রবিবার, এপ্রিল ১৪

মায়াসরসী : রিফাত আনজুম পিয়া

0

আয়নায় তাকিয়ে থাকে আফসানা। মগ্ন, কিন্তু নার্সিসাসের মুগ্ধদৃষ্টি নয়। খোঁজে, খুঁজেই যায়। কোথাও সরসীকে দেখতে পায় না। না মায়াবিনী সরসী, না মায়াবতী সরসী। অথচ আফসানাকে হাপিস করে সরসী তার সমস্ত অনুভূতিতে গ্রাস করে ফেলেছে।

ভারী চশমা চোখের তলায় ধূসর খাদ খুঁড়েছে। ভুরুর ওপরে দুটি সমান্তরাল খাঁজ। নিষ্প্রাণ ফ্যাকাশে মুখ। খসখসে ঠোঁট। কোথাও সরসতার লেশমাত্র নেই। মায়াসরসীকে ভাবলে যে মুখ ভেসে ওঠে, সে কোথায়…গল্পে-কথায় শ্যামলের মনে সরসীর যে পোর্ট্রেট আর রক্ত-মাংসের এই মুখ…

শ্যামলের আভাস পাওয়ামাত্র আফসানার মুখ কোমল হয়। চোখে যখন তারা জ্বলে ওঠে, দেখা-যায়-কি-যায়-না এমন ক্ষীণ আরক্তভাব ফোটে গালে। শুকনো ঠোঁট দুটো যখন আলগা হয়, তখন মায়াসরসীকে এক ঝলক দেখা যায়, দেখার চোখ থাকলে। আয়নায় সলাজ হেসে ওঠে মায়াসরসী। আফসানার তখন সূর্যমুখী ফুল মনে হয় নিজেকে, শ্যামল সূর্যের দিকে তাকালে যে চোখ খোলার মতো একটা একটা পাপড়ি মেলে ঝলমলিয়ে ওঠে।

 

২.
শ্যামল আসছে। আগামীকাল। সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়-হয় যখন, তখন। পৃথিবীর অলিগলি আনাচ-কানাচ চষে বেড়ানো শ্যামল আফসানাদের উদাসপুরে পা ফেলেছে বহু আগেই। তখন না শ্যামল চিনত সরসীকে, না সরসী শ্যামলকে। আদতে মায়াসরসীর তখন জন্মই হয়নি। শ্যামলের এবারের আগমন সরসীর আমন্ত্রণে। বছরখানেক হলো মেসেঞ্জারে তাদের আলাপ। ওই কতগুলো শব্দে তো নয় কেবল, ভাববিনিময় ঘটে যায় কত অদৃশ্য তরঙ্গে, মাত্রায়…।

পৃথিবীর অলিগলি আনাচ-কানাচ চষে বেড়ানো শ্যামল আফসানাদের উদাসপুরে পা ফেলেছে বহু আগেই। তখন না শ্যামল চিনত সরসীকে, না সরসী শ্যামলকে।

যেমন জীবনের স্বপ্ন বহু লোকে দেখে, আর এমন স্বপ্ন বাস্তবতার মাপে আঁটে না ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেলে, তেমন জীবন শ্যামল হেসেখেলে কাটায়। কোনো ধরাবাঁধা চাকরির ধার ধারে না। বনবাদাড়েই পাখিগণনা, বাঘগণনা, ওয়াইল্ড লাইফ ফটোগ্রাফি-ডকুমেন্টারির কাজ—যখন যা মেলে। হেঁটে হেঁটে, দৌড়ে দৌড়ে, উড়েঘুরে বেড়ানো সহিষ্ণু শরীর, উৎসুক মন। পথে পথে আস্তানা গাড়ে, বন্ধু খুঁজে নেয়। ভ্রমণে হোটেলের পয়সা গুনতে হয় কদাচিৎ। দুনিয়াজোড়া বন্ধু। কোনো সম্মোহন-টম্মোহন কি ছল-চাতুরী নয়…কী এক সহজাত টানে সে অপরিচিতদের ভেতর থেকে আপনজন টেনে নেয়। যেখানেই যায়, স্থানীয়দের কাতারে দাঁড়িয়ে তাদের একজন বনে যায়। নিজেকে আরেকটু ছড়িয়ে দেয়। নিজের খানিকটা সে ফেলে আসতে চায় সমস্ত পৃথিবীতে। যেমন তার শরীরে কত জাতির মানুষের ডিএনএ। তবু দেশবিদেশের রংবেরঙের মানুষ যতটা না টানে, তার চেয়ে অনেক গভীর টান ওই মেঘভেদী পর্বতের, নিশ্ছিদ্র জঙ্গলের বিচিত্র পশু-পাখির, কীট-পতঙ্গের, গভীর গিরিখাদের, নীলাভ-সবুজাভ সমুদ্রের…বুনো প্রকৃতির বুকের ভেতর হারিয়ে না গেলে সে নিজেকে খুঁজে পায় না। প্রকৃতিতে লীন হয়ে যায় যখন, আদিম পূর্বপুরুষদের সাথে সংযোগ খুঁজে পায়, নিজেকে হঠাৎ হঠাৎ জাতিস্মর মনে হয় তার। সে রকম ধ্যানস্থ মুহূর্ত থেকে মানুষের কোলাহলে সরাসরি ফেরা যায় না। ফের সংযোগ ঘটাতে বইয়ের পাতায় মুখ গোঁজে। তারপর একদিন নিস্তব্ধতা ভেঙে হাসিমুখে ভেড়ে, ‘বন্ধু, কী খবর বলো?’

এমন মানুষ ফেসবুকে পড়ে থাকে না। তবু যখনই ফুঁড়ে বেরোয়, অদ্ভুত কোনো গল্প, বিস্ময় জাগানিয়া কোনো ছবি থাকে সাথে। মায়াসরসীই তাকে প্রথম লিখেছিল—

‘আপনার লেখা পড়তে গেলে মাথার ভেতর কত দৃশ্যের জন্ম হয়। আপনার শব্দেবোনা, ক্যামেরায়গাঁথা ছবিরাশি যে সব কবিতা লিখে যায়, তারা আনন্দ-বিস্ময়-রহস্য-মায়ায় বাঁচবার আগ্রহ জিইয়ে রাখে। আপনি যে আমাদের মতো মরে যাননি, তুমুলতায়-নিবিড়তায় বেঁচে আছেন, আপনার সেই সঞ্জীবনী ধারা উছলে পড়ে বলে আমাদের লাশও টাটকা থাকে।’

মানুষের টান শ্যামলের চেনা। হৃদয়ের কোনো প্রদেশ থেকে ডাক উঠছে, তা ধরতে পারে। সরসীর স্বরকে সে আলাদা করতে পারল।

অপরিচিতার প্রোফাইলে গিয়ে দেখে, কোনো মানুষীর ছবি নেই সেখানে। আছে সন্ধ্যা হয়-হয় মুহূর্তে সিঁড়িঘরের মাথায় তিন জ্ঞানী প্যাঁচার ঝাপসা ছবি, তাদের সাথে সাক্ষাতের গল্প। জঙ্গলে ঘুরতে গিয়ে হঠাৎ দেখা সাদা লেসের ঘোমটাপরা ছত্রাকসুন্দরীর ছবি। বাড়ির বাগানবিলাসের ঝাড়ের ছবির সাথে নানাবাড়ির ফটকছাওয়া বাগানবিলাসময় শৈশববৃত্তান্ত। হাত-সেমাই বানিয়ে শোনানো মায়ের বানানো হাত-সেমাইয়ের স্মৃতি, সাথে পাশের বাড়ির আঙ্গুর চাচির সেমাই মেশিন থেকে মোটা সুতোর মতো সেমাইয়ের গোছা বেরিয়ে আসার মুহূর্তগুলি। বাড়ির জবা গাছে দোল খেতে খেতে জবার বুকে মুখ গুঁজে দেওয়া মৌটুসি পাখি। ঘর-গেরস্থালির ছবি।

