বৃহস্পতিবার, মে ৩০

গ্রহণের কাল : শাশ্বত নিপ্পন

0

নিজাম কোলকাতার পাটুলির মোড়ের পাশের বস্তিতে টিনের ঘরে ভাড়া থাকে তা চৌদ্দ পনেরো বছর তো হবেই। সপ্তাহে চারদিন সে পাটুলি বাজারের এককোণে ছাগল কেটে মাংস বিক্রি করে। দোকান বলতে বাঁশের বেড়া, কোনোমতে, মাথার উপর দুটো টিন লোহার বোর্ডও আছে— যদিও টিনের সাইনবোর্ডের কমদামি কালিতে লেখাগুলো প্রায় অদৃশ্য। তবুও ভালো করে লক্ষ্য করলে বোঝা যায় ‘ছিন্নমস্তা মাংস ঘর’ প্রোপাইটার শ্রী নরেন। তবে যখন বিশেষ পার্বন আসে, যেমন : ঈদ-উল-ফিতর, মহরম অথবা ঈদ-উল-আযহা এমন কি সারা রোজার মাস জুড়েই ‘ছিন্নমস্তা’ মাংস ঘরের প্রোপাইটার মাথায় বেতের ইসলামী টুপি, আর চোখে সুরমা এঁকে মাংস চুরায়।

যদিও টিনের সাইনবোর্ডের কমদামি কালিতে লেখাগুলো প্রায় অদৃশ্য। তবুও ভালো করে লক্ষ্য করলে বোঝা যায় ‘ছিন্নমস্তা মাংস ঘর’ প্রোপাইটার শ্রী নরেন। তবে যখন বিশেষ পার্বন আসে, যেমন : ঈদ-উল-ফিতর, মহরম অথবা ঈদ-উল-আযহা এমন কি সারা রোজার মাস জুড়েই ‘ছিন্নমস্তা’ মাংস ঘরের প্রোপাইটার মাথায় বেতের ইসলামী টুপি, আর চোখে সুরমা এঁকে মাংস চুরায়।

বিনবিনে মাছি ওড়ে দোকান ঘর জুড়ে; সাথে রক্ত আর বিষ্ঠার একটা তীব্র কটু গন্ধ। এর মাঝেই সে তার থলথলে পেট কাঁপিয়ে ধারালো ডাসা দিয়ে এক মনে ছাগলের ঠ্যাং, বুক, পাঁজর চুরায়। দোকানের সামনে ছোটো-খাটো লাইন জমে যায়। পিছনের সারি থেকে কেউ একজন পাটুলির লোকাল টোনে চিৎকার দেয়। বিন বিনে মাছিগুলো নিজামের ব্যস্ত হাতের দোলায় উড়ে যায়— আবার আসে। কোনোদিকে নজর না দিয়ে ডাসা চালাতে থাকে নিজাম ওরফে নরেন কুণ্ডু ওরফে নিজামুদ্দিন শেখ। ওর কানে গোঁজা থাকে ননী বিড়ি।

তবে ছাগল কাটার দক্ষতা দেখে কেউ বুঝতেই পারবে না যে এটি তার বংশীয় পেশা নয়। কেউ ভাবতেই পারবে না যে নরেনের চৌদ্দপুরুষ বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলার মধুখালীর নিভৃত গ্রামের নিরামিষ ভোজী বাসিন্দা, বাবা নিতান্ত এক মুদী ব্যবসায়ী। সন্ধ্যা হলে স্থানীয় রাধামাধব মন্দিরে কৃষ্ণভক্ত বাবা নিবারণ কুণ্ডু কপালে, বুকে তিলক এঁকে কীর্তন শুনতে যান নিয়মিত। অন্যদিকে আকবর, কুদ্দুস, পিন্টুদের নিয়ে সারা গ্রাম চষে বেড়ানোই নরেনের মূল কাজ। আর আকবরের ছোটো বোন সালমা যখন দু’পাশের বেনী দুলিয়ে কচি নিটোল আঙ্গুল তুলে বলে, ‘নরেনদা, ঐ ডাসা পিয়ারাডা পাড়ি দ্যাও না’— তখন নরেনের মনে হতো যদি কোনো জায়গায় পেয়ারার পাহাড় থাকত তাহলে সে মুহূর্তে তা মাথায় নিয়ে হাজির হতো। তারপরও সে বলে, ‘পাকা পেয়ারা খাতি নেই— ভিটামিন থাহে না।’ সালমা কখনো একটা শাপলা চাইলে, নরেন গড়াই নদী সাঁতরে একরাশ শাপলা এনে সালমার রঙিন ফ্রকের আঁচল ভরিয়ে দিত। কিছুটা তাচ্ছিল্যের সাথে বলত—‘তুই হাপলা লইয়া খেলতিছিস ক্যা? হাপলা ফুলি কোনো ছেন্ট নাই; তোমারে মেম্বারের বাড়িত্তে গোলাপ আইন্যা দিমু।’ ‘আমার ওতো দরকার নেই, আমার হাপলাই বালা’— ঠোঁট বাঁকিয়ে উত্তর করে সালমা। এই ভ্রুকুটি, নরেনের বুকে আনন্দের বান ডেকে দেয়। ওমনি কোঁচড় থেকে পাকা করমচা বের করে সালমার হাতে দেয় নরেন, বলে, ‘আমাগের বেড়ের গাছে পাকছে, নিয়া আইস্যা পড়লাম তোমার জন্য।’ খিল খিলিয়ে হেসে ওঠে সালমা।

