সোমবার, মে ১৬

মানস চৌধুরীর সাথে মনোরম পলকের আলাপ : প্রথম কিস্তি

0

Manos Chowdhury‘জনপদের সঙ্গে আমাদের বিজড়ন আসলে ইচ্ছানিরপেক্ষ’ —মানস চৌধুরী


সাবঅল্টার্ন চিন্তার সীমানা, এলিটিজমের ব্যাকরণ, কবিতা ও কবিতা পাঠ, দুই বাংলার সত্তা— ইত্যাদি নানা বিষয়ে মনোরম পলক ২০২১ সালের মার্চ মাসের ৫ তারিখ কথা বলেছেন মানস চৌধুরীর সঙ্গে। আজ রইল পুরো আলাপের প্রথম কিস্তি।


মনোরম পলক : ফ্রি জুম তো ৪০ মিনিট পর বন্ধ হয়ে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে সাথে সাথে আমি আরেকটা নতুন লিংক দিয়ে দিব।

মানস চৌধুরী : হ্যাঁ! ঠিক আছে। স্ট্রিক্টলি বললে ৪০ মিনিটে তো অনেক সময়, তারপরে দেখা যাবে। লেটস সি! আচ্ছা, আপনি বইটা (মানস চৌধুরীর সাথে চ্যাটিং, লেখক – মঈন উদ্দিন) জোগাড় করেছেন, তাই না?

 

মনোরম পলক : হ্যাঁ! বাতিঘর থেকে নিলাম। প্রথমে বলছিল যে বইটা ওদের কাছে নেই। পরে বুঝলাম ঠিকভাবে খুঁজছে না। পরে অনেক বলে টলে…

মানস চৌধুরী : বাতিঘর-পাঠক সমাবেশ এধরনের বড়ো দোকানের কিছু প্রিফার্ড রাইটার লিস্ট আছে। ডোন্ট গেট মি রং! এভাবেই চলে এবং বেসিক্যালি আমি সম্ভবত এই প্রিফার্ড দলের মধ্যে পড়ি না।

 

মনোরম পলক : এর পিছনে নির্দিষ্ট কোনো কারণ আছে?

মানস চৌধুরী : ঢাকার যে কারণ… এখানে সবাই তো একটা ক্লাব পদ্ধতিতে চলে। বুঝতে পারছেন সবচেয়ে বড়ো গুণী নামী রাইটাররাও এই ধরনের নামজাদা প্রকাশক বা পুস্তক-বিক্রেতাদের সাথে একটা ‘ব্যক্তিগত’ যোগাযোগ রাখেন। আনরিটেন একটা ইয়ে থাকে; মানে ঐক্য বা আপন-বোধ থাকে।

 

মনোরম পলক : যেমন?

মানস চৌধুরী : একটা উদাহরণ দেই। পাঠক সমাবেশের প্রথম লিখিত বিজ্ঞাপনটার সম্ভবত আমি প্রকাশক, ১৯৯০ বা ৯১ সালে। আমি এই সময়টাতে ক্যাম্পাসে থিয়েটার করি। আমার নির্দেশিত কোনো নাটকের ক্রোড়পত্রের জন্য কমন-বন্ধুরা নতুন পুস্তক-উদ্যোক্তা হিসাবে ওদের বিজ্ঞাপনটা সংযোজন করেন। তখনকার আমাদের নিজ নিজ পরিস্থিতিতে এটার নিজস্ব গুরুত্ব বা আবেগ ছিল। তবে যৌথ সম্পাদিত একটা বই তিনি ২০০০ সালে বাজারজাত করেন। এছাড়া সম্পর্কটার অনেক বিকাশ ঘটেনি। পলক, সাফল্যের দুনিয়াটা কিন্তু আলাদা। আমি বছরের পর বছর গুরুতর বড়ো হইনি। এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমি বড়ো হই নাই বলতে, আমার ৯৭ সালের সামাজিক স্ট্যাটাস এবং ২০২১ এর স্ট্যাটাসে গুরুতর কোনো পার্থক্য নাই। যদি ঢাকার মর্যাদার উঁচু-নিচু ভেদের কথা বলেন আর কী! ৯৭-এর শান্তিচুক্তির বিরোধিতার সময়ও আমি মাস্টার হিসাবে কারো কারো হয়তো নজরে পড়তাম। তখন আমি ২৭ বছরের একজন লেকচারার। আপনি নিশ্চয়ই বোঝেন যে, কালচারাল ইন্টেলেকচুয়াল অঙ্গনে আপনার স্থান বৃদ্ধি ঘটাতে হয়। মানে, আপনার প্রগ্রেসিভ হারে বড়ো হতে হয়।

 

মনোরম পলক : তা তো অবশ্যই।

মানস চৌধুরী : প্রকাশক হিসাবে বাতিঘরের প্রধানের সাথে আমার ফেসবুকে যোগাযোগ আকস্মিক ঘটে, যেমন হয় আর কী! আমাদের কমন বন্ধু অনেক। আমি নিজে খুব হার্ডলি প্রকাশকদের এপ্রোচ করি ডাকে বা ফোনে। মানে পাণ্ডুলিপি প্রকাশের জন্য প্রকাশকের সঙ্গে ‘ব্যক্তিগত’ যোগাযোগ করা হয় না তেমন। কিন্তু খানিকটা আশপাশের মানুষদের উৎসাহেই আমি ওঁদের একটা পাণ্ডুলিপি পাঠিয়েছিলাম বছর দুয়েক আগে ইমেইলে। নন-ফিকশন পাণ্ডুলিপি।

 

মনোরম পলক : তারপর ?