সুখী গৃহকোণের মায়া শ্যামলকে আটকায় না। তবু ভালো লাগে। মা বেঁচে থাকতে অলস কয়েকটা দিন সে কাটিয়ে দিত তাদের শান্ত মফস্বলের খোলামেলা বাড়িটায়। ছেলের প্রিয় সব খাবার খাইয়ে-দাইয়ে আর লতায়পাতায় যত আত্মীয়কুটুম্ব আছে সবার গল্প শুনিয়ে গভীর তৃপ্তিতে নিদ্রা যেত মা।

মায়াসরসী কখনো আবার অন্য চেহারায় হাজির হয়।

ঝড়ে লন্ডভন্ড হোক পরিপাটি গৃহকোণ। বুনো বেনোজল ভাসিয়ে নিক পুরাতন। স্মৃতিসঞ্চয় লোপাট করুক চোর। এই মমির শরীর হাজার বছর সিন্দুকবন্দি। তুমি এসে তাণ্ডব চালাও। পুনরুত্থিত করো হে। মমি গলুক মোমের মতন।

এই ফেসবুক আইডির আড়ালের মানুষটার নাম-পরিচয়-ঠিকানা-পরিবার-পরিজনের কিছুই জানে না শ্যামল। তবু মায়াকে আপন লাগে। হাজার হাজার পেন্ডিং ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট সত্ত্বেও হরেদরে ফেক আইডির মতো তাকে ছেঁটে ফেলতে পারে না।

শ্যামল: আপনি ঘুরতে বের হন না?

মায়া: আপনি যেমন, ‘হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে’, আমি—হাজার বছর ধরে ঘুরপাক খাচ্ছি ঘরের চৌকাঠে। তবে আপনার ছবি আর লেখা আমাকে সেটা ভুলিয়ে দেয়। আমি আপনাদের সঙ্গী হয়ে খোলা প্রান্তরে শ্বাস নিই।

মায়াসরসী একদিন লিখল—

শুনুন, আমার বাড়ি আসুন। আপনাকে বড়ো যত্ন করে মচমচে ভাজা টুকুস মাছ, কালিঞ্চি পাতার ভর্তা আর সিজিলের চচ্চড়ি দিয়ে বকুল চালের ভাত খাওয়াব। শেষপাতে খাবেন জোছনাক্ষীর। তারপর দেখাতে নিয়ে যাব নীলছায়া বিল—আশ্চর্যজনকভাবে এ যুগেও যে নিজেকে অজ্ঞাতে রেখেছে।

একদিন আসুন উদাসপুর।

শ্যামল লিখল—

সরসী, আপনি মায়াবতী না মায়াবিনী? একদিকে আপনাকে কুহকিনী মনে হয়, কোনো অচেনা সুর শুনিয়ে কোথায় যেন টেনে নিয়ে যাচ্ছেন… আবার পরক্ষণেই চেনা স্বরে জলের মতো ঘুরে ঘুরে কথা কন…

আরও কত কথা গড়ায়, কিন্তু মায়াসরসী জমিনে নেমে আসে না।

সবাই আমাকে কোন নামে চেনে, তাতে কী এসে যায়। আপনি আমাকে বিশ্বাস করে উদাসপুর আসবেন একবার? মায়াসরসীকে সামনাসামনি কেউ কখনো দেখেনি। তাই এই পরিচয়পর্বে আর কারও প্রবেশ না ঘটাই ভালো, কী বলেন?

 

৩.
আয়নার সামনে বেশিক্ষণ একলা থাকা যায় না। হন্তদন্ত হয়ে অঙ্কুর চলে আসে সামনে। ওর ডান হাতে জেমস চকলেটের প্যাকেট আর কম্পিউটারের কাটা তার। বাম হাত দিয়ে বুকের সাথে জাপটে ধরেছে বেস্টফ্রেন্ড তাতাকে। তাতা একটা মলিন রংচটা কিম্ভূত খেলনা এলিয়েন। অঙ্কুরের সতেরো বছরের জীবনে চৌদ্দ বছরকার সঙ্গী।

‘মা!’ উদ্বিগ্নমুখে কাটা তারটা দেখায় সে।

‘আহহা! একটা অ্যাত্তোবড়ো ধেড়ে ইঁদুর রান্নাঘরে ঘোরাফেরা করছিল কাল রাতে। ওই দুষ্ট ব্যাটাই মনে হয় দাঁত দিয়ে কুট্টুস করে কেটে ফেলেছে, আব্বু।’

‘করিম মামা!’ অঙ্কুর ইতোমধ্যে অধৈর্য।

‘আচ্ছা, আচ্ছা। তোমার করিম মামাকে বলব এসে কম্পিউটার ঠিক করে দিতে।’

বারান্দা থেকে চমন ম্যাঁও ম্যাঁও করে নিজের উপস্থিতি জানান দেয়।

আফসানা অঙ্কুরের মনোযোগ ঘোরানোর মওকা পেয়ে যায়।

‘চলো, চমনকে দেখে আসি।’

‘চমন জেমস খাবে!’

‘উঁহু। চকলেট খেলে চমনের পেট খারাপ হবে, বমি করবে।’ মুখে বলার পাশাপাশি অঙ্গভঙ্গি করে বুঝিয়ে দিল আফসানা। এখন অবশ্য অঙ্কুরের জন্য মুখের কথাই যথেষ্ট। তবু দীর্ঘদিনের অভ্যাসে তার গোটা শরীর কথা বলে যায়।

এ বাড়িতে পাড়ার বেড়াল চমনের নিত্য আনাগোনা, বলা যায় বাঁধা অতিথি। তার প্রতি অঙ্কুরের যত মান-অভিমান, তত ভালোবাসা। অঙ্কুর এখন যথেষ্ট শান্ত। আগে পথের বেড়াল-কুকুররা তার নির্দেশ না মানলে ঝাঁপিয়ে পড়ত। ছোটোবেলায় দুবার আঁচড়-কামড় খেয়ে হাসপাতাল ঘুরে ব্যান্ডেজ আর একগাদা ইনজেকশন নিয়ে বাড়ি ফিরতে হয়েছিল।

‘চলো আব্বু, আমরা দেয়ালে চমনের ছবি আঁকি।’

‘উঁহু…কম্পিউটার।’

কাগজ-ক্যানভাস-দেয়ালের চাইতে কম্পিউটারে আঁকাআঁকিতেই বেশি ঝোঁক। পরপর দু’রাত ও ঘুমাচ্ছে না ঠিকমতো। স্ক্রিনের সামনে সারাদিন পড়ে থেকে ছেলে যেন ঘুমের বারোটা না বাজায়, তাই ভোরবেলা নিজ হাতে সিপিইউ-এর একটা তার ভোঁতা কাঁচি দিয়ে কেটে রেখেছে আফসানা।

