সোমবার, আগস্ট ১৫

রঘুনাথ বাগচীর ধূসর জগৎ : অপূর্ব সাহা

0

১.
রঘুনাথ বাগচী। বিশালাকার চেহারা। বুদ্ধি চেহারার ঠিক বিপরীত। গ্রামের মানুষের সাথে রঘুনাথও জানে এ কথা। কোনো কিছুই ঠিকঠাক ভেবে উঠতে পারে না সে। যখন মেঘ নিয়ে ভাবে, মেঘ সুন্দর আবার কুটিলও, বৃষ্টি ঝরায়, ঝড় আনে, ব্যস্ এটুকুই। কিন্তু কোত্থেকে আসে আর কোথায়ই বা যায়, তার কূলকিনারা করতে পারে না। কিছুক্ষণ সে মেঘের মতোই চিন্তার মহাশূন্যে ভেসে থাকে, তারপর সিদ্ধান্তে আসে— সব তাঁর (ঈশ্বর) ইচ্ছা। তখন বৃষ্টি হয়ে ঝরে যাওয়ার মতোই একটা স্নিগ্ধ প্রশান্তি হয় তার।

রঘুনাথ এখন বসে আছে মৌলভী দ্বীন মোহাম্মদের টিনের বাড়ির শান বাঁধানো পৈঠায়। মনুষ্যকূলের মধ্যে মৌলভী সাহেবই এ গ্রামে তার একমাত্র বন্ধু। এই মানুষটিকে তার ভালো লাগে। শাদা শুভ্র দাড়ি, চেহারাটা কালো, কিন্তু মনটা তার দাড়ির মতোই শাদা। বয়সও তার মতো সত্তরের কোঠায়।

ঘর থেকে নকশাকাটা মেহগনি কাঠের দরজা খুলে দ্বীন মোহাম্মদ বেরিয়ে আসতে আসতে বলেন, ‘কী রে রঘু, এই ভরদুপুরে?’

‘স্লামালেকুম হুজুর।’

‘ওয়ালাইকুমু আসসালাম। আজকে তোগের দুর্গাপূজার শেষদিন না?’

মাথা নাড়ে রঘু।

‘হ। মায়ের বিসর্জন হবে। মনডা খারাপ। তাই তুমার কাছে আসলাম। তুমি তো জানো তুমার সাথে কথা ক’লে আমার মনডা ভালো হয়।’

‘হ রে। তা জানি। তুই মানুষডা ভালো। তোর মনডা শিশুর মতো সরল। আমি জানি তুই আল্লার বিশেষ নেয়ামত।’ মৌলভী, লুঙ্গি পরা, স্যান্ডো গেঞ্জি গায়ে, উল্টোদিকের পৈঠায় বসতে বসতে বলেন, ‘তা বলতো রে রঘু, করোনা কি এইবার যাবে?’

রঘুনাথ নাকের সামনে থেকে হাত দিয়ে মাছি তাড়ানোর ভঙ্গি করে বলে, ‘না হুজুর। মনে হয় আরও কয়েকটা পুন্নিমা লাগবে। তারপর যাবে। তয় এই বালাইডার আয়ু আর বেশিদিন নাই।’

দ্বীন মোহাম্মদ তার এই ভবিষ্যতবাণীতে বিশ্বাস করলেন। এই রঘুনাথই ২০১৯ সালের শেষের দিকে তাকে বলেছিল, ‘হুজুর, কাল রাতে আমি স্বপন দেখলাম, ঠিক স্বপন না, জাগে জাগেই দেখলাম, একটা বালাই একটা ডাইনীর রূপ ধরে আগায়ে আসতেছে। খুউব ভয়ংকর। খুউউউব। বুকডার মধ্যি চিনচিন করে ব্যথা করে হুজুর।’

এই রঘুনাথই ২০১৯ সালের শেষের দিকে তাকে বলেছিল, ‘হুজুর, কাল রাতে আমি স্বপন দেখলাম, ঠিক স্বপন না, জাগে জাগেই দেখলাম, একটা বালাই একটা ডাইনীর রূপ ধরে আগায়ে আসতেছে। খুউব ভয়ংকর। খুউউউব। বুকডার মধ্যি চিনচিন করে ব্যথা করে হুজুর।’

তার কয়েকদিন পরেই শোনা গেল চীনদেশে করোনা না কী একটা মরণ ব্যাধির আবির্ভাব ঘটেছে। তারপর তো এক এক করে পুরো পৃথিবী গ্রাস করল সেই ব্যাধি। মাসের পর মাস। বছরের পর বছর। এই গ্রামেই তো মারা গেল ১০ জন লোক।

রঘুনাথ উদ্ভ্রান্তের মতো সারা গ্রাম ঘুরে বেড়ায়। মানুষ চায়ের দোকানে, হাঁটে-মাঠে-ঘাটে কতরকম আলাপ করে। রঘুনাথ শোনে, কিন্তু বেশিরভাগ কথাই বুঝতে পারে না। এই রোগ নাকি চীনের তৈরি করা রোগ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, সামাজিক দূরত্ব, মাস্ক, লকডাউন, গণটীকা কর্মসূচি। এতসব কথা তার কমজোরি মাথায় ঠিকঠাক ঢোকে না। তার বুদ্ধি কম। ভাবনাচিন্তা বেশিদূর এগোয় না। তবে এটুকু বোঝে, এই রোগ অনেক ক্ষতি করে দেবে পৃথিবীর। মৌলভী সাহেবকে অনেকবার বলেছে সে একথা।

