সোমবার, জুলাই ৪

ম্লান ছায়ার শরীর : কৃষ্ণ জলেশ্বর

0

তখন শীতকাল বহুদূর চলে যেতে থাকছিল। আর লোকজন তাদের সোয়েটারগুলো ধুয়ে শুকিয়ে ভাঁজ করে আলমারিতে ভরে রাখতে শুরু করে, পরের বছর ব্যবহার করবে ভেবে। ফাগুনের মাঝামাঝি অথচ চৈত্রের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ছে বাতাসে। পাতা ঝরার দিনে বাতাসে ঝরাপাতার হাহাকার লেগেছিল বলেই কি না কে জানে কী এক গভীর শূন্যতা মানুষের বুকের ভেতর উপলব্ধ হতে থাকে। ঠিক সে সময়টাতে আল হানিফ কোট অ্যান্ড ব্লেজার স্টোর তাদের শীতের কাপড়গুলোতে মূল্যছাড় ঝুলিয়ে দেয়। সাড়ে পাঁচ হাজার টাকার ব্লেজার দিব্যি দেড় হাজার টাকায় দিয়ে দিচ্ছে। এই সুযোগে আবু জাফর মোহাম্মদ দেড় হাজার টাকা দিয়ে মেরুন রঙের একটা ব্লেজার কিনে ফেলে ।

 

২.
আবু জাফর মোহাম্মদ একজন গল্পকার। সে নতুন কেনা মেরুন রঙের ব্লেজার গায়ে দিয়ে গরমে ঘেমে একাকার হয়ে আল হানিফ কোট অ্যান্ড ব্লেজার স্টোরের হানিফকে মনে মনে গাল দেয়, ‘শালা, গরমের মধ্যে তোর ব্লেজারের দাম কমাতে হয় কেন? ফাজিলের ফাজিল!’ মনে মনে গাল দেয় বটে কিন্তু কোথাও একটা আয়না সে খুঁজে ফেরে ব্লেজার গায়ে দিয়ে তাকে কেমন দেখাচ্ছে সেটা দেখার জন্য। এবং শহরের পাশে প্রায় মৃত নদীটির তীরে বিকেল বেলায় সে অপেক্ষা করে তার বন্ধু কবি সুমিত দেবনাথের জন্য। কবি সুমিত দেবনাথের একটি ক্যামেরা আছে। মেরুন ব্লেজার পরে একটা ছবি জাফর তুলে রাখতে চায়। আর ভাবে ছবি তোলার পর ব্লেজারটা সে রেখে দেবে পরের বছর শীতে পরার জন্য।

পাতা ঝরা বাতাসের হাহাকার আর নতুন ব্লেজারের উষ্ণতায় আবু জাফর হাঁসফাঁস করে। সুমিত দেবনাথকে ফোন করে, ‘তাড়াতাড়ি আসো মিয়া।’ সুমিত দেবনাথ আসে। কিন্তু ক্যামেরা আনে না। বলে, ‘ক্যামেরা আনি নাই। কাকাতো বোন সীমা তার বান্ধবীর বিয়েতে ক্যামেরাটা নিয়ে গেছে। মোবাইল দিয়াই ছবি তুলে দিবো নে। মোবাইলের ছবি সুন্দর হয়।’ জাফর হতাশ হয়। ব্লেজারটা খুলে হাতে ভাঁজ করে রাখে। ‘থাক! ছবি আর তুলবো না।’

 

