শুক্রবার, অক্টোবর ২২

মাটিবর্তী

0

Startএই সময়টার জন্যই ফজর আলী ওত পেতে থাকে।

বন্যার পানি শুকিয়ে যাবার পর চারদিকে শুধু ক্ষুধা। প্রচণ্ড ক্ষুধায় ওরা ঘর ছাড়ে। ওদের কেউ অনাথ কিশোরী, কেউ সদ্য যৌবনে পৌঁছেছে, কেউ পোড়-খাওয়া গ্রাম্য বধূ। সবার সামনে দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ক্ষুধা। একদিকে কাম পিপাসায় ছটফট করা শহুরে মানুষ, আর একদিকে পেটে বেসামাল ক্ষুধা নিয়ে বেরিয়ে পড়া সুলভ গ্রাম্য নারী। খাদ্য-খাদকের এই আদিম চক্রের মাঝে ফজর আলী।

এই সময়টায় তার একদণ্ড বিশ্রাম মেলে না। চায়ের দোকান চালাবার জন্য সে একটা বাচ্চা ছেলেকে রেখে দিয়েছে। তারপরও দিনের বেলায় তাকে প্রায়ই দোকানে গিয়ে বসতে হয়। রাতে সে বেরিয়ে পড়ে শিকারের সন্ধানে। এতটুকু ক্লান্ত হয় না। কাঁচা পয়সার একটা সুবাস আছে। সেই সুবাস তার সব ক্লান্তি ভুলিয়ে দেয়।

আজও কাঁচা নরম আল ধরে হাঁটছিল ফজর আলী। পেছনে আছিয়া। আছিয়াকে সে এনেছে বামনডাঙা থেকে। হাঁটতে হাঁটতেই ফজর আলী বিড়ি ধরায়। বিড়িতে টান দিয়ে আছিয়াকে বলে, ভনভন করি পা চালা। পাছারাতোর মধ্যি শহরত পৌঁছতি হবি।

আছিয়া নির্বিকারভাবে চেয়ে থাকে ফজর আলীর মুখের দিকে। মৃদুস্বরে বলে, অল্পেআনা দম লেই বাহে।

ফজর আলী ধমকে ওঠে, দমের টাইম মেলা পাবু। এহন এত টাইম নাই। ভালোয় ভালোয় তোক পার করবার পাল্লেই বাঁচি।

আছিয়া তবু দাঁড়িয়ে থাকে। আকাশপাতাল ভাবে। ভেবে লাভ নেই, তবু ভাবে। আসলে ভাবার ক্ষমতাও তার কিছু অবশিষ্ট নেই। দাঁত দিয়ে খাবার চিবানোর মধ্যে যে আনন্দ, সে আনন্দ ছাড়া অন্য কিছু নিয়ে সে ভাবতে পারে না। ফজর আলীর রাগী চোখের দিকে তাকিয়ে সে ভয়ে ভয়ে বলে, তোমাক খিদা লাগছে? চিড়া খাইবেন?

ফজর আলী দেশলাই জ্বালায়। দেশলাইয়ের কাঠিটা উঁচু করে ধরে কিছুক্ষণ আছিয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখে। মায়া হয় তার। না খেতে পেয়ে আছিয়ার শরীরটা হয়েছে পাকানো দড়ির মতো, যেন কেউ সব রস শুষে নিয়ে গেছে। লম্বা দেহটা একটু কুঁজো। এই রকম শুকনো আকর্ষণহীন চেহারার মেয়েকে দিয়ে ছিনালি হয় না।

দেশলাইয়ের কাঠিটা ফেলে দিয়ে সে বলে, সামনত লক্ষ্মীপুর। ওই গ্রামডা পার হলে পরে শহর। টহল পুলিশ কিছু কোলে বোবা হয়া থাকপু না। কবু, মুই তোর মামু। মামুর সাথত পাছারাতোর ট্রেনত চাপি ঢাকাত যাবু।

কিন্তু এ কথাও সত্য যে পেটে ভাত পড়ে না বলেই ওরা ঘর ছাড়ে। ফজর আলী পাকা জহুরি। সে জানে, দুবেলা দুমুঠো ভাত ঠিকমতো পেটে পড়লেই ওদের শরীর আবার ভরে উঠবে, আকর্ষণ ফিরে আসবে। এসব ক্ষেত্রে সচরাচর তার ভুল হয় না।

