রবিবার, এপ্রিল ১৪

লীলা : অমিত রেজা চৌধুরী

0

খুন করার পর পাঁচিল টপকে খুনিটা পালাতে গিয়ে পাঁচিলে বসে কিছুক্ষণ কাঁদল। তারপর ঝাঁপ দিয়ে নিচে নামতে গিয়ে দেয়ালের উপর কাচের টুকরায় প্যান্ট গেল আটকে। ছেঁড়া প্যান্ট নিয়ে কাকে জানি অশ্লীল সব গালি দিতে দিতে নিচে ফের নামতে গিয়ে পাশের ড্রেনেই পড়ে গেল খুনিটা। পূর্ণিমার রাত। তার আলো এসে পড়েছে দেয়ালের উপর নিরাপত্তার কারণে গাঁথা কাচের টুকরোগুলোয়। তাদের থেকে যৌথ প্রতিফলিত আলো থেকে ঝলকে ওঠা প্রতিবিম্বই আমি।

যে খুন হলো সে ছিল আমার মালকিন— মাঝবয়সী, সুচারু বা ধরুন এক বেদুঈন সুন্দরী। স্বামী বিদেশে থাকলেও মাঝেমধ্যেই যখন দেশে আসেন, প্রায় প্রতিবার মুখে কোনো না কোনো একটা প্লাস্টিক সার্জারি করিয়ে। এবং এসেই বউকে নতুন ব্রান্ডের গাড়ি কিনে দেন

যে খুন হলো সে ছিল আমার মালকিন— মাঝবয়সী, সুচারু বা ধরুন এক বেদুঈন সুন্দরী। স্বামী বিদেশে থাকলেও মাঝেমধ্যেই যখন দেশে আসেন, প্রায় প্রতিবার মুখে কোনো না কোনো একটা প্লাস্টিক সার্জারি করিয়ে। এবং এসেই বউকে নতুন ব্রান্ডের গাড়ি কিনে দেন (খুব দামী অবশ্যি নয়), এবং পাশের মাদ্রাসায় বাচ্চা হুজুরদের দিয়ে একাত্তরে হারিয়ে যাওয়া তার বাবা-মার জন্য কোরান খতম দিয়ে, মিলাদ না পড়িয়েই জোড়া মোষ দিয়ে কাঙালিভোজ করান। তো যে মেয়েটি খুন হলো তার তেমন একটা আত্মীয়স্বজন ছিল না মনেহয় এ ছদ্ম দুনিয়ায়। তার বাড়িতে কেউই তেমন আসত না, এমনকি ঈদে-পর্বেও না। উনার তো ছেলেমেয়েও নাই, টিউমারে জরায়ু কাটতে হয়েছিল অনেক আগেই। নিত্যসঙ্গী বলতে আছে দুটো মস্ত হুলো বিড়াল— নবাবী তাদের চালচলন-খানাপিনা। এনিম্যাল প্ল্যানেট চ্যানেল নয় বরং একটু এক্স রেটেড অনুষ্ঠান তাদের বেশি পছন্দের। সেসময় তাদের মালকিনের সিল্কের নাইটির ভিতর থেকে বেরিয়ে আসা দুই ঊরুঘেঁষে দুজন বসে টিভি দেখত, আর জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিত। প্রতিবেশী মূষিক, গেছো ইঁদুরেরা দূর থেকে টিপ্পনী কাটলেও তারা বাঘের মাসী হবার চেষ্টা করত না কখনো, কেবল তার মালকিনকে নিয়ে রাস্তায় কেউ কিছু বললে ঘাড়ের রোম ফুলিয়ে দাঁত খেঁচিয়ে ভয় দেখাত। তো হুলো দুটিকে নিয়েই সে হামেশা প্রাতঃভ্রমণে, পার্লারে কিংবা ঘুমের অষুধ কিনতে অন্যপাড়ায় যেত। তবে মাছের বাজারে বা লাস্ট থার্টি ফাস্ট নাইটের সালসা পার্টিতে প্রিয় হুলোদের নিয়ে সে যায়নি। তাদের তিনজনের এহেন নগরভ্রমণে যেন পুরো রাষ্ট্রটাই হেলেদুলে উঠত, মোটা স্বৈরশাসকের আরও স্থূল নিতম্বের উপচ্ছায়ার মতো, আর তার তৈরি দুঃসময়ে আলোর কুশলতা হয়ে আমার মালকিন ছড়িয়ে পরতেন চরাচরে, আবার নিজেকে কুড়িয়ে নিয়ে আলতো করে লুকিয়ে ফেলতেন তার ব্রাজিলিয়ান গুইসাপের চামড়ায় তৈরি দামী ভ্যানিটি ব্যাগের পকেটে, যেখানে সযতনে রাখা আছে বুড়ো স্বামীর সাথে তার বিশ্বস্ত যুগল ছবি, মোটা ফোম-ব্রা’র টিপ্পনী সমেত।