৩.
মানুষ সাধারণত এমন করে। অনিশ্চিত ভবিষ্যতের জন্য জমিয়ে রাখে তার চাষের ভূমি, সুগন্ধী সাবান, নতুন পিরান। অথচ বর্তমানের চেয়ে তার কাছে সুনিশ্চিত কিছু নেই আর। অবশ্য অনিশ্চিত দিনের জন্যও জমিয়ে রাখতে হয় জীবন কৌশল, জ্ঞান আর অমোঘ শস্যবীজ। যাইহোক, পাতা ঝরা বাতাসের হাহাকার আর নতুন ব্লেজারের উষ্ণতায় আবু জাফর হাঁসফাঁস করে। সুমিত দেবনাথকে ফোন করে, ‘তাড়াতাড়ি আসো মিয়া।’ সুমিত দেবনাথ আসে। কিন্তু ক্যামেরা আনে না। বলে, ‘ক্যামেরা আনি নাই। কাকাতো বোন সীমা তার বান্ধবীর বিয়েতে ক্যামেরাটা নিয়ে গেছে। মোবাইল দিয়াই ছবি তুলে দিবো নে। মোবাইলের ছবি সুন্দর হয়।’ জাফর হতাশ হয়। ব্লেজারটা খুলে হাতে ভাঁজ করে রাখে। ‘থাক! ছবি আর তুলবো না।’

সুমিত কিছু বলে না। মুচকি হাসে। তারপর ব্লেজারের কাপড়ে হাত দিয়ে পরখ করে। ‘কাপড় ভালোই।’ মলিন মুখে বলে জাফর। সুমিত বলে যে, ‘হ, ব্লেজারের কাপড় ভালো, কিন্তু এই রঙটা কোনোমতেই তোমার সঙ্গে যায় না, জাফর।’ গায়ের রং কালো বলে জাফরকে প্রায়ই বাঁকাকথার মুখোমুখি হতে হয়। সুমিত বলে, ‘মেরুন রঙে তোমারে উজবুকের মতো লাগতাছে, বন্ধু।’ এই বলে সে হাসিতে ফেঁটে পড়ে। জাফরের মন খারাপ হয়। কিন্তু কিছু বলে না। পৃথিবীতে সন্ধ্যা নেমে আসতে থাকে।

 

৪.
সন্ধ্যায় তারা দু’জন নদীর তীর ধরে হেঁটে যেতে থাকে। যেহেতু তারা কবি ও গল্পকার, তারা শুধু মেরুন ব্লেজারে আটকে থাকে না। তারা বরং ব্লেজারটিকে নিয়ে কবিতা, গল্প এবং জীবনবোধের এক দীর্ঘ ও অমিমাংসিত অধ্যায়ে প্রবেশ করে। ‘একজন কবির মানবিকবোধ সম্পন্ন হওয়া জরুরি।’ —বলে জাফর। ‘একজন কবি হয়ে অন্যের আবেগকে আঘাত করাটা কতোটা সমীচিন!’

সুমিত দেবনাথ তখন হাঁটা থামায়, জাফরের দিকে তাকায়। জাফরও চোখ রাখে সুমিতের চোখে। ‘কবি কোনো এনজিও না, দাতা সংস্থাও না, মানবতার দোকান খুলে বসে নাই। যেভাবেই হোক আঘাত করাই কবির কাজ।’ শীতল অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলে সুমিত।

জাফর বলে, ‘তা ঠিক আছে। কিন্তু কবিকে তো বোধসম্পন্ন হইতে হবে। কবি মানুষকে আঘাত করবে প্রথার প্রাচীর ভাঙতে। মানুষের যে বৈশিষ্ট্য তার নিজের হাতে থাকে না সেই বৈশিষ্ট্যের জন্য তাকে নিয়ে টিটকারি মারাটা কবিসুলভ নয়।’

‘বাল! এইসব কথা বন্ধ করো তো। মেজাজ খারাপ লাগে।’—ধমকের স্বরে বলে সুমিত।

বাতাস তখন শীতল হয়ে এসেছে। মৃত নদীর হাওয়ায় কেমন ভেজাগন্ধ জমেছে। জাফর তার মেরুন ব্লেজারটা পুনরায় গায়ে দেয়।

