শনিবার, এপ্রিল ২০

শামীম রেজার কবিতা ও নব্বইয়ের উপাখ্যান : জব্বার আল নাঈম

0

তুলির প্রথম আঁচড়ের উপর নির্ভর করে শিল্পের নান্দনিকতা ও শিল্পীর সক্ষমতা। একে মহাকালের রেখাও বলা যেতে পারে। যেখানে দাঁড়িয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্ম দেখবে অসামান্য সুন্দরের স্নিগ্ধ কারুকাজ। তাই বলে শেষের আবেদন কোনো অংশেই কম নয়। ক্ষেত্র বিশেষে বেশি। বিংশ শতকের নব্বই দশক ছিল বিভিন্ন কারণে গুরুত্বপূর্ণ। যার দ্বারা একবিংশ শতাব্দী দারুণভাবে প্রভাবিত। পদে ও প্রকরণে রয়েছে তুলির আঁচড়; প্রভাব; প্রতিপত্তি। নিজেকে ছাড়িয়ে প্রকাশ ও বিকাশের সুযোগ। সদ্ব্যবহার। নব্বই দশক ছিল বাঙালি জাতীয় জীবনে যেমন গুরুত্বপূর্ণ। বৈশ্বিকভাবে ছিল আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দুই জার্মানির মিলনের মালা বদল ছিল গত শতকের নব্বই দশকে। আবার সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের ফলে কফিনে চূড়ান্ত পেরেক ঠেকানোও হয়েছিল নব্বই দশকে। সে সময়ে ইরাক কিং সাদ্দাম হোসেন দখল করে কুয়েত নামক রাষ্ট্রটি। দীর্ঘ সাতাশ বছর কারাভোগের পর মুক্ত হয় আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গ আন্দোলনের প্রবাদ প্রতীম নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা। দুর্বল হয়ে পড়ে কমিউনিস্টের আধিপত্য, উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন প্রভাব ও সুপার পাওয়ার হিসেবে আমেরিকার আধিপত্য বিস্তার, ভারতে রাজীব গান্ধী হত্যা, বাবরি মসজিদে ভাঙন ও সাম্প্রদায়িক দাঙা, মাফিয়া ডন দাউদ ইব্রাহিমের উত্থান, পাকিস্তানের ইমরান খানের নেতৃত্বে প্রথমবারের মতো বিরানব্বই বিশ্বকাপ ক্রিকেট জয়, শ্রীলংকার ক্রিকেটে নব জাগরণ, অস্ট্রেলিয়ার একক আধিপত্যবাদের বিস্তার ও বিকাশ। যেখানে বাংলাদেশও বাঘের হুংকারের মাধ্যমে জানায় আগমনী বার্তা। ফুটবলে ব্রাজিলের সাম্বা ছন্দের চূড়ান্ত প্রদর্শনী, জিনেদিন জিদানের হাত ধরে ফ্রান্সের ফিরে আসা ছিল আশ্চর্য রকমের সুন্দর।

কে না জানে ক্লিনটন ও মনিকার প্রেম উপাখ্যান ছিল সারা বিশ্বের আলোচিত ও আলোড়িত। যার আগে ও পরে ছিল বুশ পরিবারের একক আধিপত্য। আফ্রিকার দেশগুলো ক্রমান্বয়ে ফ্রান্সের নখদর্পণে চলে আসা—এরপরও পৃথিবীর জনসংখ্যা ৬ শত কোটির মাইলফলক অতিক্রম করা—যা কেউ থামিয়ে রাখতে পারেনি। অথচ থেমে যেতে হয়েছে ক্রিকেট বিশ্বের কলঙ্ক বহন করা দক্ষিণ আফ্রিকা দলের সাবেক অধিনায়ক হান্সি ক্রনিয়েকে। জেমস ক্যামেরুনের দক্ষ হাতে জ্যাক ও রোজের সফল প্রেমকাহিনি নিয়ে বানানো হয়েছিল দুর্দান্ত ‘টাইটানিক’ ছবিটি। যা আজও পৃথিবীর মানুষকে নাড়া দেয়, সাড়া দেয় হৃদয়ে। স্কুল শিক্ষিকা জে কে রাওলিংও তাঁর দুনিয়া কাঁপানো ‘হ্যারি পটার’ লেখার সূচনা করেন গত শতকের শেষাংশে।

