শনিবার, এপ্রিল ২০

মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র : রাবেয়া রব্বানী

0

মেলায় ঘুরতে আসা বেহুশ মানুষের মতো, মাছেরা নামে এখানে।

আজানের পর পর, মজনু চেয়ারে বসে প্রথম অবতরণের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। পাখিদের কিচ কিচ শব্দ শোনা যায়। ভোরের বাতাস আবর্জনা আর প্রস্রাবের গন্ধ নিয়ে খেলা করে, কখনো কখনো মানুষের মলের দুর্গন্ধও থাকে। মজনু নির্লিপ্ত, তাকিয়ে থাকে আড়তের দরজায়। একের পর এক ট্রাক এসে ফুসসস… করে দম ছাড়ে, ট্রাকের দরজায় থপ থপ করে মহাজনরা। পাখির ডাক ক্ষীণ হতে থাকে। ছেলেগুলো কাদাজলের উপর ব্যস্ত পায়ে হাঁটে।

মহাজনরা রাতে জমে থাকা শ্লেষ্মা পরিষ্কার করতে খোয়াক থুহ… খোয়াক থুহ… করে, দুই আঙ্গুলে নাক টিপে কফ বের করে। তাদের আঙ্গুলের ডগায় চোখ চলে গেলে বিজল ঝুলতে দেখা যায়। সূর্য্যকে বের করে আনতে আকাশের চেষ্টা চরিত্রও একসময় শেষ হয়। এরপরই নামতে থাকে মাছ।

নাক টেনে ঘ্রাণ নেয় মজনু, মাছ হাতায়। হাতের চেটো শুকে। তারপর আঠা আঠা শ্লেষ্মাগুলো সে তার চুলে মাখে, গালে লাগিয়ে রাখে। শুকিয়ে যাওয়ার আগে আবার একই ভাবে মেখে নেয়। কাজটা করায় তার দক্ষতা আছে নিশ্চয়ই কেননা কাউকে ভিন্ন ভাবে তাকাতে বা এ নিয়ে প্রশ্ন করতে শোনা যায় না।

নাক টেনে ঘ্রাণ নেয় মজনু, মাছ হাতায়। হাতের চেটো শুকে। তারপর আঠা আঠা শ্লেষ্মাগুলো সে তার চুলে মাখে, গালে লাগিয়ে রাখে। শুকিয়ে যাওয়ার আগে আবার একই ভাবে মেখে নেয়। কাজটা করায় তার দক্ষতা আছে নিশ্চয়ই কেননা কাউকে ভিন্ন ভাবে তাকাতে বা এ নিয়ে প্রশ্ন করতে শোনা যায় না। আঁশটে গন্ধ মজনুর শরীরে শিরশিরে সুখ আনে। গোপনে তার ঘাড় গরম হয়। বেড়ালের আনাগোনা শুরু হয়, লাথি মারার জন্য তৈরি হয় মজনু।

মহাজনরা গলার শ্লেমা পরিষ্কার করতে গরম চা খায়। প্রতিটা চুমুকের পর থুথু ফেলে আর মুখ বিকৃত করে। তাদের লাল চোখ ক্লান্ত দেখায়। মহাজনদের বসিয়ে রেখে মজনু এসময় আবার ট্রাকের কাছে চলে যায়।

রূপচাঁদা মাছগুলো নিঃশব্দ। ঝরঝরা ভাতের মতো আলগা হয়ে নামে। মজনু তাদের ভেতর হাত ঢুকায়, উলট পালট করে দেয়। তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসে, নাড়ির গতি দ্রুত হয়। পাবদা নামে থলথল করে। ঠুস ঠুস শব্দ হয় মৃত ভারী কাতল আর রুই মাছের স্তূপ তৈরির সময়। গোলাপি পাড় দেয়া সাদা শাড়ির মতো লম্বা বোয়ালগুলি তরতর করে নেমে নুইয়ে যায়। মজনুর নাকের বাঁশি ফুলে উঠে। বেহায়া বেড়ালগুলোর পেট বরাবর লাথি মারতে থাকে মজনু।

মহাজনদের গলা নাক পরিষ্কার হয়ে যায়। তারা দরদামের কথা উঠায়। বাস চলার গতি বাড়ে, বিকট হর্ন শোনা যায়। পেট্রোলের গন্ধ ঢুকে যায় আড়তে। মজনু তখন আবার কোনার দিকে চলে যায় যেখানে পচা মাছগুলো আলাদা করে রাখা থাকে। যেখানে পেট্রোলের গন্ধ কাজ করে না। মজনু কিছুক্ষণ থাকে সেখানে। পচতে থাকা মাছের উগ্র গন্ধ তার চোয়াল শক্ত করে, উত্তেজনায় দম ফেলতে কষ্ট হয়। উত্থিত শিশ্ন বাগে আনতে মজনু তার স্যান্ডেলের তলা দিয়ে একটা দুটা মাছ পিষে দেয়। বের হয়ে আসে কালচে পেটি, থেঁতলে যাওয়া নরম মাছের শরীর দেখে মজনু কিছুটা সন্তুষ্ট হয়।

