেঁচে গেছি। দম ফাটানো এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মধ্যে দিন গুনেছি মৃত্যুর।

২৫ শে মার্চের নারকীয় গণহত্যার পর সবাই যখন প্রাণভয়ে শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছে গ্রামে, তখন আমিও আমার আড়াই বছরের ছেলেকে নিয়ে আমার বাবা-মার সঙ্গে চলে যাই ময়মনসিংহ শহর থেকে মাইল বিশেক দূরে আমার পিসিমার বাড়ি পলাশীহাটা গ্রামে। অধ্যাপক যতীন সরকার (আমার স্বামী) তার মা-বাবা ভাই-বোনসহ রয়ে গেলেন শহরেই। একরাশ দুশ্চিন্তার বোঝা মাথায় নিয়ে যেতে হলো বাবা-মার সঙ্গে। তারপর যে ওরা কে কোথায় ছিটকে পড়ল, তার কোনো হদিস পাইনি প্রায় দীর্ঘ ন’টা মাস। খবর পেলাম ময়মনসিংহ শহরে মিলিটারি ঢোকার আগেই ওরা চলে গিয়েছিল নেত্রকোনায় ওদের গ্রামের বাড়িতে।

আছি পিসিমার বাড়ি। প্রথমে শুরু হলো ডাকাতের উৎপাত। তারপর এলো মিলিটারি। মিলিটারির তাড়া খেয়ে চলে গেলাম পলাশীহাটা থেকে তিন মাইল দক্ষিণে আমাদের নিজের বাড়ি শিবরামপুর গ্রামে। ভীষণ উদ্বেগের মধ্য দিয়ে দিন কাটে সেখানেও। আমার পিসতুতো ভাই রমেন্দ্রনারায়ণ দে-কে মিলিটারিরা ধরে নিয়ে যায় তার বাড়ি থেকে। সে গিয়েছিল বাড়িটা কী অবস্থায় আছে চুপিচুপি দেখতে। বলে গিয়েছিল যাবে আর ফিরে আসবে। কিন্তু কোনোদিনই তার আর ফেরা হলো না। বাড়ি দিল পুড়িয়ে।