এখন আসল আলাপে আসি, মেয়েটা খুন হলো কেন অর্থাৎ হেতুটা কী? হয়তো কেউ কেউ বলবেন, মেয়েটা একটু বদমেজাজি, উচ্চাকাঙ্ক্ষী-ধাঁচের আর ডিপ্লোমেটিক জোনের মতো কৌশলী ছিলেন, তবু তার এমন সিনেম্যাটিক মরণ, এইটাও ঠিক মেনে নেয়া যাচ্ছে না। এর পিছনে তাহলে আছেন কে, নাকি অনেকে? এবং এটাও ভাবাচ্ছে যে, ভেষজ গাছগাছালিতে ঘেরা তার সাবেকি আমলের বাড়িটি থেকে চুরিও যায়নি তেমন কিছু! যদিও মহামূল্যবান অনেক এন্টিক পিস ছিল তার বাড়িতে। এন্টিকের প্রতি তার আচ্ছন্নতা ছিল নিজের হারানো মাতৃত্বের কাছে ফেরার মতো। যেমন তার বেডরুমেই ছিল মেক্সিকোর রাজদরবারের একটি ঝাড়লণ্ঠন, অতীব সুশোভনা বাহারি, খুব বড়োও নয়, অনায়াসেই ঝাড়টি হাতে করে পালিয়ে যাওয়া যায়। কিংবা তার বামহাতে যে হীরেখচিত দুর্মূল্য ঘড়িটা ছিল, আফ্রিকা থেকে সংগ্রহ করা, আহাম্মক খুনিটা সেটাও নেয়নি। খুন করতে এসে কেউ চুরি করে না? না তাকে নির্লোভ হতে হবে শ্মশানচারী সিরিয়াল কিলারের মতো? কিন্তু সে কিছুই নেয়নি, এটাই বাস্তবতা, এবং এটাই সন্দেহ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে যে, তাহলে এই হত্যার আসল মোটিভটা কী? খুনী মেয়েটাকে ভালোবাসত না তো আবার? কিংবা কোনো দূর-প্রতিহিংসা? নাকি পুরোটাই টুইস্টে ঘেরা এক ডার্করুম? অনেকের অবশ্যি খুনের গল্পের চেয়ে জ্য পল সাঁর্ত্রের যৌনজীবনের ট্র্যাজেডি অধিক পছন্দের।

এটাই সন্দেহ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে যে, তাহলে এই হত্যার আসল মোটিভটা কী? খুনী মেয়েটাকে ভালোবাসত না তো আবার? কিংবা কোনো দূর-প্রতিহিংসা? নাকি পুরোটাই টুইস্টে ঘেরা এক ডার্করুম? অনেকের অবশ্যি খুনের গল্পের চেয়ে জ্য পল সাঁর্ত্রের যৌনজীবনের ট্র্যাজেডি অধিক পছন্দের।