দ্বীন মোহাম্মদ বিশ্বাস করেন, এই আলোভোলা কমবুদ্ধির মানুষটার কিছু অলৌকিক ক্ষমতা আছে। গ্রামের মানুষও কম-বেশি জানে, কিন্তু হয় মেনে নিতে কষ্ট হয় তাদের অথবা উপেক্ষা করে।

একবার বর্ষাকালে মৃত্যু-শয্যায় শুয়ে থাকা সর্দারপাড়ার আলেফ সর্দারের দাদীমাকে দেখতে গিয়েছিল রঘুনাথ। আলেফ তার ছেলে দশরথের বন্ধু। দশরথ তখন হাইস্কুলের শেষভাগ থেকে ঝ’রে পড়ে গ্রামের বাজারে একটা অলংকার তৈরির দোকানে স্বর্ণকারের কাজ শিখতে শুরু করেছে। দশরথই তাকে বলেছিল আলেফের দাদীমার মৃত্যুর সম্ভাবনার কথা। রঘুনাথ সকালের দিকে হাঁটতে হাঁটতে চলে গিয়েছিল আলেফদের বাড়ি তার দাদীমাকে দেখতে। দাদীমা রঘুনাথের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন অন্তিম ইচ্ছাটার কথা। তার কৈ মাছের ঝোল খেতে ইচ্ছে করছে।

গ্রামের বাজারে কৈ মাছ খোঁজা হলো, পাওয়া গেল না। আশপাশের গ্রামের বাজারগুলোতেও খোঁজাখুঁজি করা হলো। ফলাফল শূন্য। রঘুনাথ কেমন একটা ফাঁকা চোখে আকাশে ভেসে যাওয়া একখণ্ড মেঘের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল, বৈকালেই কৈ মাছ পাওয়া যাবে। মাসিমা মৃত্যুর আগে অবশ্যই কৈ মাছ খাবেন।

লোকজন তার কথা পাত্তা দিল না। নির্বোধ, পাগল একটা। পশুপাখির সাথে কী সব বিড়বিড় করে, এমন লোককে পাত্তা দেওয়ার কোনো কারণও নেই।

ওইদিন দুপুর গড়িয়ে গেলে আকাশে মেঘ ঘন হয়ে এলো। শুরু হলো বৃষ্টি। তেমন প্রবল নয়, মাঝারি ধরনের। আলেফ বারন্দা থেকে দেখল, উঠোনের এক কোণে গড়িয়ে যাওয়া বৃষ্টির পানিতে একটা আলোড়ন তৈরি হচ্ছে। তারপরই অগভীর পানিতে লাফাতে শুরু করল কিছু প্রাণী। আলেফ প্রথমে ভেবছিল, ব্যাঙট্যাং কিছু হবে। তারপর অপরিমেয় বিস্ময় নিয়ে সে আবিষ্কার করল, ওগুলো কৈ মাছ। খালি হাতেই ধরে ফেলল প্রায় গোটা বিশেক কৈ।

এই গল্প ছড়িয়ে পড়লে গ্রামের অধিকাংশ মানুষ মত দিল, কৈগুলো বরষার পানিতে পার্শ্ববর্তী একটা পুকুর থেকে উঠে এসেছিল। এখানে রঘুনাথের বিশেষ কোনো কৃতিত্ব নাই। তবে কেউ কেউ স্বীকার করল, রঘুনাথ লোকটা নির্বোধ হলেও জন্মগতভাবে তার জ্যোতির্বিদ্যায় কিছুটা দখল আছে। কেউ কেউ বলল, রঘুনাথের জ্বীন-পরীদের সাথে যোগাযোগ আছে।

মৌলভী দ্বীন মোহাম্মদ কিন্তু অন্যরকম করে ভাবেন। আল্লাহ তাকে একটা জিনিস কম দিয়েছেন, আর সেই খামতির জায়গাটা পূরণও করে দিয়েছেন কিছু অলৌকিক ক্ষমতা দিয়ে।

যাই হোক, ওইদিন সন্ধ্যায় কৈ মাছের ঝাল ঝাল ঝোল দিয়ে ভাত খেয়ে আলেফের দাদীমা রাত ১১টা ৫৯ মিনিটে পৃথিবী থেকে বিদায় নেন।

মৌলভী সাহেব কিছুক্ষণ একদৃষ্টিতে রঘুনাথের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। যেন ওটা একটা কিতাব। অতীত হয়ে যাওয়া কোনো লিপিতে লেখা। পড়া যাচ্ছে না, কিন্তু অক্ষরগুলোর বিন্যাস প্রবলভাবে আকর্ষণ করছে।

‘রঘুনাথ।’

‘বলো হুজুর।’

‘তোর ছেলের কী খবর? খোঁজ-খবর নেয় তো? পয়সা-পাতি পাঠায় তো বাড়িতে?’