ফর্সা ও সুদর্শন সুমিতের দীঘল চুল বাতাসে ওড়ে। সুমিত চুলগুলোকে টেনে নিয়ে পনিটেইল করে। এই দেখে কি ঈর্ষা হয় জাফরের! তার চেয়ে বেশি ঈর্ষা বোধ হয় সুমিতের কবিতার জন্য। এতো বোধহীন জীবন নিয়েও সুমিত ভালো কবিতা লেখে।

ফর্সা ও সুদর্শন সুমিতের দীঘল চুল বাতাসে ওড়ে। সুমিত চুলগুলোকে টেনে নিয়ে পনিটেইল করে। এই দেখে কি ঈর্ষা হয় জাফরের! তার চেয়ে বেশি ঈর্ষা বোধ হয় সুমিতের কবিতার জন্য। এতো বোধহীন জীবন নিয়েও সুমিত ভালো কবিতা লেখে। লোকজন তার কবিতার প্রশংসা করে। অথচ জাফরের গল্পকে পাত্তাই দিতে চায় না মানুষ। সুমিতের আর এক ক্ষমতা আছে— ভাবে জাফর। কথা দিয়ে মানুষকে মোহগ্রস্ত করে ফেলে। তার কথা বলার ধরনই এমন যে সব কথা ছাপিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়ে ওঠে।

অদূরেই নদীতীরে ফাল্গুনি মেলা জমেছে। মেলা থেকে মাইকে আহ্বান আসে— ‘আসেন আসেন… চাল্লু চাল্লু চইলা আসেন। শুরু হতে যাচ্ছে আজকের ভ্যারাইটি শো।’

টিকিট কেটে ঢুকে পড়ে প্যান্ডেলে। নাচ-গান-কৌতুক-জাদু ইত্যাদির লাইভ সংস্করণ হচ্ছে ‘ভ্যারাইটি শো’। খুবই নিম্নমানের উপস্থাপনা। মানুষজনকে আকৃষ্ট করার জন্য যৌন সুড়সুড়ি আছে। জাফর ও সুমিত এই সব দেখে। দর্শকদের আনন্দ দেখে, হুল্লোড় দেখে। সুমিত বলে— এইগুলোতে কবিতা আছে। জাফরের দিকে তাকিয়ে বলে, গল্পও আছে। জাফরের নিজেকে মাথামোটা মনে হতে থাকে।

 

৫.
যেহেতু তাদের তেমন কাজ ছিল না। তারা মানে জাফর আর সুমিত। তারা ভ্যারাইটি শো দেখতে যায়। টিকিট কেটে ঢুকে পড়ে প্যান্ডেলে। নাচ-গান-কৌতুক-জাদু ইত্যাদির লাইভ সংস্করণ হচ্ছে ‘ভ্যারাইটি শো’। খুবই নিম্নমানের উপস্থাপনা। মানুষজনকে আকৃষ্ট করার জন্য যৌন সুড়সুড়ি আছে। জাফর ও সুমিত এই সব দেখে। দর্শকদের আনন্দ দেখে, হুল্লোড় দেখে। সুমিত বলে— এইগুলোতে কবিতা আছে। জাফরের দিকে তাকিয়ে বলে, গল্পও আছে। জাফরের নিজেকে মাথামোটা মনে হতে থাকে। সে বুঝতে পারে না— এখানে ঠিক কোথায় গল্পটা লুকিয়ে আছে। আর কোথা থেকেই কবিতাটা নামিয়ে আনছে সুমিত। এর মাঝে শো’র সর্বশেষ আকর্ষণ বলে ভারী কণ্ঠে ঘোষণা আসে মাইকে— ‘এবার স্টেইজে আসছে সুদূর মেঘালয় থেকে আগত বিউটি কুইন প্রিন্সেস কঙ্কাবতী। দেখুন তার ঝুমুর ঝুমুর নাচ।’ স্টেইজে রঙিন আলোর ঝলকানি। ঘুঙুর পায়ে রিনঝিন তোলে স্টেইজে আসে কঙ্কাবতী। ওড়নায় ঢাকা। ‘আমার ওড়নার নিচেই তুমুল বসন্ত— এমন সত্য তুমি জানলে না। মিছে ঘুরে মরো মরিচিকায়/ এতো সুমিষ্ট রস রেখেছি তুমি পান করলে না।’ এমন কথার কোনো হিন্দি গানের তালে তালে শরীরে ঢেউ তুলে নাচে প্রিন্সেস কঙ্কাবতী। নাচের মুদ্রায় নয়, শরীরের ভাঁজে ভাঁজে চোখ রেখে নেশা ধরে যায়। এমন জীবন্ত শরীর! নাচ শেষে নিজেকে ওড়না দিয়ে ঢেকে বক্ষবন্ধনী খুলে দর্শকের দিকে ছুঁড়ে দেয় কঙ্কাবতী। যাদের দিকে ছুটে যায় কঙ্কাবতীর বক্ষবন্ধনী সেই দর্শকরা হৈচৈ তুলে কাড়াকাড়ি করতে শুরু করে। একজনের হাত থেকে টেনে নিয়ে যায় আর জন। শেষে একজন হাত উঁচিয়ে বিজয় নিশানের মতো ওড়াতে থাকে। এই দেখে লাজুক হাসি হেসে গ্রিনরুমের পর্দার নিচে মিলিয়ে যায় প্রিন্সেস কঙ্কাবতী।