ছবি : ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত

মা-বাবা দুই ভাই আর বৌদিকে নিয়ে আছি বাড়িতে। দিন কাটছে ভীষণ অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে। বাড়ি থেকে মাত্র মাইল দেড়েক দূরে হয়েছে মিলিটারি ঘাঁটি। যেকোনো মুহূর্তে আক্রমণ হতে পারে। তাছাড়া গ্রামে রাজাকার বাহিনীও তৈরি হয়ে গেছে। মাঝেমাঝেই শুরু হতো তাদের অপারেশন। আর আমরা প্রাকৃতিক দুর্যোগ উপেক্ষা করে দিনের পর দিন রাতের পর রাত গোলকধাঁধার গুটির মতো ঘুরপাক খেতে থাকলাম গ্রামের ভেতরেই। কারণ আমাদের বাড়ির পাশ দিয়েই চলে গেছে ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের সড়ক। গ্রামে ঢোকার এবং বের হওয়ার ওই একটিমাত্র পথ। মিলিটারিরা যখন আসত, তখন আসত এই সড়কটার দুদিক দিয়েই। অতএব গ্রাম থেকে বের হওয়ার পথ বন্ধ। তাই খানা-খন্দ ভেঙ্গে গ্রামের মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকল আমাদের বেঁচে থাকার অক্লান্ত প্রয়াস। এভাবে এক দিকে চলল মিলিটারি-রাজাকারের অত্যাচার, অন্যদিকে শুরু হলো হিন্দুদের মুসলমান বানানোর হিড়িক। আশেপাশের গ্রাম থেকে নানা প্রকারের অমানুষিক নৃশংস অত্যাচারের কথা কানে আসতে লাগল অনবরত। ভয়ে সব লোক গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে পাহাড়ি এলাকায় নিরাপত্তার আশায়। মানসিকভাবে হয়ে পড়লাম ভীষণ রকম বিপর্যস্ত। এই যখন অবস্থা তখন ১২ আগস্ট মুক্তিবাহিনীর স্বেচ্ছাসেবকরা এসে সেই রাতে গ্রাম ছাড়ার নির্দেশ দিয়ে বলে গেল, গ্রামে মিলিটারি আসছে। কিন্তু যাবটা কোথায়? রাত-দিন অনবরত ছোটাছুটি করার ফলে ক্লান্তিতে ভরে গিয়েছিল শরীর ও মন দুই-ই। কিন্তু মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও মানুষ চায় বাঁচতে। আমরাও তাই আবার পা বাড়ালাম পথে। নিশুতি রাত, চারদিকে জমাট অন্ধকার। মাইলের পর মাইল পার হয়ে চলছি নিরাপদ আশ্রয়ের আশায়। হঠাৎ পেছনে অনেক দূর থেকে কারা যেন আমাদেরকে চিৎকার করে থামতে বলল। বলল, এক পা নড়লেই গুলি করব। দেখলাম বড়ো একটা লাইট আমাদের দিকে দ্রুতগতিতে এগিয়ে আসছে। রাজাকার মনে করে ঘাবড়ে গেলাম। চার-পাঁচ জন লোক রাইফেল তাক করে আমাদের পথ আগলে দাঁড়াল, পরিচয় দিয়ে বলল, ওরা মুক্তিবাহিনী, রাজাকার মনে করে আমাদের গুলি করতে চেয়েছিল। কিন্তু হারিকেনের আলোয় শাড়ির আঁচল দেখতে পেয়ে গুলি করেনি। ওদের নির্দেশমতো হারিকেন নিভিয়ে আরো মাইলখানেক দূরে কাকনেরপুর গ্রামের এক বাড়িতে আশ্রয় নিলাম। বাড়ির মালিকের নাম ভারতবাসী। শুনে এত কষ্টের মধ্যেও হাসি পেল। বললাম নামটাই যথেষ্ট, আর কিছু লাগবে না। যে বাড়ির প্রায় সবাই পালিয়েছে ভয়ে, সে বাড়িই হলো আমাদের আশ্রয়স্থল। আমাদের সঙ্গে একই ঘরে আশ্রয় পেল গুটিকয়েক ছাগল ও দুটি কুকুর। এছাড়া আছে ঘরময় ইঁদুরের গর্ত ও চাল সমান লাকড়ি। সর্পরাজও যে আমাদের সঙ্গী নেই তাই বা কে বলবে। বিষাক্ত প্রাণীর ভয়ে বসে বসে কাটিয়েছিলাম রাত। চারদিন এভাবে থেকে ১৬ আগস্ট সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে এলাম। এসেই খবর পেলাম মিলিটারি আসছে। যারা ফিরছিল তারা আবার ছুটছে। কিন্তু এত ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম যে আর কোথাও যাওয়া সম্ভব হলো না আমাদের পক্ষে। রয়ে গেলাম গ্রামেই। রাত কাটালাম এক মুসলমান প্রতিবেশীর বাড়িতে। এছাড়া যেখানেই যাচ্ছি, শুধু শুনতে লাগলাম বেঁচে থাকার একটাই পথ, মুসলমান হওয়া। একদিকে মিলিটারি রাজাকার, অন্যদিকে ধর্মান্তরিত হওয়ার হুমকি। আশেপাশের গ্রামগুলোতে জোর করে করে মুসলমান বানানো হচ্ছিল— এ ধরনের গুজব কানে আসতে লাগল। এসব গুজব এর সত্য-মিথ্যা যাচাই করার সুযোগ আমাদের ছিল না। আমাদের এক আত্মীয় ডাক্তার অনিল দাস বললেন— ‘ভীষণ চাপ আসছে মুসলমান হয়ে যাওয়ার জন্য। মুসলমান হওয়া ছাড়া জানে বাঁচার আর কোনো পথ নেই। আমি ঠিক করেছি মুসলমান হয়ে যাব। তোমরাও তাই করো। জানটা তো আগে বাঁচাতে হবে!’ এভাবে গ্রামে থাকা যখন একেবারেই অসম্ভব হয়ে উঠল, তখন শহরের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক শুনে চেষ্টা করতে থাকলাম শহরে আসার। গ্রামে একটি ছেলের মাধ্যমে যোগাযোগ করলাম আমার স্কুলের (আমি একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে মাস্টারি করতাম) প্রিন্সিপাল সিস্টার হেলেনের সঙ্গে। আর দাদা আমাদের অবস্থা জানিয়ে চিঠি লিখলেন তার এক ছাত্র হেলালকে। ছেলেটি পরদিন সিস্টার হেলেনের চিঠি নিয়ে বাড়ি ফেরে। সিস্টার হেলেন গাড়ি ভাড়া বাবদ আমাকে টাকা পাঠিয়েছিলেন। আর হেলাল চিঠির সাথে উর্দু লেখা একটি কাগজ পাঠিয়েছিল। বলে দিয়েছিল, পথে কোনো বিপদ হলে সেটা দেখাতে। লিখেছিলো— চলে আসুন, কোনো ভয় নেই। ২৭ আগস্ট মৃত্যু অবধারিত জেনেও শেষ রাতে গ্রামের দুজন মুসলমান ছেলেকে সঙ্গী করে সবাইকে নিয়ে পা বাড়ালাম শহরের পথে। ভোর সাতটার দিকে উঠলাম এসে বাক্তা গ্রামের এক রাজাকার কমান্ডারের বাড়িতে। আমাদের সঙ্গী একটা ছেলের চাচাশ্বশুর সে। রাজাকার কমান্ডারের বাবাসহ তাদের পরিবারের সবাই ছিল আমার দাদুর ভক্ত ছাত্র। আমাদেরকে নিয়ে সেই কমান্ডারটি বেশ বিব্রত হলো। তাদের বাড়ির সবাই ভয় পেয়ে গেল আমাদের নিরাপত্তার কথা ভেবে। কলেজের একটি ছাত্র নানান রকমের বিপদ সম্পর্কে আমাদের হুশিয়ার করতে লাগল। শুধু তাই নয়, হিন্দুদেরকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য রাজাকার কমান্ডারের বাবাকে মিলিটারি কর্তৃক বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ারও ভয় দেখাল। উত্তরে ভদ্রলোক বললেন, ‘হিন্দুমিন্দু জানি না, কয়েকজন মানুষকে আশ্রয় দেওয়ার জন্যে যদি আমার বাড়ি পুড়িয়ে দেয়, দিক, তাতে তোর কী?’