রঘুনাথের একমাত্র ছেলে দশরথ বাজারের একটা অলংকার তৈরির দোকানে কাজটাজ শিখে যশোর শহরে গিয়ে একটা বড়ো জুয়েলারিতে কাজ নিয়েছিল। এখন এলাহী অবস্থা। নিজে নবম শ্রেণির গণ্ডি টপকাতে না পারলেও বিয়ে করেছে এম.এ পাশ করা মেয়েকে।

রঘুনাথের একমাত্র ছেলে দশরথ বাজারের একটা অলংকার তৈরির দোকানে কাজটাজ শিখে যশোর শহরে গিয়ে একটা বড়ো জুয়েলারিতে কাজ নিয়েছিল। এখন এলাহী অবস্থা। নিজে নবম শ্রেণির গণ্ডি টপকাতে না পারলেও বিয়ে করেছে এম.এ পাশ করা মেয়েকে। ওই মেয়ে কী একটা এনজিও তে চাকরিও করে। ছিমছাম একটা বাসা ভাড়া করে থাকে। তাদের এক ছেলে এক মেয়ে। দু’জনই নাকি ইংরেজি ভার্সন স্কুলে পড়ে। দশরথ গ্রামে কমই আসে, কিন্তু এখানে রঘুনাথ আর রঘুনাথের যে বাল্যবিধবা পিসিমা থাকে তাদের খাওয়া-পরার খরচা সে-ই টানে। তাতেই খুশি রঘুনাথ। এই ৬৫ বছর বয়সে তাকে যে আলুর চপ, পেঁয়াজি, বেগুনি আর পাঁপড় ভেজে পেট চালাতে হচ্ছে না তাতেই আহ্লাদে আটখান সে।

একগাল হেসে উত্তর দেয় রঘুনাথ, ‘হা হা, সব ঠিকাছে। ছ’লডা বড়ো ভালো, বুঝলে তো হুজুর! আমার মতো আধপাগলা বলদ না। তার এলেম আছে। আমার নাতি-নাতনিরে ইংরিজি ইস্কুলে ভর্তি করাইছে। সব তাঁর ইচ্ছে…’। আকাশের দিকে হাত উঁচু করে প্রণাম জানায় সে।

এক অলৌকিক আলো তার চোখে-মুখে দুর্বোধ্য এক নকশা তৈরি করেছে। এই নকশা সবাই দেখতে পায় না, মৌলভী সাহেব দেখতে পান আর তার হৃদয় গ’লে এক বিশুদ্ধ ভালোবাসার ধারা বেরিয়ে আসে।

কিছুক্ষণ চুপচাপ। সূর্য মাথার উপর উঠে এসেছে। একটু পর আজান হবে, নামাজের সময় হয়ে আসছে।

‘হুজুর’।

‘হুমম।’

‘রুকাইয়া কনে? তুমার বেড়ালডার কথা কচ্ছি। আশেপাশে তারে দেখা যাচ্ছে না ক্যান?’

‘আমি জানতাম, তুই এই প্রশ্নডাই করবি। কালকে রাতের পর থেকে তারে আর দেখতিছি না। কই যে গেল…’

রঘুনাথের বেড়ালপ্রীতি, বেড়ালের ভাষা বোঝা আর বেড়ালদের সাথে কথাবার্তা চালানোর ব্যাপারটা এই গ্রামের অনেকেই জানে, কিন্তু মানে না। পাগলছাগল একটা, পশুপাখিদের সাথে বিড়বিড় করা আর তাদের ভাষা বোঝা তো আর এক জিনিস না। কিন্তু মৌলভী মানেন। শুধু মানেনই না, বিশ্বাসও করেন। এটা হয়, হতেই তো পারে। আল্লাহ তা’আলা পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন আর তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে গুঁজে দিয়েছেন অপার সব বিস্ময় আর রহস্য।

এদিকে রঘুনাথের মাথার খোঁড়লের মধ্যে জেগে উঠেছে এক ধূসর জগৎ। আবছা সব সাদাকালো দৃশ্য। দেখতে পাচ্ছে রঘুনাথ।… চাঁদের মৃদু আলোয় একটা বেড়াল। উঠোনে, একা। হঠাৎ ইঁদুরটাকে দেখল সে। এমন বৃহৎ আকৃতির ইঁদুর খুব একটা দেখা যায় না। বেড়ালটার চোখ জ্বলে উঠল, এমন শিকার ধরার সুযোগ জীবনে খুব কম আসে। ধাওয়া করল ইঁদুরটাকে। ইঁদুর প্রাণ বাঁচাতে দক্ষিণ দিকে ছুটল। একটা পায়ে হাঁটা পথ। বেড়াল মরিয়া। ইঁদুরও তাই। দু’জনই ছুটছে। একজন আততায়ী, ক্ষীপ্র। অন্যজন প্রাণভয়ে ভীত, বাঁচার জন্য উন্মাদ।

কিছুদূর গিয়ে ইঁদুর ঢুকে পড়ল একটা আম-কাঁঠাল-মেহগনি আর নানারকম ঔষধি গাছে ভরা জঙ্গলের মধ্যে। ঢুকল বেড়ালও। দুজনের মধ্যে দূরত্ব এক বা দু’হাত হবে। লাফিয়ে পড়লেই হয়ে যাবে। শিকার ঢুকে যাবে শিকারীর থাবায়।