এসব কথা এখন আর খুব একটা মনে পড়ে না নিজামের। মায়ের গায়ের গন্ধ, গ্রামের নদী— এসব রোমান্টিক বিষয়। কসাইয়ের অত রোমান্টিকতা থাকলে চলে নাকি? কিন্তু সব কাজ শেষে যখন নিজাম গোসল সেরে, ঘুঘনী দানা আর সিক্সটি আপ-এর বোতল খুলে বসে তার বস্তির ঘরে প্রতিসন্ধ্যায়, তখন বার বার এসব টুকরো টুকরো গল্প বিনবিনে মাছি হয়ে উড়তে থাকে তার মগজের মধ্যে। পেগ যতই বাড়ে, ততই তার গল্পের চরিত্ররা জীবন্ত হয়ে ওঠে। সালমার সেই বেনী, ফ্রকের আঁচল, তার নিথর দেহ— সবই। এক সময় নিজামের মনে হয় নেশা নয়, সে যেন যন্ত্রণা গিলছে। সালমাকে গিলছে, গড়াই নদীর পাড়, প্রাইমারী স্কুলের বারান্দা, কুদ্দুস, আকবরের সাথে আমড়া চুরি, গ্রামের বর্ষা, সোঁদা মাটির গন্ধ গিলছে সে একটার পর একটা। সিক্সটি আপের বোতল শেষ হতে না হতেই নিজাম কসাই আবার নরেন হয়ে যায়—

পেগ যতই বাড়ে, ততই তার গল্পের চরিত্ররা জীবন্ত হয়ে ওঠে। সালমার সেই বেনী, ফ্রকের আঁচল, তার নিথর দেহ— সবই। এক সময় নিজামের মনে হয় নেশা নয়, সে যেন যন্ত্রণা গিলছে। সালমাকে গিলছে, গড়াই নদীর পাড়, প্রাইমারী স্কুলের বারান্দা, কুদ্দুস, আকবরের সাথে আমড়া চুরি, গ্রামের বর্ষা, সোঁদা মাটির গন্ধ গিলছে সে একটার পর একটা।

ঘুড়িতে মাজনের মৌসুমগুলোতে ব্যস্ত সময় যেত নরেনদের। সালমা ওদের গা লাগা হয়ে থাকত সবসময়। নরেন বার বার বলত, ‘তুমি হইলা ম্যাইয়া ছাওয়াল, তুমি আমাগের মধ্যে কি হরো, এ্যাঁ? বাড়িত যাও।’ ‘তুমি যাও গা’— ভ্রু দুটো বাঁকিয়ে উত্তর করত সালমা। অন্য দিকে মনে মনে নরেন চাইতো সালমা যেন শেষ পর্যন্ত-ই থাকে। সব কিছু চলছিল বেশ। হঠাৎ একদিন সালমা হারিয়ে গেল। সারা গ্রামে তার খোঁজ মেলে না। চারপাশে হৈ হৈ। এর মাঝেই সালমাকে স্কুল ঘরে পাওয়া গেল ঘুলঘুলি সন্ধ্যায়। বাড়ির লোকেরা সালমাকে খুঁজতে শুরু করে দুপুরের পর থেকে। সন্ধ্যায় ওরা দু’দলে ভাগ হয়ে গড়াইয়ের পশ্চিম দিকে আর ঘোষ মশাইদের টলটলে পুকুরের পাড়ে জড়ো হতে শুরু করে, জাল আর হারিকেন হাতে। সালমার মা এর মধ্যেই পাগল প্রায়। স্কুলের কাজ শেষে শহর থেকে ফিরে প্রাইমারি স্কুলের দপ্তরী নিতাই এসে খবর দিল, ‘দুপুরে আমাগের পণ্ডিত স্যার হরগোবিন্দ বাবু, অংকের বই নিয়ে ছালমারে ইশকুল ঘরে আসতি ক’ল।’ সারা গ্রাম ছুটল স্কুলের দিকে। সালমার প্যান্টের ফিতেটা ছেড়া ছিল। হাতের মুঠিতে তখনো তিনটে করমচা ধরা। ওর দুই কষা দিয়ে শুকনো রক্ত ধারা মিশে গিয়েছিল স্কুল ঘরের মেঝের মাটির সাথে। সেই থেকে নরেনের সালমা হয়ে গেল সন্ধ্যার জোনাকি।

