রবিবার, নভেম্বর ২৮

মানস চৌধুরীর সাথে মনোরম পলকের আলাপ : শেষ কিস্তি

0

Manos Chowdhuryবয়সের একটা মানে হচ্ছে প্রায়োরিটির সম্পাদনা বদলানো — মানস চৌধুরী


সাবঅল্টার্ন চিন্তার সীমানা, এলিটিজমের ব্যাকরণ, কবিতা ও কবিতা পাঠ, দুই বাংলার সত্তা— ইত্যাদি নানা বিষয়ে মনোরম পলক ২০২১ সালের মার্চ মাসের ৫ তারিখ কথা বলেছেন মানস চৌধুরীর সঙ্গে। আজ রইল পুরো আলাপের শেষ কিস্তি।


তৃতীয় কিস্তির পর…


মনোরম পলক : আপনি বললেন অবকাশযাপন ছাড়া এই অনুভূতির কোনো মূল্য থাকে না। কিন্তু ক্লাস ভেদে এই অবকাশটা একেক রকম।

মানস চৌধুরী : একেক রকম এবং কোনো কোনো শ্রেণীর নেই।

 

মনোরম পলক : সেখান থেকেই প্রশ্নটা। আপনার কি মনে হয় আমাদের বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থায় তলানিতে যে ক্লাস পড়ে বা পড়ে বলে আমরা ধারণা করি তাদেরকে কি জীবনে অবকাশযাপনের কোনো অবকাশ আছে? তারা জীবনানন্দ দাশের সাথে বাহাসটা কীভাবে করে?

মানস চৌধুরী : প্রথম বাহাস হচ্ছে যে স্বপ্ন নয়, শান্তি নয়। এই শব্দগুলো শুধু ব্যাপার না, বিষয়টা হলো গিয়ে ধরা যাক আমাদের মাচার দুনিয়া। আমি সতর্ক থাকি আমাকে যাতে ট্রেডিশনাল— যে আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম— এই তত্ত্বের লোক মনে না হয়। আমি নই, আমি শুধু বলছি যখন লোকসমাজ গ্রামসমাজ জাগরুক ছিল এই আধুনিক পুঁজিবাদের আগে, মাচার আড্ডাটা কিন্তু শুধুমাত্র সাহিত্যের প্রসঙ্গ নয়। গ্রামে গ্রামে, এক গ্রামে একটাও না হয়তো; একটা টং সেখানে পা ঝুলিয়ে লুঙ্গির অর্ধেক তুলে হয়তো পুরুষকেন্দ্রিক, কিংবা ধরেন কোনো উঠানে নারীদের ঢেঁকিকে কেন্দ্র করে সামাজিক বাক্যালাপের ক্লাবিং ছিল। দুষ্টুমি করে এই নাগরিক শব্দটা দিলাম। এই যে ক্লাবগুলো ছিল মাচায় বসে একটা হুক্কা নিয়ে চলছে, কাউকে কাউকে বাসা থেকে ডাকতে হচ্ছে— আমি বলতে চাচ্ছি যে কৃষিজ ভীষণ শ্রম, আবার কৃষিজ শ্রমের যে অবকাশ, সেটা। এই আপনি বসন্তকালে কীর্তন বলেন, কীর্তন মানে কিন্তু একদম শ্রীকৃষ্ণ নাম; কিন্তু কীর্তনটা তো গাইছেন ওই কৃষকই— তাঁর তখন অবকাশ আছে, নবান্ন তো যিনি করছেন তিনি কৃষকই; তাঁর তখন অবকাশ আছে। ফসল ওঠার পরে তাঁর তো আবার এসব ফুর্তির কাজও ছিল। বেসিক্যালি আমার চাচাও কীর্তনে বের হতেন। যাঁর কৃষ্ণ-প্রেম ছিল, যাঁর নারীর প্রেম ছিল, যাঁর যে প্রেম আছে তিনি সেদিক দিয়ে যাবেন এবং তাঁর তো সেই সময়টুকু আছে। এবং নামাবলী কীর্তনের প্রধান মৌসুমই হচ্ছে ফসলের পরের মৌসুম। শুকনা একটা ফসল উঠে গেছে এবং সবই কিন্তু কৃষিজ গেরস্থ। এবং গ্রামীণ অন্যান্য ফর্ম— যাত্রাপালা বা সংযাত্রা বলেন, ধামালি বলেন— সবই কিন্তু কৃষিজ শিডিউলের সাথে সম্পর্ক ছিল। ফসলী শিডিউলটার পরেই কিন্তু এটা আসছে। এর অন্য মানে হলো, এটুকু বলা পর্যন্ত নিরাপদ হবে কোনো সরলীকরণের আশঙ্কা ছাড়াই যে, আধুনিক পুঁজিবাদ এমনকি অন্ত্যজ শ্রেণীর গরিব শ্রেণীরও আরও বেশি অবকাশকে খেয়ে ফেলছে। মানে তাঁর যে সামাজিক অবকাশ ছিল— সেটার ঢেঁকিপার কেন্দ্রিক হোক, হয়তো তাতে করে ধান ভানতে একটু সময় লাগবে বেশি, কিন্তু একটা আড্ডা হতো ওই নারীদের মধ্যে; এবং মাচাতে, টঙে।