হঠাৎ একটা দশাসই চেহারার গোখরা লাফিয়ে পড়ল বেড়ালটার উপর। সাপটা একের পর এক কামড় দিচ্ছে শরীরে, বিষ ঢালছে। রক্তাক্ত হয়ে গেল বেড়ালের শরীর। এক মিনিটও লাগল না তার মারা যেতে। ইঁদুরটা হারিয়ে গেল ঔষধি গাছের একটা ঝোপের মধ্যে।

রঘুনাথের এই অন্য জগতে যাওয়াটা যেন দেখতে পাচ্ছেন দ্বীন মোহাম্মদ। ওর চোখ দুটো ধূসর হয়ে গেছে। মানুষের চোখ বলে মনে হয় না, যেন ভিনগ্রহের কোনো প্রাণী। মুখের এক পাশ দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা লালা বের হচ্ছে।

‘রঘুনাথ। ওই রঘুনাথ।’

ধূসর জগতের গোলক ধাঁধা থেকে বেরিয়ে আসতে তাকে এক প্রকার সাহায্য করলেন দ্বীন মোহাম্মদ।

‘হু। হুজুর।’ রঘুনাথের কণ্ঠস্বর আর্দ্রতামুক্ত শীতের শুষ্ক বাতাসের মতো ভুস করে বের হয়ে আসে।

‘কী হইসে তোর? শরীর খারাপ লাগতিছে?’

মাথা নাড়ে রঘুনাথ। তার শরীর ঠিক লাগছে না।

‘পানি খাবি?’

আবার সম্মতিসূচক মাথা নাড়ে সে। মৌলভী সাহেব চিৎকার করে পানি দিতে বললে, বাড়ির একটা ছোট্ট মেয়ে একটা মেলামাইনের গ্লাস ভরতি পানি পৈঠার ওপর রেখে যায়। রঘুনাথ এমনভাবে পানি খায়, যেন সে টানা তিন ধরে খাবার-পানি ছাড়াই একটা দীর্ঘ মরুভূমি পাড়ি দিয়ে এসেছে। তার শরীর ভরতি এক মরুভূমি তৃষ্ণা।

গ্লাস রেখে উঠে দাঁড়ায় সে। বলে, ‘আজকে যাই হুজুর। শরীরটা ঠিক নাই।’ তারপর শরীরটাকে দুই হাত সামনে এগিয়ে দিয়ে দ্বীন মোহাম্মদের দিকে ফিরে খনখনে ভুতুড়ে গলায় বলে, ‘তোমার বিড়াল আর ফিরে আসপে না হুজুর।’

কথাটা বর্শার ফলার মতো বুকে এসে বেঁধে মৌলভী দ্বীন মোহাম্মদের। তার বিস্ফারিত চোখের সামনে দিয়ে রঘুনাথ বাগচী উত্তর দিকের প্রধান পথে না গিয়ে দক্ষিণ দিকের পায়ে হাঁটা পথের দিকে হাঁটতে থাকে।

 

২.
দুপুর গড়িয়ে গেছে। রঘুনাথ ঘুরপথে মুসলমান পাড়া থেকে বেরিয়ে ইট বসানো বড়ো রাস্তায় উঠে আসে। এখানে রাস্তার দু’পাশে বেশ কিছুদূর পর্যন্ত ফাঁকা, ধানি জমি। রাস্তাটা সোজা চলে গেছে পূর্বমুখে শালিখার দিকে। বড়ো রাস্তা ধরে কিছুটা এগিয়ে উত্তর দিকের উপরাস্তায় নেমে পড়ে সে। ঢুকছে হিন্দু পাড়ায়। দুর্গাপূজা চলছে। প্রথম দুইদিন প্রচুর ঢাকঢোল আর মাইক বেজেছে। করোনার কারণে সরকারের নানারকম বিধিনিষেধ থাকা সত্ত্বেও উৎসবে কোনো খামতি ছিল না। হঠাৎ কী যেন হয়ে গেল, কুমিল্লা আর কোথায় কোথায় কী সব সাম্প্রদায়িক হাঙ্গামা হয়ে গেল। উৎসব মাটি। সাম্প্রদায়িক শব্দটাই উচ্চারণ করতে পারে না রঘুনাথ। মানেও বোঝে না। রক্ত ঝরার কথা শুনে বুঝেছে, শব্দটা অভিশপ্ত। আজ বিসর্জন। পড়ন্ত দুপুরে পুরো হিন্দুপাড়াটা যেন ভাতঘুমে ডুব দিয়েছে। একটা অস্বস্তিকর চুপ মেরে থাকা। মনের উপর একটা পাহাড়সমান ওজন নিয়ে নিজের বাড়ির দিকে হাঁটতে থাকে সে।

রাস্তার দুইপাশ দিয়ে সারি সারি কাঠের বাড়ি। মাঝে মাঝে একটা দুটো ইঁটের বাড়িও আছে। এখানে বাড়িগুলোর বৈশিষ্ট হচ্ছে, বাড়ির বাইরের পাশ রাস্তার দিকে অর্থাৎ বাড়ির সামনের ফটকগুলো রাস্তার উল্টো দিকে, রাস্তা থেকে বাড়িগুলোর ভেতরটা যেন না দেখা যায়, তাই এ ব্যবস্থা। শত শত বছর ধরে এভাবেই চলছে।

বেশ কয়েকটা বাড়ি পার হয়ে আসার পর একটা বাড়ির পেছনের ঘন জঙ্গল থেকে শোনা গেল, ‘রঘুনাথ বাবু, ও রঘুনাথ বাবু। আপনাকে ভালো দেখাচ্ছে না। শরীর ঠিক আছে তো?’