নব্বই দশকে বাংলাদেশেও ঘটেছে ঐতিহাসিক ঘটনার উত্থান। স্বৈরাচার পতনের মাধ্যমে যার সূত্রপাত। জীবন দিতে হয়েছে ডা. শামসুল আলম খান মিলনকে, উন্মেষ ঘটেছে গনতন্ত্রের, মধ্যবিত্ত সমাজের ধারায় যুক্ত হয়েছে বিবর্তনের ইতিহাস, রাজনীতিতে এসেছে প্রাণের বাতাস, মুক্ত মনে নিশ্বাস নিয়েছে মানুষ। বার বার বাংলাদেশের ইতিহাস, ভাষা ও সাহিত্যের বাঁকবদল ও রূপান্তর ঘটেছে। সাহিত্যের ময়দান উজ্জ্বল করতে আগমন ঘটেছে জ্ঞানী, গুণী, প্রাজ্ঞ ও বিজ্ঞজনের। যাঁদের কল্যাণে বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে বিশাল পরিবর্তন এসেছে। উন্মেষ ঘটেছে সৃজনশীলতার।

আর সেই সময়ে অসংখ্য তরুণ কবির ভিড়ে বাংলা কবিতা লিখতে এসে নিজেকে আলাদা করতে পেরেছেন কবি শামীম রেজা।

 

০২
নব্বই দশকের বাংলা কবিতায় এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। শব্দ ও ছন্দে, বাক্য ও প্রকরণে, ভাব ও কল্পনায় ছিল আবেগ ও আহ্বানের ধ্বনি। বাস্তব ও অতিবাস্তবতার মিশেল। বাংলার সঙ্গে ইংরেজি ও অন্যান্য ভাষার সংমিশ্রণ। এর বাইরেও কেউ কেউ ভাষার অলংকরণ বাড়াতে আশ্রয় নিয়েছেন আঞ্চলিক ভাষার দিকে। আঞ্চলিকতা যেকোনো ভাষার শক্তি বৃদ্ধিতে ঈর্ষণীয় ভূমিকা পালন করে। যা নিয়ে ভেবেছেন স্মার্ট কবি শামীম রেজা। এর জন্য থাকতে হয় আধুনিক ও উত্তরাধুনিক মন। প্রমাণ হিসেবে দাঁড় করানো যায়, ‘যখন রাত্তির নাইমা আসে সুবর্ণনগরে’ তখন ‘নালন্দা দূর বিশ্বের মেয়ে’ চিনতে চায় ‘ব্রাহ্মাণ্ডের স্কুল’ ‘হৃদয় লিপিতে’ আঁকতে চায় ‘দেশহীন মানুষের দেশ’। শামীম রেজার এমন জার্নি বরিশাল থেকেই শুরু। কবি ব্রাহ্মাণ্ডের স্কুলের হয়ে ভ্রমণ করেন দেশহীন মানুষের দেশে। অথচ আধুনিক মানুষের কাছে দেশ মানে কাঁটাতারের বেড়া। সীমানায় আলাদা প্রাচীর। মানুষের সঙ্গে মানুষের বিভাজন।

কবি বিভাজনে বিশ্বাস রাখতে অনিচ্ছুক। বরং সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সামনের দিকে যেতে চান। মানতে চান না জাত, ধর্ম, বর্ণ, বৈষম্য, উঁচু, নিচু, শেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গ। কবির ভাবনায় কোনো কাঁটাতার থাকবে না। সমগ্র পৃথিবী একটি গ্রাম। যেখানে বাঘের ভয়ে পালাবে না হরিণ শাবক কিংবা দুর্বলপ্রাণী। তখন কবির অন্তর দৃষ্টি যায় নতুনের সন্ধানে।

 

অতপর সবকিছু দেখি মমিঘুমে বিভোর ঈশ্বর
ধূলোহাড় হয়ে ওঠে অন্য গ্রহে, আর পৃথিবীতে আমরা
ছুটতে থাকি তাড়া খাওয়া হরিণীর চোখে। মূর্ছা যাওয়া
অন্ধকার দেখে নিথর জলের নিঃশ্বাস গুনি, তখন আর
কল্পনার ঘাস ফড়িং ওড়ে না আমাদের অন্তরে-টের
পাই কামারশালার হাপরের বাতাস, বুকের পাঁজর জুড়ে ওঠানাম।

 