 

৬.
আধঘণ্টা পর পুনরায় নতুন শো শুরু হবে। সিঙ্গারা খেতে খেতে সুমিত বলে— ‘আবার দেখব।’

‘হ, লও দেখি।’— জাফর সম্মতি দেয়।

‘কঙ্কাবতীর ব্যাপারটা কেমন কাব্যময়, দেখছ জাফর!’ — সুমিত বলে। ‘ওর সারা শরীর থেকে কেমন কবিতা ঝরে পড়তাছে! মুগ্ধকর!’

জাফর বলে যে— ‘কঙ্কাবতী সুন্দর। কিন্তু দেখ সুমিত, আমরা কিন্তু কঙ্কাবতীর শরীরের সৌন্দর্যতেই লোলুপদৃষ্টি রাখছি। নৃত্যকলার তেমন কিছু না জানলেও বলে দিতে পারি শরীর দোলানো ছাড়া নাচের তেমন কিছুই জানে না কঙ্কাবতী। ফলত শরীরের সৌন্দর্য দেখানোই তার পেশা।’ বলে জাফর সিঙ্গারায় কামড় দেয়।

সুমিত বলে —

“আমরা বুঝেছি যারা বহু দিন মাস ঋতু শেষ হলে পর
পৃথিবীর সেই কন্যা কাছে এসে অন্ধকারে নদীদের কথা
ক’য়ে গেছে ;- আমরা বুঝেছি যারা পথ ঘাট মাঠের ভিতর
আরো এক আলো আছে : দেহে তার বিকেলবেলার ধূসরতা;
চোখের— দেখার হাত ছেড়ে দিয়ে সেই আলো হয়ে আছে স্থির:
পৃথিবীর কঙ্কাবতী ভেসে গিয়ে সেইখানে পায় ম্লান ধূপের শরীর;”

 

‘এখন আসলো কবিতা?’— বিস্মিত হয়ে জানতে চায় জাফর। সুমিত কিছু বলে না। মৃদু হাসিতে সম্মতির আভা। জাফর ঈর্ষায় মরে যেতে থাকে। এই একই জায়গায় থেকে এমন চমৎকার একটা কবিতা সুমিত বের করে নিল, আর মাথামোটা তার মাথায় কোন গল্পই এলো না! কিছুই হবে না তাকে দিয়ে। ব্যর্থ গল্পকার!