লীলার গলা। লীলা দেখতে টুকটুকে একটা মিনি বেড়াল। এ বাড়ির পোষা। রঘুনাথ আর লীলা দু’জন দু’জনের ভীষণ পছন্দের। এ গ্রামে অনেক বেড়াল আছে, কিন্তু সবার সাথে কথা পোষায় না রঘুনাথের।

রঘুনাথ দাঁড়ায়। এদিক ওদিক খুঁজে একটা শিরিষ গাছের নিচে লীলাকে আবিষ্কার করে সে।

‘লীলাদেবী, দুপুরে ঘুমাননি নাকি? হু। ঠিক ধরেছেন আপনি। আমার শরীর ভালো নেই। মনডাও খারাপ।’

‘কেন? কেন?’ লীলার গলায় স্পষ্ট উদ্বেগ।

‘রুকাইয়া মানে মৌলভী সাহেবের বেড়ালটা…’

কথা কেড়ে নিয়ে বলে লীলা, ‘আমি জানি। কাল রাতে সাপের আক্রমণে মারা গেছে সে।’

‘কীভাবে জানলেন লীলাদেবী?’ প্রশ্নটা না করে পারে না রঘুনাথ।

‘আমাদের বেড়াল সমাজে তথ্য আদান-প্রদানের নিজস্ব ধরন আছে। মানুষের চেয়েও দ্রততম আমাদের তথ্য-প্রবাহ।’

‘ও আচ্ছা। তা ঠিক আছে। ভীষণ কষ্ট পেয়েছি আমি। এইমাত্র তার মৃতদেহ খুঁজে বের করে কবর দিয়ে এসেছি।’

‘ধন্যবাদ আপনাকে। আপনি অনেক ভালো মনের একজন মানুষ। মানুষ্য-প্রজাতির ভেতরে এই ধরনের মানুষ খুব বিরল।’

এমন প্রশংসায় রঘুনাথের কষ্টটা যেন একটু কমে।

‘আসুন লীলাদেবী, তার আত্মার শান্তি কামনায় আমরা এক মিনিট নীরবতা পালন করি।’

হাতে ঘড়ি নেই রঘুনাথের। সময়ও দেখতে পারে না। এক মিনিট আন্দাজ করে দু’জনেই চুপ করে থাকে। এবং তারা দু’জনেই প্রায় এক সাথে কথা বলে ওঠে, ‘তারপর খবরাখবর কী?’

লীলা বলে, ‘ভালো না।’

রঘুনাথও বলে, ‘ভালো না। দেশে দুর্গাপূজা নিয়ে খুব ঝামেলা চলছে।’

লীলার গায়ের রংটা একদম আলাদা ধরনের। সাদা, কালো আর বাদামি রঙের মিশেল। ব্যক্তিত্বেও সে আলাদা, এই গ্রামের অন্যান্য বেড়াল থেকে। লীলা মণ্ডলবাড়ির বেড়াল, আদর-যত্ন খাওয়া-দাওয়ার কোনো কমতি নেই। মণ্ডলদের মতোই। এক শতাব্দী ধরে এই পরিবার অবস্থাসম্পন্ন। বেশ কয়েক বিঘা ফসলি জমি আছে মাঠে। বাজারে কাঁচামালের আড়ত আছে। শোনা যায়, আগে চিত্রানদী দিয়ে বড়ো বড়ো বালার নৌকায় করে দূরদূরান্ত থেকে মালামাল আসত। এখন নদী মৃত হলেও ব্যাবসা মরেনি। এখন স্থলপথে ট্রাক ভরতি করে মালামাল আসে। এই প্রজন্মে মণ্ডল পরিবারে ওরা দুই ভাই শুধু। দুই ভাইই মোটামুটি পড়ালেখা করে ব্যবসার হাল ধরেছে। বড়ো ভাই অভয় মণ্ডল, ছোটো ভাই জয় মণ্ডল। বছরখানেক হলো অভয় বিয়ে করেছে। জয় এখনও ব্যাচেলর। পয়মন্ত সংসার। ওদের বাবা মারা গেছেন, কিন্তু মা জীবিত আছেন। থাকার জন্য বিশাল বড়ো পাকা ঘর। আলদা রসুইঘর। উঠানের এক কোনে পাকা বাথরুম। বাড়িটা অসংখ্য ফলজ বৃক্ষ দিয়ে ঘেরা। এই বাড়ির মতোই লীলার চেহারাটাও ঝকঝকে, আকর্ষণীয়।

এই প্রজন্মে মণ্ডল পরিবারে ওরা দুই ভাই শুধু। দুই ভাইই মোটামুটি পড়ালেখা করে ব্যবসার হাল ধরেছে। বড়ো ভাই অভয় মণ্ডল, ছোটো ভাই জয় মণ্ডল। বছরখানেক হলো অভয় বিয়ে করেছে। জয় এখনও ব্যাচেলর।

লীলা চিন্তিত হয়ে বলে, ‘ও আচ্ছা।’

লীলার খবর কেন ভালো না তা রঘু জানতে চায় । কী সমস্যা হয়েছে তার?