গত শতকের শেষার্ধে শতাব্দীর নানান অস্থিরতা, বিশ্বপুঁজিবাদ, রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যের পাশপাশি দেশীয় রাজনীতির অস্থিরতা ছিল দৃশ্যমান। পরবর্তীতে যা হয়ে ওঠে কবিতার বিষয়বস্তু। কবিতাকে পুঁজিবাদ গ্রাস করে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় কবির কাব্যভাষা, কাব্যভঙি, কাব্যশীলন, প্রতীক, চিত্রকল্প, উপমা ও উৎপ্রেক্ষা। সত্তর দশকে এমন প্রকরণ ছিল। আশিতে কিছুটা বেড়েছে। নব্বই দিয়েছে পরিপূর্ণতা। দেখা যায়, গদ্য কবিতার ছড়াছড়ি। উদ্দেশ্যহীন উদ্দেশ্য, পরিপার্শ্ববিবর্জিত উপমা, অপ্রয়োজনীয় কোলাজ। নেই নির্দিষ্ট দার্শনিকতা। অথচ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ব্যক্তিগত আবেগ, অনুভূতি, উগ্রবাক্যের প্রয়োগ ও প্রয়াস, দুরূহ ও দুর্ভেদ্য চিন্তার আধিক্য। সত্যিকারের কবি যে কজন আছেন তারাও এমন কলকাকলিতে হারিয়ে যাওয়ার অবস্থায়। অথচ শামীম রেজা এইসব কোলাজ থেকে নিজেকে সরিয়ে, হেঁটে গেছেন গ্রামের আলপথ ধরে প্রান্তিক মানুষের কাছে। যেখানে মেলে টাটকা সবজি, মিষ্টি আলু, মটর শুটি, যুবতী ধান আর ফাল্গুনের উন্মাদনা। এইসব এই বাংলার অলংকার। কবি শামীম রেজার চোখ সেই অলংকার চিনতে একটুও ভুল করেনি।

 

০৩
আমি বিস্মিত হয়ে ভাবি, ‘যখন রাত্তির নাইমা আসে সুবর্ণনগরে’ এই সুবর্ণনগর কোথায়? হয়তো বাংলাদেশের অন্য দশটি গ্রামের মতোই। গাছগাছালির ছায়ায় ঢাকা। সেখানে পাখিরা ডাকে। নদী বা খালের স্রোত বয়। সেই স্রোত থেকে কলসিতে পানি আনতে যায় সুবর্ণনগরের বউ। সকাল বেলা জমি চাষ করতে যায় কৃষক। বিকেল বেলা বসে গ্রামের হাট। চায়ের দোকানে বসে আড্ডা দেয় যুবক ও বৃদ্ধ। সুবর্ণনগরে শীত নামে। কুয়াশার চাদর ভেদ করে হেঁটে বেড়ায় কবির মানস কন্যা নালন্দা। হারিয়ে যায় দূর অজান্তে। যখন রাত্তির নাইমা আসে সুবর্ণনগরের ৪ নম্বর কবিতায় মেলে সুবর্ণ নদী।

‘যখন রাত্তির নাইমা আসে সুবর্ণ নদীটার ধারে, অন্ধপাখির পাখনায় ভর করে সোনালু আগুন আইসা ঝইরা পড়ে কার অন্তরে? পোখর্ণার রাজার করুণ প্রাসাদের কথা মনে পইড়া যায়, কেন মনে পড়ে? নিসর্গের হেঁয়ালি বিছ্নায় একরাশ পরগাছ ঘাস-গ্রহের মনীষা গিইলা গিইলা খায় নিশীরহীন প্রভাত বেলায়।’ সুবর্ণ বহুভাবে এসেছে শামীম রেজার কবিতায়। এই সুবর্ণ কখনো গ্রাম, কখনো নদী, কখনো প্রেম। সুবর্ণ তবুও থেকে যায় আমাদের অন্তরে বিশাল জায়গা জুড়ে। কিন্তু কবির বহুমাত্রিক চিন্তার প্রকরণে সুবর্ণের কলেবর দীর্ঘ আর বর্ণিল হয়ে উঠছে। এ যেন এক অনবদ্য কাব্য সুষমা। এটা হয়তো ধানসিড়ি, তিতাস, কপোতাক্ষ অথবা পদ্মার অন্যরকম এক রূপান্তর। যেখানে রোজ রোজ কলেবর নামে। মানুষ হয় স্নিগ্ধ ও প্রশান্ত।

