শুক্রবার, অক্টোবর ২২

মানস চৌধুরীর সাথে মনোরম পলকের আলাপ : তৃতীয় কিস্তি

0

Manos Chowdhuryশূন্যতার বোধ অটুট সমসত্ত্ব সর্বগ্রাহ্য কোনো অনুভূতি নয়— মানস চৌধুরী


সাবঅল্টার্ন চিন্তার সীমানা, এলিটিজমের ব্যাকরণ, কবিতা ও কবিতা পাঠ, দুই বাংলার সত্তা— ইত্যাদি নানা বিষয়ে মনোরম পলক ২০২১ সালের মার্চ মাসের ৫ তারিখ কথা বলেছেন মানস চৌধুরীর সঙ্গে। আজ রইল পুরো আলাপের তৃতীয় কিস্তি।


দ্বিতীয় কিস্তির পর…


মনোরম পলক : জি

মানস চৌধুরী : তখন এসে হয়তো আপনার বাবার রেখে যাওয়া প্লট, তাতে হয়তো যদি আপনি সমাজসেবক হন তাহলে রবীন্দ্রসংগীত কিংবা শাস্ত্রীয় সংগীতের একটা কারখানা— কারখানা তো বলা উচিত না— একটা আউটলেট দিলেন; আর যদি স্বাস্থ্য সচেতন হন তাহলে একটা জিম দিলেন, আর যদি আপনি ব্যবসায়ী হয়ে ওঠেন…। এর মাঝে আরেকটা লাইন এড করি এই যে বস্টন— বরিশাল এবং ঢাকা-ওয়াশিংটন এই যে ড্রিফট এই সিনারিওটা তো আপনি দেখতে পাচ্ছেন; গত ১০ বছরে একদম দৃষ্ট। ফলে আমার মনে হয় যে যদি এলিট শব্দটাকে আমি বলি ইন্ডাস্ট্রিয়াল ক্লাস, সেই ইন্ডাস্ট্রিয়াল ক্লাসের যে অসন্তোষের জায়গাগুলো— দুঃখ শব্দটা তাঁদের জন্য একটু বেশি হয়ে যায়, রাজমুকুট হয়ে যায়— কিন্তু তাঁদের অসন্তোষগুলো বুঝতে আমি মনে করি না অধিক গবেষণার দরকার। তাঁদের স্থাপনা এস্টাবলিশমেন্টগুলোর ক্যারেক্টারে ধরা পড়ছে তা। তাঁরা কোনোটাকে বরদাস্ত করতে পারেননি, কোনোটা বরদাস্ত করতে পেরেছেন, কোনোটা গ্রহণযোগ্য, কোনোটা মানসম্পন্ন মনে করেন না এবং সেগুলো কারেক্ট করেছেন। এবং দে আর হাভিং আ কসমোপলিটন লাইফ! ফলে আপনি যদি রেফার করে থাকেন কসমোপলিটন ক্লাসের কথা, আমরা হয়তো রাগ করে বলতে পারি ওঁরা ৫’শ কোটির জায়গায় ৫ হাজার কোটি টাকা নাই কেন এমন দুঃখ প্রকাশ করেন— এগুলো চলতি ভাষায় বলেন লোকজন। আমার শুনতে কোনো সমস্যাও নেই। কিন্তু এরকম একটা আলোচনায় এসে ওইগুলোই পয়েন্ট নেয়। আমি বরং দেখতে চাই তাঁরা কী কী ভাবে তাঁদের জীবনযাপন দেখাচ্ছেন। কোনটা তাঁরা কারেক্ট করছেন, রাষ্ট্রের এস্টাবলিশমেন্টের জায়গা থেকে এবং সেগুলো রাষ্ট্রোর্ধ এস্টাবলিশমেন্ট হয়ে গেছে। হার্ডলি ইউ ক্যান সে এনিথিং অ্যাবাউট দ্যাট। তাঁর গার্মেন্টসে কিভাবে চলবে, তাঁর ছেলেমেয়েরা কোথায় থাকবে, তিনি ডুয়েল সিটিজেনশিপ পাবেন কেন এবং তিনি এখানে কথার কথা; ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি। আমার মনে হয়, ফলে দুঃখ শব্দের যে মধ্যবিত্ত— নির্দিষ্টতা এই কারণেই বোধহয় আমার কাছে বেখাপ্পা লাগল। তাঁর জীবনে দুঃখ শব্দটির ব্যবহার করলে ঠিক একইভাবে আমার কিন্তু শ্রমিক শ্রেণীর জন্য এতটা মন খারাপ হয়েছে যে বেখাপ্পা লাগছে। এই ‘দুঃখ’টা না আপনার আমার শ্রেণীতে অনেক বেশি ক্রিয়াশীল এবং অর্থবহ হয়েছে! কিন্তু ওই একই শব্দ দিয়ে কথার কথা ‘জরিনার দুঃখ’ এই মর্মে একটা গল্প লেখা যেতে পারে। কিন্তু এরকম একটা সিরিয়াস আলাপে এটা বলাও খুব জরুরি হয়ে দাঁড়ায় যে আমরা যখন দুঃখ শব্দটা ব্যবহার করি তখন বেসিক্যালি পলক-মানসের কথা, মানস-পলকের কথা—আমাদের পরস্পরেরটাই মিন করি। বিচ্ছেদ বোধ, শোক, দূরত্ব-বোধ, জীবনানন্দ— বরং আমাদের কাছাকাছি আছেন জীবনানন্দ। কিন্তু সত্যি সত্যি মনে হয় না যে ওয়ার্কিং ক্লাস মিন করি আমরা। ঠিক একইভাবে আমি এভাবে মনে করি না ইন্ডাস্ট্রিয়াল ক্লাসও এই শব্দটার অর্থ ধারণ করতে পারে।

 

মনোরম পলক : আপনার মতো করে দুঃখের একটা মডেল কী হতে পারে বলেন তো?