ঠিক কী কারণে সালমা মরল তা সেদিন বুঝতে পারেনি নরেন। তবে সে রাতে চিরকুমার হরগোবিন্দ স্যারকে গ্রামের রাধা-মাধব মন্দিরে পাওয়া গেল না। পরদিন গ্রামের মুসলমানরা অস্ত্র-পাতি নিয়ে হরগোবিন্দ পণ্ডিতের বাড়িতে আগুন দিল। দাউ দাউ করে জ্বলল বাড়ির গো-খাদ্য, ঘরের চালের শুকনো-পুরনো খড়, বাঁশ, বালিশ, চৌকি, কীর্তনের খোল, পুজোর ঘরে রাখা কৃষ্ণ ঠাকুরের মুর্তি, ফুল, বেলপাতা সবই। নরেন সেদিন ঠ্যাঁয় দাঁড়িয়ে ছিল। মনে মনে বলেছিল পুড়ুক, পুড়ুক সব কিছু। পরের দিন পোড়া ছাইভস্মের মাঝে কিছুতেই চেনা যাচ্ছিল না কোনটা যে বদনা আর কোনটা নারায়ন পূজার কষাকুষি। কোনটা যে মুদি দোকানের হিসাবের খাতা আর কোনটা শ্রীমতভাগবত গীতার পাতা! মিলে মিশে সব একাকার। সবই কয়লা! এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই গ্রামের দাসেরা ঘোর আষাঢ়ে দিল বাঁধের মুখ আগলা করে। মুহূর্তে গড়াইয়ের অভিশপ্ত জলের তোড়ে ভেসে গেল মুসলমানদের ফলন্ত ফসলের মাঠ। বানের জলে রাতারাতি ডুবে গেল মুসলমান বর্গা চাষীদের ঘামে বোনা ফসল।

এই ঘটনার দু’একদিন পর কে বা কারা রাধা-মন্দিরের উঠানে ফেলে গেল সদ্য জবাই করা একটা আস্ত গরুর মাথা। আর লুট হয়ে গেল ঘোষদের বাড়ি আর বাগানের ফল। সাতদিন শহরে থেকে এক আঁধারী ভোরে ঘোষ পরিবার দেশ ছাড়ল। নরেন প্রায় প্রতিদিনই সালমাদের বাড়ির কাছে ঘুরঘুর করে। সালমার কবরটার কাছেও যায়। সেদিন একজোড়া পাকা পেয়ারা আর একটা কামরাঙ্গা রেখে এসেছিল কবরটার পাশে। ফিরে আসার সময় চোখের জল রাখতে পারেনি নরেন। কিন্তু আজ হঠাৎ আকবরের সাথে দেখা হলে, সে নরেনকে পাশ কাটিয়ে গেল। উপযাচক হয়ে নরেন-ই বলল কামরাঙ্গা খা— ঘোষদের বাগানের। খাব না, থুঃ! গোঁয়ারের মতো উত্তর দেয় আকবর। ওতা হিন্দুগের গাছের— ওর চোখ-মুখে ঘৃণা উচ্ছলে পড়ে। অবাক হয়ে কামরাঙ্গাগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে নরেন। বোঝার চেষ্টা করে প্রাণ-পনে— তার কি করা উচিত। ফলগুলো কি সে ফেলে দেবে? ঘোষদের বাগানের গাছগুলোর জাত কী? হিন্দু না মুসলমান? নরেণের মনে পড়ে, সে দিন গড়িয়ে যাওয়া বিকেলে স্কুলের মাঠে, একদল লাল পিঁপড়ের সারিকে আকবর, নূরুল, সিদ্দিকরা বলছিল, ‘এই দ্যাখ এই গুলাই হিন্দু পিঁপড়া, দেখস না হ্যাগো মাথার মধ্যে সিনদুর।’ সিদ্দিক বলে, ‘মার হালার পো গের, না হলে হালার পো রা কামড় দিব।’ সেদিন অবশ্য নরেনও মেতেছিল সে হত্যা যজ্ঞে। ওদের পায়ের নিষ্ঠুর দলনে পিষ্ঠ হয়ে মরেছিল মুখে ডিম বহনকারী হিন্দু পিঁপড়েরা। পরক্ষণে, আকবর বলে, ‘আর শোন নরেন, আমার বোনের কবরের ধারে তুই আর আসবি না— আমাগের বাড়িতেও না— তোরা হিন্দু— মালাউল, কাফের।’