কিন্তু শামীম রেজা সেখানে ব্যতিক্রম সুন্দর। নির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে সাধারণ পাঠকের হৃদয়ের কাছাকাছি থেকে নিজেকে প্রকাশ ও বিকাশ করতে চেয়েছেন। ধরতে চেয়েছেন প্রান্তিক মানুষের মুখের ভাষা। কর্পোরেট উপস্থাপনায় না থাকলেও রয়েছে স্বত্বস্ফূর্ত প্রক্রিয়া। অথচ এর ভেতর দিয়েই কবিতার খনিতে সন্ধান করা যায়।

কবি কর্ম জীবনে শিক্ষক। কিন্তু অন্তরে বিরাজমান হাজার বছরের নদীমাতৃক গ্রাম। তার সৃষ্টির অন্তরাত্মায় ধ্যানস্থ নদীচিত্রের কথা। নালন্দার কথা। সুবর্ণনগরের কথা। খাঁটি গ্রাম্য মানুষের মতোই তিনি তার প্রতিটি শব্দ-বাক্যে বাংলার মাটির গুণগান করেছেন। কর্মের কারণে শরীর পৃথিবীর বহু দেশ ভ্রমণে যায়, মন পড়ে থাকে মায়ের কাছে, ভূমির কাছে। তখন তিনি মাতৃভূমির তর্পণ করাকেই আরাধ্য করে তুলতে জানেন। এ কোনো পারদর্শিতামূলক জ্ঞান নয়, নয় কোনো কৌশল। এ আত্মযোগ, পরম প্রার্থীর ন্যায় প্রাণের আকুল আবেদন। সনেটের প্রবর্তক মাইকেল মধুসূদন দত্তের কথা তখন প্রাসঙ্গিক হয়ে যায়, দূর দেশে থেকেও দেশের প্রতি প্রগাঢ় মমত্বের কথা বলেছেন, লিখেছেন। রবীন্দ্র-নজরুলউত্তর বাংলা সাহিত্যে সবাইকে ম্লান করে একটিমাত্র মুখ স্থান করে নিলো পাঠকের মনে জীবনানন্দ দাশ। জসীমউদ্দীন দেখিয়েছেন বড়োদের সঙ্গে থেকেও বড়ো হওয়া যায়। শামীম রেজা ভালো করেই জানেন, মেধাবীরা ভিন্ন ধরনের কাজ করেন না, তারা একই কাজ ভিন্নভাবে করেন। বিজয়ের রাস্তা অনেক। জানতে হবে কোন রাস্তায় গেলে বিজয় নিশ্চিত। বিজয় নিশ্চিত হলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না, ভাবতে হবে সাধারণ মানুষের কথা। প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষের কথা। নদীমাতৃক জনজীবনের কথা। শামীম রেজার ভাবনায় সারাক্ষণই ছিল বেড়ে ওঠা সেই বরিশাল। যা এখনও হৃদয়ে বয়ে বেড়ান তিনি। শুধু তাই নয়, বরিশালের গুণকীর্তন কলম-কাগজে লিখে পৃথিবীর গলিতে গলিতে ছড়িয়েও দিচ্ছেন। যেখানে আছে সত্যিকারের আনন্দ ও অভিনবত্ব।

 

যমুনামহল কাঁপে, কামভাবে কাঁপে নয়াল হরিণী, পাশে ঘুমায় লুম্বিনী গাঁ, জয়ন্তী নদী ঘাটে এখন কেউ পাল তোলে না। রাত্তির রূপকথা বুকে নিয়ে সেই কবে দিয়াছি উড়াল, চারদিকে ভয়াল আন্ধার, বিমর্ষ চাষাচোখ সেঁধে আছি, কাকে গিয়ে বলি, আমিই কইরাছি চুরি কৃষ্ণের বাঁশি।

যখন রাত্তির নাইমা আসে সুবর্ণনগরে ৩৬

 