হিন্দুদেরকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য রাজাকার কমান্ডারের বাবাকে মিলিটারি কর্তৃক বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ারও ভয় দেখাল। উত্তরে ভদ্রলোক বললেন, ‘হিন্দুমিন্দু জানি না, কয়েকজন মানুষকে আশ্রয় দেওয়ার জন্যে যদি আমার বাড়ি পুড়িয়ে দেয়, দিক, তাতে তোর কী?’

অনেকটা জোর পেলাম লোকটির কথায়। বোরখা পরে বিকাল চারটার দিকে বেবিট্যাক্সি চড়ে উঠলাম শহরে। হেলাল নামের এক ছাত্রের বাসায়। সে আমাদেরকে আশ্রয় দিল দুই-তিন দিন। কিন্তু হিন্দু বলে সমূহ বিপদের আশঙ্কায় ঘর থেকে বের হতে পারছিলাম না। এদিকে হিন্দু পরিবার আশ্রয় দেওয়ার অপরাধে যখন হেলালের বাড়ি পুড়িয়ে দেবে এমন উৎপাত শুরু হলো, এই পরিস্থিতিতে হেলালের মা ভীষণ ভয় পেয়ে যান।

মায়ের এই দুর্বলতায় হেলাল ও তার ভাইয়েরা খুবই লজ্জিত বোধ করছিল। কিন্তু আমরা এই বাড়ি ছেড়ে দেওয়াই সঙ্গত মনে করলাম। আশ্রয় নিলাম দাদার আরেক ছাত্র আলী আজগরের বাসায়। কিন্তু এভাবে কতদিন থাকব, কে দেবে আশ্রয়? সবাই বলছে এভাবে থাকা নিরাপদ নয়। বাইরে যেতে হলে লাগবে পরিচয় পত্র। হিন্দু বলে আমাদেরকে কেউ বাসা ভাড়াও দেবে না। গ্রামের মতো এখানেও সেই একই কথা, বেঁচে থাকতে হলে মুসলমান হতে হবে। অনেকে তাই হয়েছে এবং হচ্ছে। কী করব বুঝে উঠতে পারছিলাম না।

মুসলমান হবো? কিন্তু উপায় কী? চাকরিতে যোগ দেওয়া তো দূরের কথা ঘর থেকেই বের হতে পারছি না। উপায়ন্তর না দেখে মনটাকে শক্ত করলাম। মা-বাবাকেও সবাই মিলে বোঝালাম, জান বাঁচানো ফরজ। আগে তো বাঁচি, তারপর ধর্মের হিসাব নিকাশ করা যাবে। পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির চাপে পড়ে বাধ্য হলাম ধর্মান্তরিত হতে। মা-বাবাকে রাজি করে আলী আজগর ও তার বাবা আবদুল আলীর সহায়তায় বড়ো মসজিদে গিয়ে ওযু করলাম এবং ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলাম। ইমাম সাহেবের মেয়ের সহায়তায় প্রথমে আমাদেরকে ওযু করা শেখানো হলো। তারপর ইমাম সাহেব আমাদেরকে একটি সাদা চাদরের চার কোণে ধরতে বললেন। তিনি সুরা বলতে থাকলেন এবং আমাদেরকেও তার সাথে জোরে জোরে বলতে বললেন। আর সুরা বলার মাঝে মাঝে তিনি ধমক দিয়ে বলছিলেন, জোরে জোরে পড়েন, এটা মন্ত্র না। খুবই দুঃখে বলতে ইচ্ছে হলো— ধরণী, দ্বিধা হও। কিন্তু উপায় কী? আমরা তখন বলির পাঁঠারই সমতুল্য।