লীলা একটু ভেবে উত্তর দেয়, ‘আজ এ বাড়িতে একটা খুন হবে।’

খুনখারাবি খুব খারাপ জিনিস। আবার একটা ধাক্কা খায় রঘুনাথ।

‘আপনি কীভাবে জানলেন লীলাদেবী?’

‘আমি কিছু দিন ধরেই একটা কিছু আঁচ করছিলাম, বুঝলেন তো রঘুনাথ বাবু। একটা কিছু যা মানুষের মধ্যে আমি প্রায়ই দেখি।’

‘কী সেটা?’

‘সম্পর্ক।’

দ্বিধা জর্জর রঘু বলে, ‘একটু পরিষ্কার করে যদি বলেন লীলাদেবী। আমার বুদ্ধি খাটো। কঠিন ব্যাপারগুলো ঠিক বুঝতে পারি না।’

‘মনুষ্যজাতির মধ্যে আমি সম্পর্ক ব্যাপারটার কোনো কিনারা দেখতে পাই না। মানে কোনো সূত্র মেনে চলে না। অধিকাংশ সর্ম্পকই দেখি ক্রমশ জটিল হয়ে ওঠে! আমাদের বেড়ালদের মধ্যে এই ধরনের জটিলতা নাই। আমরা মুহূর্তের সম্পর্কগুলোকেই বিশ্বাস করি, বিশ্বাস রাখি এবং পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করি।’

রঘুনাথের চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছে, সে কথাগুলো ঠিক বুঝতে পারে নাই।

এবার লীলা মূল প্রসঙ্গে চলে যায়। ‘অভয় বাবুর স্ত্রীর নাম সম্পা। বিয়ের পর থেকেই আমি খেয়াল করেছি, ওদের সম্পর্ক খুব আলগা ধরনের। এর কারণ হচ্ছে অভয় বাবু। তিনি সম্পাকে…ঠিক কী বলব… ওইভাবে কাছে টেনে নেন নাই। এর কারণ খুঁজতে গিয়ে দেখেছি, অভয় বাবু বিয়ের আগে থেকেই অন্য একটা মেয়ে মানে আপনি চিনবেন রঘুনাথ বাবু, সাহা বাড়ির অক্ষয় সাহার মেয়ে রুপালি সাহার সাথে ইয়ে মানে একটা সম্পর্কে ছিলেন।’

রঘুনাথ মাথা নাড়ে। এবার সে একটু একটু বুঝতে পারছে।

লীলা বলে চলে, ‘রুপালি সাহা বিয়ে করেননি। একটা স্কুলে চাকরিও করেন। আমি অভয় বাবুর মোবাইলে কথপকথন শুনে বুঝতে পেরছি, ওনাদের সম্পর্কটা শেষ হয় নাই। ব্যাপারখানা কতটা জটিল দেখেন, সম্পাদেবী আবার জড়িয়ে পড়েছেন অভয়বাবুর ভাই জয় মন্ডলের সাথে।’

লীলা দম নেওয়ার জন্য একটু থামে। রঘু বলে, ‘হুঁ বুঝলাম। কিন্তু এর সাথে খুনের সম্পর্ক কী?’

‘আমি দেখেছি, পৃথিবীতে সবকিছুই একটা পরিণতির দিকে যেতে চায়। তা ভালো হোক বা মন্দ হোক। খুব বেশি সময় ধরে ঝুলে থাকতে চায় না।… পূজার দুইদিন আগে এনাদের মা বেড়াতে গেছেন তার মামাবাড়িতে, খুলনায়। ফিরতে দেরী আছে। গতকাল ব্যবসার ব্যাপারে জয়বাবু কয়েকদিনের জন্য গেছে ঢাকায়। এই সুযোগে খুনটা হবে এখানে।’

‘কে খুন হবে?’