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রাচীনতম ধারায় হাঁটি-হাঁটি পা-পা করে এগিয়েছে বাংলা ভাষা, যে পথের অলিগলি হেঁটে ফলকে লিখেছেন ইতিহাসের খেরো খাতা, মধ্যযুগের প্রথম নিদর্শন বড়ু চণ্ডীদাসের ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’। রাধা-কৃষ্ণের প্রেমকাহিনি অবলম্বনে এ কাব্য রচনা করেন। এ সময় মৈথিলি কবি বিদ্যাপতি ব্রজবুলি ভাষায় রাধাকৃষ্ণের প্রেমবিষয়ক পদ রচনা করেছিলেন। মধ্যযুগের প্রথম মুসলমান কবি শাহ মুহম্মদ সগীর পঞ্চদশ শতকে প্রণয়োপখ্যান জাতীয় কাব্য ‘ইউসুফ-জোলেখা’ রচনা করেন। এর বাইরে অনুবাদ সাহিত্য মধ্যযুগের অনেকখানি অংশজুড়ে আছে। এ ধারার সূত্রপাত হয় কবি কৃত্তিবাস কর্তৃক রামায়ণের বঙ্গানুবাদের মাধ্যমে। পরবর্তীতে বাংলায় আরও অনূদিত হয়েছে অসংখ্য গ্রন্থ। মধ্যযুগের বিশাল পরিসর জুড়ে ছিল মঙ্গলকাব্য। দেবদেবীর মাহাত্ম্যসূচক এই কাব্যধারার সূত্রপাত হয় পনেরো শতকে। তবে ষোল শতকে এর সর্বাধিক প্রসার ঘটে। ধর্মমঙ্গল, মনসামঙ্গল, শিবমঙ্গল বা শিবায়ন, চণ্ডীমঙ্গল ইত্যাদি এ পর্যায়েরই নানা শাখা। এই ধারার অন্যতম কবি মাণিক দত্ত, কানাহরি দত্ত, বিজয়গুপ্ত, বিপ্রদাস পিপিলাই, কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম চক্রবর্তী, ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর প্রমুখ। শ্রীচৈতন্যদেবের আবির্ভাবের ফলে বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগ সমৃদ্ধির পথে অনেকখানি এগিয়ে যায়। মধ্যযুগেই আরাকানের রাজসভায় বাংলা সাহিত্যের চর্চা আরম্ভ হয়। এছাড়া শাক্ত পদাবলী, নাথসাহিত্য, বাউল ও অপরাপর লোকসংগীত, ময়মনসিংহ গীতিকা, পূর্ববঙ্গ-গীতিকা ইত্যাদি অমূল্য সাহিত্য মধ্যযুগেরই সৃষ্টি। শতাব্দী শ্রেষ্ঠ এ তালিকায় অনায়াসে সংযুক্তি পায়, লুইপাদ, কাহৃপাদ, আলাওল, আবদুল হাকিম, কালিদাস থেকে মাইকেল মধুসূদন, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ হয়ে সমকালের শামীম রেজা। শামীম রেজার ধারাকে কেউ কেউ বলে থাকতে পারেন, পুরাতন বা প্রাচীন। এমনটা বললে পুরো ভুল হবে, বরং বলা যেতে পারে, চিরায়ত ধারা। যে পথকে আরও সুগম করে তোলার অক্লান্ত আকাঙ্ক্ষা নিয়ে এ যাত্রার পথিক হয়েছেন ব্রাহ্মাণ্ড স্কুলের শিক্ষক। কেউ কেউ চিরায়ত ধারা নিয়ে মনের গভীরে আরও ভাবতে পারেন, তাদের বলব, আকাশ প্রতিদিনই নতুন! প্রশ্ন হলো, পথের কি শেষ আছে? সহজ উত্তর, ‘না’। তবু যেতে হবে বহু দূর। শামীম রেজার সেই পথের স্বর্ণখচিত যাত্রী, সন্দেহ নেই তাতে।

মিথ ও ইতিহাসে আশ্রিত কবি ‘যখন রাত্তির নাইমা আসে সুবর্ণনগরে’র ৩৪ নম্বর কবিতায় দেখিয়েছেন।

 

জুলেখার চুলের বেণী দিয়া যে বালক ঘুড়ি উড়াইছিল সে ইউসুফ নয়—দেখে যাও তারে, অনাহূত যুদ্ধে অপরিচিত সৈনিকের চোখের ভেতরে, শুইয়া আছে সে—নাভি-কাটা ব্লেড হাতে বর্গীর মজ্জায়; আমিই সেই ছেলে নাচোলের, রক্ত-ঘাম মাইখা কৃষকের গইলা যাওয়া চোখে ভাসি ভীষণ তমসায়!