একদম এক্সট্রিম রায়ট ধরনের পরিস্থিতি ছাড়া তার মধ্যেই হতো, নেগোসিয়েশনগুলো ছিল। আধুনিক পুঁজিবাদ আপনাকে ওইখানে একবার খায় কারখানায় লেবার, আরেকবার লেবার খায় হয়তো মার্কেটে এসে এবং প্রচুর লোক আছেন যাঁরা কৃষির পরের সময়টা দেন ঢাকায় রিকশা চালিয়ে। তার মানে এক মৌসুমে তাঁরা কৃষিজ মজুর, আরেক মৌসুমে তাঁরা ঢাকা শহরের এক্সট্রাঅরডিনারি প্রলেতারীয় লেবারার। এই বদলটা দেখার জন্য আপনার আমার তো রকেট সাইন্স জানা লাগছে না। তার মানে তাঁর শ্রমের আর অবকাশের আরো দখল। ঠিক একইভাবে গার্মেন্টসে যে নারীরা কাজ করেন, এক প্রজন্ম আগে তাঁর মায়েরা বাসায় রান্না করতেন। কিন্তু আপনি তো বলতে পারছেন না যে গার্মেন্টসের শ্রমিক বাসায় রান্না করেন না। তার মানে গৃহস্থালী লেবার এবং গার্মেন্টসের লেবার— এই জেনারেশনে এসে তাঁকে দুটি শ্রম প্রয়োগ করতে হচ্ছে। তাঁর আগের প্রজন্মের প্রয়োগকৃত শ্রমের দ্বিগুণ অন্তত। এইটুকু দেখার জন্য আপনার আমার কিন্তু ফিন্যান্স কিংবা নৃবিজ্ঞান বা কম্পিউটার সাইন্স কোনো শাস্ত্রই বাধা না। এটা কমনসেন্সেই দেখা সম্ভব। ফলে আমি মনে করি আপনি তলানি বলছেন যেটাকে অর্থাৎ প্রলেতারীয় শ্রেণীর জন্য, অন্ত্যজ শ্রেণীর জন্য, অপেক্ষাকৃত শ্রমঘনিষ্ঠ শ্রেণীর জন্য, দিনকে দিন নতুন পুঁজিবাদ আরও বেশি তাঁর অবকাশের সামাজিক এলাকাগুলো সঙ্কুচিত করেছে। এটা বলার মাধ্যমে ‘আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম’— এই ধরনের কোনো নস্টালজিয়া বা রোমান্টিকতা আমি বলিনি। আমি বলছি শুধু নতুন পুঁজিবাদের শ্রম শোষণ সামর্থ্য আরও বেড়েছে।

 

মনোরম পলক : তাহলে কি জীবনানন্দ দাশ শুধু নির্দিষ্ট শ্রেণীকে সার্ভ করল না? তাদেরকেও করল?

মানস চৌধুরী : ঠিক আছে! মানে কবিদের শ্রেণী তো আমাদের শ্রেণী! আমার মনে হয় না যে সত্যি সত্যি এতটা দীর্ঘকাল তাঁকে নিয়ে চাইবো না বসে থাকতে। কারণ পরিশেষে ধরেন আমাদের এই পারফর্মিং আর্টগুলো— জীবনানন্দ দাশ কেন শুধু, জীবনানন্দ দাশ হোন, মেঘমল্লার রাগ হোক বা, কথার কথা ভীমসেন যোশীর গান হোক, এমনকি ইন দ্য এন্ড ফিল্মের যদি প্রোডাকশন না থাকতো তাহলে তো এমন কি এ আর রহমানের মিউজিকও তাই; তিনি ফিল্মের প্রোডাকশন হওয়ার কারণে আরও বেশি লেবারার ক্লাসে কনজিউম করতে পারেন। কিন্তু আদারওয়াইজ সঙ্গীতশাস্ত্রীয় যোগাযোগও, যেগুলো আমরা পরিচিত, মধ্যবিত্ত। সবই পরিশেষে ক্লাস প্রোডাক্ট। মানে ফর দ্যা ক্লাস, বাই দা ক্লাস— ডেমোক্রেসি থেকে দুষ্টুমি করে যদি বলি; ফর দ্যা পিপল বাই দ্যা পিপল অফ দ্য পিপল, এরকম বলেনা! আমাদের এই কালচারাল ইন্টেলেকচুয়াল আউটলেট হচ্ছে বাই মিডলক্লাস, ফর মিডলক্লাস, অফ মিডলক্লাস। এটা বললেই বরং মুম্বাইয়ের একটা ঘোষণাপত্র মনে হতে পারে না, বললে বরং এটা বোঝাই যায়। উচ্চারণ করলে একটু বেশি প্রপাগণ্ডিস্ট মনে হতে পারে, কিন্তু এটাই তো আমাদের আর্ট কালচারের পুরা দুনিয়া। “বাই, ফর, অফ আস।” ফলে আমি মনে করি না যে শুধু জীবনানন্দ দাশ এত সময় আপনার বা আমার ডিজার্ভ করেন এই প্রসঙ্গে। এটা তো আমাদের টোটাল কালচারের বা ইন্টেলেকচুয়াল প্রোডাক্টের আউটলেট।

 

মনোরম পলক : আপনার এইবারের ছবি মেলায় আর্টিস্ট হিসেবে সংযুক্ত হওয়ার গল্পটা একটু বলেন।

মানস চৌধুরী : হাহাহাহা! এটা হচ্ছে যে যদি বলি আমাদের দুজনেরই বান্ধব জিহান-এর কৃতিত্ব বা যাই বলি, যদি কৃতিত্ব হয়। জিহান হচ্ছে কি, আমি তো ওঁকে চিনতাম না, প্রফেসর ঢালী আল মামুনের নিমন্ত্রণে আমি একটা জুম, ওঁরা বলেছেন ক্লাস বা বক্তৃতা, আমিও তাই বলি— ক্লাস বা বক্তৃতা তাতে কিছু আসে যায় না— একটা, ফাইন আর্টস শিক্ষার্থীদের জন্য দিই। শিক্ষার্থী ছাড়াও কয়েকজন শিক্ষক ছিলেন। জিহান তার মধ্যে ছিলেন শ্রোতা। তখন থেকেই আমি জিহানকে বা জিহান আমাকে চেনেন। তার আগে আমাদের কোনো চাক্ষুষ যোগাযোগ ছিল না। ঢালী আল মামুন আমাকে নামে চেনেন; আমি তাঁকে তাঁর যোগ্যতার কারণে চিনি। এরকম একটা যোগাযোগ আমাদের আছে, বন্ধুত্ব যদি বলি। এবার জিহান যখন এটা কিউরেট করবেন, ও পরিষ্কার বলে বসলেন আপনার কাছ থেকে কিছু চাই।