মানস চৌধুরী : দেখুন, এখানকার প্রধান সমস্যাটা হলো যোগাযোগে কোনো পেশাদারিত্ব নেই। এর আগে আমার সাক্ষাৎকার নিয়ে চট্টগ্রামের মঈন উদ্দিন শুনেছিলাম ওঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। সেটা ভালোমতো তখন জানলে আরেকবার যোগাযোগ না করাই ঠিক ছিল। আমার পাণ্ডুলিপি ওঁরা গ্রহণ করেননি বা করবেন না সেটা আমারই মাস দেড়েক পর ফোন দিয়ে জানতে হয়েছিল। খুবই বিনয়ী যোগাযোগ ছিল তাতে সন্দেহ নেই। আমাকে জানালেন যেন একটা গল্পের বই পাঠাই। এটা তো মানা করার একটা পদ্ধতি। আপনি যখন একটা বই দিচ্ছেন তখন আরেকটা বইয়ের কথা বলা…

 

মনোরম পলক : হ্যাঁ তাই তো..!

মানস চৌধুরী : এখন যেকোনো প্রকাশকেরই অধিকার আছে কোনো বিশেষ বই না ছাপানোর। ওইটা আমার পয়েন্ট না আশা করি বুঝবেন। কিন্তু যদি কোনো বড়ো প্রকাশক তাঁর মাথায় ঢাকা শহরের ৫০ কিংবা ৬০ জন লেখকের মধ্যে আমাকে রাখেন বা জায়গা দেন তাহলে পরের এক বছরে একটা যোগাযোগ ডিউ হয়ে থাকে আমার কাছে। আমি মনে করি। ডু ইউ গেট মাই পয়েন্ট?

 

মনোরম পলক : হ্যাঁ…

মানস চৌধুরী : যোগযোগটা ‘যে মানসদা অথবা মানস চাচা, বা মানস’— যেটাই হোক না কেন— ‘গতবার আপনার বইটা তো ছাপাতে পারি নাই; তো আপনার নতুন পাণ্ডুলিপি কই?’ যখন এই যোগাযোগটা হয় না, তখন আমার কমনসেন্স কাজ করবে এভাবে যে এই প্রকাশকের মাথায় যে ৫০ জন লেখক আছেন তার মধ্যে আমি নেই। আর কোনো লজিক্যাল কারণ কি থাকতে পারে? হতে পারে যে আমার লেখনীগুণ খারাপ। আপাতত সেটা যদি আমরা বিবেচনায় না রাখি, তাহলে পলক, কী থাকে বাকি? ক্লিক বলুন বা গিল্ড, ক্লাব বা আপন-পর যাই বলেন, এটা রচনা পছন্দ-অপছন্দের ব্যাপার নয়। নামজাদা প্রকাশক বা বিক্রেতা যদি বাদও দেন, সংবেদ, সংহতি যারা কিনা বাই ডেফিনেশন লেফট, হয়তো সংহতি বেশি লেফট এবং সংবেদ একটু কম লেফট; তাঁদের যোগাযোগও কার্যকরী কিছু নয়। আপনি হয়তো বুঝতে পারছেন কোন জায়গা থেকে বলছি।

 

মনোরম পলক : জি।

মানস চৌধুরী : …লেখক হিসেবে আমি এপ্রোচড নই তেমন। আপনি এটাও নিশ্চয় আশা করি বুঝবেন যে আমি কোনো আক্ষেপ থেকে বলছি না। আমি এতই অলস লেখক যে আমার আক্ষেপ করার সুযোগ নেই। আপনার সাথে ইন্টারভিউটা তো দুষ্টুমি থেকে শুরু হয়। ওই যে বন্ধু-পুত্রের জায়গা থেকে না দেখে রাদার আমরা যে দুষ্টামি করছিলাম যে আজকে যদি আর্টিস্ট হতাম! সেভাবেই ইন্টারভিউ! তারপরও হয়তো আমি মেথডিক্যাল হয়েছি এই বইটা আছে বলে, যে ঠিক আছে তাহলে আপনি দেখেন বইটা এবং ইন্টারভিউ নেন। ফলে আক্ষেপের আলাপ নয়; একটা নগরে কাজকর্মের বাস্তবতা বোঝা।

 

মনোরম পলক : ইন্টারভিউয়ের জন্য ধন্যবাদ।

মানস চৌধুরী : লেখক হিসাবে আমাকে কম এপ্রোচের কারণে তাতে কিন্তু আমিও অখুশি না। আমি খুবই অলস; এবং এটা আমার জন্য সুবিধাজনক। তবে আপনি যদি ঢাকার লজিক বুঝতে চেষ্টা করেন তাহলে কেন একটা প্রকাশনী কখনো আমাকে বা কাউকে-কাউকে বই লিখবার জন্য সিরিয়াস কোনো অনুরোধ করে নাই সেটাকে কীভাবে দেখবেন? একটা বাম প্রকাশক যোগাযোগ করছেন না, এটার কোনো লজিক নাই তো। আর কিছু বাদ দিলে আমার লেফট লেগেসিটা কই? ফলে আমার মনে হয় এটা একজন দুইজন প্রকাশক বা বিক্রেতার বিষয় নয়। বরং নামজাদারা আরও লিবারেল-বুর্জোয়া বা জাতীয়তাবাদী রাইটারদের সাথে কানেক্টেড। তার থেকেও বড়ো কথা বিখ্যাত লেখকদের সাথে। এটা তো আপনার কমন সেন্সেই বোঝা যায়।

 

মনোরম পলক : একদম ঠিক

মানস চৌধুরী : কিন্তু যারা কিনা তথাকথিত মার্ক্সিস্ট এবং লেফট ঘরনার রাইটার খুঁজে বেড়ান সেই প্রকাশকরাও তো আমাকে কখনো পরিষ্কার ভাষায় এপ্রোচ করেন নাই পাণ্ডুলিপি জমা করার জন্য। আমি মনে করি এটা আমার বা স্বীয় স্বীয় রচনাকারদের পার্সোনালিটির সাথে সম্পর্কিতও।

 

মনোরম পলক : ঢাকাতে লেফট ঘরনার প্রকাশক কারা?

