শনিবার, এপ্রিল ২০

শামীম রেজার কবিতা: শাশ্বত হৃদয়লিপি : আহমেদ বাসার

0

সময়, সমকাল ও বৈশ্বিক আবহ আত্মস্থ করে বাংলাদেশের কবিতায় কবি শামীম রেজার উত্থান, যিনি বাংলা ও বিশ্বকবিতার সমূহ ঐতিহ্য ধারণ করেও স্বকীয়তায় ভাস্বর। বাংলাদেশের কবিতায় নব্বয়ের দশকে শামীম রেজার আবির্ভাব। নব্বইয়ের দশক বাংলাদেশের কবিতার এক হিরন্ময় সময় পরিসর। এ সময়ে যেসব কবিরা নিরন্তর নিরীক্ষা ও প্রত্যয়ী নতুনত্বের নান্দনিক বিভায় পাল্টে দিতে চেয়েছেন বাংলা কবিতার বিস্মিত ভূগোল, তাঁদের মধ্যে অন্যতম কবি শামীম রেজা; যিনি নির্দ্বিধায় বলতে পারেন— ‘যে হৃদয় হারিয়েছে সে পেয়েছে শাশ্বতের খোঁজ’।

মূলত শামীম রেজার কবিতায় শাশ্বতের খোঁজ তীব্রভাবে ধরা পড়ে। প্রেম, প্রকৃতি, মানুষ ও সমকাল তাঁর কবিতায় চিরকালীন আবহ নিয়ে দুলে ওঠে। এক্ষেত্রে তিনি মিথ-পুরাণ ও লোকজ আবহ চমৎকার দক্ষতায় ব্যবহার করেন। যা একই সঙ্গে কাব্যিক উৎকর্ষে অসামান্য ও লক্ষ্যভেদী। একটি দৃষ্টান্ত— যতটা ভেসেছে কৃষ্ণ, বেশি ভাসি তোর যমুনায়। এখানে মধ্যযুগের সাহিত্যিক ঐতিহ্য নবরূপে জেগে ওঠে। পৌরাণিক রাধা-কৃষ্ণ বাঙালির অস্থি-মজ্জায় জড়িয়ে আছে । লক্ষণীয় যে, এখানে কবি কৃষ্ণ ও যমুনার উল্লেখ করলেও রাধার কথা বলেননি। প্রিয়তমাই যেন রাধার মহিমা পেয়ে যায়। পংক্তিটির মধ্য দিয়ে কবি প্রণয় প্রকাশের এক চূড়ান্ত শিখর স্পর্শ করতে সক্ষম হয়েছেন।

কবি যখন বলেন— ‘বেইন্নাবেলা এখনও কি দক্ষিণ দুয়ার খোলো, পারা ভাঙা ধানের বীজে মন কি তোর করে এলোমেলো, দুপারকালে ঘুঘুর ডাহে কাঁপে যখন হোগলপাতার ঘর, ভাডার টানে দেখো কি তুই নারা কুড়ার ঘর।’ এখানে ‘পারা ভাঙা ধানের বীজ’, ‘ হোগলপাতার ঘর’, ‘ভাডার টান’, ‘নারাকুড়ার ঘর’ দারুণ কাব্যিক আবহাওয়ায় দুলে ওঠে।

বাংলার লোককথা, লোকজ ভাবনা ও লোকজ ঐতিহ্যের ব্যবহার শামীম রেজার কবিতায় নতুন মাত্রা যোগ করে। কবি যখন বলেন— ‘বেইন্নাবেলা এখনও কি দক্ষিণ দুয়ার খোলো, পারা ভাঙা ধানের বীজে মন কি তোর করে এলোমেলো, দুপারকালে ঘুঘুর ডাহে কাঁপে যখন হোগলপাতার ঘর, ভাডার টানে দেখো কি তুই নারা কুড়ার ঘর।’ এখানে ‘পারা ভাঙা ধানের বীজ’, ‘ হোগলপাতার ঘর’, ‘ভাডার টান’, ‘নারাকুড়ার ঘর’ দারুণ কাব্যিক আবহাওয়ায় দুলে ওঠে। গ্রামীণ জীবন ও প্রকৃতি যেন ভাষিক দেহ নিয়ে শব্দময় হয়ে ওঠে এখানে। টি.এস এলিয়ট ‘Tradition and the individual talent’ প্রবন্ধে বলেছেন— ‘tradition is matter of much wider significance. It cannot be inherited and if you want it you must obtain it by great labour.’ শামীম রেজা কবিতায় ঐতিহ্যকে ভিন্ন তাৎপর্যে আধুনিক জীবনের প্রেক্ষিতে নতুন মাত্রায় বিন্যস্ত করেছেন। ফলে তাঁর কবিতায় ঐতিহ্যিক অনুষঙ্গ কেবল নির্জীব কাব্যিক কসরতে সীমাবদ্ধ থাকে না; আধুনিক সময়, সমাজ ও মূল্যবোধের গভীর দ্যোতনায় উজ্জীবিত হয়ে ওঠে।