সুমিত বলে— ‘দ্যাখো জাফর, এই যে আমরা এই নদী তীরে বসে আছি। এই বসে থাকা শুধু এই সময়ের বসে থাকা না। আমরা শতাব্দী শতাব্দী ধরে এইখানে বসে আছি। আর অপেক্ষা করছি মৃত্যুর আগে আর একবার কঙ্কাবতীকে দেখব বলে। কঙ্কাবতী সুন্দর। কারণ আমাদের অবদমন তার এই সৌন্দর্য আবিষ্কার করেছে।

সুমিত বলে— ‘দ্যাখো জাফর, এই যে আমরা এই নদী তীরে বসে আছি। এই বসে থাকা শুধু এই সময়ের বসে থাকা না। আমরা শতাব্দী শতাব্দী ধরে এইখানে বসে আছি। আর অপেক্ষা করছি মৃত্যুর আগে আর একবার কঙ্কাবতীকে দেখব বলে। কঙ্কাবতী সুন্দর। কারণ আমাদের অবদমন তার এই সৌন্দর্য আবিষ্কার করেছে। যেহেতু আমরা বহু শতাব্দী ধরে এখানে বসে আছি। আমরা আসলে এক নই। বহুজন। বহুজন মিলেই আমরা কঙ্কাবতীকে আকাঙ্ক্ষায় রাখছি। ফলে আমার আগে যারা এই কঙ্কাবতীকে নিয়ে কবিতা লিখেছে সেটা আমারই।’

সুমিতের কথা কঠিন ঠেকে জাফরের। ভাবে সুমিত এমন চিন্তা কী করে করে! তারপর বলে, ‘সুমিত, দেখছ মেয়েটা তার বক্ষবন্ধনী আমাদের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে আমাদের কেমন কটাক্ষ করল!’

‘কটাক্ষ কেন বলছ! নিজেকে সুগন্ধীর মতো সবার মাঝে বিলিয়ে দিতে চাইল সে।’ সুমিত বলে।

সিঙ্গারা খাওয়া শেষ। এখন চায়ের পালা। চা খেতে খেতে জাফর একটা সিগারেট ধরাল। সুমিত সিগারেট খায় না।

‘তোমার কি মনে হয়, কঙ্কাবতী স্বেচ্ছায় এই শরীর প্রদর্শনের পেশায় এসেছে?’ ধুঁয়া ছাড়তে ছাড়তে প্রশ্ন করে জাফর।

‘নিশ্চয়ই। শরীর দেখিয়েই যদি অর্থ উপার্জন করা যায়। তবে কেন মেধা বা শরীর বেচতে যাব?’ চায়ে চুমুক দিয়ে সুমিত বলে। নদীতীরে তখনও ট্রলার থেকে বালু ফেলছিল শ্রমিকরা। তাদের দেখিয়ে সুমিত বলে— ‘যে শ্রমিক নদী থেকে বালু তোলে সে মূলত শ্রম বিক্রি করে। কায়িক শ্রম। মানে শরীরই বিক্রি করছে সে। অর্থাৎ তার বিনিয়োগ শরীর। অন্যদিকে এই শ্রমিকদের যে নিয়ন্ত্রণ করছে, বালু বাণিজ্যের খসড়া টানছে। সে বিনিয়োগ করছে মেধা ও পেশি। বলো নদী কার? নদীর পানি যদি সকলের হতে পারে নদীর বালি সকলের নয় কেন?’

‘তুমি অন্য প্রসঙ্গে চলে যাচ্ছো।’ জাফর পুড়ে যাওয়া সিগারেটের ছাই ফেলতে ফেলতে বলে। সুমিত আবার প্রসঙ্গে ফেরার চেষ্টা করে— ‘বলতে চাচ্ছিলাম, তুমি যদি শরীর দেখিয়েই তোমার জীবন ধারণের চাহিদা মিটিয়ে ফেলতে পারো, তবে কেন তুমি মেধা বিক্রি করতে যাবে? শরীর প্রদর্শনেও কিন্তু মেধা লাগে। আমি বলতে চাচ্ছি মেধা অর্থাৎ বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যাপারগুলো তুমি তোমার পেশনের জায়গায় খাটাও।’

সাধারণত এইসব জায়গায় এসেই সুমিতের মতের সাথে জাফর যেতে পারে না। যে কোনো অন্যায়কে সে ন্যায়ের যুক্তিতে ফেলে দেয়। জাফর উত্তেজিত হয়ে জানতে চায়, ‘কী বোঝাতে চাচ্ছো, সুমিত?’