মানস চৌধুরী : আমি জানি না। তবে মানুষের মৃত্যু খুবই বিষাদকর। মানে একটা লোককে আপনি দেখতে পাবেন না! ইউ নো ইট পলক। কাজল বেঁচে আছে, কাজল বেঁচে নেই! আপনি জানেন উচ্চারণ করা যায় না, পাশের মানুষটাকে বলা যায় না— আপনার মাথায় কী কী আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। এটা তো উচ্চারণ করতে নেই— ও যখন নিরুদ্দেশ ছিল, নিখোঁজ ছিল। সারাক্ষণই তো ওই প্রশ্নটা আসছে, আপনার রচনাতেও এসেছে, যে এই বাবা আমাকে আর কোলে নেবে না। আমি বলতে চাচ্ছি যে মৃত্যু শ্রেণী নির্বিশেষে বোধহয় এই অনুভূতিটা দেয়, দ্যাট ইউ কান্ট গেট এনিমোর এনি টাচ ফর্ম হার/হিম। এটা বোধহয় একটা জায়গা যেটা আমিই আবিষ্কার করে ফেলেছি বলব না। আর নিজের মৃত্যু দিয়ে আবিষ্কার করার সুযোগ কারোরই থাকে না। কিন্তু আমার মনে হয় যে মৃত্যুজনিত যে বিষাদ যদি তার নাম বিষাদ হয়, এটা হচ্ছে সকল কিছুর ঊর্ধ্বে।

বুদ্ধ সাহেবের বোধহয় ব্যাধি, জরা, মৃত্যু-কে কাছাকাছি রাখবার একটা অন্য কারণও আছে। আমি কখনোই স্পোর্টস পার্সোনালিটি কিসিমের ছিলাম না। ১২-১৩ বছরেও আমি তখন লাফঝাঁপ দেওয়া ছেলে ছিলাম না। ফলে আমিও তো মিস করি। অন্যরাও নিশ্চয়ই; ৫২-তে এসে ১৪ বছরের পানিতে ঝাঁপানো! ফলে আমার মনে হয় যে-সকল সঙ্গ এবং যে-সকল গুণ আমাদের ভেতর থেকে হারিয়ে যেতে থাকে— মানে দুর্দান্ত গতিতে বল করা ম্যাকগ্রাথ, যদি কথার কথা, আমার উদাহরণ টা হয়তো ড্রাসটিক লাগবে; তিনি এখন আর সেই আগের পেইসে বল করতে পারবেন না— এটা নিয়ে যদি তার দুঃখ থাকে আই ওন্ট মাইন্ড। ওয়ান্স ইউ হ্যাভ এচিভড সামথিং অ্যান্ড নাউ ইউ আর বাউন্ড টু লুজ ইট। এটা তো একটা স্ট্রাকচারাল বিষাদ, এটাকে আমি আমার ভঙ্গি দিয়ে এড়িয়ে যেতে পারি না যে সেটা বলছিলাম। কিন্তু আরও বড়ো প্রকরণ বোধহয় মৃত্যু। নিজের মৃত্যু নিয়ে বিষাদের অনেক কবিতা আছে, সেগুলো আমি গৌণ করে দেখব না। ওই সাবজেক্টিভ, ওই রোমান্টিক কবিতাগুলো সুন্দর কবিতা! যখন অন্যের মৃত্যু ঘটে তখন আমরা আর তাঁকে দেখতে পাব না; হয়তো এমনিতেই ১৭ বছর দেখা নেই, কিন্তু এই অনুভূতিটা ভালো নয়— সাইদুর ভাইয়ের সাথে দেখা হবে না! যদিও তাঁর সাথে আমার ৩০ বছর পর দেখা হয়েছিল আচমকা রাজশাহীতে পরীক্ষা নিতে গিয়ে। তিনি একটা কমনরুমে ছিলেন, আমি অন্য কোনো কমনরুমে ছিলাম। কিন্তু আমরা এক বিল্ডিং এর দুই রুম দূরে ছিলাম। ফলে আমাদের ৩০ বছর পরে দেখা হয়। আপনার মনে পড়তে পারে তাই এত সহজে বললাম। কুষ্টিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের একজন অধ্যাপক সম্প্রতি মারা গেছেন সাইদুর রহমান। ঘটনাচক্রে তিনি মেহেরপুরের, এবং তার আগে জাহাঙ্গীরনগরে পড়তেন এবং আমি দুদিন ধরে অনুভূতি সামলালাম। যদিও তাঁর সাথে আমার ৩০ বছর দেখা ছিল না, কিন্তু আচমকাই গত বছর যে দেখা হলো তা কিন্তু এই ভাবনায় নিয়ে গেছে যে আবার কখনো দেখা হবে না! কিংবা বাবার সাথে। আমার বাবা ৮২ বছর পর্যন্ত ছিলেন; তার আগে তিনবছর বিছানায় শুয়ে ছিলেন। সম্ভবত সবচেয়ে যোগ্য পরিণতি হয়েছে। আরও তিন বছর বিছানায় এভাবে অচল হয়ে শুয়ে থাকার চাইতে, যদি আমাকে জিজ্ঞাসা করেন, যুক্তিসিদ্ধভাবে আমি মনে করি তাঁর আরও আগে মৃত্যু ব্লেসিং হতো। কিন্তু ওই যে ধরেন তাঁর কপালে আর হাত দেয়া যাবে না এটার তো একটা অদ্ভুত বেদনাদায়ক অনুভূতি আছে। ওটাকেই বরং! মৃত্যু ছাড়া আমি দেখি না আর কোন দুঃখ শ্রেণী নির্বিশেষে আলাপ করা যেতে পারে; আমি দেখতে পাই না।

 

মনোরম পলক : মানসের মৃত্যুভীতিটা কেমন?