হা হা হা! সত্যি সত্যি বলি পলক, আমাকে কেউ আর্টের কোনো কিছুতে কেউ চাইছেন এটার মানে হলো আমাকে প্রথম আদৌ যদি কেউ চান, জীবনে যে দু-চার বার ঘটেছে, আমি ধরেই নিই আর্ট ক্রিটিক হিসাবে চাইছেন। মানে আমি একটা সমালোচনা করব, এটার জন্যই কেউ চাচ্ছেন। আর কোনো ভাবে কেউ চাইতে পারেন, এটা আমি ভাবি না। আর জিহানের ক্ষেত্রে যেটা সুবিধা হলো, ওঁর দৃষ্টিভঙ্গি আরও প্রসারিত হবার কারণে, ও যেহেতু কিউরেটর হিসেবে ইতিমধ্যেই স্থপতি, আঁকিয়ে, গল্পবলিয়ে সকলকেই আগে জীবনে জড়ো করে ফেলেছিলেন, ওঁর জন্য আলাদা করে একজন আর্ট ক্রিটিক খুঁজছেন কিনা সেটা অত বড় গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিন্তু আমি যখন এর আগে দু-একবার নিমন্ত্রিত হয়েছি কোনো একটা চিত্রকলা শিল্পকলার দুনিয়াতে, আমি মূলত ক্রিটিকের জায়গা থেকে নিমন্ত্রিত হয়েছি। তার মানে তো আমি তখন ক্রিটিক। জিহানই বরং ক্রিটিক আর অক্রিটিক এর জায়গায় ভাবেন নাই। এটা যখন আমি বুঝলাম যে আমি ক্রিটিক করি আর যাই করি এটাই আসলে ওঁর এক্সিবিশনের বিষয়বস্তু প্রদর্শনী বা ইনস্টলেশনের অংশ হবে; এটা বুঝতে পেরে আমার রেস্পন্সিবিলিটি বাড়লো, কিন্তু আবার নার্ভাসনেসও বাড়লো। কারণ জিহান আমাকে দামী মনে করলেন, আর আমি যদি কমদামী সাব্যস্ত হয়ে পড়ি! এটা তো জিহানের কাছে দাম, মানে দাম বাজারের দাম না। জিহান আমাকে মনে গুণী করলেন, আমি যদি ওঁর কাছে কম গুণী হয়ে পড়ি! আপনি আশা করি বুঝবেন যে কৌতুকের বাইরেও এর একটা গুরুত্ব আছে। আপনার যদি কখনো মনে হয় ‘মানুষ আমাকে বুদ্ধিমান ভেবেছে, কিন্তু আমি যদি পাছে মানুষের কাছে কম বুদ্ধিমান হই’ এরকম। ফলে আমি জিহানের কাছে আমার দাম, ওই অর্থে দাম, নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ি। মানে অনেকদিন পর— এরমধ্যে আবার অন্য কিছু প্রতিশ্রুতি ছিল যেগুলো শেষ করতে হয়; কিন্তু পরে যখন আমি এক টানেই কথাটা বলেছি, যেটা শুনেছেন ওই ৯ মিনিটের ভিডিওতে, এই ল্যাপটপেই— এবং আমি দেখলাম যে আসলে এখানে কোনো কথা নিয়ে আমার বিব্রত ও লজ্জিত হওয়ার কিছু বোধ করি না। কারণ আমি এটা ভাবি ঠিক এভাবেই। হয়তো আরেকবার প্রস্তুতি হলে আরও শানানো বাক্য হতো। তা নয় বলে বাক্যগুলো ছেদড়ানো নয়। ছবি বরং, এই যে কার্টুনগুলো বরং, আমাকে লোভী করে ফেলেছে। এটা জিহানের কৃতিত্ব। দুদিন অপেক্ষা করার পর আমি ভাবলাম আচ্ছা আমি তো বিশ বছর আগে কার্টুন আঁকা শুরু করেছিলাম। আমি তো দু’চারটা কার্টুন এঁকেছিলাম। কেন না তবে আমি জিহানকে একটু চমকে দিই কার্টুন এঁকে!