সে বাধ্য হয়ে এই পেশায় এসেছে এমনটা নয়। শত শত চোখ তাকে দেখে তৃপ্তি পাচ্ছে, হাজার পুরুষ তাকে পেতে চায় এই ব্যাপারটা তাকে হয়তো উদ্বেলিত করে। তোমাকে যদি অসংখ্য নারী কামনা করে তোমার কি মন্দ লাগবে?

জাফরের উত্তেজনা সুমিত অবধি পৌঁছায় না। সে শান্ত কণ্ঠে বলে— ‘জাফর, তুমি হয়তো ভাবছ কঙ্কাবতী অনিচ্ছায় এখানে নাচছে। এই সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা তাকে এখানে আসতে বাধ্য করেছে। কিন্তু সমাজ বা রাষ্ট্র কেউই আদতে এটা সমর্থন করে না। সে বাধ্য হয়ে এই পেশায় এসেছে এমনটা নয়। শত শত চোখ তাকে দেখে তৃপ্তি পাচ্ছে, হাজার পুরুষ তাকে পেতে চায় এই ব্যাপারটা তাকে হয়তো উদ্বেলিত করে। তোমাকে যদি অসংখ্য নারী কামনা করে তোমার কি মন্দ লাগবে? একটা ভালো লাগা কি তোমার ভেতর কাজ করবে না? একটা টেলিভিশন বিজ্ঞাপন নিশ্চয়ই তোমার চোখে পড়েছে, একটা পুরুষ সুগন্ধী ব্যবহার করে। আর সে সুগন্ধে মেতে বহু নারী সেই পুরুষের দিকে ছুটে যায়। এই বিজ্ঞাপনটা আমাদের চোখে লাগে না। বিষয়টা তেমন স্বাভাবিক মনে না হলেও আমাদের অনুভূতিতে আঘাত করে না। যদি উল্টো চিত্র হতো, যদি একটা নারী সুগন্ধী মেখে দাঁড়াত আর অসংখ্য পুরুষ তার শরীর ঘেঁষে দাঁড়াতে চাইত তখন সেটা আমাদের অনুভূতিতে আঘাত করত। অথচ এইটা অস্বাভাবিক নয়। ভ্যারাইটিশোর প্রতিটি দর্শক কঙ্কাবতীকে কামনা করে। একবার ছুঁয়ে দেখতে চায়। তার ঘ্রাণ নিতে চায়। তার ছুঁড়ে দেওয়া বক্ষবন্ধনী পেতে চায়। এটাই হতে পারে কঙ্কাবতীর চরম তৃপ্তির বিষয়।’

‘তুমি তোমার মতো করে ভাবছ সুমিত।’— জাফর বলে। ‘এমন তো নাও হতে পারে। কঙ্কাবতী আসলে এইরূপ নাচ নাচতে চায় না। সে হয়তো একটা সংসার চায়। স্বামী সন্তান নিয়ে সুখী হতে চায়।’

‘ঘোড়ার ডিম।’— রেগে যায় সুমিত। কঙ্কাবতী নায়িকা হতে চায়। নায়িকা না হতে পেরে এখানে নাচ দেখাচ্ছে! বাল! তোমার চিন্তার দরিদ্রতা আমাকে আহত করে জাফর। তুমি জীবনেও ভালো গল্পকার হতে পারবা না।’

জাফর আহত হয় এবার। সত্যি সে একটা চমৎকার গল্প লিখে ফেলতে চায় পৃথিবীতে— একটা চমৎকার গল্প লিখে ফেলতে না পারার ব্যর্থতায় ম্লান হয়ে যেতে থাকে সে।