মানস চৌধুরী : সংবেদ, সংহতি যারা কিনা বাই ডেফিনেশন লেফট। হয়তো সংহতি বেশি লেফট এবং সংবেদ একটু কম লেফট। হয়তো আমি কম এপ্রোচেবল বলে বিবেচিত। আই এম হ্যাপি উইথ দ্যাট।

 

মনোরম পলক : তাহলে এই বিষয়টাও খুব একটা খারাপ না! এটার মধ্যে এন্টারটেইনমেন্ট পাওয়া যেতে পারে।

মানস চৌধুরী : নিশ্চিতভাবে, সকল কিছুতেই এন্টারটেইনমেন্ট পাওয়া যেতে পারে। ইন্টারভিউটা একটা ফর্মাল কাজ। ইউ ক্যান গেট ইউর ইনটেন্ট। আমার সাথে তো জানেনই গল্প করতে থাকলে গল্প করাই যায়।

 

মনোরম পলক : গল্পটাই গুরুত্বপূর্ণ।

মানস চৌধুরী : আপনি কি রেকর্ড করছেন?

 

মনোরম পলক : হ্যাঁ, আমি রেকর্ডিং অন করে নিয়েছি। দুঃখিত আমি বলতে চেয়েছিলাম কিন্তু আপনি কথা শুরু করে দিয়েছেন পরে আর বলা হয়নি।

মানস চৌধুরী : আমি জানি, এজন্য আমি নিজেকে সতর্ক করলাম। আমার আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক দুইটা জীবন নাই। সেটার পার্থক্য ওখানেই, যে ভঙ্গিতে বলেন বা আর্গুমেন্টে বলেন গুরুতর কোনো কিছুতেই মনে পড়ে না অনেক বছরে কোনো ভিন্নতা আছে। মানে, আমার মায়ের সাথে কথোপকথনে হয়তো রসিকতা বেশি করে থাকতাম। হতে পারে আপনারও আমাকে খুব বেরসিক মনে হয়নি। আমার ব্যক্তিগত কোনো গীবত নাই।

 

মনোরম পলক : ওইটাই বললাম, এখানে নামটা তো আসলে মুখ্য না সেটা তো এক্সাম্পল ছিল।

মানস চৌধুরী : এগজ্যাক্টলি এটা এক্সাম্পল ছিল। চলেন—

 

মনোরম পলক : তাহলে, আজকে কেমন আছেন?

মানস চৌধুরী : আচ্ছা, যেটা হলো, যখন ঝামেলা থাকে আমি তখন ব্যবস্থাপনা হিসেবে দেখি; কারণ হলো আপনার থেকে এ বিষয়ে ভালো শ্রোতা এ মুহূর্তে ঢাকা শহরে খুবই কম। কেন ঝামেলাকে ব্যবস্থাপনা হিসেবে দেখতে হয়? কারণ হলো তখন আপনি কী ফিল করছেন এর চাইতে কী করতে হবে ওটা আরও বেশি চাপের বিষয়। তাৎক্ষণিকতা আছে, নির্ধারণ করতে হয়। সেটা ধরেন মরা বাড়িতেও তাই ঘটে। পাঁচজন হয়তো বিলাপ করছেন, বাকি দুইজন যোগাযোগ করছেন সংস্থাপনগুলো নিয়ে। বড়ো চাচাকে জানাতে হবে। ইমামকে আনতে হবে। তারপরও যদি কারও দেহদান করা থাকে মেডিকেলে জানাতে হবে। বিদেশে কে আছেন খোঁজ নিতে হবে। এই ব্যবস্থাপক যদি বিলাপ করতে বসেন! কেউ না কেউ এখানে রোলটাতে চলে আসে। এই ব্যবস্থাপক যদি বিলাপ করতে বসে! এই মরা বাড়ির ব্যবস্থাপনা কিন্তু পুরো শেষ! আমার মনে হয় যে, একরকম শরীর ভালো না আমার, তার থেকে বাড়ির লোকজনের শরীর আরও খারাপ-এরকম একটা দশা যাচ্ছে আমার।

 

মনোরম পলক : শেষবার যখন আপনার সাথে কথা হলো এরপর থেকে এখনও একইরকম চলছে?

মানস চৌধুরী : একচুয়ালি না। বরং কিছু ক্ষেত্রে ডিটিওরেইট করেছে। ফলে রোগীর সংখ্যা এখন আমাকে ধরলে চার, সদস্য সংখ্যা সাত, গিন্নী দেশের বাইরে। যদিও এগুলো হচ্ছে বাস্তবতা। কিন্তু দ্যাটস জাস্ট পার্ট অফ দ্যা পার্সেল। এই যে যেমন আমি সময়টা বের করেছি ওরকমই। মাঝখানে আমি ইমেইলে উত্তর করেছি। কাউকে অপেক্ষা করিয়েছি এ সপ্তাহে না আগামী সপ্তাহে! এভাবেই চলে আমাদের জীবন। আপনাকে যেমন কালকেরটা আজকে নিয়ে আসলাম। এখন ইন বিটুইন। ওইটার উত্তেজনা হয়তো এখন আমাকে— ক্লান্তি সেটা ভিন্ন বিষয়, শারীরিক। কিন্তু ওইটার উত্তেজনা কিংবা উৎকণ্ঠা আবার এই শিডিউলে হ্যাম্পার করবে না। এভাবে দেখার ব্যাপার আছে।

 

মনোরম পলক : খাওয়া-দাওয়া করলেন এখন?