‘সম্পাদেবী। আমি কাল অভয়বাবুকে রূপালিদেবীর সাথে ফোনে কথা বলতে শুনেছি। অভয়বাবুর কথা শুনে যেটুকু বুঝেছি…।’

 

৩.
ঘুম আসছে না রঘুনাথের। পিসিমার রান্না করা ভাত খেয়েছে ঘন্টা দুয়েক হয়ে গেছে। বাইরে ধুমছে নেমেছে বৃষ্টি। বিসর্জনের দিন আগে হোক পরে হোক বৃষ্টি হবেই। এ যেন নিয়তি নির্ধারিত। জন্মের পর থেকে দেখে আসছে রঘুনাথ।

নিজের জীবনে যা কিছু হয়েছে, সব নিয়তি বলেই মেনে নিয়েছে সে। নির্বোধ হয়ে জন্মানো, মা-বাবা, পাড়াপড়শিদের চূড়ান্ত অবহেলার ভিতর দিয়ে বেড়ে ওঠা, একটা কন্যাদায়গ্রস্ত পিতার আইবুড়ো এবং কুশ্রী কন্যাকে বিবাহ, প্রথম সন্তান প্রসবের সময় তার স্ত্রীর অকাল মৃত্যু, বালবিধবা পিসিমার হাতে তার সন্তান দশরথের বড়ো হয়ে ওঠা, তার বেড়ালের ভাষা বুঝতে পারার আশ্চর্য ক্ষমতা, তার মাথার খোঁড়লের মধ্যে ভিন্ন একটা জগৎ যে জগতের সাথে বাস্তব পৃথিবীর পার্থক্য শুধু রঙে আর সময়ে— এই সবকিছু সে নিয়তি নির্ধারিত বলেই মেনে নিয়েছে; তার কুশ্রী স্ত্রীর সঙ্গে—লীলা যেমন বলেছিল—তেমন একটা সম্পর্ক হয়ে ওঠা…নিয়তি নয়?

নিজের জীবনে যা কিছু হয়েছে, সব নিয়তি বলেই মেনে নিয়েছে সে। নির্বোধ হয়ে জন্মানো, মা-বাবা, পাড়াপড়শিদের চূড়ান্ত অবহেলার ভিতর দিয়ে বেড়ে ওঠা, একটা কন্যাদায়গ্রস্ত পিতার আইবুড়ো এবং কুশ্রী কন্যাকে বিবাহ, প্রথম সন্তান প্রসবের সময় তার স্ত্রীর অকাল মৃত্যু, বালবিধবা পিসিমার হাতে তার সন্তান দশরথের বড়ো হয়ে ওঠা, তার বেড়ালের ভাষা বুঝতে পারার আশ্চর্য ক্ষমতা, তার মাথার খোঁড়লের মধ্যে ভিন্ন একটা জগৎ যে জগতের সাথে বাস্তব পৃথিবীর পার্থক্য শুধু রঙে আর সময়ে— এই সবকিছু সে নিয়তি নির্ধারিত বলেই মেনে নিয়েছে; তার কুশ্রী স্ত্রীর সঙ্গে—লীলা যেমন বলেছিল—তেমন একটা সম্পর্ক হয়ে ওঠা…নিয়তি নয়? কুশ্রী মানে দেখতে সুন্দর নয়। কিন্তু সেই সরলা বালাকে দেখলেই তো তার মনটা আর্দ্র হয়ে উঠত। প্রকৃতপক্ষে তাকে ভাবলেই এখনও ভিজে যায় তার মন। শরীরের স্পন্দনগুলো কেমন পাল্টে যায়। আজও তার স্পর্শ চায় বার্ধক্য নেমে আসা শরীর। এসব কিছুই কোথাও একটা ছক করা আছে বলে বিশ্বাস করে রঘুনাথ।

আজ রাতে মণ্ডল বাড়িতে একজন খুন হবে। কিন্তু কী করতে পারত রঘুনাথ? সে কি নিজে ও-বাড়িতে গিয়ে বলে দেবে যে, সম্পাদেবী, আপনাকে আজ খুন করা হবে, আপনি পালান? অথবা থানায় গিয়ে পুলিশকে বলবে? তাতে কি পাল্টাবে কিছু?

সম্পাকে খুন হতেই হবে! এটাই নিয়তি।

চোখ বন্ধ করল রঘুনাথ। আর সঙ্গে সঙ্গে সে ঢুকে পড়ল সেই ধূসর জগতে।

…মশারির ভেতরে শুয়ে আছে অভয় আর সম্পা। জগৎটা এম্নিতেই কুয়াশার পরতে ঢাকা, মশারি টাঙানো থাকায় তার ভেতরটাতে, রঘুনাথ দেখছে, দুজন অস্পষ্ট মানুষ অদ্ভুত এক খেলায় মেতে উঠেছে। খেলাটা চেনা আবার অচেনাও। অনেক্ষণ ধরে চলল সেই খেলা। তারপর একজন খেলতে খেলতেই ঘুমিয়ে পড়ল। অন্য মানুষটি বালিশের মতো কিছু একটা ঘুমন্ত মানুষটির মুখের উপর চেপে ধরল। কিছুক্ষণ ছটফট করল ঘুমন্ত মানুষটি। তারপর থেমে গেল। অন্য মানুষটি এবার উঠে মশারি খুলে ফেলল। বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল রঘুনাথ। এ কি দেখছে সে? উঠে দাঁড়ানো মানুষটা সম্পা! হন্তারক তাহলে সম্পাদেবী! তা কী করে হয়? নিয়তি তো বদল হওয়ার নয়!
প্রায় জোর করেই সেই জগৎ থেকে ফিরে এলো রঘু। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। সারা গা ঘামে ভিজে জবজব করছে। উঠে জগ উঁচু করে ধরে পুরোটা জল খেল সে। জানালা খুলে দিল। বৃষ্টির ঝাপটা ঢুকল ঘরে। শরীরটাকে বৃষ্টির ছাঁটে ভিজে যেত দিল।

অনেক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে আবার এসে শুয়ে পড়ল। চোখ বন্ধ করল। ফের ধূসর জগৎ!