সেদিন থেকেই জাত গেল নরেনের। সেই হারিয়ে যাওয়া জাত ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেনি নরেন। আজ সে কখনো, ‘জয় মা তারা’ বলে চিৎকার দিয়ে ছাগলের গলায় ছুরি চালায় আবার কখনো বা ‘আল্লাহু হুয়াকবর বলে’ জবাই করে। নিজাম কসাই এর এত জাতের বাতিক নেই। বলতে গেলে কিছুই নেই। গ্রাম, নদী, ঘোষদের বাগান, সালমা, মা-বাবা। সে শৈবালের মতো শিকড়হীন। মানুষ, তার আবার জাত!

সেই হারিয়ে যাওয়া জাত ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেনি নরেন। আজ সে কখনো, ‘জয় মা তারা’ বলে চিৎকার দিয়ে ছাগলের গলায় ছুরি চালায় আবার কখনো বা ‘আল্লাহু হুয়াকবর বলে’ জবাই করে। নিজাম কসাই এর এত জাতের বাতিক নেই।

এ টানাপড়েনের মাসেই গ্রামে আসল নরেনের পিশিমা। বাবার কাকাতো বোন। পিশে বহরমপুরের জুট মিলের ইউনিয়ন করা লেবার। মেশিন চালায়, নাম শ্রীধাম। তিন মেয়ের সংসার। রাতে সবার খাওয়া শেষে, মুখে পান পুড়ে পিশিমা বললেন, ‘তা দাদা বলিহারী তোমাকে, এখনো বুঝতে তোমার দেরি হচ্ছে; এদেশে আর আমরা থাকতে পারব না; সবে তো শুরু। তারচে নরেন আমার সাথে থাক, সময় থাকতে একটা ব্যবস্থা কর ওদেশে— ভবিষতে থাকতে তো হবে ওখানেই।’ দূর থেকে ভেসে আসা শেয়ালের তীব্র চিৎকারকে থামিয়ে পিশিমা আবার বললেন, ‘আমার তিন মেয়ে একবেলা খেলে, নরেনও একবেলা খাবে’— বলেই বিশ্রি ভাবে একদলা পানের রস মাখানো পিক ফেললেন, আমাদের নিকানো উঠানে।

সেই রক্তলাল পিকের দাগ না শুকাতেই নরেন পিশিমার সাথে চলে আসে বহরমপুর জুট মিল কলোনির আড়াই খোপের টিনের বাসাতে। এখানেই থাকবে সে, আর প্রাণপনে চেষ্টা করবে তার বংশের ঔপোনিবেশ প্রতিষ্ঠা করতে। টাকার জোগান আসবে বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলায় মধুখালী উপজেলার নিভৃত পল্লীর এক মুদী দোকান মুসলমান বর্গা চাষীদের ফলানো ফসল থেকে।

 