বিশ্বাস করেন, আমার মাথা কিন্তু অন্য ভাবে কাজ করে। আমার জন্য জিহানকে ইমপ্রেস করা যত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেছিল, আর কিছু কিন্তু তত গুরুত্বপূর্ণ হয়নি। আমার পরের কাজগুলো ছিল বেসিক্যালি জিহানকে ইমপ্রেস করা। আমার ধারণা আপনি একদম বুঝতে পারছেন। জিহান যাতে খুশি হয়, জিহান যাতে বলে কিছু! এগুলো হয়, যদি এটা কৈশোর হয় তাহলে হয়। এই কৈশোর নিয়ে আমার কোনো লজ্জাবোধ নেই। আমি জিহানকে ইমপ্রেস করতে চাইছি। ঘটনাচক্রে আমি কবিসভাতে আঁকা দুটো কার্টুন পেয়ে যাই মেইলের অ্যাটাচমেন্টে কী যেন খুঁজতে গিয়ে। এটা কাকতালীয়ভাবে ঘটে। তখন আমি আরও দুটো আঁকবার কথা ভাবি; ওই দুটোকে ম্যানিপুলেট করি, এখনকার কম্পিউটারে যেটা করা যায়। অর্থাৎ বাণীগুলো তুলে ফেলেছি যা অন্য পারপাসে ব্যবহার করা ছিল; সেটাও জেন্ডার পারপাসে ছিল। শেষের দুটো। আর বাকি দুটো কার্টুন আমি নতুন করে আঁকি। তো এই পুরো জিনিসটাই ঘটে শেষের দিকে একটু বাড়তি চাপ নিয়ে। দুটো কার্টুন পাবার কারণে আমি আমার কিউরেটরকে ইমপ্রেস করতে চাই যাতে তিনি মুগ্ধ হন। এই হচ্ছে আমার, যদি একান্ত বলতে বলেন, এবং পরে আমি এই পাঁচটা কার্টুনের একটা সিরিজ বানিয়ে ‘বোধ’ কবিতার সাথে রিলেট করি। বক্তৃতার পাশাপাশি আছে। ফলে আমার বক্তৃতাটা এবং কার্টুনগুলো এই একই থিমেটিক দুনিয়াতে চলে। এটা নিশ্চয়ই আপনি লক্ষ্য করেছেন। এবং আমি বেশ মজা পাই, কারণ অন্তত জিহান আলাদা করে মুগ্ধতা প্রকাশ করার লোকও না এবং করেন নাই। কিন্তু আমি যেহেতু মুরুব্বি ও যদি লজ্জার খাতিরেও যদি ওটা ইনস্টল করে থাকে?! তবে সেটা কারণ না ওঁর দিক থেকে; ও কঠোর লোক। ওঁর যে ১৪ জন ১৫ জনের দল তার মধ্যে আমি রইলাম, আমার ভালো লেগেছে। এই হচ্ছে কাহিনী। জিহান ইজ এ ভেরি গুড কিউরেটর। শান্ত, বুদ্ধিমান এবং লেগে থাকা, নিরুত্তেজিত। এই পরিচয়টাতে আমি খুব ইমপ্রেসড। ফর দ্য ফার্স্ট টাইম ইন এন আর্ট শো— আমার জন্য।

 

মনোরম পলক : এ্যাস এ্যান আর্টিস্ট

মানস চৌধুরী : যদি ভিজ্যুয়াল আর্টিস্ট বলেন। কিন্তু মেহেরপুর শহরে আমি বহুবার গান গেয়েছি ফলে আমি ওই অর্থে তো অবশ্যই আর্টিস্ট আরকি।

 

মনোরম  পলক : তাহলে তো আগের থেকেই…

মানস চৌধুরী : ওইগুলো সবই তো পারফর্মিং আর্ট। আগে কোথাও না কোথাও তো পারফর্মিং অথবা ভিজ্যুয়াল, এগুলো নির্ভর করে আমরা কিভাবে ডিফাইন করছি। ভিজুয়াল আর্টের দুনিয়াতে আর্টিস্ট হিসেবে আমার এটাই প্রথম জীবনে। আবার কেউ কেউ বলবেন সেটাও না; কেননা চলচিত্রে অভিনয় করেছি। আর্টের সবই কমপ্লেক্স। কোনো কিছুই ডিফিনিট না। আর ক্যাটাগরি তো আপনি জানেনই। ক্যাটাগরি ফ্লেক্সিবল, ক্যাটাগরি ফ্লুইড। কিন্তু বিষয় হল চিত্রকলার দুনিয়া সংশ্লিষ্ট একটা প্রদর্শনী, সেখানে আমার আসলে এভাবে করে ঢুকবার কোনো ভাবনাও ছিল না। এবং ইট হ্যাপেন্ড বিকজ জিহান ওয়াজ দেয়ার। এবং আমার প্রথম ফিজিকালি দেখা জিহানের সাথে। আই রিয়েলি লাইকড হিম।

 

মনোরম পলক : ফর্মাল প্রশ্ন গুলো আপাতত শেষ, কিন্তু আমার নিজের জানার জন্য একটা প্রশ্ন ছিল যে আপনার যে শব্দের ব্যবহার বাংলার, এটা এরকম বিস্তারিত কীভাবে?