Muktijuddho

ছবি : ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত

ভয়ে শাখা-সিঁদুর ছেড়ে দিলাম গ্রামে থাকতেই। এবার ধর্মটাকেই ছাড়লাম। ধর্মান্তরিত হলাম। নিরাপত্তার জন্য পরিচয়পত্র ও বাসা ভাড়া করলাম। আবদুল আলী সাহেবই বাসা ঠিক করে দিলেন। চাকুরিতে যোগ দিলাম। আমি এবং দাদা— দুজনেই। তারপর জানতে পারলাম, ময়মনসিংহের তৎকালীন এডিশনাল ডিস্ট্রিক্ট জজ দ্বিজেন চৌধুরী, শিল্পী সুনীল ধর, বেগুনবাড়ি স্কুলের প্রধান শিক্ষক শশাঙ্ক মোহন দে, নৃপেন্দ্র সরকার, মনোরঞ্জন সেন, বিষ্ণুপদ ভট্টাচার্যসহ আরো অনেকেই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন।

সবচেয়ে মর্মান্তিক হলো, ধর্মান্তরিত হওয়ার পরপরই মাইকে সারা শহর প্রচার করা হলো যে— অধ্যাপক যতীন সরকারের স্ত্রী-পুত্র, শ্বশুর-শাশুড়িসহ পরিবারের সবাই পবিত্র ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে মুসলমান হয়েছেন। কিন্তু অন্যদের বেলায় তো এমনটি করা হয়নি। ধাক্কা খেলাম ভীষণ একটা। বুঝলাম : পরিকল্পিতভাবেই মানসিক চাপ সৃষ্টি করে আমাদেরকে এমনটি করানো হলো। সেটা আরো স্পষ্ট হলো স্কুলের সিস্টার হেলেনের সাথে যখন দেখা হলো। তিনি জানালেন যে, এসেই তার সঙ্গে দেখা করলে এমন ঘটনা তিনি ঘটতে দিতেন না। তিনি খুব দুঃখিত হলেন। সেখানেই দেখা হলো আমার সহকর্মী জ্যোৎস্না মিত্রের সাথে। তিনি আমার পূর্বে স্কুলে যোগদান করেছেন কিন্তু মুসলমান হয়ে নয়। তার কাছ থেকে জানতে পারলাম যে সিস্টার হেলেন তাদের প্রত্যেককে একটি করে চেনসহ ক্রস ও খ্রিস্টান নাম দিয়ে সবাইকে একটি করে পরিচয় পত্র দিয়েছেন। তাদেরকে ধর্মান্তরিত হতে হয়নি। শুধু তাদেরকেই নয় এমনটি দিয়েছেন তাদের আশ্রয়প্রার্থী অনেককেই। আমাদের পুরোহিত শিবু ঠাকুরকেও। সহকর্মী জ্যোৎস্না মিত্রের পরিবারকেও থাকার জন্য স্কুলের দুটি রুম ছেড়ে দিয়েছেন, যেমন দিয়েছিলেন তাদের আশ্রয়প্রার্থী অন্যান্য সবাইকে। স্থানাভাবে আমাকে আশ্রয় দেওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব হলো না। তার ফোন নাম্বারটি দিলেন ও প্রয়োজনে তাকে জানাতে বললেন। বললেন— ভয় নেই, আমার সাধ্যমতো আমি তোমাকে সাহায্য করব। আমাদের অলংকার ও সার্টিফিকেটের ফাইলটা নিরাপত্তার জন্যে তার কাছে রাখলাম। বললেন— ‘সব ফিরে পাবে, কিছুই নষ্ট হবে না।’

এদিকে কড়া নির্দেশ এলো মসজিদে যাবার। তাই প্রত্যেক দিনই বাবা, দাদা ও ছোটো ভাইকে যেতে হতো মসজিদে নামাজ পড়ার জন্যে। ভাই দুটোর জন্যে তেমন না হলেও ৭০ বছর বয়সে সবার শামিল হয়ে রোজ মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়া বাবার পক্ষে ছিল এক মর্মান্তিক ব্যাপার।

Muktijuddho

ছবি : ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত

পেয়েছিলামও তাই-ই। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই তিনি সবকিছু ফেরত দিয়েছিলেন। আজ তিনি লোকান্তরিত হয়েছেন, কিন্তু অন্তরের গভীরে তার সহৃদয় সহানুভূতির ছোঁয়া পাই আজও। সকৃতজ্ঞচিত্তে আজ তার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করছি।