মানস চৌধুরী : করলাম এই কিছুক্ষণ আগে। দশ মিনিট আগে। আপনি করেছেন?

 

মনোরম পলক : দিনের বেলা খাওয়া নিয়ে আমার একটু অনিয়ম আছে। ঘুম থেকে উঠে যদি খাবার রেডি থাকে এবং মন চায় সেক্ষেত্রে খাওয়া হয়। তবে ঘুম থেকে ওঠার অনেক পরে হয়।

মানস চৌধুরী : কোন সময়টাতে ঘুম থেকে ওঠা?

 

মনোরম পলক : আমার ঘুম থেকে ওঠা ধরেন এগারোটা-বারোটা ঠিক দুপুরের আগে। তবে কখনো বিকাল ৫টা।

মানস চৌধুরী : বেসিক্যালি তাহলে আপনি ঘুম থেকে উঠেছেন এবং গত দু ঘন্টায় খান নাই এই তো বুঝলাম।

 

মনোরম পলক : হ্যাঁ, গত দুই ঘণ্টায় খাই নাই এবং আগামী এক দুই ঘণ্টায় হয়তো খাব না।

মানস চৌধুরী : ঠিক আছে।

 

মনোরম পলক : রাতের বেলা আবার স্বাভাবিকভাবে খাই। টাইমটা একটু ডিফরেন্ট আমার জন্য।

মানস চৌধুরী : প্রত্যেকের সিডিউলই আলাদা ফলে ম্যাটার করে না।

 

মনোরম পলক : ম্যাটার করে না তা না, কিন্তু এটা কাউকে বোঝাতে একটু আজব আর কী।

মানস চৌধুরী : ম্যাটার করে না বলতে আমি বোঝাতে চাচ্ছি যে একটা স্ট্যান্ডার্ড রুটিন যে সবার জন্য ওয়ার্কেবল সেটা আমার মনে হয় না। ধরেন আমি প্রায় সারারাত জাগা থাকতাম, তারপর ভোরবেলা ক্লাসে যেতাম। কোন সময় ঘুমাতাম আমি ঠিক ভেঙে বলতে পারব না। কিন্তু এই যে টার্ম, এটা বদলাতে হয় বা বদলাই যখন আমরা একটা যৌথ জীবন শুরু করি। কারণ তখন হয় কি ঘুমের ক্ষেত্রে আপনার পাশের জন, আপনার ক্ষেত্রে আপনার মা-বাবা আপনার বোন-বাবার কথা যদি আলাদাও রাখি, আপনার ঘুমের সিডিউল খাওয়ার সিডিউলে তাঁদের ইফেক্ট করে। তখন ইউ মাইট থিংক অফ চেঞ্জিং দ্য হ্যাবিট! যদি কোনো কারণে আপনি দেখেন যে আপনি না খেলে বোন খাচ্ছে না। তখন ইউ মাইট থিংক অফ এ চেঞ্জ। জিনিসগুলো এরকম আমার মনে হয়।

 

মনোরম পলক : সেজন্যই বললাম যে স্পেসিফিক হয় না। কিন্তু অনেক সময় অনেক জায়গায় গেলে বা কারো সাথে বসলে, থাকলে একসাথে, ধরেন একটা আড্ডা হোক সেটা একটা পরিবারের রিইউনিয়ন হোক, সে ক্ষেত্রে একটু বিষয়গুলো আমার জন্য ডিফিকাল্ট হয়ে যায়, যে, খেতে হবে অথবা এখন আবার এতজনকে বোঝানো একজন একজন করে—

মানস চৌধুরী : মেনুতেও ঝামেলা হয় তখন। আমি খুব রেয়ারলি অবশ্য নেমন্তন্নে যাই, কিন্তু তারপরও দেখা যায় যে ওই প্রান্তে এমন একজন মেজবান আছেন যিনি বেড়ে খাওয়াতে পছন্দ করেন এবং যিনি কিনা নেগোশিয়েট করেন: ‘এটা ভালো— ওটা ভালো। আপনি খান না, একটু খেয়ে দেখেন!’ তো তখন একটু ডিফিকাল্ট হয়। কারণ টেবিলে যখন চার রকম পদ থাকে তখন আপনি চামে-চিকনে দু’রকম এড়াতে পারেন। সকলের তো ফুড হ্যাবিট এক না। আমি খুশি হতাম গণতান্ত্রিক হলে, সর্বভুক হলে; কিন্তু আমি তো তা নই। নই যেহেতু আমি করি কি কোথাও গেলে— এমনিতেও আমার মনে হয় যে দুই তরকারির বেশি খেলে আটকে যাই, কোথাও আমার শর্টসার্কিট হয়ে যায়— আমি তখন সবগুলো না খেয়ে দুটো বা তিনটে বাছাই করে আগাবো। কিন্তু দেখা যায় কোনো কোনো সময় এটা ঘটে যে অন্য প্রান্তে যিনি কিনা মেজবান, অতিথি সামলাচ্ছেন, তিনি পছন্দ করেন যে আপনাকে আট পদের একটু স্বাদ দিতে। তখন এটা একটা টাফ নেগোসিয়েশন হয়ে দাঁড়ায়। ওগুলো নিয়ে আমি ঝামেলায় পড়ি আর কি।