ছবি আঁকায় অঙ্কুরের বেজায় আগ্রহ। ইদানীং কাগজ-ক্যানভাস-দেয়ালের চাইতে কম্পিউটারে আঁকাআঁকিতেই বেশি ঝোঁক। পরপর দু’রাত ও ঘুমাচ্ছে না ঠিকমতো। স্ক্রিনের সামনে সারাদিন পড়ে থেকে ছেলে যেন ঘুমের বারোটা না বাজায়, তাই ভোরবেলা নিজ হাতে সিপিইউ-এর একটা তার ভোঁতা কাঁচি দিয়ে কেটে রেখেছে আফসানা।

‘করিম মামা! করিম মামা! করিম মামা!’ অঙ্কুর আওয়াজ চড়িয়ে এলোপাতাড়ি হাত ছুড়ে মেঝেতে পা ঠুকে গোঙাতে থাকে।

আফসানা বাধ্য হয়ে করিমকে কল দেয়, ‘হ্যালো, করিম ভাই, আমাদের বাসায় একটু আসেন তো। অঙ্কুরের কম্পিউটারের কেবল কেটে গেছে।’

হাতের পাঁচ আঙুলের চিরুনিতে অঙ্কুরের চুল গুছিয়ে দিতে দিতে বলে—

‘তুমি চমনের জন্য মাছ রান্না করবা না আব্বু? চলো, আমাকে হেল্প করো।’

বাসায় যে মাছ রান্না হয়, সেটাই একটু সরিয়ে রেখে হালকা সেদ্ধ করে চমনকে খেতে দেওয়া হয়। এ পর্বটা অঙ্কুরের খুব পছন্দের। আফসানা পাশে দাঁড়িয়ে থাকে আর অঙ্কুর চমনের ছোট্ট পাতিলে কাঁচা মাছের টুকরা নেয়; একটু হলুদ, একটু লবণ আর একটু পানি দিয়ে চুলায় বসিয়ে দেয়। পানি ফুটতে শুরু করলে উবু হয়ে ঘ্রাণ শোঁকে।

চমনকে মাছ খাওয়াতে অঙ্কুর ব্যস্ত হয়ে পড়লে আফসানা ছেলের ঘরের একমাত্র ফাঁকা দেয়ালে দ্রুত কয়েকটা ফিগার আঁকার চেষ্টা করে। আফসানা, অঙ্কুর, চমন, তাতা। সাথে নাজনীন আর তার তিন ছেলেমেয়ে। এই ছবিগুলো রং করার ভার অঙ্কুরের হাতে গছিয়ে দিলে সারাদিন এ কাজেই সে ডুবে থাকবে। আর একবার ডুবে গেলে, তাকে খাওয়ানোর জন্যও ওঠানো যাবে না। ছবি আঁকতে আঁকতে ক্লান্ত হোক ছেলে, গা কাঁপিয়ে খিদে নামুক। তারপর মায়ের হাতে ভরপেট খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ুক। ঘুম খুব দরকার ওর। দু’রাত ঠিকঠাক ঘুমায়নি।

কাল সকালসকাল ওকে নাজনীন আপার বাড়িতে রেখে আসবে সে। পুরো শহরে এটাই অঙ্কুরের সেকেন্ড হোম। দোলনা আছে ও বাড়িতে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দোল খাওয়া অঙ্কুরের পছন্দের কাজ। নাজনীনের তিন ছেলেমেয়ে শ্রাবণী, মেঘ আর ফাগুনের সাথে খুব বন্ধুত্ব ওর। মেয়েটা ভার্সিটির ছুটিতে বাড়িতে এখন। ইদানীং ওর প্রতি অঙ্কুরের টানটা বেশ নজরে পড়ে। এই চিরশিশু অঙ্কুর, যার গা থেকে এখনো দুধের গন্ধ মিলায়নি বলে মনে হয়, শিশুর সারল্যে শ্রাবণীর পাশে ঘুরঘুর করে, বড়ো বড়ো চোখে তাকিয়ে, বয়ঃসন্ধির বিহ্বল সময়ে নিজেকে আবিষ্কার করছে।

 

৪.
শ্যামল, শ্যামল, শ্যামল!

তোমার সামনে আমি মায়াসরসী, আর কেউ নই। আমার আর যত পরিচয়চিহ্ন, সব আউট অব ফোকাস হয়ে যাক। আমি কার মা, কার বোন, কার শিক্ষক—তাতে কী এসে যায়? জানো, আমি কক্ষনো নিজের মতো বাঁচিনি। এইবার দেখো, বাপ-মায়ের আকিকা দেওয়া নামটাও ছেঁটে ফেলে দিলাম। তোমার মতো জন্ম-স্বাধীন মুক্তমানুষ ছাড়া আর কার সামনে আফসানা খোলস ছাড়বে আর মায়াসরসী আত্মপ্রকাশ করবে?

মনে মনে শ্যামলকে কত কথা বলে সরসী। সাহস-আত্মবিশ্বাস কমে দমে গেলে অন্তরার মুখটা উঁকি দিয়ে পিঠে হাত রাখে—আমাকে দেখ না! যদিও বাস্তবে শ্যামলের শ-ও জানে না ও। অন্তরাকে এখনই সব জানাতে ভয় লাগে…যদি শ্যামলের সাথে তার নিবিড় চেনাজানার মুহূর্তটা কখনো না আসে…

অন্তরার সাথে শেষ দেখা বছর দুয়েক আগে, ওর উত্তরার ছোট্ট ফ্ল্যাটে। সেবার একটা ট্রেনিং-এ ঢাকা গেছিল আফসানা। ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের ডর্মে থাকার বন্দোবস্ত থাকলেও বান্ধবীর সঙ্গলাভের সুযোগ হাতছাড়া করতে চায়নি।

‘অন্তু শোন, আমি ঢাকায় আসতেছি। তোর বাসায় তিনটা দিন থাকতে দিবি? উদাসপুরে থাকতে থাকতে বুড়ি হয়ে গেলাম রে। আমিও কি কোনো এককালে কিশোরী কি তরুণী ছিলাম? হাহ্, মনেই পড়ে না! তোর সাথে হল-হোস্টেলের খিলখিলানো দিনগুলার মতো কয়েকটা দিন কাটানোর ইচ্ছাটা ঝাটপটাচ্ছে!’

‘ইস…তোর সেই লিজেন্ডারি সংকোচ, ভান-ভণিতা আর গেল না! এখনই ব্যাগ গুছিয়ে চলে এসো, সানা-সোনা!’

‘আর হ্যাঁ, অজয়ের প্রেজেন্সে কিন্তু একদম আনইজি ফিল করবি না।’

‘অজয় কে রে?’

‘আল পাচিনো জুনিয়র।’

আল পাচিনো! গডফাদারের মাইকেল কর্লিওনির সূত্রে আল পাচিনো ছিল অন্তরার ড্রিম ম্যান। এককালে আফসানাও আল পাচিনোতে মজলেও সে মুহূর্তে সেটা অস্বস্তির অপর নাম। তার এই ডিভোর্সি বান্ধবীর জীবন প্রেমশূন্য থাকেনি কখনো। কিন্তু নিজের ছোট্ট ফ্ল্যাটের নিজস্ব স্পেস সে কারও সাথে শেয়ার করতে নারাজ ছিল। পুরানো দিনের মতো দুই বান্ধবীতে গলাগলি করবে বলে খুব লাফঝাঁপ আর বাকবাকুম করে এখন বিপাকে পড়ে গেল আফসানা। ‘কাবাব মে হাড্ডি’ হয়ে ওদের অস্বস্তির কারণ হয়ে না দাঁড়ায়! আর অজয়ের সামনে দুই সখী খোলামেলা আনসেন্সরড বকবকই বা করবে কীভাবে। একটা পুরুষমানুষের সামনে বুকে কাপড় আর মুখে ফিল্টার এঁটে চলা…শিক্ষকসুলভ মার্জিতভাব আর গাম্ভীর্যের ভং ধরে থাকা…ধুর! ইস! ধ্যাৎ!