দেশলাইয়ের কাঠিটা ফেলে দিয়ে সে বলে, সামনত লক্ষ্মীপুর। ওই গ্রামডা পার হলে পরে শহর। টহল পুলিশ কিছু কোলে বোবা হয়া থাকপু না। কবু, মুই তোর মামু। মামুর সাথত পাছারাতোর ট্রেনত চাপি ঢাকাত যাবু।

আছিয়া কিছু না বলে নিঃশব্দে পা চালাতে শুরু করে।

লক্ষ্মীপুরে ঢুকবার মুখে মেঠো পথটা একটু সরু। গ্রামটাতে অবস্থাসম্পন্ন গৃহস্থই বেশি। দুর্ভিক্ষের ছোঁয়া এসে লাগেনি। লক্ষ্মীপুর নামটাকে সার্থক করতেই যেন লক্ষ্মী এসে এ গ্রামে স্থায়ীভাবে বাসা বেঁধেছে। এখানকার পুরুষেরা ভালো খেতে পায়, বউ-ঝিরা ভালো কাপড় পরে। ঠিকমতো খেতে পেয়ে এই গ্রামের কুকুরগুলো পর্যন্ত হৃষ্টপুষ্ট। ফজর আলী আর আছিয়াকে দেখে দু-তিনটে কুকুর ঘেউ ঘেউ শুরু করে। ফজর আলী জানে, ওরা কামড়াবে না, ধাওয়াও করবে না। তবু সে ভয় পায়, যতটা না কুকুরকে, তার চেয়ে বেশি মানুষকে। কুকুরগুলো একটানা চিৎকার করলে গাঁয়ের লোক বেরিয়ে আসবে। সে নিমগাছের ঝুলে পড়া একটা ডাল ভেঙে নিয়ে কুকুরগুলোকে তাড়া করে। কুকুরগুলো দূরে সরে গিয়ে মৃদু গরগর করতে থাকে।

ফজর আলী আছিয়াকে নিয়ে শহরের সুরকি বিছানো রাস্তায় ওঠে। রাস্তাটা প্রবেশমুখে বেশ চওড়া। দুপাশে পরপর কয়েকটা পাকা দালান উঠেছে। কোনো কোনো বাড়ির চেহারায় আধুনিকতার ছাপও আছে। বাড়িগুলো পার হয়েই রেলস্টেশন। স্টেশন থেকে তারা কিছুটা ঘুরপথে যায়। রেললাইন পার হয়ে বড়ো মাঠের মধ্য দিয়ে তারা আর একটা গলিতে এসে ওঠে।

এই গলিটা অপেক্ষাকৃত সরু। হাত পাঁচেক চওড়া হবে। দিনের বেলায়ও পাশাপাশি দুটো রিকশা যেতে পারে না। তার ওপর আবার আছে সরু ড্রেন। ড্রেনে একটা বিড়াল মরে পচে আছে। উৎকট গন্ধ নাকে এসে লাগে।

গলিটা সামনে আরও সরু হয়ে যায়। ল্যাম্পপোস্টের অস্পষ্ট আলোয় তারা পথ চলে। দুপাশে ছোটো ছোটো ঘর। পাকা দেয়াল, তার ওপর টিনশেড। নালা পার হয়ে একটা ঘরের সামনে এসে ফজর আলী দাঁড়ায়। আস্তে আস্তে জানালায় টোকা দেয়।

এই প্রথম আছিয়া ভয় পায়। মৃদুস্বরে বলে, মোক না গারমেন্টে কাম দেওনের কতা? এটি কোনে আনলেন?

ফজর আলী বিরক্ত হয়। কিন্তু সে বিরক্তি প্রকাশ করে না। দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে সে জানে, একদম শেষ মুহূর্তে এসে মেয়েগুলো বেঁকে বসে। সামনে নিশ্চিত খাওয়া-পরার ব্যবস্থা আছে জেনেও ওরা ঘর ভুলতে পারে না। সে সান্ত্বনা দেবার সুরে বলে, তোক জায়গামতো আনছি। রুস্তম ভাই কাইল তোক ঢাকাত নিয়া যাবি।

আছিয়া বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করে, তুমি যাইবেন না সাথে?