মানস চৌধুরী : কৈশোরে ফ্যান্টাসি ছিল। ফ্যান্টাসি ছিল বলতে কখনো কখনো আমিও এরকম ভেবেছি যে আমি মারা গেছি, মা কাঁদছেন— শুনলে খুবই হালকা লাগে, কিন্তু আমার মনে হয় অনেক মানুষের এরকম একটা জার্নি আছে। এগুলো উচ্চারণে খুব হালকা শোনায়। এবং সত্য যে শৈশবের এই ফ্যান্টাসির ধ্বংসাবশেষ বা অংশবিশেষ যাই বলেন তা রয়ে গেছে এখনও; কিন্তু ওই যে বললাম উচ্চারণে এত লঘু এগুলো। এর বাইরে যদি ভাবনা আকারে বলি তাহলে যদি আমি শৈশবে ভীষণ ঈশ্বর-ভক্ত ছিলাম, এখনো যে তাঁর বিরুদ্ধে তা না বলে বলব এখন সম্পর্কটা কমপ্লেক্স তাঁর সাথে। কারণ এত মানুষ ঈশ্বরকে বহন করেন যে সেই মানুষগুলোর সাথে শত্রুতা বহন করা খুব মুশকিল। আমি বলতে চাইলাম যে যদি আমাকে জিজ্ঞাসা করেন, আমি আসলে অচলাবস্থার আগেই মরতে-পারা মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার হিসেবে দেখি। মুশকিল হচ্ছে, রাষ্ট্র হার্ডলি ক্যান ডু এনিথিং অ্যাবাউট দ্যাট, এক্সেপ্ট ধরে ধরে মেরে ফেলা লোকজনকে। এর ব্যতিরেকে তো রাষ্ট্র ঠিক মৃত্যু বিষয়ে কিছু বলতে পারে না। তাই এটা ঠিক গণতান্ত্রিক অধিকার বলা যায় না; রসিকতা করে বললাম। মৃত্যু নিয়ে আমার ভাবনা হচ্ছে যে চিন্তা এবং দৈহিক সচলতা— এমনকি মধ্যবিত্তদের ক্ষেত্রেও চিন্তা এবং দৈহিক সচলতা— থাকাকালীন সময়ে যদি মানুষ মারা যান, এবং আমি মারা যাই তাহলে আমি গৌরব বোধ করব। আমি আমার বাবার মতো মরতে চাই না। অচল, ভাষাহীন, চিনতে না-পারা এবং চিন্তা প্রসেস করতে না-পারা, গায়ে নানাবিধ ইনফেকশন দেখা দেয়া একটা জড় পদার্থ হিসেবে থাকা; অথচ জড় নন। কিন্তু এটা আমি মনে করি, এটা আমাদের হাতে নেই। এটা খুবই গর্হিত মৃত্যু। এবং যাঁরা সৃষ্টিকর্তার উপর আস্থা রাখেন তাঁদের তাহলে এই বিষয় নিয়ে তাঁর সাথে কথাবার্তা বলা উচিত যে এটা কোন সহিহ্ বিচার মনে হয় না এবং তিনি যেই হোন না কেন।

 

মনোরম পলক : জীবনানন্দকে আপনি যেরকম এ্যাপোলোজিস্টের মতো ব্যাখ্যা করেছেন সেটার কারণ কী হতে পারে? নাকি এরকম যে নগর জীবনটা সচরাচর অ্যাপলোজিস্ট করে দেয়?

মানস চৌধুরী : আমি মনে করি নগরজীবন এ্যাপোলোজিস্ট করে দেয়। এটা খুব ভালো একটা প্রশ্ন আমার জন্য। কিন্তু এটাও সত্য যে তাঁর একটা কবিতায় ছিল ‘বোধ’। আবার ‘বোধ’-এ আমি এক ধরনের টিপ্পনী কেটেছি; তা সত্ত্বেও বলব তিনি বোধহয় বিরল নগর-কবিদের একজন, আল মাহমুদ হবেন আরেকজন, যাঁরা কিনা আসলে জানেন অনুভূতির সাথে একটা যুদ্ধময়তা; কোনো একটা জায়গাতে এসে আমাদের লৌকিক দুনিয়ার সাথে সম্পর্ক। এটা লৌকিক বললাম আমি। মার্কসের ভাষায় বলতে গেলে ‘কেরানি’র। মানে তিনি (মার্কস) কেরানি বলেননি, ম্যানেজারিয়াল ক্লাস বলেছেন— এই ক্লাসে থাকা বা প্রলেতারিয় জীবনে থাকা যে আকাশ-পাতাল তফাৎ! যদিও আমি তাকে মক করেছি, সেটা এই সো কলড আর্টটার মোড অফ এক্সপ্রেশন ছিল, কিন্তু তিনি হলেন বিরল নগর-কবিদের একজন, যাঁরা দফায় দফায় শ্রমঘনিষ্ঠ জীবনযাপনের থেকে দূরে থাকাকে রিয়েলাইজ করেছেন। হয় তিনি ওটাকে নিয়ে সন্তাপ করেছেন, ক্রিটিক করেছেন…

 