কিলবিলানো অস্বস্তিসঙ্কুল মনে আফসানা কলবেল বাজালে দরজা খুলে দিয়েছিল অন্তরা। ঢিলেঢালা কাফতান পরনে। ঘাড় পর্যন্ত ছাঁটা চুল। সতেরো তলার জানালা গলে আসা বিকেলের আলো ছলকে যাচ্ছিল ওর মসৃণ মুখে।

‘তোকে কী সুন্দর লাগতেছে রে!’ অন্তরাকে জড়িয়ে ধরার আগেই আফসানার চোখমুখ থেকে টুপটাপ মুগ্ধতা ঝরে পড়ছিল। ঈর্ষা চিমটি কেটে তুলনা টানছিল—তারা দুই বান্ধবী পাশাপাশি দাঁড়ালে তাকে কমসে কম দশ বছরের বড়ো মনে হবে।

দুই বান্ধবী গেস্টরুমের বিছানায় আধশোয়া হয়ে হাত-পা নেড়েচেড়ে গল্প করতে করতে হাসিতে কেঁপে কেঁপে উঠছিল। কলিং বেলের শব্দে ‘অজয়’ নামটা আনমনে উচ্চারণ করে উঠে গেল অন্তরা আর মুখটা বেজার হলো আফসানার। বাগড়া না বাধালে হচ্ছিল না এই ব্যাটার?

অজয়কে দেখে চমকে উঠেছিল সে। কত আর বয়স হবে? সাতাশ-আঠাশ? আফসানার অবাক-চাউনি তাকে কিছুটা আড়ষ্ট করেছে বুঝতে পেরে অজয়ের পিঠে হাত রেখে হেসে উঠেছিল অন্তরা। অন্তরা-অজয় হাসিহাসি মুখে চোখাচোখি করল যখন, সে দৃশ্য আফসানার দেখা রোম্যান্টিকতম মুহূর্ত হিসেবে সাঁই করে মাথায় গেঁথে গেল কিউপিডের তিরের মতন। সেদিন রাতের খাবার অজয়ই রেঁধেছিল। ওয়ানডিশ অ্যাংলো ইন্ডিয়ান খিচুড়ি পিশপাশ। সেই অপূর্ব স্বাদ-সুবাস স্পষ্ট মনে করতে পারে আফসানা। পরের তিনদিনও কখনো অজয়ের হাতের লাচ্ছি, কখনো মালাই চা। শান্ত, খানিকটা লাজুক স্বভাবের দিঘল পাপড়ির বড়ো বড়ো চোখের মায়াময় চেহারার অজয়। অন্তরা তো বরাবরই সুশ্রী। ওর পিঠাপিঠি ছোটো বোন ওরই মতো দেখতে। দুই বোনকে একসাথে দেখে আফসানা বুঝেছিল, অন্তরার আকর্ষণ আদতে যত্ন-সুরুচি-সৌন্দর্যবোধে গড়া। অন্তরা-অজয় কাছাকাছি হলেই মন দিয়ে ওদের দেখত আফসানা। না, আঠাশের পাশে বিয়াল্লিশকে কিংবা বিয়াল্লিশের পাশে আঠাশকে বিসদৃশ লাগেনি। অন্তরা হাসতে হাসতে বলেছিল, ‘আমরা একসাথে থাকতে থাকতে অজয়ের বয়স কিছুটা বেড়ে গেছে, আর আমার কয়েক বছর কমে গেছে। আমরা এখন সমবয়সি।’

সেই অপূর্ব স্বাদ-সুবাস স্পষ্ট মনে করতে পারে আফসানা। পরের তিনদিনও কখনো অজয়ের হাতের লাচ্ছি, কখনো মালাই চা। শান্ত, খানিকটা লাজুক স্বভাবের দিঘল পাপড়ির বড়ো বড়ো চোখের মায়াময় চেহারার অজয়। অন্তরা তো বরাবরই সুশ্রী।

উদাসপুরে ফেরার রাতে অন্তরা আফসানাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল, ‘নিজের এত অযত্ন কেন রে? বুঝলাম, ছোটো-বাচ্চার মায়েদের মতন অঙ্কুরের পিছন পিছন তোর দিনরাত কাটে। কিন্তু ওই সেক্রিফাইস-সেক্রিফাইস জিকির করা আর দীর্ঘশ্বাস ফেলা বাদ দে তো। এই তিনটা দিন অঙ্কুর তোরে ছাড়া থাকল না? সবসময় চেহারাটারে এরম মনমরা বানায় রাখবি না!’

‘তোদের দেখে খুব ভাল্লাগলো রে। নজর যেন না লাগে! থু থু…’

‘শোন, নিজের যত্ন-শখ-আহ্লাদ এসব বিসর্জন দিস না। সেই কবে তোর ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। তারপর এত বছরে একটাও প্রেম করলি না। বাঁচিস কীভাবে তুই? It’s never too late!’

অন্তরা হাত নেড়ে বিদায় জানানোর সময়, আরও একবার ওকে ভালো করে দেখে নিয়েছিল আফসানা। অল্পবয়সের কচি-নির্মল সৌন্দর্যের চেয়ে এই পরিণত, আত্মবিশ্বাসী চেহারার অন্তরা মুগ্ধ করল বেশি। ওর বহু কিছু দেখে ফেলা চোখেও বিদ্যুৎ চমকায় আর বহু বার মোহভঙ্গ হওয়া মুখের প্রতিটা কোষ থেকে হাসিহাসি আলো ফুটে বেরোয়।

রাতের ট্রেনে বিগত জীবন সর্বগ্রাসী ব্যথার মতো আফসানার হাড়-মাস-মজ্জা চেপে ধরেছিল। ছাব্বিশে মা বনেছিল সে। বিয়ে, অঙ্কুরের জন্ম, সরকারি কলেজের চাকরি—জীবনের সব বড়ো বড়ো ঘটনা বিরতিহীনভাবে ঘটেছিল পরপর। এরপর দুবছরের বিরতি। অঙ্কুরের তিন পেরোলে সবাই একে একে টের পায়, দুনিয়া উলটে গেলেও এ ছেলে নিজের ধ্যান থেকে বেরোয় না। একাকী জগৎ তার, এলিয়েন তাতাকে নিয়ে। ঠিকমতো ঘুমায় না। দুই-তিনটা শব্দের বেশি বলে না। কান্না দিয়ে বুঝিয়ে দেয় সমস্ত চাওয়া। অঙ্কুর যে আলাদা, তার শৈশব যে কখনো পুরোপুরি শেষ হবে না সেই সত্যের মুখোমুখি হওয়া আর অঙ্কুরের বাবার সাথে আফসানার ছাড়াছাড়ি—এ দুটি ঘটনাও বিরতিহীনভাবে পরপর ঘটে যায়। বাচ্চা একটু বড়ো হলে যে মায়েরা হাঁপ ছেড়ে বাঁচে, তাদের মতো অবসর পাওয়া হয় না তার। স্পিচ থেরাপিস্টের চেম্বার থেকে স্পেশাল স্কুল আর স্পেশাল স্কুল থেকে স্পিচ থেরাপিস্টের চেম্বারে ছুটতে ছুটতে চিরটাকাল চিরশিশুর মায়ের জীবনে ঘুরপাক খায় সে। এভাবে বিয়াল্লিশ ছুঁয়ে ফেলা। দীর্ঘশ্বাস ফেলে আফসানা। ফুরায় বেলা, ফুরায় খেলা, সন্ধ্যা নেমে আসে…