হামার যাওয়ার কী দরকার? রুস্তম ভাই লোক ভালা, তার সাথত যাবু। কুনু ভয় নাই।

‘ভয় নাই’ শব্দ দুটো শুনে আছিয়া প্রচণ্ড আতঙ্কে অস্থির হয়ে ওঠে। দৃঢ়স্বরে বলে, মোক বামনডাঙ্গা থুইয়া আসেন। তোমাগেরে সাথে কুনুটিও যামু না। তোমরা ঠগ, বাটপার।

ফজর আলী বলে, রুস্তম ভাই, ছেমড়িডা খালি কান্দে, তুমি বাহে ধমকধামক দিয়েন না। কচি ছেমড়ি তো। বাড়ির জন্যি মন পোড়ে। কদ্দিন পরে ঠিক হয়ি যাবি।

ফজর আলী এবার রেগে যায়। রেগে যাবার মতো যথেষ্ট কারণও তার আছে। সে কি না ঠগ? বাটপার? হ্যাঁ, সে গার্মেন্টসে কাজ দেবার কথা বলে আছিয়াকে সঙ্গে এনেছে। সে মিথ্যে কথা বলেছে। কিন্তু ক্ষুধার জ্বালায় তিল তিল করে মরে যাবার চেয়ে আছিয়ার কাছে এই মিথ্যেটা বড়ো হলো?

ফজর আলী জোরে ধমক দেয়।

ধমক খেয়ে আছিয়া কাঁদতে শুরু করে। জোরে কান্না নয়। ইনিয়ে-বিনিয়ে কান্না, যেন মৌচাকে গুনগুন করে ওঠে অসংখ্য মৌমাছি।

ফজর আলী এবার ভয় পেয়ে যায়। কান্না শুনে আশপাশের ঘর থেকে যদি কেউ বেরিয়ে আসে? তার রাগ আস্তে আস্তে পড়ে আসে। তার বদলে জেগে ওঠে ভয় মেশানো সহানুভূতি। জানালায় আবার টোকা দিতেই দরজা খুলে দাঁড়ায় সুঠাম দেহের এক লোক।

ফজর আলী বলে, রুস্তম ভাই, ছেমড়িডা খালি কান্দে, তুমি বাহে ধমকধামক দিয়েন না। কচি ছেমড়ি তো। বাড়ির জন্যি মন পোড়ে। কদ্দিন পরে ঠিক হয়ি যাবি।

আছিয়া শেষবারের মতো প্রতিরোধ করার চেষ্টা করে। ফজর আলী কাঁধের গামছা আছিয়ার মুখে চেপে ধরে। তারপর জোর করে ঘরের ভেতর ঢুকিয়ে হাতে এক শ টাকা গুঁজে দেয়।

এ রকম জোরজবরদস্তি করতে প্রথম প্রথম ফজর আলীর বাধত। এখন অভ্যাস হয়ে গেছে। মেয়েগুলোর মনে কে যেন ঢুকিয়ে দিয়েছে, এসব অন্যায়। ফজর আলী কোনো ন্যায়-অন্যায়ের পরোয়া করে না। এ কথা কে না জানে, পৃথিবীর সবচেয়ে আদি নিয়মই হলো ছিনিয়ে নেওয়া। আজ তোমার আছে বলেই আমার নেই। সুতরাং আমার যা নেই, তা আমি অবশ্যই ছিনিয়ে নেব। ফজর আলী তো তার ভাতের অধিকার ছিনিয়ে নিতে দুবার ভাবেনি। ওসব ন্যায়-অন্যায়ের চাটনি খেলে কবেই সে মরে ঢুসে যেত।

ফজর আলী বিশ্বাস করে, মানুষ কেবল নিজে চাইলেই তার ভাগ্য বদলাবে। কোনো আল্লাহ, খোদা বা ভগবান এসে তার ভাগ্য বদলে দিয়ে যাবে না। আর বিশ্বাস করে বলেই সে আজ পেট ভরে খেতে পায়। চোর নয়, ডাকাত নয়, গুণ্ডা নয়, বদমাশ নয়, বা তার মতো দালালও নয় এমন মানুষ অনেক আছে। সৎ মানুষের সে রকম অভাব এখনো ঘটেনি। তবে ব্যাপারটা হলো এই যে, এত সৎ মানুষ থাকা সত্ত্বেও ফজর আলী দিনের পর দিন না খেয়ে থেকেছে, স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে রাত কাটিয়েছে। ওই সব ভালো মানুষের দল তাকে মালসাভর্তি ভাত দেয়নি। ফজর আলী তাই নিজেই নিজের পথ খুঁজে নিয়েছে।