 

মনোরম পলক : আমার জন্য আরও ঝামেলা হয় কেউ আমার প্লেটে খাবার তুলে দিলে।

মানস চৌধুরী : হ্যাঁ, আমি বুঝতে পারছি। আমাদের এখানকার ফিউডাল ব্যবস্থা হচ্ছে আতিথেয়তার একটা মানেই হলো সামওয়ান— মোস্টলি নারী, মানে, পারিবারিক পর্যায়ে নারী আর পাবলিক নিমন্ত্রণ পর্যায়ে হলে পুরুষ হতে পারেন— যেখানে কিনা এটা এক্সপেক্টেড যে আপনাকে পীড়াপীড়ি করা হবে। এখানে খুব কালচারাল একটা সঙ্কট আছে।

 

মনোরম পলক : আমার মা, পৌষী গতকালকে মেহেরপুর গেল।

মানস চৌধুরী : তাই নাকি! মানে কে কে গেলেন বাবা-মা…

 

মনোরম পলক : পৌষী, আমার ছোটো বোন।

মানস চৌধুরী : ও আচ্ছা। বাবা-মা বাসে গেলেন? আচ্ছা এগুলো তো খুব কেমন জানি লাগে শুনতে; মানে, ওরা নিরাপদ তো সকলে মেহেরপুরের জন্য?

 

মনোরম পলক : হ্যাঁ, আশা করা যায়। আপনি এখন আপনার মেহেরপুরের একটু স্মৃতি বলেন। আপনার প্রিয় একটা জায়গা বলেন মেহেরপুরের।

মানস চৌধুরী : প্রিয় খুব ডিফিকাল্ট বলা। কিন্তু আমার মাঝেমধ্যে যে রাস্তাটা মনে পড়ে সেটা হচ্ছে কলেজের রাস্তা। সেটার একটা কারণ হতে পারে ওই যে আপনার যেমন পাশ্চাত্য সাহিত্যের ঝাউবনে বা আমাদের অনেকেরই মননে ঝাউয়ের একটা গুরুত্ব আছে না! ঠিক একই রকমভাবে যদি আপনি মেহেরপুর অঞ্চলটা ভাবেন মানে সনাতন মেহেরপুর। তাহলে বাবলা গাছের কিংবা শিশু গাছ এগুলো কিন্তু অনেক পুরাতন বনায়নের অংশ। আমার বিবেচনায় বনায়নে শিশু গাছ এসেছে কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে, আর বাবলা এসেছে জনপদের লোকজনের কাছ থেকে মানে স্থানীয়দের থেকে। কিন্তু ওই কলেজের রাস্তাটাতে দুটোই। দু-একটা বাবলা অথবা স্মৃতিতে কল্পনাতে বাবলা এসে যোগাযোগ হয়েছে, আর দু চারটা শিশু। আপনি তো মেহেরপুর গেছেন। অবশ্য ৩০ বছর আগের কথা। কিন্তু কলেজ বলতে বোঝাচ্ছি যেটা সেটা হচ্ছে ঐদিকে ওয়াপদা আর এদিকে হচ্ছে আপনার পোস্ট অফিস। এই যে সরল রাস্তাটা, হয়তো দু কিলোমিটার হবে। এই রাস্তাটা আমার খুব আকস্মিকভাবে মনে পড়ে। আমার ধারণা এর একটা কারণ হতে পারে যেহেতু দু’বছর আমি কলেজে পড়েছি এবং সে দু’বছর অনেক সময় আমি সাইকেলে আসা-যাওয়া করেছি। ওই রাস্তাটায় কিছু সেগুন গাছ, কিছু শিশু গাছ, এবং কিছু বাবলা গাছ। মানে, আমার স্মৃতি সাজানোটা কিছুটা এরকম। ওই রাস্তাটা আমার পছন্দ। অনেকেরই যেমন ‘গড়ের’ পুকুর পছন্দ। আমার ওই রাস্তাটা। এটা একটি সরল রৈখিক রাস্তা এবং আমার ভালো লাগে ভাবতে।

 

মনোরম পলক : বাহ!

মানস চৌধুরী : আমি নিশ্চিত ভোকেশনাল ইত্যাদি পার হয়ে ওখানে একটা সিনেমা হল ছিল। সিনেমা হলটার নাম ভুলে গেছি। তার পাশে আবার লাশকাটা ঘর ছিল। খুব ইন্টারেস্টিং। সিনেমা হলের ওই রাস্তাতেই। আবার তামাক চাষের সময় কিছু তামাক ক্ষেত পাশে ছিল। আবার নেমে নজরুল স্কুলে যাওয়া যেত। ফলে ওই রাস্তাটা আমি আন্দাজ করি ৩০ বছরে বদলে গেছে। কিন্তু আমার স্মৃতিতে তো আগের ওইটা আছে এবং ওইটার একটা অদ্ভুত মায়াবী ইংরেজিতে বললে ম্যাজিকাল স্মৃতিচারণ হয়। ওই রাস্তাটার কথা মনে পড়ে খুব। আর হলো শৈশবের একটা স্মৃতি আছে, সেটা হলো আপনার ওই যে গোবিপুরে হয়তো স্যার নিয়ে গেছেন আমাদের। এগুলো টুকরো টুকরো মনে আসে। কিন্তু যদি সিনিক বিউটি আকারে মনে পড়ে তাহলে কলেজের রাস্তাটা।