মানস চৌধুরী : খুব ইন্টারেস্টিং! এটা বলতে ১২০ মিনিটের একটা গল্প বলতে হয়। যাতে করে একটা একশ পৃষ্ঠার বই হয়ে যায়। দুষ্টুমি করে বললাম। বিষয়টা হলো যে প্রথম ধাক্কাটা লেগেছিল, এখন বুঝি তখন তো বুঝি নাই, সেটা হলো আমার মা আমাকে গল্প বলতে বলতেন। সব মা ই নিশ্চয় বাচ্চাকে বলেন ‘গল্প বল’। কিন্তু মায়ের যেটা হতো মা গল্প বলতে বলতেন ক্লাসের পড়া। দ্যাটস দা ডিফরেন্স। ধরেন কোনো মা হয়তো বাচ্চাকে বলছেন ‘গল্প বল’, তখন তাঁরা নিশ্চয়ই ফিকশন মিন করছেন। কিন্তু আমার মা বলতেন ধরেন ক্লাস ফাইভের বিজ্ঞান বইয়ে কী যেন থাকত না একটা— দুধকে আদর্শ খাদ্য বলা হয় কেন? এখন মা ঠিক কেন করেছেন জানি না। মাকে আমি এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলাম পরে। এর থেকে আমার যেটা হয়েছে যে মুখস্ত না করার অভ্যাস, বা মুখস্থ করার যে চিরাচরিত বাংলাদেশের অব্যর্থ দাওয়াই ভালো ছাত্র হওয়ার— এটার থেকে আমি একেবারেই ক্লাস ফোর ফাইভেই ছুটে গেছি। কারণ আমার তো বলতে হতো তাঁকে, আমার তো লিখে দেখাতে হতো না। মা এই যে বিজ্ঞানের বই বা সমাজ বিজ্ঞানের বই থেকে কেন গল্প বলতে বলতেন সেটা মায়ের ক্ষেত্রে হয়তো তিনি এভাবে পড়াচ্ছেন অথবা বাচ্চার সাথে গল্পের একটি প্রণালী। সেটা একটা কারণ। আর দুই হলো, আমি যখন বড়ো হচ্ছিলাম তখন দেখছিলাম মানুষ জনের যে শব্দভীতি! মানুষজন শব্দ ব্যবহার করবেন তখন যখন তাঁর লাগবে; কাজে অর্থাৎ ডিগ্রী পাবে। যেটায় পরীক্ষার নাম্বার পাওয়া যাবে, ডিগ্রী পাওয়া যাবে, তারপর বাংলা একাডেমি সনদ পাওয়া যাবে, হয়তো একুশে পদক পাওয়া যাবে। তো এইগুলাতে তাঁরা শিখতে রাজি আছেন, ব্যবহার করতে রাজি আছেন। অর্থাৎ মঞ্চে দাঁড়িয়ে গণতন্ত্রের কথা বলার মতো। তার মানে কি, মঞ্চ থেকে যখন নেমে যাবেন অমনি নেমে-যাওয়া পাজামার মতো গণতন্ত্রও নেমে যাচ্ছে মাথা থেকে আপনার। আপনি তো মঞ্চে দাঁড়ালে গণতন্ত্র বলেন! আপনার মনে পড়বে ঠিক দু’ঘন্টা আগে আমি বলেছিলাম যে আনুষ্ঠানিক আর অনানুষ্ঠানিক নাই আমার জীবনে।

 

মনোরম পলক : হ্যাঁ বলেছিলেন।

মানস চৌধুরী : এখন হয়তো বুঝতে পারছেন, ওই যে মানুষজন প্রয়োজনে বাড়তি শব্দ ব্যবহার করবেন এবং এই প্রয়োজনগুলো হচ্ছে পেশাগত প্রয়োজন বা সাকসেসের প্রয়োজন বা যশের প্রয়োজন, পুরস্কারের প্রয়োজন। এটা কোনো না কোনোভাবে কৈশোরে আমাকে বিরক্ত করেছিল। আপনার যদি শব্দ জানা থাকে তাহলে সমস্যা কোথায়? আমার তো এখন আমাকে নিজেকে নিয়েও বিরক্তি আছে। আমার যদি এখনকার বোধ আরও চল্লিশ বছর আগে হতো তাহলে হয়তো আমি তিনটি ভাষা জানতাম। যেভাবে ইংরেজি জানি এটা নিয়ে আমার কোনো ইয়ে নাই, এটা কোনো জানাই না। আমি যে অর্থে বলছি, এখনকার উপলব্ধির সাথে থাকলে শুধু একটা ভাষায় তালিম থাকত না। আমার তখন তিনটা ভাষায় তালিম থাকত। কারণ আপনি শুধু পুরস্কারের জন্য আর পত্রিকায় রচনার জন্য শব্দ ব্যবহার করলে তাহলে শব্দগুলোর সাথে তো সম্পর্কহীন থাকবেন। এটা তো অনেকটা ওরকম যে, আপনার বসন্তের বাতাস উপভোগ করতে হবে এই কারণে যে আপনার পত্রিকা আপনার কাছে রচনা চেয়েছে। যদিও ঢাকা থেকে বসন্তের বাতাস উপভোগ করা খুব কঠিন। কিন্তু আপনার যদি বাতাস উপভোগ করার জন্য সম্পাদকের চাপ জরুরি হয় এটা কিন্তু খুবই বেদনাদায়ক। এখন আপনি আশা করি বুঝবেন, শব্দের যে মজা এ মজার বাইরে এই শব্দ ব্যবহার তো একপক্ষীয় না— এটা শ্রোতার এবং বক্তার একটা যুগপৎ রাস্তা। যদি শিল্প নাও, বলি হ্যাঁ রাস্তা। ফলে আমার নিন্দাও শুনতে হতে পারে, প্রশংসাও জুটতে পারে। আশা করি আপনি মানবেন সেটা। এক শ্রোতা প্রশংসা করবেন, আরেক শ্রোতা নিন্দা করবেন অধিক শব্দ ব্যবহারের কারণে বা জবানবাক্যে লেখ্য ভাষার কারণে। আমার মনে হয় যে এই ঝুঁকিগুলো আপনার জীবনে থাকবে।