২.
এ গল্পের পরবর্তী অংশটুকু কালবৈশাখী ঝড়ের মতো। নরেন কলোনির আড়াই খোপে হাত-পা ছড়িয়ে বসতে না বসতেই সবকিছু তালগোল পাকিয়ে গেল শ্রীধাম বাবুর পরিবারে। জুট মিলের আন্দোলন দু’বছরে উঠল তুঙ্গে। ইউনিয়নের নেতাদের দাবির মুখে কারখানা ‘লক আউট’। আর কারখানা বন্ধের সাথে সাথে পিশিমার আড়াই খোপ ঢেঁকে গেল অভাবের আঁধারে। এর মাঝেই ট্রেড ইউনিয়ন পলিটিক্সে গুম হলেন শ্রীধাম বাবু। কিছুদিন পর তার লাশ পাওয়া গিয়েছিল কোথায় যেন। অবশ্য তিনি থাকলেও সে সমস্যার খুব একটা সামাধান হতো এমন না। প্রয়োজনের তাগিদেই পিশিমা মেজ মেয়ে শিপ্রাকে বিয়ের নামে বিহারে বেঁচে দিলেন একদিন। সেই টাকায় মাস দেড়েক সংসার চালিয়েছিলেন পিশিমা। কলোনির দুর্গা পুজার চাঁদাও দিয়েছিলেন, সেই টাকাতেই। ৮১ টাকা।

তারপর কলোনির আড়াই খোপেই নিজেদের শুকনো শরীর পেতে বসেছিল সংসারের বাকি সদস্যরা। প্রথমে পাওনাদার দিয়ে শুরু, তারপর সার্বজনীন। শরীরী ব্যবসা। নরেনের কাজ ছিল, বাড়িতে আসা ভদ্র লোকদের হুকুম শোনা।

তারপর কলোনির আড়াই খোপেই নিজেদের শুকনো শরীর পেতে বসেছিল সংসারের বাকি সদস্যরা। প্রথমে পাওনাদার দিয়ে শুরু, তারপর সার্বজনীন। শরীরী ব্যবসা। নরেনের কাজ ছিল, বাড়িতে আসা ভদ্র লোকদের হুকুম শোনা। এই হুকুম শুনতে শুনতেই নরেন চুরি শিখল, শিখল বিড়ি খাওয়া, বোতল কিনে হিসেব মিলান আর হস্তমৈথুন। নরেনের লেখাপড়া হয়নি। হয়নি অনেক কিছু; সে সাথে হয়নি তার ঔপোনিবেশ স্থাপন করা। এর মধ্যেই একদিন রাতে আড়াই খোপের নরক ছাড়ল নরেন। ভাত তাকে ছেড়েছিল অনেক আগেই এবার সে ছাড়ল ঘর। তারপরও সেই আড়াই খোপে আসা ভদ্র লোকদের মাতাল বেসামাল গলার চিৎকার আর দিদিদের শীৎকার তাড়া করে ফিরেছে গৃহহীন নরেনকে। শৈবাল জীবনেও দিদিদের এই বুক ফাটানো শীৎকার নরেনকে ঘুমাতে দিত না।

তারপর শৈবাল হয়ে ভাসতে ভাসতে এক ধাবায় পরিচয় হয়ে গলে পাঞ্জাবী মুসলমান ড্রাইভার হায়দার খাঁন এর সাথে। দূর পাল্লার লরি ড্রাইভার। হুকুম শুনতে শুনতেই পরিচয়। ছোলা, কাবলি, ইডলি, কাবাব সোডা ওয়াটার কখনো মেয়ে মানুষ প্রভৃতি। খাঁ সাহেব সারা ভারত ঘুরিয়েছে নরেনকে। তিন বেলা ভালো খাইয়েছে— অর্থাৎ বাঁচিয়ে রেখে হঠাৎ হার্ট ফেল করল ড্রাইভার। আর মরার আগে নরেনকে তার বন্ধু বিহারের নাসিরুদ্দিন শেখ, কসাই এর কাছে বন্দোবস্ত দিয়ে গেল। নাসির কসাই-ই নরেন এর দীক্ষা গুরু। আর এখানেই নরেন হয়ে গেল নিজাম। তার হাতে খড়ি হয়েছিল গরু জবাই এর মধ্যে দিয়ে। প্রথমে একটু অস্বস্থি লাগত পরে ঠিক হয়ে যায় জীবিকার তাগিদে। তারপর নিজে ওস্তাদ হওয়ার পর অবস্থা বুঝে এখনো গরু মহিষ এখনো ছাগল ভেড়া। ওস্তাদের মেয়ে তহমিনা নরেনের প্রথম পরিবার। টেকেনি। তারপর নিজাম কসাই হরিজন পাড়ায় দ্বিতীয় কাজ করে। একদিন গঙ্গার ঘোলা জলের ঘুর্নিতে পড়ে একটানে পাতাল পোঁছে গেল হরিজনের মেয়ে সেঁওতি। তিনদিন পর ভেসে উঠেছিল মাইল খানেক দূরে। দূর থেকে টা টা জানিয়ে নিজামকে বন্ধনহীন করে কৃতজ্ঞ করেছিল, গৌরি চামারের মেয়ে সেঁওতি। নরেনের না হয়েছে মধুখালীর কুণ্ডু পরিবারের ঔপোনিবেশ প্রতিষ্ঠা, না হয়েছে হরিজন পাড়ায় হাঁড়িয়া খেয়ে দোল উৎসব করা। এর মাঝেই নরেন বুঝেছিল বাংলাদেশের গড়াই আর গঙ্গা এক না; বুঝেছিল, পলি দোআঁশ আর এদেশের মাটি এক নয়।