তো মেয়েটি তার নানাশ্বশুরের পক্ষ থেকে পাওয়া কিঞ্চিৎ ভূতুড়ে বাড়িটির দোতলার বারান্দায় টবে ফোটা কেতকিঝোপের আড়ালে মরে পরে আছে, হাওরে সারা সকাল-দুপুর-হামীম দাপিয়ে গোধূলিরেখার জালে জড়ানো মরা বাঘাআইড় মাছের ডিমভরা পেটের অনর্থকতার মতো উজ্জ্বল, বাকস্পৃহ, সুরেলা হয়ে। মৃত্যুর বিষয়টি এখনো পাঁচকান হয়নি, পুলিশ আসেনি, হুলো দুটি টের পায়নি তখনো, ভোররাতের আলো এখনও কুরবানী ঈদে অভাবী প্রতিবেশীদের মতো উঁকিঝুঁকি মারেনি বড়ো কলাপসিবল গেইটে।

কেবল আমি, বাড়ির পিছনের উঁচুপ্রাচীরের উপরে চারাধানের মতো বুনে রাখা কাচের টুকরোয় জোছনার প্রতিফলিত আলোকগুচ্ছে গড়ে ওঠা এক চেহারার প্রতিবিম্ব, এই আমি জেনেছি, মেয়েটি খুন হয়েছে আর তাকে খুন করে পালিয়েছে আমার অনুপস্থিতি। কেন অনুপস্থিতি? তার ভাবনার স্নায়ুজলে আমার সৃষ্টি, আমাদের পাগলপারা প্রেম, সেখান থেকে সৃষ্টি ও স্রষ্টার ইগো, হীনমন্যতা, অবিশ্বাস, হ্যামলেট সিনড্রম, আমার অপমৃত্যু

কেবল আমি, বাড়ির পিছনের উঁচুপ্রাচীরের উপরে চারাধানের মতো বুনে রাখা কাচের টুকরোয় জোছনার প্রতিফলিত আলোকগুচ্ছে গড়ে ওঠা এক চেহারার প্রতিবিম্ব, এই আমি জেনেছি, মেয়েটি খুন হয়েছে আর তাকে খুন করে পালিয়েছে আমার অনুপস্থিতি। কেন অনুপস্থিতি? তার ভাবনার স্নায়ুজলে আমার সৃষ্টি, আমাদের পাগলপারা প্রেম, সেখান থেকে সৃষ্টি ও স্রষ্টার ইগো, হীনমন্যতা, অবিশ্বাস, হ্যামলেট সিনড্রম, আমার অপমৃত্যু… এসব তো কবেই, তার যৌবনেই আমি খতম!

তবু আমিই কিনা তার খুনী? কেউ না জানুক, সে জানে, তার অতিশখের ফুলপাতা-আঁকা গোপন রুমালটাকে সে তার অতিব্যবহৃত কাঁচি দিয়ে নিজেই ফালিফালি করেছে, আমি কেবল তার প্রেমের পূর্ণতা মাত্র! অবশ্যি আমার দূরাগত এক ভক্ত, মানে এই খুনের তদন্তে পরবর্তীতে জড়িয়ে পড়তে পারেন যে গোয়েন্দা তার বোন, সে এ যাত্রায় বলতেই পারে যে, আমি ছিলাম শুধু আমার মালকিনের নয়, দুনিয়ার তাবৎ চতুরঙ্গের শেষ হাতিয়ার মাত্র! কী সাংঘাতিক! জোছনায় ভেসে যাওয়া এই ভারি, অবিশ্বস্ত শেষরাত্রিতে তবু সে খুন হলো, আর তার মরাচোখ থেকে গড়িয়ে পড়া শেষ অশ্রুবিন্দুপটে আমি তাকেই পালিয়ে যেতে দেখলাম।

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

বাংলা কবিতায় অমিত রেজা চৌধুরীর উত্থান নব্বইয়ের দশকে। বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গে, বগুড়ায় বসবাস করেন। কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, সমালোচনা— বিভিন্ন মাধ্যমে তার বিচরণ অবাধ। একসময় দেশের প্রথিতযশা লিটলম্যাগাজিনগুলোয় লিখেছেন নিয়মিত। লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের সাথেও ওতোপ্রোতোভাবে যুক্ত ছিলেন এবং এখনও সেই বিশ্বাস লালন করেন। কী এক অজ্ঞাত কারণে গদ্যরচনার জগৎ থেকে এখন অনেকটাই দূরে অবস্থান করেন। কোনো বই প্রকাশিত হয়নি।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।