 

মনোরম পলক : আপনার ইন্টারভিউর বইটা পরে একটা প্রশ্ন মনে হলো সেটা হচ্ছে আপনি জন্মালেন যেখানে সেখান থেকে কিন্তু খুব অল্প বয়সেই চলে গেলেন মেহেরপুরে। তারপরে হচ্ছে মেহেরপুরে আপনার শৈশবটা কাটলো কিন্তু সাধারণত যেটা আমার দেখা, নরমালি, যেখানে বাড়ি, যেখানে জন্ম সেখানেই শৈশবটা অন্তত কাটে তারপরে মুভমেন্টটা হয়। আপনার ক্ষেত্রে যেটা হলো জন্মের সাথে সাথেই স্থানান্তর হলো। শৈশবটা কাটলো অন্য এক জায়গায়। এখন বাকি জীবনটা পরিচালিত হচ্ছে সে ক্ষেত্রে যদি ঢাকা বলি তাহলে আরও অন্য এক জায়গায়। তো মেহেরপুরটাকে কি আপন করে নিতেন?

মানস চৌধুরী : নিশ্চয়ই বুঝবেন, পলক, এই প্রশ্নটার মধ্যে যদি সাবজেক্টিভ অংশটা বাদও দেই, তাহলেও এটার ভিতরে একটা লিটারেরি লেগেসি আছে। আপন, তাই না, আপন আমরা কখন বলি? এখন হয় কি কেউ ওই লিটারেরি লেগেসিটাকে চাইলেই সেন্টিমেন্ট বলতে পারেন। আমি আপাতত সেন্টিমেন্ট না বলে লিটারেলি লেগেসি বলে ডিফাইন করলাম যে আমার ‘আপন’ এলাকা। আসলে তো ধরেন জনপদের সাথে আমাদের যে বিলঙ্গিংস বা বিজড়ন, তার সাথে যে জড়িয়ে থাকা এগুলো আমার বিবেচনায় কিন্তু হচ্ছে নিরপেক্ষ। এটার ইন্টারপ্রিটেশনটা ইচ্ছাসাপেক্ষ হতে পারে। কখন মনে করব, কখন বলব, যেমন আপনার প্রশ্নের উত্তরে আমি রাস্তাটার কথা বললাম। আমার সনাতনী আলাপে দু’দিন হোক বা কুড়ি দিন হোক আমি মেহেরপুর মিস করি না, মানে যেগুলো প্রচলিত ভঙ্গি সেগুলো নেই। কিন্তু আপনার একটা প্রশ্নের উত্তর আমি রাস্তাটাকে বাছাই করতে পারলাম। এগুলো তো ধরেন আমার জন্য মনে হয় ইন্টারেক্টিভ। অর্থাৎ অডিয়েন্স প্রান্তে এবং বক্তা প্রান্তে একটা সেতুবন্ধনের মধ্য দিয়ে চলে, সেন্টিমেন্টাল হন বা আমার মতো খসখসে হন। এখন মেহেরপুরের সাথে বা যেকোনো শহরের সাথে আমাদের যে জড়িয়ে থাকা তা ইচ্ছা-নিরপেক্ষ বলে আমি মনে করি। আপনি একটা নির্দিষ্ট রাস্তায় চিঠি ফেলতে যাচ্ছেন, একটা নির্দিষ্ট রাস্তায় বাস কাউন্টারে যদি কখনো চুয়াডাঙ্গা যাওয়া লাগে, আর একটা জায়গাতে বাবার হাত ধরে বা পাশে হাঁটতে হাঁটতে বইয়ের দোকানে যাচ্ছেন, মেহেরপুরে কাঁচা বাজারে মাছ কিনতে যাচ্ছেন। আমি এই সবগুলোকেই বলছি ইচ্ছে-নিরপেক্ষ দর্শন। বলছি এই কারণে, আপনি সত্যি সত্যি মাছ কিনতে দিল্লি রওনা দিচ্ছেন না। যদি মাছ কিনতে চান তাহলে ওখানেই যাচ্ছেন। এই যে পৌনঃপুনিকতার মধ্য দিয়ে আমাদের বয়স বাড়ে, সেটা যাই হোক না কেন। কিন্তু স্মৃতির তো একটা ধর্ম পৌনঃপুনিকতা। ওই যে বাস স্ট্যান্ডে যাওয়াটা, ওই যে বড়োবাজারে যাওয়াটা, ওই যে কাপড়ের দোকানে গেলে আগারওয়ালের দোকানে যাওয়াটা, (তখন কাপড় দোকানে গেলে আগারওয়ালের দোকান এবং আরেকটা দোকান ছিল নাম মনে করতে পারছি না, তবে কাছাকাছি দূরত্বে)— এই যে জনপদের যে একটা মানচিত্র মাথায় ধারণকৃত এটাকে আমি বলছি ইচ্ছে-নিরপেক্ষতা। এটা আপনার আমার ইচ্ছাতে ঠিক বদল ঘটে না। বদল ঘটে পরে যখন আমরা স্মৃতিচারণ করতে বসি তখন। সেই কারণে আমি মনে করি মেহেরপুর আমার আপন হওয়া না-হওয়া— যদি আপন হওয়াটাকে এখন আমি আমার পদ্ধতিতে ডিফাইন করি তাহলে— মেহেরপুর আপন হওয়া আমার ইচ্ছাসাপেক্ষ দশাতেই ছিল না। কিন্তু এটাও সত্য যখন আমি ঢাকায় চলে এসেছি তখন, কিংবা একইরকমভাবে এখনো, আর ভাষাতে অমুকটা মিস করি না। ভাষা মানে তো চিন্তাও। আমার চিন্তাতেও কিন্তু আসলে মিস করি না। এটা আমার চিন্তা প্রণালীতে কোনো একসময় গণ্ডিগত হয়ে গেছে একেবারে। বরং আমাকে যদি বলেন আমার শৈশবের স্মৃতি হাতড়াতে হলে বরগুনাই বরং আপনার প্রায় পৌরাণিক দূরত্বে চলে গেছে। আমার শৈশবের স্মৃতি যদি তুলতে হয় তাহলে সেটা অনায়াসেই মেহেরপুর থেকে তুলতে হবে। মানে এরকম কিন্তু স্মৃতি তোলার ব্যাপারে আমার খুব বেশি নিয়মিত কোনো চর্চা নেই যে চর্চাটা জারি রাখতে হবে। ‘জানিস আমি যখন স্কুলে যেতাম..’! যেগুলো আপনি জানেন যে মডেলগুলো। ‘তখন কিরকম সুন্দর দিন ছিল’—এগুলো চিন্তাপ্রণালীতে আমার নেই। কিন্তু মেহেরপুর একদম জাগরুক। অনেকগুলো বছর খুব গুরুত্বপূর্ণ বছর। ৬ থেকে ১৬-১৭ যদি বলেন একেবারেই মেহেরপুরে। আমার শৈশব বলতেই আমি মেহেরপুর আসলে বুঝি। বরগুনাটাই বরং বললাম না পৌরাণিক দূরত্ব হয়ে গেছে। কারণ তার ধারাবাহিক দৃশ্যাবলী মাথায় নেই।