 

৩.
ঢুলু ঢুল চোখে নিজাম তাকায় বাইরের দিকে। কোলকাতায়ও চাঁদ ওঠে। বিবর্ণ বিষণ্ন পাংশু একচিলতে চাঁদ। কোলকাতার চাঁদে কোনো আলো থাকে না। তবু জোসনাহীন সর্বহারা চাঁদ ওঠে প্রতিরাতেই। রাস্তার নিয়ন আলো গ্রাস করে নিয়েছে রাতের সব সৌন্দর্য। কাঁচাহলুদ আলো ছড়িয়ে এদকি ওদিক ছুটছে নানা ধরনের গাড়ি। ওরা ছুটছে ওদের ঠিকানায়। ঠিকানাহীন নিজাম কসাই এর কোনো ব্যস্ততা নেই। নিভে যাওয়া বিড়িটা হাতে নিয়ে সে বসে থাকে। এই বস্তি থেকে পাটুলির বড়ো রাস্তাটার অনেকটা দেখা যায়। সামনের বিশাল ফ্লাইওভারটা পর্যন্ত দেখতে বেগ পেতে হয় না মোটেও। কাঁপা হাতে নিজাম বিড়িটা জ্বালায়। তার ঘরের গুমোট অন্ধকার এই সামান্য আলোতেই কেঁপে ওঠে। বিড়িতে একটা টান দিয়ে, নিজাম বিড়বিড় করে ওঠে, ‘এই দ্যাশের প্যাডে কি জানি হইছে; হালয় হারা দিনই খালি গুড়গুড় করে— মিছিল যায় ঘন ঘন। বোমা ফাড়ে… হায়নার মত পুলিশ দৌড়ায়, গুলি চালায়—কুনো ঝামেলা চলতাছে।’ হঠাৎ বিকট শব্দ হয় কোথাও। মৃদু কেঁপে ওঠে বস্তির জং ধরা জীর্ণ টিন। আবার সে বিড়বিড় করে ওঠে, ‘পেটো ফুটচে চারদিকে, বানচোদরা পেটো ফুটাচ্চে। দে ছাড়খার করে দে বালের এই দ্যাশ, দ্যাশ পুড়লে আমার কি ন্যাওড়া— গ্লাসের তলানিটুকু গলায় ঢেলে দ্যায় নিজাম। গলিত যন্ত্রনাটুকু ঢক করে গিলে, থুঃ করে একদলা থুতু ফেলে সে ঘরের মেঝেতে। চোখ মুখ বিকৃত করে দৃষ্টি মেলে দেয় বড়ো রাস্তার দিকে।

পেটো ফুটচে চারদিকে, বানচোদরা পেটো ফুটাচ্চে। দে ছাড়খার করে দে বালের এই দ্যাশ, দ্যাশ পুড়লে আমার কি ন্যাওড়া— গ্লাসের তলানিটুকু গলায় ঢেলে দ্যায় নিজাম। গলিত যন্ত্রনাটুকু ঢক করে গিলে, থুঃ করে একদলা থুতু ফেলে সে ঘরের মেঝেতে। চোখ মুখ বিকৃত করে দৃষ্টি মেলে দেয় বড়ো রাস্তার দিকে।