তার অভাব ছিল একটা সংসারের। নিজ বুদ্ধিবলে সংসারও সে পেতেছে। স্টেশনের বুড়ো চায়ের দোকানদার রহমত মিয়ার মেয়েকে সে বিয়ে করেছে।

স্টেশনের মাঠ পার হলেই যে গ্রাম, সেই গ্রামেই ছিল রহমত মিয়ার বাড়ি। তার একমাত্র মেয়ে জয়তুনকে বিয়ে করে ফজর আলী সেই বাড়িতে এসে উঠেছিল বছর চারেক আগে। তারপর একদিন রহমত মিয়া টুপ করে মরে গেল। এখন চায়ের দোকান আর বাড়ি দুটোরই সে পুরোদস্তুর মালিক বনে গেছে।

ফজর আলী সরু গলিটা পেরিয়ে আসে। হাঁটতে হাঁটতেই বিড়ি ধরায়। স্টেশনের মাঠটার কাছে গিয়ে থামে। মাঠ পার হলেই তাদের গ্রাম। সেই গ্রামে তার বাড়ি। বাড়িতে জয়তুন তার জন্য অপেক্ষা করছে।

সে বাড়িতে যেতে পারে, আবার আলতা বানুর কাছেও যেতে পারে। ডান দিকের রাস্তা ধরে মাইল দুয়েক গেলে শহরের শেষ মাথায় আলতা বানুর খুপরি।

আলতা বানুকেও আছিয়ার মতো ঢাকায় চালান দেবার কথা ছিল। কিন্তু সে যে আর দশটা মেয়ের মতো নয়। সে কথায় কথায় হাসতে পারে, ইচ্ছে হলে কাঁদতে পারে, অভিমানে ঠোঁট ফোলাতে পারে। তার জংলা শাড়ির পরতে পরতে লুকিয়ে থাকে রহস্য। এই রহস্যের জন্যই আলতা বানুকে ফজর আলী বেঁচে দিতে পারেনি, নিজের করে নিয়েছে।

ফজর আলী বিড়িতে শেষবারের মতো একটা টান দেয়। তারপর বাড়ির পথ না ধরে ডান দিকের পথে হাঁটতে শুরু করে।

 

২.
ফজর আলী বাড়ি ফিরে আসে পরদিন দুপুরে।
কলসি কাঁখে কালো ছিপছিপে জয়তুন তখন মাত্র পুকুরঘাট থেকে ফিরেছে। ফজর আলীকে দেখে সে কলসিটা ঘরের দাওয়ায় নামিয়ে রাখে।

ফজর আলী নিজেকে শোনানোর জন্যই যেন বলে, রাতে কাম পড়ি গেল।

জয়তুন কোনো উত্তর দেয় না। কিন্তু তার মুখ লম্বাটে হয়ে যায়।
ফজর আলী দাওয়ায় পাতা মাদুরে বসে। ফের স্বগতোক্তির মতো করে বলে, আসপার পাল্লে কি আর আসলামনি না? এবারের কামোত মেলাগুলান ট্যাকা পাছি। ইঙ্কা কাম আর দুই তিনটা ধরবার পাল্লে সামনের মাসত তোক গয়না গড়ায়ে দিমু।

জয়তুন এবারও উত্তর দেয় না। তার উত্তর দেবার দরকারও নেই। সে জানে, ফজর আলী রাতে কী কাজ করে। শুধু সে কেন, গাঁয়ের প্রায় সবাই জানে। কিন্তু কেউ কোনো প্রতিবাদ করে না।

জয়তুন খানিকক্ষণ ফজর আলীর অপরাধী মুখটার দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর বলে, খাই দাই হইছে?
না, ফজর আলী উত্তর দেয়।

তালি বসেন, মুই ভাত নিয়া আসি।

দু’ডা কাঁচা মরিচ আনিস।

ঘরের ভেতর থেকে জবাব আসে, কাঁচা মরিচ নাই।

কাঁচা মরিচ নাই— এমন দুঃসংবাদে ফজর আলীর মাথা গরম হয়ে ওঠে। ইচ্ছে করে জয়তুনের চুলের মুঠি ধরে বলে, কাঁচা মরিচ নাই, এইটা আগে খিয়াল ছিল না?