এদিকে কড়া নির্দেশ এলো মসজিদে যাবার। তাই প্রত্যেক দিনই বাবা, দাদা ও ছোটো ভাইকে যেতে হতো মসজিদে নামাজ পড়ার জন্যে। ভাই দুটোর জন্যে তেমন না হলেও ৭০ বছর বয়সে সবার শামিল হয়ে রোজ মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়া বাবার পক্ষে ছিল এক মর্মান্তিক ব্যাপার। মাঝে মাঝে বলতেন, ‘এর চেয়ে মৃত্যুও ভালো ছিল’। মসজিদ থেকে এসে মাথা নিচু করে চুপচাপ বসে থাকতেন তিনি। তার সেই বিমর্ষ মূর্তিটার দিকে তাকিয়ে মাঝে মাঝে আমারও মনে হতো— হ্যাঁ, এর চেয়ে মৃত্যুই ভালো ছিল। মনে হতো এতসব করেও যদি শেষ পর্যন্ত কাউকে ফিরে না পাই তাহলে এরকম বেঁচে থাকারই বা সার্থকতা কোথায়? কী হবে বেঁচে থেকে? এতসব করেও কি রেহাই পেলাম মানসিক নির্যাতনের হাত থেকে? আমাদের প্রতিবেশী এক ভদ্রলোক প্রায়ই বাবাকে শাসাত যে, আমাদেরকে দুই-একদিনের মধ্যেই গুলি করে মারা হবে। হঠাৎ করে একদিন ভোরে আলবদররা বাসা ঘেরাও করে সবকিছু উলট-পালট করে দিয়ে চলে গেল। ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম ভাই দুটোর জন্যে। এভাবে বাসা ঘেরাও করে অনেক বাসা থেকে তারা ছেলেদেরকে চোখ বেঁধে ধরে নিয়ে যেত। যাদের নিয়ে যেত তারা আর ফিরে আসত না। রোজার সময় প্রায়ই ৭-৮ জন করে মহিলা এসে ঢুকে যেত আমাদের রান্নাঘরে, এবং হাড়ি-পাতিল খুলে খুলে পরীক্ষা করত আমরা রোজা রাখি কি-না। এভাবে নানাভাবে আমাদের উপর চলছিল মানসিক নির্যাতন। এমন সময় একদিন মারা গেলেন আমার ঠাকুরমা (বাবার কাকিমা)। কিন্তু তাকে দাহ করা সম্ভব হয়নি। মুখে একটু আগুন দিয়ে মাটিতে পুঁতে রাখা হয়েছিল। তিনি ছিলেন নিঃসন্তান, তাই ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী তার শ্রাদ্ধের দায়িত্ব বর্তে আমার বাবার উপর। বাবা আমাদের পুরোহিত শিবু ঠাকুরের সঙ্গে দেখা করে চাইলেন তার পরামর্শ। তিনিও ক্রস ঝুলিয়েছিলেন গলায়। বললেন— ‘চলে আসুন সবকিছু নিয়ে আমার বাড়িতে, এখানেই শ্রাদ্ধ করব।’ করেনও তাই। বাহিরের পোশাকে খ্রিস্টান হলেও ভেতরে ভেতরে তিনি হিন্দু পুরোহিতই রয়ে গিয়েছিলেন। আমাদের এই বিপদের খবর পেয়ে আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন অধ্যাপক সরকারের সহকর্মী ও শুভানুধ্যায়ী বন্ধু-বান্ধবরা যারা এখানে ছিলেন। সব সময়ই তারা আমাদের সাথে যোগাযোগ রেখেছেন ও খোঁজখবর নিয়েছেন এবং বিপদে বুদ্ধি যুগিয়েছেন। মর্মাহত হয়েছেন আমাদের ধর্মান্তরিত হওয়ার ব্যাপারে। ধর্মান্তরিত হওয়ার আগে তাদের সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। খবর পেয়ে এসেছিলেন এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক আমার সঙ্গে দেখা করতে, যিনি অধ্যাপক সরকারকে খুব স্নেহ করতেন বলে মনে করতাম। আমাকে ডাকতেন বউমা বলে। তিনি আমাকে ইসলামের মাহাত্ম্যের কথা শোনালেন। বললেন যে, যদি ইসলামকে মনেপ্রাণে গ্রহণ করতে পারি তাহলে অন্তরে শান্তি পাব, সব দুঃখ-কষ্ট ভুলে যাব।

তিনি আমাকে ইসলাম ধর্ম সম্পর্কিত কয়েকটি বইও দিয়েছিলেন পড়ার জন্যে। পিতৃতুল্য জ্ঞানী-গুণী ভদ্রলোকের এহেন আচরণে সেদিন খুবই মর্মাহত হয়েছিলাম।

খবর পেয়ে এসেছিলেন এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক আমার সঙ্গে দেখা করতে, যিনি অধ্যাপক সরকারকে খুব স্নেহ করতেন বলে মনে করতাম। আমাকে ডাকতেন বউমা বলে। তিনি আমাকে ইসলামের মাহাত্ম্যের কথা শোনালেন। বললেন যে, যদি ইসলামকে মনেপ্রাণে গ্রহণ করতে পারি তাহলে অন্তরে শান্তি পাব, সব দুঃখ-কষ্ট ভুলে যাব।