হায় ক্ষুদ্র জীবন… হঠাৎ কোত্থেকে স্মৃতিতে উদয় হয় স্বপন কাকা। পাগলাটে স্বপন কাকা, চিরকুমার। পঞ্চাশ পর্যন্ত ভবঘুরে জীবন কাটিয়ে শেষমেশ বাড়ির একটা ভাঙাচোরা ঘরে আস্তানা গেড়েছিল। যে লোক সারাজীবন টইটই করে ঘুরে বেড়াল, সে কেন ঘর ছেড়ে আর তেমন বেরোত না, তা কেউ বলতে পারত না। শুয়ে শুয়ে বই পড়ত আর ডায়েরি লিখত। ষাট পেরোনোর পর সেই কাকা এক মধ্য-পঁচিশের যুবতির প্রেমে পড়ল। প্রমিতা চৌধুরী তার নাম। কাকা নিজে পোস্টঅফিসে গিয়ে চিঠি পোস্ট করত আর ডাকপিয়নদের বাড়ি পর্যন্ত আসার সুযোগ না দিয়ে নিজেই চিঠি আনত। বাড়িতে গুজগুজ-ফিসফাস। একবার কাকা নিরুদ্দেশ হলো। অবশ্য ফিরেও এলো দিন সাতেকের মাথায়। সবাই বলত প্রমিতার কাছেই গিয়েছিল বুড়ো। কাকার মৃত্যুর পর সেই চিঠির তাড়া আর ডায়েরি আফসানার বাবা পুড়িয়ে ফেলার আগে আলমারিতে রেখেছিলেন কিছুদিন। তখনই লুকিয়েচুরিয়ে বুকে ধুকপুকানি নিয়ে নিষিদ্ধ বইয়ের মতো পড়েছিল সে সেসব। ডায়েরিতে প্রমিতাকে নিয়ে লেখা অংশগুলো পড়তে পড়তে কান-মুখ সব লাল হয়ে যেত আফসানার। পঞ্চাশ পর্যন্ত লোকে যাকে সন্ন্যাসীপুরুষ হিসাবে জানত, তার লেখায় এত প্রেম, এত উত্তাপ, থরোথরো আবেগ। আফসানা পড়া শেষ করে ভাবছিল পাশের বাড়ির আকলিমা ফুপুর কথা। কাছাকাছি বয়স তার আর স্বপন কাকার। ভাবা যায়, আকলিমা ফুপুর কলমে এমন বাসনাজর্জর লেখা?

সে রাতে স্বপন কাকাকে ভাবতে ভাবতে আফসানার মনে হয়েছিল, সে তুলনায় তার আর কিইবা বয়স? মোটে বিয়াল্লিশ। কিন্তু বিয়াল্লিশের নারীকে বাতিল, বাজেয়াপ্ত, মেয়াদোত্তীর্ণ ভাবাই যে এ দেশের দস্তুর।

বিয়াল্লিশ থেকে চুয়াল্লিশে পৌঁছে শ্যামলের কাছে সে কী চায়? অত স্পষ্ট আর সরলরৈখিক থাকেনি সে ভাবনা। বারবার বাঁক নিয়েছে, পাক খেয়েছে। তার কাছের মানুষ খুব অল্প, একটা পুরো বৃত্তও আঁকা যাবে না। মুখগুলো পুরানো, নতুন কেউ তাদের সঙ্গ দেয়নি বহু বহু বছর। শ্যামলের মতো মুক্ত-স্বাধীন একজনকে আপনমানুষদের মতো কাছাকাছি পাবার আকাঙ্ক্ষা হয়েছিল তার। শ্যামল কেনই বা তার কাছের মানুষদের একজন হতে চাইবে তার সদুত্তর না পেয়ে কেবল একটা সংযোগ রাখতে চেয়েছিল। আর মায়াসরসীর আড়াল যখন আছেই, তখন অকপটে মুগ্ধতা জানাতে ভয় কী। ওই সজীব যুবকের সংস্পর্শে সে তাজা, টাটকা থাকতে চেয়েছিল। তাকে সামনে বসিয়ে অভিযানের গল্প শুনতে চেয়েছিল। যোগাযোগ বাড়তে থাকলে একসময় মনে হয়েছিল মাঝেমধ্যে পথক্লান্ত শ্যামল যদি জিরিয়ে নিতে আসে উদাসপুরে তার এই বাড়িতে? দুনিয়াটাকে নিয়ে আসবে সে ছোটো শহরের ছোট্ট বাড়িতে। এসব কল্পনাই! অনাত্মীয় পুরুষ এসে থাকবে কী করে প্রতিবেশীদের দৃষ্টির সামনে? তারপর একদিন শ্যামল যখন তাকে দেখতে উদাসপুর আসবে বলল, তখন সে আর অত সম্ভব-অসম্ভব, বাস্তব-অবাস্তবের ধার ধারল না। আকাঙ্ক্ষা স্বতন্ত্র জীবন পেয়ে নিজের মতো আকারে-প্রকারে বাড়তে লাগল। নিজেকে সেই স্বেচ্ছাচারীর হাতে ছেড়ে দিল সে। স্বাগত, হে সকল প্রথম অভিজ্ঞতা!

 

৫.
শ্যামল পা রেখেছে উদাসপুরে। আফসানার সারারাত তন্দ্রায় পার। ভোরে শ্যামলের আগমনী বার্তায় তন্দ্রাও হাওয়া। এ ঘরের অন্য বিছানায় ঘুমাচ্ছে অঙ্কুর। অনেক রাত পর্যন্ত জেগে থেকে বিছানায় খচরমচর করে ভোরের দিকে ঘুমিয়েছে ছেলেটা।

গতকালই সব গুছিয়ে রেখেছে সে। রান্নার সকল উপকরণ, থালাবাসন। ঘরদোর ঝেড়েমুছে ঝকঝকে তকতকে করেছে।

রান্নাঘরে গিয়ে পরম যত্নে সে একেকটা রান্না চড়ায়। পাকারাঁধুনীর নিপুণ হাত ভালোবাসায় আচ্ছন্ন। পেঁয়াজের ফালি, সিজিলের কুঁচি এত নিখুঁত হয় যে মনে হয় বুঝি মেশিনে কাটা। এত সাবধান সে আজ, আজকেই না কোনো ভুলচুক হয়ে যায়। শ্যামলের ভালো লাগবে তো তার রান্না?

অঙ্কুর দরজায় উঁকি দেয়।

‘আব্বু, হাত-মুখ ধুয়ে তোমার লাল শার্টটা পরে নাও। শ্রাবণীদের বাসায় যাবা না?’