আমাদের ক্যাম্পাসে খুরশিদ আলম এসেছিলেন জাকসুর নিমন্ত্রণে। খুরশিদ আলম হচ্ছেন বাংলাদেশের প্লেব্যাক সিঙ্গার হিসেবে এক সময়ের টপার ছিলেন; রুনা লায়লার আমলে। তিনি আসার পর দর্শকদের জুতা প্রদর্শন দেখেছেন। আমার এখনো মনে পড়ে; এবং আমার গা রোঁয়া দিচ্ছে। এত বেদনা বোধ করছি! কারণ তিনি যে জুতা দেখেছেন এটা খুবই নৃশংস আচরণ হয়েছে। তিনি ডিজার্ভ করেন না, কেউই করেন না পৃথিবীতে হয়তো। এখন সমস্যা হয়েছে কি! তিনি তো ধরেন তারকা ছিলেন! এই যে কালচারাল বদলগুলো ঘটে গেছে— ‘রক রক রকি রকি আমার নাম, সবাইকে জানাই আমার সালাম’— এই গানটা যে আর্লি নাইন্টি বা লেইট নাইন্টির ক্যাম্পাসে আর ট্রেন্ডি নাই, হি জাস্ট ডিডন্ট নো দ্যাট। এখন উল্টো দিক থেকে যদি ভাবি, যাঁরা নিমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন— ‘তাহলে তুই খুরশিদ আলমকে ডাকলি কেন?’ আমি কি বোঝাতে পারছি পয়েন্টটা কোথায়? এটাতো দুই পক্ষের প্রসঙ্গ। তুই তাঁকে পয়সা দিয়ে নিয়ে আসলি, তিনি তার পপুলার গানগুলো গাইতে শুরু করলেন; আর ততদিনে সেই নাইন্টিজের ক্যাম্পাসে বা আর্লি নব্বই ক্যাম্পাসে তখন আর রকি সিনেমার গান কিংবা সোহেল রানার ঠোঁটে তাঁর গানটি আর ট্রেন্ডি নাই। এই যে শিফট টা ঘটেছে এই শিফটটার ব্যাপারে ওয়াকিবহাল না-থেকে তিনি গান গাইতে শুরু করলেন হারমোনিয়াম বাজিয়ে এবং তৃতীয় গানে এসে তিনি গণজুতা দেখলেন। আমার বিচারে এটা খুবই নৃশংস একটা ঘটনা। কিন্তু আমি কাউকে অভিযোগ করার জন্য অন্তত আজকে কথাটা তুলি নাই।

আমি বলছি যে এই যে গায়ক আর শ্রোতা এটা কিন্তু একটা কম্প্যাক্ট প্যাকেজ। ফলে খুরশিদ আলম অন্য একটা জায়গায় যেমন সমাদৃত হতে পারেন, আরেকটা জায়গায় অত্যন্ত ভর্ৎসনার মধ্যে পড়তে পারেন। কালচারাল প্রোডাক্টের এই সমস্যাগুলো আছে। তো আমি বলতে চাইছি যে আমার শব্দ ব্যবহারে আমি নিজে উত্তেজিত হতে শুরু করেছিলাম, আমার ভালো লাগতে শুরু করেছিল। কিন্তু আমি জানি যে এটা এমন একটা প্যাকেজ যার মধ্যেই আছে যে কোনো কোনো জায়গায় আপনাকে নিন্দিত হতে হবে, কোনো কোনো জায়গায় আপনাকে আঁতেল শুনতে হবে। আমার ক্ষেত্রে ধরেন, আমার সাবলীলতার কারনে বা গতির কারণে চট করে নিষ্প্রাণ বলা খুব কঠিন আমার এই বলাটাকে; আপনি আশা করি বুঝবেন যে কেন বলছি। অন্যত্র এই যে কেতাবি ভাষায় কথ্য বলা, আঁতলামি করা— এই সঙ্কটগুলোর একটা সময়কাল কেটেছে যা এখন পঞ্চাশোর্ধ বয়সে আর ম্যাটার করে না। কিন্তু আমার এক বাক্যের উত্তর হবে যে, আমি আসলে শব্দ ব্যবহারের এই যে শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিকতা— যখন আপনি প্রবন্ধ রচনা করবেন, যখন আপনি সংবাদ উপস্থাপনা করবেন, যখন আপনি একুশে পদক নিতে যাবেন, তখনই শব্দ ব্যবহার করার বিস্তারিত অভ্যাস রাখবেন— এটা আমার এক ধরনের সংকীর্ণতা মনে হয় এবং আসলে উপভোগের একটা সীমানা নির্ধারণ করে। যেমন এখন এই যে এই বাক্যটাই— উপভোগের সীমানা মনে হচ্ছে নির্ধারিত— আপনি আমার মুখের হাসি দেখেই জানেন যে আমার বলবার স্বার্থে একটুও আমাকে হাতড়াতে হচ্ছে না শব্দগুলো। কারণ আমি আসলে এই শব্দমালাতে আমি উপভোগ করি। ফলে ইন দ্য এন্ড, ইট ওয়াজ কমপ্লিটলি মাই প্লেজার টু ইউজ এ লট অফ ওয়ার্ডস টুগেদার।

 

মনোরম পলক : শ্রোতা হিসেবেও খুব ভালো লাগে। ভালো লাগা খারাপ লাগা একসাথে। ভালো লাগে শুনতে, আর দেখতে যে এভাবে শব্দ ব্যবহার করা যায়। আর খারাপ লাগে এভাবে যে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে যে প্রতিটা শব্দের নিখুঁত অর্থ জানিনা। আর তার থেকে আরও বেশি স্পষ্ট যেটা সেটা হচ্ছে কখনোই এই ধরনের শব্দকে মনে রাখা বা ব্যবহার করা হবে না।