‘নদী’ ও ‘নারী’ শামীম রেজার কবিতার দুটি অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থের নাম ‘পাথরচিত্রে নদীকথা’। নাম থেকেই কবির মনোভঙ্গি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব। পাথর আধুনিক নগর-জীবনের অন্যতম অনুষঙ্গ। টি. এস এলিয়ট Waste Land কাব্যে বলেছেন—

Here is no water but only rock
Rock and no water and the sandy road

শামীম রেজা নগরের পাথুরে রুক্ষতায় নদীর মমতাময় নরম স্রোতধারা জাগাতে চান— ‘মৃতদের পাঁজরের দাঁড়টানা বাতাসে কীর্তনীয়া নদী কীর্তনখোলায় ওঠে উত্তাল ঢেউ’। ‘পাথরচিত্রে নদীকথা’ কাব্যে বিরূপ ইতিহাস ও ব্যক্তি বেদনার রূপায়ণ ঘটেছে দারুণভাবে। এ কাব্যে প্রেয়সীকে কবি ‘পরাণী’ বলে সম্বোধন করেছেন— ‘ও পরাণী বলে দাও তুমি, আমি কার নির্ঝর’।

এখানে ‘বানানো নদীর ঘোলাটে জল’ আর ‘চরের শরীরে ঘুমিয়ে থাকা বরফনদীর’ দেখা পাই আমরা। কবি ওমর খৈয়ামের ‘ওসালিয়া’ চরিত্রের দেখাও মিলে যায় চকিত চমকে— ‘একা নিদ্রায় বিষণ্ণ বিভোর জলরেণু কেঁদে যায়…ওসালিয়া গায় তবু’। ‘নালন্দা দূর বিশ্বের মেয়ে’ কাব্যে কবির হৃদয়তমা নালন্দা ব্যঞ্জনায় ধরা দেয়। নারী অভিধার ঊর্ধ্বে উঠে নালন্দা এখানে নদী, প্রকৃতি ও মুক্ত চেতনার প্রতীকী তাৎপর্যে অভিসিক্ত—

 

মনেতে বসতি নদী
দূর-বনে আগুন-পাহাড়
কীভাবে বসতি গড়ি
এমন চিতার ভিতর।

 

জীবনানন্দের রূপ-রস-গন্ধময় চিরন্তন বাংলাকে প্রাতিস্বিক ভঙ্গিতে আত্মস্থ করে নবসৃষ্টির আনন্দে এগিয়ে চলেন কবি। এ-কাব্য সম্পর্কে সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য— ‘জীবনানন্দকে তাঁর প্রয়োজন হয় তার ওয়েস্টল্যান্ডকে কিছুটা হলেও সবুজের স্পর্শ দিতে। জীবনানন্দের নদী বৃক্ষ প্রান্তরের ছবি সে জন্য প্রয়োজন শামীম রেজার। সেগুলো তাঁর কবিতার পরোক্ষে অথবা প্রত্যক্ষে বিছিয়ে দিয়ে তাঁর ভিন্ন পথে চলেন।’

‘যখন রাত্তির নাইমা আসে সুবর্ণনগরে’ কাব্যে শামীম রেজা বিষয় ও ভাষাগত দিক থেকে স্বকীয়তায় ভাস্বর হয়ে ওঠেন। আঞ্চলিক ভাষাকে দক্ষতার সঙ্গে বিষয় উপযোগী করে প্রয়োগ সক্ষমতা অর্জন করেছেন।

‘যখন রাত্তির নাইমা আসে সুবর্ণনগরে’ কাব্যে শামীম রেজা বিষয় ও ভাষাগত দিক থেকে স্বকীয়তায় ভাস্বর হয়ে ওঠেন। আঞ্চলিক ভাষাকে দক্ষতার সঙ্গে বিষয় উপযোগী করে প্রয়োগ সক্ষমতা অর্জন করেছেন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ভাষায় এ কাব্যে তিনি— ‘ক্লাসিক ও রোমান্টিকের ভেদাভেদ মুছে দেন’। এখানেও ক্লাসিক ও রোমান্টিক চেতনার ভারসাম্যে নদীর কলরোল ধ্বনিত—

‘পদ্মা-সুরমা-কুশিয়ারা-আগুনমুহা কত নদী নাম বুকে বাজে না, ঘুম আসে না, একবার কমলদহে প্রিয়তমার শরীর দাহ হলে কমলারঙের আগুন ছড়ায়েছিল পূর্ণতোয়ার জলে’