(কলিংবেলের আওয়াজ শোনা যায়। মনোরম পলক তার নানাকে এটেন্ড করে ফের এসে আলাপে বসেন। )

 

মনোরম পলক : আচ্ছা যা বলছিলেন…

মানস চৌধুরী : আমার শৈশব কানেক্টেড মেহেরপুরের সাথে ভীষণভাবে। জায়গা বা দৃশ্যের স্মৃতি যেমনই হোক, কিন্তু সঙ্গ খুব গুরুত্বপূর্ণ। নাসির ভাই, মনা ভাই, তরুণ দা, রবু ভাই অন্যান্যভাবে অরুণ ভাই, শিবনারায়ণ জ্যেঠু, ইসমাইল স্যার, দাশু জ্যেঠু। আমি বলতে চাচ্ছি আপনি যখন বড়ো হয়ে পিছনের দিকে তাকান— যে মানুষগুলো আপনার শিক্ষক ছিলেন, শিক্ষক তো নানান ভাবে; তাঁদের কারো কারো সাথে মৈত্রী ছিল, কারো কারো সাথে বৈরিতা তৈরি হয়েছিল— সেভাবেই তো আপনি যদি নির্মোহভাবে পিছন দিকে তাকান তাহলে তো দেখা যায় এঁরা সকলে ওখানে ছিলেন। ওঁরা ওখানে ছিলেন বলে আজকে আপনি। আপনার অনেকগুলো টুকরো ওনাদের কাছ থেকে নেয়া; এভাবেই তো হওয়ার কথা। সে টুকরোগুলো তিনি না জানলেও কিন্তু আমার নেয়া। নাসির ভাই হয়তো তাঁর সতেরো টুকরো চেনেন না! কিন্তু কথার কথা! নাসির ভাই হচ্ছেন ঘটনাচক্রীয় ভাই মানে সাংগঠনিক ধরনের ভাই, বয়সের হিসাবে নন। যদি বলি উনি সকলের ভাই ছিলেন, বলা চলে। মনা কখনো ছিলেন ভাই, কখনো ছিলেন চাচা। কারণ বাবার দিক থেকে গেলে চাচা, যা হয় এগুলো ছোটো শহরে। কিন্তু আমি বলছি এই সকল সংগঠক এই সকল মানুষ ভিন্ন ভিন্ন ভাবে নানান রকম টুকরো আপনার জীবনে সরবরাহ করেন। ছোটো শহরের ক্ষেত্রে সেটা আরও সত্য, মহানগরে হয়তো সব সময় এগুলো টের পাওয়া যায় না। ফলে বড়ো হওয়ার পরে যদি বলা যায়— আমি নির্মোহভাবে বলি, আবেগের একটা দুনিয়া আছে, সেটা অন্য প্রসঙ্গ, আমাকে খুব বেশি একটা ইয়ে করে না— কিন্তু আমি বলতে চাচ্ছি যে, আমি যদি নিজের বায়োগ্রাফির দিকে তাকাই তাহলে মেহেরপুরের অনুষঙ্গ শুধু আপন নয়; আপন শব্দটাকে আরো ভেঙে বলছি আর কি। আপন তো বটেই। যেটাকে ইংরেজিতে বলে ফাউন্ডেশনাল, মানে আমার গড়ে ওঠার অনেকগুলো টুকরো এইসকল কারিগর দ্বারা সরবরাহকৃত। সেটা তাঁদের অনবধানতাবশত হতে পারে। সেটা ওঁরা বলতে পারেন যাঁরা বেঁচে আছেন। সেটা প্রসঙ্গ নয়। আমি দেখতে পারি যে ওঁরা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকমের কারিগর ছিলেন এবং অবশ্যই সবচেয়ে সাংঘর্ষিক সম্পর্ক বোধগম্য ভাবেই মাসুদ অরুণের সাথে হয়েছিল। তো সেটা বোধহয় বোধগম্য। কিন্তু তাতে করে তিনি যখন কারিগর ছিলেন তা মিথ্যে হয়ে যায় না।

 

মনোরম পলক : অন্য প্রসঙ্গে আসি, আপনার প্রিয় কবি কে?