তিনি আমাকে ইসলাম ধর্ম সম্পর্কিত কয়েকটি বইও দিয়েছিলেন পড়ার জন্যে। পিতৃতুল্য জ্ঞানী-গুণী ভদ্রলোকের এহেন আচরণে সেদিন খুবই মর্মাহত হয়েছিলাম।

একদিন এক ফাদার এলেন স্কুলে। আমার সব খবর তিনি পেয়েছিলেন সিস্টার হেলেনের কাছ থেকেই। তিনি আমাকে বলেছিলেন, যদি কিছু মনে না করি তাহলে একটি কথা জিজ্ঞেস করবেন আমাকে। অভয় দিলাম তাকে। জানতে চাইলেন ধর্মান্তরিত হওয়ার পর কেউ আমার উপর কোনো চাপ সৃষ্টি করেছে কি-না। অনেক জায়গাতেই নাকি এরকম ঘটনা ঘটেছে এবং জোর করে বিয়েও করেছে। তিনি ফোন নাম্বারটা আমাকে দিয়ে বললেন, যদি কখনো এমন দুর্ঘটনা ঘটে, তাহলে যেন সঙ্গে সঙ্গে তাকে খবর দেই। ভীষণ রকমভাবে ভয় পেয়ে গেলাম ফাদারের কথা শুনে। কথাটা বাসায় বাবা, মা, দাদা— কাউকে জানাইনি। জানালে বাবা-মা আরো ভেঙ্গে পড়বেন এ আশঙ্কায়। খুবই ভয়ে ভয়ে দিন কাটাচ্ছিলাম।

একদিন দশ-এগার বছরের একটা ছেলে দৌড়ে এসে জানাল যে, আল-বদররা আমার ছোটো ভাইকে ধরার চেষ্টায় আছে এবং সেদিনই তারা তাকে ধরবে। সে তার নিজের পরিচয় দিল, আল-বদরটির নাম বলল এবং চেহারার বর্ণনা দিল। আমার ভাই আল-বদরটিকে চিনল। একই স্কুলের ছাত্র তারা। ছেলেটি বলল, ‘আপনি যখন বাসায় ঢুকছিলেন, তখন তারা আপনার দিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে বলেছে, তারা আজই সন্ধ্যার মধ্যে আপনাকে ধরবে। চলে যান আপনি এক্ষুনি’। বলতে বলতে ছেলেটি আবার দৌড়ে চলে গেল। ভাইটা ফ্যাল ফ্যাল করে তকিয়ে আছে আমার মুখের দিকে। কী করব আমি! উপায়ান্তর না দেখে ভাইকে বাবার এক বন্ধুর বাসায় রেখে (সে বাসাটিও নিরাপদ নয়) বাবাকে সঙ্গে নিয়ে সাহায্য পাওয়া যাবে এমন কয়েকজন লোকের বাসায় গেলাম। কিন্তু কাউকেই পেলাম না। যাদের পেলাম, তারা কোনো আশ্বাস দিতে পারল না। কেউ বললেন, চেয়ারম্যানের কাছে যেতে। কেউ বললেন, বড়ো মসজিদের ইমামের সাথে দেখা করতে। কিন্তু সাহসে কুলোয়নি, হতাশ হয়ে ফিরে এলাম। সব শুনে আমাদের বাসার মালিকের স্ত্রী আমার ভাইকে নিয়ে গেলেন তার বাসায়। বললেন, ‘আপনার ভাই আমার ভাই, আমি থাকতে কেউ তাকে নিয়ে যেতে পারবে না’। শিক্ষিতজনেরা যা পারলেন না একজন অশিক্ষিত মহিলা আমাদেরকে সে আশ্বাসটুকু দিলেন। এখানে বলে রাখা ভালো, আমাদের বাসার মালিক একসময় ছিলেন রিকশাচালক। রিকশা চালিয়েই কঠোর মিতব্যয়িতার সঙ্গে পয়সা জমিয়ে তিনি হয়েছিলেন বাসার মালিক। তার স্ত্রীও ছিলেন নিরক্ষর। কিন্তু অস্ত্রের কাছে তার এই আন্তরিকতার শক্তি কতটুকু।

এই ঘটনার পর মা খুবই অসুস্থ হয়ে পড়লেন। প্রতিবেশী এক ভদ্রলোককে কাকা বলে ডাকতাম। সব শুনে তিনি সেই আলবদরটিকে ধরে আমাদের বাসায় নিয়ে এলেন। ছেলেটি মাকে ও আমার ছোটো ভাইকে হাত ধরে কথা দিয়ে গেল যে সে এমন কাজ কখনো করবে না এবং করতে পারে না। ছেলেটি ভুল খবর দিয়েছে সে এমন কথা বলেনি।