 

 

০৪
কবি শামীম রেজার কবিতায় অন্তর্গত বোধের গভীর টানাপড়েনের সুতোয় গ্রন্থিত। সেটা ফিকশন। কখনো কখনো ননফিকশনের অবয়ব। কবি ও কবিতার সঙ্গে পাঠকের যেকোনো সৃষ্টির আদিতে চিরকালীন দ্বান্দ্বিক অবস্থানকে অতিক্রম করে নিতে হয়। শামীম রেজার কবিতা অসম্ভব রকমের প্রাণচাঞ্চল, সতেজ, প্রাণবন্ত ও সহজাত প্রক্রিয়ার ধারক। নদীর মোহনায় ঢেউয়ের ছন্দে নৃত্য তোলে, ঝরে যাওয়া শুকনো পাতার মতোই শব্দ করে। কবিতার রং-রূপ-রস এসে মিলে যায় ধীরে, আত্মার দীর্ঘ সরোবরে।

নব্বইয়ের নক্ষত্র হওয়ার সৌভাগ্য সবাই অর্জন করতে পারে না। সবাই নামতেও পারে না এই প্রতিযোগিতায়। এ সময়ের কবিতা আকাশ ছুঁতে গিয়ে সূর্যের স্পর্শে নিজেকে প্রকাশ করতে চেয়েছে। জীবনের নানা রঙের ভাষ্য তাদের হাতে কতটা ধরা দিয়েছে কিংবা তাদের কবিতা কাঙ্ক্ষিত স্বপ্ন বাস্তবায়নে কতটা বিবেচ্য, যেমন বিবেচ্য ব্যক্তিমনের অন্তর্লোক উদ্ঘাটন কতটা গভীরে পৌঁছতে পেরেছে। মূলত বাস্তব জীবনের চেয়ে জীবনের আলো ও আঁধারে সময় কাটে বেশি তাদের। ফলে সাধারণ মানুষের কাছে কবিতা নিরাসক্ত। এমন ভাবটা পূর্বে ছিল না। সাধারণ পাঠক যতটা না কবিতাবিমুখ হয়েছে তারচেয়ে বেশি বাধ্য করেছে অতিবাস্তব, নিরাসক্ত, ভাববোধহীন, দর্শনহীন কবিতার কবি। কবিদের লক্ষ্য দার্শনিকতার, আবার বিজ্ঞান চেতনার নিরাসক্তির বিষয়টি দিয়ে অর্জিত কবিতার অনুভূতিকে রূপান্তর করা। সত্য প্রকাশ যদি কবিকূলের লক্ষ্য হয়ে থাকে সমকালের কবিদের উদ্দেশ্য আবেগের পসরা বিছানো, নিজেকে উপস্থাপনার কৌশল আয়াত্ত্ব করা, বিক্ষিপ্ত অন্ধকারে সোনার হাসের ডিমের সন্ধানে নামা। নিজের সুখ ও দুখের বয়ান নির্মিত করা।

কিন্তু শামীম রেজা সেখানে ব্যতিক্রম সুন্দর। নির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে সাধারণ পাঠকের হৃদয়ের কাছাকাছি থেকে নিজেকে প্রকাশ ও বিকাশ করতে চেয়েছেন। ধরতে চেয়েছেন প্রান্তিক মানুষের মুখের ভাষা। কর্পোরেট উপস্থাপনায় না থাকলেও রয়েছে স্বত্বস্ফূর্ত প্রক্রিয়া। অথচ এর ভেতর দিয়েই কবিতার খনিতে সন্ধান করা যায়। স্পর্শ করা যায় দার্শনিকতা, বিজ্ঞান, জ্ঞান, কৌশল, আধুনিক ও উত্তরাধুনিক, ভাব ও বোধ, কল্পনা ও বাস্তবতার যুগপৎ। শামীম রেজা এসব সহজেই করতে পেরেছেন বলব না, বলব এটাই কবি শামীম রেজার সহজাত প্রক্রিয়া।

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

কবি ও কথাসাহিত্যিক। জন্ম ১১ নভেম্বর, ১৯৮৬; চাঁদপুর জেলার মতলব দক্ষিণ উপজেলার বদপুর গ্রাম। হিসাব বিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। পেশায় সাংবাদিক। বর্তমানে একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের ক্রিয়েটিভ বিভাগের সঙ্গে যুক্ত। ‘জীবনের ছুটি নেই’ পাণ্ডুলিপির জন্য পেয়েছেন জেমকন তরুণ কথাসাহিত্য পুরস্কার ২০২০। প্রকাশিত বই : তাড়া খাওয়া মাছের জীবন [কবিতা; শুভ্র প্রকাশ, ২০১৫], বিরুদ্ধ প্রচ্ছদের পেখম [কবিতা; বিভাস প্রকাশন, ২০১৬], এসেছি মিথ্যা বলতে [কবিতা; চৈতন্য, ২০১৭]। কিশোর উপন্যাস :বক্সার দ্য গ্রেট মোহাম্মদ আলী [ অন্বেষা প্রকাশ, ২০১৯]।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।