মনোরম পলক : ক্রিটিকই করেছেন বলে আমার মনে হয়…

মানস চৌধুরী : …অথবা ওই মায়াটা দেখিয়েছেন, অথবা বুঝতে চেষ্টা করেছেন, এই দূরত্ববোধ খোদ একটা বৌদ্ধিক দুনিয়ার সম্পদ, যেখানে আপনি আমি কিছু প্রডিউস করি না। মানে আমাদের প্রোডাকশন হচ্ছে কবিতা দিয়ে। আমি মনে করি, কবিদের বরং ভিন্ন ভিন্ন চরণে ধরা পড়েছে। কখনো কখনো এই লৌকিকটা শুধু গ্রাম্যময়তায় না। বরং লৌকিক জীবনের শ্রম-ঘনিষ্ঠতা হয়তো আপনি অপেক্ষাকৃত মার্কসবাদী কবিদের কাছ থেকে স্পষ্ট পান। হয়তো তাঁরা ঘোষণাধর্মী বলে। সেটা আমি খাটো করে বলছি না। সুভাষ মুখোপাধ্যায় হয়তো পরিচিত নাম, কিন্তু অন্য কবিদের ক্ষেত্রেও এই যে মাঝে মাঝে লৌকিক জীবনের টান চলে আসে এই যে মায়াটা— মায়াটা এক ধরনের উপলব্ধিও যে আপনি আমি আসলে প্রডিউস করি অশ্বডিম্ব। বেসিক্যালি আমরা তো আসলে শ্রমঘনিষ্ঠ কিছু প্রডিউস করি না। ওইটা কোথাও না কোথাও বাঁকগুলো আছে। ফলে আমি যেমন মক করেছি এ্যাপোলোজিস্টের মতো কিন্তু আবার ওই সজাগতা— ওটা তো তাঁর সজাগতা যে ‘ভালোবেসে দেখিয়াছি’ যেমন বলছেন, আবার বলছেন ‘কাঁধে তুলে কি নিইনি কি চাষার লাঙল?’ তিনি জানেন যে আমাদের এই অনুভূতি একটা সঙ্কট, হয়তো কোথাও না কোথাও জেনেছেন— অবকাশ। দে হ্যাভ টু গো টু দ্য ফিল্ড। একচুয়াল ফিল্ড, যেখানে হাতে কাদা মাইখা কাজ করলেই কেবল…। আমি করি নাই, আপনাকে কেন বলছি! আমি তো পরিশেষে একজন একমপ্লিশড টিচার। আসলে আমাদের বুদ্ধি যদি একটু চালাই, তাহলে আমরা জানতে পারি বাংলাদেশের একজন শিক্ষকের বেতন এই কনটেক্সটে ওভারপেইড। কারণ এখানে তো যদি ব্যাংকের মালিককে কনটেক্সটে না রেখে এখন যদি ওই কাদামাখা লোকটিকে আমি কনটেক্সটে রাখি, তাহলে আমি একজন ওভারপেইড কর্মচারী যে কিনা প্রডিউস করি নাথিং এক্সেপ্ট ওয়ার্ডস— শব্দাবলী। আর কোথাও না কোথাও গিয়ে কিন্তু দেখেন ওইখানে এ্যাপোলজি প্রসঙ্গ আসে; শুধু জীবনানন্দের না, আমাদের শ্রেণীর সকলের। আসলে যে আমরা করি না কিছু, এটা কি কখনোই আপনাকে বা আমাকে হান্ট করবে না? কিছু তো বানাই না আমরা! কিচ্ছু বানাই না, ভৌত দুনিয়ায়। কোথাও না কোথাও আপনি যদি শান্ত মাথায় চিন্তা করেন তাহলে গাঢ় একটা রক্ত হিম করা অনুভূতি হবে! আপনার ২০ বছর, ২২ বছরে বছরে আমার ৫২ বছরে, আই ডিড নট প্রোডিউস এ সিঙ্গেল ম্যাটার। বস্তু দুনিয়ায় কিছু উৎপাদন করেছি? আপনি বলতে পারেন একজন ভাস্কর পর্যন্ত করেন নাই, যতই তিনি পাথরের ওপরের কাজ করুন। ওই অর্থে চিন্তা করলে এটা এমন একটা পুরনো প্রসঙ্গ, মার্কস তো দেখিয়েছেন, ওটাও কিন্তু একটা অদ্ভুত— তার মানে যিনি প্রোডিউস করেন তার বাদে, যিনি প্রডিউস করেন না তাঁরও কিন্তু একটা দর্শন থাকে, যেটাকে আমি অ্যাপোলজি নাম দিয়েছি ঠিকই। তাঁর এক অদ্ভুত বিষাদ থাকতে পারে। একদিন আপনি-আমি চাষার লাঙল কাঁধে তুলে নিতে পারি, কিন্তু অন্য একটা দিন মনে পড়তে পারে অন্য ৫২ বছর চাষার লাঙল কাঁধে তুলে নিই নাই। দ্যাট মে হার্ট ইউ। এবং আমরা অনেক টাকা আয় করি টু দ্যাট এক্সটেন্ট…

 

মনোরম পলক : পার্সপেকটিভের ব্যাপার কার সাথে কম্প্যায়ার করছেন? ঐ যে হাইটের মতো—
(সম্ভবত হাইটের বিষয়টা ছিল এই যে, পলকের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ-পরিচয়ে মানস বলেন যে পলক বেশ লম্বা, আর পলক জানান যে তিনি মানসের থেকে লম্বা নন)