কিন্তু সে কিছু না বলে মনে মনে ফুঁসতে থাকে। চুপচাপ ভাত খায়। ভাত খেয়ে উঠে সে খাটে গিয়ে শোয়। চোখ দুটো বন্ধ করে ঝিমায়।

কালো কুচকুচে জয়তুনের জায়গায় সে মনে মনে আলতা বানুকে কল্পনা করে। একদিকে শুষ্ক, রুক্ষ জমি আর একদিকে রসে ভরা মাটি। রুক্ষ জমিতে লাঙল চালিয়ে সুখ কোথায়?

ফজর আলী ঝিমায়, কিন্তু ঘুমায় না। তার আধবোজা চোখ ফাঁক করে সে সব দেখে। শিকের ওপর তুলে রাখা এক বাটি দুধ, ঘরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটে যাওয়া ধেড়ে ইঁদুর, জয়তুনের কালো চকচকে অভিমানমাখা মুখ—কিছুই তার নজর এড়ায় না। মনে হয়, সবকিছু তাকে ব্যঙ্গ করছে।

ফজর আলী বিছানায় উঠে বসে। জয়তুনের মুখে আঁতিপাঁতি করে কী যেন খোঁজে। এক নির্বাক ঔদাসীন্য ছাড়া কিছুই পায় না। তার মেজাজ খারাপ হতে শুরু করে।

ফজর আলীর মনে হয়, সে জয়তুনকে বিয়ে করে ভুল করেছে। রহমত মিয়ার বাড়ি আর চায়ের দোকানের ওপর লোভ করে মারাত্মক ঠকেছে। কালো কুচকুচে জয়তুনের জায়গায় সে মনে মনে আলতা বানুকে কল্পনা করে। একদিকে শুষ্ক, রুক্ষ জমি আর একদিকে রসে ভরা মাটি। রুক্ষ জমিতে লাঙল চালিয়ে সুখ কোথায়? দুই নারীর স্পষ্ট বৈপরীত্যে সে মনে মনে পুড়তে থাকে।

ঠিক তখনই তার চোখে পড়ে, বিছানার পাশে পড়ে থাকা আধখাওয়া বিড়ির একটা টুকরো। ফজর আলী এবার অস্ত্র পেয়ে যায়। লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। সে জানে, বিড়ির টুকরোটা কোথা থেকে এসেছে। জয়তুনকে সে অনেকবার তার শার্টের পকেট থেকে চুপি চুপি বিড়ি বের করে ধরাতে দেখেছে।

কিন্তু আজ যেন তাকে সর্বনাশের নেশায় পেয়ে বসেছে। সে উঠে গিয়ে জয়তুনের চুলের মুঠি চেপে ধরে। বিড়ির টুকরোটা দেখিয়ে বলে, এইটা এইখানে ক্যামনে আইলো?

জয়তুন প্রাণপণ চেষ্টা করে চুলের মুঠি ছাড়াতে। পারে না। ফজর আলীর প্রকাণ্ড হাতের চড় খেয়ে সে বিছানার ওপর উল্টে পড়ে।

ফজর আলী চিবিয়ে চিবিয়ে বলে, এক রাইত বাড়িত আসি নাই। নটী মাগি আর একজনার সাথে শুতিছিস। আইজ তোক আমি খুন করি ফ্যালাব।

হঠাৎ যেন জয়তুন বুঝতে পারে, তার ওপর কী অভিযোগ চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সে প্রাণপণ চেষ্টা করে বলে, রাইতে তুমি বাড়িত আসেন না। মুই তোমার জন্যি জাগি বসি থাকি। তাই মাঝেমধ্যি এক-আধটা বিড়ি খাই। কিরা কাটি কতিছি, আর কেউ এই বিড়ি খায় নাই।

কিন্তু ফজর আলীর মাথায় ততক্ষণে খুন চেপে গেছে। সে দরজার পাশে ঝুলিয়ে রাখা মোটা পাটের দড়িগাছা হাতে তুলে নেয়। তারপর জোরে চাবকাতে থাকে।