এভাবে প্রতিটা মুহূর্তেই মৃত্যুর জন্যে অপেক্ষা করে করে দিন কাটে আমাদের।

Jatin Sarkar

ছবি : ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত

এদিকে অধ্যাপক সরকার ও আমার শ্বশুর-শাশুড়ি কারো কোনো খবরই পাচ্ছিলাম না। সিস্টার হেলেনও রোজই তাদের কোনো খবর পেয়েছি কি-না তা জানতে চাইতেন। এ ব্যাপারে তিনিও খুবই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন। ভারতে আমার কোনো আত্মীয় আছে কি-না, থাকলে তাকে সব জানিয়ে চিঠি লিখতে বললেন। বললেন ফ্রান্সে তার মা’র মাধ্যমে তিনি আমার আত্মীয়ের সাথে যোগাযোগ করবেন। তাঁর কথামতো আমি আমার সব খবর জানিয়ে কুচবিহারে চিঠি লিখলাম আমার মামাশ্বশুরকে। সিস্টার হেলেন সে চিঠি পাঠালেন ফ্রান্সে তার মা’র কাছে। তার মা সেখান থেকেই যোগাযোগ করলেন কুচবিহারে আমার মামাশ্বশুরের সাথে। মামাও সিস্টার হেলেনের মায়ের মাধ্যমে আমাকে লিখলেন, তাতেই জানতে পারলাম অধ্যাপক সরকার তার মা-বাবাসহ সবাইকে নিয়ে সীমান্ত পেরিয়ে ময়মনসিংহেরই সীমান্তে ভারতের মেঘালয় রাজ্যে অবস্থান করছেন। কি বলে যে সিস্টার হেলেনকে কৃতজ্ঞতা জানাব বুঝতে পারলাম না। তাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলেছিলাম। চিঠিটি হাতে দিয়েই তিনি বলেছিলেন, ‘তোমাকে আজ আর ক্লাস নিতে হবে না। বাসায় গিয়ে সবাইকে খবরটি দাও।’ খবরটা পেয়ে নতুন করে বাঁচার তাগিদ অনুভব করলাম। দুশ্চিন্তার বোঝা অনেকটা কমে গেল।

এর কিছুদিন পর মান্নান নামে দাদার ছাত্র এলো আমাদের বাসায় এবং মোজার ভেতর থেকে বের করে দিল ছোটো একটা চিঠি। অধ্যাপক সরকার লিখেছেন আমার দাদাকে। তাতে লেখা ছিল, ‘আমরা সীমান্ত পেরিয়েছি, তোমরাও পত্রবাহকের সঙ্গে চলে এসো।’ পরদিন অনুরূপ আরেকটি চিঠি নিয়ে এলেন টিচার্স ট্রেনিং কলেজের অধ্যাপক শিল্পী শাহতাব। অনেক হাতবদল হয়ে চিঠি দুটো আমাদের হাতে এসে পৌঁছেছে। অধ্যাপক শাহতাব বললেন, ‘ধরুন আমিই পত্রবাহক।’ আমরা প্রস্তুত হলাম যাবার জন্য। কিন্তু অধ্যাপক সরকারের সহকর্মী অধ্যাপক গোলাম সামদানী কোরায়শী ও অধ্যাপক রিয়াজুল ইসলাম এবং অধ্যাপক শাহতাব নিজেও কিছুতেই রাজি হলেন না। বললেন, ‘মুক্তিবাহিনীরা এগিয়ে আসছে। তুমুল যুদ্ধ আরম্ভ হওয়ার সম্ভাবনা। জেনেশুনে আমরা আপনাদেরকে মৃত্যুর মুখে ফেলে দিতে পারি না। বরং আপনারা আবার গ্রামে চলে যান।’ কিন্তু গ্রামে যেতে কিছুতেই রাজি হলাম না। এদিকে ভারতীয় বিমান থেকে দু-দু’বার বোমা নিক্ষেপ করা হয়েছে শহরে। শহরের অবস্থা ভালো নয়।

৮ ডিসেম্বর আবার শহর ছাড়লাম। গেলাম শহরের উপকণ্ঠে আকুয়া গ্রামে মান্নানদের বাড়িতে। আমরা শহর ছাড়ার ঘন্টাখানেক পরেই শহরে কারফিউ দিয়ে খানা তল্লাশি চালানো হয়েছে ঘরে ঘরে। মান্নানদের ওখানে থাকাও নিরাপদ নয় মনে করে পরদিনই চলে গেলাম আরো মাইলখানেক দূরে বারেরা গ্রামে দাদার সহকর্মী আজহার সাহেবের বাড়িতে। সেদিনই রাত এগারোটার দিকে শুরু হলো ভীষণ গোলাগুলি। মাটির দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে রাত কাটালাম। পরদিন শুনলাম মিলিটারিরা নিজেরাই তাদের অস্ত্রাগারে আগুন দিয়েছে।