মানস চৌধুরী : একদম একদম। হা হা হা হা! তখন যদি আপনি সংবেদনশীল হন— এটা তো আমি জানি না আল্লাহ পাঠান নাকি আমরা অর্জন করি, সংবেদনশীল হওয়া— তখন আপনার বেদনাবোধ হবে পলক। আপনি যখনই লেগুনার ১৫ বছরের বাচ্চাটার সাথে যোগাযোগ করবেন তখন তো আপনার বেদনাবোধ না হওয়ার কোন কারণ দেখছি না। আপনি বেদনাবোধ বদলাতে পারবেন কি না, এই বেদনাবোধ বুর্জোয়া কি না সেটা নিয়ে একটা তর্ক হতে পারে। কিন্তু বেদনাবোধের যে উৎস এবং তার যে বিকাশ সেটা তো খুব জেনুইন হওয়ার কথা। এই নিয়ে আমি তর্কে রাজি না এটা যে বুর্জোয়া বেদনাবোধ কিনা, এটা দিয়ে আপনি কি করবেন! ‘আপনি কি মঙ্গলময় হয়ে উঠছেন!’, ‘এটা তো প্রকৃত মার্ক্সিস্টের ধর্ম নয়’— এগুলা নিয়ে সম্পূর্ণ আলাদা আলোচনা করা যেতে পারে। কিন্তু যখন আপনি আপনার কাছাকাছি বয়সের একজন বাস কন্ডাক্টরকে দেখবেন আধা ঘুমচোখে, যেটা কিনা মধ্যবিত্ত যাত্রীদের চোখে হিরোইঞ্চি চোখ। সেটা মূলত কম ঘুমের চোখ। কারণ উনি রাত দুটোর সময় গাড়ি পরিষ্কার করেন এবং ছয়টার সময় গাড়ি বের করেন। এটাই তাঁর জীবন। কম খাবার, অধিক গালাগালি। এটা বোঝার জন্য আমাদের রকেট সাইন্স জানা লাগে না। তিনি হিরোইঞ্চি হন বা না হন তিনি অলরেডি একটা ক্লান্তির জীবন যাপন করছেন। সাধারণত আপনার বয়সী কন্ডাক্টররা, তাই আপনাকে এভাবে বললাম। পাবলিক বাসের কন্ডাক্টরের সাথে দেখার পরে— যদি আপনি সংবেদনশীল মানুষ হন, কোথাও যদি আপনার বেদনাবোধ দেখা দেয় এবং সেই বেদনাবোধ নিয়ে আপনি এ্যাপোলজিটিক্যাল কবিতা লেখেন সেটা তো বিচিত্র কিছু না। এটা আমার পয়েন্ট ছিল আসলে।

 

মনোরম পলক : আপনার নিজের নাগরিক জীবনের একটা ইমেজ দাঁড় করান। দেখতে চাই যে মানস এর নগর জীবনটা কিরকম।

মানস চৌধুরী : আমি খুবই ঘরকুনো। ঘরকুনো বলতে আমি বছর ১০-১২ বছর বিবাহিত তার আগের ৪০-৪২ বছর আমি অবিবাহিত— এই সময়টাতে নির্বিশেষে ঘরকুনো বলতে বোঝায় যে আমার সার্কেল নেই। আচ্ছা সার্কেল নেই শব্দ টা বলতে গিয়ে আবার মনে হলো বিষাদ প্রকাশ পেল কি না। আমি বলতে চাচ্ছি সার্কেলের যে ধর্ম থাকে— আপনি মেহেরপুর, আপনি জগন্নাথ, আপনি ২২, কথার কথা, আপনি চুল রঙওয়ালা, আপনি গিটারওয়ালা— এই বর্গগুলোইতো আমাদের সার্কেল নির্দিষ্ট করে। নিশ্চয়ই আপনি মানবেন। হয়তো আপনি কিছু দিনের মধ্যেই সাংবাদিকওয়ালা হবেন। এই যে আমাদের সার্কেলগুলো এগুলো তো নাগরিক ডিসকোর্সের মধ্যেই তৈরি হয়। যেভাবেই হোক না কেন আমি বাম রাজনীতি করা, আমি থিয়েটার করা, আমি তথাকথিত ভালো রেজাল্ট করা, আমি জাহাঙ্গীরনগরওয়ালা, মেহেরপুরওয়ালা, তার আগে বরগুনাওয়ালা— সবই তো সত্য। কিন্তু কোনো একটা সার্কিটে অবারিতভাবে আমার যাওয়া হয়নি। আমার মতে নগরের যে পরিচয়গুলো আছে বিশেষ করে ঢাকা মহানগরীর পরিচয়গুলো বিশেষ ডিসকারসিভ মানে আলাপচক্রীয়। ধরুন, কথার কথা, আপনি একজন প্রতিবাদী কি না তা তো কেবলমাত্র তোপখানা বা শাহবাগে দেখা গেলেই সম্পন্ন হতে পারে! আপনি থিয়েটারকর্মী কি না তাহলে তো আপনাকে শিল্পকলা দেখতে পেতে হবে। আমি বলছি যে তার একটা ভৌত দুনিয়া আছে, তার একটা আলাপ দুনিয়া আছে। ‘আমরা যারা চলচ্চিত্র সংসদ কর্মী’— এই যে বলার মধ্যে দাবিনামাটা উত্থাপিত হবে। বলবার মাধ্যমে আমি তো মক করলাম না? ‘আমরা যারা রবীন্দ্রসংগীত পছন্দ করি’— এই যে ‘আমরা’র একটা বোধ থাকতে হবে। আপনি আশাকরি বুঝছেন আমি কোন জায়গায় বোঝাতে চাচ্ছি। ‘আমরা যারা বাম’— এই যে ‘আমরা’র বোধ সেটাকে ডিসকোর্স বলছিলাম; আর বলছিলাম এর একটা ভৌত দুনিয়া আছে। আপনি যদি কোনো কারণে রক-লাভার হন, দেয়ার আর প্লেসেস ইন ঢাকা দ্যাট ইউ এক্সপেক্ট টু গো টু; এটলিস্ট টু বি এ পার্ট অফ দ্যাট। সেই অর্থে বলতে গেলে ভৌত দুনিয়ায় এবং ভাষার দুনিয়ায় আমাদের এই গোষ্ঠীগুলো নির্ধারিত হয় নাগরিক জীবনে, নগর পরিচয়ে। এবং আমি চোখ বুঁজে বলতে পারি আমি বাইশে যেমন, বায়ান্নতেও তেমনি, আমি ভৌত দুনিয়ায় কোথাও তেমন নড়াচড়া করি না। এটা আসলে পছন্দ-অপছন্দের ব্যাপার না।