এর কিছু পরই ইলিশ মাছগুলো বরফের বাক্সে ঢুকিয়ে ফেলতে তৎপর হয়ে উঠে ছেলেগুলো। সকালের প্রথম সূর্যের আলো পড়ে রুপার ফলার মতো ধারালো দেখায় পোয়াতি মাছগুলোকে। মজনু সেখানে যায়, মাছের পেটের কাছে নাক রাখে। তার শরীর ঝিম ঝিম করে। ইচ্ছে করে সবার সামনেই কামড় বসায়। তার দাঁত নিশপিশ করে, ঠোঁট কেঁপে উঠে। লাথি মারার জন্য মজনু বেড়াল খুঁজতে থাকে। নিজেকে সামলাতে মজনু মহাজনদের কাছে ফিরে যায়।

মহাজনরা প্রতিদিন নতুন দর রাখে। মজনু তাদের শুরুর কথাগুলোকে আমলে নেয় না, ট্রাকগুলোর দিকে কান খাড়া করে রাখে। যদি খসখস শব্দ হয় চিংড়ি মাছ নামার, কথার ফাকে মজনু চিংড়ি মাছ নেড়েচেড়ে আসে। তার হাতে শুঁড়ের খোঁচা লাগে। আগের দিনের লাল দাগের সাথে আরও নতুন কিছু আঘাত যুক্ত হয়। ব্যথা বুঝতেই চায় মজনু। হাত মুষ্টিবদ্ধ করে, আবার খুলে দেয়। আহত বেড়ালগুলো দূরে বসে তাকিয়ে থাকে, গড়-গড় শব্দ করে।

সিলভারের থালা নিয়ে ভিক্ষুকগুলো দাঁড়িয়ে মাছ ভিক্ষা চায়, কোলে বাচ্চা নিয়ে কয়েকজন মহিলাও দাঁড়িয়ে থাকে মাছের আশায়। মজনু পচা মাছগুলোর দিকে তাকায়, দিয়ে দিবে না কি? মজনু গড়িমসি করে।

মহাজনদের তাড়া থাকে। তারা দাম কমাতে শুরু করে, মজনুকে দরাদরিতে মন দিতেই হয়। ভিক্ষুকগুলো অপেক্ষায় থাকে। পচা মাছগুলো আরও পচে যায়। সকাল বাসী হয়ে উঠে। মহাজনরা ঢুলতে ঢুলতে খালি ট্রাক নিয়ে ফিরে যায়।

মহাজনদের তাড়া থাকে। তারা দাম কমাতে শুরু করে, মজনুকে দরাদরিতে মন দিতেই হয়। ভিক্ষুকগুলো অপেক্ষায় থাকে। পচা মাছগুলো আরও পচে যায়। সকাল বাসী হয়ে উঠে। মহাজনরা ঢুলতে ঢুলতে খালি ট্রাক নিয়ে ফিরে যায়। সাথে সাথেই আবার নতুন নতুন খালি ট্রাক, ভ্যান এসে ভিড় করে আড়তের দরজায়। মাছগুলো চালান হবে এবার। ব্যবসায়ীরা এসে বসে মজনুর সামনে। মাছগুলো উঠতে থাকে, আলাদা শব্দ নেই, ঝাঁপি উঠানোর সময় চিৎকার চেঁচামেচি করে শুধু ছেলেগুলো। মজনুকে হিসাব করতে হয়। তার পরোটা শক্ত হয়ে যায়, সেগুলো নরম করে খেতে মাছিরা অবিরত বমি করতে থাকে।

মাছগুলোর উঠা শেষ হয়, ভিক্ষুকের পাত্রগুলো খালি থাকে না, বেড়ালগুলোকেও কয়েকটা পচা মাছ ছুড়ে দেয় ছেলেরা। মজনুর শরীর নির্ভার, নিস্তেজ হয়ে যায়। তার খুব খিদে পায়। সে নাশতার দিকে হাত বাড়ায়, বাধ্য হয়েই মাছিদের মলত্যাগ করা ফেলে উঠতে হয়। এরপর মজনু যায় আড়তের পেছন দিকে, সেখানে ড্রামে রাখা পানি থেকে ছেলেগুলো হাত পা ধোয়।

প্রায়ই ছেলেদের লম্বা লাইন দেখে দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে মজনু। তার চোখ বুজে আসে ঘুমে। কেউ কেউ বলে উঠে, ওস্তাদ, বাড়িত গিয়ে ঢইল্লা গোসল কইরেন।

শ্লেমাগুলো শুকিয়ে চর চর করে গালে, চুলে। সেখানে হাত বুলিয়ে প্রতিদিন একই কথা ভাবে মজনু, নাহ লাইলীর কাছে এভাবে ফেরা যাবে না।

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

জন্ম নারায়ণগঞ্জ জেলায়। ইডেন কলেজ থেকে হিসাববিজ্ঞানে মাস্টার্স করেছেন। তার প্রথম গল্প সংকলন প্রকাশিত হয় ২০১৭ সালে (সময় প্রকাশন থেকে)। এ পর্যন্ত চারটি অনুদিত ও দুটি মৌলিক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে তার, সাহিত্য ম্যাগাজিনগুলোতে নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে ছোটোগল্প।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।