Jatin Sarkar

ছবি : ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত

১১ ডিসেম্বর ভোরে গ্রামের লোকজন কয়েকটি রাজাকারকে ধরে মারধর করায় গ্রামের সবাই ভয় পেয়ে গেল। সবাই গ্রাম ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। আমরাও প্রস্তুত হচ্ছি। এমন সময় খবর এলো, গ্রামে মিলিটারি ঢুকেছে। সবাই ছুটোছুটি শুরু করল। একটু পর জানা গেল, মিলিটারিরা অন্য দিকে চলে গেছে। এভাবে সেদিন তিন-তিনবার উল্টোপাল্টা ছুটোছুটি করলাম। আবার খবর এলো মিলিটারি এসেছে। এবার একদম বাড়ির কাছাকাছি এসে গেছে। পালাবার কোনো পথ নেই। সবাই দাঁড়িয়ে আছি, অপেক্ষা করছি মৃত্যুর জন্যে। এমন সময় দাদা আমার ছেলেকে কোলে নিয়ে কেঁদে ফেললেন। তিনি বললেন— ‘মামা রে, আমার একটু ভুলের জন্যে তোকে বাঁচাতে পারলাম না। ফিরিয়ে দিতে পারলাম না তোর বাবার কাছে।’ এমন সময় ‘দিদি, ভয় নেই’ বলে চিৎকার করতে করতে ছুটে এলো আজহার সাহেবের ছোটো ভাই। সে বলল, পাঞ্জাবীরা আত্মসমর্পণ করার জন্যে লোক খুঁজেছে। সে তাদেরকে দাপুনিয়ার দিকে পাঠিয়ে দিয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে ভেসে এলো ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি। ময়মনসিংহ মুক্ত।

মরতে মরতে বেঁচে গেলাম। এ বাঁচার যে কী আনন্দ তা বোঝানোর ভাষা আমার নেই। জীবন দিয়ে অনুভব করলাম স্বাধীনতার স্বাদ। স্বচক্ষে দেখলাম স্বাধীনতা। বিজয় আনন্দে মেতে উঠেছে জনগণ, ‘জয় বাংলা’ ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠেছে চারদিক। পায়ে হেঁটে ট্রাক-বাস ভরে ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি তুলতে তুলতে জনতা ছুটছে শহরের পানে। ইচ্ছে হলো মিশে যেতে জনতার ভিড়ে। পরদিনই ফিরে এলাম শহরে আমাদের বাসায়। ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গেই সেই রিকশাওয়ালার স্ত্রী ছুটে এলেন। তিনি সিঁদুর পরিয়ে দিলেন এবং সবাইকে প্রণাম করলেন। প্রতিবেশী সবাই ছুটে এসে যোগ দিল। মুহূর্তের মধ্যেই দূর হয়ে গেল ধর্মান্তরের বেদনা। অনুভব করলাম একটা পরম তৃপ্তি। সবাইকে মনে হলো আপনজন বলে।

শিখসেনা ও মুক্তিবাহিনীতে ভরে গেছে শহর। সিটি কলেজিয়েট স্কুল হলো তাদের ঘাঁটি। এবং সেখানেই পাওয়া গেল আলবদরদের তৈরি করা একটি নামের লিস্ট। সেই তালিকায় আমার বাবা ও দাদার নামও ছিল। ৮ ডিসেম্বর যদি আমরা শহর না ছাড়তাম, তবে পড়তাম তাদের কবলে।

মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করতে করতেই গেলাম বেঁচে। একে একে ফিরে পেলাম সবাইকে। হারিয়ে ফিরে পাওয়ার যে কী আনন্দ তা কাউকে বোঝানো সম্ভব নয়।

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক। জন্ম ১৯৮৪ সালের ১১ মার্চ, চাঁদপুর জেলার শাহরাস্তি উপজেলাধীন বলশীদ গ্রামে। ইংরেজী ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে বর্তমানে ইংরেজি প্রভাষক হিসেবে কর্মরত আছেন। নিয়মিত লিখছেন জাতীয় দৈনিক ও বিভিন্ন সাময়িকীতে। ওয়েবম্যাগ তীরন্দাজ-এর সহযোগী সম্পাদক। লেখালেখির স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন নাগরিক বার্তা লেখক সম্মাননা, নতুন কুঁড়ি লেখক সম্মাননা, ফরিদগঞ্জ লেখক ফোরাম পদক (প্রবন্ধে), ছায়াবানী মিডিয়া কমিউনিকেশন লেখক সম্মাননাসহ অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা। প্রকাশিত অনুবাদগ্রন্থ মধ্যপ্রাচ্যের সমকালীন গল্প (মাওলা ব্রাদার্স, বইমেলা ২০১৯), দশ নোবেলজয়ী লেখকের সাক্ষাৎকার (পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি., বইমেলা-২০১৮) ও কাব্যগ্রন্থ স্বপ্নের শঙ্খচিল (২০১৪)।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।