 

৭.
দ্বিতীয় শো দেখতে দেখতে জাফর ভাবতে থাকে— এখানে তার গল্পটা কোথায় রয়েছে ঠিক! সৈয়দ হকের ‘রক্তগোলাপ’-এর কথা মনে পড়ে তার। সে-ও চায় আল্লারাখার মতো ম্যাজিক দেখিয়ে মোহমুগ্ধ করে ফেলতে সকলকে। সবার দিকে ছুঁড়ে দিতে চায় মুগ্ধতার রক্তগোলাপ। কিন্তু সেই রক্তগোলাপ সে কীভাবে তৈরি করবে? কী তার গোপন কৌশল? মানুষপাঠে খুব অজ্ঞ মনে হয় নিজেকে। শো’র শেষ আয়োজন। মঞ্চে উঠে আসে প্রিন্সেস কঙ্কাবতী। শরীরে ঢেউ তোলা মাদকতা। জাফরের মনে হতে থাকে, কঙ্কাবতীর শরীরের চেয়ে সুন্দর কোনো ফুল নেই, কোনো প্রার্থনালয় নেই। নাচের শেষের দিকে যথারীতি কঙ্কাবতী ছুঁড়ে দেয় তার নীল জড়ির বক্ষবন্ধনী। একজন লুফে নেয়। দর্শক হই হই করে ওঠে। ঠিক তখনই জাফরের কী হয় কে জানে, সে তার মেরুন রঙের কোটটা ছুঁড়ে দেয় কঙ্কাবতীর দিকে। কঙ্কাবতী মেরুন রঙের ব্লেজারটা গায়ে জড়িয়ে নিয়ে কে ছুঁড়ে দিল একবার দেখার চেষ্টা করে হেসে গ্রিনরুমের দিকে ছুটে যায়।

 

৮.
দ্বিতীয় শো শেষে সুমিত ও জাফর তৃতীয় শো দেখার জন্য অপেক্ষা করে। যেহেতু তাদের ক্ষুধা লেগে যায়, তারা নদীতীরে হোটেলে বসে খিচুরি খায়। খেতে খেতে সুমিত জানতে চায়— ‘জাফর, তুমি তোমার ব্লেজার কেন ছুঁড়ে দিলে কঙ্কাবতীর দিকে?’ জাফর কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর বলে— ‘ছুঁড়ে দেওয়ার জন্য আমার কাছে কোনো রক্তগোলাপ ছিল না।’ কিছু একটা পরিবর্তন ঘটে গেছে জাফরের মাঝে। সে পূর্বের তুলনায় শান্ত। যেন ভাবনার গহীন তলে ডুবে যাওয়া পাথর।

‘জাফর, আমার মনে হয় তুমি নিজেকেই জড়িয়ে ফেলছ। অথচ তুমি গল্পকার। নীরবে সব দেখে যাওয়া ছাড়া তোমার কর্তব্য নেই।’ সুমিত বলে।

জাফর কিছু বলে না। চুপচাপ খেয়ে যায়।

খাওয়া শেষে সিগারেট ও চা। পুরোটা সময়। সুমিত ও জাফর কথা বলে না। মাইকে ঘোষণা আসে— চাল্লু চাল্লু চইলা আসেন। শুরু হতে যাচ্ছে আজকের রাতের শেষ ভ্যারাইটি শো।

 