 

মনোরম পলক : হ্যাঁ।

মানস চৌধুরী : কোনো একটা বিশেষ সার্কেলকে আমার সার্কেল বলে আমার মনে হয় না। এটুকুই বলি! এই যে কাজল ঘটনাচক্রে আপনার বাবা, ঘটনাচক্রে আমার ছোটোবেলার বন্ধু আরও আগে থেকে, উনি মৈত্রী করতেন— দেখা হওয়ার কথা, কিন্তু আমাদের দেখা হয়নি। এ ব্যাপারটা ম্যাটার করে নাই। আজকে যখন কাজলের সাথে দেখা হবে, গুরুতর কোনো ভিন্নতাও তা তৈরি করবে না। আমি কি বোঝাতে পারছি? এটাই আমার পদ্ধতি। এটা করতে গিয়ে যেটা হলো আমি নাগরিক মানুষকে কীভাবে দেখি— একটা পর্যায়ে আমার বিবেচনায় আমি যা ভেবেছি তার থেকে অনেক বেশিই লোকজন আমাকে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষক মনে করেছেন। আমি মনে করি সেটা যতটা আমার শিক্ষকতা গুণ তার থেকে অনেক বেশি হতে পারে আমার বাচনভঙ্গি। ফলে যেটা হয়েছে আমি লেকচারার থাকাকালীনই লোকজন ডাকেন, কিংবা বলেন ‘আপনি তো ইত্যাদি ইত্যাদি’। ঢাকার যে ভার্বাল দুনিয়াতে আমি আছি, সেটা একটা সময় গৌরব দিয়েছে, আবার অস্বস্তি দিয়েছে। কোনোটাই ম্যাটার করে না। আমি নিজেকে একজন ঘটনাচক্রীয় কথক হিসেবে দেখি। একজন অরেটর এবং ঘটনাচক্রে আমি চাকরিটা করি অরেশনের যদিও কিনা অরেটর হওয়া বাংলাদেশে মাস্টারি করার কোনো যোগ্যতাই না। বাংলাদেশের মাস্টারের যোগ্যতা নিয়ে স্বতন্ত্র আলাপ হতে পারে। কিন্তু মুখ দিয়ে কথা বাইর হইতে হয় এরকম তো কোনো প্রমাণের সুযোগ নাই। আপনি তো পড়েন একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে, আপনি দেখেছেন কারা শিক্ষকতা করেন। কিন্তু ঘটনাচক্রে আমি নিজেকে কথক ভাবি এবং ঘটনাচক্রে আমি একটা কথকের-ই চাকরি করি, প্রভাষনা দিয়ে শুরু। এর বাইরে আর আমি খুব বেশি সজাগ না আসলে। আমি বুঝতে পারি কেউ কেউ আমাকে গুরুত্ব দেন না, কেউ আমাকে প্রয়োজনের তুলনায় গুরুত্ব কম দেন, কিন্তু এগুলো সবই পার্ট অফ দ্য পার্সেল। পলক, আমি কি পরিষ্কার করতে পারলাম? এই যে কেউ হয়তো শুধুমাত্র আমার বাচনভঙ্গির কারণে আমাকে গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞানী মনে করেন; হতে পারে সেটা যেমন অধিক মূল্য প্রদান, কিন্তু অন্যদিকে যেটা মনে করেন একটা ফ্লাট দাম হবারই কথা সেটা কেউ আবার দেন না— কথার কথা। এগুলো আমি বলতে চাচ্ছি, একটা অঞ্চলে একসাথেই কাজ করে। আলাদা করে দুটোর কোনটাই ম্যাটার করে না। অধিক মূল্য বা কম মূল্য! পরিশেষে আমি একজন চাকুরীজীবী যে কিনা ঘটনাচক্রে কথা বলতে জানি। এভাবে করে নিজেকে দেখি আসলে।

 

মনোরম পলক : শূন্যতার যে বোধটা, সেটা কি নানা রকম অনিশ্চয়তা থেকে আসে?

মানস চৌধুরী : গৌণতার বোধ অনিশ্চয়তা থেকে আসে। আমার নিজের কৈশোর যৌবন থেকে বিশ্লেষণ করলে আরও নিশ্চিতভাবে বুঝতে পারি। যে গৌণতার বোধ আসে অনিশ্চয়তার বোধ থেকে। প্রথম বিষয় হচ্ছে নগর অঞ্চলে যশ-খ্যাতি এসবের যে ব্যাকরণ তা বেশি উদ্ঘাটিত না। উদঘাটিত না কেন বলছি— আপনি যদি সাইবার স্পেসেও দেখেন দেখবেন যে এটা সবচেয়ে পরিচিত আলাপ যে অমুকের লেখা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ না হওয়া সত্ত্বেও পুরস্কার পেয়েছে। আপনি যদি এই অধ্যায়টা খেয়াল করেন, মূলভাবটা কী! তাহলে দেখেন যাঁরা কিনা পুরস্কারের পাত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তাঁদেরও সিংহভাগ পুরস্কারের ব্যাকরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন না। তুলছেন হচ্ছে কার পুরস্কার পাওয়া উচিত সেই প্রসঙ্গে, খেয়াল করেছেন? এটা তো একটা তুলনামূলকতা। ফলে দেখা যায়, উভয় পক্ষের আলাপ ভিত্তিতেই, সিংহভাগই ওই প্রতিষ্ঠানের পুরস্কার প্রদান সামর্থ্য অথবা প্রয়োজনীয়তা অথবা অকার্যকরতা নিয়ে প্রশ্ন করছেন না। ঢাকা শহরে ফ্লাট সকলেই আপনার নোবেল পুরস্কার পেলে এক ধরনের চঞ্চল হয়ে ওঠেন পরের দিন, একটা প্রবন্ধ লেখার জন্য। কেউ কেউ আবার দাবি করেন ‘এই লেখকের লেখা আমার কাছে আছে; আমি আরও আগে থেকে পড়ছি, নোবেল পুরস্কার পাইতেই হয়নি।’ আমি বই আর আর্টকে কিন্তু একটি বর্গের মনে করি, গুরুত্বের লড়াইয়ের দিক থেকে। সাহিত্য দুনিয়ার কথা বলেন বা চিত্র দুনিয়ার কথা বলেন, আমি বলছি, উভয় আলাপের কোনো গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য নেই আসলে। দুটোই আসলে পরিশেষে গুরুত্বের হকদার এবং বেহকদার-এর তর্কাতর্কির উপর দাঁড়ানো।