মানস চৌধুরী : তো আপনাকে আমি এখন একটা অ্যাডভান্টেজ দিই শেষ করার আগে। সেটা হলো যে এটা বলে রাখা ভালো যে খুব আনুষ্ঠানিক শোনাবে, কিন্তু ফিল ফ্রি টু কল মি এনিটাইম এবং আবারো কোনো— শুধু ইন্টারভিউ তো বিষয় না, আরেকদিন গল্প করব সেটা তো আপনার আমার প্রাপ্য। পৃথিবীর যে কোনো মানুষের প্রাপ্য— শুধু সময় সাপেক্ষে, হয়তো আজকে মিলবে না, আরেকদিন মিলবে— এই তো ব্যাপারটা। আমাদের জীবনটা এভাবে কাটে, সবসময় প্রায়োরেটাইজ করতে হয়। আলুর উপরে পটল, পটলের উপর টেংরা মাছ— একটার বিনিময় একটা সব সময় আমরা প্রায়োরেটাইজ করি। অন্য একটা প্রায়োরিটি হবে পলকের মানস বা মানসের পলক। আশা করি বুঝবেন এই মেথডটা। আমি ড্রামেটিক করলাম না। এটাই বরং সবচেয়ে সরল করে বললাম। ফলে ফিল ফ্রি যে ‘আরেকদিন চলেন আড্ডা দিই।’ আর এর বাইরে যেটা বলবার আছে সেটা হলো যে বিশেষ করে এখন আমি ত্রিশ বছর আপনার থেকে অন্তত বেশি যে এটার অ্যাডভান্টেজ নিয়ে বলছি যদি এটা উপলব্ধি হয় পলক বিশ্বাস করুন আমার কুড়ি বাইশের সময়ে যদি এটা হতো আমার ভাষা তিনটা হত। মানে আজকে যে প্রজ্ঞার দুনিয়া সেটার কথা বলছি। সেই প্রজ্ঞার দুনিয়া যদি আমার কুড়ির হত তাহলে সম্ভাবনা ছিল যে আমি তিনটি ভাষার মানুষ হতাম অন্তত। এর অন্য মানে হলো যে, যদি আপনার কখনো মনে হয় এটাকে বেদনায় না নিয়ে বাংলা বলেন, চাকমা হতে পারে, সাঁওতাল হতে পারে। মানে ভাষা শেখার ব্যাপারে দৃষ্টিভঙ্গি জাতীয়তাবাদী হওয়া মানেই হল আমরা নিজেদের পায়ে গুলি করছি। এই আমি বুঝি এটা ঠিকই যে ইংরেজি ভাষার বাজারদর, ফ্রেঞ্চ ভাষায় বাজারদর, আর সাঁওতাল ভাষার বাজারদর এক নয়। কিন্তু যদি দর্শনের দিক থেকে বলেন আপনার ভালো লাগা— বিশ্বাস করুন আপনার ফুর্তিতে মন ভরে যাবে যখন আপনার চাকমা বন্ধুর সাথে অন্তত আধাআধি অন্তত কথা আপনি চাকমা ভাষায় বলতে পারছেন। এই যে ফুর্তিটা এটা আনপ্যারালাল ফুর্তি হবে আপনার নিশ্চিতভাবে। ফলে ওইটাকে বলছিলাম যে এটা একটা দুঃখ হতে পারে যে আপনি নতুন করে গিটারে, নতুন করে নারকেল গাছে চড়া, নতুন করে সাঁতার শেখা, নতুন করে ভাষা শেখা, বাহান্নোর জীবনে এবং তার যে পলিটিক্যাল ইকোনমি— সেটা কাজলের হোক বা আমার হোক বা আপনার মায়ের হোক— আমাদের জন্য একটা সংযোজন ঘটানো আর সম্ভব নয়। দক্ষতার অভাব বয়সকালে এসে কাল হলো। আমাদের সম্পাদনার যে জীবন, যা যা সম্পাদন করতে হয়, যা যা শেষ করতে হয় সেসব দায়িত্বের মধ্যে আমাদের জন্য আর নতুন করে সংযোজন করা কঠিন। কিন্তু বিইং আ টুয়েন্টি অর আর্লি টুয়েন্টি, বিশ্বাস করুন, আপনি যা যা আপনার পালকে রাখতে চাইবেন তার একটা বাছাই করে ফেলা সম্ভব। এবং ভাষা সেটা হওয়া উচিত।

আমাদের রাষ্ট্রের ভাষা প্রশ্ন খুবই সংবেদনশীল। আমি প্রতিবেশীদের— ধরেন কথার কথা হোক, যেমন তামিল হোক বা গুজরাটি হোক আর আপনার পশতু হোক, আমি কি বোঝাতে পারছি বাংলাদেশের শিক্ষা কাঠামোতে আমাদের অন্য একটা ভাষা শেখা ইংরেজি ছাড়া— অন্য একটা ভাষা শেখা কখনো এজেন্ডা হয় নাই, এমনকি উর্দুও না, যেটা কিনা এখানে জাগরুক ভাষা ছিল কিছুকাল আগে, বা ফারসি যা আপনার-আমার দাদারাই জানতেন। হয়তো হিন্দু দাদারা জানতেন না, কিন্তু মুসলিম দাদারা ফার্সি জানতেন— শিক্ষিত দাদারা বা আপনার ক্ষেত্রে পরদাদারা। আমি বলছি যে, যে ভাষাগুলো জাগরুক ছিল এই অঞ্চলে, সেই ভাষাগুলোরও কিন্তু সলিল সমাধি হয়েছে। এটা ভাষা প্রশ্ন হিসেবে একটা অঞ্চলের, আমি বলছি মধ্যবিত্তের জন্য, রূপরেখা। ওয়ার্কিং ক্লাসই বরং তাঁর মত জেনে নেন। যেমন ধরেন, বেঙ্গালুরুতে যান, তো আপনার গাড়ির ড্রাইভার কিন্তু আপনাকে ইংরেজিতেই বলবেন। তাই তো? তার মানে, ওয়ার্কিং ক্লাস তাঁর নিজের চালানোর মত একটা ইংরেজি জেনে যান বা আমাদের ওই যে সিমেন্টের বিজ্ঞাপনে দেয়— আপনি লক্ষ্য করেছেন যে সিমেন্টের বিজ্ঞাপনটাতে কোরীয় মালিককে রসগোল্লা খাওয়ানো হয়— ওয়ার্কিং ক্লাসই বরং তাঁর মত একটা কার্যকরী ভাষা শিখে নেন। সেটা অন্য প্রসঙ্গ। কিন্তু আমি বলছি মধ্যবিত্ত সাহিত্য ভাষার প্রশ্নে এই যে মনো লিঙ্গুয়ালিটি সমুন্নত রাখছে, আর আপওয়ার্ডিং ভাষা হচ্ছে ইংরেজি যে আপনি বৃহৎ দুনিয়ায় প্রবেশ করবেন তার অধিক চাবিকাঠি পাবেন ইংরেজি শিখলে। আর এই সমর্থিত চারটি ভাষা। এভাবে করে দেখাটা আমি বাংলাদেশের মধ্যবিত্তদের সংকীর্ণতা হিসেবে দেখছি। পলক, রাদার, যদি আমি আরও কুড়ি বছর বেঁচে থাকি আপনাকে আমি ট্রাইলিঙ্গুয়াল দেখতে চাই।