ছুটে ঘরে ফিরে গেল অঙ্কুর।

অঙ্কুরের ব্যাপারে আফসানা কিছু জানায়নি শ্যামলকে। প্রথবার একদম একা, শুধু মায়াসরসীর বেশে দেখা দেবে সে। তারপর কোনো এক অকপট মুহূর্তে তার অস্তিত্বের সবচেয়ে স্পর্শকাতর অঙ্গ অঙ্কুরকে মেলে ধরবে। অঙ্কুরের গল্প করলে হয়তো অন্য উৎসাহে মেতে উঠত শ্যামল। বন্ধুত্ব করে ফেলত অঙ্কুরের সাথে, যেমন বহু বন্ধুত্ব—অসম্ভব মানুষকেও সে ঠিক বন্ধু বানিয়ে ফেলে। ঠিকই হাত-পা-মাথা গুটিয়ে গোল বল হয়ে থাকা অঙ্কুরকে সে ছুটিয়ে নিয়ে বেড়াত কোনো দুর্গম অঞ্চলে। হ্যাঁ, অন্তত একবার নিশ্চয়ই তারা মা-ছেলে শ্যামলের সঙ্গী হয়ে ঘুরতে যাবে কোথাও। কিন্তু আজ না। ভিনজগতের ঘোরে আচ্ছন্ন এক শিশুর সিঙ্গেল মায়ের সংগ্রামের গল্প সে আজ শোনাবে না। মাতৃমূর্তি ঢাকা থাকুক, আজ সে আগাগোড়া এক মায়াবতী কিংবা মায়াবিনী নারী। আজ তারা দুজনে নীলছায়া বিলে নিজেদের ছায়া দেখবে।

বন্ধুত্ব করে ফেলত অঙ্কুরের সাথে, যেমন বহু বন্ধুত্ব—অসম্ভব মানুষকেও সে ঠিক বন্ধু বানিয়ে ফেলে। ঠিকই হাত-পা-মাথা গুটিয়ে গোল বল হয়ে থাকা অঙ্কুরকে সে ছুটিয়ে নিয়ে বেড়াত কোনো দুর্গম অঞ্চলে। হ্যাঁ, অন্তত একবার নিশ্চয়ই তারা মা-ছেলে শ্যামলের সঙ্গী হয়ে ঘুরতে যাবে কোথাও।

অঙ্কুরকে নাজনীন আপাদের বাড়ি ছেড়ে আসা গেল অনায়াসে। গেট দিয়ে ঢুকেই সে দোলনার দখল নিল। তারপর শ্রাবণীকে দেখতে পেয়ে দোল খাবার সঙ্গী হবার জন্য ডাকাডাকি শুরু করে দিল।

নাজনীন আপাকে আগেই বলে রেখেছিল একটা গোটা দিন ছেলেটাকে দেখেশুনে রাখতে হবে। রাতের বেলা নিয়ে যাবে।

বাড়িতে তাকে ফিরতে দেখে চমন মিউমিউ করে রান্নাঘরে চলে এলো। চমন খুবই ভদ্র; চোরাস্বভাবের নয় মোটেই। ওর ভাগের বরাদ্দ থালায় বেড়ে বারান্দায় রেখে আফসানা রান্নায় মন দেয়। কিন্তু তেল-নুন-মশলায় মিশে যায় কী করে; শ্যামলকেন্দ্রিক সব ভাবনা বুড়বুড়ি কাটছে মাথায়। সে রন্ধনপটিয়সী বলেই অত অমনোযোগেও কোনো রান্নাই খারাপ হলো না।

রান্না শেষ করে মুখে চন্দনের প্রলেপ মাখিয়ে রাখে। লেবু আর সর্ষের তেল দিয়ে ঘষে ঘষে নখের হলুদ দাগ আর হাতের মেছোগন্ধ দূর করে। শেষে ধারাজলে স্নান। চুয়াল্লিশের জীবনে গত চৌদ্দ বছর এ শরীর পুরুষস্পর্শহীন। সাজাপ্রাপ্ত কয়েদির মতো ১৪টা খটখটে বছর কাটল…রক্তে তোলপাড় উঠল না, নোনা ঘামে ভেজা শরীরে সুখের ক্লান্তি নামল না। আর অল্প কয়েক বছরে ঋতু থেমে যাবে চিরতরে। নগ্ন চামড়া এত বছর পর কারও তপ্ত নিশ্বাসের অপেক্ষায় উৎকর্ণ। শরীরের বাঁধুনী কিছুটা ঢিলে হয়ে এলেও গোলালো পক্ব বুক আর মেদের হালকা পরত জমা তুলতুলে পেটে প্রশান্তিময় আশ্রয় মিলতেই পারে, বিশেষত দীর্ঘ ভ্রমণ শেষে। হয়তো প্রেমিকা ও মায়ের যুগলমায়া মিলবে এই শরীরে। আজকাল হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি আশার কথা শোনায়। অন্তরার সাথে আলাপ করতে হবে এ ব্যাপারে। বাথরুমের আয়নায় আফসানা আবার মায়াসরসীকে খোঁজে। মায়াসরসী, সংকোচ কোরো না। নিজেকে মেলে ধোরো পুরোপুরি।

বাথরুমের নীল বালতিতে সে দেখে নীলছায়া বিল। চা-বাগানের ভেতর দিয়ে যেতে হয় বলে অনুমতি লাগে। অনুমতি সে নিয়ে রেখেছে আগেই। আর পাশের জেলা থেকে গাড়ি ভাড়া করেছে। এখানকার কেউ তাদের দুজনের নীলছায়া-অভিসারের খবর না জানুক। চা-বাগানের পর বিশাল চারণভূমি। চা-শ্রমিকদের গরু-ছাগল-ভেড়া-মহিষ চরে বেড়ায় সেখানে। তারপর সেই আশ্চর্য নীলচে বিল। ওপারে ইন্ডিয়া। বিস্তীর্ণ চারণভূমির মধ্যেমধ্যে ঝাঁকড়া-ঝাঁকড়া বট-পাকুর-অশ্বত্থ। কোনো কোনোটার গোড়া গোল করে বাঁধানো, হয়তো দুদণ্ড জিরিয়ে নেওয়ার জন্য। স্বর্গীয় বাতাস বয়ে যায় সেখানে। আলুথালু করে মাথার চুল, পরনের শাড়ি। মনটা তখন উদার আকাশ, অবাধ বাতাস আর গভীর নীল জলের আকার ধারণ করে।

চোখে কাজলের চিকন রেখা এঁকে, ছোট্ট কালো টিপ পরে আয়নায় তাকিয়ে ছিল আফসানা। কলিং বেলের শব্দে আমূল কেঁপে ওঠে। সরসী, তোমার হলো শুরু, আমার হলো সারা।

আনন্দ-উত্তেজনা-উৎকণ্ঠা মিশ্রিত হাসি নিয়ে দরজা খোলে মায়াসরসী। ওপাশে দীর্ঘ, সুঠাম, শ্যামলা শ্যামল। ঝোঁপের মতো জংলী চুল। টলটলে স্বচ্ছ জলের হাসি। ঝকঝকে চোখ। মায়া এক ঝলক তাকিয়েই চোখ নামিয়ে নেয়। যদি তাকে দেখে হতাশ হবার দৃষ্টি ওই স্বচ্ছ চোখে ভেসে ওঠে!