আমি বলতে চাচ্ছি, যে যশলাভের যে ব্যাকরণ তার তো নিজস্ব একটা ধর্ম আছে। আমি এখান থেকে দেখতে পাই যে আমরা এমন একটা সময়ে বসবাস করি বা এমন এক দুনিয়া, সেখানে আপনি হয়তো মন্ত্রীসভার অর্থমন্ত্রীর নাম পর্যন্ত বলতে পারবেন না। বিগত আমলের হলে চারজন মন্ত্রীর নাম মুখস্ত বলতে পারবেন না। আপনি এবছরের লাক্স বিজয়ী হোন বা অমুক হোক বা বাংলাদেশের মিস্টার বাংলাদেশ হোন— যদি কেউ হয়ে থাকেন— তাঁর নাম জানেন না। সত্যি করে বলতে গেলে বাংলা একাডেমি পুরস্কার কে পেলেন সেটা পর্যন্ত আমরা মুখস্ত করি না। এবং ইট হার্ডলি ম্যাটারস।

 

মনোরম পলক : ইয়েস ইট হার্ডলি ম্যাটারস।

মানস চৌধুরী : কোথাও কোথাও আমাদের মাথা আচ্ছন্ন হয়ে যায় যেখানে কিনা আমরা এগুলোকে প্যারামিটার ভাবতে শুরু করি। ফলে আমার মনে হয় গৌণতার বোধ শুরু হয় নানান রকম ইনসিকিউরিটি থেকে। কিন্তু বাস্তবতা হলো এই যে বিভিন্ন এলাকাতে গত বারের সাংসদ যিনি তাঁকেও কেউ খেয়াল না করে একটা চেয়ার এগিয়ে না দিল— এরকম হতে পারে। আমাদের যাপিত জীবনটা যদি আমরা খেয়াল করি, তাহলে আপনার ইনসিকিউরিটি থাকার কোনো কারণ নেই। আমি আশা করি পরিষ্কার করতে পেরেছি। কিন্তু আমরা যাপিত জীবনটাকে আমাদের তদন্ত করতে অনেক ভুল হয়; মানে অন্যমনস্কতা থাকে। তা না হলে আমরা খেয়াল করতাম, আপনি যদি দেখেন, এখন যদি ফজলে লোহানী সাহেব যিনি কিনা মরহুম, তাঁকেও যদি আপনি একটা জমায়াতে ছেড়ে দেন, হতে পারে উইথ ডিউ রেসপেক্ট, উনি হানিফ সংকেতের আশেপাশে তো নাই-ই এবং হতে পারে তিনি ভিড়ের মধ্যে একটি চেয়ার পেলেন না। দেন হোয়াট? এই হিস্টরিসিটিটা তো আছে যশের। তার মানে দেখেন, ফজলে লোহানীর মত এরকম একটা লেগেসিও, বা কাজী সব্যসাচী— যাঁর কথা বললাম— সেই লেগেসিকেও বর্তমানে আপনি যে ক্যাম্পাসে থাকেন সেখানে যদি জ্যান্তও ছেড়ে দেওয়া হয়, তিনি আনরিকগনাইজড অবস্থায় ক্যাম্পাস থেকে বের হয়ে যাবেন। আমার প্রশ্ন হবে তাহলে এটা নিয়ে বদার্ড হওয়ার কী আছে? এই যে বদার্ড হবার কী আছে— এই অংশটা বোধহয় দার্শনিক অংশ। এবং মেথডিক আমি বদার্ড নই, অন্য অনেকেই বদার্ড।

 

মনোরম পলক : আমি মূলত বলছিলাম শূন্যতার বোধ নিয়ে।

মানস চৌধুরী : শূন্যতার বোধ ইনসিকিউরিটি— আমি আমার বক্তব্যে বলেছি— বলে আমি মনে করি। আর শূন্যতার বোধ যদি মৃত্যু হয়, মৃত্যুভীতি হয় তাহলে আমি খুব আলাদা করেই দেখব।

 

মনোরম পলক : না মৃত্যু না, শূন্যতাটাই। এটা আসলে খুব স্পেসিফিক প্রশ্ন না।

মানস চৌধুরী : বলছি শূন্যতা বোধ তো আবারও ইন্টারপ্রেটেশন-সাপেক্ষে। ধরেন, কথার কথা, আপনি জমিতে চাষ করলেন, আর মধ্যরাতে কেউ পাকা ফসলে আগুন দিয়ে দিল অথবা আপনি কাঁচাবাজারে যোগাযোগ করে দেখলেন যা পাচ্ছেন তার সাথে আপনার উৎপাদন ব্যয়ের খুব সামান্যই পার্থক্য। আর আপনার শ্রম তো গেছেই। এই লোকটার শূন্যতাবোধ আদৌ কখনো আমরা অনুভব করতে পারি কি তার প্যারালাল সিচুয়েশনে? আমার কথা শুনতে পাচ্ছেন, পলক?