…খেলা শেষ হলে এবারও হত্যাকাণ্ড ঘটানো হল। কিন্তু মশারি খুলে ফেলার পর রঘুনাথ দেখল, হন্তারক অভয় মণ্ডল। তারপর অভয় বাবু যা করল তা হচ্ছে, সিলিঙ ফ্যানের উপর দিয়ে একটা দড়ি ছুড়ে দিয়ে, দড়ির এক মাথা সম্পার গলায় ভালো করে পেঁচিয়ে দিল। দড়ির অন্য মাথা প্রচণ্ড শক্তি দিয়ে টেনে টেনে ফ্যানের কাছাকাছি শূন্যে ঝুলিয়ে দিল সম্পাকে। তারপরই দৃশ্যগুলো ভেঙেচুরে ঝরে পড়ল রঘুনাথের করোটির মধ্যে।

এই দৃশ্যটা লীলার বলা দৃশ্যের সাথে মিলে যাচ্ছে। পরবর্তীতে সবকিছু শান্ত হয়ে গেলে অভয় মণ্ডল বিয়ে করবে রূপালি সাহাকে।

মাথার ভেতর ভীষণ জ্বালা করছে রঘুনাথের। যেন একটা নয়, দুটো জগৎ রয়েছে ওখানে। পরস্পর বিপরীতধর্মী ঘটনার জন্ম দিচ্ছে, আর ঘটনাগুলো পরস্পরের সাথে সংশ্লিষ্ট হয়ে মাথার ঘিলু ওলটপালট করে দিচ্ছে রঘুনাথের।

তাহলে কোনটা নিয়তি? চরম এলোমেলো হয়ে গিয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল সে। আবার সেই ধূসর জগৎ। …খেলাটা একইরকম আছে, মন্থর কিন্তু তীব্র। খেলার এক পর্যায়ে মশারির ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো একজন। সম্পা। দরজার দিকে এগোল। খিল খুলল। দরজা খুলে বাইরে এলো। বৃষ্টি হচ্ছে। ফের ভেতরে ঢুকে ছাতাটা নিয়ে বৃষ্টির মধ্যে নেমে পড়ল। বাথরুমে গিয়ে ঢুকল। পাঁচ মিনিট পর, বাথরুম থেকে বের হয়েই একটা চিৎকার দিয়ে উঠল। ‘সাপ সাপ। মরে গেলাম রে।’

একটা কেউটে তার পায়ে ছোবল দিয়ে পালিয়ে গেছে। অভয় ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে এলো। চেতনাহীন স্ত্রীকে কোলে তুলে ঘরের বারান্দায় নিয়ে এলো। বারান্দায় শুইয়ে দিয়েই চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করল। মারা গেছে সম্পা?

তারপর পুরো দৃশ্যটা ঝরঝর করে ভেঙে পড়ল করোটির মধ্যে।

রঘুনাথের মাথার মধ্যে এখন তিনটি জগতের উপস্থিতি। সে টের পাচ্ছে। তিনটি জগৎ যেন তিনটি বুদবুদ, পরস্পরের সাথে ঠেলাঠেলি করছে। রাত শেষ হতে এখনও অনেক বাকি আছে। ভোর অব্দি কে জানে আরও কত বুদবুদ তৈরি হবে!

কিন্তু বাস্তব জগতে কী ঘটে তা দেখতে হলে আরও কিছুটা সময় অপেক্ষা করা ছাড়া বিকল্প কোনো উপায় রঘুনাথ বাগচীর জানা নেই।

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

গদ্যে-পদ্যে সমান বিচরণ। পেশায় উন্নয়ন কর্মী। ২০০২ সালের অমর একুশে গ্রন্থমেলায় গল্প সংকলন ‘হ্রেষাধ্বনি ও অন্যান্য কণ্ঠস্বর’ দিয়ে আত্মপ্রকাশ। উল্লেখযােগ্য গ্রন্থসমূহের মধ্যে ‘স্পর্শপুরাণ’ (উপন্যাস), ‘বিহঙ্গ হত্যার পূর্বাপর’ (উপন্যাস), ‘কুহেলিবৃত্তান্ত’ (কাব্যগ্রন্থ), ‘হৃৎপিণ্ড ভরতি ভেজা পলল’ (কাব্যগ্রন্থ), ‘রংছুট কোয়েলের বিষণ্নতা’ (কাব্যগ্রন্থ) উল্লেখযোগ্য। সাহিত্যের পথ-পরিক্রমায় তার সম্বল স্বকৃত ভাষাশৈলী। শব্দকে ব্রহ্মজ্ঞান করেন। শব্দ-সংঘাত সৃষ্টি করে তা থেকে বিচ্ছুরিত বিভার ভেতর খুঁজে ফেরেন শিল্পের অন্তর্গূঢ় রহস্য। জন্ম সদ্য স্বাধীন দেশের মাটিতে, যশোর জেলায়।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।