শামীম রেজা আবেগকে পুর্ণদমে শাসন করে কবিতাকে শিল্পোত্তীর্ণ করে তোলার ক্ষেত্রে আরও মনোযোগী হয়ে উঠেছেন ‘হৃদয়লিপি’ কাব্যে। সনেটের আঙ্গিকে লেখা কবিতাগুলোতে মানবহৃদয় এক অভূতপূর্ব সুরেলা কোরাসে মূহ্যমান। প্রেম, নদী, নারী এ কাব্যের ভূগোল জুড়ে আছে। যদিও কবি জানেন, ‘ঠোঁট ঠোঁটকে বিশ্বাস করে না কখনো কখনো’। তবুও তিনি ‘কবর ওপারে যেয়ে’ সেখানেও পেতে চান সাকী। প্রেম কবির কাছে আগুন নিয়ে খেলা— ‘আগুন নিয়ে খেলি খেলতে খেলতে কত পুড়েছি মন’। এ-কাব্যে প্রেম, কাম ও প্রকৃতি একাকার হয়ে ওঠে। শরীরী চেতনা এখানে স্বাভাবিক জীবন অভিধায় চিহ্নিত— ‘দেহ দেহ রেখে কে না কেঁপেছে প্রথম ওহে নারী’। নারী এ কাব্যে একদিকে যেমন থরো থরো কামকম্পিতা অন্যদিকে তেমনি আলোর উৎসমুখও বটে। কবি তার কাছেই আলোর দুয়ার খোলার প্রার্থনাবিভোর— ‘দুখজাগানিয় নারী তুমি আলোর দুয়ার খোলো’।

শামীম রেজা স্বশাসিত আবেগ ও অনুভবের বহুমাত্রিকতায় বাংলাদেশের কবিতার মানচিত্রে এঁকে দিয়েছেন স্বকীয় পদচিহ্ন। বাংলা কবিতার ঐতিহ্য ও বিশ্বকবিতার অঙ্গীকার তাঁর পথ চলায় আলো ছড়িয়েছে। কবি জানেন তাকে কোথায় পৌঁছাতে হবে। তাই নিরন্তর নিজেকে ভেঙে নতুন রূপে নির্মাণ করে চলেন। এখানেই তাঁর শক্তি ও সম্ভাবনার উৎসভূমি।

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

জন্ম ৪ জুন ১৯৮২ সালে নোয়াখালী জেলার সেনবাগ উপজেলার বালিয়াকান্দি গ্রামে। পিতা আবদুল হাই ও মাতা আসমা খাতুন। সহধর্মিনী সানজিদা আক্তার ইমু। দুই কন্যা ওয়াসিয়া তাজনূর বারিষা ও ওয়াসফিয়া নাজরীন এষা। বিজবাগ এন. কে উচ্চ বিদ্যালয় ও চৌমুহনী সরকারী এস. এ কলেজ থেকে এস.এস.সি ও এইচ.এস.সি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর উভয় পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান লাভ করেন। শামসুর রাহমানের কবিতা নিয়ে গবেষণা করে এম.ফিল ডিগ্রি অর্জন করেছেন ২০১২ সালে। রাজউক উত্তরা মডেল কলেজের বাংলা বিভাগে অধ্যাপনায় নিয়োজিত।

ছোটোবেলা থেকেই লেখালেখির সূচনা। দেশের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় দৈনিক,সাহিত্যপত্র ও ছোটোকাগজে নিয়মিত লেখেন। প্রকাশিত গ্রন্থ ১৩ টি। কাব্যগ্রন্থ: প্রথম অন্ধকার, প্রলম্বিত রাতের নর্তকী, ঘুড়িদের পার্থিব আকাশ, মানুষ তোমার দিকে, মর্ত্যের মাছিরা, সূর্যফুলের রৌদ্রঘ্রাণ; প্রবন্ধগ্রন্থ: শামসুর রাহমানের কবিতা: মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গ, বাংলাদেশের সাহিত্য:পরিপ্রেক্ষিত ও সাম্প্রতিক প্রবণতা; গল্পগ্রন্থ: রাতশিকারি; উপন্যাস:অতিমানবী, দ্বিখণ্ডিত চাঁদ; অনুবাদগ্রন্থ: ডি এইচ লরেন্সের কবিতা: ঈর্ষা ও একটি প্রেমগীতি; সম্পাদিত গ্রন্থ: নির্বাচিত প্রথম দশক। সম্পাদনা করেন সাহিত্য শিল্প ও সংস্কৃতির ছোটোকাগজ ‘অক্ষৌহিণী’ এবং শিল্প সাহিত্য ও সমাজ রাজনীতির পত্রিকা ‘সৃজন’।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।