অনেকক্ষণ চাবকানোর পর তার মাথাটা একটু ঠান্ডা হয়। শার্ট গায়ে দিয়ে সে বেরিয়ে পড়ে। হাঁটতে হাঁটতে এক নিদারুণ মনঃকষ্ট তাকে পেয়ে বসে। সব জেনেশুনে সে বউকে মেরেছে। অবশ্য না মেরেও তার কোনো উপায় ছিল না। মাঝে মাঝে তার ও রকম রাগ ওঠে। তখন সে নিজেকে সামলাতে পারে না। কিছু একটা অঘটন ঘটিয়ে বসে।

ঘোর কাটতেই সে স্টেশনে যায়। ওষুধের দোকান থেকে মলম কেনে।

 

৩.
ফজর আলী যখন বাড়ি ফিরে আসে তখন প্রায় বিকেল।
জয়তুন উপুড় হয়ে শুয়ে ছিল বিছানায়। কিছুক্ষণ পরপর পিঠটা ফুলে ফুলে উঠছে। কোমরের কাছে শাড়ি সরে গেছে, সেখানে কালো রঙের গভীর দাগ। হাতার কাছে ব্লাউজটা ছেঁড়া। রক্তের দাগ শুকিয়ে আছে।
ফজর আলীর অনুশোচনায় মরে যেতে ইচ্ছে হয়। সে খাটের পাশে বসে পরম যত্নে জয়তুনের শরীরের কেটে যাওয়া জায়গাগুলোতে মলম লাগিয়ে দেয়। মৃদুস্বরে জিজ্ঞাসা করে, খুব লাগিছে বউ?

জয়তুন ফুঁপিয়ে ওঠে।

মলম লাগানো শেষ করে ফজর আলী শুয়ে পড়ে জয়তুনের পাশে। জয়তুনের চুলে আস্তে আস্তে আঙুল বুলিয়ে দেয়।
জয়তুন বলে, মোক আর মারবেন না তো?

ফজর আলী জয়তুনের বুকে মুখ ঘষতে ঘষতে বলে, কসম। আর যদি মারি তো মুই বাপের ব্যাটা না।

জয়তুন এবার নিজেই স্বামীকে কাছে টেনে নেয়। রুক্ষ, অনুর্বর মাটি উর্বর হতে শুরু করে।

ফজর আলী মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে, সে এবার আলতা বানুকে ছেড়ে দেবে। আর আছিয়াকেও তার গ্রামে ফিরিয়ে দিয়ে আসবে।

 

৪.
বেলা গড়িয়ে যায়। সন্ধ্যা হয়ে আসে। ডানা ঝাপটে ঘরে ফেরে পাখির দল। বটগাছের ওপারে টুপ করে হারিয়ে যায় সূর্যের শেষ রশ্মি।

রতিক্লান্ত ফজর আলীর কোনো প্রতিজ্ঞা মনে থাকে না। বেঁচে থাকার প্রয়োজনে সব প্রতিজ্ঞা হয়ে ওঠে অর্থহীন।

আবারও রাত নামে।
আঁধার গাঢ় হয়ে আসে মাটির পৃথিবীতে, আর মাটিবর্তী মানুষের মনে।

 

 

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

আলভী আহমেদ বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তড়িৎ প্রকৌশলে স্নাতক। পেশাগত জীবনে যন্ত্রপাতির খটমট বিষয়ে না গিয়ে বেছে নিয়েছেন অডিও ভিজুয়াল ফিকশন নির্মাণ। টেলিভিশন মিডিয়ার জন্য নাট্যরচনা ও পরিচালনা করেন। সিনেমার বড়ো পর্দায়ও অভিষেক হয়েছে। লেখালেখি তার নেশা। নিজের নাটক, সিনেমার জন্য গল্প, চিত্রনাট্য রচনার মধ্য দিয়ে তার লেখার অভ্যাস গড়ে উঠেছে। আলভী অনূদিত হারুকি মুরাকামির উপন্যাস ‘নরওয়েজিয়ান উড’, ‘হিয়ার দ্য উইন্ড সিং’, ‘পিনবল ১৯৭৩’ বাতিঘর থেকে প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশের অপেক্ষায় আছে ‘কনফেশনস অব আ শিনেগাওয়া মাংকি’। তার নিজের লেখা প্রথম উপন্যাস ‘জীবন অপেরা’ ২০২১-এ প্রকাশিত হয়েছে।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।