মানস চৌধুরী : একজন তো নন। বা বলা যায় কোনো একভাবে, পদ্ধতিগতভাবেই, আপনার প্রিয় হিসাবে একজন বা দুজনের নাম বলবার যে চর্চাগুলো—আছে প্রিয় খাবার, প্রিয় পোশাক—থাকে না? তারকাদের তো একটা স্ট্যান্ডার্ড ইন্টারভিউ আছে। আমি বলছি যে এন্টারটেইনমেন্ট তারকাদের থাকে না যে আপনার প্রিয় ডিস কী? প্রিয় নায়ক কে? তো আমার মনে হয় আমি কোনো না কোনোভাবে এটার পদ্ধতিগত যে ত্রুটি তা আমি ছোটোবেলায় আবিষ্কার করেছি যে প্রিয়তা আসলে একটা তাৎক্ষণিকতার প্রসঙ্গ। সত্যি সত্যি যখন স্কুলে ছিলাম—ছিল গোবিন্দ দাসের বর্ষার বিল। এতদিন পরে নামটাও বলতে পারলাম যে ‘বর্ষার বিল’। এটা তো সহজ না! একাদশ শ্রেণির দশম শ্রেণির বইয়ের একটা কবিতার নাম বলতে পারা! তার মানে অতটাই কিন্তু ভিজ্যুয়াল আর আমাকে আচ্ছন্ন করেছিল বর্ষার বিল। এখন ঢাকা শহরের অনেক আধুনিক কবির কাছে গোবিন্দ দাস একটা নামোল্লেখ করার মতো কবিও নন। তখনকার শিক্ষাবোর্ড যেভাবেই হোক না কেন হয়তো বাংলার রূপের কারণে রেখেছিলেন। এখনকার শিক্ষাবোর্ড সহজেই কোনো গোবিন্দ দাসকে রাখে না। আমি বলতে চাইছি যে, যখন ওইটা কিনা আমাকে আচ্ছন্ন করল যেটা কিনা আমি এত বছর পরে, ৩৫ বছর পরেও এখনো মনে করে বলতে পারছি, তাহলে ওটাকে অপ্রিয় বলার কোনো সুযোগ নেই। অন্য সময়, যখন কিনা আমি অক্ষরবৃত্ত ছন্দে ‘মেঘনাদ বধ’ পড়ছি তখন তো মধুসূদন আচ্ছন্ন করছেন। ফলে এই যে মুহূর্তগুলো, আমাদের জীবনকে যাপন করার বা যেই মুহূর্তে আমরা যে জীবন যাপন করি সে কারণেই এটা একটা অনন্ত তালিকা হওয়ারই কথা। কিন্তু অন্যরা সেভাবে না দেখার কারণে চাপ পড়ে। আপনি যখন বলেন যে একজন কীভাবে হবে তখন দেখা যায় যে আপনার উপরে চাপ পড়ে। ‘কেন হবে না, সবাই তো বলতেছে, তুমি কেন পারবে না?’ ফলে আমার কাছে মনে হয় যে এটা বিভিন্ন ফেইজে বিভিন্ন রকমে বিভিন্ন মোডালিটিতে আমাদের চিন্তাপদ্ধতিতে বিভিন্ন রকমের মানুষ আচ্ছন্ন করেছেন। লম্বা সময় ধরে আমি পড়েছি বাংলাদেশের অনেক তরুণদের মতোই জীবনানন্দ দাশের কবিতা, আল মাহমুদের কবিতা। গুচ্ছের তরুণরাই আধুনিককালে এটা করেন; ফলে আলাদা কিছু বলার নেই। কিন্তু এর বাইরেও ধরেন, যে সময় হেলাল হাফিজ, রুদ্র মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ ছিলেন! ঢাকায় রুদ্র অন্তত যে ধরনের ঝড় তুলেছিলেন! কিন্তু এটা সত্য যে আমি আমার প্রজন্মের অনেক পাঠকের তুলনায় তসলিমা নাসরিনের কবিতার অনেক বেশি মনোযোগী পাঠক ছিলাম। পুরুষ পাঠকদের তুলনায় তো বটেই! পরীক্ষার খাতাতেও তার ‘শিকার’ কবিতাটা আমি ক্যোট করেছিলাম। মনে আছে; সাধারণত কবিতা আমি মুখস্ত করতে পারি না। কিন্তু আমার মনে ছিল, ‘শিকারী পুরুষ হাতিয়ার নিয়ে শিকারের খোঁজে’—এরকমই ছিল। এই যে বলছিলাম তার মানে ১৭-১৮-১৯ বছরের আমার একটা সেকেন্ড ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষার খাতাতে আমি তসলিমা নাসরিনের কবিতাও দু’লাইন লিখে দিচ্ছি। সমাজবিজ্ঞানের খাতাতে খুবই ধৃষ্টতামূলক কাজ ছিল। কিন্তু ওই পর্যায়ে নিশ্চয়ই উনি পছন্দ হয়ে পড়েছিলেন তার ভাবনা দিয়ে। ফলে আমি বলব যে, পলক, এটা না একটা এন্ডলেস জার্নি।

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

জন্ম ১৭ নভেম্বর, ১৯৯৯; ঢাকা । জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত; "Where Is Kajol?" এর প্রতিষ্ঠাতা।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।