 

মনোরম পলক : হ্যাঁ। আমার আসলে একটা টেকনিকাল প্রব্লেম আছে। ভিডিও আটকে যায়। কিন্তু আমি আপনার কথা সবসময়ই শুনতে পাবো।

মানস চৌধুরী : আমি বলছিলাম যে উৎপাদিত ফসল আগুনে পুড়ে যাওয়া, উৎপাদিত ফসলের দাম কমে যাওয়ায় মানে শ্রম তো গেলোই, লগ্নিও উঠল না— ওই লোকটাকে আমি কল্পনা করার চেষ্টা করছি তাঁর কেমন শূন্যতা লাগে। লোকটা বা পরিবারটা। আপনি খবরে শুনে থাকবেন কোনো সময় উৎপাদিত পাট দিয়ে দড়ি বানিয়ে সেটা দিয়ে আত্মহত্যা করা, কিংবা কৃষক তাঁর পেঁপে লাঠি দিয়ে পেটাচ্ছেন, বাজারে এর দাম শুনে। এটার নাম শূন্যতাবোধ দেবেন, না কী দেবেন আমাদের তো ভাবতে পারতে হবে! নাম দিতে হবে তো এই অনুভূতিটার! আমি বলতে চাচ্ছিলাম, ফলে, শূন্যতা বোধও এমন একটা শব্দ দ্যাট রিকোয়ের্স ইন্টারপ্রিটেশন। সে অর্থে বলছি, যে কোনো কারণে মানুষের অনাগত মৃত্যু, কিংবা নিজের মৃত্যু, মানুষের ইতোমধ্যে হয়ে যাওয়া প্রিয়জনের মৃত্যু— এটা যদি শূন্যতাবোধের সাথে কানেক্ট করি, আই হ্যাভ ভেরি লিটল টু সে। এটা একটা অনুভূতি যেটা আমি আগেও বলেছি খুবই কদর করবার, খুবই গুরুত্ব দিয়ে বলবার এমন কিছু। আর যদি আপনার এই আনডিফাইন্ড মধ্যবিত্ত শূন্যতাবোধ হয় তাহলে আমি দূরে থাকার চেষ্টা করব। আমি বলব যে ‘ভাই তুই বসে থাক গে একটা শূন্য নদীর কিনারে।’

আর যদি একটু আগে যে আমাদের পেঁপেতে লাঠিপেটা-করা অথবা পাটের দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা-করা কৃষক কিংবা এই মুহূর্তে, ধরেন কথার কথা, খুলনার পাটকল শ্রমিকদের শূন্যতাবোধ। আমি জানি না এই মুহূর্তে রিলেট করতে পারেন কিনা। যদি আমরা শূন্যতাবোধ শব্দটার সাথে রিলেট করে থাকি, তাহলে তো আসলে আমরা রিলেট করছি শব্দ দিয়ে, আমি তো অনুভূতি দিয়ে রিলেটও করতে পারি না। বড়োজোর ৫৩ দিনে কাজলের অনুপস্থিতির সময় আপনার কেমন লাগছিল সেটা ভেরি লাইটলি ভাবার চেষ্টা করতে পারি। কিন্তু পাটকল বন্ধ হয়ে গেল, ছয় মাসের বেতন নাই— আমাদের এক শূন্যতাবোধের মধ্যে যদি এগুলো আনতে চাই, তাহলে তো আমাদের নিজস্ব হোমওয়ার্কের প্রয়োজন আছে। আদৌ আমরা ঐ অনুভূতিটা রিলেট করি কিনা সেটা বলছিলাম। আমি মনে করি না, এই শব্দগুলোকে শুধুমাত্র এর ফেসভ্যালুতে ছেড়ে দেয়া যাবে। আমার তো মাঝে মাঝে রিকশার উপর বসে থাকা যে লোকটা— রিক্সার উদাহরণ দেয়াটা খুব প্রাসঙ্গিক কারণ এটা একদম এক্সক্লুসিভ ফিজিক্যাল লেবারের একটা কাজ— ওই যে রিক্সাওয়ালা পা তুলে বসে আছেন, এক ধরনের বিশ্রামের ভঙ্গিতে; প্রচুর মধ্যবিত্ত তাঁদের অ্যারোগেন্সের গল্প বলেন, আমি অভিজ্ঞতা করেছি; এটা স্বতন্ত্র প্রসঙ্গ। কিন্তু আপনি যখন তাকিয়েছেন, তার আগের তিন ঘন্টার ক্লান্তি দেখলেন— ওই চোখের নাম দিলাম আমরা শূন্যতা, শ্রমক্লান্তির শূন্যতা! সেই জন্যই বলছি, আমাদের লিবেরেল বুর্জোয়া সাহিত্যচর্চায় একটা ঝামেলা আছে। আমরা ধরেই নিচ্ছি যে শূন্যতা বললে আপামর বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার মনুষ্য জগতের একটা অখণ্ড অনুভূতিকে ধরা যাচ্ছে। কিন্তু আমি মনে করি না যে সেটা সম্ভব।


অলংকরণে ব্যবহৃত মানস চৌধুরীর ছবি তুলেছেন শাহাদাৎ স্বাধীন

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

জন্ম ১৭ নভেম্বর, ১৯৯৯; ঢাকা । জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত; "Where Is Kajol?" এর প্রতিষ্ঠাতা।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।