৯.
তৃতীয়বারের মতো তারা ভ্যারাইটি শো দেখতে বসে। এবার একেবারে সামনের কাতারে বসে তারা। এবং শো’র শেষের দিকে কঙ্কাবতীর নাচ আসে। জাফর জানে না কোথায় তার গল্পটা খাঁজকেটে পড়ে আছে। একটা দারুণ গল্প খুঁজে না পেয়ে সে কঙ্কাবতীর চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে। আর কিছু দেখে না সে। কঙ্কাবতী নাচে। আলো জ্বলে, আলো নেভে। দর্শক হুল্লোড় তোলে, সিটি দেয়। কঙ্কাবতী নাচতে নাচতে হাসে। জাফর শান্ত ও দৃঢ় চোখে তাকিয়ে থাকে কঙ্কাবতীর চোখের দিকে। একবার জাফরের চোখে চোখ পড়ে যায় কঙ্কাবতীর। মুহূর্ত মাত্র। কে জানে ফের জাফরের চোখে চোখ রাখে কঙ্কাবতী। দু’জনের দৃষ্টি দু’জনের চোখে স্থিত হয়। কয়েক সেকেন্ড। কঙ্কাবতী তার বক্ষবন্ধনী খুলে জাফরের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে দৌড়ে গ্রিনরুমে চলে যায়।

‘এইটা কী হইলো, জাফর?’— সুমিত প্রশ্ন করে। জাফর উত্তর দেয় না, তার বাম হাতে কঙ্কাবতীর বক্ষবন্ধনী, ডান হাতে ছাই হয় সিগারেট। জাফরের মনে হতে থাকে— সে যেন যুদ্ধজয় করে ফেরা কোনো বীর। কিংবা মহামারী রোধ করে দেওয়ার মহাষৌধ আবিষ্কার করা কোন বিজ্ঞানী।

 

১০.
ফাল্গুনরাতের বাতাস গায়ে মেখে মেখে নদীতীর ধরে হাঁটতে হাঁটতে সুমিত আর জাফর ফিরতে থাকে।

‘এইটা কী হইলো, জাফর?’— সুমিত প্রশ্ন করে। জাফর উত্তর দেয় না, তার বাম হাতে কঙ্কাবতীর বক্ষবন্ধনী, ডান হাতে ছাই হয় সিগারেট। জাফরের মনে হতে থাকে— সে যেন যুদ্ধজয় করে ফেরা কোনো বীর। কিংবা মহামারী রোধ করে দেওয়ার মহাষৌধ আবিষ্কার করা কোন বিজ্ঞানী। পৃথিবীর মানুষ তাকে স্বাগত জানাচ্ছে। তার দিকে ছুঁড়ে দিচ্ছে ফুলের পাঁপড়ি, বাতাসে চুম্বন। ফলত তার চাহনি ও পথ হাঁটায় গাম্ভীর্য চলে আসে।

সুমিত হাসে। বলে— ‘কী করবা এই বক্ষবন্ধনী দিয়া তুমি? পইরা বইসা থাকবা?’ জাফর উত্তর দেয় না। সুমিতকে সে যেন সমুচিত জবাব দিয়ে দিয়েছে ইতোমধ্যে। আর কোনো কথা নেই তার সাথে।

এক সাথে হেঁটে এসে সুমিত ও জাফরের পথ এক জায়গায় ভাগ হয়ে যায়। মধ্যরাতে তারা যার যার পথে একা। হাঁটতে হাঁটতে স্ট্রিট লাইটের আলোয় জাফর তার ছায়াকে দীঘল ও হ্রস্ব হতে দেখে। হ্রস্ব হওয়া ছায়া নিয়ে একজায়গায় সে থামে। হাতে থাকা কঙ্কাবতীর রঙিন বক্ষবন্ধনীটা পথের পাশে স্তূপ ময়লায় ফেলে দেয়। তারপর হেঁটে চলে যায়। পরাজিত একটা ছায়া দীঘল হতে থাকে। কোথা থেকে শীতল বাতাস এসে ধুয়ে দিয়ে যায়। জাফর শীত অনুভব করে। তার মেরুন ব্লেজারটার কথা মনে হয়।

 

[গল্পে ব্যবহৃত কবিতাংশটি জীবনানন্দ দাশের ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’ বইয়ের ‘মৃত্যুর আগে’ থেকে নেওয়া।]

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

জন্ম বাংলাদেশে। প্রকাশিত গল্পের বই 'আনোহাবৃক্ষের জ্যামিতি'।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।