বিশালাকার শ্যামলের সামনে নিজেকে এত্তটুকু, জড়সড়, পলকা মনে হয় ওর। যেন ঈগলের সামনে খুদে চড়ুই।

বসার ঘরের সোফা দেখিয়ে, ‘বসুন’ বলে দ্রুতপায়ে ভেতরে চলে যায়। ফ্রিজ থেকে শরবতের গ্লাস বের করে। ও ঘরে যেতে পা সরতে চায় না। শ্যামল নিজেই আপন মানুষের মতো ভেতরে চলে আসুক না?

বসার ঘরের বইয়ের তাক থেকে বই নেড়েচেড়ে দেখছিল শ্যামল।

‘বাড়ির গাছের সাজনী লেবুর শরবত…’ মায়ার আড়ষ্ট গলার বিপরীতে সপ্রতিভ শ্যামল—‘বসেন না!’ যেন এ বাড়িটা তারই, আর মায়া এখানে অতিথি। নিঃসঙ্কোচ দৃষ্টিতে সে সরসীকে দেখে। চোখ নামিয়ে ফেলে সরসী।

‘মায়াসরসী, আপনার বাড়িটা কিন্তু আমার অপরিচিত না… বাগানবিলাসের ঝাড়, মাধবীলতার ঝোঁপ, বাড়ির পেছনের জংলা… সব আপনার লেখায় দেখেছি।’

শ্যামল যেন অপেক্ষা করে সরসী কিছু বলবে বলে। কিন্তু সরসী তখন ডিম ফুটে সদ্য বেরোনো পাখির ছাও। আনাড়ি, অসহায়। ফেসবুকের ভার্চুয়াল উপস্থিতির আড়াল তো নেই, এখন সে বাস্তবের মায়াসরসী। যার অনেক গভীর-গোপন অনুভূতি এ লোকের কাছে ফাঁস হয়ে গেছে।

শ্যামল তাকে জড়িয়ে ধরলে সবকিছু সহজ হয়ে যেত। কিন্তু সে সাহস শ্যামল করবে না। সরসীরও সংকোচ হয়। শ্যামল তার চেয়ে অন্তত বছর সাত-আটেকের ছোটো হবে। যদি বয়স্কা নারীতে তার আপত্তি থাকে…চৌদ্দ বছর পর সরসীর সারা শরীর দপদপ করতে থাকে। এই কি সেই প্রার্থিত পুরুষ যে কিনা মমি গলাবে মোমের মতন…

সরসীর নীরবতায় শ্যামল প্রসঙ্গ ঘোরায়।

‘এবার উঠছি মোহনদের বাড়ি। উদাসপুরে আসার খবর আর কাউকে জানাইতে চাই নাই। একা একা…অথবা আপনার সাথে ঘুরব জন্য। মোহনকেও সেইরকম আভাস দিয়ে রাখছিলাম। তা-ও কীভাবে কীভাবে যেন অনেকেই জেনে গেছে। উড়তিয়ার জঙ্গলে একটা দল গেছে সকালে। আমাকেও পীড়াপীড়ি করছিল। বলে দিছি কাল যাব। আপনি যাবেন নাকি আমার সাথে?’

‘ওই দলে হয়তো আমার ছাত্র আছে। রাশভারী আফসানা ম্যাডামকে দেখে তারা ভড়কে যাবে।’

‘আচ্ছা…আপনি তাহলে কলেজের শিক্ষক?’

‘হ্যাঁ। উদাসপুর সরকারি কলেজে সেই খবরটা ছড়িয়ে যাওয়ার পর পরিস্থিতি কেমন হবে ভাবছি! এমন একজন ম্যাডাম, যিনি মোটামুটি মুডি, আনসোশ্যাল হিসাবে খ্যাত গোটা কলেজে।’

‘আপনি নীলছায়া বিল দেখাতে নিয়ে যাবেন বলছিলেন।’

‘স্থানীয়রা বলে নিলচা বিল। ওখানকার মাটিতে কী সব খনিজ থাকার কারণে পানির রং নীল। সাথে আকাশের নীল তো আছেই। হয়তো নীলচে বিল কিংবা নীলছায়া বিল থেকে নামটা নিলচা বিল হয়ে গেছে। আমার নীলছায়া ডাকতেই ভালো লাগে। জানেন, ওখানে গেলে আপনি মুক্তি ব্যাপারটাকে কোষে কোষে, শিরায় শিরায়, লোমে লোমে অনুভব করবেন। ঘরের ভেতরে অনেক কথা বলা যায় না। ওখানে কোনো বাধা থাকে না। একটা পাকুর গাছের নিচে বসে কত সহজে কত কিছু বলে ফেলা যাবে।’

আপনমনে কথা বলে যেতে যেতে সরসী হঠাৎ খেয়াল করে শ্যামল কেমন উশখুশ করছে।

‘কোনো সমস্যা?’

‘বারবার কল আসছে। জাস্ট আ মিনিট।’

এ পাশে শ্যামল বলতে থাকে, ‘তাই! তাই নাকি! না, না… বাংলাদেশে কোথাও দেখা যায়নি… আচ্ছা, আচ্ছা। আমি আসছি তাহলে! মোহনের বাইক নিয়ে এখনই আসছি।’

আসছি! বুকটা ধক করে ওঠে সরসীর।

শ্যামল গড়গড় করে একনাগাড়ে বলে যায়, ‘উড়তিয়ার জঙ্গলে যে দলটা গেছিল, ওরা একটা ইন্ট্রেস্টিং সাপের সন্ধান পাইছে, জানেন! জঙ্গলের গাছ কাটার সময় আদিবাসীরা গাছের গুঁড়ির পাশে সাপের গর্ত দেখছে। সারাশরীরে কাঁটার মতো স্পাইকঅলা একটা সাপ আর তার তিনটা বাচ্চা পাওয়া গেছে। খয়েরি আর শ্যাওলা সবুজে মেশানো। রেমনাজ্জিও স্নেক সম্ভবত। গোটা পৃথিবীতেই রেয়ার স্পিশিজ। আমার জানামতে বাংলাদেশে আগে কখনো দেখা যায় নাই। জঙ্গলে তো নেটওয়ার্ক নাই। জামী ওই আদিবাসীদের একজনের সাইকেল নিয়ে বাজারে গিয়ে আমাকে কল দিল। আমাকে এখনই যেতে হচ্ছে…আমি এক্সট্রিমলি স্যরি… এখানে তো আছি কয়েকদিন… আজ আর নীলছায়া বিল যাওয়া হচ্ছে না আপনার সাথে… কিন্তু উদাসপুর ছাড়ার আগে নিশ্চয়ই হবে।’ কথা বলার সময় উত্তেজনায় ঝকঝক করছিল শ্যামলের চোখ-মুখ।

সরসীর মুখ ফ্যাকাশে হয়ে যায়। ভাড়া করা গাড়ি আর খানিক পরই চলে আসার কথা। শ্যামলের জন্য রান্না করা খাবারের ঘ্রাণ ঝাপটা মেরে গেল।

সে শুধু এটুকু বলতে পারে, ‘আপনার জন্য রান্না করেছিলাম…কখন ফিরবেন?’