মিছিল আসছে; জঙ্গী মিছিল। বেশ কিছু যুবক আসছে জোর কদমে। প্রায় সবার হাতে অস্ত্র। ওরা স্লোগান দিচ্ছে তারস্বরে। নেশা চোখে নিজাম দেখতে থাকে মিছিল, দেখতে থাকে মিছিলকারীদের হাতের তরবারী, সড়াশী, রামদা— ওদের সবাইকে কসাই মনে হয় নিজামের। আর এই মিছিল দেখতে দেখতেই সে আবার নরেন হয়ে যায়— দেখতে পায় একদল মানুষ ছুটে আসছে হাতে লাঠি, বল্লম, ন্যাটা হাতে ছুটে আসছে মধুখালির গ্রামে হিন্দু পাড়ার দিকে আগুন দিতে। সে দেখতে পায় একদল কসাই লুট করছে ঘোষদের ঘরদোর, বাগান। ওদের হাতের অস্ত্র তিমির অন্ধকারেও খড়িস সাপের চিড়ল জিভের মতো লকলকিয়ে উঠছে।

মিছিলের কসাইরা স্লোগান দেয়, ‘মুসলমান হো তো ভাগ যাও…’ ওদের গায়ের গোরুয়া পোষাকগুলো মনে হয় যেন রক্তে ধোওয়া। সে রক্ত ছাগলের নয়। মানুষের! ওরা স্লোগান দিতে থাকে, ‘মুসলমান গাদ্দার হো, গাদ্দার কো গোলি মার দো… জয় শ্রী রাম…’। নিজামের কানে বাজতে থাকে এই স্লোগানের বাংলা ভারসান। ‘জিহাদ জিহাদ জিহাদ চাই… নারায়েক তকরি আল্লাহু হুয়াকবর…’। মিছিলটা বড়ো। ওদের গগন বিদারী চিৎকার শিয়ালদা স্টেশনের নয়টার রানাঘাট লোকালের ভেঁপুর আওয়াজ ঢেঁকে যায়। আরও একটা বোমার শব্দ হয়। এটা পূর্বের চেয়ে বড়ো। গোটা বস্তিটা থর থর কেপেঁ উঠে; বস্তির ওদিকটা হঠাৎ আলোকিত হয়ে উঠে। নিজাম টালমাটাল পায়ে বাইরে আসে। জ্বলন্ত বিড়িটা দু’আঙ্গুলে চেপে হুস করে একটা টান দিয়ে আকাশের গায়ে ছড়িয়ে দিল একরাশ ধূসর ধোঁয়া। কি বিশাল আকাশ। তার এক কোণে একাকী চাঁদ, অসংখ্য তারা ছড়িয়ে আছে— তার মনে পরে ছেলেবেলার মধুখালীর আকাশটিও ছিল এরকমই নীল। সেই নীলাকাশ উগড়ে দিত সোনা গলানো জোসনা— গড়াইয়ের শান্ত বুকে। শীতের গড়াই কুয়াশা ঢাঁকা। যার দু’পাড় হলুদ সরিষায় ছাওয়া। সে দেখে, সেই হলুদ রাঙা পাড় বেয়ে দৌড়াচ্ছে সালমা বানু— তার বেনি দুটো দুলছে আর দুলছে পুরনো ঘড়ির পেণ্ডুলামের মতো। দূরন্ত সালমার সামনে দাঁড়িয়ে নরেন বলে, ‘তুমি হইলা মাইয়া ছাওয়াল এ্যত্ত দৌড় দাও ক্যা?’ পাগলের মতো দৌড়ে আসা উদভ্রান্ত মহিলাটা চিৎকার করে ওঠে, ‘ও দাদা হারামিরা বস্তিতে আগুন দিয়েছে গো… ও…. ও….। আমার আ…মা…র বাবুটা ঘরে ঘুমায় গো…ও…ও…. ’

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

পেশায় শিক্ষক। মেহেরপুর জেলার সক্রিয় সংস্কৃতিকর্মী তিনি। প্রকাশিত গল্পগ্রন্থের সংখ্যা পাঁচ। দেশভাগ, মুক্তিযুদ্ধ, সমকালীন সামাজিক সংঘাত থেকে শুরু করে ব্যক্তির সাংসারিক টানাপোড়েন ও মনস্তাত্তিক সংকট তাঁর গল্পে উপজীব্য হয়ে উঠেছে। ‘অনতিক্রম’, ‘পুনরুত্থান’, ‘অশনির ছন্দ’, ‘বৃন্তচ্যুত’ তাঁর উল্লেখযোগ্য গল্পগ্রন্থ।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।