 

মনোরম পলক : তাহলে আমিও ছোটো মানুষ একটা বড়ো কথা বলি। আপনারও কিন্তু আরও কুড়ি বছর বাকি আছে আপনিও কিন্তু ট্রাইলিঙ্গুয়াল হওয়ার এখনো সুযোগ আছে।

মানস চৌধুরী : ওই যে বললাম, আবারও বলি, আমাদের বিভিন্ন বয়সের সম্পাদনাগুলো খুবই আলাদা। আমরা যা যা সামলাই, বিশেষ করে যারা কিনা নিম্নমধ্যবিত্ত ব্যাকগ্রাউন্ডের। সোজা বাংলায় যদি বলি শিখতে আমাদের যে কষ্ট হয়— এটুকু তো মানেন যে ভাষা শিক্ষা শিশুদের জন্য অপেক্ষাকৃত সহজ বা মিউজিকও তাই, ইন্সট্রুমেন্টও তাই। তাছাড়াও যেটা হয়, সোজা বাংলায় বললে, বুড়ো বাপ-মা, বুড়া নিজ ও সংসার ব্যবস্থাপনা, খরচ সম্পাদনা এবং কিছু বছর পর রিটায়ারমেন্ট— আমাদের বয়সের অনেকেরই ৯ বছর পর রিটায়ারমেন্ট লাগতে যাচ্ছে। দেখতে দেখতে এই সময়গুলোর নতুন যে হিসাব পরিকল্পনা, মস্তিষ্কের অভ্যেস সেগুলো খুব আলাদা। তাতে যদি কাজল নিজেকে কন্যাদায়গ্রস্ত নাও ভাবে— একজন র্যা ডিক্যাল কাজল না ভাবতে পারে— কিন্তু কাজলের সমবয়সী বহু লোক তাঁদের নিজেদের কন্যাদায়গ্রস্ত ভাবেন। এগুলো তো বাস্তব; আমি বোঝাতে পারছি? আমি ভীষণ হাম্বলড যে আপনি বললেন। আমি এখন একান্তে ভাববো। কিন্তু বাস্তব দুনিয়ায় হয়তো নতুন কোনো প্রশিক্ষণ নেয়ার জন্য স্বাভাবিক পরিবেশ নাই আমাদের বয়সটাতে। আমাদের অন্যান্য জিনিস শেষ করতে হচ্ছে। কী যেন বলে না— মাইলস টু গো, সেরকম। একটা ব্যাপার যেমন আপনি তো বাস্তবে দেখতে পাচ্ছেন— না, এখনো বেঁচে আছে, তার এটা লাগবে! থাকে না জিনিসগুলো খুব এরকম? বা ধরেন, কথার কথা, শাহীনের এখন জীবনে, আপনি আশা করি বুঝবেন, ওর স্ত্রী (পলকের চাচা শাহীনের প্রথম স্ত্রী ক্যান্সারে গত হয়েছেন), তারপরে নতুন স্ত্রী— এইযে সংযোজনা, ওর তো অনেকের থেকে একটা কমপ্লেক্স ম্যানেজমেন্টে থাকতে হয়। তার মধ্যে ওর ঈশ্বর আছেন, তার জন্য ওর কিছুটা সময় দিতে হয়। এগুলোকেই আমি বলছি যে প্রত্যেকটা প্যাকেজগুলো খুব আলাদা। কিন্তু ও যখন আমার জন্য একটা কলম কিনে নিয়ে এসেছে লন্ডন থেকে, ওই যে কলমে ওর যে ইনভেস্টমেন্টটা— ইনভেস্টমেন্ট বলতে ফিনান্স না অবশ্যই, কিন্তু ইমোশনটা বলছি— এটাও কিন্তু সে এফোর্ড করতে পারে। কিন্তু ওকে যদি বলি তুই স্প্যানিশ শেখ এখন শাহীন সেটা নাও পারতে পারে। ওর টাইট একটা আয়ের জীবন, গোটা চারেক বাচ্চা, সব মিলিয়ে— আমি কি স্পষ্ট করতে পারলাম? ফলে ওইটুকু পার্থক্য। এটা বুঝবেন যে এটা বয়সবাদী আচরণ না। এইটুকু পার্থক্য ২০-৪০-৫০ ইত্যাদি বয়সের মধ্যে আছে। আমাদের এখন অন্যান্য জিনিস শেষ করতে হচ্ছে, বিফোর উই ডাই। ভালো থেকেন, পলক।

 

মনোরম পলক : ঠিক আছে অনেক সময় দিলেন! অনেক সুন্দর সময় গেল!

মানস চৌধুরী : এই প্লিজ! ইউ ডিজার্ভ ইট! ভালো থেকেন। কথা হবে।

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

জন্ম ১৭ নভেম্বর, ১৯৯৯; ঢাকা । জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত; "Where Is Kajol?" এর প্রতিষ্ঠাতা।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।