‘ফিরতে ফিরতে তো রাত হয়ে যাবে…আর তখন আমার সাথে অনেকে থাকবে। আমি সিনসিয়ারলি স্যরি। আপনি ফ্রিজে রেখে দিন। কাল এক ফাঁকে খেয়ে যাব আমি।’

দরজা পর্যন্ত গিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে ‘দেখা হচ্ছে, মায়া’ বলে ঝড়ের বেগে বেরিয়ে যায় শ্যামল।

বিশ্বাস হতে চায় না সরসীর। দুঃস্বপ্ন? হ্যাঁ, স্বপ্নই। আগাগোড়া। শ্যামল বলে বাস্তবে কারও অস্তিত্ব নেই। পুরো শ্যামল-অধ্যায়টা মনগড়া। কল্পনা। একলার জীবন তো…হ্যালুসিনেশন। সে স্কিৎজোফ্রেনিক হয়ে যাচ্ছে নাকি? তার এক চাচা আছে। শেকলবাঁধা পাগল। বংশে যখন আছে… কাজলগলা কালচে পানি তার গাল ভিজিয়ে চিবুক বেয়ে নেমে গলার হাড়ের খাঁজে জমা হয়।

এ-ই তো স্বাভাবিক। শ্যামল তো এমনই। ঘরোয়া আদর-আপ্যায়ন তাকে টানবে কেন, যখন জঙ্গল থেকে ডাক এসেছে?

 

৬.
কেবল একটা টিমটিমে টেবিল ল্যাম্প জ্বলা বাড়িটাকে হানাবাড়ির মতো দেখায়। আফসানা অন্ধকারে বসে থাকে। যেন মায়া কাটাতে না পেরে শত শত বছর ধরে আছর করে থাকা এক অতৃপ্ত আত্মা। সন্ধ্যায় নাজনীনদের বাড়ি গেছিল অঙ্কুরকে আনতে। সারাদিন খেলে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল ছেলেটা। আগের তিনরাত ঠিকমতো ঘুমায়নি। এক গ্লাস গরম দুধ খেয়ে গাঢ় ঘুমে তলিয়ে গেছে মেঘ-ফাগুনের বিছানায়। ছেলের এমন অপাপবিদ্ধ প্রশান্ত মুখ, যেন সুন্দর কোনো স্বপ্ন দেখছে। আর জাগায়নি আফসানা।

সকালের পর গলা দিয়ে কিছু নামেনি। খাবার সব ফ্রিজে তোলা। নতুন করে রান্না করার মতো মনের জোর কবে ফিরবে, কে জানে। একটা গ্লানিকর অনুভূতি অস্বাভাবিক ভারী কম্বলের মতো ঠেসে ধরেছে। ভেতরের যুক্তিবাদী কোণঠাসা সত্তাটা মিনমিনিয়ে বলছে, শ্যামল তো আর দশজন পুরুষের মতো না। চারপাশের জলের মতো, আগুনের মতো, মেঘের মতো, ফুলের মতো আকর্ষণীয়ার টান এড়াতে পেরেছে বলেই না তার এই বন্যজীবন। সত্যিকারের জল-মেঘ-ফুলের কাছে সমর্পণ। তাতে ক্ষতের ওপর একটুখানি প্রলেপ পড়া মাত্র আফসানার চিরবঞ্চিত কণ্ঠটা খোঁচা মেরে হিসহিসিয়ে উঠছে—আরে, তুমি সাদামাটা চেহারার পড়ন্তবেলার নারী। না হলে শ্যামল এভাবে পালায়?

ভেতরের যুক্তিবাদী কোণঠাসা সত্তাটা মিনমিনিয়ে বলছে, শ্যামল তো আর দশজন পুরুষের মতো না। চারপাশের জলের মতো, আগুনের মতো, মেঘের মতো, ফুলের মতো আকর্ষণীয়ার টান এড়াতে পেরেছে বলেই না তার এই বন্যজীবন।

ফেসবুকে পোস্ট করেছে শ্যামল। উড়তিয়ার জঙ্গলে খোঁজ পাওয়া বিরল সর্পপরিবারের ছবি ও বৃত্তান্ত।

আহা শ্যামল, আস্ত একটা পোস্ট হয়ে গেল। নিউজ সাইটগুলো লুফে নিল তোমার লেখা আর ছবি। কিন্তু আমাকে দুই লাইনের একটা মেসেজ দেওয়ার অবসর হলো না তোমার। যেমন কালও তুমিও আসবা না। তার পরের দিনও না। ফ্রিজে রাখা খাবারেও গন্ধ উঠবে। তারপর তুমি উদাসপুর ছেড়ে চলে যাবা। তোমার কাছে যা কোনো এক অদেখা অনুরাগীকে চেনার সাধারণ ঘটনা, আমার কাছে সেটা নিজের গোপনীয়তা প্রথম কারো সামনে ভেঙে ফেলার দিন।

কেন শ্যামল ছাড়া মায়াসরসীর উদ্বোধন হবে না, তার কোনো ব্যাখ্যা হয় না। শুরুটা তো এমন ছিল না। নিজেকে কঠিনগলায় শাসন করে সে। যেন নিজের কিশোরী মেয়েকে সামলাচ্ছে। এত বছর একলা পিঠসোজা চলার পর এখন কেন লতার মতো আঁকড়ে ধরে উঠতে চাওয়া! লোকেরা ‘বুড়ির ছুড়িগিরি’ বললই বা, অন্তরার অজয়ের মতো কেউ পাশে নাইবা থাকল।

হঠাৎ শ্যামলের কল। সেই রিংটোন মন্ত্রের মতো এক ঝটকায় আফসানার গায়ের অদৃশ্য পুরু কম্বল ফেলে দেয়। আফসানা নিজেকে বলে, সরসী, তোমার গলা যে অভিমানে কাতর হয়ে আছে, সেটা যেন বোঝা না যায়।

কেটে যাওয়ার আগমুহূর্তে কলটা ধরে সে।

‘হ্যালো, মায়া! আমি আর দশ মিনিটের মধ্যে বাইক নিয়ে বড়ো রাস্তার মোড়ে আসতেছি।’

‘মানে?’

‘আপনার প্রিভ্যাসির জন্য আপনার বাড়ির সামনে যাচ্ছি না।’

‘আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।’

‘সালোয়ার-কামিজ পরে আসবেন। শাড়িতে অসুবিধা হবে। আর কেডস পরবেন। হিল-স্যান্ডেলে চলবে না কিন্তু।’

‘কোথায় নিয়ে যাবেন আমাকে?’

‘উড়তিয়ার জঙ্গল। উড়ুক্কু কাঠবিড়ালী, মেছোবাঘ, লজ্জাবতী বানর, তক্ষক-সহ আরও অনেক নিশাচর জঙ্গলবাসী ঘুরতে বের হইছে। দিনের অত আলো, কোলাহল ওদের সহ্য হয় না…’

মায়াসরসী স্তম্ভিত হয়ে থাকে কয়েক মুহূর্ত। এ মুহূর্তে আফসানা অনেক কিছু ভাবত। শ্যামলকে বিশ্বাস করা যায় কি না। রাতের জঙ্গল নিরাপদ কি না। কেলেঙ্কারি হবে কি না। ইত্যাদি ইত্যাদি।

কিন্তু এতক্ষণে মায়াসরসী পূর্ণ অস্তিত্বে জেগে উঠেছে। দ্রুত সালোয়ার-কামিজ পরে পায়ে কেডস গলিয়ে বড়ো রাস্তার মোড়ের দিকে হাঁটতে থাকে সে। কোন বাড়িতে আলো জ্বলছে, কে বারান্দায় দাঁড়িয়ে তাকে দেখে ফেলল, তাতে কী এসে যায়।

‘শ্যামল, আমি আসছি।’

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

গল্পকার। জন্ম রংপুর জেলায়, ১৯৯২ সালে। প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ ‘তখন গল্পের তরে’ (২০২২)।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।